GeoRenus Editorial Team

সামাজিক উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা আরো সহজ করে দেয় সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাস টুল। মূলত বহুল ব্যবহৃত বিজনেস মডেল ক্যানভাস টুল থেকেই সামাজিক সংগঠনের কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযোগী করে এই মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের সামাজিক উন্নয়নে কোনো আইডিয়া এই টুলের মাধ্যমে পর্যালোচনা করে সুনির্দিষ্ট সিন্ধান্তে আসা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি।
যুগে যুগে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নে কিংবা নির্দিষ্ট এক বা একাধিক সমাধানের লক্ষ্যে অসংখ্য নন-প্রফিট, চ্যারিটেবল কিংবা সোশ্যাল স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে। গতানুগতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর এই সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পার্থক্য হলো এইসব প্রতিষ্ঠান মুনাফা অর্জনের চেয়ে সামাজিক কিংবা জনগণের উন্নয়ন কে বেশী প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে জনগণের সেবা প্রদান করাই এই সামাজিক উদ্যোগ গুলোর একমাত্র মূখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে মুনাফা অর্জনের কোনো চিন্তাধারা থাকে না। তাই এসব সামাজিক সমস্যার সমাধানকল্পে গড়ে তুলা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্ল্যানিং ও স্ট্র্যাটেজিও কিছুটা ব্যাতিক্রম হয়ে থাকে।
আর একজন সামাজিক উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা আরো সহজ করে দেয় সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাস টুল। মূলত বহুল ব্যবহৃত বিজনেস মডেল ক্যানভাস টুল থেকেই সামাজিক সংগঠনের কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযোগী করে এই মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের সামাজিক উন্নয়নে কোনো আইডিয়া এই টুলের মাধ্যমে পর্যালোচনা করে সুনির্দিষ্ট সিন্ধান্তে আসা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি।
আপনি যদি সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে উদগ্রীব থাকেন এবং সমাজের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে চান, চলুন, তাহলে এই অসাধারণ সামাজিক আইডিয়া উপযোগী টুলটি সম্পর্কে বিশদভাবে জেনে নেওয়া যাক যা আপনাকে অনেকাংশে উপকার করবে বলে আশা করা যায়।
২০১৩ সালে সোশ্যাল ইনোভেশন ল্যাব ( Social Innovation Lab) বিজনেস মডেল ক্যানভাস অনুকরণ করে সোশ্যাল বিজনেস ক্যানভাস মডেলটি তৈরি করে। এই মডেলটি অন্য মডেলের চেয়ে কিছুটা ব্যাতিক্রমধর্মী হওয়ার মূল কারণ এটি মুনাফা অর্জনের চেয়ে একটি প্রতিষ্ঠান কিভাবে সামাজিক উপকারে কাজে লাগছে সেটি তুলে ধরে। একারণে বিজনেস মডেল ক্যানভাস নয়টি ব্লকের মাধ্যমে তৈরি করা হলেও এই সোশ্যাল বিজনেস ক্যানভাস মডেলে তেরটি ব্লক রয়েছে যা একটি মাত্র পৃষ্ঠায় ভিজুয়ালি উপস্থাপন করা।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া ছোট যেকোনো ব্যবসায় যদি মানুষের কথা বিবেচনা করে গড়ে তুলতে চান, এই মডেলটি ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারেন। মূলত এই বিজনেস টুলটি আপনাকে বিজনেস মডেল ক্যানভাসের তুলনায় আরো বেশকিছু মূল বিষয়াদি সম্পর্কে পর্যালোচনা করতে সহায়তা করবে। যা সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবেচনায় রাখা খুবই জরুরি।
যদিও সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাস মূলত ১৩ টি ব্লকে বিভক্ত, কিছু কিছু ব্লক আবার একটি মৌলিক ব্লকের অংশ মাত্র। এই অংশে আমরা সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাসের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করবো, যাতে আপনার সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই মডেলটি ব্যবহার করা অনেকাংশে সহজ এবং নির্ভূল করা যায়।
আপনি যে সমস্যা সমাধান করতে চাচ্ছেন তা সামাজিকভাবে সেই স্থানে কতটুকু প্রভাব ফেলবে সেটা অবশ্যই আলোকপাত করা জরুরি। সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাসে এই ভ্যালূ প্রোপোজিশনকে আবার তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমনঃ
একটি নির্দিষ্ট স্থানে কোনো একটা সমস্যা সমাধানে সেটি সামাজিকভাবে কেমন প্রভাব ফেলবে তা অংশে ব্যাখা করা প্রয়োজন।
আপনার ভ্যালু প্রোপোজিশন সামাজিক ক্ষেত্রে কিভাবে প্রভাব বিস্তার করছে তা আপনি কিভাবে পরিমাপ করবেন? এই অংশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি গ্রাহকরা কিভাবে অনেক বেশি উপকৃত হতে পারে সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তাহলে, সবকিছু মিলে একটা দারুণ যোগসূত্র হবে।
কিভাবে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কিংবা সমাজের উন্নয়ন করা সম্ভব? আপনি কি তাদের জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করবেন নাকি কোনো পণ্য কিংবা সেবা প্রদানের মাধ্যমে এক বা একাধিক সমস্যার সমাধান করবেন? এই ব্যাপারে একটি নির্দিষ্ট সিন্ধান্তে উপনিত হয়ে আপনাকে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাসে সেগমেন্ট অংশটি আবার দু'ভাগে বিভক্ত। যেমনঃ
এই অংশের উপর ভিত্তি করেই একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। আপনি নির্দিষ্ট সামাজিক সমস্যা সমাধানকল্পে যে পদক্ষেপ গুলো নিয়েছেন তা কিভাবে উপকার বয়ে আনবে? আপনি কিভাবে সফল হয়েছেন বলে নিজেকে ভাবতে পারবেন? (এক্ষেত্রে মুনাফা অর্জন কম প্রাধান্য পাবে)
আপনি অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করেই একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা করেছেন কিংবা গড়ে তুলেছেন। নির্দিষ্ট গ্রাহক সম্পর্কে যত অবগত থাকা যায়, তাদের কাছে পৌছানো টা ততটাই সহজ হয়ে যায়।
নির্দিষ্ট গ্রাহক সম্পর্কে আপনার ধারণা আছে, এখন লক্ষ্য হলো আপনি তাদের কাছে কিভাবে পৌছাবেন? আপনাকে পর্যালোচনা করে বের করতে হবে কোন মাধ্যমে আপনি আপনার উপযুক্ত গ্রাহকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারবেন। সেটি হতে পারে প্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইনে, কিংবা জনসম্মুখে মানুষের সামনে গিয়ে প্রচারণা চালিয়ে।
আপনার সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন তাই মূলত কী একটিভিটিস। আপনার প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি করা অনেকাংশে সহজ হয়ে যাবে যদি আপনার ভবিষ্যতে কি কি করবেন এই নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকে।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য কি কি প্রয়োজন? আপনার হয়তো দক্ষ জনশক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য-সামগ্রী প্রয়োজন! আপনার সামাজিক ব্যবসার ধরণ অনুযায়ী কি কি প্রয়োজন সবকিছু নিয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা রাখুন। সে অনুযায়ী কী রিসোর্সেস ব্লকে সবকিছু লিপিবদ্ধ করুন।
আপনার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য বাহিরের কোন কোন ব্যাক্তিবর্গ কিংবা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট? আপনার যেকোনো প্রজেক্ট হাতে নিতে কি কারো থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা? এইসকল বিষয়গুলো একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এইসব বিষয়ে অবশ্যই শুরু থেকেই ধারণা রাখা উচিত।
আপনার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য কেমন অর্থের প্রয়োজন এবং কোথায় কেমন খরচ করতে হবে এই ব্যাপারে একটা নিখুঁত প্ল্যান করা জরুরি। কোন কোন অংশগুলোর জন্য একটা বিশাল বাজেট রাখতে হবে কিংবা কিভাবে আপনার প্রতিষ্ঠান সুনির্দিষ্ট বাজেটিং এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে পারবে তা অবশ্যই লিপিবদ্ধ করে রাখা প্রয়োজন।
সারপ্লাস হলো আপনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে ফান্ডিং কিংবা লভ্যাংশ অর্জন করবেন তা কোথায় বিনিয়োগ করবেন। ধরুন, আপনি এক সমাজসেবক থেকে বেশকিছু টাকা পেয়েছেন সামাজিক উন্নয়নের জন্য। এখন এই টাকা আপনি দরিদ্র জনগণের মাঝে শীতের কাপড় বিতরণের মাধ্যমে খরচ করতে চান। এটাই মূলত সারপ্লাস।
আপনি যদি নন-প্রফিট কিংবা চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশনের চিন্তাভাবনা করে থাকেন তাহলে এই অংশটি এড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি আপনার সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উপার্জন কিরতে চান তাহলে কিভাবে সেই অর্থ আসবে সেটার একটা ভালো রেভিনিউ মডেল দাড়া করানো জরুরি। এক্ষেত্রে যে মাধ্যম থেকে আপনি টাকা উপার্জন করতে চাচ্ছেন, সেগুলো সবগুলো নিয়ে শতকরা হিসেবে এই মডেলে উপস্থাপন করতে পারেন।
