GeoRenus Editorial Team

বিগত কয়েক দশকে ই-কমার্স ল্যান্ডস্কেপ অসাধারণ একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। অনলাইন শপিংয়ের প্রথম দিকে যখন ক্রেতাদের কাছে তেমন অপশন ছিল না, এবং পণ্যের গুণমান সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। মূল পন্য কয়েক ধাপ পার হয়ে কাস্টমারের হাতে পৌঁছাতো। সেখান থেকে, আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে সিঙ্গেল-ব্র্যান্ডেড ই-কমার্স গুলো মার্কেটে জায়গা করে নিয়েছে। এই নতুন বিজনেস মডেল টি ব্রান্ড-কাস্টমার সম্পর্ককে নতুন ভাবে সজ্ঞায়িত করেছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গুলো পাইকারি রিটেইলার বা মিডলম্যান এর সাহায্য ছাড়াই কাস্টমারের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারছে। এতে করে ব্রান্ড ও কাস্টমার উভয়কেই সমানভাবে লাভবান করছে। সৌভাগ্যক্রমে, বর্তমানে প্রায় ৫৮ শতাংশ নতুন উদ্দোক্তা রা সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্সে আগ্রহী হচ্ছে।
সিঙ্গেল ব্র্যান্ডেড ই-কমার্স, ডাইরেক্ট-টু-কনজিউমার (DTC) ই-কমার্স নামেও পরিচিত। এটি এমন একটি ব্যবসায়িক মডেল যেখানে একটি কোম্পানি একচেটিয়াভাবে তাদের ডেডিকেটেড অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজেদের প্রডাক্ট বিক্রি করে। এই সেটআপে, প্রোডাক্টের ডিজাইন এবং উৎপাদন থেকে শুরু করে মার্কেটিং, বিক্রয় এবং কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স পর্যন্ত সব কিছুতেই ব্র্যান্ডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। এই মডেলটিতে ট্রেডিশনাল খুচরা বিক্রেতাদের মতো মিডলম্যানের সাহায্য ছাড়াই , ব্র্যান্ডগুলিকে তাদের কাস্টমার বেসের সাথে সরাসরি সংযোগ করার সূযোগ করে দেয়।
একটি সিঙ্গেল-ব্র্যান্ডেড ই-কমার্স ওয়েবসাইটের বাস্তব উদাহরণ হল অ্যাপলের অফিসিয়াল অনলাইন স্টোর। Apple তার নিজস্ব ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এককভাবে তাদের প্রোডাক্ট গুলো বিক্রি করে, যেমন iPhones, MacBooks, iPads এবং এমন আরো প্রোডাক্ট। আর গ্রাহকরাও সরাসরি আইফোনের প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে অ্যাপল প্রোডাক্ট গুলো কিনতে পারেন।
অ্যাপলের ওয়েবসাইট ভিজিট করলেই কাস্টমার রা অ্যাপল এর সব প্রোডাক্ট গুলো ব্রাউজ করতে পারেন। এই স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে অ্যাপল তাদের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে তাদের ব্র্যান্ডিং, ইউজার এক্সপেরিয়েন্স এবং কাস্টমার ইন্টারএ্যাকশনের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে।
একটি single-branded e-commerce বিজনেস শুরু করার জন্য কিছু মেজর স্টেপস রয়েছে। যেগুলো পর্যায়ক্রমে অনুসরণ করার মাধ্যমে সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্স প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব -
প্রথমেই আপনার সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্স স্টোর এর জন্য একটি স্পেসিফিক নিশ বা প্রোডাক্ট ক্যাটেগরি সিলেক্ট করুন। এরপর মার্কেট ডিমান্ড, কম্পিটিশন এবং টার্গেট অডিয়েন্স রিসার্চ করুন। যাতে করে আপনার বিজনেসের উদ্দেশ্য এবং টার্গেট ঠিক থাকে।
একটা ডিটেইলড বিজনেস প্লান তৈরী করুন যেখানে আপনার বিজনেস গোল, বাজেট, রেভিনিউ প্রোজেকশন এবং মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি গুলোর একটি আউটলাইন থাকবে। এতে করে আপনি অর্গানাইজড ভাবে বিজনেস গ্রো করতে পারবেন।
আপনার বিজনেস এর জন্য একটি লিগ্যাল স্ট্র্যাকচার বাছাই করুন, অর্থাৎ আপনার বিজনেসের গঠন কেনন হবে তা সিলেক্ট করুন। (যেমন, sole proprietorship, LLC, কর্পোরেশন) এবং আপনার লোকাল আইন অনুসারে একে রেজিস্ট্রার করুন।
