ই-কমার্স বিজনেস মডেল

ই-কমার্স ভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে প্রথমেই বিশ্লেষণ করতে হবে মার্কেট, সেই সাথে গ্রাহক কিংবা পণ্য বা সেবা এসব বিষয়ও চিহ্নিত করতে হবে। কিন্তু তারও আগে জানতে হবে ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট বিজনেস মডেল গুলো সম্বন্ধে। আপনার ই-কমার্স ব্যবসাটি কিভাবে পরিচালনা করবেন এবং নানাবিধ কার্যক্রম কিভাবে সুশৃঙ্খল ভাবে পরিচালনা করে আয়ের পথ উম্মোচন করবেন, তাঁর পুরোটাই কিন্তু নির্ধারণ করে দিতে পারে বিজনেস মডেল। তাই আপনি যদি ই-কমার্স ব্যবসায় সাফল্য পেতে চান, তবে আপনাকে অবশ্যই সঠিক এবং উপযোগী বিজনেস মডেলটি গ্রহণ করতে হবে।
Key Points
- বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার: বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর বাজার পরিধি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- ই-কমার্স বিজনেস মডেলের গুরুত্ব: ই-কমার্স ব্যবসায় সফল হতে হলে সঠিক বিজনেস মডেল নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ড্রপশিপিং মডেল: কম বিনিয়োগে ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করার একটি জনপ্রিয় উপায়। এতে পণ্য মজুত করার প্রয়োজন হয় না।
- হোলসেলিং ও ওয়্যারহাউজিং মডেল: বড় পরিমাণে পণ্য মজুত করে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা।
- প্রাইভেট লেভেলিং মডেল: নিজস্ব ব্র্যান্ডের অধীনে অন্যের তৈরি পণ্য বিক্রয় করা।
- হোয়াইট লেভেলিং মডেল: অন্যের ব্র্যান্ডের অধীনে নিজস্ব ওয়েবসাইটে পণ্য বিক্রয় করা।
- সাবস্ক্রিপশন মডেল: নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেবা প্রদানের বিনিময়ে নির্দিষ্ট ফি গ্রহণ করা।
ভূমিকা
দ্যা ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (The Financial Express) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার এর পরিধি ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে। আর এর বর্তমান বাজার পরিধিও কিন্তু ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এর কাছাকাছি। তাই বুঝতেই পারছেন, বাংলাদেশের ই-কমার্স সেক্টর কতটা উদীয়মান। আর এই বিশাল পরিধির উদীয়মান সেক্টরটিতে কিন্তু আপনিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। সামান্য পুঁজি কিন্তু প্রবল মনোবল আর কৌশল জানা থাকলে ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন আপনিও।
ই-কমার্স বিজনেস মডেল
তাহলে কিছু জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহ্রত ই-কমার্স বিজনেস মডেল সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাকঃ
ড্রপশিপিং বিজনেস মডেল (Dropshipping Business Model)
আপনি যদি তুলনামূলক কম মূলধন বিনিয়োগ করে ই-কমার্স ব্যবসায় সফল হতে চান, তবে ড্রপশিপিং বিজনেস মডেল হতে পারে আপনার জন্য উপযুক্ত মাধ্যম। এই বিজনেস মডেল ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো ধরনের পণ্য প্রস্তুত, গুদামজাতকরণ, সরবারহ ব্যতীতই আপনি আয় করতে পারবেন। এখন স্বভাবতই আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এটি কিভাবে সম্ভব? আর কিভাবেই বা এই মডেল কাজ করে থাকে?
