ভূমিকা
কেউ যদি জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশে মোট কত টাকা আছে, আপনি হয়তো বলবেন — বাংলাদেশ ব্যাংক যত নোট ছেপেছে তত। উত্তরটা যৌক্তিক শোনায়, কিন্তু ভুল।
আধুনিক অর্থব্যবস্থায় "কত টাকা আছে" — এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অনেক জটিল। কারণ টাকা একটি জিনিস নয়, এটা কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো কাগজের নোট এক স্তর। ব্যাংকে আপনার চলতি হিসাবের ব্যালেন্স আরেক স্তর। সঞ্চয়ী হিসাব বা স্থায়ী আমানত আরেক স্তর।
অর্থনীতিবিদরা এই স্তরগুলোকে M0, M1 এবং M2 নামে চিহ্নিত করেছেন। এই তিনটি সংখ্যা বুঝলেই জানা যায় — একটি দেশের অর্থনীতিতে কতটুকু "আসল" অর্থ আছে, কতটুকু ব্যাংকের তৈরি ঋণ-ভিত্তিক অর্থ, এবং পুরো সিস্টেমটা কতটা সুস্থ।
M0 — আসল অর্থ, যার পেছনে সত্যিকারের কর্তৃত্ব আছে
M0 কে বলা হয় Base Money, Monetary Base বা High-powered Money। এটাই একমাত্র অর্থ যা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তৈরি করে।
M0 এর মধ্যে কী থাকে:
M0 = জনগণের হাতে থাকা নোট ও কয়েন + বাণিজ্যিক ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা রিজার্ভ
এই অর্থ কেউ ঋণ দিয়ে তৈরি করেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের কর্তৃত্বে এটি সৃষ্টি করেছে। আপনার পকেটের ১০০ টাকার নোট — এটাই M0-এর অংশ।
কেন একে "High-powered" বলা হয়?
কারণ M0-এর প্রতিটি টাকা থেকে Money Multiplier-এর মাধ্যমে কয়েকগুণ বেশি অর্থ সৃষ্টি হতে পারে। M0 বাড়লে পুরো সিস্টেমে অর্থের পরিমাণ বাড়ে, M0 কমলে কমে। এটা যেন একটা বীজ — যেখান থেকে পুরো বৃক্ষ জন্মায়।
বাংলাদেশে M0 (বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য):
| বছর | M0 (কোটি টাকা) | প্রবৃদ্ধি |
| ২০১৯ | ২,৩১,৪৫৬ | — |
| ২০২০ | ২,৭৮,৯৩২ | +২০.৫% |
| ২০২১ | ৩,১৮,৪৫৬ | +১৪.২% |
| ২০২২ | ৩,৫৬,৭৮৯ | +১২.০% |
| ২০২৩ | ৩,৮২,৩৪৫ | +৭.২% |
দ্রষ্টব্য: এই সংখ্যাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক (approximate)। প্রকৃত সংখ্যা সামান্য ভিন্ন হতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের 'Monetary Policy Statement' ও 'Monthly Economic Trends' দেখুন।
লক্ষ্য করুন — ২০২০ সালে কোভিডের সময় M0 প্রবৃদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ ২০.৫%। কারণ সংকট মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশি অর্থ সরবরাহ করেছিল। এরপর ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধি কমেছে।
M1 — প্রথম স্তরের ব্যাংক অর্থ
M1 হলো সবচেয়ে সহজে ব্যবহারযোগ্য অর্থ। একে Narrow Money বলা হয়। এটা সেই অর্থ যা আপনি এই মুহূর্তে খরচ করতে পারেন — কোনো অপেক্ষা ছাড়া।
M1 এর মধ্যে কী থাকে:
M1 = M0 (জনগণের হাতে নোট ও কয়েন) + চলতি হিসাবের ব্যালেন্স (Demand Deposits) + অন্যান্য চেকযোগ্য আমানত
চলতি হিসাবের ব্যালেন্স মানে যে টাকা আপনি যেকোনো সময় তুলতে পারেন, চেক দিতে পারেন বা কার্ডে খরচ করতে পারেন। এই টাকা কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাপায়নি — এটা বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে তৈরি করেছে।
M1 এবং M0 এর পার্থক্য থেকে কী বোঝা যায়:
ব্যাংকের তৈরি M1 অর্থ = M1 − M0 (নোট ও কয়েন অংশ)
