ভূমিকা
বাংলাদেশে থেকে অনলাইনে আয় করার উপায় হিসেবে বর্তমানে ইউটিউব অন্যতম জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম। যেহেতু প্রতি ঘরে ঘরেই এখন ইউটিউবের ব্যবহারকারী রয়েছে, তাই বাংলাদেশে প্রতি মূহুর্তে লাখ লাখ মানুষ ইউটিউবে সময় কাটাচ্ছে। এতে করে ইউটিউব সৃজনশীল মানুষদের কাছে নিজের প্যাশনকে টাকায় কনভার্ট করার একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে এখনো সঠিক উপায়গুলো জানা নেই বলে নিজের ‘ইউটিউবার’ হওয়ার যাত্রাটি এখনো অনেকে শুরু করতে পারছেন না। তাই আজকের লেখায় আমরা ইউটিউব থেকে আয় করার জনপ্রিয় সব উপায়গুলো তুলে ধরছি।
ইউটিউব থেকে আয় করার জনপ্রিয় সব উপায়
১। ইউটিউব অ্যাডস থেকে আয়
ইউটিউব ভিডিও’র শুরুতে/মাঝে/শেষে অ্যাড দেখালে সেই অ্যাড থেকে আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ ইউটিউব উক্ত চ্যানেলের মালিকের সাথে শেয়ার করে। এটিকে ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রাম হিসেবে অভিহিত করা হয়। বেশিরভাগ ইউটিউবার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এই অ্যাড থেকেই প্রাথমিকভাবে আয় করে থাকেন। দুটি শর্ত পূরণ করলে ইউটিউব আপনার চ্যানেলে অ্যাড দেখাবে।
১। ন্যুনতম ১০০০ সাবস্ক্রাইবার থাকতে হবে।
২। বিগত ১২ মাসে আপনার চ্যানেলের ভিডিওগুলোতে ন্যুনতম ৪০০০ ঘন্টা ভিউ থাকতে হবে।
আপনার চ্যানেল যখন এই দুটো শর্ত পূরণ করবে, তখন আপনাকে একটি গুগল অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্ট সেটআপ করতে হবে, এতে করে আপনি পেমেন্ট রিসিভ করতে পারবেন। তবে শুধু শর্ত পূরণ করলেই হবে না, এরপর থেকে আপনাকে ইউটিউবের মনিটাইজেশন পলিসিগুলো মেনে চলতে হবে। একই সাথে, কোনো কপিরাইটযুক্ত কন্টেন্ট আপনার ভিডিও’তে ব্যবহার করা যাবে না এবং অ্যাড-ফ্রেন্ডলি কন্টেন্ট আপলোড করতে হবে।
মনিটাইজেশন পাওয়ার পর থেকে আপনি অ্যাড ভিউ ও ক্লিকের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ইউটিউব থেকে পাবেন।
২। সুপার চ্যাট ও সুপার স্টিকার থেকে আয়
সুপার চ্যাট ও সুপার স্টিকার ইউটিউবের বেশ জনপ্রিয় মনিটাইজেশন ফিচার, যা ইউটিউবারদের লাইভ স্ট্রিম চালানোর সময় অতিরিক্ত অর্থ আয় করার সুযোগ দেয়। মূলত, লাইভ স্ট্রিম চলার সময় চ্যাটে প্রচুর পরিমাণ ম্যাসেজ আসে। আর এতো এতো ম্যাসেজের মাঝে যদি ভিউয়ার নিজের ম্যাসেজকে স্পেশালভাবে স্ট্রিমারের কাছে পৌছে দিতে চান, তাহলে তিনি কিছু অর্থ ব্যয় করেন। সুপার চ্যাটের মাধ্যমে দেয়া ম্যাসেজ হাইলাইট করা থাকে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চ্যাটের সবার উপরে পিন করা থাকে। এতে করে ভিউয়াররা খুব সহজেই স্ট্রিমারদের সাহায্য করতে পারেন।
একই উপায়ে সুপার স্টিকার ফিচারটি কাজ করে, যেখানে ভিউয়াররা বিভিন্ন মজাদার ও কালারফুল স্টিকার সেন্ড করতে পারেন। এই ফিচারগুলো মূলত সেই ইউটিউবারদের জন্য বেশি উপযুক্ত, যারা বিভিন্ন বিষয়ে এনগেজিং লাইভ স্ট্রিমের আয়োজন করেন, যেমন - প্রশ্নোত্তর পর্ব, গেমিং ইভেন্ট বা বিশেষ কোনো ঘোষণা ইত্যাদি।
এই ফিচার দুটো উপভোগ করতে চাইলে ইউটিউবারকে অবশ্যই ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে এবং ইউটিউবের গাইডলাইন মেনে চলতে হবে।
৩। ইউটিউব চ্যানেল মেম্বারশিপ থেকে আয়
ইউটিউবের চ্যানেল মেম্বারশিপ ফিচারটি ব্যবহার করে ইউটিউবার তার সবচেয়ে ডেডিকেটেড ফ্যানদের এক্সক্লুসিভ কন্টেন্ট অফার করার মাধ্যমে প্রতি মাসে স্টেবল ইনকাম সোর্স পেতে পারেন। মূলত সাবস্ক্রাইবাররা উক্ত চ্যানেলের মেম্বার হয়ে একটি মাসিক ফি প্রদার করে, যার বিপরীতে তারা পায় কাস্টম ব্যাজ, ইমোজি, মেম্বার-অনলি লাইভ স্ট্রিম এবং বিহাইন্ড-দ্য-সিন কন্টেন্টের মতো সুবিধা। এতে করে ভিউয়াররা ইউটিউবারের প্রতি আরো বেশি কানেক্টেড ফিল করে।