মূলত এখানে ম্যানুফ্যাকচারার এবং কাস্টমারদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী একটি মাধ্যম হিসেবে আপনার ই-কমার্স ওয়েবসাইটটি কাজ করে থাকবে। পণ্যের মালিক থাকবে ম্যানুফ্যাকচারার, আর আপনি থাকবেন রিটেলার হিসেবে। আপনার এবং ম্যানুফ্যাকচারার বা ওয়্যার হাউজ এর মধ্যে নির্দিষ্ট চুক্তির সাপেক্ষে আপনি আপনার ওয়েবসাইটে তাঁদের পণ্য গুলো প্রদর্শন করতে পারবেন। আর এক্ষেত্রে গ্রাহককে আকৃষ্ট করে পণ্যটি বিক্রয় করার মধ্যেই কিন্তু আপনার সাফল্য নিহিত।
তবে এটাকে অবশ্য অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ভেবে ভুল করবেন নাহ। কারণ ড্রপশিপিং এবং অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর মধ্য বিস্তর ফারাক রয়েছে। এক্ষেত্রে মূল পার্থক্যটা হচ্ছে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর ক্ষেত্রে আপনার ওয়েবসাইটটির মাধ্যমে গ্রাহকদের মূল পণ্যটির প্রস্তুতকারকদের ওয়েবসাইটটির লিংক দিচ্ছেন, এবং সেখান থেকে গ্রাহকরা পণ্যটি ক্রয় করছে। কিন্তু ড্রপশিপিং এর ক্ষেত্রে আপনি অন্যের পণ্যটি আপনার ওয়েবসাইট থেকেই বিক্রি করছেন, আপনার ব্রান্ডের তত্ত্বাবধানে।
ড্রপশিপিং এর ক্ষেত্রে আপনি কোনো পণ্যের মূল্য আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে পারেন। ধরুন একটি হেডফোনের ম্যানুফ্যাকচারার কতৃক নির্ধারিত মূল্য ৪০০ টাকা, আপনি চাইলে আপনার ওয়েবসাইটটি থেকে ৫০০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে এটি বিক্রয় করতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই গ্রাহকের চাহিদা কিংবা ক্রয়ক্ষমতা, বাজারের সাথে সামঞ্জস্যতা রেখেই পণ্য সাজাবেন এবং মূল্য নির্ধারণ করবেন।
এক্ষেত্রে গ্রাহক যদি আপনার ওয়েবসাইটটি থেকে কোনো একটি পণ্যের অর্ডার করে, তখন আপনি ঐ অর্ডারটি মূল পণ্যের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট পৌছে দিবেন। আর তাঁরাই মূলত গ্রাহকের নিকট ঐ পণ্যটি সরবারহ করে দিবে এবং তাও আপনার ব্রান্ডের নামে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের টেক প্রোডাক্ট, কসমেটিকস, জামা-কাপড় সহ নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় জিনিষই ড্রপশিপড হয়ে থাকে। এবং এর চাহিদাও তুলনামূলক ভাল, বিশেষ করে বিদেশী পণ্যগুলো বেশি শিপিং হয়ে থাকে।
জিভিআর এর ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, ড্রপশিপিং এর বৈশ্বিক বাজার পরিধি ছিল ১০২.২ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের টেক প্রোডাক্ট, কসমেটিকস, জামা-কাপড় সহ নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় জিনিষই ড্রপশিপড হয়ে থাকে।
নোটবুক থেরাপি (Notebook Therapy), আনটিল গন (Until Gone), ব্লু ক্রেট (Blue Crate), ক্লাব ফিট উইয়ার (Club Fit Wear) ইত্যাদি সহ অনেক ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে এই ড্রপশিপ কেন্দ্রিক।
হোলসেলিং এবং ওয়্যারহাউজিং বিজনেস মডেল (Wholesaling and Warehousing Business Model)
আপনি যদি হোলসেলিং এবং ওয়্যারহাউজিং মডেল ভিত্তিক ই-কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে চান, তবে আপনার যেমন মোটা অঙ্কের মূলধন প্রয়োজন হবে ঠিক তেমনি প্রয়োজন হবে বেশ ভাল জনবলেরও।
