GeoRenus Editorial Team

পারসোনাল ব্র্যান্ডিং হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ তার পরিবেশের কাছে নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এটি এমন একটি পরিচয় তৈরি করে যা মানুষকে তাদের প্রতিযোগীদের থেকে আলাদা করে, তাদের অডিয়েন্সের কাছে আরও স্বীকৃত এবং কানেক্টেড করে দেয়। পারসোনাল ব্র্যান্ডিং-এর সাহায্যে ব্যক্তি ও প্রফেশনাল উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ইমপ্যাক্ট তৈরি করা যায়।
তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে নিজের ব্যক্তিগত এবং প্রফেশনাল জীবনে সফল হতে পারসোনাল ব্র্যান্ডিং-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বোধ হয় আর দ্বিতীয়টি নেই। আপনার পারসোনাল ব্র্যান্ড আপনার ক্যারেক্টার এবং স্কিলসেট ডিফাইন করতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে অন্যরা বুঝতে পারে যে আপনি কিভাবে নিজের জীবন অতিবাহিত করছেন এবং আপনার কোর ভ্যালুগুলো কি কি। পারসোনাল ব্র্যান্ডিং-এর সাহায্যে আপনি নিজের গল্পগুলো যেমন অন্যদের কাছে তুলে ধরতে পারেন আবার অন্যদের অনুপ্রেরণার উৎস’ও হয়ে উঠতে পারেন। হাতের মুঠোয় সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্ম থাকা সত্ত্বেও অনেকের কাছেই একটি পারসোনাল ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা অনেক কঠিন কাজ মনে হয়। আজ আমরা এই বিষয়েই আলোচনা করবো।
অ্যামাজন ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি জেফ বেজোস তার এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন যে, “আপনি রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর রুমে থাকা মানুষ আপনার যেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন, সেটিই আপনার পারসোনাল ব্র্যান্ড।” এই একটি বাক্যের সাহায্যেই পারসোনাল ব্র্যান্ড-এর একটি শক্ত ধারনা গ্রহণ করা যায়।
সহজভাবে বলতে গেলে, একটি কোম্পানী যেমন করে নিজের প্রোডাক্টের জন্য একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে তোলে, ঠিক তেমনই কোনো একক ব্যক্তির স্বতন্ত্র স্বত্তা গড়ে তোলার প্রক্রিয়াই হচ্ছে পারসোনাল ব্র্যান্ডিং। আপনি কে, আপনার উদ্দেশ্য এবং চিন্তাধারা কি, আপনার পরিবেশে আপনার প্রভাব কতটুকু তার অনেকটাই প্রকাশ পায় আপনার পারসোনাল ব্র্যান্ড ভ্যালুর সাহায্যে।
বেশিরভাগ মানুষ এই প্রথম স্টেপেই আটকে যান অথবা নিজেকে সঠিকভাবে উপলব্ধি না করেই ভুল্ভাবে পারসোনাল ব্র্যান্ডিং করে থাকেন। নিজের একটি পারসোনাল ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার শুরুতেই আপনার আগে নিজের সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। আপনি যদি নিজেকেই ভালোভাবে না জানেন তবে অন্যদের কিভাবে নিজের সম্পর্কে ধারণা দিবেন। তাই প্রথমেই আপনাকে আপনার জীবনের মিশন, ভিশন, জীবনের নীতি ইত্যাদি সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। আপনি এখন কোথায় আছেন, ভবিষ্যতে কোথায় পৌছাতে চান এবং সেখানে কিভাবে পৌছাতে চান - এগুলো নির্ণয় করার মাধ্যমেও আপনি কাজটি শুরু করতে পারেন।
পারসোনাল ব্র্যান্ডিং-এর খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সততার অবলম্বন করা। আপনার কাজ হয়তো আর দশজনের সাথে মিলছে না অথবা অনেকেই আপনাকে কটুকথা শোনাচ্ছে, কিন্তু তবুও আপনার নির্ভেজাল হতে হবে। আপনি যদি একজন সৎ মানুষ হয়ে থাকেন, তাহলে দেখবেন এমনিতে সমাজে আপনার একটি ব্র্যান্ড তৈরি হয়ে আছে, মানুষের কাছে আপনার কথার ভার একটু বেশিই। অন্যদিকে আপনি যদি এমন কোনো রুপ ধারণ করার চেষ্টা করেন, যা আপনার আসল রুপ নয় - তাহলে একদিন আপনি ধরা পরেই যাবেন।
