GeoRenus Editorial Team

স্টক ও বন্ডের ভ্যালুয়েশন বলতে মূলত স্টক বা বন্ডের প্রকৃত মূল্য বের করাকে বোঝানো হয়। অনেকসময় মার্কেটে অতিরিক্ত চাহিদা বা অন্য কোনো ফ্যাক্টরের কারণে স্টক বা বন্ড অতিরিক্ত প্রাইসে বিক্রয় হয়ে থাকে। তবে অতিরিক্ত প্রাইসে ক্রয় করলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এমন স্টক বা বন্ড খুজে বের করতে হয় যেগুলোর মার্কেট ভ্যালু তার প্রকৃত ভ্যালুর চেয়ে কম বা আন্ডারপ্রাইসড। আর এই কাজেই বিনিয়োগকারীদের সাহায্য করে ভ্যালুয়েশনের বিভিন্ন মেথড।
আর্থিক জ্ঞানের জগতে আপনাকে স্বাগতম। আর্থিক জ্ঞান ছাড়া যেকোনো ধরণের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত কঠিন ও ঝুকিঁপূর্ণ। আর বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে আপনাকে প্রথমেই জানতে হবে স্টক ও বন্ডের ভ্যালুয়েশন সম্পর্কে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার পর আপনি বেশ সহজেই বুঝতে পারবেন যে আপনার নির্দিষ্ট কোনো স্টক বা বন্ডে বিনিয়োগ করা উচিত হবে কি না। সেই উদ্দেশ্যেই এই ব্লগে আপনাকে জানানোর চেষ্টা করবো ভ্যালুয়েশনের ফান্ডামেন্টাল কিছু প্রিন্সিপাল, অ্যাডভান্সড টেকনিক সম্পর্কে এবং তার পাশাপাশি কিছু প্র্যাক্টিকাল ইনসাইট প্রদান করার’ও চেষ্টা থাকবে।
বিনিয়োগের জগতে আপনি যদি নতুন হয়ে থাকেন, তবুও আশা করি এই ব্লগে দেয়া তথ্যের সাহায্যে আপনি খুব সহজেই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন এবং ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট নেভিগেট করতে পারবেন।
যারা স্টক ও বন্ড মার্কেটে ভালো পারফর্ম করতে চান তাদের প্রত্যেককে অবশ্যই স্টক ও বন্ড ভ্যালুয়েশনের মাস্টার হতে হবে। ভ্যালুয়েশন হচ্ছে মূলত কোনো স্টক বা বন্ডের ইন্ট্রিন্সিক ভ্যালু বা অন্তর্নিহিত মূল্য বের করার উপায়। এই ভ্যালু এই কারণে বের করতে হয়, কারণ স্টকের অন্তর্নিহিত মূল্য তার মার্কেট প্রাইসের থেকে কম/বেশি হতে পারে। ভ্যালুয়েশন করার মাধ্যমে ইনভেস্টররা বুঝতে পারেন যে কোনো স্টক বা বন্ড কি ওভারপ্রাইসড নাকি আন্ডারপ্রাইসড।
স্টক ভ্যালুয়েশন বিনিয়োগের বেশ ফান্ডামেন্টাল একটি কাজ এবং যেকোনো কোম্পানীর স্টকের নেট প্রাইস বোঝার জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা যায়। এই সেকশনে আমরা স্টক ভ্যালুয়েশনের কিছু উপায় সম্পর্কে জানবো।
স্টক ভ্যালুয়েশনের মূলত দুইটি পদ্ধতি রয়েছে -
এই ক্ষেত্রে আমরা মূলত কোম্পানীর আর্থিক বিবরণীগুলো থেকে যেই ডেটা বা ইনসাইট পাওয়া যায়, সেগুলো থেকে স্টকের প্রকৃতমূল্য বের করার চেষ্টা করি।
এই ক্ষেত্রে আমরা একাধিক কোম্পানীর বিভিন্ন ইনসাইট একত্র করে তুলনামূলক আলোচনা করে থাকি। অর্থাৎ, যদি শুধু একটি কোম্পানীর বিভিন্ন রেশিও নিয়ে আপনি কাজ করেন, তাহলে সেটি হবে অ্যাবসল্যুট ভ্যালুয়েশন, আর একাধিক কোম্পানীর অ্যাবসল্যুট ভ্যালুয়েশন যখন আপনি একত্র করে তাদের মাঝে তুলনা করবেন, তখন সেটি হবে রিলেটিভ ভ্যালুয়েশন।
