GeoRenus Editorial Team

অর্থকে অনেকেই অনেক জটিল বিষয় মনে করেন। তবে অর্থ নিজে কোনো জটিল বিষয় নয়, বরং আমরা অর্থকে জটিল বিষয় হিসেবে দেখি বলেই জটিল মনে হয়। অর্থের প্রতি কারো মনোভাব কেমন হবে, তা সাধারণত তার বায়াস ও মাইন্ডসেট দ্বারা নির্ধারিত হয়। আবার পরিবার ও সংস্কৃতির মতো বিভিন্ন সামাজিক ফ্যাক্টর এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। তবে নিজেদের জীবনে আরো কার্যকর আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইলে আমরা নির্দিষ্ট কিছু কাজ করতে পারি, যেমন - আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণ, বাজেট তৈরি, বিশেষজ্ঞের মতামত নেয়া এবং মাইন্ডফুলনেস চর্চা করা।
আমাদের মানসিক অবস্থা ও ভালো থাকার পেছনে অর্থের বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। তাই অর্থকে যদি কেউ শুধু লেনদেন করার মাধ্যম হিসেবে মনে করে থাকে তাহলে তা ভুল হবে। মানুষ ও অর্থের মাঝে এই জটিল সম্পর্ক নিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা তাই অনেক দিন আগেই থেকেই গবেষণা করছেন। তাই আর্থিক সফলতা অর্জন করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই অর্থের মানসিক প্রভাবগুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। কারণ, দিন শেষে আমাদের যেকোনো সিদ্ধান্তে অর্থ বেশ বড় একটি ভূমিকা পালন করে। তাই আজকের লেখায় আমরা অর্থের সাইকোলজিকাল প্রভাবগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো।
অর্থ ও আর্থিক সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত মনোবিজ্ঞান
বায়াস বলতে আমরা সাধারণত নিজের প্রতি, অন্য কারো প্রতি বা কোনো বিষয়ের প্রতি পক্ষপাতমূলক বিহেভিয়ারকে বুঝে থাকি। বিভিন্ন ধরণের বায়াস আমাদের মাঝে বেশ কমন এবং তা আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল বিহেভিয়ারকে নানা উপায়ে প্রভাবিত করে থাকে। অনেক সময় এগুলো আমাদের চিন্তাকে বাধাগ্রস্থ করে আমাদের ভুল সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে দিতে পারে। তাই আমাদের প্রথমেই কিছু বায়াস সম্পর্কে জেনে নিতে হবে।
এইক্ষেত্রে আমরা এমন সব বিষয়, তথ্য বা মতামত খুজে বের করার চেষ্টা করি যা আমাদের পূর্বের বিশ্বাসকে সঠিক প্রমাণ করতে সাহায্য করে। সাধারণত এই বায়াসের শিকার মানুষেরা নিজেদের বিশ্বাস বা অভ্যাসের বাইরের ভিন্ন কোনো মতামতকে গ্রাহ্য করতে রাজি থাকেন না।
ক্ষতি হওয়ার ঝুকিঁ থেকে এই বায়াসের জন্ম হয়। তাই এই বায়াস মানুষকে এমন সব অপশন সিলেক্ট করতে বাধ্য করে যেগুলোতে ঝুকিঁর পরিমাণ বা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। এই বায়াসের কারণে আমরা অনেক সুযোগ হারিয়ে ফেলি অথবা অনেক রক্ষণাত্বক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।
এই বায়াসের শিকার মানুষেরা কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা বিষয়কে মূল ধরেই বসে থাকেন। এর ফলে তারা নতুন কোনো তথ্যকে ইভালুয়েট বা কনসিডার করতে রাজি হন না। যেমন - গাড়ি ক্রয় করার সময় অনেকেই শুধু গাড়ির মূল্যকে কনসিডার করেই ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। তবে গাড়ি ক্রয় করার পর যে আরো বিভিন্ন খরচ থাকে, যেমন - রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভারের বেতন, মেইন্টেনেন্স, ট্যাক্স ইত্যাদি বিষয় তারা কনসিডার করেন না।
মানি মাইন্ডসেট বলতে আমরা অর্থ সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস বা ধারণাকে বুঝিয়ে থাকি। বিভিন্ন ধরণের মাইন্ডসেট মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। তাই কে কিভাবে অর্থকে হ্যান্ডেল করে, তা তার মানি মাইন্ডসেট বিবেচনা করলেই বোঝা যায়।
এই মাইন্ডসেটের অধীকারি ব্যাক্তি মনে করেন যে অর্থ অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং তা অর্জন করার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়। এই কারণে তারা আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এমন সব অপশন সিলেক্ট করেন যেখানে ঝুকিঁ কম থাকে এবং তারা অর্থ খরচ করার চাইতে জমানোকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।
