ব্যাংক কীভাবে কাজ করে?

ব্যাংকের কার্যক্রম বলতে মূলত জনগণের সঞ্চয় আমানত হিসেবে গ্রহণ ও ঋণ প্রদান বোঝানো হলেও ব্যাংক আরো অনেক ধরণের সার্ভিস যেমন - ক্রেডিট কার্ড, বিভিন্ন ধরণের পেমেন্ট সার্ভিস, কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, ব্যবসায়িক ঋণ, ট্রেড ফাইন্যান্স, ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট সেবা প্রদান করে থাকে। তবে সকল ব্যাংক সকল ধরণের সার্ভিস প্রদান করে না, উদ্দেশ্যভেদে প্রতিটি ব্যাংকের কার্যক্রম ভিন্ন হয়ে থাকে।
Key Points
- কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের অন্যান্য ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম তদারকি করে থাকে যাতে করে ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং নিয়ম-নীতি মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
- উন্নত বিশ্বে রিটেইল ব্যাংক ও কমার্শিয়াল ব্যাংক পৃথক হলেও, বাংলাদেশে কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোই রিটেইল ব্যাংকের সার্ভিসগুলো অফার করে থাকে।
- যখন কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের আইপিও লঞ্চ করতে চায়, তখন বিভিন্ন বিনিয়োগ ব্যাংক তাদের শেয়ার সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রয় করে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
- সন্দেহজনক লেনদেন ডিটেক্ট করার জন্য ব্যাংকগুলো ফ্রড ডিটেকশন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে।
ভূমিকা
ব্যাংক আমাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে যা কিছু করছি, তার বেশিরভাগ সিদ্ধান্তেই তাই ব্যাংকগুলো কোনো না কোনো ভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। তবে যেই প্রতিষ্ঠানের সাথে আমরা প্রায় প্রতিদিনই ডিল করি সেটি আদৌ কিভাবে কাজ করে তা সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষেরই কোনো ধারণা নেই।
ব্যাংক কিভাবে কাজ করে তা জানা শুধু আর্থিক শিক্ষার জন্যই প্রয়োজন নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনে আরো বেশি ডেটা-ড্রিভেন সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যেও এটি প্রয়োজন। তাই আজকের লেখায় আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করবো যে কোন কোন ধরণের ব্যাংক কি কি সেবা ও সুবিধা প্রদান করে থাকে এবং পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকা সম্পর্কেও আপনাদের জানাবো।
ব্যাংকিং সিস্টেম
ব্যাংক কিভাবে কাজ করে তা জানার আগে আমাদের ব্যাংকিং সিস্টেম নিয়ে কিছুটা জেনে নেয়া দরকার।
ব্যাংকিং সিস্টেমের স্ট্রাকচার
মডার্ন ব্যাংকিং সিস্টেম মূলত ৩টি স্তরের উপর টিকে আছে। সবগুলো স্তর একসাথে কাজ করে, যাতে করে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের সকল ধরণের আর্থিক চাহিদা পূরণ করতে পারে।
১। ফিজিকাল ব্রাঞ্চ
রেগুলার ব্যাংকগুলোর ফিজিকাল ব্রাঞ্চ থাকে, যার মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের ইন-পারসন সার্ভিস প্রদান করে থাকে। বলা যায় এই ব্রাঞ্চগুলো ব্যাংকের ফেইস হিসেবে কাজ করে যেখানে গ্রাহকরা অ্যাকাউন্ট খুলতে ও আর্থিক পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে।
২। অটোমেটেড টেলার মেশিন বা এটিএম
গ্রাহকরা যাতে করে তাদের অ্যাকাউন্টে জমানো টাকা দিনের যেকোনো মুহুর্তে উত্তোলন করতে পারে, তাই ব্যাংকগুলো বিভিন্ন স্থানে এটিএম বসিয়ে থাকে। টাকা তোলার পাশাপাশি এখন এটিএম ব্যবহার করে গ্রাহকরা চেক ও ক্যাশ জমা দিতে পারেন ও নিজেদের অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স চেক কর দেখতে পারেন।
৩। অনলাইন ব্যাংকিং
বর্তমান সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠেছে অনলাইন ব্যাংকিং সেবা। ব্যাংকগুলো নিরাপদ ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ অফার করছে, যাতে করে গ্রাহকরা নিজেদের অ্যাকাউন্ট এক্সেস করা, ফান্ড ট্রান্সফার করা, বিল পে করা ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। আর এইসব কিছুই করা যাচ্ছে ফিজিকাল ব্রাঞ্চে না এসে, যেকোনো স্থান থেকেই।
রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক
