ব্যাংক ব্যবস্থার ইতিহাস

পৃথিবীতে ব্যাংক ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল বিনিময় প্রথার অবসানের মাধ্যমে। তখন ব্যাংকিং বলতে মূলত বোঝানো হতো অর্থ (কয়েন ও স্বর্ণ) জমা রাখা এবং ঋণ আদান-প্রদান। ব্যাংক ব্যবস্থাকে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয় রোমান সম্রাজ্য এবং বিশ্বের প্রায় সকল দেশে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রভাব বিস্তার করতে ভূমিকা পালন করে ইউরোপের বিভিন্ন ধনী সম্প্রদায়।
Key Points
- প্রায় ৮০০ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বে কয়েন ব্যবস্থা পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চলে প্রচলিত হয়ে ওঠায় বিনিময় প্রথার সমাপ্তি ঘটে।
- রোমানদের ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন সম্রাজ্যের রাজারা নিজেদের সম্রাজ্যে এই ব্যবস্থার প্রচলন করেন।
- খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১ থেকে ১৮৫ সালে ভারতে যখন মৌর্য্য সম্রাজ্যের হাতে ক্ষমতা ছিল, তখন ‘আদেশা’ নামক একটি দলিলের সন্ধান পাওয়া যায়।
- ১৯৬০’র দশকে অটোমেটেড টেলার মেশিন বা এটিএম প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয় এবং দশকের শেষের দিকে অনেক ব্যাংক নিজের এটিএম স্থাপণ করে।
ব্যাংক ব্যবস্থার ইতিহাস
ব্যাংক ব্যবস্থার শুরু হয়েছিল মুদ্রাব্যবস্থার সাথেই। মুদ্রাব্যবস্থার আগে প্রাচীন মানুষ নিজেদের মাঝে বিনিময় প্রথা বা Barter System ব্যবহার করে বিভিন্ন লেনদেন করতো। তবে বিনিময় প্রথার বিভিন্ন অসঙ্গতি ও অসুবিধা থাকার কারণে মানুষ নিজেদের প্রয়োজনেই মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন করে।
মুদ্রাব্যবস্থায় ধনীরা বুঝতে পারেন যে নিজেদের বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ গচ্ছিত রাখার জন্য তাদের একটি নিরাপদ স্থান প্রয়োজন। এছাড়াও বিভিন্ন রাজ্যের প্রধানরা নিজেদের রাজ্যে সুষ্ঠুভাবে বাণিজ্য পরিচালনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ট্যাক্স কালেকশনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার প্রয়োজনবোধ করে।
ফলস্বরুপ, আবিষ্কার হয় ব্যাংকিং পদ্ধতির। তবে তখনকার ব্যাংক ব্যবস্থা আর আজকের ব্যাংক ব্যবস্থার মাঝে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। এখনকার ব্যাংক ব্যবস্থা ঠিক যতোটা জটিল, প্রাচীন কালের ব্যাংক ব্যবস্থা ছিল ঠিক ততোটাই সরল।
হাজার বছর ধরে চলা পরিবর্তনের পরিক্রমায় আমরা বর্তমান ব্যাংক ব্যবস্থা পেয়েছি। ব্যাংক ব্যবস্থা কিভাবে শুরু হলো এবং বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে আমরা কিভাবে আজকের ব্যাংক ব্যবস্থা পেলাম, আজ সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।
বিনিময় প্রথার অবসান
আমরা সকলেই জানি যে প্রাচীন কালের মানুষ পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বা বিনিময় প্রথায় নিজেদের মাঝে লেনদেন করতেন। বিনিময় প্রথা নিয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে লেখা অনেক বেশি বড় হয়ে যাবে, তাই সেই টপিকে যাচ্ছি না। তবে বিনিময় প্রথার কিছু অসুবিধা ছিল, যা না জানলেই নয়। যেমন -
- দূরে কোথায় নিয়ে গিয়ে লেনদেন করা ছিল কষ্টসাধ্য।
- কোন পণ্যের মূল্য কতোটুকু তা জানার কোনো উপায় ছিল না।
- খাদ্যপণ্য যেহেতু অনেক দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত, তাই অনেক বেশি পরিমাণে লেনদেন করা যেত না।
- পণ্য লেনদেনের সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক বেগ পোহাতে হত।
