GeoRenus Editorial Team

স্টার্টআপ কি? কোনো আইডিয়া, টেকনিক কিংবা স্ট্র্যাটেজি এর শুরু? অনেকটা তেমনই। স্টার্টআপ কথাটির মধ্যেই এর বেসিক আইডিয়া চলে আসে। সিম্পলি, স্টার্টআপ হল “টু স্টার্ট সামথিং নিউ”। এখন এটা হতে পারে কোনো বিজনেস, কোনো আইডিয়া কিংবা কোনো টেকনোলজিস। তবে মার্কেট ও ইন্ডাস্ট্রি ফিল্ডে স্টার্টআপ বলতে নতুন এবং ইনোভেটিভ বিজনেস, প্রোডাক্ট লঞ্চ, সার্ভিস অফারিং এগুলোকেই বোঝায়।
ক্লাস, মিটিং কিংবা ভিডিও কনফারেন্স, সবার আগে এখন মাথায় আসে Zoom প্লাটফর্ম টির কথা। ২০১১ সালে ডিজিটালাইজেশন আর কমিউনিকেশন এর ডিমান্ড কে মাথায় রেখে তৈরি করা এক কোম্পানি। খুব কম সংখ্যক মানুষ এর নাম জানতো আর এখন এর আছে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ভ্যালুয়েশন।
এখানেই স্টার্টআপ এর আসল মিস্ট্রি। স্টার্টআপ কোম্পানি গুলো শুরুই হয়, আপকামিং ডিমান্ড, প্রেডিকশন আর সম্ভাবনার ওপর বেজ করে। এখানে হয় সাকসেস নয়ত প্যাথেটিক ডাউনফল। তবুও এই রিস্কি কিন্তু সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ উদ্দোক্তাদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। ভার্চুয়াল ডিপেনডেন্স এর কথা মাথায় রেখে একে একে অ্যামাজন, জুম, ইন্সটাকার্ট এর মত জায়ান্ট প্লাটফর্ম গুলো তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এখন ১৫০ মিলিয়ন স্টার্টআপ কোম্পানি আছে।
সব বিজনেস এর ই তো একটা স্পেসিফিক স্টার্টিং পয়েন্ট থাকে। তাহলে, প্রশ্ন আসতে পারে, স্টার্টআপ কে আলাদা ভাবে মার্ক করা হল কেন?
প্রথমত স্টার্টআপ কোনো ট্রেডিশনাল বিজনেস নয়। স্টার্টআপ হল কিছুটা অন ডিমান্ড ও অন গোয়িং প্রবলেম সলভিং উদ্যোগ এর মত।
উদাহরণস্বরূপ, সবাই ট্রেডিশনাল ওয়ে তে সিজনাল ফল বিক্রি করছে, আপনিও শুরু করলেন। এটাকে স্মল বিজনেস বলা যেতে পারে। স্টার্টআপ নয়।
তবে, আপনি দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অফ-সিজনাল ফল এনে সারাদেশে হোম ডেলিভারি দেওয়ার উদ্যোগ নিলেন। এতে করে গ্রাহকরা যারা অফ-সিজনে ফল ক্রেভিং করছে কিংবা লোকেশনের কারণে সার্ভিস নিতে পারছে না, তাদের প্রবলেম সলভ করার একটা ওয়ে বের করলেন। মোট কথা, আপনার টার্গেট অডিয়েন্স এর স্পেসিফিক ডিমান্ড ফুলফিল করার উদ্দোগ নিলেন। এটাই হবে আপনার স্টার্টআপ বিজনেস।
স্টার্টআপ জিনিসটা আরো ভাল ভাবে বোঝার জন্য এর মূল বৈশিষ্ট্য গুলো এনালাইসিস করা যেতে পারে-
আগেই বলেছি স্টার্টআপ হবে ইনোভেটিভ, নোভেল সল্যুশন এর এক্সপ্লোরেশন। টেকনোলজিস এবং ক্রিয়েটিভিটি ব্যাবহার করে টার্গেটেড অডিয়েন্স এর অন গোয়িং সমস্যা গুলোর একটা সমাধান বের করা।
স্টার্টআপ এর একটা বেসিক গোল হচ্ছে ফাস্ট গ্রোথ। কারন আপনি যে সমস্যা কে বেইজ করে স্টার্টআপ শুরু করেছেন, একটা সময়ে সেটা নাও থাকতে পারে। অথবা একই সমাধান নিয়ে অসংখ্য উদ্দোক্তা কাজ শুরু করছে। তাই স্টার্টআপ আপের শুরুই থেকেই একটা ফাস্ট গ্রোথ এর কথা মাথায় রাখতে হয়।
