ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস কী? কীভাবে করবেন?

587
article image

যে পরিমাণ পণ্য বা সেবা বিক্রয় করলে আপনার ব্যবসায় থেকে লাভ বা ক্ষতি কোনোটাই হবে না, সেই পরিমাণ বের করা এবং সেই পরিমাণ পণ্য কিভাবে বিক্রয় করা যায় তার কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা’ই হচ্ছে ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস। ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট হচ্ছে সেই পয়েন্ট যেখানে ব্যবসায়ের আয় এবং ব্যয় সমান হয় অর্থাৎ, লাভ বা ক্ষতি কোনোটাই থাকে না।

Key Points

  • ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট হচ্ছে সেই বিন্দু, যেখানে আপনার ব্যবসায়ে বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ থেকে আসা রিটার্ন সমান হবে।
  • যেকোনো বিনিয়োগের ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট বের করে তা অর্জনের জন্য কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা’ই হচ্ছে ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস।
  • ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট = স্থায়ী ব্যয় / (প্রতি একক পণ্যের বিক্রয়মূল্য - প্রতি একক পণ্যের পরিবর্তনশীল ব্যয়)
  • স্থায়ী ব্যয় : স্থায়ী ব্যয় বলতে সেসব খরচকে বোঝানো যেগুলো সাধারণত উৎপাদনের পরিমাণের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় না।
  • পরিবর্তনশীল ব্যয় : পরিবর্তনশীল ব্যয় বলতে সেসব খরচকে বোঝানো হয় যেগুলো সাধারণত উৎপাদনের পরিমাণের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে।

ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস

ব্যবসায়ের লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা অর্জন করা। যেকোনো উদ্যোক্তা মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য নিয়েই ব্যবসায় হাত দিয়ে থাকেন। তবে ব্যবসায়টি থেকে আদৌ মুনাফা অর্জন করা সম্ভব কি না অথবা কোন পর্যায়ে পৌছালে বিনিয়োগের টাকা উঠে এসে মুনাফা অর্জন শুরু হবে তা আগে থেকেই জেনে নেয়া দরকার। কীভাবে জানবেন? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস-এর মাধ্যমে।

ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস আমাদের জানতে সাহায্য করে যে ঠিক কি পরিমাণ পণ্য বিক্রয় করলে লাভের মুখ দেখা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, লাভ আদৌ হবে কি না, আর হলেও সেটি কোন পর্যায়ে গিয়ে হবে তা ব্রেক-ইভেন থেকে জানা যায়। তাই আজকের লেখায় আমরা ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস-এর আদ্যোপান্ত সম্পর্কে জানব।

ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস কী?

প্রথমেই ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট হচ্ছে সেই বিন্দু, যেখানে আপনার ব্যবসায়ে বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ থেকে আসা রিটার্ন সমান হবে। অর্থাৎ, এই পয়েন্টে আপনার লাভ’ও থাকবে না আবার লস’ও থাকবে না। ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট-এর পর থেকেই লাভের শুরু হয় এবং ব্যবসায় থেকে রিটার্ন যদি ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট-এর আগেই থেমে যায় তবে ক্ষতি হয়েছে বলে বোঝা যায়।

যেকোনো বিনিয়োগের ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট বের করে তা অর্জনের জন্য কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা’ই হচ্ছে ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস। মুনাফা অর্জন করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট অতিক্রম করতে হবে।

কীভাবে ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট বের করবেন?

ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট বের করতে চাইলে আপনাকে নিচের ফর্মুলা ব্যবহার করতে হবে।

ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট = স্থায়ী ব্যয় / (প্রতি একক পণ্যের বিক্রয়মূল্য - প্রতি একক পণ্যের পরিবর্তনশীল ব্যয়)

স্থায়ী ব্যয় : স্থায়ী ব্যয় বলতে সেসব খরচকে বোঝানো যেগুলো সাধারণত উৎপাদনের পরিমাণের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় না। যেমন : কারখানা ভাড়া, মেশিনের ক্রয়মূল্য ইত্যাদি। কারখানা ভাড়া করার পর আপনি কোনো পণ্য উৎপাদন না করলেও যে পরিমাণ ভাড়া দিতে হবে, ১০০টি পণ্য উৎপাদন করলেও সেই পরিমাণ ভাড়া’ই দিতে হবে। অর্থাৎ, উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি বা হ্রাসের সাথে এই ব্যয় বৃদ্ধি বা হ্রাসের সম্পর্ক নেহায়েতই কম।