তো, প্রাচীন মানুষ এইসব সমস্যা পেরিয়ে নিজেদের মাঝে বিনিময় প্রথায় লেনদেন করেছেন বহু বছর। তবে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করলো যখন মানুষ অনেক বেশি যাতায়াত করা শুরু করলো। মানুষ নতুন নতুন পণ্য ও বাজারের সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রতিনিয়ত চলাচল করা শুরু করলে বিনিময় প্রথা অনেকটাই অকেজো হয়ে পরে।
এই সময়েই পৃথিবীর কিছু কিছু অঞ্চলে শামুক/ঝিনুকের খোলস এবং ধাতব কয়েন পণ্যের বিনিময়ে গ্রহণ করা শুরু হলো। যেহেতু ছোট ছোট এসব কয়েন পণ্য পরিবহনের চাইতে অনেক বেশি সহজ ছিল, তাই এই ব্যবস্থা পৃথিবীত অনেক প্রান্তেই ছড়িয়ে পরেছিল।
প্রায় ৮০০ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বে কয়েন ব্যবস্থা পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চলে প্রচলিত হয়ে ওঠায় বিনিময় প্রথার সমাপ্তি ঘটে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে মানুষের যাতায়াত ছিল অনেক কম, সেসব স্থানে আরো বহুদিন পর্যন্ত বিনিময় প্রথা সচল ছিল।
প্রাচীন ব্যাংক ব্যবস্থার সূচনা
কিছু কিছু সোর্সের মতে, প্রায় ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বই প্রাচীন মিশন, অসিরীয়, সুমেরিয়া এবং ভারতীয় কিছু অঞ্চলে ব্যাংকের একটি ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তবে একে ব্যাংক না বলে বরং বিশাল বাজার ব্যবস্থা বলা যায়। যেখানে কৃষকরা নিজেদের ফসল একত্রে এনে জমা করতেন এবং বাজার কর্তৃপক্ষ সেখান থেকে অল্প অল্প করে ফসল বিক্রয় করতেন। তবে এখানে ঋণ বা অন্য কোনো সুবিধার অস্তিত্ব ছিল কি না সে বিষয়ে পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি।
কয়েন ব্যবস্থার শুরুতে অর্থাৎ আনুমানিক ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে ফিরে আসা যাক। রাজা-মহারাজা এবং ব্যবসায়ীদের মাঝে অনেকেই তখন বিপুল পরিমাণ কয়েনের মালিক হয়ে উঠেছিলেন। যেহেতু তৎকালীন সময়ে বাসা-বাড়িতে স্টিলের সিন্দুক ছিল না, তাই তারা নিজেদের কয়েন বিভিন্ন মন্দিরের বেইসমেন্টে জমা রাখতেন। এই স্থানকে অনেক বেশি পবিত্র মনে করায় এবং মন্দিরে সবসময় প্রহরী ও পূজারীদের উপস্থিতি থাকায়, এই স্থানকে তখন মনে করা হতো অনেক বেশি নিরাপদ।
এই কারণে প্রাচীন ইতিহাসে দেখা যায় যে কোনো রাজ্যে আক্রমণ হলে, আক্রমণকারীরা সর্বপ্রথম সেই রাজ্যের মন্দিরের ধ্বংস এবং লুটপাট করতো, কারণ সেখানেই সবচেয়ে বেশি সম্পদ পাওয়া যেত।
প্রাচীন মিশর, রোম, গ্রিস এবং ব্যাবিলনের ইতিহাস থেকে জানা যে এসব মন্দিরের প্রধান পূজারীরা অর্থ নিরাপদ রাখার পাশাপাশি অর্থ ঋণ হিসেবে প্রদান করতেন এবং সুদ হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতেন। এতে করে যেকোনো শহরের উপাসনালয় সেই শহরের অর্থব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতো।
উপাসনালয়গুলোর এসব কর্মকান্ড দেখে ধনী ব্যবসায়ীদের অনেকেই সুদের ব্যবসায় নেমে পরেন। যাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বা ব্যবসায় করার জন্য অর্থ প্রয়োজন হতো, তারা মন্দির বা ধনী ব্যবসায়ীদের থেকে অর্থ ঋণ হিসেবে নিতেন এবং সুদাসল পরিশোধ করতেন। অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে হতে হতো দাস/দাসী অথবা পেতে হতো মৃত্যুদণ্ড।
রোমান সম্রাজ্যে ব্যাংকিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবস্থার শুরু
সর্বপ্রথম রোমান সম্র্যজ্যে ব্যাংক ব্যবস্থাকে উপাসনালয় থেকে সরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়া হয়। এই সময়ে যদিও ব্যক্তিগত অনেক ব্যবসায়ী সুদি ব্যবসায় পরিচালনা করতেন। তবে রোমান সম্রাজ্যে কয়েন জমা রাখা এবং ঋণ দেয়া হতো শহরের নির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভবন থেকে। এই ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল সরকারের হাতে। তবে ব্যাংকিং কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল শুধু অর্থ জমা রাখা এবং ঋণ প্রদান পর্যন্ত’ই। তাই এই ব্যবস্থাকে অনেকে প্রোটো-ব্যাংক বলে সম্বোধন করেন।
