সেলস বা বিক্রয় হচ্ছে দুই বা তার অধিক পক্ষের মধ্যে লেনদেন করা যেখানে ক্রেতা অর্থের বিনিময়ে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান পণ্য, সেবা বা সম্পত্তি গ্রহণ করে থাকে। এককথায়, মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে দুইটি পক্ষের মধ্যে পণ্য বা সেবার আদান-প্রদানকে সেলস বা বিক্রয়(Sales) বলে।
ধরুন, আপনি আপনার ছোট বোনকে ৫০০০ টাকা দামের একটি জামা কিনে দিলেন। এটি কি বিক্রয়? না, কারণ এখানে আপনি আপনার ছোট বোনকে উপহার হিসাবে জামা দিয়েছেন। মুনাফার উদ্দেশ্যে নয়। তার মানে বিক্রয় হতে হলে তিনটি শর্ত থাকতে হবে। ১. কমপক্ষে দুইটি পক্ষ থাকবে ২. পণ্য বা সেবার আদান প্রদান ৩. মুনাফার উদ্দেশ্য।আপনি আপনার ছোট বোনকে গিফট দেওয়ার জন্য যখন দোকান থেকে জামা বিক্রেতার থেকে ক্রয় করেছেন অর্থের বিনিময়ে তখন সেটা বিক্রেতার জন্য সেলস ছিলো কারন জামা বিক্রয়ের মাধ্যমে সে মুনাফা অর্জন করেছে।
কিভাবে সেলস কাজ করে
১. গ্রাহকের সাথে পরিচিত হোনঃ
সেলসের জন্য প্রথমেই আপনার গ্রাহকের সাথে পরিচিত হতে হবে।আপনার পণ্য সম্পর্কে তাকে আগ্রহী করে তোলার আগে আপনার গ্রাহককে বুঝতে হবে। গ্রাহক কি ধরনের পণ্য পছন্দ করতে পারে। আপনি যদি একজন গ্রাহক সম্পর্কে জানেন তাহলে আপনি অনুমান করতে পারবেন গ্রাহক কি ধরনের পণ্য চায়।যেমন Walton তাদের ব্রাঞ্চ গুলোতে বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে থাকেন।তাদের কাজ হচ্ছে সময় নিয়ে গ্রাহক কেমন পণ্য চাচ্ছেন, গ্রাহকের বাজেট কেমন,গ্রাহক তার বাজেট কৃত পণ্য কি কি ধরণের সুবিধা চাচ্ছেন এসকল কিছু বিস্তারিত জানা এবং সেই অনুযায়ী কোম্পানিকে তথ্য দিয়ে সেলস বৃদ্ধিতে সহায়তা করা তাদের কাজ।
২. প্রতিযোগি কোম্পানিদের তথ্য সংগ্রহ করাঃ
বাজারে একই পণ্যের অনেক কোম্পানি থাকে।প্রতিযোগিতার বাজারে সেলসে টিকে থাকতে হলে প্রতিযোগি কোম্পানিদের পণ্য এবং দাম সম্পর্কে একটা ধারণা থাকতে হবে।যেমন বাংলাদেশে ওয়াশিং মেশিনের চাহিদা এখন দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।বিদেশি কোম্পানি Whirlpool washing machine ভালো সার্ভিস দেওয়ায় দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ার পরও বাজারে একচেটিয়া চাহিদা থেকেছে সব সময়।কিন্তুু এখন আমাদের দেশী পণ্য Walton brand তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে ভালো সার্ভিস দেয় এমন ওয়াশিং মেশিন বাজারে আনায় তার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৩. আপনার পণ্য/সেবার মান প্রদর্শনঃ
