GeoRenus Editorial Team

ক্যাপিটাল বাজেটিং হচ্ছে এমন একটি প্রসেস যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রজেক্টের ভ্যালু বোঝার চেষ্টা করেন। ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর সবচেয়ে বহুল পদ্ধতিগুলো হচ্ছে পে-ব্যাক পিরিয়ড, নিট বর্তমান মূল ও অভ্যন্তরীণ আয়ের হার। তবে বিভিন্ন কোয়ান্টিটেটিভ পদ্ধতির পাশাপাশি কোয়ালিটেটিভ ফ্যাক্টর যেমন - মার্কেট ডিমান্ড, সার্ভাইভাল, পরিবেশের উপর প্রভাব ইত্যাদি’ও ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর সময় বিবেচনা করা উচিত।
চিরগতিশীল ব্যবসায়িক জগতে যেকোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে ভালো বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর। ক্যাপিটাল বাজেটিং, যাকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ের প্রাণরস বলা হয়, এই গতিশীল ব্যবসায়িক জগতে ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কম্পাস হিসেবে কাজ করে। ক্যাপিটাল বাজেটিং জানার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে কোন কোন প্রজেক্টে নিজেদের রিসোর্স সবচেয়ে বেশি অ্যালোকেট করা উচিত, যার মাধ্যমে একটি ভালো গ্রোথ ও রিটার্ন পাওয়া যাবে। তাই ব্যবসায়িক সমুদ্রে মূলধণের জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পরার আগেই এই কম্পাসের সঠিক এবং সর্বোত্তম ব্যবহার জেনে নেয়া প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্যেই আজকের লেখায় আপনাদের ক্যাপিটাল বাজেটিং’র আদ্যোপান্ত সম্পর্কে জানাবো।
ক্যাপিটাল বাজেটিং হচ্ছে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে ইভালুয়েট, সিলেক্ট ও ম্যানেজ করার একটি পদ্ধতি যেমন - সম্পদ ক্রয়, ব্যবসায় সম্প্রসারণ, নতুন প্রোডাক্ট তৈরি ইত্যাদি। ক্যাপিটাল বাজেটিং মূলত অ্যানালাইজ ও জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে যে কোনো প্রজেক্টে বিনিয়োগ করা উচিত কি না এবং সেই প্রজেক্ট থেকে ভবিষ্যতে যথেষ্ট পরিমাণ রিটার্ন জেনারেট করা সম্ভব হবে কি না। যেহেতু ব্যবসায়ের রিসোর্স বেশ সীমিত, তাই ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর মাধ্যমে এমন সব প্রজেক্টকে ছাটাই করে ফেলা হয় যেগুলো থেকে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ব্যবসায় জগতে ক্যাপিটাল বাজেটিং বেশ কিছু কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাপিটাল বাজেটিং সম্পর্কে বিস্তারিত শুরু করার আগে ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর দুইটি কোর কনসেপ্টের সাথে পরিচিত হয়ে নেয়া প্রয়োজন।
ইংরেজিতে বলা হয় যে, Time is money। আর ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর মাধ্যমে এই ধারণার উপর আরো বেশি জোর দেয়া হয়। অর্থের সময়মূল্য বোঝায় যে আজকের টাকা আগামী দিনের সমপরিমাণ টাকার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রতিনিয়ত টাকার মান কমে চলেছে এবং আজকে ১০০ টাকা দিয়ে যা ক্রয় করা যাবে, আগামী ১ বছর পর সেই একই জিনিস ক্রয় করতে ১২০ টাকা বা তার বেশি খরচ করতে হবে। তাই অর্থের সময়মূল্যের কনসেপ্ট ব্যবহার করে কোনো প্রজেক্ট থেকে ভবিষ্যতে আসা রিটার্নের বর্তমান মূল্য নির্ণয় করে বোঝার চেষ্টা করা হয় যে আদৌ সেই প্রজেক্ট থেকে আসা রিটার্ন যথেষ্ট কি না।
