ভূমিকা
তুমি প্রতি মাসে কষ্ট করে কিছু টাকা জমাও এবং সেটা ব্যাংকে রাখো। তুমি ভাবো টাকাটা নিরাপদে ভল্টে বসে আছে, যখন দরকার তুলে নেবে। কিন্তু বাস্তবটা একটু অন্যরকম।
তুমি যে মুহূর্তে ব্যাংকে টাকা রাখলে, সেই মুহূর্ত থেকে সেই টাকার বড় একটা অংশ অন্য কারো কাছে ঋণ হিসেবে চলে গেছে। হয়তো সেই মুহূর্তে কেউ গৃহঋণ নিচ্ছে, কেউ ব্যবসার ঋণ নিচ্ছে — তোমার জমানো টাকা দিয়েই সেটা হচ্ছে। অথচ তোমার অ্যাকাউন্টে পুরো ব্যালেন্স দেখাচ্ছে।
এটাই ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং। আধুনিক পুরো ব্যাংকিং সিস্টেম এই একটা নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে।
ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং কী
সংজ্ঞাটা সহজ। ব্যাংক তার কাছে আসা মোট আমানতের একটা নির্দিষ্ট অংশ — যেটাকে রিজার্ভ বলে — নিজের কাছে রেখে বাকি পুরোটা ঋণ হিসেবে দিয়ে দেয়।
এই "ভগ্নাংশ" বা fraction-টাই সিস্টেমের নাম দিয়েছে। ১০০ টাকা আমানত পেলে যদি ১০ টাকা রিজার্ভ রাখা হয়, তাহলে রিজার্ভ রেট ১০%। বাকি ৯০ টাকা ঋণ যায়।
এই রিজার্ভ রেট নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক এটা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য Cash Reserve Ratio বা CRR হলো ৪%। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আমানতে মাত্র ৪ টাকা রিজার্ভ রাখতে হয়, বাকি ৯৬ টাকা ঋণ দেওয়া যায়।
এর পাশাপাশি Statutory Liquidity Ratio বা SLR আছে, যেটা আরো ১০%। মানে মোট ১৪% রিজার্ভ রাখতে হয়, বাকি ৮৬% ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকে।
ইতিহাস — কোথা থেকে এলো এই ব্যবস্থা
এই ব্যবস্থার শুরু আধুনিক ব্যাংকের জন্মেরও আগে।
সোনার কারবারিদের আবিষ্কার
মধ্যযুগের ইউরোপে সোনার কারবারিরা মানুষের সোনা নিরাপদে রাখার কাজ করতো। সোনা জমা দিলে তারা একটা রসিদ দিতো। ধীরে ধীরে সেই রসিদই লেনদেনের মাধ্যম হয়ে উঠলো — মানুষ সোনা না নিয়ে রসিদ দিয়েই কেনাবেচা করতো।
এই সোনার কারবারিরা একটা বিষয় লক্ষ্য করলো। সবাই একসাথে কখনো সোনা তুলতে আসে না। তাই সব সোনা ভল্টে রেখে লাভ নেই। তারা জমা রাখা সোনার একটা অংশ অন্যদের ধার দিতে শুরু করলো এবং সুদ নিতে শুরু করলো। এটাই ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিংয়ের আদি রূপ।
আনুষ্ঠানিক শুরু
১৬৯৪ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। ব্যাংকটি ইংল্যান্ড সরকারকে ১২ লাখ পাউন্ড ঋণ দিয়েছিল এবং বিনিময়ে নোট ইস্যু করার অধিকার পেয়েছিল। সেই নোটের পরিমাণ ছিল আসল সোনার মজুতের চেয়ে অনেক বেশি — এটাই ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভের প্রথম বড় প্রয়োগ।
আমেরিকায় ফেডারেল রিজার্ভের জন্ম
