ট্যাক্সেশন সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য, গুরুত্ব এবং প্রকারভেদ

258
article image

ট্যাক্সেশন শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে করারোপণ বা করারোপ। এককথায় করবিধি হচ্ছে ট্যাক্সেশন। ট্যাক্সেশন শব্দটি ট্যাক্স শব্দের বিশেষ্য বা ক্রিয়া রূপ। ট্যাক্স শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'ট্যাক্সো' থেকে যার অর্থ হল একটি আজ্ঞাধীন আর্থিক মূল্য যা করদাতা একক কিংবা অন্যান্য আইনগত সত্তা'র উপর সরকার বা সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আরোপিত হয়েছে সর্বসাধারণের বিভিন্ন ব্যয়ের তহবিল গঠনের জন্য।সহজ কথায় ট্যাক্সেশন হলো ট্যাক্স ধার্য করা।রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকার জনসাধারণের নিকট হতে বাধ্যতামূলকভাবে যে অর্থ আদায় করে তাকে ট্যাক্স বা কর বলে।আর এই ট্যাক্স ধার্য করা,আদায় করা সম্পূর্ণ কাজটাই হচ্ছে ট্যাক্সেশন।

Key Points

  • ট্যাক্সেশন হচ্ছে দেশের সরকারের রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনা সচল রাখার প্রয়োজনে যখন দেশের নাগরিক এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান থেকে একটি রাজস্ব আদায় করা হয়।
  • ট্যাক্সেশনের মাধ্যমে জমাকৃত ট্যাক্স এর অর্থ থেকে ট্যাক্স প্রদানকারী ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান কে প্রত্যক্ষ কোন বিনিময় সুবিধা দেওয়া হয় না।
  • সম্পত্তি এবং লেনদেন, যেমন স্টক বিক্রয়, বা একটি বাড়ির উপর ট্যাক্স হয়।
  • করের প্রকারের মধ্যে আয়, কর্পোরেট, মূলধন লাভ, সম্পত্তি, উত্তরাধিকার এবং বিক্রয় অন্তর্ভুক্ত।

ট্যাক্সেশন সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য, গুরুত্ব এবং প্রকারভেদ

কোনোরূপ প্রত্যক্ষ সুবিধার আশা না করে সরকার কর্তৃক ধার্যকৃত যে অর্থ জনগণ বাধ্যতামূলকভাবে পরিশোধ করে তাকে ট্যাক্স বা কর বলে।আর ট্যাক্স এর মূল্য ধার্য করা থেকে তা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা করার কাজই হচ্ছে ট্যাক্সেশন বা করবিধি।ট্যাক্সেশনের কাজের মাধ্যমে সরকার রাষ্ট্রপরিচালনার ব্যয় নির্বাহের জন্য জনসাধারনের নিকট থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ট্যাক্স বা করের অর্থ আদায় করে থাকে।

ট্যাক্সেশনের উদ্দেশ্যঃ

১. রাজস্ব সংগ্রহঃ

রাজস্ব সংগ্রহ করাই টেক্সেশনের মূল উদ্দেশ্য। সরকার প্রতিবছর বাজেটের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে কি পরিমান রাজস্ব কোন কোন খাত হতে সংগৃহীত হবে।দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা,বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী কাজে প্রচুর অর্থ প্রয়োজন।আর এই প্রয়োজনীয় অর্থের সিংহভাগ আসে ট্যাক্সেশন থেকে।

২. কাম্য উৎপাদন বজায় রাখাঃ

একটি দেশের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী যাতে বিদেশি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন না হয় সে দিকে খেয়াল রাখে সরকার।যদি বিদেশি কোন পণ্য সস্তায় দেশের অভ্যন্তরে সহজলভ্য হয় তবে দেশীয় শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।তাই দেশীয় শিল্পকে রক্ষার জন্য প্রতিযোগি দ্রব্যের আমদানির উপর উচ্চ হারে ট্যাক্স বা কর আরোপ করা হয়।ফলে দেশের অভ্যন্তরের আমদানিকৃত দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যায় এবং দেশীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়।এভাবে উৎপাদন কাম্য স্তরে রাখা যায়।

৩. ক্ষতিকারক দ্রব্যের ভোগ নিয়ন্ত্রণঃ

সরকার বিভিন্ন ক্ষতিকারক দ্রব্য যেমন মদ,আফিম,বিয়ার ইত্যাদির উপর উচ্চ হারে ট্যাক্স বা কর আরোপ করে এগুলোর ব্যবহার নিরুৎসাহিত তথা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