এই ফিচার উপভোগ করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে, যার মাঝে অন্যতম হচ্ছে ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রামের আওতাভুক্ত হওয়া এবং আপনার একটি লয়াল ফ্যান বেইস থাকতে হবে। তবে এই ধরণের মেম্বারদের মেইনটেইন করতে চাইলে আপনাকে প্রতিনিয়ত হাই-কোয়ালিটি কন্টেন্ট তৈরি করতে হবে এবং মেম্বারদের সাথে নিয়মিত এনগেজ করতে হবে।
যেসব ইউটিউবারদের একটি নিশ অডিয়েন্স বেইস রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত কমিউনিটির সাথে এনগেজ হতে হয়, তাদের জন্য এই ফিচার সর্বোত্তম।
৪। স্পন্সরশিপ ও ব্র্যান্ড ডিল থেকে আয়
ইউটিউবে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হওয়ার সবচেয়ে লুক্রেটিভ কারণ হচ্ছে স্পন্সরশিপ ও ব্র্যান্ড ডিল। এইক্ষেত্রে, ইউটিউবাররা কোনো কোম্পানি বা ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট প্রমোট করার উদ্দেশ্যে তাদের সাথে কোলাবরেট করেন এবং নির্দিষ্ট হারে ফি চার্জ করেন। আর ব্র্যান্ডগুলোও সর্বদা এমন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের সন্ধানে থাকে যারা সহজেই তাদের প্রোডাক্ট বা সার্ভিস টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে পৌছে দিতে পারবে।
স্পন্সরশিপ পেতে চাইলে আপনাকে কোনো নির্দিষ্ট নিশ বা ইন্ডাস্ট্রি টার্গেট করে কন্টেন্ট তৈরি করতে হবে। উদাহরণস্বরুপ, একজন টেক রিভিউয়ার বিভিন্ন গ্যাজেট ব্র্যান্ডের সাথে কোলাবরেট করতে পারে, আবার একজন বিউটি ভ্লগার বিভিন্ন কসমেটিক ব্র্যান্ডের সাথে কোলাবরেট করতে পারে। তবে অবশ্যই আপনার ভিউয়ারদের সাথে আপনার একটি সখ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে হবে, কারণ ব্র্যান্ডগুলো এমন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর চান যাদের রেকমেন্ডেশন ভিউয়াররা গুরুত্ব দিবেন।
স্পন্সরড কন্টেন্ট প্রমোট করার সময় অবশ্যই ভিডিওতে উল্লেখ করে দিবেন যে এটি একটি স্পন্সরড কন্টেন্ট। এতে করে আপনার ভিউয়ারদের সাথে আপনার স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।
৫। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং হতে আয়
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ইউটিউবারদের জন্য আয়ের একটি চমৎকার উপায় যেখানে তারা ভিডিও ডিসক্রিপশনে অ্যাফিলিয়েট লিংক শেয়ার করে কমিশন-ভিত্তিক আয় করতে পারেন। যখন ভিউয়াররা এই লিংকে ক্লিক করে কোনো প্রোডাক্ট ক্রয় করেন, তখন ইউটিউবার সেই বিক্রয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে পান। এই পদ্ধতি অত্যন্ত বহুমুখী এবং বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের জন্য উপযুক্ত।
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ে সফল হতে হলে আপনার কন্টেন্ট এবং ভিউয়ারদের আগ্রহের সাথে মিল রেখে প্রোডাক্ট রেকমেন্ড করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ফিটনেস চ্যানেল জিম ইকুইপমেন্ট বা সাপ্লিমেন্ট প্রমোট করতে পারে, আর একটি ট্রাভেল ভ্লগিং চ্যানেল হোটেল বুকিং প্ল্যাটফর্ম বা ভ্রমণ সরঞ্জাম রিকমেন্ড করতে পারে। তবে এই উপায়ে আয় করতে চাইলে ভিউয়ারদের আস্থা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই সবসময় এমন প্রোডাক্ট রেকমেন্ড করুন যা আপনি নিজেও ব্যবহার বা পছন্দ করেন।
বাংলাদেশে অ্যামাজন অ্যাসোসিয়েটস-এর মতো অনেক অ্যাফিলিয়েট প্রোগ্রাম পাওয়া যায়। এই লিংকগুলো স্ট্র্যাটেজিকালি আপনার কন্টেন্টে যোগ করে আপনি বিজ্ঞাপন বা স্পন্সরশিপের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করেই একটি স্টেবল আয়ের উৎস তৈরি করতে পারেন।
৬। প্রোডাক্ট বা মার্চেন্ডাইজ বিক্রয় হতে আয়
নিজস্ব প্রোডাক্ট বা মার্চেন্ডাইজ বিক্রয় করা ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে আয় করার আরো একটি কার্যকর উপায়। এখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডেড আইটেম, যেমন - টি-শার্ট, মগ, হ্যাট, বা ডিজিটাল প্রোডাক্ট, যেমন - ই-বুক, অনলাইন কোর্স, বা কাস্টম প্রিসেট অন্তর্ভুক্ত বিক্রয় করা যেতে পারে। মার্চেন্ডাইজ বিক্রয়ের মাধ্যমে আপনি শুধু আয়ই করতে পারবেন না, বরং নিজের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডও গড়ে তুলতে পারবেন।
