GeoRenus Editorial Team

অর্থনীতি জগতের খোঁজ রাখা ব্যক্তিদের কাছে, পঞ্জি স্কিম ও পিরামিড স্কিম শব্দ দুটো বেশ পরিচিত। স্বল্প সময়ে কোনো পরিশ্রম ছাড়াই দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রায় সকল জালিয়াতি বা প্রতারণা কেই পঞ্জি এবং পিরামিড স্কিম হিসেবে ধরা হয়। দুই ধরনের স্কিম এর উদ্দেশ্য একদম কাছাকাছি। প্রথমে ইনভেস্টরদের আস্থা অর্জন করা এবং তাদের ইনভেস্টের সর্বস্ব আত্মসাত করা। সঙ্গতভাবেই এ ধরনের স্কিম বিজনেসের কোনো আইনি বৈধতা থাকে না, শুধু মূল পরিকল্পনাকারীই লাভবান হয়ে থাকেন। Ponzi & Pyramid স্কিম এর উদ্দেশ্য একই হলেও পার্থক্য তাদের প্রতারণার ধরন ও স্ট্র্যাকচারে৷ পঞ্জি ও পিরামিড স্কিমের ফাঁদে পরে বিশ্বব্যাপী এখন পর্যন্ত ২০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি রেকর্ড করা হয়েছে। শুধুমাত্র একটি স্ক্যামেই ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার স্ক্যাম হয় ২০০৮ সালে, বার্নি ম্যাডফের হাত ধরে।
পঞ্জি স্কিম হল এক ধরনের প্রতারণামূলক বিজনেস। যেখানে থাকবেনা কোনো প্রকৃত পণ্য, সার্ভিস বা বিজনেস স্ট্র্যাকচার। শুধু থাকবে মিথ্যা ও বায়োনাট ভাবে উপস্থাপন করা প্রতিশ্রুতি অথবা প্রোপোজাল। সহজে কথায় বলতে গেলে, অনেক বেশি আয় করার লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফালানো এবং তাদের পুঁজি আত্মসাৎ করাই Ponzi Scheme। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের অসচেতনতা ও লোভকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তির লাভবান হওয়ার এমন ঘটনাই পঞ্জি স্কিমের।
তবে, এ ধরনের প্রতারণাগুলোকে অদ্ভুত নাম "পঞ্জি স্কিম" এ কেন ডাকা হয় ? এই উত্তর জানার জন্য Ponzi Scheme এর ইতিহাসের থেকে ঘুরে আসতে হবে।
"Ponzi" নামটি এসেছে চার্লস পঞ্জি নামের এক প্রতারকের নাম থেকে। চার্লস পঞ্জি, তৎকালীন ডাক ব্যবস্থাকে ঘিরে এক প্রকার প্রতারণার মাধ্যমে ১৯২০ সালের দিকে বোস্টনে বেশ হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছিল।
তিনি ‘সিকিউরিটি একচেঞ্জ কোম্পানি’ নামের একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করলেন। এই কোম্পানকে সবার সামনে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হলো, যাতে দেখানো হলো এ কোম্পানিটি স্বল্প সময়ের মধ্যে অবিশ্বাস্য মুনাফা প্রদান করতে পারবে। তিনি অনেক বেশি প্রোফিটের প্রস্তাব দিলেন, যেমন- ৪৫ দিনে ৫০% অথবা ৯০ দিনে ১০০% প্রোফিট।
এর আগে পঞ্জি ষ্ট্যাম্প বিক্রির মাধ্যমে যথেষ্ট মুনাফা করায় লোকমুখে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল এবং বিনিয়োগকারীরা তার উপর আস্থা রাখলেন। এবং এখানেই জীবনের অন্যতম বড় ভূল করে বসলেন। এবং ইনভেস্ট করে সর্বস্ব হারালেন। এ ঘটনার পর এই ধরনের প্রতারণা গুলোকে পঞ্জি স্কিম নাম দেয়া হয়।
একটি পঞ্জি স্কিম মূলত ধাপে ধাপে কাজ করে:
এখানে প্রথমে একটি মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত করে বিজনেস মডেল তৈরী করা হয়। যাতে লোকজন এখানে ইনভেস্ট করাকে অনেক বেশি কার্যকর মনে করে। এরপর স্কিমের প্রতারকরা অল্প বিনিয়োগে উচ্চ আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজনেস শুরু করে।
প্রথম দিকে অনেক লোকেরা বিনিয়োগ করে। এবং কেউ কেউ প্রতিশ্রুত রিটার্নও পায়। এটা শুধু কোম্পানির নাম প্রচারণা ও খ্যাতি অর্জনের জন্য করা হয়। শুরুর দিকে ছোট ইনভেস্ট এ রিটার্ন দিয়ে, বড় ইনভেস্ট ও বেশি লাভের স্বপ্ন দেখানো হয়।
প্রতারকরা আসলে নতুন বিনিয়োগকারীদের ফান্ড ব্যবহার করে আগের বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন দিতো, একটি সাকসেসফুল বিনিয়োগের ইল্যুশন তৈরি হত৷ পুরাতন বিনিয়োগকারী রা ভাবতো তারা তাদের প্রোফিট ঠিক ভাবে পাচ্ছে। ফলে তারা পজিটিভ রিভিউ করতো, নতুন দের আকৃষ্ট করতো, পাশাপাশি নিজেরাও আরো বড় ইনভেস্টের পরিকল্পনা করত।