এছাড়াও আপনার প্রয়োজন হবে বেশ বড়সড় একটি ওয়্যারহাউজের এবং পাশাপাশি বিশাল পরিমাণ পণ্যের আগাম সংগ্রহও থাকতে হবে।
এক্ষেত্রে বলা চলে, পূর্ববর্তী ড্রপশিপিং এ উল্লেখিত উদাহরণের ওয়্যারহাউজ এর ভূমিকায় এখন আপনি থাকবেন। অর্থাৎ পণ্য গুদামজাতকরণ বা সরবারহ সমস্ত কাজটি আপনার উপর বহাল থাকবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গুলো মূলত বিজনেস টু বিজনেস ভিত্তিক হয়। অর্থাৎ খুচরা গ্রাহক নয় বরং অন্য আরেকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠনের কাছে তাঁরা তাদের সংরক্ষিত পণ্য সমূহ বিক্রয় করে থাকে।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি একটি পণ্য ২০০ টাকায় বিক্রয় করলেন কোনো একটি বিজনেস টু কনজিউমার ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের নিকট। অর্থাৎ যারা সরাসরি গ্রাহকের নিকট পণ্য বিক্রয় করবে তাদের কাছে আপনি পণ্যটি বিক্রয় করবেন। আর সেই পণ্য তাঁরা আবার গ্রাহকদের নিকট তাঁদের সুবিধামতো দাম অনুযায়ী বিক্রয় করে দিবে। যেমন হতে পারে ঐ পণ্যটিই তাঁরা ২৫০ টাকায় বিক্রয় করে দিল। এভাবেই মূলত ওয়্যারহাউজিং এবং হোলসেলিং ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য বিক্রয় প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
একদম স্বাচ্ছন্দ্যে এবং নির্ঝঞ্জাট ভাবে যদি আপনি এই ওয়্যারহাউজিং এবং হোলসেলিং ভিত্তিক ই-কমার্স ব্যবসা করতে চান, তবে আপনাকে কিছু বিষয়ে চৌকষ ভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। যেমন, সাপ্লাই চেইন এবং লজিস্টিক এর ব্যাপারটি খুব গুরুত্বতার সাথে দেখতে হবে যেন ডেলিভারি বা শিপিং খুব দ্রুততার সাথে ঝামেলাহীন ভাবে হয়। সবকিছুর মধ্যে সামঞ্জস্যতা রাখতে দক্ষ জনবলও লাগবে, যারা প্যাকেজিং, রেকর্ডিং, ইনভয়েসিং, ফিন্যান্সিং সহ বিভিন্ন বিষয়ের দেখভাল করবে।
এছাড়াও আপনাকে কাস্টমার সেগমেন্ট সহ ট্র্যানস্যাকশনাল প্রসেস এর দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সব কিছুর মধ্যে সমন্বয় নিয়ে আসতে পারলেই, আপনি খুব সফল ভাবে ব্যবসাটি পরিচালনা করতে পারবেন। বর্তমানে অটোমোবাইল, মুদি সামগ্রী, জামা-কাপড়, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট সহ নানা ধরনের পণ্য বিক্রয়কারী হোলসেলিং এবং ওয়্যারহাউজিং ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। ফেডএক্স (FedEx), আলীবাবা (Alibaba) এর মতো প্রতিষ্ঠানও এই মডেল ব্যবহার করে আসছে।
প্রাইভেট লেভেলিং বিজনেস মডেল (Private Labeling Business Model)
ই-কমার্স ভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় মডেল হচ্ছে প্রাইভেট লেভেলিং। এক্ষেত্রে আপনি কোনো একটি পণ্যের প্রস্তুতকারকের ভূমিকায় থাকবেন। কিন্তু আপনার প্রস্তুতকৃত পণ্যটি আপনার প্রতিষ্ঠানের নামে নয় বরং অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের নামে গ্রাহকের নিকট বিক্রয় হবে। অর্থাৎ গ্রাহকের কাছে পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যম হচ্ছে রিটেলার। ড্রপশিপিং এর ক্ষেত্রে প্রয়োগকৃত উদাহরণ অনুযায়ী, কোনো রিটেলার আপনার প্রস্তুতকৃত পণ্যটি তাঁর ওয়েবসাইটে প্রদর্শন করে প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে তাঁর ব্রান্ডের অধীনে বিক্রয় করে থাকবেন। আর এতে আপনার