বোধহয় প্রাইস টু আর্নিংস রেশিও স্টক ভ্যালুয়েশন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় মেথড। এই মেথডে কোম্পানীর স্টকের প্রাইসের সাথে সেই স্টক থেকে আসা রিটার্নের তুলনা করা হয়। এই কাজে বেশ সিম্পল একটি ফরমুলা ব্যবহার করা হয় -
P/ERatio = Stock Price / Earnings per Share
এই রেশিও যদি বেশি হয় তাহলে বুঝে নিতে হবে যে বিনিয়োগকারীদের এই স্টকের উপর ভরসা আছে এবং তারা মনে করে যে এই স্টক ভবিষ্যতে ভালো গ্রোথ অর্জন করবে। অন্যদিকে এই রেশিও যদি কম হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে যে এই স্টকে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ ভরসা নেই।
তবে কিভাবে বুঝবেন যে পি/ই রেশিও বেশি নাকি কম? বিষয়টি বেশ সহজ, একই ইন্ডাস্ট্রির বা সমগোত্রীয় কিছু কোম্পানীর স্টকের পি/ই রেশিও একসাথে করে তুলনা করতে হবে। এদের মাঝে যেগুলোর পি/ই রেশিও তুলনামূলক বেশি হবে, সেগুলোতেই আপনার বিনিয়োগ করা উচিত।
পি/বি রেশিওর মাধ্যমে কোম্পানীর স্টকের প্রাইসের সাথে তার বুক ভ্যালুর তুলনা করা হয়। বুক ভ্যালু পাওয়া যায় যখন কোম্পানীর নেট সম্পদের পরিমাণকে কোম্পানীর শেয়ারের পরিমাণ দ্বারা ভাগ করা হয়। পি/বি রেশিওর ফরমুলা হচ্ছে -
P/BRatio = Stock Price / Book Value per Share
পি/বি রেশিও যদি ১’র কম হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে যে স্টকটি আন্ডারভ্যাল্যুড, অর্থাৎ দাম যতো হওয়া উচিত, তার থেকে কম আছে। আর পি/বি রেশিও যদি ১’র বেশি হয় তাহলে বুঝে নিতে হবে যে স্টকটি ওভারভ্যাল্যুড।
পি/ই রেশিওর মতো এখানেও আপনাকে সমগোত্রীয় কোম্পানীর মাঝে তুলনা করতে হবে। আর ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ডের বিষয়টিও অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। দেখা যায় অনেক ইন্ডাস্ট্রির স্ট্যান্ডার্ড হচ্ছে হাই পি/বি রেশিও। তাই বলে যে বিনিয়োগ করা যাবে না, তা কিন্তু নয়। বরং সমগোত্রীয় কোম্পানীগুলোর মাঝে যাদের পি/বি রেশিও সবচেয়ে কম, সেগুলোতে আপনি বিনিয়োগ করতে পারেন।
আর পি/বি রেশিও সাধারণত এমন সব কোম্পানীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উত্তম, যাদের অনেক বেশি পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি থাকে, যেমন - ব্যাংক বা ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানী।
এই মডেল সাধারণত সেসব কোম্পানীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যারা স্টকের বিপরীতে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ দিয়ে থাকে। এই মডেল এমন একটি ধারণার উপর তৈরি, যেখানে মনে করা হয় যে কোনো শেয়ার থেকে ভবিষ্যতে যেই লভ্যাংশগুলো পাওয়া যাবে তাদের যোগফলই হচ্ছে শেয়ারের মূল অন্তর্নিহিত মূল্য।