ব্যাংকগুলোকে কঠোর রেগুলেশনের আন্ডারে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় যাতে করে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এনশিওর করা সম্ভব হয়।
১। সরকারি তদারকি
কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের অন্যান্য ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম তদারকি করে থাকে যাতে করে ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং নিয়ম-নীতি মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ব্যাংক কতো শতাংশ রিজার্ভ রাখবে, কতো শতাংশ সুদের হারে ঋণ দিবে, গ্রাহকদের কি পরিমাণ সুদ দিবে ইত্যাদির সবকিছুই ঠিক করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক
২। ডিপোজিট ইন্সুরেন্স
কাস্টমার ডিপোজিটের নিরাপত্তার জন্য অনেক দেশেই ডিপোজিট ইন্সুরেন্স প্রোগ্রাম চালু আছে। অর্থাৎ, কোনো ব্যাংক যদি ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের সম্মুখীন হয় অথবা দেউলিয়া হয় যায়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উক্ত ব্যাংকের গ্রাহকদের একটি নির্দিষ্ট অ্যামাউন্ট ফিরিয়ে দিবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যতো টাকা ফিরিয়ে দিবে, তাকে বিমাকৃত ডিপোজিট বলে।
বাংলাদেশে ডিপোজিট ইন্সুরেন্স হচ্ছে ১ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকে যদি আপনার ১ লক্ষ টাকার বেশি থাকে এবং সেই ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়, তাহলে আপনি ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে।
৩। ক্যাপিটাল রিকোয়ারমেন্ট
ব্যাংকগুলোকে একটি নির্দিষ্ট লেভেলের ক্যাপিটাল মেইনটেইন করতে হয়, যাতে করে তারা লসের সম্মুখীন হলেও তা হ্যান্ডেল করতে পারে। এর মাধ্যমে ব্যাংকের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে আনা যায় এবং ডিপোজিটরদের টাকার নিরাপত্তা এনশিওর করা যায়।
৪। রেগুলার অডিট
রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত ব্যাংকের অডিট পরিচালনা করে থাকেন যাতে করে ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল হেলথ বোঝা যায়, ঝুঁকি ব্যাবস্থাপনার পদক্ষেপগুলো জানা যায় এবং রেগুলেশনের সাথে সামঞ্জস্যতা এনশিওর করা যায়। এর মাধ্যমে কোনো সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই তা ডিটেক্ট করা সম্ভব হয়।
ব্যাংক কিভাবে কাজ করে
ব্যাংক কিভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য আগে জানতে হবে যে কি কি ধরণের ব্যাংক রয়েছে। কারণ, সব ধরণের ব্যাংক সব ধরণের সার্ভিস দেয় না, উদ্দেশ্যভেদে তাদের কাজের পরিধি ভিন্ন হয়ে থাকে। নিচে সবচেয়ে কমন কিছু ব্যাংকের ধরণ ও তাদের প্রধান কাজ বা সেবাগুলো তুলে ধরা হলো।
১। রিটেইল ব্যাংক
আমরা সাধারণত ‘ব্যাংক’ বলতে যেসব ব্যাংক বুঝে থাকি সেগুলোই আসলে রিটেইল ব্যাংক। রিটেইল ব্যাংক সরাসরি সাধারণ জনগণ ও ছোট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সার্ভিস দিয়ে থাকে। রিটেইল অনেক ধরণের সার্ভিস রয়েছে, সেগুলো হলো -
চেকিং ও সেভিংস অ্যাকাউন্ট
রিটেইল ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরণের অ্যাকাউন্ট সুবিধা দিয়ে থাকে। গ্রাহকরা এসব অ্যাকাউন্টে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ জমা রাখার পাশাপাশি অন্যান্য সুবিধাদি ভোগ করে থাকেন। নিজেদের সঞ্চিত অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা রাখার বিনিময়ে ব্যাংক গ্রাহকদের একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করে থাকে।
নিজেদের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে গ্রাহকরা এসব অ্যাকাউন্টের বিপরীতে বিভিন্ন মেয়াদি ও পরিমাণের ঋণ নিতে পারেন। তবে ব্যাংক কিন্তু নিজের টাকা থেকে এই ঋণ দেয় না। এই ঋণ দেয়া হয় গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ থেকেই।
সহজ ভাষায়, গ্রাহকরা যখন নিজেদের সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখেন, তখন সেই অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ ব্যাংক স্ট্যাচুটরি লিকুইডিটি রিজার্ভ ও ক্যাশ রিজার্ভ হিসেবে রেখে বাকি টাকা অন্যান্য গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমান ব্যাংকগুলোর ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও ও স্ট্যাচুটরি লিকুইডিটি রেশিও বর্তমানে যথাক্রমে ৪% ও ১৩% রয়েছে। গ্রাহকের সঞ্চিত অর্থ যেহেতু এখনই গ্রাহকের লাগছে না, তাই ব্যাংক টাকা ফেলে না রেখে তা কাজে লাগায়।
