কিভাবে একজন অসাধারণ বিক্রয়কর্মী হয়ে উঠবেন

একজন আদর্শ বিক্রয়কর্মী আমরা তাকেই বলতে পারি যিনি যেকোনো মুহুর্তে যেকোনো কিছু বিক্রয় করে ফেলার অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন। নিজের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করেন এবং সামনে বসে থাকা ব্যক্তিতে তার পণ্য বা সেবার মাহাত্ম্য বোঝাতে সক্ষম হোন। আপনারও কি তেমনই একজন হয়ে ওঠার ইচ্ছা?
Key Points
- একজন বিক্রয়কর্মীর অবশ্যই তার পণ্য এবং পণ্যের মার্কেট সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে।
- একজন আদর্শ বিক্রয়কর্মীর অবশ্যই ক্রিস্টাল ক্লিয়ার কমিউনিকেটিভ স্কিল থাকা প্রয়োজন।
- সামনে বসে থাকা ব্যক্তির প্রতি যদি সহমর্মিতা না থাকে, তাহলে তার সমস্যা আপনি নিজে অনুভব করতে পারবেন না এবং আপনার সমাধানও হয়তো তার কোনো কাজে আসবে না।
- ক্রেতার কাছে একবার পণ্য বা সেবা বিক্রয় করার পর যদি আপনি তাকে ভুলে যান, তাহলে ক্রেতা’ও আপনাকে ভুলে যাবেন এটাই স্বাভাবিক।
ভূমিকা
যেকোনো কিছু বিক্রয় করার ক্ষমতা এমন একটি গুণ, যা প্রত্যেকের ক্যারিয়ারেরই কোনো না কোনো পর্যায়ে আয়ত্ত্ব করার প্রয়োজন পড়ে। একজন বিক্রয়কর্মী বলতে অনেকে শুধু রিটেইল বা হোলসেল মার্কেটে থাকা মানুষদের মনে করেন। তবে বিক্রয়কর্মীর গুণাবলি কিন্তু এই ছোট্ট পরিসরের থেকেও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। আপনাকে হয়তো আপনার স্টার্টআপের ফান্ডিং-এর জন্য পিচ করতে হচ্ছে অথবা কোনো বহুল আকাঙ্ক্ষিত চাকরির ইন্টারভিউ দিতে হচ্ছে, সেখানেও কিন্তু আপনার নিজেকে বিক্রয় করার ক্ষমতা থাকতে হবে। এখানে বিক্রয় করার ক্ষমতা বলতে এমনভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার কথা বোঝানো হচ্ছে যে সামনের মানুষটি আপনাকে ফান্ডিং দিতে বা চাকরির জন্য সিলেক্ট করতে আগ্রহী হবেন।
তাই, একজন আদর্শ বিক্রয়কর্মীর গুণাবলিগুলো আয়ত্ত্ব করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু কিভাবে করবেন সেটি? এর উত্তর হচ্ছে, আপনার তাদেরকে ফলো করতে হবে যারা নিজেদের ফিল্ডে একজন গ্রেইট সেলসপারসন হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। আজকের লেখায় আমরা এমনই কিছু বৈশিষ্ট্য এবং স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কথা বলবো যা আপনাকে একজন অসাধারণ বিক্রয়কর্মী হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
একজন আদর্শ বিক্রয়কর্মীর সাধারণত কি কি গুণাবলি থাকে?
একজন বিক্রয়কর্মীর অবশ্যই তার পণ্য এবং পণ্যের মার্কেট সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে। যাতে করে তারা যেকোনো পরিস্থিতে সামনে বসে থাকা ব্যক্তিকে ম্যানিপুলেট করতে পারেন। এই ম্যানিপুলেট করার ক্ষমতা অনেকের মাঝে প্রাকৃতিকভাবে থাকলেও অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে এগুলো গোড়া থেকেও শিখে ফেলা সম্ভব। তাই, আপনারও যদি গ্রেইট সেলস স্কিল অর্জন করার ইচ্ছা থাকে তাহলে এই গুণগুলো প্রথমে আয়ত্ত্ব করার চেষ্টা করুন।
১। উদ্যোক্তা
এই ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতা থাকা চাই। এতে করে আপনি সঠিক সময়ে সম্ভাব্য ক্রেতাকে ধরে ফেলতে পারবেন। আর নইলে অন্য কেউ এসে আপনার ক্রেতা নিয়ে যেতে পারে।
২। যোগাযোগ
একজন আদর্শ বিক্রয়কর্মীর অবশ্যই ক্রিস্টাল ক্লিয়ার কমিউনিকেটিভ স্কিল থাকা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে তিনি তার পণ্য বা সেবার গুণগুলি সঠিক এবং সহজভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সামনের ব্যক্তিকে আগ্রহী করে তুলতে পারেন।