এই সাইকেল টি বেশি দিন চালানো সম্ভব হয় না। কারণ, মানুষ যখন অনেক বেশি বিনিয়োগ করে, তখন এত বিরাট রিটার্ন না দিয়ে প্রতারক রা বড় অংকের টাকা টা আত্মসাৎ করে নেয়। শেষ পর্যন্ত, স্কিমটি ভেঙে পড়ে, যার ফলে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর ক্ষতি হয়।
পঞ্জি স্কিমের কথা উঠলে সবার আগে যে নামটি মাথায় আসে তা হলো বার্নাড ম্যাডফ। যিনি সাম্প্রতিক সময়ের শেয়ার বাজারের সবচেয়ে বড় স্ক্যামের সাথে জড়িত ছিলেন। ম্যাডফ ছিলেন নাসদাকের চেয়ারম্যান, একজন পঞ্জি স্কিমের মাস্টারমাইন্ড। তার এই জালিয়াতি প্রতিষ্ঠান ১৯৬০ সালে চালু হয় এবং ৪০ বছর ধরে মানুষকে ধোঁকায় রাখে। তিনি জনগণকে এমন সব লাভের প্রতিশ্রুতি দিতেন, যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তিনি নতুন ইনভেস্টদের টাকা দিয়ে পুরাতন দের সামাল দিতেন।
তবে এভাবে বেশিদিন প্রতারণা চালানে সম্ভব হয় না এবং তার প্রতিষ্ঠানের ৫০ বিলিয়ন ডলার দেনা হয়ে যায়। ২০০৮ সালে তার প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হবার পর, ম্যাডফের পুত্র এই ঘটনা কর্তৃপক্ষকে জানায় এবং এই কেলেঙ্কারির পর্দা ফাঁস হয়। উঠে আসে ম্যাডফের প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করার ঘটনা। অবশেষে, ম্যাডফ কে ১১টি ফেডারেল অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১৫০ বছর কারাবাস দেওয়া হয়।
পিরামিড স্কিমও হল এক ধরনের ইনভেস্ট স্কিম যেখানে অংশগ্রহণকারীদের প্রকৃত বা বৈধ পণ্য বা সার্ভিস সেল করা হয় না। এখানে শুধু ইনভেস্ট করা ও উচ্চ আয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এবং একজন মেম্বার যেন আরো কয়েকজন মেম্বার নিয়ে আসে ইনভেস্ট এর জন্য এমন কন্ডিশন রাখা হয়।
এই স্কিমটি বৃদ্ধির সাথে সাথে এটি একটি পিরামিডের আকার ধারণ করে, যার কারণে এর নাম পিরামিড স্কিম দেয়া হয়েছে। এই স্ট্রাটেজি তে শীর্ষে থাকা কয়েকজন অংশগ্রহণকারী উপকৃত হয়, আর নীচের অংশের বেশিরভাগই তাদের অর্থ হারায়। পিরামিড স্কিমগুলি তাদের শোষণমূলক এবং প্রতারণামূলক প্রকৃতির কারণে অনেক দেশে অবৈধ। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৪ সালে, অতিরিক্ত প্রতারণামূলক ঘটনার পর পিরামিড স্কিম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পিরামিড স্কিমের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকেই ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের স্ক্যাম হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে কমন পিরামিড স্কিম হল, রেফারিং স্ক্যাম। এখানে, রেফারিং সিস্টেম এর মাধ্যমে পুরাতন ইনভেস্টর কর্তৃক নতুনদের ইনভেস্ট করতে আগ্রহী করা হয়। এবং শুরু দিকের কিছু ইনভেস্টর, লাভবান হলেও, শেষের দিকের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বলা চলে, পিরামিড স্কিম ও একধরনের পঞ্জি স্কিম, কিন্তু এখানে প্রতারণা করার স্ট্র্যাকচার টা কিছুটা ভিন্ন।
একটি পিরামিড স্কিম সাধারণত কয়েকটি ধাপে কাজ করে:
BurnLounge, Inc. একটি মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং অনলাইন মিউজিক স্টোর, যা ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এটি নিউ ইয়র্ক সিটিতে অবস্থিত। ২০০৬ সাল নাগাদ, কোম্পানিটি ৩০,০০০ সদস্যকে তার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সঙ্গীত বিক্রি করার জন্য সাইটটি ব্যবহার করার জন্য কনভিন্স করে। এবং রেফারিং স্ক্যামের আড়ালে একটি পিরামিড স্কিম গড়ে তোলে।
