GeoRenus Editorial Team

অনলাইন স্ক্যামের ক্রমবর্ধমান বিবর্তনের যুগে, অন্যতম কুখ্যাত ও দীর্ঘস্থায়ী ই মেইল স্ক্যাম হল নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যাম। "419 scam" নামে পরিচিত এই স্ক্যামের ফাঁদে পরে বছরের পর বছরে হাজারো মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছে। Nigerian Prince Scam এর ভিকটিম প্রতি বছর বাড়ছে। অর্থাৎ, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম স্ক্যাম কিন্তু এখনও সচল আছে। একদম শুরুর ইমেইল এই ১৬.৮ মিলিয়ন হাতিয়ে নিয়েছে এই প্রতারণামূলক স্ক্যাম৷
৯০ এর দশকে, নাইজেরিয়ার এক ছোট শহরে, হঠাৎ করেই লোকাল ইমেইল ইউজারদের কাছে কিছু ইমেইল আসা শুরু করে। ইমেইল গুলো ছিল নাইজেরিয়ার প্রিন্সের নামে। খুবই সুকৌশলে রিসিভারদের কনভিন্স করা হচ্ছিল রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ফান্ড রেইজ করার জন্য। আর এই রিসিভারদের একটা বড় অংশই এই ই মেইলে বিশ্বাস করা শুরু করে। ফলস্বরূপ, প্রথম ই-মেইল এই ১১২৮ জন এর কাছ থেকে গড়ে ১৪০০ মার্কিন ডলার চলে যায় তথাকথিত প্রিন্সের একাউন্টে। কিন্তু এই ই মেইল গুলো কি সত্যি ই নাইজেরিয়ার রাজপুত্রের ছিল? না, ইমেইল গুলো পাঠিয়েছিল নাইজেরিয়ার অন্যতম ধূর্ত ও স্ক্যামিং মাস্টাররা।
নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যামের একটি দীর্ঘ এবং ইন্টারেসটিং ইতিহাস রয়েছে, যা ২০ শতকের গোড়ার দিকে শুরু হয়। একে , "419 স্ক্যাম," নামেও ডাকা হয়। এই নামটি মূলত নাইজেরিয়ান পেনাল কোড বিভাগ থেকে এসেছে, যেটা যা জালিয়াতি বা স্ক্যাম কে রিপ্রেজেন্ট করে। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে, ইন্টারনেট ও ইমেল এর আবির্ভাবের শুরুর সাথে সাথেই নাইজেরিয়ান স্ক্যামের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
স্ক্যামিং টি সাকসেসফুলি রান করে ১৯৯০ সালে, এক নাইজেরিয়ান স্ক্যামিং মাস্টারের হাত ধরে। মূলত, নাইজেরিয়ার লোকাল ইমেইল ইউজারদের কাছে নাইজেরিয়ার রাজপুত্রের নাম করে কিছু ইমেইল যাওয়া শুরু করে। শুরুর দিকের ইমেইল গুলোর বিষয়বস্তু ছিল রাষ্ট্রের প্রয়োজনে জন্য, প্রিন্সের একাউন্টে আর্জেন্ট টাকা ট্রান্সফার করা। ই-মেইল গুলো এতটাই নিখুঁত এবং প্রোফেশনাল ছিল অধিকাংশের পক্ষে সেগুলো এড়িয়ে চলা অসম্ভব ছিল। তাছাড়া, তখনই নাইজেরিয়ার লোকজন ইমেইল, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে সবেমাত্র পরিচিত হচ্ছে৷ তাই স্ক্যামিং এর ব্যপারে বেশিরভাগ ইউজার সচেতন ছিল না।
Nigerian Prince Scam এর বিস্তার ২০০০ সালের দিকে শুরু হলেও, এই স্ক্যাম থেমে থাকে নি। এই স্ক্যামের উৎস নাইজেরিয়ায় হলেও এর কার্যকর এখনও বন্ধ হয় নি। সেইম স্ক্যামিং গ্রুপ বিভিন্ন প্যাটার্নে প্রতিনিয়ত স্ক্যাম করে যাচ্ছে। শুরুর দিকে ক্ষতির পরিমান ১৬ মিলিয়ন হলেও এত বছরে তা বিশ্বব্যাপী ১ বিলিয়ন অতিক্রম করেছে।
নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যামটি মূলত বিভিন্ন ধাপে ধাপে সংঘটিত হত। প্রথমে ইমেইল পাঠানো থেকে শুরু করে, টাকা ট্রান্সফারের জন্য কনভিন্স করা এবং ইনফরমেশন হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা গুলো স্টেপ বাই স্টেপ করা হত৷