১৯০৭ সালে আমেরিকায় একটা বড় ব্যাংকিং প্যানিক হয়। একাধিক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়, মানুষ সর্বস্ব হারায়। এই সংকট সামলাতে তখন জে পি মরগান ব্যক্তিগতভাবে বাজারে অর্থ সরবরাহ করেছিলেন। কিন্তু এটা যে একজন ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল হওয়া ঠিক না সেটা সবাই বুঝলো। এই ঘটনার পরেই ১৯১৩ সালে ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাক্ট পাস হয় এবং আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের ব্যাংকিং সিস্টেম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয়। শুরুতে বেশিরভাগ ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত ছিল। ১৯৮০-এর দশকে বেসরকারি ব্যাংকের অনুমতি দেওয়া শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬১টি তফসিলি ব্যাংক আছে, যার মধ্যে ৯টি সরকারি, ৪৩টি বেসরকারি এবং ৯টি বিদেশি।
টেক্সটবুক বনাম বাস্তবতা
অর্থনীতির বই পড়লে ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়:
আমানত আসে → রিজার্ভ রাখো → বাকিটা ঋণ দাও
এই মডেলে ব্যাংক একজন মধ্যস্থতাকারী। সে মানুষের সঞ্চয় সংগ্রহ করে এবং সেই সঞ্চয় থেকে অন্যদের ঋণ দেয়।
কিন্তু ২০১৪ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তাদের কোয়ার্টারলি বুলেটিনে স্বীকার করেছে যে বাস্তব প্রক্রিয়াটা ঠিক উল্টো। ব্যাংক আগে ঋণ দেয়, তারপর রিজার্ভ খোঁজে। প্রয়োজনে interbank market থেকে বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রিজার্ভ ধার করে।
ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় → অ্যাকাউন্টে এন্ট্রি হয় → নতুন আমানত তৈরি হয় → রিজার্ভ পরে জোগাড় করা হয়
এই পার্থক্যটা ছোট মনে হলেও গভীরে গেলে বিশাল। প্রথম মডেলে রিজার্ভ না থাকলে ঋণ দেওয়া যায় না। দ্বিতীয় মডেলে — যেটা বাস্তব — রিজার্ভ না থাকলেও ঋণ দেওয়া যায়, রিজার্ভ পরে ব্যবস্থা করা হয়।
মানি মাল্টিপ্লায়ার — গভীরে যাই
ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ ফলাফল হলো মানি মাল্টিপ্লায়ার। একটা আমানত ব্যাংক থেকে ব্যাংকে যেতে যেতে গাণিতিকভাবে গুণ হতে থাকে।
সূত্র:
মানি মাল্টিপ্লায়ার = ১ ÷ রিজার্ভ রেট
১০% রিজার্ভ রেট ধরে একটা সম্পূর্ণ উদাহরণ:
তুমি সোনালী ব্যাংকে ১০,০০০ টাকা রাখলে।
সোনালী ব্যাংক আমানত ১০,০০০ → রিজার্ভ ১,০০০ → ঋণ ৯,০০০ → করিমকে
জনতা ব্যাংক আমানত ৯,০০০ → রিজার্ভ ৯০০ → ঋণ ৮,১০০ → রহিমকে
অগ্রণী ব্যাংক আমানত ৮,১০০ → রিজার্ভ ৮১০ → ঋণ ৭,২৯০ → সুমাইয়াকে
রূপালী ব্যাংক আমানত ৭,২৯০ → রিজার্ভ ৭২৯ → ঋণ ৬,৫৬১ → জামালকে
...এভাবে চলতে থাকে
শেষ পর্যন্ত মোট আমানত দাঁড়ায় ১,০০,০০০ টাকা। মূল ১০,০০০ টাকা থেকে পুরো সিস্টেমে দশগুণ আমানত তৈরি হলো।
| রিজার্ভ রেট | মাল্টিপ্লায়ার | ১ লাখ টাকায় সম্ভাব্য অর্থ সৃষ্টি | মোট নতুন ঋণ |
| ১% | ১০০x | ১ কোটি | ৯৯ লাখ |
| ৪% | ২৫x | ২৫ লাখ | ২৪ লাখ |
| ১০% | ১০x | ১০ লাখ | ৯ লাখ |
| ২০% | ৫x | ৫ লাখ | ৪ লাখ |
| ৫০% | ২x | ২ লাখ | ১ লাখ |
কিন্তু বাস্তবে মাল্টিপ্লায়ার এতটা কাজ করে না কেন?
