সম্ভাব্য গ্রাহক তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ের সেলস ফানেলের প্রক্রিয়া শুরু হয়।সেলস ফানেলের প্রতিটি পর্যায় গ্রাহককে ক্রয় করার এক ধাপ কাছাকাছি নিয়ে যায়।
ক্রয়ের প্রক্রিয়াটিকে একটি সেলস ফানেল হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে কারণ কোন পণ্য বা সেবা ক্রয়ের জন্য অনেক মানুষ আগ্রহ প্রকাশ করে কিন্তুু শেষ পর্যন্ত যারা পণ্য বা সেবা অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করে তারাই গ্রাহক এবং তাদের নিকট বিক্রয়ের মাধ্যমে বিক্রেতার সেলস ফানেল প্রক্রিয়াসমূহ সম্পন্ন হয়।
যেমন নীতু একটা স্মার্ট ফোন কেনার জন্য ঢাকার মোতালেব প্লাজা মোবাইল মার্কেটে গিয়েছে। মার্কেটে গিয়ে Walton, Symphony, Oppo, Real me এসকল শপে ঘুরে ঘুরে ফোন দেখেছে।নীতু যখন শপ গুলোতে ফোন দেখছে তখন সব গুলো শপের জন্য সে সম্ভব্য ক্রেতা।
কিন্তুু নীতু Real me শপ থেকে একটা নির্দিষ্ট মডেলের ফোন দেখে, ফোনের মেগাপিক্সেল ক্যামেরা,মেমোরি স্টোরেজ,ব্যাটারির স্টোরেজ, ফোনের ডিজাইন কালার পচ্ছন্দ হওয়ায় আর দাম তার বাজেটে হওয়ায় নীতু real me শপ থেকে ফোন ক্রয় করলো।নীতুর এই Real me শপে প্রবেশ করা,ফোন পচ্ছন্দ করা,দামাদামি করা,দাম নির্দিষ্ট হওয়ার পর তা ক্রয় করা, নীতুর এই ক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হওয়াই হচ্ছে real me শপের জন্য সেলস ফানেল বা বিক্রয় ফানেল।
সেলস ফানেলের ধাপ বা স্টেজঃ
সেলস ফানেল কিভাবে কাজ করে বা সেলস ফানেল ধাপ বা স্টেজ কোম্পানি ভেদে অনেক সময় পরিবর্তিত হয়ে থাকে।কিন্তু সেগুলি সাধারণত নিম্নলিখিত চারটি বিভাগে বিভক্ত:
১. সচেতনতাঃ
সেলস বা বিক্রয় ফানেলের প্রথম ধাপ হচ্ছে গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। গ্রাহক যখন তার প্রয়োজন বা চাহিদামত কোন পণ্য বা সেবা খুঁজে যে কোথা থেকে তার চাহিদাকৃত পণ্য বা সেবা সাশ্রয়ী মূলে, সহজে,মানসম্মত ভাবে পাওয়া যাবে তখন কোম্পানিকে সেই চাহিদামতো তাদের পণ্যের প্রচার আর প্রসারের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে সেই পণ্য বা সেবার তথ্য পৌঁছে দেওয়া।হতে পারে তা পত্রিকা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে,কোম্পানির পণ্যের লিফলেট বিলির মাধ্যমে, বর্তমান নেটওয়ার্কিং যুগে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর মাধ্যমে।
যেমনঃ মিলা অসুস্থ হয়ে ডাক্তার দেখাতে গেলো। ডাক্তার কিছু ঔষধ দিলেন আর টেস্ট করিয়ে আসতে বললেন।মিলা ফার্মেসীতে ঔষধ কেনার সময় খেয়াল করলো ফার্মেসী একটা ক্যালেন্ডার ঝুলানো যা ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে দেওয়া এবং ক্যালেন্ডারের পাশেই তাদের বিভিন্ন সেবার কথা সহ, ২৫% ছাড় আর মেয়েদের জন্য পৃথক ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ আছে।আর মিলা পরের দিন সব কিছু মিলিয়ে বিশ্বস্ত,সুনামধন্য আর সাশ্রয়ী হওয়ায় ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার তার মেডিকেল টেস্ট করানোর জন্য চলে গেল।
