GeoRenus Editorial Team

আমরা যখন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, তখন অনেকগুলো ভালো অপশন থেকে সর্বোত্তম টা গ্রহণ করি, যার ফলে দ্বিতীয় সর্বোত্তম অপশনটি আমরা ছেড়ে দেই, যাকে সুযোগ ব্যয় বা Opportunity Cost বলে। একটি জিনিস পাওয়ার জন্য যে সর্বোত্তম বিকল্পটি হারাতে হয়, তাকেই সুযোগ ব্যয় বলে।
অন্যভাবে বললে, একটি দ্রব্যের অতিরিক্ত উৎপাদন পাওয়ার জন্য অপর একটি দ্রব্যের যে অংশ ত্যাগ করতে হয়, সেই ত্যাগকৃত অংশকেই সুযোগ ব্যয় বলে।
অর্থনীতির ভাষায়, আমাদের ( মানুষদের ) ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা অনেক কিন্তু তা পূরণ করার জন্য রির্সোস বা সম্পদ সীমিত। তাই আমরা চাইলেও প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করতে পারব না, আমাদের চয়েস করতে হয় বা অনেকগুলো অপশন থেকে সর্বোত্তম টা বাছাই করতে হয়। আর যখনই বাছাই করার কথা আসে, তখনই সুযোগ ব্যয় আসবে।
সাধারণত সম্পদের দুষ্প্রাপ্যতা এবং অভাবের নির্বাচন থেকেই সুযোগ ব্যয় ধারণাটির উদ্ভব হয়।
যেমন ধরুন আপনার কাছে ১ লক্ষ টাকা আছে। যা আপনি আপনার একটি ব্যবসায়ী বন্ধুর ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে মাসে ২৫০০ টাকা লভ্যাংশ পাবেন, অপরদিকে আপনি ঝুঁকি না নিয়ে এই টাকা ব্যাংকে রাখলে মাসে ১৮০০ টাকা সুদ পাওয়ার মাধ্যমে আয় করতে পারবেন। আপনি এখানে ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে ব্যাংকে টাকা রাখতে পারবেন না, তাহলে ব্যাংকে টাকা রাখার সুযোগটি ছাড়তে হচ্ছে, যা আপনার জন্য একটি সুযোগ ব্যয়।
নির্দিষ্ট হারে কোন দ্রব্যের অতিরিক্ত একক উৎপাদনের জন্য অপর দ্রব্যের ক্রমান্বয়ে বেশি পরিমাণ ত্যাগ করা হলে, তাকে প্রথম দ্রব্যটির ক্রমবর্ধমান সুযোগ ব্যয় বলে। অর্থাৎ একটি দ্রব্যের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে অপর দ্রব্যের উৎপাদন বেশি পরিমাণ ত্যাগ করাকে বুঝায়। যেমন: নাবিল ফুডস প্রথম মাসে ৫০০ একক বিস্কুট বেশি উৎপাদনের কারণে ২০০ একক চিপস কম উৎপাদন করে, দ্বিতীয় মাসে ৭০০ একক বিস্কুট বেশি উৎপাদনের কারণে ৫০০ একক চিপস কম উৎপাদন করে, তৃতীয় মাসে ১০০০ একক বিস্কুট বেশি উৎপাদনের কারণে ১২০০ একক চিপস কম উৎপাদন করে, এইযে এখানে একটি দ্রব্যের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে অপর দ্রব্যটি ক্রমান্বয়ে বেশি ত্যাগ করতে হচ্ছে, এটিই ক্রমবর্ধমান সুযোগ ব্যয়।
নির্দিষ্ট হারে কোন দ্রব্যের অতিরিক্ত একক উৎপাদনের জন্য, অপর দ্রব্যটি ক্রমান্বয়ে কম পরিমাণ ত্যাগ করা হলে, তাকে প্রথম দ্রব্যটির ক্রমহ্রাসমান সুযোগ ব্যয় বলে। এটি ক্রমবর্ধমান সুযোগ ব্যয়ের বিপরীত। উপরের উদাহরণের নাবিল ফুডস প্রথম মাসে ৫০০ একক বিস্কুট বেশি উৎপাদনের জন্য ১২০০ একক চিপস কম উৎপাদন করে, দ্বিতীয় মাসে ৭০০ একক বিস্কুট বেশি উৎপাদনের জন্য ৫০০ একক চিপস কম উৎপাদন করে, তৃতীয় মাসে ১০০০ একক বিস্কুট বেশি উৎপাদনের জন্য ২০০ একক চিপস কম উৎপাদন করে, এখানে ক্রমহ্রাসমান সুযোগ ব্যয়ের সৃষ্টি হবে।