৪. আয়ের সুষম বন্টনঃ

ট্যাক্স বা কর হচ্ছে সরকারের রাজস্বনীতির অন্যতম হাতিয়ার।এর মাধ্যমে দেশে বিরাজমান আয় বৈষম্য দূর করা সম্ভব। ধনীদের উপর উচ্চ হারে কর আরোপ করে এই বৈষম্য দূর করা যায়।

৫. দামস্তরের স্থিতিশীলতা রক্ষাঃ

অর্থনীতিতে বানিজ্য চক্রের ফলে অনেক সময় মন্দা দেখা দেয়।তখন পণ্যের মূল্য পরিবর্তিত হলে সরকার প্রয়োজনে ভর্তূকি প্রদান ও ট্যাক্স বা কর আরোপ করে দ্রব্যের দাম পুনরায় ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনতে পারে।

৬. অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়নঃ

সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সরকার সঠিক কর নীতি তথা রাজস্ব নীতি প্রয়োগ করে সুষ্ঠু পরিকল্পনা করতে পারে যার ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।

ট্যাক্সেশনের গুরুত্বঃ

প্রতিটি দেশের ট্যাক্সেশন বা করবিধি সেই দেশের অর্থনীতির অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকার এই ট্যাক্স বা করের অর্থ জনসাধরনের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যয় করে থাকে। এছাড়া দেশের অবকাঠামো নির্মাণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিনির্মাণেও ট্যাক্সেশন বা করবিধি প্রধান ভূমিকা রাখে। সরকার সাধারণত একজন ব্যক্তি এবং কর্পোরেট বাসিন্দা ও প্রতিষ্ঠান থেকে ট্যাক্স বা কর আদায় করে থাকে। দেশভেদে করের নিয়ম ভিন্ন হয়।দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে, নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে, এবং বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয়ের জন্য ট্যাক্সেশন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রাখে। ট্যাক্সেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সরকার প্রয়োজনীয় জনসেবা প্রদানের জন্য সম্পদ বাড়ানো। স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল এবং সামাজিক পরিসেবার মতো বিশ্বব্যাপী কার্যকরী সমাজের জন্য মৌলিক অনেক কিছুর জন্য দেশের অর্থনীতিতে ট্যাক্সেশন গুরুত্বপূর্ণ অপরিসীম।

বাংলাদেশে ট্যাক্সেশনের প্রকারভেদঃ

বাংলাদেশে প্রধানত দুই প্রকারের করবিধি বিদ্যামান। একটি প্রত্যক্ষ কর, অপরটি পরোক্ষ কর।

ক. প্রত্যক্ষ কর (Direct Tax):

প্রত্যক্ষ কর হল এমন একটি কর যা একজন ব্যক্তি বা সংস্থার ওপর সরাসরি আইন দ্বারা আরোপ করা হয়। প্রত্যক্ষ করের উদাহরণ হল আয়কর, সম্পত্তি কর ইত্যাদি।প্রত্যক্ষ কর হলো একটি দেশের নাগরিকের আয় ও সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট হারে আদায়কৃত সরকারি রাজস্ব।প্রত্যক্ষ কর মূলত অর্থ প্রদানের ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে আরোপিত হয়। সাধারণ বাংলাদেশে একজন ব্যক্তি তার অর্জিত আয়ের ওপর কর প্রদান করতে হয়। অর্থ আইন ২০১৫ অনুসারে, একজন ব্যক্তির বার্ষিক আয় যদি ৩ লক্ষের অধিক হয় তবে, তিনি আয়কর প্রদানের উপযুক্ত হবেন।

ক. প্রত্যক্ষকর প্রকারভেদঃ

আয়কর:

সরকার ব্যক্তি এবং ব্যবসায় সহ তাদের এখতিয়ারের মধ্যে সমস্ত সংস্থার দ্বারা উত্পন্ন আর্থিক আয়ের উপর আয়কর আরোপ করে।প্রত্যক্ষ করের প্রায় ৮৭.৫% আসে আয়কর থেকে।

সম্পত্তি কর:

একটি সম্পত্তি কর একটি স্থানীয় সরকার দ্বারা অ্যাসেস এবং একটি সম্পত্তির মালিক দ্বারা প্রদান করা হয়। এই কর সম্পত্তি এবং জমির মূল্যের উপর ভিত্তি করে গণনা করা হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর আদায় করেছে। উদাহরণস্বরূপ- সম্পদ কর। সম্পদ কর ১৯৬৩ মোতাবেক ১৯৯৮-৯৯ করবর্ষ পর্যন্ত পরবর্তীকালে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ মোতাবেক আয়করের অংশ হিসেবে সারচার্য (অধিভার) ২০০১-০২ পর্যন্ত বলবৎ ছিল।

দান করঃ

১৯৬৩ সাল থেকে (১৯৮৫-৮৬ থেকে ১৯৮৯-৯০ সাল পর্যন্ত বাদে) আয়কর কর্তৃপক্ষ দান কর আদায় করছে। এ কর বর্তমানে দান কর আইন ১৯৯০-এর অধীনে দাতা কর্তৃক প্রদেয়। তবে করযোগ্য দান শুধু দেশিয় সম্পদের মাধ্যমে হতে হবে এবং স্বামী-স্ত্রী, রক্তের সম্পর্কের পারিবারিক সদস্য ও নির্ভরশীল আত্মীয়, সরকার স্বীকৃত শিক্ষা, ধর্মীয়, দাতব্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং আরও কিছু নির্ধারিত ব্যক্তিকে দান করা হলে তা করযোগ্য নয়। আয়করের মতো, করযোগ্য দানের ক্ষেত্রেও একটি ক্রমবর্ধমান স্তরবিশিষ্ট করহার প্রযোজ্য, যা হলো করযোগ্য দানের প্রথম ৫ লক্ষ টাকার ওপর ৫%, পরবর্তী ১০ লক্ষ টাকার ১০%, পরবর্তী ২০ লক্ষ টাকার ১৫% এবং পরবর্তী অবশিষ্ট করযোগ্য দানের ওপর ২০%।

নন-জুডিশিয়াল করঃ

হস্তান্তরিত সম্পত্তির মূল্যের ওপর প্রযোজ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর হলো নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, যা ১৮৯৯ সালের স্ট্যাম্প আইনের মাধ্যমে আরোপ করা হয়। বর্তমানে প্রচলিত নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক ১৯৯৮ সালের অর্থ আইনের প্রথম তফশিলে প্রদত্ত হার মোতাবেক আরোপ করা হয়। এ হার বর্তমানে সর্বনিম্ন ৪ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা এবং মূল্যভিত্তিক হার হিসেবে প্রতিদান মূল্যের ০.০৭% থেকে ১.৫%। জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বর্তমানে আদালত ফি আইন ১৮৭০ অনুসারে ধার্য করা হয়, যদিও আদালত ফি আরোপ প্রক্রিয়াটি প্রবর্তিত হয়েছে ১৭৯৫ সনের বঙ্গীয় প্রবিধান নং ৩৮ জারির মাধ্যমে।

ভূমি উন্নয়ন করঃ

১৯৭২-৭৩ সনে ভূমি রাজস্ব ছিল মাত্র ২.৫ কোটি টাকা (মোট করের ১.৫%)। এরপর টাকার অঙ্কে ভূমি রাজস্ব ক্রমেই বেড়েছে। ১৯৯৭-৯৮ সালে ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ ছিল ১৬১.৪ কোটি টাকা (মোট করের ১.১%) এবং ২০০১-০২ সনের মূল বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২৩৩ কোটি টাকা (মোট করের ১.১%) এবং ২০০৯-১০ অর্থবছরে ভূমিকরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯০ কোটি টাকা (মোট করের মাত্র ০.৮%)।

উত্তরাধিকার কর:

মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ব্যক্তিদের উপর এক প্রকার কর আরোপ করা হয়।মৃতের সম্পত্তির উপর কর আইন ১৯৫০ মোতাবেক ১৯৮১-৮২ করবর্ষ পর্যন্ত জারী ছিলো।

কর্পোরেট ট্যাক্স:

এই ধরনের কর একটি ব্যবসার লাভের উপর আরোপ করা হয়।

২০০৯-১০ কর বৎসর থেকে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে আয়করের হার হলো লভ্যাংশ আয়ের ওপর ২০%, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর থেকে মূলধনী লাভের উপর ১০%, অন্যান্য মূলধনী দ্রব্য হস্তান্তর থেকে প্রাপ্ত মূলধনী লাভের উপর ১৫%। ব্যাংক, ইনসুরেন্স এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বিশেষ করের হার হলো ৪২.৫%; মোবাইল কোম্পানী যদি স্টক এক্সচেঞ্জভুক্ত হয় তবে ৩৫% শেয়ার বাজারে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত করে ১০% শেয়ার হস্তান্তর সাপেক্ষ্যে। নতুবা ৪৫% যদি সিকিউরিটি ও এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ১০% লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয় এবং তা নির্ধারিত সময়ে যথারীতি প্রদান করা হয়। এবং অন্যান্য নিবন্ধিকৃত কোম্পানীর ক্ষেত্রে ৩৭.৫%। অনিবাসী ব্যক্তি করদাতাদের (বাংলাদেশি বাদে) ক্ষেত্রে মোট আয়ের ওপর করের হার ২৫%।

খ. পরোক্ষ কর (Indirect Tax):

সেবা ও পণ্যের উপর যে কর আরোপ করা হয় তাকে পরোক্ষ কর বলা হয়। পরোক্ষ কর পরিসেবা বা পণ্যের বিক্রেতা দ্বারা সংগ্রহ করা হয়। মূলত পণ্য ও পরিসেবার দামের সঙ্গে অতিরিক্ত দাম যোগ করে এটি তোলা হয়। এতে পণ্য বা সেবার দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশ সরকারের আয়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হল এই পরোক্ষ কর।

পরোক্ষ কর যা পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও বিক্রয়, আমদানী ও রপ্তানী এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়-বাণিজ্যের ওপর আরোপ করা হয়।

পরোক্ষ করের সাধারণ উদাহরণ হল আমদানি শুল্ক। এটি কোন পণ্য দেশে প্রবেশ করার সময় শুল্ক আমদানিকারক দ্বারা পরিশোধ করা হয়। আমদানিকারক কোনো ভোক্তার কাছে পণ্যটি যখন পুনরায় বিক্রি করতে যায়, তখন শুল্কের খরচ সহ নেট খরচ মিলিয়ে দাম নির্ধারণ করে থাকে।

খ. পরোক্ষকর প্রকারভেদঃ

বিক্রয় করঃ

পণ্য এবং পরিসেবা বিক্রয়ের উপর সরকার কর্তৃক আরোপিত একটি ভোগ কর। এটি একটি মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)। বিক্রয় কর অধ্যাদেশ ১৯৮২ ও কারবারি টার্নওভার কর অধ্যাদেশ ১৯৮২ বাতিল করে ১৯৯১ সনের ১ জুলাই থেকে তিনটি কর আদায়ের জন্য মূসক, সম্পূরক শুল্ক ও টার্নওভার কর চালু করা হয়। বর্তমানে মূসক-নিবন্ধিত ব্যক্তি, যাদের বার্ষিক টার্নওভার (মোট বিক্রয়) ২০ লক্ষ টাকা বা তার বেশি, তাদের কাছ থেকে করযোগ্য পণ্য ও সেবার আমদানি এবং উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়ার সকল স্তরে মূল্য সংযোজনের ওপর ১৫% হারে মূসক আদায় করা হয়। করযোগ্য পণ্য ও সেবার বার্ষিক টার্নওভার ২০ লক্ষ টাকার কম হলে মোট টার্নওভারের ওপর ৪% হারে টার্নওভার কর আদায় করা হয়।

বিলাস দ্রব্য, অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন দ্রব্য এবং সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত পণ্য ও সেবার ওপর ২০০৯-১০ সালে ২০%, ৩০%, ৪৫%, ৬০%, ১০০%, ২৫০%, ৩৫০%, এবং সেবা খাতের উপরে তিন ধরণের কর (১০%, ২৫% এবং ৩৫%) হারে সম্পূরক শুল্ক ধার্য করা হয়। রপ্তানির ওপর শূন্য-হারের মূসক প্রযোজ্য, অর্থাৎ রপ্তানির ওপর কোনো মূসক নেই, এমনকি রপ্তানি-পূর্ব স্তরসমূহে কোনো মূসক দেওয়া থাকলে তা ফেরৎ দেওয়া হয়। এছাড়া কর্তৃপক্ষ ১ অক্টোবর ২০০৪ থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানীকৃত পণ্যের উপর অগ্রীম বাণিজ্য শুল্ক (এটিভি) আদায় করছে (২০১০ সালে এই হার ২.২৫%)।