ব্যাংক যাদের ঋণ দিয়েছিল, তাদের থেকে উচ্চহারে সুদ চার্জ করে। গ্রাহকরা সুদের টাকা পরিশোধ করলে সেই আয়ের একটি অংশ ব্যাংক ডিপোজিটরদের সুদ হিসেবে দিয়ে দেয়। অর্থাৎ, দেনাদারদের থেকে উচ্চহারে সুদ নিয়ে এবং সঞ্চয়কারীদের তুলনামূলক কম হারে সুদ প্রদান করার মাধ্যমে ব্যাংক আয় করে থাকে।
এছাড়াও, চেকিং ও সেভিংস অ্যাকাউন্ট সুবিধা দেয়ার জন্য ব্যাংক তার গ্রাহকদের থেকে কিছু মেইনটেন্যান্স চার্জ নিয়ে থাকে, এটিও ব্যাংকের আয়ের একটি উৎস।
ক্রেডিট কার্ড
রিটেইল ব্যাংক গ্রাহকদের বিভিন্ন মেয়াদের ও সুবিধার ক্রেডিট কার্ড অফার করে থাকে। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকরা নিজেদের অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকলেও কেনাকাটা করতে পারেন। এটি স্বল্পমেয়াদী ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং টাকা খরচ করার কিছুদিনের মাঝে সেই অর্থ ব্যাংকে পরিশোধ করতে হয়। তবে ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার সাধারণ ঋণের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে থাকে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে টাকা পরিশোধ না করলে আসল টাকার সাথে জরিমানা ও সুদ যোগ হতে থাকে।
বিভিন্ন ধরণের পেমেন্ট সার্ভিস
রিটেইল ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ধরণের পেমেন্ট প্রসেসিং সার্ভিস দিয়ে থাকে, যেমন - চেক ক্লিয়ারিং সার্ভিস, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার ও বিল প্রসেসিং। নিজের ব্যাংকের ইস্যু করা চেকের জন্য ব্যাংক কোনো চার্জ না করলেও সাধারণত চেকবইয়ের জন্য কিছু টাকা চার্জ করে থাকে। তবে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার ও বিল ভাঙানোর জন্য ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে কমিশন নিয়ে থাকে।
কারেন্সি এক্সচেঞ্জ
ভ্রমণ বা ব্যবসায়িক বিভিন্ন কারণে রিটেইল ব্যাংকগুলো তার গ্রাহকদের কারেন্সি এক্সচেঞ্জ সুবিধা প্রদান করে থাকে। অর্থাৎ, ব্যাংকে এক দেশের মুদ্রা জমা দিয়ে তার সমমানের অন্যদেশের মুদ্রা সংগ্রহ করা যায়।
২। কমার্শিয়াল ব্যাংক
কমার্শিয়াল ব্যাংক মূলত বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে সার্ভিস প্রদান করে থাকে। উন্নত বিশ্বে রিটেইল ব্যাংক ও কমার্শিয়াল ব্যাংক পৃথক হলেও, বাংলাদেশে কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোই রিটেইল ব্যাংকের সার্ভিসগুলো অফার করে থাকে। তাই উপরে উল্লেখিত রিটেইল ব্যাংকের সার্ভিসগুলো এখানে কমার্শিয়াল ব্যাংকের জন্যেও প্রযোজ্য। তবে কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো আরো কিছু সার্ভিস অফার করে থাকে।
ব্যবসায়িক ঋণ
ব্যবসায় স্থাপন ও সম্প্রসারণ, যন্ত্রপাতি বৃদ্ধি, ঝুঁকি মোকাবিলা ইত্যাদি কাজের জন্য কমার্শিয়াল ব্যাংক বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদি লোন প্রদান করে থাকে।
ট্রেড ফাইন্যান্স
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সহজে আন্তর্জাতিক লেনদেন নিষ্পত্তি করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ট্রেড ফাইন্যান্স সার্ভিস অফার করে থাকে। এর মাঝে অন্যতম একটি সার্ভিস হচ্ছে লেটার অফ ক্রেডিট বা এলসি।
এখানে ব্যাংক তার গ্রাহকের জামানতকারী হিসেবে কাজ করে। গ্রাহকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ব্যাংক এলসি দিয়ে থাকে যার সারমর্ম হচ্ছে যে গ্রাহক অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে ব্যাংক উক্ত অর্থ পরিশোধ করবে। পরবর্তীতে গ্রাহক সেই এলসি পেপার ব্যবহার করে বিদেশী সাপ্লাইয়ারদের থেকে পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। পণ্য বুঝে পাওয়ার পর ব্যাংক উক্ত সাপ্লাইয়ারকে অর্থ পরিশোধ করে দেয়।
অর্থাৎ, এখানে কোনো ধরণের ঝুঁকি ছাড়াই ব্যবসায়ীরা এলসি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক লেনদেন নিষ্পত্তি করতে পারছেন।
ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট
কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের ক্যাশ ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট রিলেটেড বিভিন্ন সার্ভিস অফার করে থাকে। এতে করে গ্রাহকদের ক্যাশের এফিশিয়েন্ট ব্যবহার এনশিওর করা যায়।
৩। বিনিয়োগ ব্যাংক
বিনিয়োগ ব্যাংক হচ্ছে এক ধরণের বিশেষায়িত ব্যাংক যারা মূলত ক্যাপিটাল মার্কেট রিলেটেড বিভিন্ন কার্যক্রম ও উপদেশমূলক বিভিন্ন সার্ভিস অফার করে থাকে।
মার্জার ও অ্যাকুইজিশন অ্যাডভাইজরি
বিনিয়োগ ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের নতুন নতুন কোম্পানীতে বিনিয়োগ বা ক্রয় করে নেয়ার ব্যাপারে অ্যাডভাইস দিয়ে থাকে। এইসব ব্যাংকে মার্জার ও অ্যাকুইজিশন এক্সপার্ট থাকে, যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে প্রফেশনাল ইনসাইট প্রদান করে থাকে।
আন্ডাররাইটিং
যখন কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের আইপিও লঞ্চ করতে চায়, তখন বিভিন্ন বিনিয়োগ ব্যাংক তাদের শেয়ার সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রয় করে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে। অর্থাৎ এখানে তারা সাধারণ জনগণ ও কোম্পানীর মাঝে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি শেয়ার বিক্রয়ের বিপরীতে তারা নির্দিষ্ট হারে কমিশন চার্জ করে থাকে।
অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট
বিনিয়োগ ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের শেয়ার ও ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজ করার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এতে করে কোম্পানী তাদের পেনশন ফান্ড, মিচুয়াল ফান্ড ও পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব এসব বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোকে দিয়ে থাকে।
৪। কেন্দ্রীয় ব্যাংক
যেকোনো দেশে শুধু একটিই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকে। এই ব্যাংক অন্যান্য সাধারণ ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনা করে না। বরং দেশের অন্যান্য ব্যাংক উক্ত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের থেকে নিবন্ধন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। অর্থাৎ, দেশের সার্বিক ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে উক্ত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে শুধু অন্যান্য ব্যাংকের কার্যাবলি পর্যবেক্ষণ পর্যন্তই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম সীমিত নয়।
মনিটারি পলিসি
একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উক্ত দেশের মুদ্রার সরবরাহ ও সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই কাজ করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজ করে থাকে।
ব্যাংকের ব্যাংকার হিসেবে কাজ করা
আগেই বলেছি যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্যান্য ব্যাংকের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তবে এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণ ব্যাংকগুলো কিছু সুবিধা’ও দিয়ে থাকে। যেমন - কোনো ব্যাংক যখন ক্যাশ ক্রাইসিসের সম্মুখীন হয় তখন তারা খুবই অল্প সুদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারে। এতে করে ব্যাংকগুলো নিজেদের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
ফরেন রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণ করা
একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর। তাই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে নেগোশিয়েট করে আমদানি ও রপ্তানী নীতি তৈরিতেও ভূমিকা পালন করে।
সরকারের ব্যাংকার হিসেবে কাজ করা
কোনো দেশের সরকার যখন বড় কোনো প্রজেক্ট হাতে নেয়, তখন তারা সর্বপ্রথম অভ্যন্তরীণ উৎস হতে ফান্ড কালেক্ট করার চেষ্টা করে। আর ফান্ড কারেকশনের জন্য সরকার তার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণ করতে পারে। এছাড়াও সরকারি বিল ও বন্ড বিক্রয় ও ম্যানেজ করার দায়িত্ব’ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর থাকে।