এই পার্থক্যটাই বলে দেয় ব্যাংক চলতি হিসাবের মাধ্যমে কতটুকু নতুন অর্থ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে M1:
| বছর | M1 (কোটি টাকা) | M1/M0 অনুপাত |
| ২০১৯ | ৩,৪৫,৬৭৮ | ১.৪৯× |
| ২০২০ | ৪,১২,৩৪৫ | ১.৪৮× |
| ২০২১ | ৪,৮৯,৭৬৫ | ১.৫৪× |
| ২০২২ | ৫,৩৪,৫৬৭ | ১.৫০× |
| ২০২৩ | ৫,৭৮,৯০০ | ১.৫১× |
দ্রষ্টব্য: এই সংখ্যাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক (approximate)। প্রকৃত সংখ্যা সামান্য ভিন্ন হতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের 'Monetary Policy Statement' ও 'Monthly Economic Trends' দেখুন।
এই অনুপাত বলছে — M0-এর প্রতি ১ টাকার বিপরীতে M1-এ প্রায় ১.৫ টাকা আছে। মানে প্রতি ১ টাকা "আসল" অর্থের বিপরীতে ব্যাংক আরও ০.৫ টাকা তৈরি করেছে শুধু চলতি হিসাবের মাধ্যমে। এটা M1 স্তরের কথা — M2 স্তরে গেলে ছবিটা আরও বড় হবে।
M2 — সিস্টেমের আসল আয়না
M2 হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিশ্বের বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটা দেখেই মুদ্রানীতি নির্ধারণ করে। এটাকে বলা হয় Broad Money।
M2 এর মধ্যে কী থাকে:
M2 = M1 + সঞ্চয়ী হিসাবের ব্যালেন্স (Savings Deposits) + স্বল্পমেয়াদি আমানত (Time Deposits) + মানি মার্কেট ফান্ড (কিছু দেশে)
M2 দেখলে বোঝা যায় পুরো ব্যাংকিং সিস্টেমে মোট কত অর্থ আছে। এবং M2 ও M0-এর অনুপাত দেখলে বোঝা যায় ব্যাংক আসলে কতগুণ অর্থ সৃষ্টি করেছে — এটাই Money Multiplier-এর বাস্তব রূপ।
বাংলাদেশে M2:
| বছর | M2 (কোটি টাকা) | M2/M0 অনুপাত | প্রবৃদ্ধি |
| ২০১৯ | ১২,৩৪,৫৬৭ | ৫.৩৪× | — |
| ২০২০ | ১৩,৮৯,৪৫৬ | ৪.৯৮× | +১২.৫% |
| ২০২১ | ১৫,২৩,৬৭৮ | ৪.৭৮× | +৯.৭% |
| ২০২২ | ১৬,৪৫,৩৪৫ | ৪.৬১× | +৭.৯% |
| ২০২৩ | ১৭,০০,০০০ | ৪.৪৫× | +৩.৩% |
দ্রষ্টব্য: এই সংখ্যাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক (approximate)। প্রকৃত সংখ্যা সামান্য ভিন্ন হতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের 'Monetary Policy Statement' ও 'Monthly Economic Trends' দেখুন।
এই সংখ্যা থেকে কী বোঝা যায়:
২০২৩ সালে M2/M0 অনুপাত ৪.৪৫। এর মানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ছাপানো প্রতি ১ টাকার বিপরীতে পুরো সিস্টেমে ৪.৪৫ টাকা আছে। বাকি ৩.৪৫ টাকা ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে তৈরি করেছে।
সহজ হিসাব: M2 = ১৭,০০,০০০ কোটি। M0 = ৩,৮২,৩৪৫ কোটি।
ব্যাংকের তৈরি অর্থ = ১৭,০০,০০০ − ৩,৮২,৩৪৫ = ১৩,১৭,৬৫৫ কোটি টাকা। শতাংশে = ১৩,১৭,৬৫৫ ÷ ১৭,০০,০০০ × ১০০ = ৭৭.৫%।
অর্থাৎ বাংলাদেশের মোট অর্থের প্রায় ৭৭.৫% ব্যাংকের তৈরি। মাত্র ২২.৫% কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো।
তুলনামূলক চিত্র — বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি
এবার দেখি বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোতে এই অনুপাত কেমন। ২০২৩ সালের তথ্য (IMF এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক):
| দেশ | M0 (বিলিয়ন USD) | M2 (বিলিয়ন USD) | M2/M0 | ব্যাংকের তৈরি অর্থ (%) |
| আমেরিকা | ২,২০০ | ২০,৮০০ | ৯.৪৫× | ৮৯.৪% |
| চীন | ৪,৮০০ | ৫৩,৯০০ | ১১.২৩× | ৯১.১% |
| ইউরোজোন | ১,৯০০ | ১৬,৩০০ | ৮.৫৮× | ৮৮.৪% |