৩। প্রতিযোগিতার মনোভাব
আপনার মাঝে যদি প্রতিযোগিতার মনোভাব না থাকে তাহলে আপনি কোনোভাবেই সেলস ফিল্ডে ভালো করতে পারবেন না। আপনার সেলস টার্গেট যেন আপনি সবার আগে পূরণ করতে পারেন সেই সম্বন্ধে আপনাকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
৪। ধৈর্য্য
যেকোনো পণ্য বিক্রয় করতে অথবা প্রজেক্ট কমপ্লিট করতে অনেকটা সময় লেগে যেতে পারে। এখানে অধৈর্য্য হয়ে ওঠা যাবে না।
৫। শোনার ক্ষমতা
একজন বিক্রয়কর্মীকে অবশ্যই অসাধারণ শ্রোতা হতে হবে। এর মাধ্যমে তিনি সামনে থাকা ব্যক্তির সমস্যা এবং চাহিদা ভালোভাবে বুঝে তা সমাধানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় বের করে ফেলতে পারবেন।
৬। আত্মবিশ্বাস
আপনাকে অবশ্যই নিজের পণ্য এবং নিজের দক্ষতার উপর বিশ্বাস স্থাপণ করতে হবে। আপনার নিজেরই যদি নিজের পণ্যের প্রতি শতভাগ আস্থা না থাকে তাহলে কোনো ক্রেতার আস্থাই অর্জন করতে পারবেন না।
৭। সহমর্মিতা
সামনে বসে থাকা ব্যক্তির প্রতি যদি সহমর্মিতা না থাকে, তাহলে তার সমস্যা আপনি নিজে অনুভব করতে পারবেন না এবং আপনার সমাধানও হয়তো তার কোনো কাজে আসবে না।
৮। নেটওয়ার্কিং
পরিচিত এবং অপরিচিতদের সাথে আপনার সম্পর্ক স্থাপণ করে যেতে হবে। একজন সেলস পারসন আসলে কতোটা দক্ষ এবং সফল তা অনেকটাই নির্ভর করে তার নেটওয়ার্কের উপর।
৯। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ের প্রতি মনোযোগ
আপনার সম্ভাব্য ক্রেতার সবচেয়ে মাইক্রো চাহিদাগুলোর প্রতিও আপনার নজর রাখা চাই। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো অদেখা রয়ে যাওয়ার কারণেই অনেক সময় বড় বড় ডিল সম্পন্ন করতে বেগ পেতে হয়।
১০। খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা
কোনোদিন হয়তো আপনি খুব সহজে টার্গেট পূরণ করে ফেলতে পারবেন আবার কোনোদিন হয়তো অনেক বেশি বেগ পেতে হতে পারে। সকল পরিস্থিতিতেই আপনাকে মানিয়ে নিতে হবে।
সফল বিক্রয়কর্মীদের অভ্যাসগুলো কি কি?
এই বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জনের পাশাপাশি আপনাকে কিছু অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে। এই অভ্যাসগুলো ব্যতীত সেলস ক্যারিয়ারের অগ্রযাত্রা থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই নিজের আয় বৃদ্ধি এবং অগ্রযাত্রা বজায় রাখার জন্য অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এই অভ্যাসগুলো অর্জন করাটাও প্রয়োজন।
১। নিজের পণ্য বা সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন
সেলস ক্যারিয়ারের একেক পর্যায়ে আপনাকে একেক ধরণের পণ্য বিক্রয় করতে হতে পারে। তাই পণ্য বা সেবা যাই হোক, চেষ্টা করুন শুরুতেই সেটির সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করে নেয়ার। আপনার পণ্য বা সেবা সম্পর্কে যদি আপনার বিস্তারিত ধারণা থাকে, তাহলেই আপনি ক্রেতাকে সেটির সম্পর্কে ভালো ধারণা প্রদান করতে পারবেন।
২। বিক্রয়ের পরেও ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ রাখুন
ক্রেতার কাছে একবার পণ্য বা সেবা বিক্রয় করার পর যদি আপনি তাকে ভুলে যান, তাহলে ক্রেতা’ও আপনাকে ভুলে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। এর মাধ্যমে সেই ক্রেতা হাতছাড়া হয়ে পরার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই চেষ্টা করুন বিক্রয়ের পরেও ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে।
৩। মানুষের সাথে সম্পর্কে গড়তে থাকুন
সেলস ক্যারিয়ারে আপনি যতো বেশি মানুষের সাথে মিশবেন, ততোই আপনার দক্ষতা এবং জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন যে কোন ধরণের মানুষকে কিভাবে হ্যান্ডেল করতে হবে। তাই যখনই সুযোগ পাবেন, নেটওয়ার্কিং করুন।