নোট ইস্যু করা
দেশের ব্যাংক নোট ইস্যু করার দায়িত্ব থাকে উক্ত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর। তাই মুদ্রানীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনমাফিক নোট ইস্যু করতে পারে।
এগুলো ছাড়াও বিশ্বে আরো কিছু প্রকারের ব্যাংক দেখা যায়। যেমন -
৫। ডিজিটাল ব্যাংক
এই ব্যাংকগুলো সাধারণত কোনো ফিজিকাল ব্রাঞ্চ ছাড়া অনলাইনে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তবে তারা অন্য কমার্শিয়াল ও রিটেইল ব্যাংকগুলোর মতোই সেভিংস ও চেকিং অ্যাকাউন্ট অফার করে থাকে। ডিজিটাল ব্যাংকগুলো অনেক জনপ্রিয় মূলত তাদের কনভিনিয়েন্স ও উচ্চ সুদের হারের জন্য।
৬। কমিউনিটি ব্যাংক
কমিউনিটি ব্যাংক হচ্ছে ছোট পর্যায়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান যারা মূলত কোনো স্পেসিফিক এলাকা বা কমিউনিটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়। তারা তাদের টার্গেট কাস্টমারদের সুবিধা অনুযায়ী কাস্টমাইজড সার্ভিস অফার করে এবং এর পাশাপাশি লোকাল ব্যবসায় ও বিভিন্ন উদ্যোগকে সাপোর্ট করে থাকে।
৭। ক্রেডিট ইউনিয়ন
ক্রেডিট ইউনিয়ন নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির দ্বারা তৈরি হওয়া একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান শুধু তার মেম্বারদের ঋণ সুবিধা প্রদান করে থাকে এবং এই ঋণের সুদের হার খুব কম হয়ে থাকে।
৮। ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক
ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক হচ্ছে মূলত সরকার দ্বারা তৈরি বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান যারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে এমন সব প্রজেক্টকে সাপোর্ট প্রদান ও বিনিয়োগ করে থাকে।
৯। ইসলামিক ব্যাংক
ইসলামিক ব্যাংক হচ্ছে শরিয়া আঈন দ্বারা তৈরি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান। তারা ইসলামিক নিয়ম-কানুন মেনে সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান করে থাকে। তবে সাধারণ ব্যাংকের সাথে ইসলামিক ব্যাংকের পার্থক্য হচ্ছে যে তারা সুদ আদান-প্রদান থেকে বিরত থাকে এবং মূলত জনগণের থেকে প্রাপ্ত টাকা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে। আর সেই বিনিয়োগের টাকা লভ্যাংশ হিসেবে তার গ্রাহকদের দিয়ে থাকে।
অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকা
বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ব্যাংক দ্বারা। সেটি আফ্রিকা মহাদেশের কোনো দারিদ্রপীড়িত দেশ হোক, আমাদের বাংলাদেশের মতো কোনো উন্নয়নশীল দেশ হোক বা যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশ হোক, সকল স্থানের অর্থনীতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকের উপর নির্ভরশীল। অর্থনীতি ব্যাংক যেভাবে প্রভাব রাখে -
১। আর্থিক মধ্যস্তাকারী
প্রতিটি দেশেই দুইধরণের মানুষ পাওয়া যায়। একদল, যাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর পরেও অতিরিক্ত অর্থ থেকে যায়, নিজেদের অর্থ তারা কোনো নিরাপদ স্থানে জমাতে বা বিনিয়োগ করতে চায়। দ্বিতীয়দল, যাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য অর্থ প্রয়োজন হয়, তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিজস্ব উৎস হতে অর্থের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না।
ব্যাংক এই দুই ধরণের মানুষদের মাঝে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে কাজ করে। এতে করে দেশের মুদ্রার আরো বেশি কার্যকর ব্যবহার এনশিওর করা সম্ভব হয়।
২। মনিটারি পলিসি ইমপ্লিমেন্ট করা
বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেমন বাংলাদেশের বাংলাদেশ ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ উক্ত দেশের মুদ্রার সরবরাহ, সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। দেশের অর্থনীতিকে স্থীতিশীল রাখতে এইসব কাজের গুরুত্ব অপরিসীম।
৩। ঋণ তৈরি
আমরা সবাই জানি যে ব্যাংক টাকা তৈরি করে। তবে বাস্তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো কমার্শিয়াল বা বিনিয়োগ ব্যাংক কিন্তু নোট ইস্যু করতে পারে না। তাহলে ব্যাংক টাকা তৈরি করে কিভাবে?