ইতোপূর্বে লোন পরিশোধ করতে না পারলে তা পরবর্তী জেনারেশনে ট্রান্সফার করা হতো। অর্থাৎ, বাবা ঋণ নিয়ে যদি পরিশোধ করতে না পারতেন, তাহলে তা ছেলেকে পরিশোধ করতে হতো, সে’ও যদি না পারতো, তাহলে তার ছেলে ঋণ পরিশোধ করতো। তবে সর্বপ্রথম রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে জমি বা বসতভিটা বাজেয়াপ্ত করার নিয়ম জারি করেন।
চীনের প্রাচীন ব্যাংক ব্যবস্থা
বহুবছর আগে থেকেই চীনে আর্থিক লেনদেনের জন্য ধাতব কয়েন, রুপা ও স্বর্ণের মুদ্রার ব্যবহার হলেও, খ্রীষ্টের জন্মের পূর্বে চীনে ব্যাংক ব্যবস্থা আদৌ ছিল কি না সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ৬০০ শতকে চীনের ট্যাং সম্রাজ্যের রাজত্বকালে কিছু অ্যাকাউন্টিং হাউজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেখানে ব্যবসায়ীরা নিজেদের অর্থ জমা রেখে চেকের মতো একটি দলিল সংগ্রহ করতে পারতেন। মূলত এই দলিল তৃতীয় ব্যক্তিকে প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন সম্পাদন করা হতো।
৯৬০ সালে যখন সং সম্রাজ্যের যাত্রা শুরু হয় তখন চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় সকল ধরণের আর্থিক সুবিধা দিয়ে যাচ্ছিল, যেমন - অর্থ জমা রাখা, ঋণ দেয়া, চেক ও নোট ইস্যু করা ইত্যাদি। সপ্তম শতক থেকেতবে ১০২৪ সালে সর্বপ্রথম চীনের সিচুয়ান প্রদেশে কাগজি মুদ্রার প্রচলন করা হয়। এটিই ছিল বিশ্বে প্রথম কাগজি মুদ্রার প্রচলন। অন্যদিকে ১৩ শতাব্দীতে মার্কো পোলো কাগজি মুদ্রার কনসেপ্ট ইউরোপে প্রচার করেন।
মধ্যযুগের চীনে দুই ধরণের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের হদিস পাওয়া যায়, piao hao এবং qian zhuang। piao hao ছিল দেশব্যাপি বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন ড্রাফট ব্যাংকের একটি চেইন, অন্যদিকে qian zhuang ছিল বিভিন্ন ছোট পরিসরের আর্থিক প্রতিষ্ঠান যারা মূলত মানি এক্সচেঞ্জের কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে piao hao ব্যবহার করা হতো মূলত চীনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রেমিট্যান্স আদান-প্রদানের কাজ এবং qian zhuang নামের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ ব্যাংকিং’র কাজগুলো করতো।
এর মাঝে বেশ কিছু অর্থনৈতিক মন্দার দেখা মিললেও ১৯ শতকের আগে চীনের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চীন বিভিন্ন বিদেশী ব্যাংকের আবির্ভাব ঘটে। এইসব ব্যাংকের বেশিরভাগই ছিল ব্রিটেনের। তারা প্রায় ৪০ বছর চীনের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তার করে রাখে। তবে ১৮৯০ সালের দিকে চীনে বিভিন্ন জার্মার, ফ্রেঞ্চ, জাপানী এবং রাশিয়ান ব্যাংকের আবির্ভাব হয়।
চীনের প্রথম মডার্ন ব্যাংক হিসেবে ১৮৯৭ সালে ইমপেরিয়াল ব্যাংক অব চায়না প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং পরবর্তীতে ১৯১২ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না।
১৯৩৫ সালে চীনে কারেন্সি রিফর্মেশন নিয়ে আসা হয় এবং চীন সরকার fabi নামক একটি লিগাল টেন্ডার বা সরকারি মুদ্রা ছাড়া হয়। এর আগে চীনে নোটের মূল্য রুপার দরের সাথে মিলিয়ে রাখা হলেও fabi প্রথমবারের মতো রুপার স্ট্যান্ডার্ড থেকে মুক্তি পায়। এতে করে সাধারণ জগনণ নিজেদের কাছে থাকা সকল রুপার মুদ্রা জমা দিয়ে এই কাগজি মুদ্রা কালেক্ট করেন।
ইউরোপে ব্যাংকিং এবং মধ্যযুগে ব্যাংকের অপব্যবহার