আপনি যে পণ্যটি বিক্রয় করবেন তার মানের উপর নির্ভর করবে গ্রাহক বিক্রয়। বিক্রয় বৃদ্ধির লক্ষে অবশ্যই পন্যের মানের উপর নজর দিন। যদি পন্যের মান ভালো হয় তাহলে গ্রাহক খুশি হবে এবং সে পুনরাই পণ্যটি ক্রয় করবে। এখানেই শেষ না গ্রাহকের কাছে যদি পণ্যের মান ভালো লাগে সে তখন আরেকজনকে বলবে। এভাবেই আপনার বিক্রয় বৃদ্ধি পাবে।যেমন RFL এর প্লাস্টিকের ফুড গ্র্যাড পণ্যের মান এত ভালো যে তাদের কাস্টমাররাই তাদের পণ্যের প্রচার করে আর যার ফলে তাদের সেলস এমনিতেই সংঘটিত হয় এবং তা পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে।
৪. একই পণ্য বিভিন্ন মানের রাখাঃ
সেলসের জন্য আপনার শপে একই ক্যাটাগরির পণ্য বিভিন্ন মানের রাখতে হবে যেন বিভিন্ন কাস্টমার তাদের বাজেট আর চাহিদা অনুযায়ী পণ্য ক্রয় করতে পারে আর সেলস অপরিবর্তিত থাকে। যেমন এখনকার সময় স্মাটফোন ক্রয়ের গ্রাহক অনেক। কিন্তুু সবার পচ্ছন্দ আর বাজেট ভিন্ন। তাই শপে Oppo, Vivo, One plus প্রভৃতি ব্র্যান্ডের ফোন সংগ্রহে রাখতে হবে।
৫. সকল জায়গায় প্রোডাক্ট নিশ্চিত করা:
সেলসের জন্য যে নিয়ম আপনার ফলো করা উচিত সেই নিয়ম হচ্ছে প্রত্যেকটি দোকানে প্রোডাক্ট নিশ্চিত করা। কারণ দিন শেষে এই পন্থাটি আপনাকে সেলসের সবচাইতে বড় সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। কারণ সেলসের অপর নামই প্রোডাক্ট দোকানে নিশ্চিত করা। প্রডাক্টস সেলস করার জন্য যতগুলো দোকান আপনি বৃদ্ধি করবেন ততই আপনার সেলস দিনকে দিন বাড়তে থাকবে এটা খুবই সহজ একটি পন্থা।যেমন রিন ডিটারজেন্ট ব্র্যান্ডের চাইতে হুইল ডিটারজেন্ট ডিমান্ড বেশি। এখন রিন যদি সব সময় এলাকার সব ডিপার্টমেন্ট স্টোরে পণ্য দিয়ে রাখে তখন দোকানদার নিজেই ক্রেতার কাছে বিক্রয়ের জন্য বা সেলসের জন্য চেষ্টা জারি রাখবে।
৬. প্রোডাক্ট দৃষ্টিগোচর করা:
কথায় আছে আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী।সেলসের জন্য প্রোডাক্ট গুলো যেন চোখের সামনে দেখা যায় তার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। নইলে আপনার যে ক্রেতা সে কখনোই প্রোডাক্ট দেখবো হবে না এবং সেটা কেনার ইচ্ছা পোষণ করবে না। তাই যথাসম্ভব পন্য টিকে তার চোখের সামনে প্রদর্শন করে রাখুন। আপনার কোম্পানির যদি কোন লিফলেট, বান্টিং, স্টিকার বা যা আছে তাই দিয়ে দোকান সাজান ও ক্রেতার সামনে সুন্দরভাবে প্রদর্শন করুন।যেমন ডিপার্টমেন্ট স্টোর গুলোতে ক্যাশে যেখানে টাকা নেয়া হয় সেখানে বিভিন্ন রকম পণ্য সাজিয়ে রাখা হয় যেন কাস্টমারের চোখে পরতেই নতুন কিছু বা প্রয়োজনীয় কিছু কাস্টমার কিনে নেয়।
৭. আকর্ষণীয় অফারঃ