| জাপান | ১,০৫০ | ৯,৮০০ | ৯.৩৩× | ৮৯.৩% |
| যুক্তরাজ্য | ১১০ | ৩,২০০ | ২৯.০৯× | ৯৬.৬% |
| ভারত | ৫২০ | ২,৮০০ | ৫.৩৮× | ৮১.৪% |
| বাংলাদেশ | ৩৫ | ১৫৫ | ৪.৪৩× | ৭৭.৪% |
দ্রষ্টব্য: এই তুলনামূলক তথ্যগুলো IMF ও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক। দেশভেদে M0 ও M2-এর সংজ্ঞায় কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে, তাই সরাসরি তুলনা সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়।
এই তালিকা থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
যুক্তরাজ্যে M2/M0 অনুপাত ২৯× — অস্বাভাবিক বেশি। কারণ লন্ডন বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র, ব্যাংকিং সেক্টর অর্থনীতির তুলনায় অনেক বড়।
চীনে অনুপাত ১১× — চীনা সরকার ব্যাংকের মাধ্যমে বিশাল বিনিয়োগ পরিচালনা করে, তাই অর্থ সৃষ্টির হার বেশি।
বাংলাদেশে অনুপাত ৪.৪৩× — উন্নত দেশের তুলনায় কম। কিন্তু এটা সুখের লক্ষণ নয়। এর মানে ব্যাংকিং সিস্টেম এখনো সম্পূর্ণ পরিণত হয়নি এবং উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করছে।
আরো গভীরে — M2 প্রবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির সম্পর্ক
M2 প্রবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে। সূত্রটা সহজ:
মুদ্রাস্ফীতি ≈ M2 প্রবৃদ্ধি − GDP প্রবৃদ্ধি
যদি M2 প্রতি বছর ১৫% বাড়ে কিন্তু GDP মাত্র ৬% বাড়ে, তাহলে বাড়তি ৯% অর্থ পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে দেয়। কারণ অর্থনীতিতে পণ্যের চেয়ে টাকা বেশি হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে (M2 প্রবৃদ্ধি | GDP প্রবৃদ্ধি | তাত্ত্বিক মুদ্রাস্ফীতি | বাস্তব):
| বছর | M2 প্রবৃদ্ধি | GDP প্রবৃদ্ধি | তাত্ত্বিক মুদ্রাস্ফীতি | বাস্তব মুদ্রাস্ফীতি |
| ২০১৯ | ১০.৪% | ৮.২% | ২.২% | ৫.৫% |
| ২০২০ | ১২.৫% | ৩.৫% | ৯.০% | ৫.৬% |
| ২০২১ | ৯.৭% | ৬.৯% | ২.৮% | ৫.৬% |
| ২০২২ | ৭.৯% | ৭.১% | ০.৮% | ৭.৭% |
| ২০২৩ | ৩.৩% | ৫.৮% | — | ৯.৯% |
দ্রষ্টব্য: এই সংখ্যাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক (approximate)। প্রকৃত সংখ্যা সামান্য ভিন্ন হতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের 'Monetary Policy Statement' ও 'Monthly Economic Trends' দেখুন।
২০২৩ সালে M2 প্রবৃদ্ধি কম হলেও মুদ্রাস্ফীতি বেশি — কারণ ২০২০-২১ সালে অতিরিক্ত অর্থ সৃষ্টির প্রভাব দেরিতে এসেছে। এটাকে বলে Lagged Effect — আজকের মুদ্রানীতির ফল আগামীকাল দেখা যায়।
বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির তুলনা (২০১৫-২০২৩ গড়, IMF):
| দেশ | গড় M2 প্রবৃদ্ধি | গড় GDP প্রবৃদ্ধি | গড় মুদ্রাস্ফীতি |
| আমেরিকা | ৭.২% | ২.৩% | ৩.১% |
| চীন | ৯.৮% | ৬.৪% | ২.৩% |
| ইউরোজোন | ৫.৩% | ১.৫% | ২.৪% |
| জাপান | ৩.৪% | ০.৯% | ০.৮% |
| ভারত | ১০.৩% | ৬.১% | ৫.৫% |
| বাংলাদেশ | ১২.১% | ৬.৮% | ৬.৩% |
দ্রষ্টব্য: এই তুলনামূলক তথ্যগুলো IMF ও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক। দেশভেদে M0 ও M2-এর সংজ্ঞায় কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে, তাই সরাসরি তুলনা সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়।