আবাগারি করঃ

দেশে উৎপাদিত পণ্য ও লবণের ওপর আবগারি শুল্ক ধার্যের জন্য ১৯৪৪ সালে জারীকৃত আবগারি ও লবণ আইনের মাধ্যমে বর্তমানে আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়। ১৯৯১ সালের জুলাইয়ে মূসক চালুর আগে আবগারি শুল্ক ছিল রাজস্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস (মোট রাজস্বের প্রায় ২২%), কিন্তু ১৯৯১-৯২ সালে আবগারি শুল্কযোগ্য ৯৯টি আইটেমের মধ্যে ৭৪টি আইটেম মূসকের আওতায় নেওয়া হয়।

১৯৪৪ সালের আবগারি ও লবণ আইনের প্রথম তফশিলের অন্তর্ভুক্ত দ্রব্য ও সেবার ওপরে উক্ত তফশিলে উল্লেখিত হারে আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়। ২০০৪ সালে উক্ত আইনের প্রথম তফশিলের প্রথম অংশ বাতিল করা হয়। ফলে ২০০৪-০৫ অর্থবৎসর থেকে কোন প্রচলিত দ্রব্যের উপর আবগারি শুল্ক প্রযোজ্য থাকলো না। এখন কেবল দুটো সেবাখাতে সীমিত আকারে আবগারি শুল্ক প্রযোজ্য। ব্যাংকে আমানত সংরক্ষণের মাধ্যমে দেয়া সেবা

বিদেশ ভ্রমণ কর

১৯৮০-৮১ সালে চালু করা হয়েছে। বিমানে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমানসংস্থাগুলি বিমান টিকেটের মাধ্যমে উক্ত কর সংগ্রহ করে। ২০০৪ সাল থেকে ভ্রমণ কর আদায় করা হয়ে থাকে। ২০০৩ সালের ভ্রমণ কর আইন অনুযায়ী প্রত্যেক বাংলাদেশীর জন্য এক্ষেত্রে করহার হলো: উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং দূরপ্রাচ্যের কোনো দেশের জন্য ২৫,০০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের জন্য ৮০০ টাকা এবং অন্যান্য দেশের জন্য ১,৮০০ টাকা। স্থলপথে বিদেশ ভ্রমণের জন্য এ হার প্রতি বাংলাদেশীর জন্য ৩০০ টাকা এবং সমুদ্রপথে বিদেশ ভ্রমণের জন্য ৫০০ টাকা। ২০০৪ সালের জুন থেকে আন্তর্জাতিক বিমানের বিমান টিকেট ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতি বিমান টিকেটের জন্য ২০০ টাকা কর দিতে হয়।

অন্যান্য পরোক্ষ করসমূহঃ

মোট করের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-সম্পৃক্ত অংশে রয়েছে বহিঃশুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক), সম্পূরক শুল্ক, আবগারি শুল্ক, আয়কর, বিদেশ ভ্রমণ কর, বিদ্যুৎ শুল্ক, সম্পদ কর (১৯৯৯-২০০০ থেকে আয়করের সারচার্জ হিসেবে আদায় করা হচ্ছে), টার্নওভার কর, বিমান টিকেট কর, বিজ্ঞাপন কর, দান কর এবং কতিপয় অন্যান্য অগুরুত্বপূর্ণ কর।

এনবিআর-বহির্ভূত অন্যান্য কর (২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট করের ৫% বা মোট রাজস্বের ৪%)-এর মধ্যে রয়েছে মাদক শুল্ক (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্তৃক আদায়কৃত), ভূমি রাজস্ব (ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে তহসিল অফিসের মাধ্যমে আদায়কৃত), নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক (অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আদায়কৃত), নিবন্ধন ফিস (আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন পরিদপ্তর কর্তৃক আদায়কৃত), এবং যানবাহন কর (যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আদায়কৃত)।