ব্যাংক আসলে এই কাজটি করে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে। গ্রাহকদের জমানো টাকা সংগ্রহ করে ব্যাংক তার অন্যান্য গ্রাহকদের উক্ত অর্থ ঋণ হিসেবে প্রদান করে। এতে করে দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়।
৪। পেমেন্ট সিস্টেম হিসেবে কাজ করা
ব্যাংক তার গ্রাহকদের নিরাপদ পেমেন্ট মেথড অফার করে থাকে। এতে করে কোনো ঝামেলা ও ঝুঁকি ছাড়াই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারের মাঝে আর্থিক লেনদেন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়।
দৈনন্দিন জীবনে ব্যাংকের ভূমিকা
আগেই বলেছি যে ব্যাংক আমাদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। কিন্তু সেটি কিভাবে?
১। অর্থ জমানোর সুযোগ করে দেয়া
জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের পেছনে সঞ্চয়ের কোনো বিকল্প নেই। আর এই সঞ্চয়ের কাজটিই ব্যাংক আমাদের জন্য অনেক সহজ করে দিয়েছে বিভিন্ন ধরণের অ্যাকাউন্ট সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে। আমরা চাইলেই ব্যাংকে সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলে দৈনিক বা মাসিক হিসেবে টাকা জমানো শুরু করতে পারি অথবা অলস পরে থাকা টাকা দীর্ঘমেয়াদের জন্য ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট খুলে রেখে দিতে পারি।
২। ঋণ গ্রহণ
আমরা চাইলে বাড়ি, গাড়ি ক্রয় বা ব্যবসায় স্থাপনের উদ্দেশ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারি। গ্রাহকের উক্ত ঋণ পরিশোধ করার সামর্থ্য থাকা সাপেক্ষে ব্যাংক সাধারণ মানুষদের ঋণ দিয়ে থাকে। এতে করে ব্যাংকের আয় হয়, আবার সাধারণ মানুষ নিজেদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেন।
৩। ক্রেডিট কার্ড সুবিধা
ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে আমরা হাতে অর্থ না থাকলেও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করতে পারি, আবার মাস শেষে টাকা পেলে উক্ত অর্থ পরিশোধ করে দিতে পারি।
৪। অন্যান্য আর্থিক সেবা
ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের জন্য ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট রিলেটেড অনেক সুবিধা প্রদান করে থাকে। এতে এক্সপার্ট অপিনিয়ন জেনে সাধারণ মানুষ তাদের ফিন্যান্সিয়াল গোল অ্যাচিভ করতে পারেন।
৫। অন্যন্য সুবিধা
ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের উপরে উল্লেখিত সুবিধাদির পাশাপাশি আরো কিছু সুবিধা প্রদান করে থাকে যেমন - মোবাইল ব্যাংকিং, এটিএম, ২৪/৭ কাস্টমার সার্ভিস ইত্যাদি।
অনলাইন ব্যাংকিং
অনলাইন ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজির উত্থান ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আজ থেকে ২০ বছর আগের ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং বর্তমান সময়ের ব্যাংকিং কার্যক্রম তাই পুরোপুরি ভিন্ন। অনলাইন ব্যাংকিং বা ইন্টারনেট ব্যাংকিং’র মাধ্যমে গ্রাহকরা একটি ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। অনলাইন ব্যাংকিং’র গ্রোথ মূলত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরের কারণে হয়েছে।
কনভিনিয়েন্স - অনলাইন ব্যাংকিং’র মাধ্যমে গ্রাহকরা ঘরে বসেই ২৪/৭ নিজেদের অ্যাকাউন্ট এক্সেস ও ফান্ড ট্রান্সফার করতে পারছেন। এই কারণে ব্যাংকের ফিজিকাল ব্রাঞ্চে যাওয়ার জন্য টাকা ও সময় খরচ করার প্রয়োজন হচ্ছে না।
অ্যাক্সেসিবিলিটি - ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। যার ফলে একটি বৃহৎ গোষ্ঠী যারা এতোদিন ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে ছিলেন, তারা’ও এখন এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন।