২০০৭ সালে, কোম্পানিটি, ফেডারেল ট্রেড কমিশন দ্বারা একটি অবৈধ পিরামিড স্কিম তৈরী ও ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয়ার দায়ে অভিযুক্ত হয়। একুশ শতকের সবচেয়ে বড় পিরামিড স্কিম ছিল এটি। পরবর্তীতে, কোম্পানীটি ২০১২ সালে মামলায় হারে, এবং জুন ২০১৪-এ আপিল আবেদন হারায়। সৌভাগ্যক্রমে জুন ২০১৫-এ, FTC, স্কিমটিতে অর্থ হারিয়েছে এমন লোকদের ১.৯ মিলিয়ন ডলার ফেরত দিতে সক্ষম হয়।
Ponzi এবং Pyramid স্কিমের উদ্দেশ্য অনেক টা কাছাকাছি হলেও তাদের গঠনগত ও আইনত কিছু বিষয়ে পার্থক্য থাকে। এক নজরে পঞ্জি বনাম পিরামিড স্কিম -
পঞ্জি: হাই রিটার্ন এর লোভ দেখিয়ে ইনভেস্টর দের টাকা হাতিয়ে নেয়া। এবং নতুন ইনভেস্টর দের ফান্ড দিয়ে বহুদিন পর্যন্ত স্কিম সাইকেল চাইলে যাওয়া
পিরামিড: নতুন নতুন মেম্বার নিয়োগ করাে, তাদের ইনভেস্ট করতে আগ্রহী করা এবং বেশি লাভের জন্য নতুন মেম্বার নিয়ে আসতে বাধ্য করা।
পঞ্জি: ইনভেস্টর দের টাকা পুরোটাই ফান্ডে যোগ হয়। নতুনদের ইনভেস্ট কে পুরাতনদের রিটার্ন হিসেবে দেয়া হয়।
পিরামিড: পুরাতন ইনভেস্টর দের টাকা পুরোটাই স্ক্যামারের ফান্ডে যোগ হয়। আর, নতুন ইনভেস্টর রা টাকা ইনভেস্ট করে, সেগুলো রেফারেন্স মানি হিসেবে পুরাতনদের কিছুটা লাভ দেয়া হয়।
পঞ্জি: মাধ্যমে পুরাতন ইনভেস্টর দের ধরে রাখা যায়। ফলে, দীর্ঘদিন ধরে স্কিম চালিয়ে যাওয়া যায়।
পিরামিড: অস্থায়ী, নতুন নতুন মেম্বার নিয়োগ না হলে পিরামিড স্কিম ভেঙে পড়ে।
পঞ্জি: মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে কোম্পানির মুনাফা ও ইনভেস্ট রিটার্ন বেশি হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।
পিরামিড: নতুন মেম্বার নিয়োগ করলে বেশি লাভের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়
পঞ্জি: অধিকাংশ দেশেই বর্তমানে পঞ্জি স্কিম দন্ডনীয় অপরাধ
পিরামিড: অনেক দেশে নিষিদ্ধ হলেও, কিছু কিছু দেশে এ ব্যপারে বৈধ অবৈধ কোন প্রকার আইন জারি করা হয় নি।
পঞ্জি: চার্লস পঞ্জি স্কিম, বার্নি ম্যাডফ পঞ্জি স্কিম।
পিরামিড: বার্ন লাউঞ্জে স্কিম, ২০১৮ এর গিভ এন্ড টেক স্কিম।
পঞ্জি কিংবা পিরামিড স্কিম, উভয়ই উদ্দেশ্য অসাধু এবং আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। অর্থনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই এইসব জালিয়াতির হিংস্রতা সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায় বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারীরা এই প্রতারণা গুলের শিকার হয় এবং ক্ষতির মুখে পরে। Ponzi ও Pyramid scheme গুলোর রেকর্ডেড বাৎসরিক ক্ষতি ১০৫ মিলিয়নেরও বেশি। এবং রেকর্ডেড ডাটা ছাড়া বহু মানুষ এসব স্কিমের ফাঁদে পা দিচ্ছে।
অনলাইন ও ইন্টারনেটের যুগে, প্রতারণা ও জালিয়াতি যেহেতু সহজলভ্য হয়েছে, সেহেতু সাধারণ জনগণ ও সরকার কে হতে হবে আরো সচেতন। ফাইনান্স সিকিউরিটি আইন আরো জোরদার করতে হবে, পাশাপাশি অপরিকল্পিত বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

অ্যাড অন মডেলে মূলত কোনো একটি পণ্য বা পরিসেবার জন্য বাজারে অন্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম মূল্য (কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনামূল্য) নির্ধারণের মাধ্যমে গ্রাহক চাহিদা সৃষ্টি করা হয়। আর পণ্য বা সেবাটি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন গ্রাহক মনে ঐ নির্দিষ্ট পণ্য বা পরিষেবার বাইরেও ঐ পণ্য সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত ফিচার কিংবা সেবার প্রতি প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়। এর ফলে গ্রাহক ঐ পণ্যটির বাইরেও অন্যান্য পরিষেবা গুলোও অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করে। এভাবে এই অ্যাড অন বিজনেস মডেল টি মূলত কাজ করে থাকে।