একটি স্ট্রং ব্রান্ড আইডেন্টিটি তৈরি করুন যেখানে থাকবে একটি ইউনিক নান, লোগো এবং ডিজাইন এলিমেন্ট যেগুলো আপনার টার্গেট অডিয়েন্স কে রিপ্রেজেন্ট করে। এবং যেগুলো আপনার বিজনেসের উদ্দেশ্যর সাথে প্রাসঙ্গিক ও ব্রান্ড কে রিপ্রেজেন্ট করে।
সাপ্লায়ার বা প্রস্তুতকারকদের সাথে একটি কানেকশন গড়ে তুলুন যেগুলো আপনার ব্রান্ড প্রডাক্ট তৈরি করতে বা প্রোডাক্টের র' ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। এক্ষেত্রে পণ্যের কোয়ালিটি, প্রাইসিং এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নজর দিতে হবে। কারণ এই ম্যাটেরিয়াল গুলোর ওপরেই আপনার পন্যের ওভারঅল কোয়ালিটি নির্ভর করবে।
এবার একটি ই-কমার্স প্লাটফর্ম সিলেক্ট করুন যেমন, Shopify, দারাজ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি, যেখানে আপনি আপনার ই-কমার্স স্টোর গড়ে তুলবেন৷ এরপর একে আপনার ব্রান্ডের সাথে মিল রেখে কাস্টমাইজ করুন। যাতে এর আউটলুক, এড, ডেসক্রিপশন দেখে আপনার বিজনেস, উদ্দেশ্য ও টার্গেট অডিয়েন্স নিয়ে ক্লিয়ার ধারনা পাওয়া যায়।
এ পর্যায়ে প্রয়োজন পড়বে একটি ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট এর৷ এজন্য একটি ইউজার ফ্রেন্ডলি, মোবাইল- রেসপন্সিভ ওয়েবসাইট তৈরী করুন যেখানে হাই কোয়ালিটি প্রডাক্ট ইমেজ এবং ডেসক্রিপশন থাকবে। পাশাপাশি একটি ইজি নেভিগেশন এবং সিকিউর পেমেন্ট সিস্টেম এর ব্যবস্থা রাখুন।
আপনার প্রোডাক্ট গুলোকে রিপ্রেজেন্ট করার জন্য এনগেজিং এবং ইনফরমেটিভ কনটেন্ট তৈরী করুন। যেমন, প্রোডাক্ট লিস্টিং, ব্লগ পোস্ট, এবং প্রাসঙ্গিক ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করুন। তবে কনটেন্ট এর মান ও বিষয়বস্তু উভয়ই টপ নচ হতপ হবে। নতুবা ব্রান্ড ভ্যালুতে নেগেটিভ ইফেক্ট পড়বে।
এবার একটি সিকিউট এবং ইউজার ফ্রেন্ডলি পেমেন্ট গেটওয়ে তৈরী করুন যেখানে সহজেই কাস্টমার থেকে পেমেন্ট কালেক্ট করতে পারবেন। পাশাপাশি নিশ্চিত করুন যে গেটওয়ে টি payment card industry (PCI) এর স্ট্যানডার্ড ফলো করে তৈরী করা হয়েছে।
একটি কার্যকরী শিপিং এবং ডেলিভারি মেথড তৈরী করুন। আপনার স্কেলের সাথে তাল মিলিয়ে, ড্রপ শিপিং, ইন হাইজ ফুলফিলমেন্ট এর মত অপশন রাখার ট্রাই করুন। কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স এর অনেকাংশ নির্ভর করে শিপিং, ডেলিভারি টাইম, বিহেভিয়ার ইত্যাদির ওপরে। তাই এই বিষয় গুলোতে সচেতন থাকুন।
তবে মনে রাখবেন, সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্সে সাফল্যের জন্য সময় এবং চেষ্টা প্রয়োজন। তাছাড়া ক্রমাগত পরিবর্তন হওয়া মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আপ টু ডেট থাকার চেষ্টা করুন। আরো দ্রুত বিজনেস গ্রো করতে চাইলে প্রতিনিয়ত মার্কেটিং এবং ইউজার এক্সপেরিয়েন্স এর দিকে মনোযোগ দিন।
একজন ব্রান্ড মালিক কিংবা কাস্টমার হিসেবে সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্স কেন বেছে নিবেন? সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্স সিলেক্ট করার পেছনে অসংখ্য কারণ রয়েছে। তবে এর মধ্যে মূখ্য বিষয় হল, এই মার্কেটিং মডেল এক সাথে ব্রান্ড এবং কাস্টমার, দুই পক্ষ কেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত করে-
সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্সের ব্রান্ড সুবিধা গুলোর মধ্যে একদম প্রাইমারি এডভান্টেজ হচ্ছে, এটা ব্রান্ড মালিকদের কে তাদের ওভারঅল বিজনেস, ইমেজ, মেসেজিং কাস্টমস ইন্টারঅ্যাকশন সব কিছুর ওপর কন্ট্রোল রাখার সুযোগ করে দেয়। ফলে ব্রান্ড গুলো ও একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং ইউনিক ইউজার এক্সপেরিয়েন্স তৈরী করতে সক্ষম হয়।