পরিবর্তনশীল ব্যয় : পরিবর্তনশীল ব্যয় বলতে সেসব খরচকে বোঝানো হয় যেগুলো সাধারণত উৎপাদনের পরিমাণের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন : শ্রমিকের মজুরি, ইউটিলিটি বিল ইত্যাদি। শ্রমিক নিয়োগ দেয়ার পর আপনি যদি তাকে দিয়ে ১০টি পণ্য তৈরি করাতে চান, তাহলে যে পরিমাণ পারিশ্রমিক তাকে দিতে হবে, ৩০টি পন্য তৈরি করাতে চাইলে(ওভারটাইম) অবশ্যই তার থেকে বেশি পারিশ্রমিক দিতে হবে।

উদাহরণ

একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি আরো ভালোভাবে বোঝা যাক।

ধরে নেই, আপনি মানিব্যাগ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে মাসিক ৬০,০০০ টাকায় একটি কারখানা ভাড়া করলেন। একই সাথে বেশি পরিমাণ মানিব্যাগ উৎপাদনের জন্য ৫ জন কর্মী নিয়োগ দিলেন। প্রতিটি মানিব্যাগ উৎপাদনের জন্য আপনার কর্মীদের ৫০ টাকা করে প্রদান করতে হবে। ক্যালকুলেশন করে বের করলেন যে প্রতিটি মানিব্যাগ আপনি ২০০ টাকায় পাইকারী মূল্যে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রয় করতে পারবেন। চলুন আপনার মানিব্যাগ ব্যবসায়ের ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট বের করে ফেলা যাক।

এখানে,

স্থায়ী ব্যয় (কারখানা ভাড়া) ৬০,০০০ টাকা,

প্রতি ইউনিট পণ্যের পরিবর্তনশীল ব্যয় (কর্মীদের বেতন) ৫০ টাকা এবং

প্রতি ইউনিট পণ্যের বিক্রয়মূল্য ২০০ টাকা।

ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট = ৬০,০০০ / (২০০ - ৫০) = ৪০০ টি মানিব্যাগ

অর্থাৎ, মাসিক ৪০০ টি মানিব্যাগ বিক্রয় করলে আপনার লাভ অথবা লস কোনোটিই হবে না। এখানে আপনার আয় এবং ব্যয় সমান হয়ে যাবে। ৪০০ টির যতো বেশি মানিব্যাগ আপনি বিক্রয় করতে পারবেন, আপনার লাভ ততোই বেশি হবে।

ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস কেনো করা দরকার?

উপরিউক্ত উদাহরণে বোঝার সহজার্থে আমার খুবই সাধারণ কিছু অংক ধরে নিয়েছি এবং ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট বের করেছি। হয়তো ক্যালকুলেটর ছাড়াও এটি করে ফেলা সম্ভব। তবে বাস্তব ব্যবসায়গুলোতে আরো অনেক স্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল ব্যয় জড়িত থাকে।

বিশেষ করে স্টার্টআপগুলোর ক্ষেত্রে ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্টার্টআপগুলোর জন্য ফান্ডিং পাওয়া বেশ কষ্টের কাজ। তাই ফান্ডিং পেতে তাদের ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস করে বিনিয়োগকারীদের দেখাতে হয় যে তারা কি পরিমাণ পণ্য বা সেবা বিক্রয় করলে ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে পৌছাবে এবং সেখানে পৌছানোর জন্য তাদের কর্মপরিকল্পনা কি।

বিনিয়োগকারীরা নিজেরা’ও ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস করে কোনো স্টার্টআপে বিনিয়োগ কতোটা ঝুকিপূর্ণ তা যাচাই করেন।

নতুন ব্যবসায় ছাড়াও, ব্যবসায়ে নতুন প্রোডাক্ট লাইন যোগ করা, ব্যবসায় সম্প্রসারণ করা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে কোনো প্রজেক্টের লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা আগেই থেকেই অনুমান করে নেয়া যায়।

ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস-এর সীমাবদ্ধতা

ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস একটি বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি হলেও সময়ের সাথে সাথে এর কিছু সীমাবদ্ধতা লাইম লাইটে উঠে এসেছে।

ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস-এর প্রধান সীমাবদ্ধতা হচ্ছে এটি মার্কেটের চাহিদা প্রকাশ করে না। অর্থাৎ, ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে পৌছাতে চাইলে আপনাকে ৪০০ টি মানিব্যাগ বিক্রয় করতে হবে কিন্তু মার্কেটে মাসিক ৪০০ টি মানিব্যাগের চাহিদা আছে কি না অথবা আপনি আদৌ ৪০০ টি মানিব্যাগ বিক্রয় করতে পারবেন কি না তা ব্রেক-ইভেন কনসিডার করে না। তাই শুধু ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস করেই ব্যবসায় নেমে যাওয়া যাবে না। কর্মপরিকল্পনা আদৌ কতোটা বাস্তবসম্মত তা যাচাই করে নিতে হবে।

আরেকটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট প্রতিযোগীদের কনসিডার করে না। আপনি ঠিক কতোটা মার্কেট শেয়ার দখল করতে পারছেন এবং কতোটা বিক্রয় করতে পারছে তার অনেকটাই নির্ভর করে আপনার প্রতিযোগীদের বিভিন্ন স্টেপের উপর। কিন্তু ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিসে এই ব্যাপারটি কনসিডার করা হয় না।

ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট হ্রাস করবেন কীভাবে?

ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট কমিয়ে আনার শুধু দুইটি উপায় আছে।

  • খরচের পরিমাণ কমিয়ে আনা।
  • বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে দেয়া।

এই দুটির যেকোনো একটি করলেই আপনার ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট কমে আসবে। তবে হুটহাট ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট কমিয়ে ফেললে তা আপনার ব্যবসায়ের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

খরচ অধিক পরিমাণে কমিয়ে আনলে আপনার উৎপাদন কার্যাবলি ব্যহত হতে পারে আবার বিক্রয়মূল্য অধিক পরিমাণে বাড়িয়ে ফেললে দেখা যাবে আর পণ্যই বিক্রয় হচ্ছে না। তাই ব্রেক-ইভেনে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিটি পদক্ষেপ বেশ হিসাব করে গ্রহণ করতে হয়।

পরিসংহার

ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট অ্যানালিসিস নিঃসন্দেহে যেকোনো ব্যবসায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ টুল। ব্যবসায়টি কতোটা লাভজনক অথবা ঝুকিপূর্ণ, তা মিনিটের মাঝেই বুঝে ফেলা যায় এই ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিসের মাধ্যমে। তবে শুধু ব্রেক-ইভেন অ্যানালিসিস করেই ব্যবসায় নেমে পড়া যাবে না। মার্কেট ডিমান্ড এবং প্রতিযোগীদের মনোভাব সম্পর্কেও ধারনা রাখতে হবে। তাহলেই ব্রেক-ইভেন পয়েন্টের সর্বোত্তম ব্যবহার করা যাবে।

  • https://www.netsuite.com/portal/resource/articles/financial-management/break-even-analysis.shtml
  • https://corporatefinanceinstitute.com/resources/knowledge/modeling/break-even-analysis/
  • https://squareup.com/us/en/townsquare/how-to-calculate-break-even-point-analysis
  • https://www.shopify.com/blog/break-even-analysis
  • https://gocardless.com/guides/posts/what-is-break-even-analysis/
Next to read
Canvas & Methods
মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট (Minimum Viable Product)
মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট (Minimum Viable Product)

অধিক শ্রম ও অর্থ খরচের এই ঝুঁকি এড়াতে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন ধরনের বিজনেস স্ট্র‍্যাটেজি যেখানে পণ্য প্রয়োজনীয় কিছু ফিচার দিয়ে বাজারজাত করা হয়। পরবর্তীতে গ্রাহকদের চাহিদা পর্যালোচনা করে ধীরে ধীরে এই পণ্যের উন্নয়ন করা হয় এবং নতুন নতুন উপাদান/ফিচার যুক্ত করা হয়। ব্যবসায়িক জগতে একে বলা হয় মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট।

ফ্রিমিয়াম মডেল (Freemium Model)
Business Models
ফ্রিমিয়াম মডেল (Freemium Model)
বিজনেস মডেল ক্যানভাস ( Business Model Canvas)
Canvas & Methods
বিজনেস মডেল ক্যানভাস ( Business Model Canvas)
শেয়ারিং ইকোনমি মডেল (Sharing Economy Model)
Business Models
শেয়ারিং ইকোনমি মডেল (Sharing Economy Model)
বেইট এন্ড হুক মডেল  (Bait & Hook Model)
Business Models
বেইট এন্ড হুক মডেল (Bait & Hook Model)
ব্রান্ডিং (Branding)
Branding
ব্রান্ডিং (Branding)
অর্থনীতি কী?
Economics
অর্থনীতি কী?
ব্যষ্টিক অর্থনীতি বা Micro Economics কী?
Economics
ব্যষ্টিক অর্থনীতি বা Micro Economics কী?
সেলস ফানেল বা বিক্রয় ফানেল কি?
Sales
সেলস ফানেল বা বিক্রয় ফানেল কি?
ব্র্যান্ড আর্কিটেকচার কী? সংজ্ঞা, মডেল এবং উদাহরণ
Branding
ব্র্যান্ড আর্কিটেকচার কী? সংজ্ঞা, মডেল এবং উদাহরণ