২. আগ্রহঃ
সেলস ফানেল বা বিক্রয় ফানেলের দ্বিতীয় পর্যায়ে হলো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে গ্রাহকদের আগ্রহ।এই পর্যায়ে গ্রাহকরা পণ্য বা সেবা নিয়ে গবেষণা করে যেমন কোন পণ্য বা সেবার মান বেশি ভালো, দামে সাশ্রয়ী, অধিক সময় ব্যবহারযোগ্য,কোন পণ্য বা সেবা গ্রাহক সত্যি পচ্ছন্দ করলো,একই রকম পণ্য বা সেবা আরও বিভিন্ন রকম বা ডিজাইন বা রং এ আছে কি না এসকল বিষয় এখানে জড়িত থাকে।বিক্রেতাকে এখানে দক্ষতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। গ্রাহক কোন পণ্য বা সেবা নিলে সবচাইতে বেশি উপকৃত হবেন সে বিষয় সিদ্ধান্ত নিতে পণ্য বা সেবার সকল ধরনের তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে হয়।যেমন আমরা যখন বিগ বাজার সুপার শপে যাই তখন তাদের সেলসের মানুষ আমাদের স্বাগতম জানায় এবং তাদের শপে কোন পণ্য কোন সেক্টরে আছে এবং পণ্য সম্পর্কে ডিটেইলস জানতে এবং নিশ্চিন্তে ক্রয় করতে সাহায্য করেন।
৩. সিদ্ধান্তঃ
সেলস ফানেল বা বিক্রয় ফানেলের তৃতীয় পর্যায় হল যখন গ্রাহক কেনাকাটা করার জন্য প্রস্তুত।গ্রাহক যেখানে দুই বা তিনটি পণ্য পচ্ছন্দ করেছেন সেখান থেকে এক বা দুটি পণ্য ক্রয় করবেন।বিক্রেতার তখন দক্ষতার সাথে গ্রাহককে প্রভাবিত করতে হবে যেন গ্রাহক এই পর্যায়ে অবশ্যই পণ্য ক্রয় করে থাকেন এবং সেটা একের অধিক পণ্যও হতে পারে।বিক্রতা এই সময় বিভিন্ন রকম ডিস্কাউন অফার,গিফট ভাউচার,একটি বোনাস পণ্য ইত্যাদি গ্রাহককে অফার করতে পারেন যাতে করে গ্রাহকের কেনাকাটার সম্ভবনা বৃদ্ধি পায় এবং বিক্রয় নিশ্চিত হয়।
যেমনঃ ঈদের সময় স্বপ্ন সুপার শপ তাদের বিভিন্ন রকম ক্যাটগরির পণ্যে অফার দিয়ে থাকেন। Coca-Cola ১ লিটার ক্রয়ে কোন অফার তারা রাখেন নাই কিন্তুু ২.৫ লিটার ক্রয়ে ২০ টাকা ছাড় অফার ছিলো।১ লিটার মূল্য তারা রাখছিলো ৭০ টাকা কিন্তুু ২.৫ লিটার মূল্য রাখছিলো ১০০ টাকা যেখানে ৩০ টাকা এড করলেই ১.৫ লিটার বেশি চলে আসছিলো আর এই অফারে সবাই ২.৫ লিটার Coca-Cola সর্বাধিক বিক্রয় হয়েছে।
৪. বিক্রয় সম্পন্নঃ
সেলস ফানেল বা বিক্রয় ফানেলের চতুর্থ ধাপ বা চূড়ান্ত ধাপ হচ্ছে গ্রাহকের নিকট পণ্য বিক্রয় সম্পন্ন করা।সেলস ফানেলের এই শেষ ধাপে গ্রাহক তার চাহিদামতো এবং পচ্ছন্দানুযায়ী পণ্য বা সেবা ক্রয় করে থাকে এবং বিক্রেতার ব্যবসায়ের ইকোসিস্টেমের অংশ হয়ে যায়। শুধুমাত্র একজন গ্রাহক যখন সেলস ফানেলের শেষ ধাপে পৌঁছে তখনই ফানেলের ধাপ সম্পূর্ণ হয়।বিক্রয় বৃদ্ধিতে একজন বিক্রতাকে সব সময় যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।বিক্রয় সম্পন্ন হয়ে গেলেই বিক্রেতার কাজ শেষ হয়ে যায় না।