অনেক কোম্পানি তাদের বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য তাদের পন্যের সাথে আকর্ষণীয় অফার দেয়। যেমন- একটি কিনলে একটি ফ্রি, অথবা এই পণ্যটি কিনলে টিভি, ফ্রিজ দেওয়া হবে। এভাবে আরও অনেক কিচুর অফার দিয়ে ক্রেতাকে আকর্ষণ করে তাদের বিক্রয় বৃদ্ধি করে থাকে। ফলে তাদের মুনাফা বৃদ্ধিও সম্ভব।যেমন কুরবানির ঈদ কে সামনে রেখে সব ফ্রীজ কোম্পানি গুলো আকর্ষণীয় সব অফারে সেলসের জন্য অনেক সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
৮. বিজ্ঞাপন দেওয়াঃ
সেলসের জন্য বিজ্ঞাপন একটি বড় মাধ্যম। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহকরা যে কোন পণ্য সম্পর্কে সহজেই জানতে পারছে। তাইতো এখন বেশিরভাগ কোম্পানি তাদের বিক্রয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিজ্ঞাপনের জন্য কিছু টাকা আলাদা বিনিয়োগ হিসেবে করে। বিজ্ঞাপন অনেক ভাবেই করা যায়। টিভিতে, রেডিওতে, পত্রিকায়, অনলাইনে আরও অনেক ভাবে। বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে অনলাইন মার্কেটিং। সল্পখরচে আপনি আপনার পন্যের বিজ্ঞাপন দিতে পারছেন। আর এখন অনেকেই অনলাইন থেকে মার্কেট করে থাকে। সুতরাং আপনার সেলসের জন্য বিজ্ঞাপন সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।যেমন এখন অনেকেই খুব বেশি ফেইসবুকে এক্টিব থাকে তাই ফেইসবুকে বুস্টিং এর মাধ্যমে পেইজ বুস্ট করে ও বিভিন্ন রকম এড ক্লিপ ব্যবহার করে পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে পণ্য সম্পর্কে কাস্টমারকে সহজেই জানানো যাচ্ছে।
৯. সেলসের নতুন কৌশল আয়ত্ত করাঃ
সেলসের জন্য অনেক ধরনের কৌশল আছে। সেগুলো সম্পর্কে জানলে আপনার সেলস বৃদ্ধি করা সম্ভব।যেমন এখন কুড়কুড়ে ১০ টাকার প্যাকেট চিপস খেয়ে কেএফসিতে জমা দিলে ১৫০ টাকার ক্রিসপি চিকেন ফ্রাই পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই এই চিপস খায় না কিন্তুু এখন খাচ্ছে আবার অনেকের কেএফসিতে এখন যাওয়ার প্লান নাই কিন্তুু এখন যাচ্ছে আর সাথে ১৫০ টাকা ফ্রী ক্রিসপি ফ্রাইয়ের সাথে আরও খাবার অর্ডার করছে তাতে করে দুই কোম্পানির সেলস বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১০. পণ্যের মোড়কঃ
অনেক ক্রেতা পন্যের মোড়ক কেমন আর তা কতটা আকর্ষণীয় তা দেখে পণ্য ক্রয় করে থাকে। আকর্ষণীয় ভাবে পন্যের মোড়ক তৈরি করা হলে সেটার জন্য সেলস অনেক বৃদ্ধি পায়।যেমন বাচ্চাদের চিপসের প্যাকেট গুলো বিভিন্ন আকর্ষণীয় মোড়ক হয় আর রং থাকে অনেক ভিন্নতা যা সহজেই বাচ্চাদের পচ্ছন্দের তালিকায় থাকে।
১১. গ্রাহককে সুবিধা প্রধানঃ
