সাইক্স-পিকো চুক্তি কী
আজ যদি আপনি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র খোলেন, দেখবেন ইরাক আর সিরিয়ার সীমান্ত প্রায় সোজা একটি রেখা। জর্ডান আর সৌদি আরবের সীমান্তও অদ্ভুতভাবে সরলরেখায় টানা। কোনো নদী অনুসরণ করে না, কোনো পাহাড় ধরে যায় না, কোনো জাতিগত বা ভাষাগত বিভাজন অনুসরণ করে না।
কারণটা সহজ — এই সীমান্তগুলো মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ টানেনি। হাজার মাইল দূরে বসে দুজন ইউরোপীয় কূটনীতিক একটি মানচিত্রের উপর রুলার দিয়ে লাইন টেনে এই সীমান্ত ঠিক করেছিলেন।
সেই দুজন হলেন ব্রিটেনের স্যার মার্ক সাইক্স এবং ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকো। ১৯১৬ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক মাঝখানে, তারা গোপনে একটি চুক্তি করেছিলেন — যেটা অটোমান সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ড ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিল।
এই চুক্তির নাম সাইক্স-পিকো চুক্তি (Sykes-Picot Agreement)। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি পরিচিত "Asia Minor Agreement" নামে। এই একটি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতা চিরতরে বদলে দিয়েছে — এবং এর প্রভাব আজ, একশো বছর পরেও, প্রতিদিনের সংবাদে দেখা যায়।
চুক্তির প্রেক্ষাপট — কেন এই গোপন ভাগাভাগি
অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের প্রারম্ভ
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়। এটা ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জন্য সুযোগ তৈরি করে। কারণ অটোমান সাম্রাজ্য তখন আরব উপদ্বীপ, মেসোপটেমিয়া (আজকের ইরাক), সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও আনাতোলিয়া শাসন করত।
অটোমান সাম্রাজ্য তখন প্রায় ৬০০ বছর ধরে এই অঞ্চল শাসন করছিল। কিন্তু ১৯ শতকের শেষ দিক থেকে সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করে। একে তখন ইউরোপে বলা হতো "ইউরোপের অসুস্থ মানুষ" (Sick Man of Europe)।
ব্রিটেন ও ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা করছিল। সুয়েজ খাল (১৮৬৯ সালে চালু) ব্রিটেনের জন্য ভারত যাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। ফ্রান্সের লেভান্ট অঞ্চলে (সিরিয়া ও লেবানন) দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল। যুদ্ধ সেই সুযোগ এনে দিল।
আরব বিদ্রোহ এবং ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতি
১৯১৫ সালে ব্রিটেন মক্কার শরিফ হুসেইন ইবনে আলির সাথে একটি গোপন পত্রবিনিময় করে — যা ইতিহাসে পরিচিত "হুসেইন-ম্যাকমাহন পত্রবিনিময়" নামে। ব্রিটেনের মিশরে হাইকমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমাহন হুসেইনকে প্রতিশ্রুতি দেন:
"যদি আরবরা অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তাহলে যুদ্ধ শেষে আরবদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার ব্যাপারে ব্রিটেন সমর্থন দেবে।"
এই প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে শরিফ হুসেইন ১৯১৬ সালের জুনে অটোমানদের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ শুরু করেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দা অফিসার টি. ই. লরেন্স ("লরেন্স অব আরাবিয়া") আরব বিদ্রোহীদের সাথে মরুভূমিতে যুদ্ধ করেছিলেন।