গ্রাহক ধরে রাখার বিভিন্ন উপায়ের উপর বিক্রেতার ফোকাস রাখা জরুরি। যেমন গ্রাহক ক্রয়ের জন্য বিক্রেতা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন, গ্রাহককে সামনের দিনগুলোতে কেনাকাটা করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো এবং সম্ভব হলে গ্রাহকের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা। যেমন স্বপ্ন সুপার শপে তার রেগুলার কাস্টমারদের জন্য মেম্বার শিপ কার্ড করার সুবিধা আছে। যে কার্ডে কাস্টমারের যোগাযোগের ফোন নাম্বার দেওয়া থাকে।এবং স্বপ্ন তাদের বিভিন্ন রকম ডিসকাউন্ট অফার গ্রাহককে মেসেজের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়। এতে করে কাস্টমার ঘরে বসেই অফার গুলো জানতে পারছেন,কেনাকাটার লিস্ট করতে পারছেন আর স্বপ্ন সুপার শপে বিক্রয় বৃদ্ধি পায়।
একটি সেলস ফানেল কিভাবে তৈরি হয়ঃ
১. গ্রাহকদের চাহিদা ও আচরণ বিশ্লেষণ করতে হবেঃ
বিক্রেতাকে গ্রাহকদের পচ্ছন্দ আর অপচ্ছন্দের বিষয়টি সঠিক ভাবে জানতে হবে। বিক্রয় ফানেল প্রক্রিয়া চলমান রাখার জন্য বিক্রেতাকে গ্রাহকদের চাহিদা সম্পর্কে বুঝতে হবে।গ্রাহকদের প্রত্যাশা আগ্রহগুলি বিক্রেতা যত বেশি ভালোভাবে জানতে পারবে পণ্যের মান উন্নতিকরন,পরিবর্তন করন,নতুন চাহিদাকৃত পণ্য বাজারজাতকরন সহজ হবে।যেমন Nestle কোম্পানির ম্যাগী নুডলস বাজারে খুব জনপ্রিয় এবং তাদের নুডলসের সাথে থাকা প্যাক করা মশলাও খুব জনপ্রিয়। মশলার এই জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা করে, বাজার গবেষণা করে তারা নতুন পণ্য বাজারে আনে ম্যাজিক মশলা নামে যা বাজারে দারুণ চাহিদার যোগান দেয় এবং বিক্রয় বৃদ্ধি পায়।
২. গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবেঃ
সেলস ফানেল সক্রিয় রাখার জন্য বিক্রেতাকে গ্রাহকদের চাহিদা,প্রয়োজন,পচ্ছন্দের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় ভিন্ন রকম ডিসকাউন্ট অফার,গিফট ভাউচার দেওয়া পণ্যের প্রচার-প্রসার আর বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য খুব জরুরি। যেমন বাজারে অধিক বিক্রি হওয়া চাপাতা তাজা চা পাতার ৪০০ গ্রাম প্যাকের সাথে বিভিন্ন সময় গিফট প্রডাক্ট যেমন প্লাস্টিক কন্টেইনার, কাঁচের গ্লাস, বাটি ইত্যাদি অফারে থাকে।এবং এই অফারের জন্য অফারের সময়কার বিক্রি আরও বৃদ্ধি পায়।
৩. নিশ্চিত গ্রাহক তৈরি করতে হবেঃ
সেলস ফানেল বা বিক্রয় ফানেল তৈরি তখন সফল হবে যখন যত বেশি সম্ভাব্য গ্রাহকদের নিশ্চিত গ্রাহক হিসেবে পরিবর্তিত করে বিক্রয় নিশ্চিত করা যাবে।আর এজন্য এমন বিপণন কর্মী তৈরি করা জরুরি যারা গ্রাহকদের কাছে পণ্যের সুবিধা সুনিপুণ ভাবে বর্ণনা করতে পারে।যেমন স্বপ্ন সুপার শপে এমন অনেক বিপণন কর্মী থাকেন যারা পণ্য সম্পর্কে গ্রাহককে ডিটেইলস জানতে সাহায্য করে এবং গ্রাহককে পণ্য ক্রয়ের জন্য আগ্রহী করে তোলে।এবং গ্রাহক পণ্য সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে জেনে তা ক্রয় করে থাকে।যার জন্য সেলস ফানেলের প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমিকভাবে সামনে এগিয়ে যায়।