স্টার্টআপ এ যেমন আছে দ্রুত সফল হওয়ার সম্ভাবনা। আবার আছে অসম্ভব রিস্ক এবং অনিশ্চয়তাও। অর্থাৎ, আপনার আইডিয়া লঞ্চ করার আগে ইফেক্টিভ মনে হলেও, মার্কেটে আনার পর এটা আশানুরূপ রেজাল্ট নাও দিতে পারে। এছাড়াও ভয় থাকে, অন্য কোনো স্টার্টআপ হয়ত এর থেকেও ভাল সল্যিয়ুশন নিয়ে আসবে।
ইনিশিয়াল অবস্থায় স্টার্টআপের রিসোর্স থাকে একদম লিমিটেড। কারণ আইডিয়া টা একদম নতুন। আপনি এই বিষয় মার্কেট রিসার্চ, কম্পিটিটর রিসার্চ করার ও এনালাইসিস এর জন্য যথেষ্ট তথ্য পাবেন না।
স্টার্টআপ একটা চ্যালেঞ্জিং, আনসার্টেইন এবং প্রেডিকশন বেইসড উদ্যোগ। এই কারণে, এখানে সাকসেসফুলি গ্রো করতে চাইলে একটা স্ট্র্যাটেজিক ওয়ে তে শুরু করতে হবে।
ক্লিয়ার একটা গোল রাখা এবং একটা সমস্যা সমাধানের মিশন রাখা স্টার্টআপ এর মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট বিষয়। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বিজনেস প্রোসপেক্ট স্টাডি তে দেখা যায়, ৪৯ পার্সেন্ট স্টার্টআপ কোম্পানি ধ্বসে পড়ে একটা ক্লিয়ার এইম বা গোল না থাকার কারণে।
অর্থাৎ একটা স্টার্টআপের শুরু তে স্ট্রং মোটিভ না থাকলে ব্রান্ড রিকগনিশন, রেপুটেশন এবং রিচ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি, বিজনেস প্রেফিট এনালাইসিস, আলটিমেট গোল ফুলফিল করা সম্ভব হয় না। মোটকথা, একটা নতুন আইডিয়া ইন্ট্রোডিউস করলেই হবে না, এই আইডিয়ার মাধ্যমে কি এচিভ করতে চাচ্ছেন সেটা ক্লিয়ার থাকতে হবে।
মার্কেটিং রিসার্চ হল সেকেন্ড মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট ফ্যাক্ট। কারণ, মার্কেট বর্তমানে কোন জিনিসটির ভ্যালু বেশি। কাস্টমারদের ডিমান্ড কোন সেক্টরে বেশি এটা খুজেঁ বের করতে হবে। এটার ওপর ই আপনার স্টার্টআপ সাকসেস ডিপেন্ড করবে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশের কালচার, নর্মস এবং বিলিভ এর ওপর ভিত্তি করে মার্কেট ডিমান্ড গড়ে উঠে। সহজ কথায়, অনেক কাস্টমার স্টার্টআপের থেকে ট্রেডিশনাল বিজনেস গুলোকে বেশি ক্রেডিবল ও সাসটেইনেবল মনে করে।
তাই মার্কেট রিসার্চ এর মাধ্যমে আপনার টার্গেট অডিয়েন্স কি চায়, আপনার কম্পিটিটর রা কিভাবে মার্কেট এ টিকে আছে এগুলো রিসার্চ করতে হবে। আলটিমেট গোল হবে কম্পিটিটর দের থেকে বেটার সল্যুশন ইন্ট্রডিউস করা। এবং ট্রেডিশনাল মার্কেট ডিপেডেন্ট কাস্টমার দের কে আপনার স্টার্টআপ এর দিকে ড্রাইভ করা।
স্টার্টআপ কোম্পানি একজন ব্যক্তির পক্ষে একা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আইডিয়া জেনারেট করা সম্ভব হলেও, কোনোভাবেই সাকসেসফুলি গ্রো করা পসিবল নয়। এক্ষেত্রে একটা স্ট্রং টিম ওয়ার্কের কোনো বিকল্প নেই।
তাই স্কিলড, ওয়ার্ক ওরিয়েন্টেড এবং সেইম ভিশন ও পার্সপেক্টিভ শো করে এমন টিম মেম্বার সিলেকশন করতে হবে।