সাশ্রয় - অনলাইনে বিভিন্ন ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো নিজেদের খরচ অনেকটা কমিয়ে আনতে পারছে, এতে করে তারা আরো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোর জন্য বেশি পরিমাণে বিনিয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছে। আবার ব্যাংকের খরচ কমে যাওয়ায় তারা গ্রাহকদের আরো কম মূল্যে ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান করতে পারছে, এতে করে ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিতে একটি প্রতিযোগীতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
ফিনটেক সার্ভিসের উত্থান
ফিনটেক বলতে মূলত উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদান করাকে বোঝানো হয়। বিভিন্ন ফিনটেক স্টার্টআপ এবং বড় বড় কোম্পানী ফিনটেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন সব সার্ভিস মার্কেটে নিয়ে এসেছে যে তা ফিন্যান্সিয়াল ল্যান্ডস্কেপ পুরোপুরি পালটে দিয়েছে।
১। মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপস - বিভিন্ন মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপ যেমন - বিকাশ ও নগদ পারসন টু পারসন ফান্ড ট্রান্সফার অনেক সহজ করে দিয়েছে, এখন গ্রাহকরা নিজেদের স্মার্টফোন থেকে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়াই আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করতে পারছেন।
২। ডিজিটাল ওয়ালেটস - বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেট অ্যাপ যেমন অ্যাপল পে বা গুগল পে বিভিন্ন রিটেইল স্টোরে পেমেন্ট করা অনেক সহজ করে দিয়েছে। বাংলাদেশে বিকাশ ও নগদ’ও ডিজিটাল ওয়ালেট সেবা দিয়ে চলেছে।
৩। রোবো-অ্যাডভাইজর - বিভিন্ন ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম তাদের রোবো-অ্যাডভাইজর নিয়ে এসেছে, এতে করে গ্রাহকরা অটোমেটিক তাদের ইনভেস্টমেন্ট ও পোর্টফোলিও রিলেটেড অ্যাডভাইজ পাচ্ছেন।
৪। ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইন - যদিও বাংলাদেশে বিটকয়েন এখনো বৈধতা পায়নি, তবে বিশ্বে বিটকয়েন ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি ডিসেন্ট্রালাইজড ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে এসেছে, এতে করে পারসন টু পারসন আরো বেশি সিকিউর ও ট্রান্সপ্যারেন্ট লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে।
নিরাপদ ব্যাংকিং ও প্রতাড়না প্রতিরোধ
কাস্টমার ডিপোজিটের নিরাপত্তা ও ব্যাংকিং সেক্টরের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এই সেক্টরের নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর। সাইবার থ্রেট ও প্রতাড়না থেকে কাস্টমারদের নিরাপদ রাখতে ব্যাংকগুলো যেসব পদক্ষেপ নিয়ে থাকে -
১। এনক্রিপশন -
ইন্টারনেটে সেফলি ডেটা ট্রান্সফারের জন্য ব্যাংকগুলো অ্যাডভান্সড এনক্রিপশন প্রোটোকল ফলো করে থাকে। এর মাধ্যমে সেনসিটিভ ইনফরমেশন যেমন - অ্যাকাউন্ট নাম্বার ও পাসওয়ার্ড কনফিডেনশিয়াল রাখা সম্ভব হয়।
২। মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন -
এই পদ্ধতিতে গ্রাহকদের পরিচয় প্রমাণ করার জন্য বেশ কিছু ধরণের পারসোনাল ইনফরমেশন শেয়ার করতে হয় এবং তারপরই তারা নিজের অ্যাকাউন্ট অ্যাক্সেস করতে পারেন। এটা পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি আরো একটি অতিরিক্ত সিকিউরিটি লেয়ার যোগ করে।
৩। ফ্রড ডিটেকশন অ্যালগরিদম -
সন্দেহজনক লেনদেন ডিটেক্ট করার জন্য ব্যাংকগুলো ফ্রড ডিটেকশন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। সন্দেহজনক বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি যেমন - অনেক বড় কোনো উত্তোলন অথবা দেশের বাইরে বড় অংকের টাকা পাঠানো ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাংকের কাছে এই লেনদেনগুলো হাইলাইট হয়।
৪। নিরাপদ লগইন সিস্টেম -
গ্রাহকরা যখন অ্যাকাউন্টে লগইন করতে চান তখন তাদের ক্যাপচা টেস্ট অথবা সিকিউরিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে লগইন করতে হয়। এতে করে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে অযাচিত লগইন প্রতিরোধ করা যায়।
৫। বায়োমেট্রিক অথেনটিকেশন -
