GeoRenus Editorial Team

PESTLE বিশ্লেষণ একটি স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক যার মাধ্যমে কোম্পানীর বাহ্যিক পরিবেশের উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করা স্ট্র্যাটেজিক মার্কেটিং পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। PESTLE - এর পূর্ণরূপ হলো Political, Economic, Social, Technological, Legal এবং Environmental Factors। PESTLE বিশ্লেষণ করার জন্য কোম্পানীর বাইরে থেকে ইনফরমেশন কালেক্ট করে সেগুলোকে উপরিউক্ত ছয়টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা হয়।
আজকের বিশ্বে, আমাদের সামনে অনেক সফল প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ রয়েছে। ছোট স্টার্টআপ থেকে শুরু করে বিশাল কোম্পানী, প্রতিটি সংস্থা’ই উন্নতি এবং এগিয়ে যাওয়ার দিকে মনোযোগী। এই এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য পূরণে তারা কিছু টুল ব্যবহার করে থাকে। বাজারে প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে প্রতিটি সিদ্ধান্ত পুরো গতিশীলতাকে বদলে দিতে পারে- হয় নেতিবাচক বা ইতিবাচকভাবে।
শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো’ই একটি কোম্পানির ভাগ্য নির্ধারণ করে না, অনেক বাহ্যিক কারণ’ও সমান প্রভাব ফেলে। একটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, পরিবেশগত কারণ, কর্মের বৈধতা, অর্থনীতি, সামাজিক কারণ সবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোম্পানীগুলো এই সত্য সম্পর্কে ভালভাবে জানেন, তাই তারা কোম্পানীর বাহ্যিক ফ্যাক্টরগুলো বিশ্লেষণ করতে মার্কেটিং-এর একটি টুল ব্যবহার করেন, যাকে আমরা PESTLE বিশ্লেষণ হিসেবে জানি।
আজকের লেখায় আমরা PESTLE বিশ্লেষণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।
PESTLE বিশ্লেষণ হল একটি ব্যবসায়ের বাহ্যিক উপাদানগুলো বিশ্লেষণের একটি টুল যা ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে উপাদানগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে। PESTLE বিশ্লেষণ পরিচালনা করতে, ব্যবসা সম্পর্কে যতটা সম্ভব তথ্য খুঁজে বের করতে হয় এবং ছয়টি বিভাগে সেগুলোকে সাজাতে হয়। PESTLE - এর পূর্ণরূপ হলো -
P - Political Factors বা রাজনৈতিক উপাদান
E - Economic Factors বা অর্থনৈতিক উপাদান
S - Social Factors বা সামাজিক উপাদান
T - Technological Factors - প্রযুক্তিগত উপাদান
L - Legal Factors - আইনগত উপাদান
E - Environmental Factors - পরিবেশগত উপাদান
কোম্পানীর বাহ্যিক উপাদানগুলো প্রথমে উপরিউক্ত ছয়টি ভাগে ভাগ করতে হয়। তারপর সেগুলো পর্যালোচনা করে কোম্পানীর SWOT বিশ্লেষণের সাথে এটির তুলনা করা হয়। SWOT বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোম্পানীর অভ্যন্তরীন উপাদানগুলোর পর্যালোচনা করা হয়। তাই PESTLE বিশ্লেষণ এবং SWOT বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানীর স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং করা হয়ে থাকে।
PESTLE বিশ্লেষণের ৬টি উপাদান রয়েছে। সেগুলো হলো রাজনৈতিক উপাদান, অর্থনৈতিক উপাদান, সামাজিক উপাদান, প্রযুক্তিগত উপাদান, আইনগত উপাদান এবং পরিবেশগত উপাদান। চলুন এই উপাদানগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাক।
রাজনৈতিক উপাদানগুলোর মাঝে ট্যাক্স নীতি, পরিবেশগত বিধি, বাণিজ্য বিধিনিষেধ এবং সংস্কার, শুল্ক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ইত্যাদি অন্তর্ভূক্ত। এই উপাদানগুলোর মাধ্যমে সরকার কোনো শিল্প বা কোম্পানিকে কতোটা প্রভাবিত করতে পারে তা নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, সরকার নতুন কর সংস্কার আনতে পারে যা একটি কোম্পানির পুরো রাজস্ব-উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে পারে।