কেলেঙ্কারীটি শুরু হয় একটি ফ্রড ইমেল বা মেসেজ এর মাধ্যমে। একজন স্ক্যামার প্রথমে নিজেকে নাইজেরিয়ার রাজপুত্র, রাজপরিবারের বা উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বলে দাবি করে। তবে পরবর্তী তে এই প্যাটার্ন মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করলে, স্ক্যামার রা ধরন পাল্টে ফেলে। এবং সিকিউরিটি অফিসার, কিংবা পুলিশ, সাইবার নিরাপত্তা সদস্য দাবি করে ইমেইল পাঠাতে শুরু করে।
সাধারণত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা অন্য কোনো বানোয়াট সংকটের কারণে বিদেশী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ (প্রায় মিলিয়ন ডলার) ফিরিয়ে আনার জন্য জনগনের সাহায্য প্রয়োজন, এই ধরনের গল্প দিয়েই স্ক্যামিং শুরু হত৷ যেহেতু ওই সময়ে নাইজেরিয়ায় সবেমাত্র ইন্টারনেট ও ইমেল এর আবির্ভাব হয়েছে মানুষ স্ক্যামিং নিয়ে সচেতন ছিল না৷ তার ওপর নাইজেরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও স্থিতিশীল ছিল না৷ ফলে, প্রতারকের গল্প গুলো অনেকটাই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল।
ই-মেইল স্ক্যাম গুলোর একটি কমন প্যাটার্ন হল আর্জেন্ট কল টু অ্যাকশন৷ তারা খুব দ্রুত টাকা ট্রান্সফারের জন্য জনগণ কে চাপ দিতে থাকে। মূলত, সাহায্যকারীদের পুরস্কৃত করার প্রমিস করা, কিংবা সরকারি বিভিন্ন সূযোগ সুবিধা দেয়ার আসা দেখিয়ে টাকা ট্রান্সফার করার জন্য প্রেসার তৈরী করে। এছাড়াও সরকারি প্রয়োজনে ইউজারদের ব্যক্তিগত তথ্য, পাসকোড, একাউন্ট ইত্যাদি ইনফরমেশন শেয়ার করার জন্য ও কনভিন্স করা হত৷
একবার ভিকটিম রা, তাদের প্রাইভেট ইনফরমেশন লিক করে দিলে, কিংবা টাকা ট্রান্সফার করে দিলে, স্ক্যামার রা তাদের ইমেইল ব্লক করে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এই কাজ গুলো এত দ্রুত সংঘটিত হয় যে নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যামের মূল কালপ্রিট কে কখনই শনাক্ত করা সম্ভব হয় নি৷
নাইজেরিয়ান স্ক্যামার রা শুরুর দিকে অনেক বেশি প্রফেশনাল না হওয়া কারণে বেশ কিছু কমন ভুল করেছিল। কিন্তু, সেখানকার লোকাল মানুষজন ও যথেষ্ট সতর্ক না হবার কারণে এগুলো প্রথমে শনাক্ত করতে পারে নি। তবে, স্ক্যাম ইমেইল এর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য পরবর্তীতে তাদের শনাক্ত করতে সাহায্য করেছে-
বেশিরভাগ নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যাম গুলোতে অসংখ্য বানান ভুল, গ্রামার মিসটেক থাকে। যার কারনে ইংরেজিতে পারদর্শী যে কারো পক্ষে এগুলো আইডেন্টিটিফাই করা সহজ। কিন্তু, লোকাল নাইজেরিয়ান রা এই বিষয়ে সচেতন না থাকার কারণে তাদের কে টার্গেট করা হয়েছে।
নাইজেরিয়ান স্ক্যাম ২০০২ সালের দিকে আমেরিকাতেও বিভিন্ন অফার, এডভান্স ফি স্ক্যাম এর চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের কমন ভুল, গ্রামার ও স্পেলিং মিসটেক এর কারণে সুবিধা করে উঠতে পারে নি।