একসময় গিয়ে রোমান সম্রাজ্যের ইতি ঘটলেও, তাদের ব্যাংকিং সিস্টেম টিকে থাকে আরো অনেকদিন। রোমানদের ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন সম্রাজ্যের রাজারা নিজেদের সম্রাজ্যে এই ব্যবস্থার প্রচলন করেন। ফলে ১২ ও ১৩ শতকে ইউরোপে ব্যাংক ব্যবস্থার আবারো উত্থান দেখা যায়। যেহেতু ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকতো সম্রাজ্য, তাই রাজারা নিজেরা’ও বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে শুরু করেন।
শুরুর দিকে এই ঋণ ব্যবহার করা হতো বিভিন্ন প্রতিকুল পরিস্থিত মোকাবেলায়, যেমন - যুদ্ধ করতে বা কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগের ক্ষতি সামলাতে। তবে আস্তে আস্তে অসৎ রাজারা নিজেদের তোশামোদের কাজে ঋণের টাকা ব্যবহার করা শুরু করেন।
১৪ ও ১৫ শতকে ইতালির বিভিন্ন রাজ্য যেমন - ফ্লোরেন্স, ভেনিস এবং জেনোয়া ব্যাংকিং’র উল্লেখযোগ্য স্থান হয়ে ওঠে। ইতালির মেডিচি ফ্যামিলি থেকে সেই সময়ে মেডিচি ব্যাংক স্থাপন করা হয়। তারা ডাবল এন্ট্রি হিসাবরক্ষণের ধরণ আবিষ্কার করেন, যা আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংক ব্যবস্থায় যুগান্তকারী লেনদেন নিয়ে আসে এবং এই ব্যবস্থা এখনো বিশ্বব্যাপী অনুসরণ করা হয়।
১৫৫৭ সালে স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ করতে গিয়ে নিজেকে এতোটাই ঋণে জর্জরিত করে ফেলেন যে তার নিজের সম্রাজ্যকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে হয়। একে বলা পৃথিবীর সর্বপ্রথম রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনা।
ধারণা করা হয় যে ইউরোপে মডার্ন ব্যাংকিং’র যাত্রা শুরু হয় ১৬০৯ সালে ব্যাংক অব অ্যামস্টারড্যাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই ব্যাংক কারেন্সি স্ট্যাবিলাইজেশন এবং অন্যান্য সেন্ট্রাল ব্যাংক যেমন - ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (১৬৯৪) এবং রিকসব্যাংক (১৬৬৮) গুলোর জন্য মডেল হিসেবে কাজ করে।
১৭ ও ১৮ শতকে ইউরোপে ব্যাংক ব্যবস্থার পুনোরায় গ্রোথ দেখা যায় যখন রথসচাইল্ড এবং ব্যারিংস’র মতো ব্যাংকিং সম্রাজ্য প্রতিষ্টা করে হয়। মূলত এর মাধ্যমে ইউরোপে জয়েন্ট স্টক কোম্পানী হিসেবে ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। এতে করে সাধারণ জনগণ ব্যাংকের শেয়ার ক্রয়, মুনাফা বা ক্ষতিতে অংশগ্রহণ করতে পারতেন।
ভারতীয় উপামহাদেশে ব্যাংকিং
ভারতীয় উপামহাদেশে ব্যাংক ব্যবস্থা রোমান সম্রাজ্যের মতো সুসংগঠিত ছিল না, অর্থাৎ এখানে ব্যাংকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রুপ ছিল না। তবে মনে করা হয় যে এখানেও ব্যাংক ব্যবস্থার একটি সার্ভিস অর্থাৎ ঋণ লেনদেন অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। প্রাচীন বেদে “উজুরি’’ নামের একটি শব্দ পাওয়া যায়, যার অর্থ ছিল এমন ঋণ প্রদান থেকে বিরত থাকা যার মাধ্যমে মূলত ঋণ প্রদানকারীর লাভ হয়। এছাড়াও ভারতের আরো কিছু প্রাচীন লেখায় এই কনসেপ্টের পরিচয় পাওয়া যায়।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১ থেকে ১৮৫ সালে ভারতে যখন মৌর্য্য সম্রাজ্যের হাতে ক্ষমতা ছিল, তখন ‘আদেশা’ নামক একটি দলিলের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে ব্যাংকের দলিলে উল্লেখিত অর্থ তার হয়ে কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে পরিশোধের নির্দেশ দিতেন। এই দলিলের সাথে বর্তমান সময় বিল অফ এক্সচেঞ্জের অনেক মিল রয়েছে।
মুঘল আমলেও ভারতে এইরুপ ঋণ লেনদের প্রমাণ পাওয়া যায়, সেই সময়ে একে বলা হতো ‘দস্তাবেজ’। ভারতীয় উপামহাদেশে ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পাওয়া যায় ইংরেজ আমলে। সর্বপ্রথম ব্যাংক ছিল ‘ব্যাংক অফ হিন্দুস্তান’, যা প্রতিষ্ঠা করা ১৭৭০ সালে। তবে ব্যর্থ হওয়ায় ১৮৩২ সালে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যায়।