কিন্তু ঠিক যখন আরবরা ব্রিটেনের হয়ে রক্ত দিচ্ছে, সেই একই সময়ে — ১৯১৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসে — ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে সেই আরব ভূখণ্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করার চুক্তি করছে। এটাই সাইক্স-পিকো চুক্তির সবচেয়ে নৈতিক ভয়াবহতা।
গোপন আলোচনা — সাইক্স ও পিকো
ব্রিটিশ পক্ষে আলোচনা করেন স্যার মার্ক সাইক্স — ইয়র্কশায়ারের একজন সংসদ সদস্য ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ। ফরাসি পক্ষে ছিলেন ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকো — বৈরুতে ফরাসি কনসাল জেনারেল।
দুজনে কয়েক মাস ধরে গোপনে আলোচনা করেন। রাশিয়াকেও (তখন জারের শাসনে) এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় — তাকেও একটি অংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ১৯১৬ সালের ১৬ মে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়।
চুক্তির মূল বিষয়বস্তু — কে কী পেল
সাইক্স-পিকো চুক্তিতে অটোমান সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ডকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়:
ব্রিটেনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ (নীল অঞ্চল):
আজকের দক্ষিণ ইরাক — বাগদাদ থেকে বসরা পর্যন্ত। এই অঞ্চলে তেলের বিশাল মজুদ ছিল — যা ব্রিটেনের নৌবাহিনীর জ্বালানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ (লাল অঞ্চল):
আজকের লেবানন এবং দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের একটি অংশ (কিলিকিয়া)।
ব্রিটেনের প্রভাব বলয় (অঞ্চল B):
আজকের জর্ডান এবং উত্তর ইরাক (মসুল অঞ্চল)।
ফ্রান্সের প্রভাব বলয় (অঞ্চল A):
আজকের সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ অংশ — দামেস্কাস, আলেপ্পো এবং মসুল।
আন্তর্জাতিক অঞ্চল:
ফিলিস্তিন — জেরুজালেমসহ এই অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা ছিল, কারণ এখানে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম তিন ধর্মের পবিত্র স্থান রয়েছে।
ইতিহাসবিদ James Barr তাঁর 'A Line in the Sand' গ্রন্থে লিখেছেন — সাইক্স একটি মানচিত্রের উপর আঙুল রেখে বলেছিলেন, "আমি চাই 'e' অক্ষরটি (Acre থেকে) থেকে শেষ 'k' (Kirkuk পর্যন্ত) পর্যন্ত একটি লাইন।" এই একটি রেখাই মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল।
চুক্তি ফাঁস — বলশেভিক বিপ্লব ও বিশ্বাসঘাতকতার উন্মোচন
১৯১৭ সালের নভেম্বরে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব হলো। জারের সরকার উৎখাত হলো। নতুন বলশেভিক সরকার জারের সময়ের সব গোপন চুক্তি প্রকাশ করে দিল — সাইক্স-পিকো চুক্তি সহ।
তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করে অটোমান সরকারকে পাঠানো হলো। আরব বিশ্বে এটা ছড়িয়ে পড়ল। শরিফ হুসেইন এবং তাঁর অনুসারীরা বুঝতে পারলেন — ব্রিটেন একদিকে তাদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, অন্যদিকে গোপনে সেই ভূমি ফ্রান্সের সাথে ভাগ করে নিচ্ছিল।
এই বিশ্বাসঘাতকতা আরব বিশ্বে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল — যা আজও শুকায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির প্রতি যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে, তার মূল এখানেই প্রোথিত।
এবং ঠিক একই বছর — ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর — ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর আরেকটি ঘোষণা দিলেন:
"মহামান্য সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছে।" — বেলফোর ঘোষণা, ১৯১৭
