GeoRenus Editorial Team

সাধারণ অর্থে কোন নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে কোন পণ্য বা সেবার দাম টাকার অঙ্কে বেড়ে গেলে তাকে মূল্যস্ফীতি বলে। অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতি বলতে বুঝায়, অর্থের চাহিদার তুলনায় যদি যোগান বেড়ে যায় বা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি ঋণের প্রসার ঘটায় কিংবা শ্রমিক সংঘ যদি উচ্চ মজুরি দাবি করে, এই পরিস্থিতিতে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে মূল্যস্ফীতি বলে।
সময়ের সাথে সাথে পণ্য দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধিই মূল্যস্ফীতি (Inflation)। সাধারনত টাকার মান কমে যাওয়া, উৎপাদন না বাড়িয়ে অধিক টাকা ছাপান, যোগানের তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাওয়া বা পণ্য বা সেবার উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণ মূল্যস্ফীতি (Inflation) ঘটিয়ে থাকে।
মূল্যস্ফীতি সবসময় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব তৈরি করে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা ত্রাস করে, ব্যবসা বাণিজ্যে ধীরগতি নিয়ে আসে, জাতীয় আয়ে প্রভাব সৃষ্টি করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। মূল্যস্ফীতি একটা চক্রের মত কাজ করে একে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একটি দেশকে খাঁদের কিনারায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
অর্থনীতিবিদ পিগু এর মতে, "অর্থনীতিতে উৎপাদনশীল কার্যক্রমের চাইতে যদি আয় দ্রুত বাড়ে তবে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাকে মূল্যস্ফীতি বলে।"
অর্থনীতিবিদ কুলবর্ন এর মতে, মূল্যস্ফীতি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে অধিক অর্থ স্বল্প পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রীর পিছনে ধাবিত হয়।"
অর্থনীতিবিদ কেইন্যস্ এর মতে, মূল্যস্ফীতি এমন একটি অবস্থা যেখানে দ্রব্যসামগ্রীর সামগ্রিক যোগানের তুলনায় কার্যকর চাহিদা বেশি হয়।"
সোবাহান সাহেব ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বাজারে গিয়ে ৩০০ টাকা দিয়ে ৬ কেজি চাল কিনলেন। মে মাসে ৩০০ টাকা দিয়ে একই চাল কিনতে গেলে দোকানদার তাকে ৫ কেজি চাল দেয়, কারণ কেজি প্রতি ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা হচ্ছে মূল্যস্ফীতির ক্লিয়ার উদাহরণ।
ঘটনা টিতে জানুয়ারিতে চালের মূল্য ছিল ৫০ যা মে মাসে ১০ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ টাকা। জানুয়ারির তুলনায় মে মাসে চালের মূল্য ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। তাহলে ঘটনা টিতে মূল্যস্ফীতির হার ২০%। যা তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি।
বেশ কিছু কারণে মূল্যস্ফীতি হার প্রতিনিয়ত বাড়তে লক্ষ্য করা যায়।
তার মানে বাজারে যদি বেশি পরিমাণ অর্থ থাকে, অর্থাৎ জনগণের পকেটে যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ থাকে তাহলে জনগণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য ক্রয় করবে, সেবা গ্রহণ করবে। ফলে বাজারে পণ্য ও সেবার ঘাটতি দেখা দিবে যার ফলে ঐ পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি পাবে। ফলশ্রুতিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।
সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বা মেগা প্রজেক্টের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে, তা পরিচালনা সংক্রান্ত খরচও অনেক বৃদ্ধি পায়। এসব খরচের মাধ্যমে জনগণের হাতে অনেক টাকা চলে আসে। কারণ এসব প্রকল্প গুলোতে কাজকরা অধিকাংশ কর্মকর্তা, শ্রমিক বাংলাদেশী।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো জনগণের নিকট বেশি ঋণ প্রদান করলে, জনগণের নিকট মাত্রাতিরিক্ত টাকা চলে আসে। ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়।
মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উৎপাদন হ্রাস অনেক বড় প্রভাব রাখে। পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না হয়ে বরং উৎপাদন হ্রাস পেলে তা বাজারে এক ধরনের সংকটের সৃষ্টি করে। পণ্যের চাহিদা বেশি এবং উৎপাদন কম থাকায় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যস্ফীতির হারও বৃদ্ধি পায়।
খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে অনেক বড় প্রভাব রাখে কিন্তু আমরা খালি চোখে তা দেখতে পারি না। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঋণ পরিশোধ না করলে তাকে খেলাপি ঋণ বলে। মনে করুন, কেউ বাংলাদেশে অবস্থানরত মোট ১০০০ টাকা থেকে ১০০ টাকা ঋণ নিয়েছে। যতক্ষন পর্যন্ত এই ১০০ টাকা দেশের অর্থনীতির মধ্যে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত দেশের মোট টাকা ১০০০ ই থাকবে। কিন্তু ঋণগ্রহীতা যদি ১০০ টাকা ডলারে রুপান্তর করে বিদেশে খরচ করে আসে। তাহলে ঐ টাকা আর দেশে নেই দেশে এখন আছে ৯০০ টাকা। আবার ১০০০ টাকা মিল করার জন্য সরকার নতুন করে ১০০ টাকা প্রিন্ট করে। যার ফলে সম্পদের তুলনায় মুদ্রার মান কমে যায়, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পায়, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবরণী অনুযায়, "২০২১ সালে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লক্ষ ১৬৮ কোটি টাকা।"
প্রতিনিয়ত আমাদের দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে না আমাদের সীমিত জমির আয়তন। যে কারণে সীমিত জমিতে অধিক মানুষের জন্য শস্য-পণ্য উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না, বাসস্থান এর সংকট দেখা দিচ্ছে। যার কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের এবং বাসস্থানের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল না থাকলে কোন দেশের অবস্থায় সুষ্ঠু থাকে না। যার কারণে উৎপাদন হ্রাস পায়, দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়, সকল অর্থনৈতিক অবস্থা স্থবির হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির উচ্চ হার দেখা যায়।
তাছাড়া মুজুরির অত্যাধিক বৃদ্ধি, অবৈধ মজুদ ও চোরাচালান বৃদ্ধি, উপকরণের যোগান হ্রাস, প্রত্যাশা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদিও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি করে থাকে।
সামগ্রিক যোগানের তুলনায় সামগ্রিক চাহিদা বেশি হলে মূল্যস্তরের যে বৃদ্ধি ঘটে তাকে চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি বলে। অর্থাৎ যখন পণ্যের চাহিদা অনেক থাকে কিন্তু সেই অনুযায় বাজারে পণ্যের সরবরাহ থাকে না, সেই পরিস্থিতিকেই চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রিস্ফীতি বলে।
উৎপাদনের উপকরণসমূহের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে দামস্তরের যে বৃদ্ধি ঘটে তাকে ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি বলে। পণ্য উৎপাদনের উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেলেই ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রিস্ফীতি দেখা দেয়।
এটি ঘটে যখন মূল্যবৃদ্ধির কারণে শ্রমিকরা তাদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি করে, এবং এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে। এতে পণ্যের দাম আরও বাড়ে এবং এর ফলে একটি চক্র তৈরি হয় যেখানে মজুরি ও দাম পালাক্রমে বাড়তে থাকে।
এটি ঘটে যখন একটি দেশের আমদানি খরচ বেড়ে যায়, যেমন তেলের মূল্য বৃদ্ধি হলে পরিবহন ও অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে যায়। আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়লে দেশে অভ্যন্তরীণ মূল্যও বাড়তে থাকে।
যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থের সরবরাহ বাড়ায় বা সুদের হার কমিয়ে দেয়, তখন মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। বাজারে অতিরিক্ত অর্থ থাকলে মানুষ বেশি ব্যয় করতে পারে, যার ফলে চাহিদা বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি ঘটে।
মূল্যস্ফীতি পরিমাপের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি চালু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি দুটি হচ্ছে:
১. Wholesale Price Index বা WPI.
২. Consumer Price Index বা CPI.
এর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন জিনিসপত্রের পাইকারী দামের পরিবর্তন হিসাব করা হয়। এই পদ্ধতিতে জিনিসপত্র গুলিকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়- মুখ্য বস্তু, জ্বালানী এবং বিদ্যুৎ ও শিল্পজাত দ্রব্য।
এর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন জিনিসপত্রের বাজারদরের পরিবর্তন হিসাব করা হয়। এই পদ্ধতিতে জিনিসপত্র গুলোকে মূলত ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়- খাদ্য ও পানীয় সামগ্রী, নেশাজাত দ্রব্য, পরিধানের দ্রব্য, আবাস, বিদ্যুত্, এবং অন্যান্য।
মূল্যস্ফীতি হার = ((বর্তমান বছরের CPI - আগের বছরের CPI) / আগের বছরের CPI) * ১০০
মূল্যস্ফীতি হার = ((৩১৫ - ৩০০) / ৩০০) * ১০০
মূল্যস্ফীতি হার = ৫%
১. মৃদু মূল্যস্ফীতি অর্থনৈতিক গ্রোথ সচল রাখে।
২. মৃদু মূল্যস্ফীতি মজুরি এবং দ্রব্য-মূল্যের সামঞ্জস্যতা বজায় রাখে।
৩. মৃদু মূল্যস্ফীতি পণ্যের উর্ধ্বগতি হ্রাস করে।
৪. পরিমিতি মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশন অর্থনীতির জন্য ভালো, তা না হলে ডিফ্লেশন দেখা দিবে যা মন্দা বা অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি করে থাকে।
১. মাত্রাতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্ভাবনা হ্রাস করে।
২. অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গ্রোথ হ্রাস করে।
৩. অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি ফলে প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী সহ সকল কিছুর মূল্য বৃদ্ধি পায়, ফলে জনগণ উদ্বেগজনক হারে অর্থ খরচ করা কমিয়ে দেয় এবং সঞ্চয় করা শুরু করে যা অর্থনীতির জন্য ভালো নয়।
৪. পণ্যের দাম অত্যাধিক হারে বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
মূল্যস্ফীতি সাধারণত অনেক জিনিসের উপরেই প্রভাব বিস্তার করে থাকে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়া মানে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া আর পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীরা খুশি হয়। কারণ তারা উৎপাদন বৃদ্ধি করে বেশি দামে বিক্রি করে লাভ করতে পারবে। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রচুর কর্মীর প্রয়োজন হয় যার ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে মৃদু মূল্যস্ফীতি (২-৪%) দেশের জন্য ভালো কারণ, যখন কোনো দেশে মৃদু মূল্যস্ফীতি থাকে, তখন সেই দেশের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। ধরুণ, চামড়ার দাম যদি প্রতি বছর গড়ে ৩০/৪০ পয়সা করে বাড়তে থাকে তবে, বিনিয়োগকারীরা চামড়ার কারখানা বাড়ানো শুরু করবে, এবং কারখানা বাড়ালে, মানুষ চাকরি পাবে, বেকারত্ব কমে যাবে, এতে করে বৈদেশিক বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে, নতুন উদ্যোক্তাদের আগমন ঘটে।
কিন্তু কোনো দেশে যদি মৃদু মূল্যস্ফীতি না থাকে তবে সে দেশে বিনিয়োগ কমে যাবে, এবং অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়বে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের বাংলাদেশে হাইপার বা উচ্চ মূল্যস্ফীতি হবার কারণে আমরা মৃদু মূল্যস্ফীতি এর সুবিধা গ্রহণ করতে পারি না। সরকারের মতে আমাদের দেশের মূল্যস্ফীতির হার ৬-৭% হলেও আসলে তা আরো বেশি।
যার কারণে আমাদের দেশের বেকারত্ব বাড়ছে, হতদরিদ্র মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে খুবই কম।
যদিও সরকার ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে, কর বৃদ্ধি করে, অহেতুক টাকা প্রিন্ট বন্ধ রেখে, সরকারি ব্যয় কমিয়ে, উৎপাদন বৃদ্ধি করে, বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ করার চেষ্টা করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
মৃদু মূল্যস্ফীতি যেমন অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সাহায্য করে সেরকম হাইপার ইনফ্লেশন অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে পারে। তাই আমাদের মূল্যস্ফীতি হার বুঝেই বিনিয়োগ, খরচ এবং সঞ্চয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গুলো গ্রহণ করা উচিত।

সাবস্ক্রিপশন মডেল এ গ্রাহকরা মূলত কোনও সেবা বা পণ্য ব্যবহারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের ভিত্তিতে সাবস্ক্রিপশন ফি প্রদান করে থাকে। মাসিক বা বাৎসরিক ভিত্তিতেই বেশিরভাগ সাবস্ক্রিপশন মডেল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান গুলো চার্জ বা সাবস্ক্রিপশন ফি নিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানভেদে এই সময়ের ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। এটি সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কৌশলের উপর নির্ভর করে।