পরোক্ষ করের প্রায় ৫৩.৩% শুল্ক কর্তৃপক্ষ আমদানি পর্যায়ে সংগ্রহ করে থাকে, এর মধ্যে বহিঃশুল্ক পরোক্ষ করের ২৩.৯% (যা মোট করের ১৭.২%), মূসক ২৩.৪% (যা মোট পরোক্ষ করের ১৬.৯%) এবং সম্পূরক শুল্ক ৬.৩%। পরোক্ষ করের অবশিষ্টাংশ (যা মোট করের প্রায় ৩৩.৭%) আসে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, ভোগ বা লেনদেন থেকে, যেমন মূসক (১৯.৩%), সম্পূরক শুল্ক (১২.১%), আবগারি শুল্ক (০.৪%), বিদেশ ভ্রমণ কর (০.৮%), যানবাহন কর (১.০%), মাদক শুল্ক (০.১%), টার্নওভার কর (০.০১%)। সরকারি রাজস্বের প্রায় ১৯.৭% আসে অন্যান্য কর-বহির্ভূত রাজস্ব থেকে, যেমন কর্পোরেশনসমূহের উদ্বৃত্ত, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, রেলওয়ে, ডাক বিভাগ, জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্প, তার ও টেলিফোন ইত্যাদি খাতে আয়।

উপসংহারঃ

রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকার জনসাধারণের নিকট হতে বাধ্যতামূলকভাবে যে অর্থ আদায় করে তাকে ট্যাক্স বা কর বলে।আর এই কর নির্ধারণের কাজ আর তা আদায় করা হচ্ছে টেক্সেশন। করের বিনিময়ে করদাতা কোনাে প্রত্যক্ষ বা বিশেষ সুবিধা দাবি করতে পারে না।সরকারের মাধ্যমে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা বিশেষ লেনদেন থেকে দেশ পরিচালনা এবং দেশের উন্নয়নের জন্য আইনের সাহায্যে বাধ্যতামূলকভাবে অর্জিত অর্থকেই ট্যাক্স বা কর হিসাবে অভিহিত করা হয় আর ট্যাক্স এর পূরো কার্যক্রম হচ্ছে টেক্সেশন।

  • টেক্সেশন অব বাংলাদেশ লেখক প্রফেসর মোঃ ওয়ালী উল্লাহ এবং প্রফেসর মোঃ আবুল বাশার।
  • কর উইকিপিডিয়া।
  • বাংলাদেশ কর কমিশন তথ্য বিভাগ।
Next to read
Canvas & Methods
লিন ক্যানভাস মডেল (Lean Canvas Model)
লিন ক্যানভাস মডেল (Lean Canvas Model)

লিন ক্যানভাস মডেল মূলত একটি এক পৃষ্ঠার নয়টি ব্লকের মাধ্যমে তৈরি করা সমস্যা-সমাধান ভিত্তিক মডেল যা একটি আইডিয়াকে ব্যবসায়ে রুপান্তরিত করতে কিংবা স্টার্টআপ এর প্রসারে সহায়তা করে। এই মডেলটি মূলত স্টার্টআপ লেভেলের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যুগান্তকারী মডেল হিসেবে কাজ করে যেকারণে অনেক বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও তাদের শুরুর দিকে এই মডেলটি ব্যবহার করে নানাভাবে উপকৃত হয়েছে।

বিজনেস মডেল ক্যানভাস ( Business Model Canvas)
Canvas & Methods
বিজনেস মডেল ক্যানভাস ( Business Model Canvas)
মার্কেটিং এর ৭'পি (7P’s of Marketing)
Marketing
মার্কেটিং এর ৭'পি (7P’s of Marketing)
Needs, Wants, Demands (প্রয়োজন, চাওয়া এবং চাহিদা)
Business
Needs, Wants, Demands (প্রয়োজন, চাওয়া এবং চাহিদা)
লোগো ব্যবহারের সুবিধা অসুবিধা (Pros and Cons of Logo Usage)
Logo
লোগো ব্যবহারের সুবিধা অসুবিধা (Pros and Cons of Logo Usage)
CSR বা Corporate Social Responsibility কী?
Business
CSR বা Corporate Social Responsibility কী?
বিক্রয়ের ১০টি ভুল যেগুলো প্রতিটি বিক্রয়কর্মীর এড়ানো উচিৎ
Sales
বিক্রয়ের ১০টি ভুল যেগুলো প্রতিটি বিক্রয়কর্মীর এড়ানো উচিৎ
‘SWOT’ Analysis
Analysis
‘SWOT’ Analysis
ডিমার্কেটিং (DeMarketing)
Marketing
ডিমার্কেটিং (DeMarketing)
সেলস এবং মার্কেটিং কিভাবে একসাথে কাজ করে
Sales
সেলস এবং মার্কেটিং কিভাবে একসাথে কাজ করে