একই ভূমির জন্য তিনটি পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতি — আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি (হুসেইন-ম্যাকমাহন), ব্রিটেন-ফ্রান্সের মধ্যে ভাগাভাগি (সাইক্স-পিকো), এবং ইহুদিদের জন্য আবাসভূমি (বেলফোর)। এই তিন প্রতিশ্রুতির সংঘাত আজও মধ্যপ্রাচ্যকে জ্বালিয়ে রাখছে।
চুক্তির বাস্তবায়ন — ম্যান্ডেট ব্যবস্থা ও কৃত্রিম রাষ্ট্র
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালে লীগ অব নেশনস গঠিত হলো। সাইক্স-পিকো চুক্তির সরাসরি বাস্তবায়ন না হলেও, এর মূল নকশা অনুযায়ী "ম্যান্ডেট" ব্যবস্থা চালু হলো — যেখানে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে এই অঞ্চলগুলোর "অভিভাবক" মনোনীত করা হলো।
ইরাক — তিন জাতিকে এক দেশে আটকানো
ব্রিটেন মসুল (কুর্দি ও সুন্নি আরব অধ্যুষিত), বাগদাদ (মিশ্র) এবং বসরা (শিয়া আরব অধ্যুষিত) — তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় অঞ্চলকে একত্রিত করে "ইরাক" নামক একটি রাষ্ট্র তৈরি করল।
এই তিন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার আলাদা। তাদের কোনো সাধারণ জাতীয় পরিচয় ছিল না। ব্রিটেন হাশেমি রাজবংশ থেকে ফয়সালকে এনে ইরাকের রাজা বানাল — যিনি ছিলেন আসলে হেজাজের (আজকের সৌদি আরব) মানুষ।
এই কৃত্রিম রাষ্ট্র কাঠামোর ফলাফল? দশকের পর দশক সাম্প্রদায়িক সংঘাত, সাদ্দাম হোসেনের স্বৈরশাসন, ২০০৩ সালে আমেরিকার আক্রমণ, এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধ ও ISIS-এর উত্থান।
সিরিয়া ও লেবানন — ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ
ফ্রান্স সিরিয়া অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে নিল। তারপর একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিল — লেবাননকে সিরিয়া থেকে আলাদা করে একটি পৃথক রাষ্ট্র তৈরি করল। কারণ লেবাননে ছিল বৃহৎ খ্রিস্টান মেরোনাইট জনগোষ্ঠী — ফ্রান্সের মিত্র।
কিন্তু লেবাননে শুধু খ্রিস্টান ছিল না — সুন্নি মুসলিম, শিয়া মুসলিম, দ্রুজ এবং আরও অনেক সম্প্রদায় ছিল। এই জটিল সাম্প্রদায়িক গঠনই পরবর্তীতে লেবাননের ১৯৭৫-৯০ সালের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের বীজ বপন করেছিল।
ফিলিস্তিন ও ট্রান্সজর্ডান
ব্রিটেন ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেট পেল। একদিকে আরবদের কাছে প্রতিশ্রুতি ছিল এটা আরব রাষ্ট্রের অংশ হবে। অন্যদিকে বেলফোর ঘোষণায় ইহুদিদের কাছে প্রতিশ্রুতি ছিল এখানে ইহুদি আবাসভূমি হবে।
ব্রিটেন ফিলিস্তিন থেকে জর্ডান নদীর পূর্ব অংশ আলাদা করে "ট্রান্সজর্ডান" তৈরি করল — শরিফ হুসেইনের ছেলে আবদুল্লাহকে সেখানে আমির বানিয়ে দিল। এটাই আজকের জর্ডান।
আর জর্ডান নদীর পশ্চিম পাড়ে — ফিলিস্তিনে — ইহুদি অভিবাসন বাড়তে থাকল। আরব ও ইহুদিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হলো। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো এবং শুরু হলো ফিলিস্তিনি নাকবা (বিপর্যয়) — যা আজও চলমান।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব — এক শতাব্দীর অস্থিরতা
সাইক্স-পিকো চুক্তির প্রভাব শুধু মানচিত্রের রেখায় সীমাবদ্ধ নয়। এটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
১. জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত
কৃত্রিম সীমান্ত একই জাতিকে বিভিন্ন দেশে ভাগ করেছে (কুর্দিরা তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া ও ইরানে বিভক্ত) এবং বিভিন্ন জাতিকে এক দেশে আটকেছে (ইরাকে সুন্নি, শিয়া ও কুর্দি)।
২. স্বৈরশাসনের উত্থান