তাত্ত্বিক মাল্টিপ্লায়ার এবং বাস্তব মাল্টিপ্লায়ারের মধ্যে সবসময় একটা ফারাক থাকে। কারণগুলো হলো — মানুষ কিছু নগদ নিজের কাছে রাখে, ব্যাংক সবসময় সর্বোচ্চ ঋণ দেয় না, ঋণের চাহিদা সবসময় থাকে না, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা নিয়ন্ত্রণ আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে broad money বা M2-এর পরিমাণ ২০২৩ সালে ছিল প্রায় ১৭ লাখ কোটি টাকা, যেখানে base money বা reserve money ছিল প্রায় ৩.৮ লাখ কোটি টাকা। এই দুটোর অনুপাত থেকে বোঝা যায় বাস্তবে মাল্টিপ্লায়ার প্রায় ৪.৫ এর কাছাকাছি — তাত্ত্বিক ২৫ এর অনেক নিচে।
CAR বনাম রিজার্ভ রেট — কোনটা আসল সীমা
এখানেই টেক্সটবুক এবং বাস্তবতার মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক।
রিজার্ভ রেটের সীমাবদ্ধতা
রিজার্ভ রেট একটা নিয়ম, কিন্তু এটা ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার মূল চালিকাশক্তি না। আমেরিকা ২০২০ সালের মার্চে রিজার্ভ রেট শূন্যে নামিয়ে এনেছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং সুইডেনেও কোনো বাধ্যতামূলক রিজার্ভ রেট নেই। তারপরেও এই দেশগুলোর ব্যাংক ইচ্ছেমতো ঋণ দিতে পারছে না।
CAR কীভাবে কাজ করে
Capital Adequacy Ratio বা CAR হলো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন এবং তার মোট ঝুঁকি-ভারযুক্ত সম্পদের অনুপাত।
CAR = মূলধন ÷ Risk Weighted Assets × ১০০
প্রতিটা ঋণের ঝুঁকি সমান না। তাই প্রতিটা সম্পদকে একটা risk weight দিয়ে গুণ করা হয়।
| সম্পদের ধরন | Risk Weight | কারণ |
| সরকারি বন্ড | ০% | সরকার সাধারণত ডিফল্ট করে না |
| গৃহঋণ | ৩৫-৫০% | বাড়ি জামানত আছে |
| ব্যক্তিগত ঋণ | ১০০% | কোনো জামানত নেই |
| কর্পোরেট ঋণ | ১০০% | ব্যবসা ডুবতে পারে |
| নগদ | ০% | কোনো ঝুঁকি নেই |
বাংলাদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ন্যূনতম CAR হলো ১২.৫%। এর মানে সর্বোচ্চ ঋণ = মূলধন ÷ ১২.৫%।
একটা সম্পূর্ণ উদাহরণ:
একটা ব্যাংকের মূলধন ১,০০০ কোটি টাকা। CAR ১২.৫% মানে সর্বোচ্চ Risk Weighted Assets হতে পারে ৮,০০০ কোটি টাকা।
সরকারি বন্ড ২,০০০ কোটি × ০% = ০ কোটি RWA
গৃহঋণ ২,০০০ কোটি × ৫০% = ১,০০০ কোটি RWA
কর্পোরেট ঋণ ৩,০০০ কোটি × ১০০% = ৩,০০০ কোটি RWA
ব্যক্তিগত ঋণ ১,০০০ কোটি × ১০০% = ১,০০০ কোটি RWA
────────────────────────────────────
মোট RWA ৫,০০০ কোটি
CAR = ১,০০০ ÷ ৫,০০০ × ১০০ = ২০% — সীমার মধ্যে আছে, আরো ঋণ দিতে পারবে।
এই ব্যাংক আরো ৩,০০০ কোটি টাকার ঋণ দিতে পারবে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছানোর আগে।
মূলধন বাড়লে কী হয়
মূলধন বাড়লে ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। মূলধন বাড়ে তিনভাবে — ব্যাংকের লাভ জমিয়ে, নতুন শেয়ার ইস্যু করে, এবং কখনো কখনো সরকারের সহায়তায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের ব্যাংকিং সিস্টেম ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ নীতিতে চললেও এখানে কিছু নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ আছে যেগুলো অনেক দেশে নেই।