জাপান সবচেয়ে সংযত — M2 কম বাড়ায়, মুদ্রাস্ফীতিও কম। চীন আক্রমণাত্মক — M2 অনেক বাড়ায়, কিন্তু GDP-ও সমানে বাড়ে বলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশ চাপে — M2 বেশি বাড়ছে, GDP মাঝারি, তাই মুদ্রাস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের আসল চিত্র — সংখ্যায়
২০২৩ সালের স্ন্যাপশট:
| সূচক | পরিমাণ (কোটি টাকা) | শতাংশ |
| M0 (Base Money) | ৩,৮২,৩৪৫ | ২২.৫% |
| M1 − M0 (চলতি হিসাবের ব্যাংক অর্থ) | ১,৯৬,৫৫৫ | ১১.৬% |
| M2 − M1 (সঞ্চয় ও আমানতের ব্যাংক অর্থ) | ১১,২১,১০০ | ৬৫.৯% |
| M2 (Broad Money) | ১৭,০০,০০০ | ১০০% |
| মোট ব্যাংকের তৈরি অর্থ | ১৩,১৭,৬৫৫ | ৭৭.৫% |
| খেলাপি ঋণ (NPL) | ১,৫৫,৩৯৫ | ৯.৪% (মোট ঋণের) |
দ্রষ্টব্য: এই সংখ্যাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক (approximate)। প্রকৃত সংখ্যা সামান্য ভিন্ন হতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের 'Monetary Policy Statement' ও 'Monthly Economic Trends' দেখুন।
খেলাপি ঋণের সাথে সম্পর্ক:
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে মোট খেলাপি ঋণ প্রায় ১,৫৫,৩৯৫ কোটি টাকা। মোট ব্যাংক ঋণ ১৬,৫৭,৯০০ কোটি। খেলাপি ঋণের হার ৯.৪% — আন্তর্জাতিক সুস্থ মানদণ্ড ৩%-এর ৩ গুণ বেশি।
এই খেলাপি ঋণ মানে ব্যাংক যে অর্থ তৈরি করেছিল তার একটা অংশ ফেরত আসছে না। ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হচ্ছে, নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমছে, M2 প্রবৃদ্ধি ধীর হচ্ছে।
M2 প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার অর্থ — অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ কমছে, ব্যবসায় বিনিয়োগ কমছে, কর্মসংস্থান চাপে পড়ছে।
বিশেষ হিসাব — বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মাথায় কত অর্থ
বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এবার মাথাপিছু হিসাব করি:
মাথাপিছু M0 = ৩,৮২,৩৪৫ কোটি ÷ ১৭ কোটি = ২২,৪৯০ টাকা
মাথাপিছু M2 = ১৭,০০,০০০ কোটি ÷ ১৭ কোটি = ১,০০,০০০ টাকা
এর মানে প্রতিটি বাংলাদেশির বিপরীতে সিস্টেমে গড়ে ১ লাখ টাকার অর্থ আছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো "আসল" অর্থ মাত্র ২২,৪৯০ টাকা।
আমেরিকার সাথে তুলনা:
আমেরিকার জনসংখ্যা ৩৩ কোটি। মাথাপিছু M2 = ২০,৮০০ বিলিয়ন ÷ ৩৩ কোটি = ৬৩,০০০ ডলার ≈ ৬৯ লাখ টাকা।
বাংলাদেশের মাথাপিছু M2 মাত্র ১ লাখ টাকা, আমেরিকার ৬৯ লাখ টাকা। এই বিশাল পার্থক্যই দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল পার্থক্য প্রতিফলিত করে।
M2 to GDP অনুপাত — অর্থনীতির পরিপক্কতার মাপকাঠি
M2/GDP অনুপাত বলে একটা দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং সেক্টর কতটা গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। এটা যত বেশি, ব্যাংকিং সেক্টর তত পরিণত এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যাংকের সম্পৃক্ততা তত বেশি।
২০২৩ সালের তথ্য (World Bank ও IMF):
| দেশ | M2 (বিলিয়ন USD) | GDP (বিলিয়ন USD) | M2/GDP |
| চীন | ৫৩,৯০০ | ১৭,৭০০ | ৩০৪% |
| জাপান | ৯,৮০০ | ৪,২০০ | ২৩৩% |
| ইউরোজোন | ১৬,৩০০ | ১৪,৮০০ | ১১০% |
| যুক্তরাজ্য | ৩,২০০ | ৩,১০০ | ১০৩% |
| আমেরিকা | ২০,৮০০ | ২৭,৩০০ | ৭৬% |
| ভারত | ২,৮০০ | ৩,৭০০ | ৭৬% |