নির্দিষ্ট হারে কোন দ্রব্যের অতিরিক্ত একক উৎপাদনের জন্য, অপর দ্রব্যটি একই পরিমাণ ত্যাগ করা হলে, তাকে প্রথম দ্রব্যটির স্থির সুযোগ ব্যয় বলে। অর্থাৎ একটি দ্রব্য যে পরিমাণ বেশি উৎপাদন করা হবে, অপর দ্রব্যটি ঠিক সেই পরিমাণ কম উৎপাদন করা হবে বা সেই পরিমাণ ত্যাগ করা হবে। যেমন: কৃষক নজরুল মিশ্র চাষ পদ্ধতিতে ফসল চাষ করে থাকে। গত বছর ১০ মণ ধান বেশি চাষ করার কারণে, ভুট্টার চাষ ১০ মণ কম করতে হয়েছে। এই বছর নজরুল ৫ একর জমিতে আখ বেশি চাষ করে, ফলে অপরদিকে পাট চাষ ৫ একর কম জমিতে করতে হয়েছে, এটাই হচ্ছে স্থির সুযোগ ব্যয়।
সুযোগ ব্যয় হিসেবে করার ফর্মুলাটি হচ্ছে।
সুযোগ ব্যয় বা OC (Opportunity Cost) = FO - CO.
যেখানে, FO মানে Return on best Forgone Option (ত্যাগকৃত অপশন হতে লাভ), CO মানে Return on Chosen Option (বাছাইকৃত অপশন হতে লাভ)।
যেমন ধরুন আপনার কাছে কিছু টাকা আছে যা আপনি বিনিয়োগ করে আয় করতে চান। আপনার কাছে দুটি অপশন রয়েছে।
যথা:
অগ্রাধিকার শেয়ারে বিনিয়োগ করলে আপনি ১০% হারে রিটার্ন পাবেন, আবার অন্যদিকে সরকারি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে আপনি ১২% হারে রিটার্ন পাবেন। সুতরাং এখানে আপনি যদি সরকারি সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ না করে অগ্রাধিকার শেয়ারে বিনিয়োগ করেন, তাহলে সরকারি সঞ্চয়পত্রের সুযোগ ব্যয় হবে ( ১২% - ১০% ) = ২%। সুতরাং বলা যায়, এখানে সরকারি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করাটাই লাভবান সিদ্ধান্ত হবে।
বিনিয়োগ করার পর তা হতে আয় এর হার হিসেব করার ফর্মুলাটি হচ্ছে।
রিটার্ন অন রেভেনিউ (RoR) = [( বর্তমান মূল্য - প্রাথমিক মূল্য) ÷ বর্তমান মূল্য × ১০০]
ধরুন গত বছর ব্যাংকে আপনি ১০,০০০ টাকা রেখেছেন, যা এই বছর ১১০০০ টাকা হয়েছে। তাহলে এখানে [( ১১০০০ - ১০০০০) ÷ ১১০০০ × ১০০] আপনার রিটার্ন অন রেভেনিউ হচ্ছে ৯%।
সুযোগ ব্যয় ব্যবসায় এবং অর্থনীতির দুনিয়ায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অর্থনৈতিক গুরুত্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুযোগ ব্যয় অনেক প্রয়োজনীয়। সুযোগ ব্যয় আমাদের অনেকগুলো অর্থনৈতিক প্রকল্প বা অপশন থেকে সবচেয়ে লাভজনকটা বাছাই করতে সাহায্য করে। সুযোগ ব্যয়ের মাধ্যমে আমরা হিসাবে-নিকাশ করে লাভজনক প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতে পারি, যার ফলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারি।
বিভিন্ন পক্ষের ক্ষেত্রে সুযোগ ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা
একজন ব্যবসায়ী তার প্রচলিত ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে, নতুন কোন ব্যবসায় শুরু করবে নাকি অন্য কোন লাভজনক ব্যবসা বিনিয়োগ করবে এই সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সুযোগ ব্যয় অনেক অবদান রাখে। তাছাড়া কোন পণ্যটি বেশি উৎপাদন করবে, কোন পণ্যটি কম উৎপাদন করবে তা সুযোগ ব্যয়ের মাধ্যমে বুঝা যায়।
ভালো বেতন এবং সুযোগ সুবিধা পেতে হলে একজন চাকরি প্রার্থীকে বিভিন্ন যোগ্যতা এবং দক্ষতার পাশাপাশি সর্বোত্তম চাকরির অপশনটি বাছাইয়েও দক্ষ হতে হয়, এক্ষেত্রে সুযোগ ব্যয় অনেক গুরুত্ব বহন করে। সুযোগ ব্যয়ের মাধ্যমেই বুঝা যায় কোন চাকরিটি উত্তম এবং সুবিধাজনক একজন চাকরি প্রার্থীর জন্য।
একজন বিনিয়োগকারী তার টাকা একটি প্রচলিত লাভজনক ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে, স্টার্টআপে বিনিয়োগ করবে, রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করবে নাকি শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করবে ইত্যাদি সিদ্ধান্তগুলো সুযোগ ব্যয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে।
মানুষকে প্রতিদিন কত শত অর্থনৈতিক এবং অর্থনীতি ব্যাতীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়, এইসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেকগুলো অপশন থেকে সবচেয়ে ভালো অপশনটি বেছে নিতে সুযোগ ব্যয় অনেক সাহায্য করে।
প্রথমে বুঝতে হবে আপনাকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কেন সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সিদ্ধান্তটি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু।
যেমন ধরুন রফিক সাহেবের নিকট ২০ লক্ষ টাকা আছে। তিনি এই টাকা ব্যবহার করে কিভাবে আয় করা যায় সে বিষয়ে সিধান্ত নিতে চাচ্ছেন।
সিদ্ধান্ত যেন সঠিক হয় তার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সঠিক তথ্য জানা।
উপরের উদাহরণের রফিক সাহেবকে জানতে হবে এই টাকা দিয়ে কীভাবে আয় বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তিনি যদি চিন্তা করেন ২০ লক্ষ টাকা দিয়ে বারিধারায় একটি ১০ তলা বিল্ডিং তৈরি করে ভাড়া দিয়ে আয় করবেন, এটা সম্ভব নয়। কারণ এই টাকায় বারিধারায় একটি ফ্লাট ও কিনতে পাওয়া যাবে না বিল্ডিং তৈরি তো দূরে থাক।
যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ের বিভিন্ন বিকল্প সম্পর্কে জানতে হবে। যেমন আমাদের উদাহরণের রফিক সাহেব তার ২০ লক্ষ টাকা ব্যবহার করে আয় করার জন্য বেশ কয়েকটি বিকল্প চিহ্নিত করতে পারে। যথা:
কোন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে আয় করতে পারে, ব্যাংকে ডিপোজিট করে আয় করতে পারে, শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করে বা সরকারি সঞ্চয়পত্র কিনে আয় করতে পারে, জমি ক্রয়-বিক্রয় করেও আয় করতে পারে।