সুবিধে হচ্ছে, আপনার পণ্যটি অধিক পরিমাণে বিক্রয় হবে। ফলে প্রফিট মার্জিন ও অনেক উচ্চ হবে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ধরুন আপনি কোনো একটি পণ্য ১০০ টাকা করে বিক্রয় করে থাকেন এবং প্রতিটি পণ্যে আপনার লাভের পরিমাণ ১০ টাকা। এবং দৈনিক আপনার পণ্য বিক্রয় হয় ৫০ টি। সেক্ষেত্রে আপনার পণ্য বিক্রয়ে মোট লাভ হবে ৫০×১০ = ৫০০ টাকা। কিন্তু আপনি যদি কোনো রিটেলার এর ব্রান্ডের অধীনেও ঐ একই পণ্য বিক্রয় করেন, তবে ধরুণ দৈনিক আপনার আরও ১০ টি পণ্য অধিক বিক্রয় হয়। তাহলে এখন দৈনিক মোট পণ্য বিক্রয় হবে ৬০ টি। এবং তখন আপনার লাভের পরিমাণ হবে ৬০×১০ = ৬০০ টাকা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে কিন্তু আপনার পূর্বের তুলনায় ১০০ টাকা অধিক লাভ হচ্ছে। এভাবে মূলত প্রতিষ্ঠানটির আয়ের পরিমাণ বাড়তে থাকবে।
ভ্যালু (Great Value), মার্কেট সাইড (Market Side), ইকুয়েট (Equate), কিরকল্যান্ড সিগনেচার এর মতো প্রতিষ্ঠানসহ ছোট-বড় অসংখ্য ই-কমার্স ব্যবসা গড়ে উঠেছে এই প্রাইভেট লেভেলিং বিজনেস মডেলকে ভিত্তি করে।
বর্তমানে ফুড এন্ড বেভারেজ, জামা-কাপড়, গ্রুমিং, পার্সনাল কেয়ার ইত্যাদি যাবতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে প্রাইভেট লেভেলিং ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য আপনার প্রয়োজন হবে অনেক বেশি পরিমাণ মূলধন এর। পাশাপাশি সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে তত্ত্বাবাধায়ন এবং সুশৃঙ্খলভাবে সমন্বয় করতে হবে। ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, প্রোডাকশন প্ল্যানিং, সাপ্লাই চেইন সহ বিভিন্ন দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এছাড়াও আপনাকে বিভিন্ন ব্রান্ডের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে এবং চুক্তিবদ্ধ হওয়ার জন্য তাঁদেরকে উৎসাহিত করতে হবে। তবে তাঁরও পূর্বে আপনার প্রস্তুতকৃত পণ্যটির গুণগত মান এবং ব্রান্ডের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে হবে।
হোয়াইট লেভেলিং বিজনেস মডেল (White Labeling Business Model)
প্রাইভেট লেভেলিং এবং হোয়াইট লেভেলিং কে আপাতদৃষ্টিতে একই ধরনের মনে হলেও এদের মধ্যে কিন্তু অনেক পার্থক্য রয়েছে। আমরা ইতোপূর্বেই জেনেছি যে, প্রাইভেট লেভেলিং এর ক্ষেত্রে আপনার প্রস্তুতকৃত পণ্যটি আপনি বিভিন্ন রিটেলার এর মাধ্যমে তাদের ব্রান্ডের অধীনে বিক্রয় করছেন। কিন্তু হোয়াইট লেভেলিং এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উলটো। এক্ষেত্রে কোনো ম্যানুফ্যাকচারার তাঁদের পণ্য প্রস্তুত করবে। অতঃপর আপনার ব্রান্ডের অধীনেই আপনার ব্রান্ডের নাম, স্লোগান যাবতীয় বিষয়াদি ব্যবহার করে পণ্যটি বিক্রয় করবে।
একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে জনপ্রিয় এবং সর্বজন সমাদৃত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ মূলধন, দীর্ঘ সময়, পর্যাপ্ত জনবল। অনেকক্ষেত্রে নিজস্ব একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট তৈরী থেকে শুরু করে প্ল্যাটফর্মটি বিকশিত করা কার্যত অনেক কঠিনতর বিষয় হয়ে যায়। কিন্তু হোয়াইট লেভেলিং মডেল ব্যবহারে ঐ সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাপারটি সহজতর হয়ে যায়। এক্ষেত্রে তাঁরা উপরোক্ত সব কিছুর সমন্বয়েই গ্রাহকদের কাছে পণ্য পৌছাতে পারবে আপনার প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে। এটার জন্য তাঁদের নিজেকে অতিরিক্ত খরচ কিংবা দায়িত্ব গ্রহণ কোনোটারই প্রয়োজন নেই।