আপনি দেখবেন ইন্ডাস্ট্রি তে জায়ান্ট যেসব প্লাটফর্ম গুলো আছে সেগুলো একটি সিঙ্গেল আইডিয়া থেকে শুরু হলেও, সাকসেসফুলি গ্রো করেছে পাওয়ারফুল টিম ওয়ার্কের কারণে। টিমস্টেজ এর একটি স্টাডি, “ইম্পর্ট্যান্স অব কোলাবোরেশান” এ উঠে এসেছে, একটি স্টার্টআপ কোম্পানির ৯৯.১ শতাংশ সাকসেস ই নির্ভর করে পাওয়ারফুল টিম ওয়ার্কের ওপর। অর্থাৎ আপনার টিম সিলেশন ও টিমের সাথে কোলাবোরেশান ওপরে প্রায় শতভাগ নির্ভর করছে আপনার স্টার্টআপ সাকসেস।
কাস্টমারের ডিমান্ড ফুলফিল করা, তাদের রিসেন্ট সমস্যার সমাধান করা ই হচ্ছে স্টার্টআপ এর অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। আর ইউজার এক্সপেরিয়েন্স একটা ব্রান্ডের ক্রেডিবিলিটি নিশ্চিত করতে ও রেপুটেশন বৃদ্ধি করতে সবচেয়ে ইফেক্টিভ ভাবে কাজ করে। অর্থাৎ কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স যত বেশি স্যাটিসফেক্টরি হবে, সেলস ড্রাইভ তত বেশি হবে।
৮৯ শতাংশ কাস্টমার ই প্রিভিয়াস রিভিউ, কাস্টমার ফিডব্যাক ও কমেন্ট কে ক্রেডিবিলিটি প্যারামিটার মনে করে। তাই সাকসেসফুল স্টার্টআপ এর জন্য ফোকাস করুন কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স এ।
একটা রোবাস্ট ফাইনান্সিয়াল প্লান ছাড়া কিন্তু স্টার্টআপ এ টিকে থাকা সম্ভব নয়। কারণ ট্রেডিশনাল বিজনেস গুলোর ক্ষেত্রে আপনি আগে থেকেই আইডিয়া নিতে পারবেন খরচ, লাভ, ইনভেস্টমেন্ট সম্পর্কে। কিন্তু স্টার্টআপ এর ক্ষেত্রে আপনাকে একটা প্রেডিকশন এর ওপর নির্ভর করতে হবে। আর, দেখা যায় আশি শতাংশ ইনভেস্টর স্টার্টআপ এর থেকে গতানুগতিক ধারার ব্যবসা গুলোতে ইনভেস্ট করা বেশি রিলায়েবল মনে করে।
আবার বাকি ২০ শতাংশ কে আপনার কনভিন্স করতে হচ্ছে আপনার স্টার্টআপ বিজনেস এ ইনভেস্ট করার জন্য। এই কারণে স্টার্টআপ এর ক্ষেত্রে একটা লজিক্যাল, রোবাস্ট ও ক্লিয়ার ফাইনান্সিয়াল প্লান জরুরি।
স্টার্টআপ এর শুরু করার আগে মার্কেট এর রুলস এবং রেগুলেশন সম্পর্কে একটা ক্লিয়ার ধারণা রাখে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নমেন্ট বিজনেস লাইসেন্স সংস্থার একটি অ্যানুয়াল রিপোর্ট এ দেখা যায়, বেশির ভাগ স্টার্টআপ বিজনেস আইডিয়া রুলস এবং রেগুলেশন না মানার কারণে পারমিশন ম্যানেজ করতে পারে না। কিংবা স্টার্টআপ শুরুর পরেও স্টেট ল কিংবা বিজনেস ল’, ভোক্তা অধিকার আইনের মত বিষয় গুলোতে আটকে যায়। তাই আপনার টার্গেটেড স্টার্টআপ বিজনেস আইডিয়া যেন শুধু আইডিয়া ই থেকে না যায়। এজন্য রিলেভ্যান্ট সকল আইন ও নিয়মকানুন সম্পর্কে বিস্তারিত আইডিয়া রাখুন।
স্টার্টআপের অন্যতম বিগেস্ট সাকসেস উবার এর কথা না বললেই নয়। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট প্রবলেম কিংবা এমারজেন্সি ট্রান্সপোর্ট এর কথা মাথায় রেখে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় উবার। শুরুতে মাত্র উন্নত বিশ্বের কয়েকটি দেশের জন্য এই এপস চালু থাকলেও এখন এটি সারা বিশ্বে বিস্তৃত হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশে, রাজধানী ঢাকায়, উবার এর ব্যপক জনপ্রিয়তা দেখা গিয়েছে।