অ্যাডাম স্মিথের ফ্রি-মার্কেট ব্যাংকিং ও আমেরিকায় ব্যাংক ব্যবস্থা
১৭৭৬ সালে অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ (পুজিঁবাজের জনক) তার ‘অদৃশ্য হাত’ - এর থিওরি উপস্থাপন করেন। সারমর্ম ছিল এই যে, অর্থনীতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ কমিয়ে তাকে নিজের মতো করে চলতে দেয়া উচিত। এতে করে ঋন প্রদানকারী এবং ব্যাংকাররা অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং সেক্টরে সরকারের হস্তক্ষেপ একেবারেই কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালান এবং সফল হন।
পুজিঁবাদ এবং ফ্রি-মার্কেট ব্যাংকিং একইসাথে নতুন বিশ্বে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমেরিকা হয়ে ওঠে ফ্রি-মার্কেট ব্যাংকিং - এর স্বর্গ। আর সবচেয়ে বড় ফলাফল হিসেবে আসে ইউরোপের শিল্প বিপ্লব।
শুরুর দিকে আমেরিকায় কোনো একক মুদ্রার প্রচল ছিল না। ব্যাংকগুলো নিজেদের ইচ্ছা মতো নোটের প্রচলন করতো এবং গ্রাহকরা তা দিয়েই লেনদেন করতো। তবে এই ব্যবস্থার সমস্যা ছিল যে কোনো একটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে পরলে, তার সকল মুদ্রা হয়ে পরতো অকেজো। একে করে গ্রাহকদের বিশাল পরিমাণ লসের সম্মুখীন হতে হতো।
আমেরিকান ট্রেজারির প্রথম সেক্রেটারি অ্যালেক্সান্ডার হ্যামিলটন সর্বপ্রথম একটি ন্যাশনাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে্ন যেখানে যেকোনো ব্যাংকের মুদ্রা ফেইস-ভ্যালুতে গ্রহণ করা হতো। এতে করে গ্রাহকদের স্বার্থ কিছুটা হলেও রক্ষা করা সম্ভব হয়। সময়ের পরিক্রমায়, এই ন্যাশনাল ব্যাংকের বহুল প্রচেষ্টায় আমেরিকায় একটি একক মুদ্রার প্রচলন করা হয়। যেহেতু ততোদিনে ব্যাংক ব্যবস্থার উপর আমেরিকানদের অনেকটাই বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল, তাই একক ব্যাংকাররা আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেননি।
তবে এই ব্যাংক ব্যবস্থায় তখনো ছিল অনেক অসঙ্গতি। যেহেতু ব্যাংকের প্রাথমিক কাজ ছিল মানি এক্সচেঞ্জ করা এবং লোন দেয়া, তাই এই দুই উপায় থেকে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ মুনাফা করার চেষ্টা চালাতে থাকে। ফলস্বরুপ শুরু হয় ১৯২৯ সালের মহামন্দা বা দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন। গ্রেট ডিপ্রেশন ট্যাকল করার জন্য এবং পরবর্তী সময়ে যেন এমন পরিস্থিতি আবার তৈরি না হয়, তাই আমেরিকান সরকার ও ব্যাংকগুলো নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন।
গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের শুরু এবং শেষ
১৮২১ সালে ইংল্যান্ড প্রথম দেশ হিসেবে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড গ্রহণ করে নেয়। যেহেতু সেই সময় বিশ্বের সব সরকারের কাছেই প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণ জমা ছিল, তাই এই জমা করা স্বর্ণের সবচেয়ে ভালো ব্যবহার এবং অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা হয়।
১৮৭১ সালে জার্মানি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড গ্রহণ করে এবং এর মাধ্যমে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ১৯০০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সকল উন্নত দেশ গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড গ্রহণ করে নেয় এবং আমেরিকা একদম শেষের দিকে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড গ্রহণ করে।
তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের অনেক অসঙ্গতি বেরিয়ে আসে এবং বিশ্ব মোড়লরা বুঝতে পারেন যে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের বিকল্প উপায় খুজে বের করার সময় চলে এসেছে।