কৃত্রিম রাষ্ট্রে জনগণের আনুগত্য পেতে গণতন্ত্রের বদলে সামরিক শাসনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সিরিয়ায় আসাদ পরিবার, ইরাকে সাদ্দাম — এদের উত্থান এই কৃত্রিম রাষ্ট্র কাঠামোর পরিণতি।
৩. তেল রাজনীতি
সাইক্স-পিকো চুক্তিতে মসুলের তেল সম্পদ নিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে তীব্র দরকষাকষি হয়েছিল। David Fromkin তাঁর 'A Peace to End All Peace' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগাভাগিতে তেলের ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক।
৪. ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত
একই ভূমির জন্য আরব ও ইহুদিদের কাছে পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতি — এই সংঘাতের বীজ সরাসরি সাইক্স-পিকো যুগেই বপন করা হয়েছিল।
৫. পশ্চিমা শক্তির প্রতি অবিশ্বাস
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইউরোপের প্রতি যে গভীর অবিশ্বাস, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি সাইক্স-পিকো এবং ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। এই অবিশ্বাস আজও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকে প্রভাবিত করে।
সাইক্স-পিকো আজও কেন প্রাসঙ্গিক
২০১৪ সালে ISIS যখন ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে বিশাল অঞ্চল দখল করল, তারা ঘোষণা করেছিল — "আমরা সাইক্স-পিকো সীমান্ত মুছে ফেলছি।" এই ঘোষণা দেখায় যে একশো বছর পরেও এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ (২০১১ থেকে চলমান) সাইক্স-পিকোর কৃত্রিম সীমান্তের সংকটকে আবার সামনে এনেছে। কুর্দিরা উত্তর সিরিয়ায় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তৈরি করেছে। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চল কার্যত স্বাধীনভাবে চলে।
লিবিয়া, ইয়েমেন, সুদান — এই দেশগুলোর সংকটেও ঔপনিবেশিক যুগের কৃত্রিম সীমান্তের ভূমিকা আছে। সাইক্স-পিকো মধ্যপ্রাচ্যের কথা বললেও, এই একই নীতি আফ্রিকাতেও প্রয়োগ করা হয়েছিল — বার্লিন সম্মেলনে (১৮৮৪-৮৫) আফ্রিকাকে ভাগ করা হয়েছিল একইভাবে।
Eugene Rogan তাঁর 'The Fall of the Ottomans' গ্রন্থে দেখিয়েছেন — সাইক্স-পিকো শুধু একটি চুক্তি নয়, এটি একটি মানসিকতার প্রতিফলন। ইউরোপীয় শক্তিগুলো বিশ্বাস করত তারা অন্য জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার রাখে। এই মানসিকতাই আজকের অনেক সংঘাতের মূলে।
উপসংহার
সাইক্স-পিকো চুক্তি মাত্র কয়েক পাতার একটি কাগজ ছিল। কিন্তু এই কাগজ কোটি কোটি মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। রুলার দিয়ে টানা সরল রেখাগুলো জাতিকে ভাগ করেছে, পরিবার বিচ্ছিন্ন করেছে, এবং এমন রাষ্ট্র তৈরি করেছে যেগুলো প্রথম দিন থেকেই অকার্যকর।
আরবদের সাথে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, গোপন ভাগাভাগি এবং বেলফোর ঘোষণা — এই তিনটি মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এমন একটি মধ্যপ্রাচ্য যেখানে সংঘাত ছিল অনিবার্য।
আজ একশো বছরেরও বেশি সময় পরে, সিরিয়ার ধ্বংসস্তূপে, ইরাকের সাম্প্রদায়িক বিভাজনে, ফিলিস্তিনের দখলদারিত্বে এবং লেবাননের অর্থনৈতিক পতনে — সাইক্স-পিকো চুক্তির ছায়া এখনো স্পষ্ট দেখা যায়।
ইতিহাস আমাদের শেখায় — যখন বাইরের শক্তি কোনো জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে, সেই ব্যবস্থা কখনো দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ একদিন নিজেদের সীমান্ত নিজেরা নির্ধারণ করবে — সেদিনই সাইক্স-পিকোর অভিশাপ শেষ হবে।