মানুষ আসলে পণ্য ক্রয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন রকম সুবিধা পাওয়ার আসা রাখে। পণ্যের বৈশিষ্ট্য বলার পাশাপাশি পণ্যটি ব্যবহার করলে কী কী সুবিধা বা উপকারিতা পাওয়া যাবে, সেদিকে বেশি ফোকাস করতে হবে। ক্রেতার ইচ্ছেটাকে পণ্যের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে হবে।যেমন RFL কোম্পানি গ্রাহকের চাহিদা, পচ্ছন্দ মাথায় রেখে বিভিন্ন দামের,ডিজাইনের,রং এর,সাইজের পানির জগ বাজারে আনে আর বিভিন্ন রকম সুবিধা আর কেনাকাটায় ডিস্কাউন্টের অফার রাখে। যার কারনে সেলস হয় প্রচুর কারন নিত্য ব্যবহার্য জিনিসের মধ্যে পানির জগ একটা অতি ব্যবহৃত পণ্য।
১২. ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ক্রেতা তৈরিঃ
অনেক সময়ে সম্ভাব্য ক্রেতা পণ্য কিনতে আসেন না, তাঁরা আসেন ঘোরাঘুরি করে পণ্য সম্পর্কে আগাম ধারণা নিতে। সেটা বোঝার পরও তাঁর সঙ্গে এমন আন্তরিক ব্যবহার দেওয়া উচিত- যেন তিনি কিছু কিনে ফেলেছেন! তাঁকে পুনরায় আসার আমন্ত্রণ জানাতে হবে। খুব ভালো হয়- তাঁর মুঠোফোন নম্বর ও ইমেইল চেয়ে নিয়ে লিখে রাখলে, যেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে কেনার বাসনাটাকে জাগ্রত/চাঙ্গা রাখা যায়।যেমন সপ্ন ডেইলি শপিং এ তারা তাদের প্রতিদিনের অফার মেসেজর মাধ্যমে তাদের গ্রাহককে জানিয়ে দেয়।সবাই কিন্তুু ক্রয় করতে আসে না কিন্তুু আবার অনেকেই হয়ত পণ্যটি পরে ক্রয় করতো কিন্তুু অফারের কারনে তা আগেই ক্রয় করে নেয় আর সেলস সংঘটিত হয়ে যায়।
১৩. বাজারের অবস্থা সম্পর্কে ধারনাঃ
আপনার পণ্যটি সম্পর্কে গ্রাহকের মন্তব্য জানুন। বর্তমান বাজারে আপনার পণ্যটির অবস্থান জানার চেষ্টা করুন। এছাড়া আপনার বাজারের অবস্থা জানলে আপনি ভাবতে পারবেন কিভাবে আর কি করলে সেলস সম্ভব।যেমন ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আলাদা করে গ্রাহকের মন্তব্যের জন্য খাতা রাখা হয় আর তার দরুন অনেক পরিবর্তন আসছে তাদের সার্ভিস গুলোতে।নারী আর পুরুষ উভয়ের জন্য আলাদ করে ক্যাশ কাউন্টার, রিপোর্ট কাউন্টার,ব্লাড কাউন্টার করা হয়েছে যা সত্যি প্রশংসনীয় আর সুবিধাজনক।
উপসংহার
সেলস বা বিক্রয় হলো একটি প্রক্রিয়া যা পুনরাবৃত্তিযোগ্য পদক্ষেপগুলির একটি সেট যা একজন বিক্রয় ব্যক্তি একজন সম্ভাব্য ক্রেতাকে সচেতনতার প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিক্রয় পর্যন্ত নিয়ে যেতে নেয়। সাধারণত একটি সেলস বা বিক্রয় সংঘটিত হয় দুটি পক্ষের কথাবার্তা আদান প্রদানের মাধ্যমে, পণ্য দেখানো,পণ্য পচ্ছন্দ করা,দামাদামি করা,দাম নির্দিষ্ট করা,আর্থিক লেনদেন করা মুনাফার জন্য আর সর্বশেষ গ্রাহককে পণ্য ক্রয়ের সাথে সাথে গ্রাহক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা যেন গ্রাহক পুনরায় ক্রয়ের জন্য আসে আর সেলস নিশ্চিত হয়।