যেকোনো সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ এর জন্য একটি পরিপূর্ণ বিজনেস টুল বলা যায় সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাস কে। তাই যেকোনো সামাজিক উদ্যোক্তাদের জন্য এই টুলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শুরুতেই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বিজনেস প্ল্যান লিখাটা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। অন্যদিকে বিজনেস মডেল ক্যানভাস, লিন ক্যানভাস ইত্যাদি যে মডেলগুলো একটি ব্যবসার প্ল্যান এবং স্ট্র্যাটেজি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়, তা একটি সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ এর জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়।
এক্ষেত্রে সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাস হতে পারে একমাত্র উপযোগী টুল যা আপনার আইডিয়া কিংবা উদ্যোগ এর কোনো ক্রুটি না রাখা এবং একটি গাঠনিক রুপ প্রদান করতে সহায়তা করে। তাছাড়া, সর্বমোট তেরটি ব্লক সুনিপুণভাবে আলোকপাত করে আপনি খুব সহজেই যথোপযুক্ত সিন্ধান্ত নিতে পারবেন বলে আশা করি যায়।
সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাস ব্যবহার করে কোন কোন ক্ষেত্রে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব?
যেকোনো সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ এর জন্য এই মডেলটি আশীর্বাদস্বরূপ। তবে বেশকিছু ক্ষেত্রে এই মডেলটির যথাযথ প্রয়োগ করে অধিক লাভবান হতে পারেন। যেমনঃ
একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ফান্ড যোগাড় করা খুব ই প্রয়োজনীয়। যারা আপনার প্রজেক্ট কিংবা প্ল্যানে ডোনেট কিংবা ইনভেস্ট করতে চাইবে তাদের অবশ্যই আপনার কম সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গাঠনিক রুপ দেখিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে। সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাসের মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই আপনার শুভাকাঙ্খীদের কাছে উপস্থাপন করতে পারবেন।
সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাসের মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই আপনার প্রজেক্ট, পণ্য কিংবা সেবার যোগ্যতা যাচাই করতে পারবেন। এই এক পৃষ্ঠার ভিজুয়াল টুলে মোট ১৩ টি মৌলিক বিষয়াদি ব্লক আকারে উপস্থাপন করা থাকে। সবগুলো ব্লক সঠিকভাবে পূরণ করে আপনি আপনার উদ্যোগটি নিয়ে কতদূর কিংবা কখন আগাতে পারবেন তা সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন।
সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাসের বেশকিছু অসাধারণ সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। যেমনঃ
আমাদের সমাজের উন্নয়নে প্রয়োজন অসংখ্য সামাজিক উদ্যোক্তার ইতিবাচক মনোভাব। আর তাদের ছোট কিংবা বড় স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রুপদান করতে সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাস টুল অনেক সহায়তা করতে পারে।

প্রতিটি উদ্যোক্তাই চায় তার পণ্য বা সেবা বাজারে আনার আগে সেটাকে একদম নিখুঁত করে তুলতে। কিন্তু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর সময় আর অর্থ ব্যয় করে একটা পণ্য পুরোপুরি তৈরি করার পর যদি দেখা যায় বাজারে তার কোনো চাহিদাই নেই — এটা একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। মূলত এই সমস্যার সমাধান দিতেই তৈরি হয়েছে মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট বা এমভিপি কৌশল। পুরো পণ্য একসাথে না বানিয়ে শুধু সবচেয়ে জরুরি ফিচারগুলো নিয়ে বাজারে আসুন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সত্যিকারের মতামত নিন এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে পণ্য উন্নত করুন। বাংলাদেশের পাঠাও, বিশ্বের উবার এবং ড্রপবক্স — এরা সবাই এই একই পথ ধরে এগিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।








