ভূমিকা
ইন্সটাগ্রাম এখন আর শুধু ছবি শেয়ারের একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি আয়ের জন্য একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এক বিলিয়নেরও বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারীর এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং ব্যবসার জন্য অসাধারণ সুযোগ তৈরি করছে। আপনি যদি একজন ইনফ্লুয়েন্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, বা ছোট ব্যবসার মালিক হোন, তবে ইন্সটাগ্রাম আপনাকে নির্দিষ্ট টার্গেট অডিয়েন্সের সাথে যুক্ত হতে এবং একটি বিশ্বস্ত কমিউনিটি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। স্পনসর্ড পোস্ট, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, অথবা পণ্য ও সেবা বিক্রয়ের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ এখানে অসীম। সঠিক কৌশল ও নিয়মিত পরিশ্রমের মাধ্যমে ইন্সটাগ্রাম যে কারো জন্য একটি লাভজনক আয়ের উৎস হতে পারে। তাই আজকের লেখায় আমরা ইন্সটাগ্রাম থেকে আয় করা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা করবো।
ইন্সটাগ্রাম থেকে আয় করার জনপ্রিয় কিছু উপায়
ব্র্যান্ড পার্টনারশিপ
কোনো ব্র্যান্ডের সাথে স্পনসর্ড কনটেন্ট তৈরি করা ইন্সটাগ্রামে আয়ের অন্যতম জনপ্রিয় উপায়। প্রথমে এমন ব্র্যান্ড নির্বাচন করুন যেগুলো আপনার নিশ এবং কন্টেন্টের সাথে মানানসই। ইমেইল বা ইন্সটাগ্রাম ডিএমের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করুন। নিজের পরিচয় দিন এবং কীভাবে আপনার কনটেন্ট তাদের ব্র্যান্ডের জন্য লাভজনক হতে পারে তা ব্যাখ্যা করুন। এছাড়াও বিভিন্ন ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং প্ল্যাটফর্মে যোগ দিয়ে পার্টনারশিপের সুযোগ খুঁজে পেতে পারেন।
স্পনসর্ড পোস্ট সাধারণত কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য বা সেবার প্রচারের জন্য ছবি, ভিডিও বা রিল হিসেবে তৈরি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার জিম ইক্যুইপমেন্টের প্রমোশন করতে পারেন, আর একজন ফুড ভ্লগার কোনো নির্দিষ্ট রেস্টুরেন্ট বা পণ্যের কথা বলতে পারেন। #ad বা #sponsored - এর মতো হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন, এতে করে আপনার ফলোয়াররা জানতে পারবে যে কোনটি স্পনসর্ড পোস্ট।
তবে বাজে ব্র্যান্ড বা বাজে কোয়ালিটির পণ্য প্রমোট করা থেকে বিরত থাকুন।
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ট্রাই করুন
একসময় মানুষ ব্লগে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে প্রচুর আয় করেছেন। এখন সেই অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ব্লগ থেকে সরে চলে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং একটি সহজ এবং কার্যকর উপায় ইন্সটাগ্রাম থেকে আয় করার জন্য। এই ক্ষেত্রে আপনি কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য বা সেবা প্রমোট করার জন্য বিশেষ লিংক বা কোড পাবেন, যা আপনি আপনার ফলোয়াদের সাথে শেয়ার করবেন। যখন কেউ সেই লিংক ব্যবহার করে কেনাকাটা করে, আপনি নির্দিষ্ট হারে কমিশন পাবেন।
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং শুরু করতে, প্রথমে এমন কোম্পানি বা প্ল্যাটফর্ম খুঁজুন যারা আপনার নিশের সাথে সম্পর্কিত এবং অ্যাফিলিয়েট প্রোগ্রাম অফার করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ফ্যাশন ব্লগার পোশাক বা এক্সেসরিজের অ্যাফিলিয়েট লিংক শেয়ার করতে পারেন। অন্যদিকে, একটি টেকনোলজি রিলেটেড পেইজ গ্যাজেট বা অ্যাপ্লিকেশনের অ্যাফিলিয়েট লিংক প্রমোট করতে পারে।
তবে শুধু লিংক শেয়ার করলেই হবে না। এমন পণ্য বা সেবা প্রমোট করতে হবে যেগুলো আপনার ফলোয়ারদের লাইফে আসলেই ভেল্যু অ্যাড করবে। এতে করে আপনি ফলোয়ারদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন। একইসাথে শুধু লিংক শেয়ার করে দিলেই হবে না, এমন পোস্ট করতে হবে যেগুলো দ্বারা আপনার ফলোয়াররা লিংকে ক্লিক করতে ও পণ্য বা সেবা ক্রয় করতে আগ্রহী হবে।