Intrinsic Value = DPS / ( R - G)
যেখানে -
DPS = শেয়ার প্রতি সবচেয়ে রিসেন্ট লভ্যাংশের পরিমাণ
R = ডিস্কাউন্ট রেট
G = ডিভিডেন্ডের গ্রোথ রেট
যারা স্টক থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ আশা করেন, তাদের জন্য এই মডেল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই নিয়মে শেয়ার থেকে আসা লভ্যাংশের উপর নির্ভর করে শেয়ারের বাস্তব মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ কথা -
যেকোনো স্টকের ভ্যালুয়েশন জানতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে একের অধিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। কারণ এখানে ইউনিভার্সাল কোনো নিয়ম নেই।
আর স্টকের ভ্যালুয়েশন নির্ধারণ করার সময় অবশ্যই ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ডের বিষয়টি মাথায় রাখুন। জানা না থাকলে হালকা রিসার্চ করেই যেকোনো ইন্ডাস্ট্রির স্ট্যান্ডার্ড রেশিওগুলো জেনে নিতে পারবেন।
বন্ড হচ্ছে একটি ঋণের মাধ্যম, যার ব্যবহার করে বন্ড ইস্যুকারী ঋণ গ্রহণ করে এবং বিনিয়োগকারী বন্ডে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে কুপন পেমেন্ট হিসেবে বিভিন্ন হারে সুদ পেয়ে থাকে। বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে বন্ডের পুরো ফেইস ভ্যালু বিনিয়োগকারীকে ফেরত দিয়ে দেয়া হয়। বন্ডের ভ্যালুয়েশন বোঝার আগে কিছু বিষয় জেনে নেয়া দরকার -
নির্দিষ্ট সময় পর পর বন্ডহোল্ডারদের যেই হারে সুদ দেয়া হয় তাকে কুপন রেট বলে। বন্ডের মেয়াদ শেষ হওয়া অবদি বন্ডহোল্ডার এই হারে সুদ পেয়ে থাকেন।
একটি বন্ডের মেয়াদকে তার ম্যাচুরিটি ডেট বলা হয়। সাধারণত সকল ধরণের বন্ডের একটি ম্যাচুরিটি ডেট থাকে। বন্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বন্ড ইস্যুকারী বন্ডহোল্ডারকে সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দিয়ে দেন।
বন্ডের উপর যেই মূল্য উল্লেখ করা থাকে, তা বন্ডের ফেইস ভ্যালু বা বুক ভ্যালু বলা হয়। বন্ডের মার্কেট প্রাইস আর বন্ডের ফেইস ভ্যালু এক না’ও হতে পারে। তবে বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে এই ফেইস ভ্যালুতেই বন্ডের টাকা ফেরত দেয়া হয়। বন্ড যদি মার্কেটে ফেইস ভ্যালুতে বিক্রয় হয়, তাহলে তাকে ইংরেজিতে at Par বলা হয়, ফেইস ভ্যালুর উপরে বিক্রয় হলে Above Par বলা হয় এবং ফেইস ভ্যালুর নিচে বিক্রয় হলে Below Par বলা হয়।
কুপন বন্ডের ভ্যালুয়েশনের জন্য সেই বন্ড থেকে ভবিষ্যতে আসা পেমেন্টগুলোর বর্তমান মূল্য বের করতে হয়, এরপর বন্ডের ফেইস ভ্যালুর বর্তমান মূল্য বের করে তার সাথে যোগ করতে হয়। প্রথমে আমরা ফরমুলা দুটি দেখি, এরপর বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।