জি, যেকোনো কোম্পানীর মতোই আপনারও একটি টার্গেট অডিয়েন্স রয়েছে। হাজার চেষ্টা করলেও আপনি পৃথিবীর সব ধরণের মানুষের কাছে পৌছাতে পারবেন না আবার যাদের কাছে আপনি পৌছাবেন, তাদের অনেকেই আপনাকে ঠিকভাবে বুঝতে পারবেন না। তাই যাদের টার্গেট করলে আপনার লাইফের ভ্যালু বৃদ্ধি পাবে এবং একটি মিনিংফুল সম্পর্ক তৈরি হবে তাদেরকেই টার্গেট করা উচিত।
উদাহরণস্বরুপ, আপনার ইচ্ছা আপনি একদিন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে কাজ করবেন। তাহলে এটার জন্য আপনার টার্গেট অডিয়েন্স কারা? নিশ্চয়ই যারা বর্তমানে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোতে কাজ করছেন তারা অথবা যারা সেখানে কর্মী নিয়োগ করছেন তারা। তাই আপনি লিংকডইনে একটি প্রোফাইল তৈরি করে এমন সব মানুষদের সাথে কানেকশন গড়ে তুলতে পারেন যারা এখনই বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে রয়েছেন।
বর্তমান সময়ে আমাদের সকলেরই একটি বা একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। কারো সম্পর্কে ধারণা পেতে চাইলে আমরা তাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল দেখেই জাজ করি, এটা এখন নরমাল হয়ে গিয়েছে। তাই আপনি যদি নিজের একটি শক্ত ব্র্যান্ডিং করতে চান তাহলে আপনার সোশ্যাল মিডিয়া প্রেজেন্সকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আপনি আপনার ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি ঠিক যেমনভাবে সাজাতে চান ঠিক সেভাবেই সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল সাজাতে হবে। কোনো রকম অহেতুক ছবি, শেয়ার, কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ, এতে করে আপনার পারসোনাল ব্র্যান্ড নষ্ট হতে পারে।
এই কাজটি আপনি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সহজেই করতে পারবেন। যাদের মতো আপনি হতে চাচ্ছেন বা ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে চান তাদেরকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলো করুন, গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো নোট ডাউন করুন, তাদের সাথে এঙ্গেজ করার চেষ্টা করুন।
আপনার পারসোনাল ব্র্যান্ড আপনি চাইলে একদিনেই প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না, এটি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আপনাকে অধ্যবসায়ের সাথে লেগে থাকতে হবে এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। হঠাৎ একদিন আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনার দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে অবশেষে আপনার আনমনেই একটি পারসোনাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়ে গিয়েছে।
বর্তমান সময়ে যেকোনো কিছু করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া হচ্ছে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। তাই আপনি সোশ্যাল মিডিয়া দিয়ে নিজের ব্র্যান্ডিং শুরু করতে পারেন। প্রথমেই, নিজের প্রোফাইলকে ক্লিন করে নিতে হবে এবং তারপরেই এমন কনটেন্ট তৈরি করতে হবে যা আপনার অডিয়েন্স পছন্দ করবে এবং তাদের কাছে আপনাকে পরিচিত করে তুলবে।
অনলাইনে পারসোনাল ব্র্যান্ডিং-এর কাজ করা তুলনামূলক সহজ এবং সাশ্রয়ী। তবে আমাদের জীবনের বড় একটা অংশ কিন্তু রয়েছে অফলাইনে, সেটাকে কোনোভাবে হেলা করা যাবে না। অনালাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও আপনাকে এক্টিভলি মানুষের সাথে মিশতে হবে এবং নিজের উপস্থিতি দেখাতে হবে।