১৯২৯ সালে মহামন্দা শুরু হলে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড টিকিয়ে রাখা আরো বেশি কঠিন হয়ে পরে। অতঃপর, ১৯৩১ সালে যুক্তরাজ্য প্রথম দেশ হিসেবে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড থেকে বেরিয়ে যায়।
১৯৪৪ সালে ব্রেটন-উডস অ্যাগ্রিমেন্ট সাইন হওয়ার মাধ্যমে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের কার্যক্রম অনেক সীমিত করে ফেলা হয় এবং তখন থেকে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মান ডলারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঠিক করা হয়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার প্রভাব, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের প্রভাবে বিশ্বজুড়েই আমেরিকান ডলারের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
তাই অনেক দেশ নিজের গোল্ডের রিজার্ভ অক্ষত রাখলেও আন্তর্জাতিক লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য আমেরিকান ডলারকেই প্রিফার করা শুরু করেন। এতে করে দেশের মুদ্রার রিজার্ভ স্বর্ণের হিসেবেই রাখা হলেও, লেনদেন করা হতো ডলারে। এরপর দেশগুলো ডলারের সাথে স্বর্ণ এক্সচেঞ্জ করে নিতো। তাই মুদ্রার মান ডলারের সাথে অ্যাটাচড থাকলেও রিজার্ভের একক হিসেবে তখনো গোল্ড’ই ব্যবহার করা হতো।
পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ১৫ই আগস্ট আমেরিকা অফিশিয়ালি ডলারের বিনিময়ে গোল্ডের এক্সচেঞ্জ বন্ধ করে দেয়। শুরুতে এই পদক্ষেপকে একটি ‘স্বল্প সময়ের পদক্ষেপ’ হিসেবে বলা হলেও পরবর্তীতে আমেরিকা আর এটি চালু করেনি। ফলে এরপর থেকে বিশ্বের প্রায় সকল দেশের কারেন্সি ডলারের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই চলতে থাকে।
দ্য গ্রেইট ডিপ্রেশন
দ্যা গ্রেইট ডিপ্রেশন বা ১৯৩০’র মহামন্দার সাথেও জড়িত ছিল ব্যাংক ব্যবস্থা। মহামন্দার পেছনের সকল কারণ সম্পর্কে ইতিহাসবিদ এবং অর্থনীতিবিদগণ একমত না হলেও, এই ৪টি কারণে মহামন্দা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
১। ১৯২৯ সালের স্টক মার্কেট ক্র্যাশ
১৯২০’র দশকে আমেরিকার স্টক মার্কেটে প্রচুর পরিমাণে গ্রোথ দেখা দেয়। স্টকের মূল্য ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং প্রফিট করার জন্য সাধারণ জনগ্ণ একটি সহজ মাধ্যম পেয়ে যান। ফলস্বরুপ, মানুষ ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ লোন নিয়ে স্টক মার্কেটে ইনভেস্ট করেন। ১৯২৯ সালের অক্টোবরে স্টকের দাম কমা শুরু করলে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং সবাই স্টক বিক্রয়ের জন্য প্রায় পাগল হয়ে ওঠেন। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত স্টকের দাম ৩৩% পর্যন্ত পরে যায় এবং বিপুল পরিমাণ মানুষ নিজেদের সহায়-সম্বল হারান।
২। ব্যাংকের প্রতি অনাস্থা
১৯২০’র দশকে আমেরিকার ব্যাংকগুলো প্রচুর পরিমাণে লোন দিয়েছিল এবং স্টক মার্কেট ক্র্যাশের পর তার বেশিরভাগই কুঋণে পরিণত হয়। এতে সাধারণ মানুষের মনে ব্যাংকের কার্যক্রমের প্রতি অনাস্থা তৈরি হয় এবং সবাই ব্যাংক থেকে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ তুলে নিতে শুরু করেন। ব্যাংকে হাতে তো এতো বেশি পরিমাণ অর্থ ছিল না, ফলে জনগণের সঞ্চিত অর্থ সাথে নিয়ে ১৯৩৩ সালের মাঝে আমেরিকার ২০% ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়।