কুপনের বর্তমান মূল্য = ∑ { C / ( 1 + r )t }
বন্ডের ফেইস ভ্যালুর বর্তমান মূল্য = { F / ( 1 + r )T }
যেখানে,
C = বন্ড থেকে ভবিষ্যতে আসা কুপন পেমেন্ট
r = ডিস্কাউন্ট রেট
F = বন্ডের ফেইস ভ্যালু
t = বছর
T = বন্ডের মেয়াদ
উদাহরণস্বরুপ, একটি করপোরেট বন্ডের ভ্যালুয়েশন বের করা যাক। এই বন্ডের সুদের হার হচ্ছে ২.৫% এবং বন্ডের মেয়াদ মেয়াদ হচ্ছে ৪ বছর। ডিস্কাউন্ট রেট হচ্ছে ১.৫% এবং বন্ডের ফেইস ভ্যালু হচ্ছে ১০০০ টাকা।
এখানে,
C = ১০০০*২.৫% = ২৫ টাকা
r = ১.৫%
F = ১০০০ টাকা
t = ৪
T = ৪
কুপনের বর্তমান মূল্য = ২৫ / (১.০১৫)১ + ২৫ / (১.০১৫)২ + ২৫ / (১.০১৫)৩ + ২৫ / (১.০১৫)৪ = ৯৬.৩৬
বন্ডের ফেইস ভ্যালুর বর্তমান মূল্য = ১০০০ / (১.০১৫)৪ = ৯৪২.১৮
সুতরাং, বন্ডের ভ্যালু হচ্ছে = ১০৩৮.৫৪ টাকা।
কুপন বন্ডের মতো জিরো-কুপন বন্ড থেকে বার্ষিক সুদ পাওয়া যায় না। তাই এই বন্ডের ভ্যালুয়েশনের ধরণ একটু ভিন্ন। সাধারণত, জিরো-কুপন বন্ড তার ফেইস ভ্যালু থেকে অনেক কম দামে বিক্রয় করা হয়। বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে বন্ডহোল্ডারকে বন্ডের ফেইস ভ্যালু দিয়ে দেয়া হয়। তাই বন্ডের ফেইস ভ্যালু থেকে বন্ডের ক্রয়মূল্য বাদ দিলে যা থাকে সেটাই বন্ডহোল্ডারের লাভ। আর জিরো-কুপন বন্ডের ভ্যালুয়েশন বের করার জন্য বন্ডের ফেইস ভ্যালুর বর্তমান মূল্য বের করাই যথেষ্ট।
উদাহরণস্বরুপ, একটি জিরো-কুপন বন্ডের ফেইস ভ্যালু হচ্ছে ১০০০ টাকা, ডিস্কাউন্ট রেইট হচ্ছে ৩% এবং বন্ডের মেয়াদ হচ্ছে ২ বছর। তাহলে এই বন্ডের ভ্যালুয়েশন হবে -
জিরো-কুপন বন্ডের ভ্যালু = ১০০০ / (১.০৩)২ = ৯৪২.৫৯ টাকা।
সবসময় মার্কেটে অ্যাভেইলএবল ইনফরমেশন দেখে বিনিয়োগ না করে বরং মাঝে মাঝে নিজেই যাচাই-বাছাই করে নেয়া উচিত যে স্টক বা বন্ডের প্রাইস কি ওভারপ্রাইসড নাকি আন্ডারপ্রাইসড। আর এটি করার জন্য আপনাকে অবশ্যই স্টক ও বন্ডের ভ্যালুয়েশনের উপায়গুলো সম্পর্কে জানতে হবে। আশা করি স্টক ও বন্ডের ভ্যালুয়েশন সম্পর্কে আজ আপনাদের ভালো একটি ধারণা দিতে পেরেছি। এখন থেকে নিজেই খুব সহজে স্টক বা বন্ডের প্রকৃত মূল্য বের করে ফেলতে পারবেন।

মূলত ব্যবসা শুরু করার আগে যেকোনো উদ্যোক্তাকে একটা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান নিয়ে আগাতে হয়, তার ব্যবসার সকল কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে কিভাবে পরিচালনা করবেন! সনাতনী পদ্ধতি অনুসরণ করে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখার চেয়ে বিজনেস মডেল ক্যানভাস অনুসরণ করা অধিকতর সহজ এবং কার্যকর। কারণ এই মডেল ব্যবহার করে আপনি নয়টি ব্লক তৈরি করে একটা পৃষ্ঠায় সবকিছু আলোকপাত করতে পারবেন যা আপনার নিজের এবং ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যাক্তির বুঝতে অনেকটা সহজ হবে।








