বাজেট কী?
বাজেট শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ ব্যুজেট বা Baguette থেকে যার বাংলা প্রতিশব্দ ব্যাগ বা থলে।
মূলত প্রাচীন কালে বাজেটের অর্থ ব্যাগে বা থলেতে করে নিয়ে আসা হতো তাই এই নামকরণ। বর্তমানে বাজেটের অর্থের পরিমাণ বিশাল অঙ্ক হবার কারণে, অর্থের পরিবর্তে বাজেটের সকল কাগজপত্র থলে বা ব্রিফকেসে করে নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশ এই প্রথা এখনও প্রচলিত রয়েছে, প্রতিবার বাজেট পেশ করার পূর্বে অর্থমন্ত্রী ব্রিফকেসে করে বাজেট সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংসদে প্রবেশ করেন।
বাজেটের আনুষ্ঠানিক রুপ ১৭৬০ সাল থেকে শুরু হলেও, পৃথিবীর প্রথম বাজেট ঘোষণা হয় গ্রেট ব্রিটেনে ১৭৩৩ সালে।
যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ ১৯৭২ সালের ৩০ শে জুনে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ শে জুন পর্যন্ত সময়কে একটি অর্থবছর ধরে বাজেট ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়,"বাজেটকে বার্ষিক আর্থিক বিবরণী বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।"
বাজেট শব্দটির সাথে মোটামুটি আমরা সকলেই পরিচিত। সংসার বা দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার জন্য আমাদের একটি বাজেট থাকে। তাছাড়া শপিং এর সময় আমরা একটি বাজেট করে থাকি এবং আমাদের সামর্থ্য অনুযায় তৈরিকৃত বাজেটের ভিতরেই আমরা কেনাকাটা করে থাকি।
ব্যক্তির বাজেট আর সরকারের বাজেটের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে ব্যক্তি প্রথমে আয় করে তারপর তারপর আয় অনুযায় ব্যয়ের খাত নির্ধারণ করে। কিন্তু সরকার প্রথমে ব্যয়ের খাত এবং পরিমাণ নির্ধারণ করে তারপর সেই অনুযায় আয় করার চেষ্টা করে থাকে।
কথায় আছে, "ব্যক্তি আয় বুঝে ব্যয় করে, কিন্তু সরকার ব্যয় বুঝে আয় করে।"
বাজেট তৈরির ধাপগুলো
বাজেট তৈরির ধাপগুলো আলোচনা করা হলো। যথা:-
১. বাজেট প্রণয়ন:
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যেমন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সহ সকল মন্ত্রণালয় তাদের প্রয়োজন অনুযায় একটি বাজেট তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিকট পেশ করে, অর্থ মন্ত্রণালয় সব কিছু দেখে একটি প্রস্তাবিত বাজেট তৈরি করে যাকে বাজেট প্রণয়ন বলে।
২. বাজেট অনুমোদন:
প্রতি বছর জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে অর্থ মন্ত্রী সংসদে একটি প্রস্তাবিত বাজেট সবার সামনে উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবিত বাজেটের আয়-ব্যয় সহ বিস্তারিত হিসেব বুঝে সরকার চুড়ান্ত বাজেট অনুমোদন দিয়ে থাকে।
৩. বাজেট বাস্তবায়ন:
সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বাজেট জুলাইয়ের ১ তারিখ হতে পরবর্তী বছরের ৩০ শে জুন পর্যন্ত যে প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হয়, তাকেই বাজেট বাস্তবায়ন বলে।
৪. বাজেট মূল্যায়ন:
একটি নির্দিষ্ট বছরের বাজেট প্রণয়ন করার পূর্বে পূর্ববর্তী বছরের বাজেটের আয়-ব্যয় সহ সকল বিষয় বিশ্লেষণ করে এবং ত্রুটি বিচ্যুতি উদঘাটন করাকেই বাজেট মূল্যায়ন বলে।
বাজেট প্রক্রিয়ার এই ৪ টি কার্যক্রম বা ধাপকে বলা হয় বাজেট চক্র।
বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়
সরকারের বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুটি হচ্ছে:-
১| রাজস্ব আয় এবং
২| রাজস্ব ব্যয়।
রাজস্ব আয়:
সরকারকে দেশ পরিচালনা করতে হয়, সরকারের কাজে নিয়োজিত তাদের বেতন দিতে হয়, সমাজকল্যানমূলক কাজ করতে হয়, জনগণের সুবিধার জন্য বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন মূলক কাজ করতে হয়। এই সব কাজের ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়, এই অর্থ সরকার বেশ কয়েক ধরনের উৎস থেকে সংগ্রহ করে তাকেই সরকারের আয় বলে। একটি রাষ্ট্রের সরকারের বেশকিছু আয়ের উৎস রয়েছে।
এসব আয়ের উৎসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
১. প্রত্যক্ষ কর,
২. পরোক্ষ কর এবং
৩. করবহির্ভূত আয়।
১. প্রত্যক্ষ কর:
প্রত্যক্ষ করের মধ্যে আছে ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আয়কর বা করপোরেট কর, দান কর, উত্তরাধিকার কর, যানবাহন কর, মাদক শুল্ক, ভুমি রাজস্ব ইত্যাদি।
২. পরোক্ষ কর:
পরোক্ষ কর হচ্ছে আমদানি কর, আবগারি শুল্ক, ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর, সম্পূরক শুল্ক ইত্যাদি।
৩. কর বহির্ভূত আয়:
কর ছাড়া রাষ্ট্রের আরও কিছু আয় রয়েছে। যেমন- বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ, সুদ, সাধারণ প্রশাসন থেকে আয়, ডাক-তার-টেলিফোন থেকে আয়, পরিবহন আয়, জরিমানা ও দণ্ড থেকে আয়, ভাড়া, ইজারা, টোল ও লেভি থেকে আয় ইত্যাদিই কর বহির্ভূত আয়।
সরকারের আয়ের খাত
সরকারের আয়ের খাতগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. ব্যক্তির বার্ষিক আয় ২.৫ লক্ষ টাকার উপরে হলে সরকারকে আয়কর প্রদান করতে হয়। তবে নারী এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তির এই সীমা বছরের ৩ লক্ষ টাকা, প্রতিবন্ধী কর দাতার ক্ষেত্রে এই সীমা ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা। আর গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার এই সীমা ৪ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা।
২. আমদানি শুল্ক বা কর একটি পরোক্ষ কর। এটি দেশে আমদানি করা পণ্যের উপর ধার্য করা হয়। আমদানি শুল্ক ২ ভাবে আদায় করা হয়: ১/ মূল ভিত্তিক শুল্ক। ২/ পণ্যের পরিমাণ ভিত্তিক শুল্ক। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৬৫১ কোটি টাকার বেশি সরকার আমদানি শুল্কের মাধ্যমে আয় করেছে।
৩. আবগরী শুল্ক এটিও একটি পরোক্ষ কর। বর্তমানে দুটি ক্ষেত্রে এই শুল্ক ধার্য করা হয় ১/ ব্যক্তি সঞ্চয়ী হিসাবে এবং ২/ অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানের প্রতিটি টিকেটের উপর। ২১-২২ অর্থবছরে সরকার এই খাত থেকে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা আয় করেছে।
৪. সম্পত্তি কর একটি প্রত্যক্ষ কর। এটি সরকারের আয়ের একটি প্রাচীন উৎস। ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা সম্পত্তির উপর ধার্যকৃত করই হচ্ছে সম্পত্তি কর। এর ভিতরে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা অর্থ, স্থাবর সম্পত্তি, বীমা পরিকল্পনা, কর্পোরেশন নয় এমন ব্যবসার মালিকানা, ২৫ বিগার বেশি সম্পত্তি।
৫. নিবন্ধন বা স্ট্যাম্প বিক্রির মাধ্যমে আয়। জমি, বাড়ি, যানবাহন এবং অন্যান্য সম্পত্তির দলিল করতে নিবন্ধন করতে হয়। জমির দলিল, পাসপোর্ট, মামলা-মোকাদ্দমা অর্থাৎ যেসব ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ব্যবহৃত হয়, সেখানে স্ট্যাম্প বিক্রির মাধ্যমে সরকার আয় করে থাকে।
৬. দামি গাড়ি, বিলাসবহুল পণ্য আমদানি এর ক্ষেত্রে যে কর ধার্য করা হয় তাকে সম্পূরক শুল্ক বা কর বলে। ২১-২২ অর্থবছরে সরকার আমদানি পর্যায়ে এই খাত থেকে ৭ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা স্থানীয় পর্যায়ে ২৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা আয় করে।
৭. বিদেশে ভ্রমণ করার ক্ষেত্রে সরকার যে কর ধার্য করে তাকে ভ্রমণ কর বলে। ২১-২২ অর্থবছরে সরকার এই খাত থেকে ৬৬৯ কোটি টাকা আয় করে।
রাজস্ব ব্যয়
সরকার এবং দেশ পরিচালনায় সরকারের যে ব্যয় হয়, তাকেই রাজস্ব ব্যয় বলে। যেমন:- সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার খরচ, প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা, কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রদান, সামাজিক কর্মসূচি পরিচালনা ইত্যাদি।
বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো "উন্নয়ন বাজেট"। যে বাজেটে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের হিসাব দেখানো হয়, তাকেই উন্নয়ন বাজেট বা মূলধনী বাজেট বলা হয়।
সরকারের যে অর্থ আয় হয় তা দিয়ে দেশ পরিচালনায় যত ধরনের ব্যয় আছে তা পূরণ করার পর বাকি অর্থ দিয়ে সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে।
বড় বড় উন্নয়মূলক মেগা প্রজেক্ট গুলো স্থাপনের জন্য বরাদ্দ রাখা অর্থই উন্নয়ন বাজেট। এই অর্থ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