অন ডিমান্ড রাইডিং, রিয়াল টাইম ট্র্যাকিং ও ইউজার ফ্রেন্ডলি এক্সপেরিয়েন্স এর কারণে উবারের ফাস্ট গ্রোথ পসিবল হয়েছে। ব্যস্ততম নগরীর সিটিজেনদের রেগুলার লাইফের প্রবলেম এর একটা পার্ফেক্ট সল্যুশন নিয়ে কাজ করেছে। তাই, তাদের গ্রোথ টাও রিমার্কেবল হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালের স্টাডি অনুযায়ী উবারের ভ্যালুয়েশন এখন ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
জুম হচ্ছে বর্তমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিও কনফারেন্সিং প্লাটফর্ম, যেটা ইউজারদের রিমোটলি মিট ও কোলাবোরেট করার সুযোগ দেয়।
২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই প্লাটফর্ম টি অল্প বিনিয়োগ ও টিম মেম্বার নিয়ে বিল্ড করা হলেও, বর্তমানের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভিডিও কনফারেন্স প্লাটফর্মের খেতাব জিতে নিয়েছে। স্পেশালি প্যানডেমিক টাইমে রিমার্কেবল গ্রোথ এর সাক্ষী হয়েছে। ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভ্যালুয়েশনের এই প্লাটফর্ম টিকে এখন বলা হয়, “ইউনিকর্ন অব রিমোট স্টার্টআপ এক্সিলেন্স”।
এছাড়াও, কিকস্টার, Airbnb, Slack, স্ট্রাইপ, রিটার্ন, প্যারালেল হেলথ, পারফর্ম এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফুডপান্ডা, টেন মিনিট স্কুল কিংবা লেট নাইট ফুড ডেলিভারি সার্ভিস Munchies হল সাকসেসফুল, ট্রেন্ডিং ও ডিমান্ডিং স্টার্টআপ কোম্পানি।
স্টার্টআপ এর অপর নাম বলা যায় চ্যালেঞ্জ । অর্থাৎ আপনি একটা কারেন্ট ও অন গোয়িং সমস্যার সমাধান করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন৷ এ কারণে বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এবং এগুলোকে ফেইস করার মত পাওয়ারফুল মানসিকতা রাখতে হবে। আর একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, সেইম প্রবলেম এর অসংখ্য সমাধান আসবে। আপনার মত হাজার উদ্দোক্তা স্টার্টআপের পরিকল্পনা করছে। এদের কে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হলে ফোকাস থাকুন আপনর লক্ষ্যে। এবং ১৫০ মিলিয়ন স্টার্টআপ কোম্পানির ভীড়ে নিজের পরিচয় গড়ে তুলুন।

মূলত ব্যবসা শুরু করার আগে যেকোনো উদ্যোক্তাকে একটা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান নিয়ে আগাতে হয়, তার ব্যবসার সকল কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে কিভাবে পরিচালনা করবেন! সনাতনী পদ্ধতি অনুসরণ করে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখার চেয়ে বিজনেস মডেল ক্যানভাস অনুসরণ করা অধিকতর সহজ এবং কার্যকর। কারণ এই মডেল ব্যবহার করে আপনি নয়টি ব্লক তৈরি করে একটা পৃষ্ঠায় সবকিছু আলোকপাত করতে পারবেন যা আপনার নিজের এবং ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যাক্তির বুঝতে অনেকটা সহজ হবে।