নিজস্ব পণ্য বা সেবা অফার করুন
আপনি যদি কোনো ছোট ব্যবসার মালিক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার পণ্য বা সেবা প্রমোট করার জন্য একটি ভালো প্লাটফর্ম হতে পারে ইন্সটাগ্রাম। কিছুদিন আগেও এই কাজের জন্য সবাই ফেইসবুক ব্যবহার করতো। তবে বর্তমান জেনারেশনের বেশিরভাগই যেহেতু ইন্সটাগ্রাম ব্যবহার করে, তাই সবাই প্রোডাক্ট সেল করার জন্য এখন এই প্লাটফর্মের দিকে ঝুকছে। আপনার পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের জন্য ইন্সটাগ্রামও কিছু ভালো ভালো কিছু ফিচার অফার করছে।
আপনি চাইলেই এখানে একটি অনলাইন শপ ওপেন করে আপনার পণ্য বা সেবা সম্পর্কে পোস্ট করতে পারবেন। ডিএমের মাধ্যমে আপনি পণ্য বিক্রয়’ও করতে পারবেন। এই উদ্দেশ্যে আপনার পেইজ তৈরি করে সেই পেইজ ভালোভাবে অপ্টিমাইজ করতে হবে। আপনার পণ্য সম্পর্কিত হাই-কোয়ালিটি পোস্ট করতে হবে। মূলত এমন সব পোস্টের দিকে ফোকাস করতে হবে যেগুলো আপনার পণ্য সম্পর্কে ফলোয়ারদের মনে আগ্রহ তৈরি করবে।
পোস্টে পণ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরতে ভুলবেন না। মনে রাখবেন, আপনার পণ্য যদি ফলোয়াররা সহজে ক্রয় করতে পারে এবং পণ্য ভালো মানের হয়, তাহলে ইন্সটাগ্রামে আপনার বিক্রয় চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পাবে।
ড্রপশিপিং ও বিভিন্ন সেবা অফার করা
আপনি যদি ইন্সটাগ্রামে একটি সফল ব্যবসা শুরু করতে চান, তবে ড্রপশিপিং একটি চমৎকার উপায় হতে পারে। ড্রপশিপিং পদ্ধতিতে আপনার নিজস্ব কোনো পণ্য স্টোর করার প্রয়োজন হয় না; আপনি একটি ওয়েবসাইট বা প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন পণ্য লিস্ট করে রাখবেন এবং যখন কেউ অর্ডার করবে, তখন সেই পণ্য অন্য কোনো ই-কমার্স ওয়েবসাইট থেকে সরবরাহ করে দিবেন। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় ড্রপশিপিং করে অনেকেই ভালো করছেন। ন্যুনতম বিনিয়োগ ও কম মেইনটেনেন্স প্রয়োজন হওয়ায় এই উপায় এখন বেশ জনপ্রিয়।
এছাড়া, আপনি যদি ইন্সটাগ্রামে এক্সপার্ট হন, তবে নতুনদের সাহায্য করেও আয় করতে পারেন। যারা ইন্সটাগ্রামে নতুন বা জনপ্রিয় হতে চায়, তাদেরকে কোর্স বা কনসাল্টিং সেবা দিয়ে আপনি আয় করতে পারবেন। অনেকেই জানে না কীভাবে স্পনসরশিপ রিকুয়েস্ট, অ্যাড প্লেসমেন্ট বা ফলোয়ার বৃদ্ধি করতে হয়। তাই আপনি এসব বিষয়ে তাদের সহায়তা করে অর্থ উপার্জন করতে পারেন।
ইন্সটাগ্রাম থেকে আয় করার আরো কিছু উপায়
এছাড়াও আরো কিছু উপায়ে আয়ের উৎস হিসেবে ইন্সটাগ্রামকে ব্যবহার করা যায়, যেমন - পণ্যের ছবি বিক্রয় করে, ক্যাপশন বিক্রয় করে, মেটা অ্যাড সার্ভিস প্রদান করে, কারো সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে ইত্যাদি। উন্নত দেশগুলোতে ইন্সটাগ্রাম থেকে আয় করার মতো আরো কিছু ফিচার অ্যাভেইলএবল রয়েছে, যেমন - ব্যাজ, সাবস্ক্রিপশন বা ইন্সটাগ্রাম শপিং, অ্যাড রেভিনিউ ইত্যাদি। এগুলো বাংলাদেশে এখনো অ্যাভেইলএবল নয়। তাই আপনি যদি একটি ভালো প্রোফাইল তৈরি করে রাখেন, তাহলে ভবিষ্যতে এসব ফিচার বাংলাদেশে অ্যাভেইলএবল হয়ে গেলে আপনি এগুলো ব্যবহার করেও আয় করতে পারবেন।
পরিসংহার
একটু ভালোভাবে চেষ্টা করলে ইন্সটাগ্রাম থেকে আয় করার অসীম সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই কাজের জন্য আপনার প্রয়োজন প্রচুর ডেডিকেশন ও ধৈর্য্য। তবে নতুনদের জন্য বলবো, অ্যাকাউন্ট ওপেন করার সাথে সাথেই আয় করার জন্য লেগে পরবেন না যেন। প্রথমে অ্যাকাউন্টকে সুন্দরভাবে তৈরি করুন এবং আয় করার আগে একটি ভালো ফলোয়ার বেইজ তৈরি করার চেষ্টা করুন। এতে করে সময় বেশি লাগলেও আপনার এই ইনকাম সোর্স বেশ টেকসই হবে এবং এক সময় গিয়ে এই ইনকাম চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করবে।