বাজেটের দুটি প্রকারভেদ
একটি দেশের বাজেট ভালো না খারাপ হয়েছে তা জানতে হলে বাজেটের দুটি প্রকারভেদ সম্পর্কে জানতে হবে।
সেগুলো হলো:-
১| সুষম বাজেট।
২| অসম বাজেট।
১. সুষম বাজেট:
সুষম বাজেট হলো যখন আয়-ব্যয় সমান সমান হয়। অর্থাৎ সরকার যত টাকা ব্যয় করবে তা আয় করার সম্ভাব্য খাত নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। উন্নত রাষ্ট্র যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ইত্যাদি সুষম বাজেট প্রণয়ন করে থাকে। সুষম বাজেট শক্তিশালী এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতির বহিঃপ্রকাশ।
২. অসম বাজেট:
অসম বাজেট হচ্ছে যখন আয়-ব্যয়ের কোন সামঞ্জস্য বা মিল থাকে না, ঐ পর্যায় কে বুঝায়। অসম বাজেট ২ প্রকার যথা:-
১. উদ্বৃত্ত বাজেট।
২. ঘাটতি বাজেট।
১. উদ্বৃত্ত বাজেট:
ব্যয়ের তুলনায় আয় বেশি হলে তাকে উদ্বৃত্ত বাজেট বলা হয়। সাধারণত উন্নত দেশ গুলোতে এই ধরনের বাজেট লক্ষ করা যায়, উন্নত দেশে মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের কোন ব্যয় থাকে না বলে তাদের ব্যয়ের খাত কম ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। তাছাড়া সেই সব দেশগুলোর আয়ের পরিমাণ এবং খাত বেশি হবার কারণে ব্যয়ের তুলনায় আয় বেশি হয়ে থাকে বা উদ্বৃত্ত বাজেট দেখা যায়।
২. ঘাটতি বাজেট:
ব্যয় বেশি এবং আয় কম হলে বা ব্যয়ের তুলনায় আয় কম হলে তাকে ঘাটতি বাজেট বলা হয়। উন্নত নয় বা উন্নয়নশীল দেশ গুলোতে ঘাটতি বাজেট দেখা যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে উন্নত নয় এরকম দেশ গুলোতে ঘাটতি বাজেট ভালো। এতে করে সকলের মাঝে অর্থনীতি ভালো করার উদ্দীপনা থাকে, অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার কাজ করে এবং ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে।
তবে অতিরিক্ত ঘাটতি কোন দেশের জন্যই ভালো নয়। সাধারণত একটি দেশের জিডিপি এর চেয়ে সর্ব্বোচ ৫% বেশি ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করা যেতে পারে। সাধারণত বাংলাদেশে ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করা হয়ে থাকে।
এই ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার বৈদেশিক ঋণ, দেশে অবস্থিত ব্যাংক থেকে লোন এবং সঞ্চয় পত্র বিক্রির মাধ্যমে সংগ্রহ করে থাকে।
বাংলাদেশের ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট
চলুন সংক্ষিপ্ত আকারে বাংলাদেশের ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে জেনে আসি।
২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম দেয়া হয়েছে,"কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিক প্রত্যাবর্তন।" এটি বাংলাদেশের ৫১ তম বাজেট।
২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বাজেটের পরিমাণ ৬ লক্ষ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। তার মানে এই অর্থবছরে সরকার ব্যয় করবে ৬ লক্ষ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। এই ব্যয় পূরণে সরকার আয় করতে সক্ষম হবে ৪ লক্ষ ৩৬ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। যেখানে প্রত্যক্ষ কর বা এনবিআর এর মাধ্যমে আয় হবে ৮৫%, পরোক্ষ কর হতে আয় হবে ৪%, কর বহির্ভূত আয় হবে ১০% আর বৈদেশিক অনুদান ১%।
আর ঘাটতি হচ্ছে ২ লক্ষ ৪১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকার বৈদেশিক ঋণ নিবে মোট ঘাটতি টাকার ৩৯%, দেশের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিবে ৪৪% এবং ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ নিবে ১৭%।
এই বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭.৫% এবং মুদ্রাস্ফীতি ৫.৬%।
উপসংহার
বাজেট একটি দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যতটুকু সম্ভব ঘাটতি কমিয়ে জনগণ বান্ধব বাজেট সকলের জন্যই মঙ্গলজনক। আশাকরি বাংলাদেশ একদিন অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী হবে এবং ঘাটতি বিহীন বাজেট তৈরি করতে সক্ষম হবে।