খেলাপি ঋণের সমস্যা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৯%। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ৩% এর নিচে থাকা উচিত। উচ্চ খেলাপি ঋণ CAR-কে চাপে ফেলে এবং ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দুর্বলতা
সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালীসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বারবার মূলধন সংকটে পড়েছে। সরকারকে বারবার এই ব্যাংকগুলোতে পুনর্মূলধন করতে হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সরকার প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকার বেশি মূলধন সরবরাহ করেছে।
ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের উপস্থিতি
বাংলাদেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক ব্যাংক আছে এবং অনেক প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো আছে। ইসলামিক ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট ব্যাংকিং আমানতের প্রায় ২৭% ইসলামিক ব্যাংকগুলোর কাছে।
ব্যাংক রান — কীভাবে ঘটে এবং কেন ভয়ঙ্কর
ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানে। কারণ ব্যাংকে টাকা পুরোটা নেই, তাই সবাই একসাথে টাকা তুলতে গেলে ব্যাংক দিতে পারবে না।
ব্যাংক রানের শৃঙ্খল
একটা গুজব বা সত্যিকারের সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিছু আমানতকারী টাকা তুলতে যায়। অন্যরা সেটা দেখে আতঙ্কিত হয়। আরো বেশি মানুষ টাকা তুলতে যায়। ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত নগদ থাকে না। ব্যাংক পেমেন্ট বন্ধ করে দেয়। আমানতকারীরা সর্বস্ব হারায়।
এই পুরো প্রক্রিয়াটা আধুনিক যুগে কয়েক ঘণ্টায় ঘটতে পারে। ২০২৩ সালে আমেরিকার Silicon Valley Bank মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় দেউলিয়া হয়ে গেছে। সেখানে এক দিনে ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার উত্তোলনের চেষ্টা হয়েছিল।
ইতিহাসের বড় উদাহরণগুলো
১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সালের মহামন্দায় শুধু আমেরিকায় ২,৩০০-এর বেশি ব্যাংক দেউলিয়া হয়েছিল। কোটি কোটি আমেরিকানের সারাজীবনের সঞ্চয় মুছে গিয়েছিল।
২০০১ সালে আর্জেন্টিনায় মুদ্রার অবমূল্যায়নের আশঙ্কায় ব্যাংক রান শুরু হয়। সরকার ব্যাংক থেকে উত্তোলনে সীমা আরোপ করলো, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করলো। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা দেউলিয়া ঘোষণা করলো।
২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক সংকটে লেহমান ব্রাদার্সের পতনের পর পুরো বিশ্বের আর্থিক সিস্টেমে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল।
ব্যাংক রান প্রতিরোধে কী আছে
ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ব্যাংক রানের প্রধান প্রতিষেধক। বাংলাদেশে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হলে প্রতি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন — এই গ্যারান্টি দেওয়া আছে। আমেরিকায় এই সীমা ২,৫০,০০০ ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক "Lender of Last Resort" হিসেবে সংকটের সময় জরুরি অর্থ সরবরাহ করতে পারে।
ইসলামিক ব্যাংকিং বনাম ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ
ইসলামিক ব্যাংকিং ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে, তবে সম্পূর্ণ আলাদা কারণে।
মূল পার্থক্য
ইসলামিক ব্যাংকিংয়ে সুদ বা রিবা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ব্যাংক ঋণ দেয় না, বরং অংশীদার হয়। লাভ এবং ঝুঁকি দুটোই ভাগ করে নেয়।
বিষয়প্রচলিত ব্যাংকইসলামিক ব্যাংকআয়ের উৎসসুদলাভের ভাগ, ফিঋণের ধরনসুদভিত্তিক ঋণমুশারাকা, মুরাবাহাঝুঁকিব্যাংকের কমদুই পক্ষে ভাগ হয়অর্থ সৃষ্টিঋণ দিয়েলেনদেন দিয়ে
মুশারাকা এবং মুরাবাহা
মুশারাকা হলো অংশীদারিত্ব। ব্যাংক এবং গ্রাহক একসাথে কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। লাভ হলে ভাগ পায়, লোকসান হলেও ভাগ দিতে হয়।
মুরাবাহা হলো ক্রয়-বিক্রয় ভিত্তিক। গ্রাহক যে পণ্য কিনতে চায়, ব্যাংক সেটা কিনে গ্রাহককে বেশি দামে বিক্রি করে। পার্থক্যটাই ব্যাংকের আয়।
ইসলামিক ব্যাংকিং কি ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ মুক্ত?
এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য আছে। ইসলামিক ব্যাংক সুদ নেয় না, কিন্তু বেশিরভাগ দেশে ইসলামিক ব্যাংকও ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ কাঠামোর মধ্যেই কাজ করে। বাংলাদেশে ইসলামিক ব্যাংকগুলোকেও CRR এবং SLR মেনে চলতে হয়। তাই ইসলামিক ব্যাংকিং সুদের সমস্যা সমাধান করে, কিন্তু ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভের কাঠামোগত সমস্যা পুরোটা সমাধান করে না।
বিকল্প সিস্টেম — Full Reserve এবং Sovereign Money
ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিংয়ের সমালোচকরা দুটো বিকল্প প্রস্তাব করেছেন।
Full Reserve Banking
এই প্রস্তাবে ব্যাংককে আমানতের ১০০% রিজার্ভ রাখতে হবে। কেউ টাকা তুলতে গেলে সবসময় দিতে পারবে। ব্যাংক রান সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে যাবে।
কিন্তু সমস্যা হলো ব্যাংক তখন ঋণ দেওয়ার জন্য আলাদা বিনিয়োগ তহবিল গঠন করবে এবং সেই তহবিলে বিনিয়োগকারীরা টাকা দেবে জেনেবুঝে, ঝুঁকি নিয়ে। ঋণ দেওয়া কমে যাবে, সুদের হার বাড়বে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে।
Sovereign Money
এই প্রস্তাবে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ সৃষ্টি করবে। বাণিজ্যিক ব্যাংক অর্থ সৃষ্টি করতে পারবে না, শুধু মধ্যস্থতা করবে।
সুইজারল্যান্ডে ২০১৮ সালে Vollgeld Initiative নামে এই বিষয়ে গণভোট হয়েছিল। ৭৪% মানুষ এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। মূল আপত্তি ছিল অর্থনৈতিক নমনীয়তা কমে যাওয়ার ভয়।
Cryptocurrency
Bitcoin এবং অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যবস্থার বাইরে কাজ করে। Bitcoin-এর সরবরাহ সর্বোচ্চ ২১ মিলিয়ন নির্ধারিত, কোনো ব্যাংক ইচ্ছেমতো গুণ করতে পারে না। কিন্তু Cryptocurrency এখনো প্রচলিত মুদ্রার বিকল্প হওয়ার মতো স্থিতিশীলতা অর্জন করেনি।
বিতর্কের সত্য — সমর্থক বনাম সমালোচক
ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। দুটো পক্ষেরই শক্তিশালী যুক্তি আছে।
সমর্থকদের যুক্তি