আপনি যদি প্রোডাক্ট তৈরি, স্টোর করা, লজিস্টিকস ও ডেলিভারি হ্যান্ডেল করতে না পারেন, তাহলে ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য এসব সার্ভিস প্রদান করে এমন অনেক কোম্পানি বাংলাদেশে রয়েছে। আপনার প্রতি প্রোডাক্ট বিক্রয় থেকে তারা নির্দিষ্ট অংশ কেটে রাখে।
বিক্রয় বাড়ানোর জন্য আপনার ভিডিওগুলোতে মার্চেন্ডাইজ প্রমোট করুন এবং ডিসক্রিপশনে ক্রয়ের লিংক যোগ করুন। ইউনিক ডিজাইন তুলে ধরা বা লিমিটেড এডিশন অফার করার মাধ্যমেও চাহিদা বাড়ানো যায়।
৭। অনলাইন কোর্স বা টিউটোরিয়াল হতে আয়
আপনার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অনলাইন কোর্স বা টিউটোরিয়াল তৈরি করা ইউটিউবে আয়ের একটি জনপ্রিয় উপায়। যদি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা থাকে, তবে সেটি পেইড কোর্স আকারে উপস্থাপন করে ভিউয়ারদের শেখানোর সুযোগ নিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি ফটোগ্রাফি, কোডিং, গ্রাফিক ডিজাইন, বা রান্নার মতো বিষয়গুলোর ওপর কোর্স তৈরি করতে পারেন।
এই ধরনের কোর্স বিক্রি করার জন্য Udemy, Skillshare, বা Teachable প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া, প্রাইভেট ইউটিউব প্লেলিস্ট তৈরি করেও দর্শকদের সাবস্ক্রিপশন ভিত্তিতে অ্যাক্সেস দিতে পারেন। আপনার কোর্সের কনটেন্ট যতো মানসম্মত এবং ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী হবে, ততো বেশি সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
কোর্সগুলো ভিডিওর মাধ্যমে প্রমোট করুন এবং ডিসক্রিপশনে ক্রয়ের লিংক দিন। এর ফলে আপনি শুধু অর্থ উপার্জন করতে পারবেন না, বরং আপনার ব্র্যান্ডের প্রতি দর্শকদের আস্থা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।
৮। ইউটিউব প্রিমিয়াম হতে আয়
ইউটিউব প্রিমিয়াম রেভিনিউ হলো এমন একটি প্যাসিভ ইনকামের মাধ্যম, যেখানে ইউটিউব প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীরা আপনার কন্টেন্ট দেখার মাধ্যমে আপনাকে আয়ের সুযোগ করে দেয়। প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীরা বিজ্ঞাপন ছাড়া ভিডিও দেখতে পারেন এবং তাদের সাবস্ক্রিপশন ফি থেকে একটি অংশ কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের প্রদান করা হয়।
এই আয়ের জন্য আপনাকে আলাদা কোনো কাজ করতে হয় না। যখন প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীরা আপনার কন্টেন্ট দেখবেন, তখন ইউটিউব সেই সময়ের জন্য অটোমেটিকালি আপনাকে পেমেন্ট দিবে। এটি বিশেষত তাদের জন্য উপকারী, যারা লম্বা ফরম্যাটের আকর্ষণীয় কন্টেন্ট তৈরি করেন এবং প্রিমিয়াম দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন।
প্রিমিয়াম রেভিনিউ অ্যাড রেভিনিউয়ের পাশাপাশি একটি বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করে। এটি আপনার ক্রিয়েটিভ কাজকে আরো এগিয়ে নিতে সহায়তা করে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
পরিসংহার
ইউটিউব থেকে আয়ের সুযোগ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। চ্যানেল মনিটাইজেশনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি, যেমন - অ্যাড রেভিনিউ, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, বা মার্চেন্ডাইজ বিক্রয়ের মতো সুযোগ রয়েছে। তবে সাফল্যের জন্য আপনাকে অবশ্যই কন্টেন্টের মান বজায় রাখতে হবে, দর্শকদের আস্থা অর্জন করতে হবে এবং সময়ের সাথে নিজেকে আপডেট রাখতে হবে। একমাত্র আপনার সদিচ্ছার মাধ্যমেই ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ইউটিউবকে আয়ের একটি স্টেবল সোর্স হিসেবে পরিণত করা সম্ভব।