৪। সততার চর্চা করুন
সেলস ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সততা। আপনি যদি ভুল তথ্য দিয়ে বা মিথ্যা কথা বলে পণ্য বা সেবা বিক্রয় করেন তাহলে ক্রেতা দ্বিতীয়বার আর আপনার থেকে পণ্য নিবেন না সেটাই স্বাভাবিক। অপরদিকে আপনার পণ্যের যদি কোনো সীমাবদ্ধতা থাকে এবং সেই সম্পর্কে আপনি ক্রেতাকে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলে দেন তাহলে ক্রেতা জেনে-বুঝেই আপনার পণ্য নিবেন। এর মাধ্যমে পরেরবারও ক্রেতা আপনার কাছে আসবেন কারণ আপনি কোনো তথ্য লুকাননি।
৫। দলের সাথে কাজ করার অভ্যাস করুন
সেলস স্কিলগুলো অনেকসময়ই হয় আত্মকেন্দ্রিক। একেকজন সেলসপারসন একেকভাবে ডিল সম্পন্ন করে থাকেন। তবে কোম্পানীর ভালো জন্য কোম্পানী অবশ্যই চাইবে যে আপনি কোনো টিমের সাথে কাজ করুন। কারণ টিম হিসেবে কাজ করলে দক্ষতা এবং কার্যকারিতা দুটোই বৃদ্ধি পায়।
৬। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া গড়ে তুলুন
সেলস ক্যারিয়ারে ভালো করার অনেক ধরণের স্ট্র্যাটেজি রয়েছে। তবে সবগুলো আপনার জন্য কাজ করবে না সেটাই স্বাভাবিক। তাই চেষ্টা করুন নিজের মতো করে গুছিয়ে একটি প্রক্রিয়া তৈরি করে ফেলার। এতে করে আপনার সময় অনেকটাই সাশ্রয় হবে।
৭। বাউন্ডারি সম্পর্কে জানুন
আমরা জানি, একটি ডিল কমপ্লিট করতে অনেকটা সময় লেগে যেতে পারে। তবে কখনো কখনো ক্রেতারা পণ্য ক্রয় না করে বরং শুধু সময় নষ্ট করার জন্যই সেলসপারসনদের সাথে কথা বলতে থাকেন। এখানে আপনার সময় নষ্ট হওয়া ছাড়া আপনি আর কিছুই পাবেন না। তাই প্রতিটি ডিলের পেছনে আপনি কতোটুকু সময় ব্যয় করতে পারবেন সেই বাউন্ডারি সেট করে নিন।
৮। নিজের থেকে ক্রেতাকে গুরুত্ব দিন বেশি
চেষ্টা করুন নিজেকে সরিয়ে সামনে বসে থাকা ব্যক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিতে। তাকে বেশি সময় কথা বলতে দিন এবং আপনি বেশি সময় নিয়ে তার কথা শুনুন। এখানে আপনি কি ভাবছেন বা মনে করছেন সেটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সামনে বসে থাকা ক্রেতার গুরুত্বই বেশি, এটা ধরে নিতে হবে।
৯। রিসার্চ করার অভ্যাস করুন
প্রতিদিন নতুন নতুন টেকনিক এবং স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে জানুন। যেখানে যাচ্ছে সেখানের মানুষ এবং পরিবেশ সম্পর্কে রিসার্চ করুন। যতো বেশি রিসার্চ করবেন, ততোই আপনার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে।
উপসংহার
বেশিরভাগ মানুষেরই প্রাকৃতিকভাবে উপরের বৈশিষ্ট্যগুলো থাকে না। তাই চেষ্টা করুন সময়ের সাথে সাথে এগুলো আয়ত্ত্ব করে নেয়ার। তবে মনে রাখবেন, রাতারাতি কোনো কিছুই সম্ভব নয়। তাই অধ্যবসায়ের সাথে লেগে থাকুন এবং প্র্যাক্টিস করতে থাকুন।
- https://blog.hubspot.com/sales/habits-to-become-a-more-effective-salesperson
- https://salesinsightslab.com/become-better-salesperson/
- https://www.forbes.com/sites/forbesbusinessdevelopmentcouncil/2020/02/25/what-makes-a-good-salesperson/?sh=6f5425708d53
Next to read
অ্যাড অন মডেল (Add On Model)


সাবস্ক্রিপশন মডেল (Subscription Model)

সারোগেট মার্কেটিং (SURROGATE MARKETING)

লোগো ব্যবহারের সুবিধা অসুবিধা (Pros and Cons of Logo Usage)

মোট মুনাফা (Gross profit) সংজ্ঞা, সূত্র এবং উদাহরণ

হোরেকা (HORECA)

রিব্র্যান্ডিং (Rebranding)

বিক্রয়ের ১০টি ভুল যেগুলো প্রতিটি বিক্রয়কর্মীর এড়ানো উচিৎ

বিনিয়োগ কি? বিনিয়োগের ধরণ এবং উদাহরণ
