GeoRenus Editorial Team

ওয়ার্ড ট্রেডিং এন্ড ফাইনান্সিয়াল সিস্টেম এখন অতন্ত্য সেনসিটিভ ইস্যুতে পরিনত হয়েছে। রাতারাতি কেউ সফল হয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার চোখের পলকে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের নামকরা বহু কোম্পানি এই ধরনের অভ্যন্তরীণ ইলিগ্যাল ট্রেডিং এর ফাঁদে পড়ছে। অর্থাৎ কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করে অথবা সেটা কাজে লাগিয়ে, কোম্পানির সাথে যুক্ত ব্যক্তিরাই ইনসাইডার ট্রেডিং করে যাচ্ছে। নন পাবলিক ইনফরমেশন কে পাবলিক করা বা মিস ইউজ করার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ফেস করে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবছর প্রয় ৪৩২ টি কেস ফাইল হয় শুধুমাত্র ইনসাইডার ট্রেডিং এর বিরুদ্ধে।
একুশ শতকের শুরুর দিকের ImClone কোম্পানির সেই ঘটনাটি মনে আছে? যখন এফডিএ (FDA) তাদের ক্যান্সার ড্রাগ রিজেক্ট করে দিয়েছিল। এই ঘটনা যতদিন গোপন ছিল ততদিন ইমক্লোনের স্টক প্রাইজে কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্যকে হাতিয়ার করে কোম্পানির সিইও মার্থা স্টুয়ার্ট তার কাছে থাকা সকল স্টক উচ্চ মূল্য বিক্রি করে দেয়। এবং স্টক প্রাইজ অবিশ্বাস্য হারে কমে যায়। বলছিলাম ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ইনসাইডার ট্রেডিং এর কথা।
“সিকিউরিটি সংক্রান্ত এবং নন পাবলিক ইনফরমেশন এর অনৈতিক ট্রেডিং, দায়িত্ব ও বিশ্বস্ততার অপব্যবহার হল ইনসাইডার ট্রেডিং” - উইলিয়াম কে এস ওয়াং।
অর্থাৎ, কোনো প্রতিষ্ঠানের একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা দায়িত্বরত কর্মকর্তা যদি তাদের কোম্পানির সিকিউরিটি সংক্রান্ত কোনো তথ্য কিংবা কোম্পানির কেনো সেনসিটিভ তথ্য গোপনে ব্যবহার করে। কিংবা ইনফরমেশন ট্রেডিং এর মাধ্যমে কোম্পানির সিকিউরিটি কিংবা ভ্যালু নষ্ট করে, সেটিই হবে ইনসাইডার ট্রেডিং। বর্তমানে স্টক মার্কেটের সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠান গুলোর জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কারণ এই ইনসাইডার ট্রেডিং।
শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ফাইনান্স রিলেটেড প্রতিষ্ঠান গুলোতেই প্রতিবছর শতশত কেস ফাইল হয় ইনসাইডার ট্রেডিং এর জন্য। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে, অর্থাৎ বিশ্ব অর্থনীতিতে শেয়ার মার্কেটের প্রভাব বাড়ার সাথে সাথে ইনসাইডার ট্রেডিং ও সমান হারে বেড়েছে। কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের কাছে কোম্পানির তথ্য বিক্রি করা কিংবা অনৈতিক ভাবে ট্রেডিং করা ও স্টক প্রাইজে হেরফের করা সহজ হয়ে গেছে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৬২ টি ইনসাইডার ট্রেডিং কেস ফাইল হয়েছে।
ইনসাইডার ট্রেডিং বিষয় টি আরেকটু বিস্তারিত ভাবে বুঝতে কয়েকটি উদাহরণ -
ইনসাইডার ট্রেডিং এর কিছু হাইপোথিটিটিক্যাল উদাহরণ (Hypothetical Examples of Insider Trading)
ধরুন একটি কোম্পানির সিইও তার কোম্পানির অধিগ্রহণ বা acquisition সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এমন একজন বন্ধুর কাছে পৌঁছে দিলেন যিনি ওই কোম্পানির বড় অংশের শেয়ারহোল্ডিংয়ের মালিক। এখন সেই বন্ধু ওই তথ্যের উপর কাজ করে এবং তথ্য প্রকাশের আগে তার সমস্ত শেয়ার বিক্রি করে দিল। এটা ছিল সবচেয়ে কমন টাইপের ইনসাইডার ট্রেডিং এর উদাহরণ।
একজন সরকারী কর্মচারী একটি নতুন প্রবিধান পাশ হওয়ার বিষয়ে মূল্যবান তথ্য কোনো একটি নির্দিষ্ট সংস্থা কে জানিয়ে দিল। এখন পই প্রবিধান জনসম্মুখে আসার আগেই ওই অর্গানাইজেশন বা ব্যাক্তিরা ওই শেয়ার গুলো কিনে নিল কম দামে। এবং প্রবিধান পাশ হওয়া ও পাবলিক হওয়ার পর যখন শেয়ার এর প্রাইজ ও ভ্যালু অনেক বেশি বেড়ে যাবে তখন উচ্চ মূল্য এগুলো বিক্রি করে দিল। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া মোস্ট কমন ইনসাইডার ট্রেডিং ইন্সিডেন্ট এটি।