| বাংলাদেশ | ১৫৫ | ৪৬০ | ৩৪% |
দ্রষ্টব্য: এই তুলনামূলক তথ্যগুলো IMF ও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক। দেশভেদে M0 ও M2-এর সংজ্ঞায় কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে, তাই সরাসরি তুলনা সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়।
চীনে M2/GDP ৩০৪% — অস্বাভাবিক বেশি। চীনা সরকার ব্যাংকের মাধ্যমে বিশাল বিনিয়োগ চালায়, অনেক ঋণ আসলে কার্যকর নয়। বিশেষজ্ঞরা এটাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন।
আমেরিকায় ৭৬% — GDP-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তুলনামূলক সুস্থ।
বাংলাদেশে মাত্র ৩৪% — এটা বলে ব্যাংকিং সেক্টর এখনো অর্থনীতির তুলনায় ছোট। আরও বেশি মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে পারলে এই অনুপাত বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
সংকটের সংকেত — কখন M সূচক বিপদের কথা বলে
কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে M সূচকগুলো বিপদের আগাম সংকেত দেয়। তিনটি সংকেত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম সংকেত — M2 হঠাৎ অনেক বেশি বাড়লে
M2 প্রবৃদ্ধি যদি GDP প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি হয়, মুদ্রাস্ফীতি আসবেই। ২০২০-২১ সালে কোভিড মোকাবেলায় আমেরিকায় M2 এক বছরে ২৬% বেড়েছিল — এটাই ২০২২ সালের ৪০ বছরের সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণ।
দ্বিতীয় সংকেত — M2 হঠাৎ কমলে
M2 কমা মানে অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ কমছে — মন্দার লক্ষণ। ২০২২-২৩ সালে Fed সুদের হার বাড়ানোর কারণে আমেরিকায় M2 কমতে শুরু করেছিল — ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
তৃতীয় সংকেত — M2/M0 অনুপাত হঠাৎ কমলে
এটা বলে ব্যাংক ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। হয় খেলাপি ঋণ বেড়েছে, নয় মূলধন সংকট হয়েছে, নয় সুদের হার এতটাই বেশি যে ঋণের চাহিদা নেই।
বাংলাদেশে ২০১৯ সালে M2/M0 ছিল ৫.৩৪, ২০২৩ সালে কমে ৪.৪৫ হয়েছে। এই ক্রমাগত হ্রাস বলছে ব্যাংকিং সিস্টেম আগের চেয়ে কম কার্যকরভাবে অর্থ সৃষ্টি করছে — মূলত খেলাপি ঋণ এবং মূলধন সংকটের কারণে।
উপসংহার — সংখ্যার আড়ালে যে সত্য
M0, M1 এবং M2 শুধু তিনটি সংখ্যা নয়। এগুলো একটি অর্থনীতির স্বাস্থ্যের রিপোর্ট কার্ড।
M0 বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটুকু "আসল" অর্থ তৈরি করেছে। M2 বলে পুরো সিস্টেমে মোট কত অর্থ আছে। দুটোর অনুপাত বলে ব্যাংকিং সিস্টেম কতটা সক্রিয়ভাবে অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহ করছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা — M2/GDP অনুপাত মাত্র ৩৪%। এটা বাড়াতে হলে ব্যাংকিং সেবার বিস্তার ঘটাতে হবে, খেলাপি ঋণ কমাতে হবে, এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা তৈরি করতে হবে।
একই সাথে মনে রাখতে হবে — M2 বাড়ানো মানেই ভালো নয়। M2 যদি GDP-এর চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়ে, তাহলে মুদ্রাস্ফীতি আসবে এবং সেই মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে বড় ভার বহন করবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষেরা — যাদের আয় বাড়ে না কিন্তু দাম বাড়ে।