অনেক ব্যাংকেই এখন অতিরিক্ত সিকিউরিটির জন্য বায়োমেট্রিক ডেটা যেমন - ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফেশিয়াল স্ক্যান নেয়া হয়।
৬। রেগুলার সফটওয়্যার আপডেট -
ব্যাংক নিয়মিতভাবে তাদের ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ আপডেট দিয়ে থাকে যাতে করে ডেটা লিক হওয়া প্রতিরোধ করা যায়।
৭। ফায়ারওয়াল -
ফায়ারওয়ালের মাধ্যমে ব্যাংক তাদের সিস্টেমে আসন্ন সাইবার অ্যাটাক প্রতিরোধ করতে পারে।
৮। গ্রাহক ও কর্মীদের জন্য ট্রেইনিং -
ব্যাংক তার গ্রাহক ও কর্মীদের জন্য ট্রেইনিং সেশন আয়োজন করে যাতে করে তারা নিরাপত্তা রিলেটেড বেস্ট প্র্যাক্টিসেস সম্পর্কে জানতে পারেন এবং ভিক্টিম হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেন।
ব্যাংকিং সেক্টরে নিরাপত্তা কেনো প্রয়োজন?
১। কাস্টমার ট্রাস্ট -
বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাংকগুলোকে তাদের গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জন করতে সাহায্য করে। গত শতাব্দীতে অনেক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায় শুধু তাদের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে, এতে করে অনেক গ্রাহকদের টাকা হারাতে হয় এবং সর্বোপরি ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতি মানুষদের বিশ্বাস কমে যায়। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিকিউরিটি এনশিওর করার কারণে বর্তমানে ব্যাংকগুলো আবারো আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে পারছে।
২। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা -
একটি নিরাপদ ব্যাংক ব্যবস্থা পুরো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে করে গ্রাহকের অর্থ হারানো ও ব্যাংকের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ঠেকানো যায়।
৩। রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স -
ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের নিরাপদ ব্যাংকিং সেবা প্রদানের মাধ্যমে রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স এনশিওর করতে পারে। কারণ এটি করতে না পারলে তাদের সুনাম নষ্ট হবে এবং জরিমানা’ও দিতে হতে পারে।
পরিসংহার
আশা করি এখন আপনি বুঝতে পারছেন যে আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে ঠিক কি কি ধরণের প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং তারা কি কি ধরণের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পরিবর্তনশীল আর্থনীতিতে ব্যাংক ব্যবস্থা সম্পর্কে আপডেটেড থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এতে করে আপনি সেভিংস তৈরি বা সেভিংসের টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরো বেশি কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন।
- https://www.imf.org/external/pubs/ft/fandd/2012/03/basics.htm
- https://www.forbes.com/advisor/banking/how-do-banks-work/
- https://www.investopedia.com/terms/b/bank.asp
- https://portal.ct.gov/DOB/Consumer/Consumer-Education/ABCs-of-Banking---Banks-and-Our-Economy
- https://corporatefinanceinstitute.com/resources/wealth-management/banking-fundamentals/
- https://www.bankofengland.co.uk/explainers/what-do-banks-do
- https://www.britannica.com/money/topic/bank/Commercial-banks
Next to read
সোশ্যাল ইম্প্যাথি ম্যাপিং (Social Empathy Mapping)


শেয়ারিং ইকোনমি মডেল (Sharing Economy Model)

বেইট এন্ড হুক মডেল (Bait & Hook Model)

মার্কেটিং এর ৭'পি (7P’s of Marketing)

Needs, Wants, Demands (প্রয়োজন, চাওয়া এবং চাহিদা)

বি-টু-বি, বি-টু-সি এবং বি-টু-জি কি? (B-to-B, B-to-C, B-to-G)

লোগোর উদাহরন (Example of Logos)

নিট মুনাফা (net profit) সংজ্ঞা, সূত্র এবং কিভাবে হিসাব করবেন

হোরেকা (HORECA)