যেকোনো ধরণের বিনিয়োগে কিছু পরিমাণ ঝুকিঁর অস্তিত্ব থাকে। যেই প্রজেক্টে ঝুকিঁর পরিমাণ যতো বেশি সেই প্রজেক্ট থেকে মুনাফা’ও ততো বেশি পাওয়া যায়। তাই ক্যাপিটাল বাজেটিং চেষ্টা করে ঝুকিঁ ও মুনাফার মাঝে একটি পারফেক্ট ব্যালেন্স তৈরি করতে। যেই প্রজেক্টগুলোতে এই ব্যালেন্স তৈরি করা সম্ভব হয়, সেগুলোতে বিনিয়োগ করতেই ক্যাপিটাল বাজেটিং উৎসাহ প্রদান করে।
ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর কোর কনসেপ্টগুলো সম্পর্কে জানা হয়ে গেলে এখন আমরা ক্যাপিটাল বাজেটিং প্রসেস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি।
ভালো ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর শুরু হয় ভালো ভালো বিনিয়োগের সুযোগ আইডেন্টিফাই করার মাধ্যমে। ব্যবসায়ের স্ট্র্যাটেজিক গোলের সাথে অ্যালাইন করে এমন সব সুযোগ ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো মুখিয়ে থাকে। সাধারণত বিনিয়োগের সুযোগ দুই ধরণের হয়ে থাকে -
নতুন প্রজেক্ট - এই ক্যাটাগরিতে সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। যেমন - নতুন প্রোডাক্ট লাইন তৈরি করা, নতুন অঞ্চলে ব্যবসায় সম্প্রসারণ, ব্যবসায় বৈচিত্রায়ন নিয়ে আসা ইত্যাদি।
সম্প্রসারণ ও প্রবৃদ্ধি - এই ক্যাটাগরিতে ব্যবসায়ের বর্তমান প্রজেক্টগুলোকে সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করার চেষ্টা করা হয়। যেমন - নতুন কোনো উৎপাদন ফ্যাসিলিটি তৈরি করা, টেকনোলজি আপগ্রেড করা ইত্যাদি।
প্রথমে বিভিন্ন বিনিয়োগের সুযোগ আইডেন্টিফাই করে তারপর সেগুলো বিশ্লেষণ করার কাজ শুরু হয়। এই পর্বে ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর কিছু নিউমেরিক মেথড ব্যবহার করা হয়। যেমন -
পে-ব্যাক পিরিয়ড (PBP) - প্রজেক্টে যেই পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা পুরোপুরি উঠে আসতে ঠিক কি পরিমাণ সময় লাগবে তা পে-ব্যাক পিরিয়ডের মাধ্যমে জানা যায়। সাধারণত নিচের সূত্রের সাহায্যে পে-ব্যাক পিরিয়ড ক্যালকুলেট করা হয় -
Payback Period = Initial Investment / Annual Cash Inflow
নিট বর্তমান মূল্য (NPV) - নিট বর্তমান মূল্যের সূত্রের সাহায্যে বিভিন্ন প্রজেক্ট থেকে ভবিষ্যতে আসা রিটার্নগুলোর বর্তমান মূল্য জানা যায়। সাধারণত একেক প্রজেক্ট থেকে একেক পরিমাণ রিটার্ন আসে, আবার রিটার্ন আসার সময়েও ভিন্নতা থাকে, তাই এই ফরমুলা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয় যে বর্তমান সময়ের হিসেবে কোন প্রজেক্ট সবচেয়ে বেশি লাভজনক হবে।
NPV = ∑ [Cash Flow at Time t / (1 + r)t] - Initial Investment (I)
অভ্যন্তরীণ আয়ের হার (IRR) - যেই হারে কোনো প্রজেক্ট থেকে আসা রিটার্নের নিট বর্তমান মূল্য শূন্য হয়, অর্থাৎ, বিনিয়োগ ও রিটার্ন সমান সমান হয়, তাকে অভ্যান্তরীণ আয়ের হার বলা হয়। এতে করে প্রজেক্টের রিটার্নের হার জানা যায় এবং সবচেয়ে লাভজনক প্রজেক্ট আইডেন্টিফাই করা সম্ভব হয়।
IRR = ∑ [Cash Flow at Time t / (1 + IRR)t] - Initial Investment (I)
মুনাফালভ্যতা সূচক (PI) - মুনাফালভ্যতা সূচকের ক্ষেত্রে কোনো প্রজেক্ট থেকে আসা রিটার্নের বর্তমান মূল্যকে প্রজেক্টে বিনিয়োগের বর্তমান মূল্য দ্বারা ভাগ করা হয়। এতে করে বিনিয়োগের অনুপাতে কি পরিমাণ লাভ হচ্ছে তা বোঝা যায়।
Profitability Index = PV of Cash Inflows / PV of Cash Outflows
পূর্ববর্তী ধাপ থেকে পাওয়া নিউমেরিক ডেটার উপর নির্ভর করে এই ধাপে সবচেয়ে লাভজনক প্রজেক্টগুলো সিলেক্ট করা হয়। এই ধাপে অতিরিক্ত কিছু বিষয় কনসিডার করা প্রয়োজনঃ