অর্থনৈতিক উপাদানগুলো মাঝে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুদের হার, বিনিময়ের হার, মুদ্রাস্ফীতি ও মজুরির পরিমাণ, কর্মঘন্টা এবং বেকারত্বের হার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এই উপাদানগুলো দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স যাচাইয়ের মাধ্যম, যা একটি কোম্পানীকে সরাসরি এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করে।
উদাহরণস্বরুপ, মুদ্রাস্ফীতির হার বৃদ্ধি পেলে কোম্পানীকে পণ্য বা সেবার দাম’ও বৃদ্ধি করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা’কে প্রভাবিত করে এবং কোম্পানীর আয়ের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
সামাজিক উপাদানগুলোর মাঝে সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবনা, সামাজিক স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা সূচক অন্তর্ভূক্ত। এই উপাদানগুলো কোম্পানীর মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি তৈরি ও ক্যাম্পেইন সাজাতে সাহায্য করে। মার্কেটিয়াররা যখন নির্দিষ্ট কোনো মার্কেট সেগমেন্ট টার্গেট করে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেন তখন সামাজিক উপাদানগুলোর দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়। উদাহরণস্বরুপ, ভারতীয় মার্কেটে সাধারণত বছরের শেষদিকে গাড়ি ক্রয়ের প্রবণতা বেড়ে যায়, কারণ সেই সময়ে অনেকেই বিয়ে করে থাকেন এবং এছাড়াও আরো অনেক উৎসব বছরের শেষ দিকে হয়ে থাকে।
প্রযুক্তিখাতে উদ্ভাবন এবং পরিবর্তন এই উপাদানের অন্তর্ভূক্ত। একটি কোম্পানী কিভাবে তার অপারেশন পরিচালনা করবে তা এই উপাদানের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। বর্তমান সময়ে মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, ইন্টারনেট অব থিংস ইত্যাদি উদ্ভাবন করপোরেট সেক্টরকে পুরোপুরি পরিবর্তিত হতে বাধ্য করছে এবং যেসকল সংস্থা এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে না তাদের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ ঝুকির মুখোমুখি হতে বাধ্য।
আইনগত উপাদানের মাঝে কর্মসংস্থান আইন, আমদানী-রপ্তানি নীতি, ট্যাক্স ও টারিফ নীতি ইত্যাদি অন্তর্ভূক্ত। এই উপাদানের অভ্যন্তরীন এবং বাহ্যিক উভয় ধরণের প্রভাব বিদ্যমান। একটি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ কি অনুকুল হবে নাকি প্রতিকূল তা এই আইনগুলোর মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। দেশের আইনগুলোর পাশপাশি বিভিন্ন কোম্পানী তাদের অভ্যন্তরীন পরিচালনার সুবিধার্থে স্বেচ্ছায় কিছু বিধি অবলম্বন করা যা সেই কোম্পানীর কর্মীরা মানতে বাধ্য থাকেন। তাই আইনগত উপাদান বিশ্লেষণের সময়ে অভ্যন্তরীন এবং বাহ্যিক উভয় দিকই বিবেচনা করতে হয়।
পরিবেশগত উপাদান মূলত প্রাকৃতিক উপাদান এবং ভারসাম্যের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে। বর্জ্য নিষ্কাষণ আইন, পরিবেশ রক্ষা নীতি এবং অন্যান্য এই উপাদানের অন্তর্ভূক্ত। PESTLE-এর এই দিকটি নির্দিষ্ট কিছু শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে পর্যটন, কৃষিকাজ ইত্যাদি। গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রতিটি কোম্পানী’কে পরিবেশগত কারণগুলি বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে৷ সংস্থাগুলির জন্য কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