এই স্টেপগুলো ধারাবাহিকভাবে না করে আপনি যেকোনোটি দিয়েই কাজ শুরু করে ফেলতে পারেন। এক এক করে সবগুলো ফলো করতে পারলেই আপনার পারসোনাল ব্র্যান্ড তৈরির ক্ষেত্রে আপনি অনেকটা পথ এগিয়ে যাবেন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি গবেষণা মতে, আমেরিকার ৮১% মানুষ কোনো কিছু ক্রয় করার আগে সেই বিষয়টি সম্পর্কে অনলাইনে একবারের জন্য হলেও সার্চ করেন। বাংলাদেশের ক্রেতাদের বিষয়ে এমন কোনো রিসার্চ এখন পর্যন্ত না হলেও যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখন ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় চলে এসেছেন এবং প্রায় সব ঘরেই অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে, তাই ধরেই নেয়া যায় যে বাংলাদেশেও এই সংখ্যাটি বেশ ভালো হবে। কোনো পণ্য ক্রয় করা অথবা সেবা নেয়ার আগে মানুষ একবারের জন্য হলেও গুগলে সেই বিষয়টি নিয়ে সার্চ করেন অথবা ইউটিউবে ভিডিও দেখেন। এমন একটি সময়ে যদি আপনার একটি শক্ত অনলাইন প্রেজেন্স এবং পারসোনাল ব্র্যান্ড থাকে তাহলে ধরেই নেয়া যায় যে আপনার চলার পথ অনেক সহজ হয়ে গেল।
একমাত্র এই কারণেই অনেক ব্যক্তি নিজের কোম্পানী বা প্রোডাক্টের সাথে রিলেট করে নিজের পারসোনাল ব্র্যান্ডিং করে থাকেন। উদাহরণস্বরুপ, টেন মিনিটস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক যখন কোনো স্কিল ডেভেলপিং কোর্স আমাদের সাজেস্ট করেন তখন তা আমাদের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। এর পেছনে একমাত্র কারণ হচ্ছে আয়মান সাদিকের পারসোনাল ব্র্যান্ডিং।
একইভাবে আপনার পারসোনাল ব্র্যান্ড যদি শক্ত হয়ে থাকে তাহলে আপনার কথা মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এছাড়াও পারসোনাল ব্র্যান্ডিং-এর আরো বেশ কিছু গুরুত্ব রয়েছে।
বর্তমান প্রতিযোগীতাপূর্ণ সময়ে পারসোনাল ব্র্যান্ডিং না থাকলে আপনাকে কেউ চিনতে বা জানতে পারবেন না। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কারোই অগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দিকে মনোনিবেশ করার সুযোগ নেই। এমতাবস্থায় পারসোনাল ব্র্যান্ডিং আপনাকে অন্যদের থেকে অনেকটা এগিয়ে দেয়।
পারসোনাল ব্র্যান্ডিং করলে আপনার ফিল্ডের প্রচুর পরিমাণ মানুষের সাথে পরিচিত হতে পারবেন এবং সেখান থেকে আপনি ভবিষ্যতে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা’ও পাবেন।
আপনার পারসোনাল ব্র্যান্ডিং-এর কারণে মানুষ আপনাকে অনেক বেশি বিশ্বাস করবে এবং আপনার কথা মতো কাজ করার চেষ্টা করবে, এটাই পারসোনাল ব্র্যান্ডিং-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা।
আপনার যদি আগে থেকেই একটি পারসোনাল ব্র্যান্ড তৈরি হিসেবে থাকে তাহলে আপনি নতুন কোনো কাজ শুরু করলে প্রথম থেকেই ভালো পরিমাণ সাড়া পাবেন। কারণ, আপনি ইতোমধ্যেই অনেকের কাছে পরিচিত এবং তারা আপনাকে বিশ্বাস করেন।
নিজের পারসোনাল ও প্রফেশনাল উভয় জীবনে সফল হতে পারসোনাল ব্র্যান্ডিং-এর কোনো জুড়ি নেই। এর মাধ্যমে আপনি মানুষের কাছে আরো অনেক বেশি পরিচিত এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারবেন যা আপনার জন্য প্রতিনিয়ত খুলে দিবে নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। তাই দেরি না করে যতো দ্রুত সম্ভব একটি স্ট্র্যাটেজি সিলেক্ট করে নিজের পারসোনাল ব্র্যান্ড তৈরি করার কাজ শুরু করে দিন।

কাস্টমার এক্সপ্লোরেশন ম্যাপ মূলত এক ধরনের টেমপ্লেট বা চার্ট। যা অনেকাংশে একটা স্টোরিবোর্ড এর মতো ও কাজ করে থাকে। নিতান্তই ছোট এবং সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ এই টেমপ্লেট কিংবা স্টোরিবোর্ড আপনার ব্যবসার উন্নতির জন্য অনেক কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।