প্রকৃত নাইজেরিয়ান প্রিন্স কিংবা সরকারি কর্মকর্তা রা কখনও এভাবে ইমেইল কিংবা মেসেজ এর মাধ্যমে জনসাধারণের সাথে যোগাযোগ করতেন না৷ গণমাধ্যম কিংবা সরকারি নোটিশ এর মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন৷ তাই, ইমেইল গুলোতে রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার দাবি করাটাও নাইজেরিয়ান স্ক্যাম চেনার উপায়। শুরুর কয়েক মাস উপলব্ধি না করলেও একটা সময় পরে এই রয়্যাল প্যাটার্ট সবাই সন্দিহান দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। ফলে স্ক্যামাররাও প্যাটার্ন চেঞ্জ করে ফেলে।
নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যাম ইমেইল গুলোর আরেকটি মোস্ট কমন বৈশিষ্ট্য হল, তারা রিসিভারদের খুব দ্রুত টাকা ট্রান্সফার করার জন্য প্রেসার দিতে থাকে। অফার শেষ হয়ে যাওয়া, রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজন কিংবা নানা অজুহাতে দ্রুত টাকা ট্রান্সফার এর দাবি করে। আর এই আর্জেন্ট কল টু অ্যাকশন, কনভিন্সিং টোন ও নাইজেরিয়ান স্ক্যাম চেনার একটা গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
নাইজেরিয়ান রয়্যাল ফ্যামিলি থেকে বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অফিশিয়াল নোটিশ ছাড়া সককারের কেউ জনগণের ব্যক্তিগত তথ্যের দাবি করে না। কিন্তু, নাইজেরিয়ান স্ক্যামাররা পরবর্তী তে আরো বেশি টার্গেট করতে রিসিভারদের পারসোনাল ডাটার এক্সেস চাইতো। শুরুর দিকে অনেকেই সরকারের প্রয়োজন মনে করে তথ্য দিয়ে পরবর্তীতে ব্লাকমেইল, তথ্য চুরি, ও নানা রকম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তাই, ব্যক্তিগত তথ্যের দাবি করা ইমেইল গুলো দিয়েও নাইজেরিয়ান স্ক্যাম সনাক্ত করা সম্ভব।
নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যামের প্যাটার্ন কিছুদিন পরপরই চেঞ্জ করা হত৷ এবং একই ধাঁচের ফিশিং এখনও ফলো করে স্ক্যামার রা। ফলে, নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যামের সূচনা আরো ৩০ বছর আগে হলেও, নতুন রুপে এখনও স্ক্যামিং চালিয়ে যাচ্ছে। স্ক্যামারদের করা কমন কিছু ইমেইল হল-
Nigerian Prince Scam এর সূচনা হয়, নাইজেরিয়ার রাজপুত্রের নামে ইমেইল পাঠানোর মাধ্যমে। শুরু দিকের ইমেইল গুলোতে, ভুয়া নাইজেরিয়ান প্রিন্স দাবি করে তার বেশ কিছু একাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার কারণে বিদেশি লেনদেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে। এবং তার একাউন্টে ৩,৫০০ মার্কিন ডলার পাঠানোর অনুরোধ করে। এবং প্রতিশ্রুতি দেয়, উপকারীকে পুরস্কার স্বরুপ, ১০০০০০ ডলার দেয়া হবে।
১ম ইমেইল টি কয়েক মাস ধরে প্রায় ১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয়ার পর লোকজন সর্তক হয়ে যায়। ফলে, স্ক্যামার রা প্যাটার্ন চেঞ্জ করে। ২য় ধাপে ইমেইল গুলো আসে একজন রয়্যাল ফামিলি মেম্বার এর নামে। এবং দাবি করে বিজনেসের উদ্দেশ্য ৪.২ মিলিয়ন ডলার নাইজেরিয়ান ব্যাংকে রাখা আছে। যারা তার বিজনেসে শুরুতেই ইনভেস্ট করবে, তাদেরকে এক মাসের মধ্যে, ৪.২ মিলিয়ন ডলারের ২০% দেয়া হবে। এই নতুন স্ক্যামের ফাঁদে পরেরও প্রায় ১৪০০ লোকাল নাইজেরিয়ান, প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার হারিয়েছে।