অনেক সময় অনেকগুলো বিকল্প আমাদের সামনে চলে আসে। একগাদা বিকল্প গ্রহণ করার ইচ্ছা জাগে। তখন প্রায়োরিটি সেট করতে হয়। আর সেটা ঠিক করতে হয় নিজেদের ভালোলাগা, প্রয়োজন, ইচ্ছা এসবের উপর নির্ভর করে। এবার প্রায়োরিটি ঠিক করার পালা। উদাহরণের রফিক সাহেব তার ইচ্ছা, বিনিয়োগের পরিবর্তে লভ্যাংশের পরিমাণ, ঝুঁকি, বিনিয়োগের টাকা বৃদ্ধির পরিমাণ ইত্যাদি বিষয়গুলো মাথায় রেখে তাকে প্রায়োরিটি সেট করতে হবে।
বিকল্পগুলোকে কাটছাঁট করে ছোট একটা লিস্টে আনার পর এবার হিসাব-নিকেশ করতে হবে। যেটাতে লাভ বেশি সেটা স্যাক্রিফাইস করলে বোকামি হবে। অনেকগুলো ভালো অপশন থেকে সর্বোত্তম টা কীভাবে বাছাই করব?
ঠিক এখানেই অপরচুনিটি কস্ট বা সুযোগ ব্যয় তার কুলনেসটা দেখায়। ইমপ্লিসিট কস্ট বা ইন্ডিরেক্ট কস্ট হিসেবে এর ক্ষেত্রে সুযোগ ব্যয়ের অবদানের জুড়ি নেই। রফিক সাহেব এই পর্যায়ে বিনিয়োগের অপশনগুলো হিসেবে করবে যে কোনটিতে আয় বেশি হবে, ঝুঁকি কম হবে, ভবিষ্যতে ভালো কিছু করার সুযোগ রয়েছে এবং কোন ক্ষেত্রটির ভবিষ্যত সম্ভাবনা ভালো রয়েছে ইত্যাদি বিষয়গুলো হিসাব-নিকাশ করতে হবে।
সর্বশেষ ধাপ। বেস্ট বিকল্পটি বেছে নেওয়া। উপরের ৫ টি ধাপ আমাদের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। এ পর্যায়ে আমরা জাস্ট সর্বোত্তম বিকল্পটি বেছে নিব। আমাদের রফিক সাহেব এই পর্যায়ে তার জন্য যে বিনিয়োগ ক্ষেত্রটি সর্বোত্তম সেখানে বিনিয়োগ করবেন।
এই ধাপগুলো অনুসরন করে আমরা সুযোগ ব্যয়ের মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে পারি।
সুযোগ ব্যয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সুযোগ ব্যয়ের প্রক্রিয়াগুলো ভালোভাবে অনুসরন করা প্রয়োজন। তাছাড়া সুযোগ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কম সময় এবং অর্থ খরচে যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি বেনিফিট পাওয়া যাবে, সেটিই গ্রহণ করা উচিত।

প্রতিটি উদ্যোক্তাই চায় তার পণ্য বা সেবা বাজারে আনার আগে সেটাকে একদম নিখুঁত করে তুলতে। কিন্তু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর সময় আর অর্থ ব্যয় করে একটা পণ্য পুরোপুরি তৈরি করার পর যদি দেখা যায় বাজারে তার কোনো চাহিদাই নেই — এটা একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। মূলত এই সমস্যার সমাধান দিতেই তৈরি হয়েছে মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট বা এমভিপি কৌশল। পুরো পণ্য একসাথে না বানিয়ে শুধু সবচেয়ে জরুরি ফিচারগুলো নিয়ে বাজারে আসুন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সত্যিকারের মতামত নিন এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে পণ্য উন্নত করুন। বাংলাদেশের পাঠাও, বিশ্বের উবার এবং ড্রপবক্স — এরা সবাই এই একই পথ ধরে এগিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।