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ধরুন কেউ কোনো ঘড়ি বিক্রয় ভিত্তিক ব্যবসা করতে চায়। এক্ষেত্রে ঘড়ি বিক্রয় করতে হলে প্রথমত তাঁর একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইটের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি ই-কমার্স ওয়েবসাইটটি আবার বহুল প্রচলিতও হতে হবে। তা না হলে তো আর গ্রাহক পাবে নাহ। তাই এত সব দিক বিবেচনায় এনে শুরুর দিকে তাঁর পথচলাটা অবশ্যই মসৃণ হবে নাহ। পক্ষান্তরে সে যদি আপনার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সাথে হোয়াইট লেভেলিং পার্টনার প্রোগ্রামে চুক্তিবদ্ধ হয়, তাহলে আপনার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আপনার ব্রান্ডের অধীনে তাঁর পণ্যটি বিক্রয় করার সুযোগ পাচ্ছে সে। আর পণ্যটি সরবারহ সহ প্রায় সকল দায়িত্বই কিন্তু এক্ষেত্রে আপনার উপর বহাল। ফলে একদিনে তাঁর গ্রাহক সংখ্যাও অপ্রতুল হবে, আয়ের পরিমাণও বেশি হবে ঠিক তেমনি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির ক্ষেত্রে সে থাকতে পারবে নির্ঝঞ্জাট ভাবে।
আর এক্ষেত্রে আপনার ভূমিকা হচ্ছে আপনি বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারার এর পণ্যগুলো রিপ্যাকেজিং, ব্রান্ডিং, মার্কেটিং, বিক্রয় সহ সব দিক পর্যবেক্ষণ করা। এবং আপনার সুবিধা হচ্ছে আপনাকে ম্যানুফ্যাকচারিং এর খরচ বহন এবং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে নাহ, ফলে এখানে আপনার পণ্যের সংখ্যা হচ্ছে অপ্রতুল। এবং যত বেশি পণ্য বিক্রয় হচ্ছে তাঁর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ আপনিও পেয়ে যাচ্ছে। আর তাছাড়া আপনি বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে নতুন মার্কেটেও অনায়াসে প্রবেশ করতে পারবেন। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ওয়ালমার্ট (WallMart), আলীবাবা (Alibaba) । অন্যান্য মডেল গুলোর ন্যায় এই মডেল ব্যবহার করেও আপনি ফুডস এন্ড বেভারেজ, ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেট, কম্পিউটার সফটয়্যার সহ প্রায় সব পণ্যই বিক্রয় করতে পারবেন।
সাবস্ক্রিপশন মডেল (Subscription Model)
নেটফ্লিক্স, এমাজন প্রাইম, স্পটিফাই, এক্সবক্স গেম, প্লেস্টেশন সহ বিভিন্ন SAAS (Software As A Service) ভিত্তিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সাবস্ক্রিপশন মডেল ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকগুলো পণ্য বা সেবার সমন্বয় করে একটি পরিষেবা তৈরী করে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে উপস্থাপন করে। আর গ্রাহকরা এসব ভার্চুয়াল পণ্য বা পরিষেবা গুলো নির্দিষ্ট সাবস্ক্রিপশন ফি এর বিনিময়ে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে থাকে। তাঁরা তাদের খুশিমতো ঐ পরিষেবার অন্তর্গত যে কোনো সেবা ব্যবহার করতে পারে। সাবস্ক্রিপশন মডেল ব্যবহারের শুরুটা ষোড়শ শতাব্দীতে ম্যাগাজিন, বই, সংবাদপত্র প্রকাশনীর মাধ্যমে হলেও, বর্তমানে প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিভিন্ন ই-কমার্স ভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠায় এর ব্যবহার বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটালিস্ট ম্যাগাজিন এর তথ্য অনুযায়ী, সফটওয়্যার থেকে প্রাপ্ত রেভিনিউ এর ৫৩ শতাংশই আসে সাবস্ক্রিপশন মডেল এর মাধ্যমে।