৩। দ্য গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অযত্নের কারণে আমেরিকায় মহামন্দা শুরু হলেও, তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের কারণে। আমেরিকায় জিডিপি হ্রাস ও মুদ্রার মান বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করলে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনার লক্ষে আমদানি কমিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়। বাণিজ্যে হঠাৎ করে অসমতা তৈরি হওয়ায় অনেক দেশের গোল্ডের রিজার্ভ কমতে শুরু করে। এতে করে ঐসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (মূলত ইউরোপ) নিজেদের সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, এতে করে ব্যাংক ঋণ দেয়া কমিয়ে দেয়। ফলস্বরুপ, তাদের দেশের জিডিপি কমে যায় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। পরিশেষে, ইউরোপের অর্থনীতির অবস্থাও আমেরিকার মতো খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।
৪। আন্তর্জাতিক ঋণ প্রদানে হ্রাস
আমেরিকার ব্যাংকগুলো ২০’র দশকের পূর্বে বিভিন্ন দেশকে সরাসরি ঋণ প্রদান করতো, যাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিল জার্মানি, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। ৩০’র দশকে আমেরিকায় মহামন্দা শুরু হলে আমেরিকার সুদের হার অনেক বেড়ে যায়। এতে করে সেই সকল দেশ ঋণ নেয়া কমিয়ে দেয়। ফলস্বরুপ, তাদের জিডিপি আরো কমে যায় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। এভাবেই আমেরিকায় শুরু হওয়া এক ছোট্ট আগুনের ফুলকি প্রথমে সারা ইউরোপে ও ল্যাটিন আমেরিকা এবং পরবর্তী পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পরে।
মহামন্দার পূর্ববর্তী সময়ে ব্যাংকের মার্জিন রিকোয়ারমেন্ট ছিল মাত্র ১০%, অর্থাৎ কেউ ব্যাংকে ১০ টাকা রাখলে ব্যাংকগুলো ১ টাকা নিজের কাছে জমা রেখে বাকি ৯ টা লোন হিসেবে দিয়ে দিতো। গ্রেইট ডিপ্রেশন শুরু হওয়ার পর ব্যাংকগুলো এসব লোনের টাকা ফেরত চায়, তবে তা আর পাওয়া যায় না। একদিকে ব্যাংক লোনের টাকা ফেরত পাচ্ছে না, অন্যদিকে টাকা জমা রাখা ব্যক্তিগণ টাকা উঠিয়ে নিতে চাইছেন, সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর হয়ে পরেছিল বেহাল দশা। পর পর অনেকগুলো ব্যাংক এতে করে দেউলিয়া হয়ে যায়।
হিসাবে দেখা যায় যে ১৯২৯ ও ১৯৩০ সালে আমেরিকায় মোট ৭৪৪টি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায় এবং পুরো ১৯৩০ এর দশকে প্রায় ৯০০০ ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়। ফলস্বরুপ আমেরিকায় সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠন করা হয়। এতে করে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং এবং কমার্শিয়াল ব্যাংকিং’কে আলাদা করে দেয়া হয় যাতে পরবর্তী কোনো মন্দায় সাধারণ মানুষের টাকা হারিয়ে না যায়।
মডার্ন পেমেন্ট টেকনোলজি
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৪ সালে ব্রেটন-উডস অ্যাগ্রিমেন্ট সাইন করা হয় এবং এর মাধ্যমে দুটি সংগঠনের জন্ম হয়, বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। অনুন্নত বিশ্বের উন্নয়নের জন্য এরা অনেক প্রচালনা চালায় এবং ফলস্বরুপ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় ব্যাংক তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে লোন দেয়া শুরু করে।
একইসময়ে পশ্চিমা বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি অনেক বেশি বেড়ে যায় এবং গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বাতিল করা হয়, এতে করে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই নিজেদের ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় এবং ফলস্বরুপ দেউলিয়া হয়ে যায় আরো কিছু ব্যাংক।