৪.নতুন লিড তৈরি করাঃ
সেলস ফানেলের পূর্ববর্তী তিনটি ধাপ সম্পূর্ণ হয়ে গেলে, সেলস ফানেলে যোগ করার জন্য নতুন লিড তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিক্রেতা এই পর্যায়ে এমন গ্রাহকদের লক্ষ্য করেন যারা কোন কিছু ক্রয়ের জন্য আগ্রহ করছেন না। তখন বিক্রেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই যে সেইসকল গ্রাহকদের ক্রয়ের জন্য আগ্রহী করে তোলা দক্ষতার সাথে।আর এজন্য বিক্রেতাকে কিছু লিড তৈরি করতে হয়।যেমনঃ ইমন সাহেব মায়ের দোয়া ডিপার্টমেন্ট স্টোরে প্রবেশ করেছেন লেমন ডিটারজেন্ট হুইল পাউডার,সাবান,হ্যান্ড ওয়াশ ক্রয়ের জন্য কিন্তুু ইমন সাহেব দেখলেন উনার চাহিদাকৃত হুইল ডিটারজেন্ট পাউডার নাই, ডেটল হ্যান্ড ওয়াশ, সাবান নাই যার জন্য তিনি ক্রয় করতে চাইলেন না।
কিন্তুু বিক্রেতা তাকে জানালেন রিন হুইল পাউডার ক্রয় করলে সাথে চমক ফেব্রিক ব্রাইটনার ফ্রী, স্যাভলন হ্যান্ডওয়াশ দুটো ক্রয় করলে একটা বক্স ফ্রী। এমন সব ব্র্যান্ডের প্রডাক্টে উপহার সামগ্রী অফার ফ্রী আর সাশ্রয়ী হওয়াতে ইমন সাহেব ক্রয়ে আগ্রহী হলেন এবং ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন।এখানে বিক্রেতা যে লীড তৈরি করলেন আর গ্রাহকে ক্রয়ে আগ্রহী করে তুলেন যা সেলন ফানেলের আরেকটি ধাপ সম্পন্ন করে।
৫. গ্রাহকদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবেঃ
সেলস ফানেলের এই পর্যায়ে গ্রাহক পণ্য বা সেবা ক্রয়ের খুব কাছাকাছি থাকে।এই সময় বিক্রেতা গ্রাহককে যেন ভবিষ্যতেও যোগাযোগ করতে পারে এবং প্রয়োজনে গ্রাহক নিজে থেকে আবার পণ্য বা সেবা ক্রয়ের জন্য আসে তাই বিক্রেতা গ্রাহককে মেম্বার শিপ কার্ড অফার করতে পারে।
যেমন স্বপ্ন সুপার শপে মেম্বার শিপ কার্ড গ্রহণের মাধ্যমে গ্রাহক যেমন ডিসকাউন্ট অফার পায় আর বিভিন্ন রকম অফারের তথ্য মেম্বার শিপ কার্ডে গ্রাহকের ফোন নাম্বার থাকার জন্য ফোনে মেসেজের মাধ্যমে পৌঁছে যায়।তাই গ্রাহক খুব সহজেই অফার সম্পর্কে জানতে পারে এবং প্রয়োজন মতো কেনাকাটার জন্য চলে আসে।এতে করে সেলস ফানেলের কার্যকারীতা বৃদ্ধি পায়।
উপসংহারঃ
একজন বিক্রেতার জন্য সেলস ফানেল বা বিক্রয় ফানেল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।গ্রাহক পণ্য বা সেবা পচ্ছন্দ করা থেকে শুরু করে অর্থের বিনিময়ে পণ্য বা সেবা ক্রয় করাই হচ্ছে একজন বিক্রেতার জন্য সেলস ফানেল। কিন্তুু বিক্রয় সম্পন্ন হয়ে গেলেই সেলস ফানেলের কাজ শেষ হয়ে যায় না।সেলস ফানেলের প্রক্রিয়াগুলো নিত্যনতুন ভাবে আরও বেশি কার্যকর করার জন্য বিক্রয়ের তথ্য গুলো লিপিবদ্ধ করা এবং গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সেলস বৃদ্ধিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে এমন সব প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমিক ভাবে শুরু করা ব্যবসায়ের জন্য জরুরি।