প্রজেক্ট সিলেক্ট করার সময় আমরা কোয়ান্টিটেটিভ ডেটাকে প্রাধান্য দিলেও কোয়ালিটেটিভ কিছু ফ্যাক্টর যেমন - স্ট্র্যাটেজিক ফিট, মার্কেট ডিমান্ড, পরিবেশের উপর প্রভাবকে গুরত্বের সাথে দেখতে হবে।
যখন বাজেট স্বল্পতার কারণে সবগুলো মুনাফাজনক প্রজেক্ট সিলেক্ট করা সম্ভব হবে না, তখন ক্যাপিটাল রেশনিং’র সাহায্যে প্রজেক্ট থেকে আসা লাভের অনুপাতে মূলধন বিনিয়োগ করতে হবে।
প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পর প্রতিনিয়ত তা রিভিউয়ের আন্ডারে রাখতে হবে, যাতে বোঝা যায় যে প্রজেক্ট থেকে এক্সপেক্টেড প্রফিট জেনারেট হচ্ছে কি না বা কোথাও কোনো বিচ্যুতি ঘটেছে কি না।
রিসোর্স অ্যালোকেশনের জন্য ক্যাপিটাল বাজেটিং বেশ কার্যকর একটি টুল হলেও এর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা’ও রয়েছে।
ক্যাপিটাল বাজেটিং-এ কোনো প্রজেক্ট থেকে আসা ভবিষ্যত নগদ আন্তঃপ্রবাহ অনুমানের উপর ধরে নেয়া হয়। যদিও এই অনুমান করার জন্য এখন বেশ অ্যাডভান্সড টেকনিক ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ঠিকভাবে এই টেকনিকগুলো ব্যবহার করতে না পারলে ক্যাপিটাল বাজেটিং-এ ভুল হতে পারে।
ক্যাপিটাল বাজেটিং-এ ধরে নেয়া হয় যে ভবিষ্যতে প্রজেক্ট থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যাশ ফ্লো আসবে এবং মুদ্রাস্ফীতির হার একই থাকবে। তবে বাস্তবে প্রতি বছরের ক্যাশ ফ্লোতে বিশাল পরিবর্তন আসতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতির হার প্রতি বছর পরিবর্তন হতে পারে।
ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর সময় বিভিন্ন সংখ্যাত্মক পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। তবে বাস্তবে প্রজেক্টগুলো থেকে আরো কিছু অদৃশ্য সুবিধা পাওয়া যেতে পারে যা ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর ক্ষেত্রে কনসিডার করা হয় না, যেমন - ব্র্যান্ডের সুনাম, কাস্টমার লয়ালটি, কর্মীদের মোটিভেশন ইত্যাদি।
ক্যাপিটাল বাজেটিং-এ প্রতি বছর সুদের হার ও ডিস্কাউন্ট রেইট একই ধরে নেয়া হয়, যা প্রতি বছর পরিবর্তন হতে পারে। এতে করে অর্থের সময়মূল্যের’ও পরিবর্তন হতে পারে।
ক্যাপিটাল বাজেটিং-এর ক্ষেত্রে কিছু নন-মনিটারি ফ্যাক্টর অনেকটা ইগনোর করা হয়, যেমন - পরিবেশের উপর প্রভাব, নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব ইত্যাদি।
ক্যাপিটাল বাজেটিং এমন সব প্রজেক্টকে প্রাধান্য দেয়, যেখান থেকে সবচেয়ে দ্রুত বিনিয়োগের টাকা উঠে আসবে। এতে করে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী ও স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্যের সাথে তা অ্যালাইন না’ও করতে পারে।
ক্যাপিটাল বাজেটিং ফাইন্যান্স জগতের বেশ শক্তিশালি একটি টুল। এই টুলের সর্বোত্তম ব্যবহার করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বেশ সহজেই তৈরি করতে পারে। তবে ক্যাপিটাল বাজেটিং ব্যবহার করার সময় এর প্রসেসগুলো যথাযথভাবে ফলো করা উচিত। নইলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশ ধরণের ভুল হওয়ার সুযোগ থেকে যায়।

লিন ক্যানভাস মডেল মূলত একটি এক পৃষ্ঠার নয়টি ব্লকের মাধ্যমে তৈরি করা সমস্যা-সমাধান ভিত্তিক মডেল যা একটি আইডিয়াকে ব্যবসায়ে রুপান্তরিত করতে কিংবা স্টার্টআপ এর প্রসারে সহায়তা করে। এই মডেলটি মূলত স্টার্টআপ লেভেলের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যুগান্তকারী মডেল হিসেবে কাজ করে যেকারণে অনেক বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও তাদের শুরুর দিকে এই মডেলটি ব্যবহার করে নানাভাবে উপকৃত হয়েছে।