আপনি যদি সাবস্ক্রিপশন মডেল ব্যবহার করে আপনার ই-কমার্স প্রতিষ্টানটি পরিচালনা করতে চান, তবে প্রথমেই আপনার সংগ্রহে গ্রাহক উপযোগী ভাল পণ্য বা সেবা রাখতে হবে। পাশাপাশি এই সেবা গুলো সমষ্টিবদ্ধ করে অনন্যভাবে গ্রাহকদের নিকট উপস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে এই পণ্য বা সেবা গুলো আপনি বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারার বা সেবাটি প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করতে পারেবেন। অতঃপর আপনার কাজ হবে পরিষেবাটি প্রাইসিং করা এবং যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা। তাছাড়াও মান্থলি রিকারিং ইনভয়েসিং, কাস্টমার ম্যানেজমেন্ট, ট্যান্স্যাকশন ম্যানেজমেন্ট এর মতো বিষয়গুলো অতি সতর্কতার সাথে সুশৃঙ্খলভাবে সাজাতে হবে।
এক্ষেত্রে গ্রাহকরা মূলত সাইনঅাপ এর মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিষেবাটি গ্রহণের জন্য সম্মতি জানাবে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই মাসিক বা বাৎসরিক ভিত্তিতেই চার্জ বা সাবস্ক্রিপশন ফি নিয়ে থাকে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানভেদে বিভিন্ন ধরনের সাবস্ক্রিপশন প্যাকেজ থাকে। আর এই নির্দিষ্ট সময় যদি শেষ হয়ে যায় তখন গ্রাহকরা চাইলে তাঁদের সাবস্ক্রিপশন টি আবার পুনঃনবায়ন করতে পারে, কিংবা বাতিল ও করে দিতে পারে। এই মডেল ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধাটি হলো একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গ্রাহক ধরে রাখা যায়। আর যেহেতু গ্রাহক একটু রেগুলার ব্যসিসে হয়ে থাকে, ফলে কি পরিমাণ পণ্যের যোগান লাগবে সেটিও বুঝা যায় আর আয়ের পরিমাণ সম্পর্কেও ধারণা রাখা সহজতর হয়। আর আয়ের পরিমাণও খুব একটা অস্বাভাবিকহারে ওঠা নামা করে নাহ, ফলে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনাটাও তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়।
উপসংহার
বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিশ্ববাজারের প্রেক্ষাপটে ই-কমার্স এর চাহিদা অনেক শীর্ষে। আর যার প্রভাব বাংলাদেশেও লক্ষ্যণীয়। তাই উল্লেখিত মডেল গুলো যাচাই-বাছাই বিশ্লেষণপূর্বক আপনার পণ্য বা সেবার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাজার উপযোগী বিজনেস মডেল টি নির্ধারণ করে আপনার অনলাইন শপ বা ই-কমার্স ব্যবসার মাধ্যমে সাফল্যের মুখ দেখতে পারেন আপনিও।
Next to read
সোশ্যাল ইম্প্যাথি ম্যাপিং (Social Empathy Mapping)


Needs, Wants, Demands (প্রয়োজন, চাওয়া এবং চাহিদা)

মোট মুনাফা (Gross profit) সংজ্ঞা, সূত্র এবং উদাহরণ

ইক্যুইটির সংজ্ঞা এবং অর্থ

ব্রান্ডিং (Branding)

বিক্রয়ের ১০টি ভুল যেগুলো প্রতিটি বিক্রয়কর্মীর এড়ানো উচিৎ

ব্যবসায়কি আইন কি? উদাহরণ সহ বিভিন্ন প্রকার ব্যবসায়কি আইন

ই-কমার্স: অনলাইন ব্যবসা

World Trade Organization (WTO) Agreements