তবে এই সময়ে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আসে গ্রাহক-পর্যায়ের ব্যাংকিং-এ। ১৯৬০’র দশকে অটোমেটেড টেলার মেশিন বা এটিএম প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয় এবং দশকের শেষের দিকে অনেক ব্যাংক নিজের এটিএম স্থাপণ করে। আবার ১৯৭৪ সালে সুইফট (SWIFT) টেকনোলজি আবিষ্কৃত হয়। এতে করে গ্রাহক পর্যায়ের অনেক কাজকে ব্যাংকগুলো অটোমেট করে ফেলতে সক্ষম হয় এবং প্রযুক্তির আরো বেশি উন্নয়নে প্রযুক্তিখাতে প্রচুর পরিমাণে খরচ করতে থাকে।
একবিংশ শতক
একবিংশে শতকের শুরুতে মূলত বড় ব্যাংকগুলোর একত্রিকরণ এবং ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটে অন্যান্য প্লেয়ারদের প্রবেশ শুরু হয়। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্থনীতিতে ব্যাংক ছাড়াও আরো বহুদিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। ফলে ব্যাংকারদের প্রতিযোগিতা অনেক বেশি বেড়ে যায়।
নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বহুবিধ সুবিধা যেমন - পেনশন, বিমা, লোন, হেজ ফান্ড এবং মিচুয়াল ফান্ডের মতো প্রোডাক্টের সার্ভিস দেয়া শুরু করে। শেষ ৩০ বছরের ক্রমাগত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে উন্নত বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যাংকিং’র যাত্রা শুরু হয়। এতে করে সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
ব্যাংক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ
ব্যাংক ব্যবস্থার শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ব্যাংকিং জগতে অনেক পরিবর্তন ঘটলেও সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বলা যায় ডিজিটাল ব্যাংকিং’র প্রকাশ। বর্তমান সময়ে ব্যাংক শুধু টাকার রাখার জায়গার চাইতেও অনেক বেশি কিছু। ডিজিটাল ব্যাংকগুলো এমন সব সুবিধা এনে দিয়েছে, যা ব্যবহার করে মানুষ যেখানে খুশি বসে ব্যাংকের লেনদের সম্পাদন করতে পারে। অর্থাৎ, সাধারণ লেনদেনের জন্য ব্যাংকে যাওয়া এখন অপ্রয়োজনীয় বলা যায়।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সাধারণ চোখে অনেক উজ্জ্বল মনে হলেও, আগামী কয়েক দশকে ব্যাংক ব্যবস্থায় আরো অনেক পরিবর্তন আসতে চলেছে। তবে তা আসলে কেমন, তা সময়ই বলে দিবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত হিসেবে বলা যায় যে, আগামীতে ডিজিটাল ব্যাংকগুলোই সবচেয়ে ডমিনেন্ট রোল প্লে করবে। ব্যাংকিং সেক্টরে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রবেশ এখনো পুরিপুরি ঘটেনি।
ব্যাংকগুলো যদি আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্সের ভালো ব্যবহার করতে পারে, তাহলে আশা করা যায় যে ভবিষ্যতে আমরা ডিজিটাল ব্যাংকের চাইতেও আরো উন্নত সেবা পেতে পারি।
- https://americandeposits.com/history-evolution-banking/
- https://www.investopedia.com/ask/answers/09/gold-standard.asp
- https://en.wikipedia.org/wiki/History_of_banking
- https://www.investopedia.com/articles/07/banking.asp
- https://relayfi.com/blog/evolution-of-banking
- https://en.wikipedia.org/wiki/Banking_in_India
- https://en.wikipedia.org/wiki/History_of_banking_in_China
- https://www.britannica.com/story/causes-of-the-great-depression
- https://en.wikipedia.org/wiki/Gold_standard
Next to read
লিন ক্যানভাস মডেল (Lean Canvas Model)


মার্কেটিং এর ৭'পি (7P’s of Marketing)

অর্থনীতি কী?

সেলস কি এবং কিভাবে তা কাজ করে?

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং (Affiliate Marketing)

কনভার্সন রেট অপটিমাইজেশন (Conversion Rate Optimization)

কর্পোরেট ট্যাক্সেশন এবং আন্তর্জাতিক সমস্যা (Corporate Tax)

ব্যাংক লোন কিভাবে কাজ করে

বাংলাদেশ ব্যাংক