আপাত দৃষ্টিতে Insider Trading অবৈধ হিসেবে গন্য করা হলেও, বিশেষ ক্ষেত্রে এটি লিগ্যাল হিসেবেও বিবেচিত হয়৷
Insider Trading বা অভ্যন্তরীণ লেনদেন তখনই অবৈধ বলে গণ্য করা হয় যখন ননম্যাটেরিয়াল তথ্য গুলো নন পাবলিক থাকে এবং সেগুলো প্রকাশ করা হয়। এজন্য সম্ভাব্য জরিমানা এবং কেয়েক বছর জেল সহ আরো কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়।
সহজ কথায়, যদি কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের এমন কোনো নন ম্যাটেরিয়াল, নন পাবলিক তথ্যকে এমন কোনো তথ্য হিসাবে রিপ্রেজেন্ট করা হয় যা সেই কোম্পানির স্টক প্রাইজ কে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এই ধরনের সেনসিটিভ তথ্য আদানপ্রদান ও স্টক প্রাইজ হেরফের করা হলে তখন এই ট্রেডিং পুরোপুরি অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এবং পেনাল্টি হিসেবে বিভিন্ন ধাপে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।
অভ্যন্তরীণ লেনদেন বা ইনসাইডার ট্রেডিং তখনই লিগ্যাল হবে যখন ও অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি ট্রেডিং করেও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে তা রিপোর্ট করে। অর্থাৎ কোম্পানির মালিকানাধীন সকলের সম্মতিতে কোম্পানির ইনফরমেশন বিক্রি করে ট্রেডিং করে তবে এটি অবৈধ বলার সূযোগ থাকবে না।
এছাড়াও কোনো গোপন তথ্য ফাঁস করার পর অপরপক্ষ সেটা থেকে লাভবান না হলে কিংবা তথ্য গুলো কোম্পানির কোনো ক্ষতি না করতে পারলে ইনসাইডার ট্রেডিং এর বিষয়টিকে কনসিডার করা হয় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তথ্য ফাঁস কারী ইনসাইডার এর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ইতিমধ্যে জেনেছি, ইনসাইডার ট্রেডিং মূলত দুই ধরনের লিগ্যাল এবং ইলিগ্যাল। তবে এই দু ধরনের ট্রেডিং এর অন্তর্ভুক্ত আরও কিছু ইনসাইডার ট্রেডিং রয়েছে -
প্রতিষ্ঠানের সম্মতিক্রমে কিংবা প্রতিষ্ঠানের কোনো রকম ক্ষতি না করে যদি অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যাবহার করা হয়। সেগুলো লিগ্যল ট্রেডিং হিসেবে বিবেচনা করা হবে। লিগ্যাল ইনসাইডার ট্রেডিং দুই ধরনের হয়ে থাকে -
রুটিন ট্রেডিং (Routine Trading): প্রতিষ্ঠানের পাবলিক বা নন পাবলিক তথ্য ব্যবহার করে ওই প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ বা এমপ্লয়ি রা যখন নিজেরাই যখন নিজেদের প্রতিষ্ঠানের স্টক কিনে নেয় বা নিজেরাই বিক্রি করে তখন একে রুটিন ট্রেডিং বলা হয়।
প্লানড ট্রেডিং (Planned Trading): প্রি এরেঞ্জড বা প্রি প্লানড সিকিউরিটি সেলিং করে যদি কোম্পানি গুলো নিজে থেকেই তাদের স্টক প্রাইজের দাম বৃদ্ধি করে তাহলে সেটির দায়ভার সম্পূর্ণ ভাবে কোম্পানির কাছে থাকে। এবং একে আপাতদৃষ্টিতে লিগ্যাল হিসেবে দেখা হয়।
ক্লাসিকাল ইনসাইডার ট্রেডিং ( Classical Insider Trading): ক্লাসিকাল ইনসাইডার ট্রেডিং এ মূলত ম্যাটেরিয়াল ও নন পাবলিক ইনফরমেশন গুলো কে লিকেজ করা কে বুঝায়। কোম্পানির ক্ষতি সাধন ও স্টক প্রাইজ হঠাৎ কমিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য এটি করা হয়।
টিপার স্কিম ট্রেডিং (Tipper Scheme): টিপার স্কিম এ একজন ইনসাইডার (টিপার) থাকেন যিনি কোম্পানির বাইরের কারো কাছে বা ইনভেস্টদের কাছে গোপনে বিক্রি করে দেয়। যাতে তারা সময় সুযোগ বুঝে কম দামে স্টক কিনতে কিংবা উচ্চ মূল্যে বিক্রি করতে পারে।
মিসএপ্রোপ্রিয়েশন (Misappropriation): এখানে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কেউ সরাসরি ট্রেডিং এর সাথে জড়িত থাকে না৷ কিন্তু এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যারা কোম্পানির সাথে যুক্ত। যেমন লয়্যার বা সার্ভিস প্রোডিউসার এমন কেউ যারা কোনো ভাবে কোম্পানির কোনো তথ্য জানে এবং সেগুলো অবৈধ ভাবে কাজে লাগায়।