প্রথমত, এই সিস্টেম ছাড়া আধুনিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব হতো না। সব সঞ্চয় ভল্টে বসে থাকলে বিনিয়োগ হতো না, কারখানা হতো না, চাকরি হতো না। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৮০০ সালে বিশ্বের মাথাপিছু আয় যা ছিল, ২০২০ সালে সেটা প্রায় ১৪ গুণ বেশি — এই প্রবৃদ্ধিতে ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিংয়ের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
দ্বিতীয়ত, এই সিস্টেম মূলত ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতার বিপরীতে আজকের বিনিয়োগকে সম্ভব করে। একজন উদ্যোক্তা আজকে ঋণ নিয়ে কারখানা করেন, সেই কারখানা থেকে আয় করে ঋণ শোধ করেন। এটা সমাজের জন্য উৎপাদনশীল।
তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই সিস্টেমকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স এবং Lender of Last Resort প্রক্রিয়া অনেকটাই ঝুঁকি কমিয়ে এনেছে।
সমালোচকদের যুক্তি
প্রথমত, এই সিস্টেম অন্তর্নিহিতভাবে অস্থিতিশীল। ২০০৮ সালের সংকট, ১৯২৯ সালের মহামন্দা, ২০০১ সালের আর্জেন্টিনা সংকট — বারবার প্রমাণ হয়েছে যে সিস্টেমের মধ্যেই একটা বিপদের বীজ আছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংক শূন্য থেকে অর্থ তৈরি করে সুদ নেয় — এই প্রক্রিয়ায় সমাজে সবসময় মোট ঋণের চেয়ে মোট অর্থ কম থাকে। কারণ ব্যাংক মূলধন সৃষ্টি করে, কিন্তু সুদ সৃষ্টি করে না। তাই ঋণের ট্রেডমিল চলতেই থাকে — থামলেই সিস্টেম ভাঙে।
তৃতীয়ত, নতুন অর্থ সিস্টেমে ঢোকার সময় সবাই সমানভাবে পায় না। যারা আগে পায় তারা জিনিসের দাম বাড়ার আগেই সম্পদ কেনে, যারা পরে পায় তারা বেশি দামে কম কিনতে পারে। অর্থনীতিবিদ Richard Cantillon আঠারো শতকেই এই বিষয়টা চিহ্নিত করেছিলেন, যা এখন Cantillon Effect নামে পরিচিত।
চতুর্থত, ব্যাংক রানের ভয়ে সরকার সবসময় ব্যাংককে বেইলআউট দেয়। ফলে ব্যাংক জানে যে ডুবলেও সরকার বাঁচাবে — এই নিশ্চয়তায় তারা অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয়, যা আরো বড় সংকট তৈরি করে। অর্থনীতিতে এটাকে Moral Hazard বলে।
উপসংহার
ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং আধুনিক অর্থনীতির একটা অপরিহার্য কিন্তু গভীরভাবে বিতর্কিত কাঠামো। এটা একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সম্ভব করে, অন্যদিকে সিস্টেমের ভেতরে একটা স্থায়ী ঝুঁকি রেখে দেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো — এই সিস্টেম মূলত বিশ্বাসের খেলা। যতদিন মানুষ বিশ্বাস করে ব্যাংকে টাকা আছে, ততদিন সিস্টেম চলে। বিশ্বাস ভাঙলে সিস্টেম ভাঙে। আর এই বিশ্বাস ধরে রাখার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চ খেলাপি ঋণ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণের ফাঁকফোকর এই সিস্টেমকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ইসলামিক ব্যাংকিং সুদের সমস্যা সমাধান করলেও কাঠামোগত সমস্যা পুরোটা সমাধান করে না। Full Reserve বা Sovereign Money-র মতো বিকল্প এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে আছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এটা নয় যে ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং ভালো না খারাপ। প্রশ্নটা হলো — এই সিস্টেমের সুবিধা নিতে গিয়ে আমরা কতটুকু ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, এবং সেই ঝুঁকি কে বহন করছে।