PESTLE বিশ্লেষণ করার জন্য কিছু ধাপ অবলম্বন করতে হয় যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো -
১। রিসার্চের পরিধি নির্ধারণ করা।
২। একটি ভালো টিম গঠন এবং দায়িত্ব বন্টন।
৩। ইনফরমেশনের সোর্স চিহ্নিত করা।
৪। ইনফরমেশন কালেক্ট করা এবং সাজানো।
৫। ইনফরমেশন উপরিউক্ত ক্যাটাগরিগুলোতে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা।
৬। বিশ্লেষিত ইনফরমেশন থেকে কোম্পানীর অনুকুল এবং প্রতিকূল ফ্যাক্টরগুলো চিহ্নিত করে একটি পরিপূর্ণ রিপোর্ট তৈরি করা।
৭। প্রতিষ্ঠানের স্টেকহোল্ডারদের কাছে রিপোর্ট প্রকাশ করা।
স্ট্র্যাটেজিক এডভান্টেজ নিয়ে যেসব কোম্পানী প্রতিদ্বন্দীদের থেকে এগিয়ে থাকতে চায় তাদের অবশ্যই নিয়মিত পরিসরে PESTLE বিশ্লেষণ করতে হবে।
PESTLE বিশ্লেষণ সবসময় ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কোম্পানীর বাহ্যিক যেসব ফ্যাক্টর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে সেগুলো চিহ্নিত করার জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজন। এছাড়াও কোম্পানীর অন্যান্য যেসকল ক্ষেত্রে এই বিশ্লেষণ সাহায্য করে, সেগুলো হলো -
১। স্ট্র্যাটেজিং বিজনেস প্ল্যানিং
২। মার্কেটিং প্ল্যানিং
৩। প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট
৪। প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক পরিবর্তন ইত্যাদি।
অন্যান্য সকল মার্কেটিং টুলের মতোই এই বিশ্লেষণের’ও কিছু সুবিধা এবং অসুবিধা রয়েছে। সেগুলো হলো -
১। এটির ফ্রেমওয়ার্ক অনেক সহজ এবং সহজেই অবলম্বন করা যায়।
২। ব্যবসায়ের বাহ্যিক ফ্যাক্টরগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।
৩। প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং করতে সাহায্য করে।
৪। ভবিষ্যতে ব্যবসায়ের পরিধি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কি কি অসুবিধা হতে পারে তা আগেই জানা যায়।
৫। কোম্পানীর অনুকুল ফ্যাক্টরগুলো চিহ্নিত করতে এবং সেগুলো ব্যবহার করতে সাহায্য করে।
১। অধিক পরিমাণ ইনফরমেশন কালেক্ট করা সম্ভব না হলে এটির উপযোগিতা হ্রাস পায়।
২। আবার অধিক পরিমাণ ইনফরমেশণের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরগুলো থেকে মনোযোগ সড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩। এই বিশ্লেষণে সম্ভাবনার উপর বেশি নির্ভর করা হয়, যার ফলে সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ার ঝুকি থেকে যায়।
৪। নিয়মিত পরিসরে এই বিশ্লেষণ করা না হলে এর উপযোগীতা হ্রাস পায়।
৫। বাহ্যিক উপাদানগুলোতে অধিক পরিমাণে পরিবর্তন আসলে পুরো ফ্রেমওয়ার্ক এডযাস্ট করে নিতে হয়।
পরিশেষে এটি বলাই যায় যে PESTLE বিশ্লেষণ একটি কোম্পানীর সুবিধা-অসুবিধাগুলো চিহ্নিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ টুল। প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক ৬টি উপাদান বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি ভবিষ্যতের সুযোগ এবং ঝুকিগুলো চিহ্নিত করার জন্য উপযুক্ত। এর অল্প কিছু অসুবিধার দিকে নজর রেখে উপযুক্ত উপায়ে বিশ্লেষণ করা গেলে অবশ্যই ভালো কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব।

কাস্টমার ডেটা মনিটাইজেশন মডেলে গ্রাহকদেরকে মূল সেবাটি বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। অতঃপর সুষ্ঠু পদ্ধতিতে গ্রাহকদের যাবতীয় তথ্যাবলি সংগ্রহ করে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রয় করা হয়। আর এই গ্রাহক তথ্য বিক্রয়ের মাধ্যমেই মূলত এই কাস্টমার ডেটা মনিটাইজেশন মডেল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মূল আয় করে থাকে।