১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া অন্যতম স্বনামধন্য বায়ো ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি ছিল Imclone। প্রতিষ্ঠার কয়েকবছর থেকেই জনপ্রিয়তার কারণে তাদের স্টক প্রাইজ ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু ২০০০ এর শুরুর দিকে তাদের তৈরি ক্যান্সার বিরোধী ড্রাগ ও বেশ কিছু মেডিসিন FDA থেকে রিজেক্ট করা হয়।
এই গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে তাদের স্টক ভ্যালু কমে যাওয়ার সম্ভবনা থাকায় সিইও স্যামুয়েল তার পরিচিত ও বন্ধু বান্ধব দের না জানিয়ে স্টক কিনতে ইনফ্লুয়েন্স করে।
অন্যদিকে আরেক সিইও মার্থা স্টুয়ার্ট তার কাছে থাকা ৩৮৩৮ টি স্টক বিক্রি করে দেয় চড়া দামে। এবং এরপর রিজেকশনের ঘটনা পাবলিক করে দেয়। ফলস্বরূপ স্টক প্রাইজ কমে ৫০ ডলার থেকে ১০ ডলারে চলে আসে। মূলত দুই সিইও দুই ভাবে ইনসাইডার ট্রেডিং এর মাধ্যমে কোম্পানির মূল্যবান তথ্যের অপব্যবহার করেছে। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে মার্থা কে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং স্যামূয়েল কে ৪.৫ মিলিয়ন জরিমানা সহ ৭ বছরের জেলের শাস্তি দেয়া হয়।
২০০৬ সালে আরেকটি স্বনামধন্য ফিনানশিয়াল সার্ভিস কোম্পানি লাইভডোর এর নন পাবলিক ম্যাটেরিয়াল ইনফরমেশন গুলো ট্রেডিং এর মাধ্যমে ২৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটে।
ইয়োসিয়াকি মুরাকামী, কোম্পানির একজন অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা, জানতে পারেন যে লাইভডোর নিপ্পন ব্রডকাস্টিং এ ৫% স্টক পাওয়ার প্লানিং করছে। তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করার মাধ্যমে ২৫.৫ মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করে নেন। তিনি এই দামে প্রায় ২ মিলিয়ন শেয়াী বিক্রি করেছিলেন।
রাজ রাজারত্নাম, New York Hedge এর ফান্ড ম্যানেজার তথ্য ফাঁস এর মাধ্যমে ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আত্মসাৎ করেছিলেন। তিনি মূলত IBM, Intel Corp, and McKinsey & Co. ইত্যাদি কোম্পানির কাছে নিজের কোম্পানির মূল্যবান তথ্য পাচার করতো। এবং ওই কোম্পানি গুলো সেই অনুযায়ী বিভিন্ন আ্যকশন নিতো।
তবে ২০০৯ সালে তাকে ১৪ টি কন্সপাইরেসি এর অপরাধে আটক করা হয় এবং ৯২.৮ মিলিয়ন ডলার চার্জ করা হয়।
Insider Trading ফাইনান্সিয়াল সিকিউরিটি ফিল্ডের জন্য একটি হুমকির নাম। প্রতি বছর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড বিলিয়ন ডলারের অবৈধ ট্রেডিং হয় শুধুমাত্র কোম্পানি ইনসাইডারদের দ্বারা। কোম্পানিগুলোর মূল্যবান তথ্যের অনিশ্চয়তা শুধুমাত্র ওই প্রতিষ্ঠানেরই ক্ষতি করছে না। বরং ফাঁদে পরে বহু সাধারণ বিনিয়োগকারী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ১৯৯০ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত পরপর ঘটে যাওয়া ইনসাইডার ট্রেডিং এর ঘটনা গুলো প্রতিষ্ঠান গুলো সিকিউরিটি সিস্টেম কে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তবে এই পাইরেসির ও কিছু সমাধান রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হল সিকিউরিটি আইন। যেহেতু অধিকাংশ ইনসাইডার ট্রেডিং বিশ্বস্ত কিংবা পরিচিত মূখ গুলো দ্বারাই বেশি সংঘটিত হয়, তাই এগুলো খুঁজে বের করা জটিল। তবে সিকিউরিটি ল’ গুলো যদি আরো বেশি স্ট্রিক করা হয়, তাহলে ইনসাইডার ট্রেডিং কন্ট্রোল এ আনা সম্ভব।

কাস্টমার ডেটা মনিটাইজেশন মডেলে গ্রাহকদেরকে মূল সেবাটি বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। অতঃপর সুষ্ঠু পদ্ধতিতে গ্রাহকদের যাবতীয় তথ্যাবলি সংগ্রহ করে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রয় করা হয়। আর এই গ্রাহক তথ্য বিক্রয়ের মাধ্যমেই মূলত এই কাস্টমার ডেটা মনিটাইজেশন মডেল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মূল আয় করে থাকে।