২য় প্যাটার্ন টি ও যখন লোকমুখে পরিচিত হয়ে উঠে এবং সরকারের নজরে আসে, স্ক্যামার রা আবারো তাদের মেসেজ এর ধরনে বড় পরিবর্তন আনে। এবার তারা আরো বেশি পাওয়ারফুল মোটিভ নিয়ে কাজ করে এবং অনেক বেশি টাকা হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এবার তারা সিকিউরিটি অফিসার হওয়ার দাবি করে এবং নাইজেরিয়ান প্রিন্স স্ক্যাম ভিকটিমদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
FTc এর অথোরাইজেশনে Pay Settlement Commission এর নামে এই ইমেইল গুলো আসা শুরু করে। এবং বলা হয় তারা স্ক্যামারদের আইডেন্টিফাই করে তাদের কাছ থেকে ১২৫ মিলিয়ন টাকা ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছে। এই টাকা গুলো এখন ভিটকিমদের ফিরিয়ে দেয়া হবে, তবে এডভান্স ফি হিসেবে কিছু টাকা ও ভেরিফিকেশন এর জন্য কিছু তথ্য শেয়ার করতে হবে।
এবং শেষপর্যন্ত, একবার বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ভিকটিম রা আবারও সর্বস্ব হারায়।
বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন স্ক্যাম ই-মেইল পাঠানো হয়। দেখা গেছে প্রোমোশন কিংবা অফার ইমেল গুলোর ৫৬ শতাংশ ই স্পাম!
আর রিসিভারদের একটা বড় অংশই এই প্রতারণামূলক ই-মেইল আইডেন্টিফাই করতে পারে না। ফলস্বরূপ, ৪.২৬ বিলিয়ন ইমেইল ইউজারদের ৩০% ই কোনো না কোনভাবে ই মেইল স্ক্যামের শিকার হয়৷ আর শুধুমাত্র এক Nigerian Prince Scam, এক বছরে ৭০,০০,০০০ ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।
তবে ফিশিং ইমেইল গুলোর ব্যাপারে সচেতন হতে পারলে এই প্রতারণা কিছুটা হলেও থামানো সম্ভব। তাই, ব্যাক্তিগত তথ্য কারো সাথে শেয়ার করা, কেনো অফিশিয়াল নোটিশ ব্যতিত টাকা ট্রান্সফার করা এবং এই ধরনের ফিশিং স্ক্যাম থেকে সতর্ক থাকতে হবে । এবং মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি স্ক্যামিং ইমেইল গুলো রিপোর্ট করে কিংবা সিকিউরিটি অফিসারদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

প্রতিটি উদ্যোক্তাই চায় তার পণ্য বা সেবা বাজারে আনার আগে সেটাকে একদম নিখুঁত করে তুলতে। কিন্তু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর সময় আর অর্থ ব্যয় করে একটা পণ্য পুরোপুরি তৈরি করার পর যদি দেখা যায় বাজারে তার কোনো চাহিদাই নেই — এটা একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। মূলত এই সমস্যার সমাধান দিতেই তৈরি হয়েছে মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট বা এমভিপি কৌশল। পুরো পণ্য একসাথে না বানিয়ে শুধু সবচেয়ে জরুরি ফিচারগুলো নিয়ে বাজারে আসুন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সত্যিকারের মতামত নিন এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে পণ্য উন্নত করুন। বাংলাদেশের পাঠাও, বিশ্বের উবার এবং ড্রপবক্স — এরা সবাই এই একই পথ ধরে এগিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।