কাস্টমারের সাথে ডিরেক্ট ইন্টারেকশন মানে বেশি বেশি ভ্যালুয়েবল ডাটা এবং ইনসাইটের একসেস পাওয়া। তাছাড়া এই মডেলে ব্রান্ড তাদের কাস্টমার দের কাছ থেকে সরাসরি ফিডব্যাক, প্রেফারেন্স, শপিং হ্যাবিট, ডিমান্ড সম্পর্কে জানতে পারে। ফলে তাদের মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি গুলো আরো ইফেক্টিভ ভাবে এপ্লাই করতে পারে।
রিটেলার এবং ডিস্ট্রিবিউটর এর মত মিডলম্যান না থাকার কারণে আরো বেশি প্রোফিট কালেক্ট করা সম্ভব হয়। তাছাড়া ডিরেক্টলি কাস্টমারের কাছে সেল করার কারণে ব্রান্ড গুলো আরো বেশি রেভিনিউ সংগ্রহ করতে পারে।
সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্সে কাস্টমার সুবিধা:
সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্স এর ক্ষেত্রে গ্রাহকরা একটি কনসিস্ট্যান্ট এবং ফ্যামিলিয়ার শপিং পরিবেশ পান। ব্র্যান্ডের প্রতি তাদরে বিশ্বাস এবং রিকগনিশন আরো শক্তিশালী হয়।
এই বিজনেস মডেল এ ব্র্যান্ডগুলি তাদের পণ্যের গুণমানের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। তারা নিশ্চিত করে গ্রাহকরা যেন নির্ভরযোগ্য এবং খাঁটি পণ্য পান। এ-কারণে মিডলম্যান কর্তৃক পন্যের গুনমান নষ্ট হওয়া, ওভার প্রাইজ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
এই মডেল এ ব্র্যান্ডগুলো যেহেতু সরাসরি ভাবে পার্সোনালাইজেশ ও কাস্টমার প্রেফারেন্স এ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সেহেতু কাস্টমারদের ডিমান্ড, চাহিদা, পছন্দ এগুলো প্রাধান্য দিয়ে পণ্য তৈরি করা হয়৷ ফলস্বরূপ কাস্টমার রা আরো বেশি বেনিফিটেড হয়৷ তাদের পছন্দ এবং চাহিদা অনুযায়ী পণ্য অর্ডার করতে পারে।
যদিও সিঙ্গেল-ব্র্যান্ডেড ই-কমার্স অনেক ধরনের সুবিধা দেয়, তবে এর আছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও। কারণ এই বিজনেস মডেল টিতে ব্র্যান্ড গুলোকে শক্তিশালী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, লজিস্টিক এবং কাস্টমার সাপোর্ট এ আলাদা করে বিনিয়োগ করতে হয়। তাদের ওয়েবসাইটে মার্কেটিং এবং ট্রাফিক চালনার দায়িত্বও নিজেদের বহন করতে হয় ফলে ব্রান্ড পরিচালনায় স্ট্রেস তৈরি হয়।
তাছাড়া, অনলাইন স্পেসে প্রতিযোগিতা তীব্র, তাই সিঙ্গেল ব্র্যান্ড গুলোকে সফল হওয়ার জন্য ও নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরী করার জন্য অনেক বেশি এফোর্ট দিতে হয়।
সিঙ্গেল-ব্র্যান্ডেড ই-কমার্স ভোক্তাদের আরও পার্সোনালাইজড এবং বিশ্বস্ত শপিং অভিজ্ঞতা দেয়ার সাথে সাথে ব্র্যান্ডগুলোকে তাদের পণ্য এবং ইউজার এক্সপেরিয়েন্স ডেভেলপ করার সুবিধা দিচ্ছে। ফলে, মার্কেটিং ইন্ডাস্ট্রি নতুন করে অপটিমাইজড হচ্ছে। তাছাড়া বিজনেস ইন্ডাস্ট্রি মডেল এক্সপার্ট দের মতে আগামী দুই বছরে প্রায় ৬৯% নতুন উদ্দোক্তা সিঙ্গেল ব্রান্ডেড ই-কমার্স এর দিকে ঝুঁকে পড়বে। প্রযুক্তির ক্রমাগত অগ্রগতি অব্যাহত থাকায়, আমরা আশা করছি Single Branded E-commerce বিজনেস মডেল আরও বেশি উদ্ভাবনের মুখ দেখবে।

লিন ক্যানভাস মডেল মূলত একটি এক পৃষ্ঠার নয়টি ব্লকের মাধ্যমে তৈরি করা সমস্যা-সমাধান ভিত্তিক মডেল যা একটি আইডিয়াকে ব্যবসায়ে রুপান্তরিত করতে কিংবা স্টার্টআপ এর প্রসারে সহায়তা করে। এই মডেলটি মূলত স্টার্টআপ লেভেলের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যুগান্তকারী মডেল হিসেবে কাজ করে যেকারণে অনেক বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও তাদের শুরুর দিকে এই মডেলটি ব্যবহার করে নানাভাবে উপকৃত হয়েছে।