এই ধরণের মানসিকতার ব্যাক্তিবর্গ মনে করেন যে অর্থ জমিয়ে রাখতে হয় না বরং অর্থকে ব্যবহার করে সুযোগ কাজে লাগাতে হয় এবং গ্রোথ অর্জন করার চেষ্টা করতে হয়। তাই তাদের ফাইনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট বেশ পজেটিভ ও প্রোএক্টিভ হয়ে থাকে।
এই ধরণের মানসিকতার ব্যাক্তিরা অর্থকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। সাধারণত আর্থিক লেনদেনের প্রতি তাদের একধরনের ভয় কাজ করে।
আমাদের পরিবারে অর্থকে কিভাবে ম্যানেজ করা হয় তা আমাদের পরবর্তী জীবনে বেশ প্রভাব ফেলে। পরিবারে যদি অর্থকে নেগেটিভ উপায়ে হ্যান্ডেল করা হয় এবং এই সম্পর্কে নেগেটিভ কথাবার্তা বেশি হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা Scarcity Mindset নিয়ে বড় হবো এবং আমাদের নিজেদের জীবনে অর্থকে সেভাবেই হ্যান্ডেল করবো। আবার পরিবারের ব্যাক্তিবর্গের যদি আর্থিক জ্ঞানের অভাব থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আর্থিক জ্ঞান ছোটবেলা থেকেই কম থাকে। তবে বড় হওয়ার পর যেকোনো ব্যাক্তি চাইলেই এই বিষয়গুলো মেনে নিয়ে নিজের চিন্তা-ভাবনা পরিবর্তন করতে পারেন।
আমরা কোন সংস্কৃতিতে বড় হয়ে উঠছি তা’ও আমাদের অর্থের প্রতি মনোভাবকে বেশ প্রভাবিত করতে পারে। কারণ, সব সংস্কৃতিতে অর্থকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ট্রিট করা হয়। কোথাও অর্থকে জমিয়ে রাখার প্রতি বা ভবিষ্যতের জন্য রেখে খরচ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়, আবার কোথাও অর্থ জমানোকে করা হয় নিরুৎসাহিত। তাই আমাদের চারিপাশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার জন্য আমরা এই ধরণের পজেটিভ বা নেগেটিভ কাজগুলো করা শুরু করি। তবে যারা নিজের চারিপাশের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, অর্থ সম্পর্কে নিজে জেনে ও পড়াশোনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাদের ফাইনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট অন্যদের থেকে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
বিভিন্ন ধরণের ইমোশন যেমন - ভয়, লোভ, দুঃচিন্তা ও অপরাধবোধ আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল মনোভাবে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ভয়ের কারণে আমরা বিভিন্ন সুযোগ হাত ছাড়া করতে পারি, লোভের কারণে চিন্তা না করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারি, দুঃচিন্তার ফলে আমরা অতিরিক্ত খরচ করে ফেলতে পারি আবার অপরাধবোধ আমাদেরকে এমন আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারে যা আমরা আসলে চাই না। তাই সুষ্ঠু আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইলে এই ইমোশনগুলোকে বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করার কোনো বিকল্প নেই।
ফরচুনেটলি, ইমোশনকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে মাইন্ডফুল থাকা ও পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। আপনাকে যেনো কোনো ধরণের বায়াস আকড়ে ধরতে না পারে তাই আপনাকে অবশ্যই আগে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে আপনি যা করতে পারেন -
আর্থিক সফলতা অর্জন করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্ট হচ্ছে লক্ষ্য নির্ধারণ করা। আপনি একবার লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলার পর নিজেই বুঝতে পারবেন যে এখন আপনার কি করা উচিত। উদাহরণস্বরুপ, আপনাকে আগেই বুঝতে হবে যে আপনি আর্থিকভাবে কি অর্জন করতে চাইছেন। যেমন - বাড়ির ডাউন-পেমেন্ট করা, ঋণ পরিশোধ করা, ইমার্জেন্সি ফান্ড গঠন করা, অবসরের ফান্ড গঠন করা ইত্যাদি।
একবার লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলার পর এখন আপনাকে সেই লক্ষ্যকে আরো কিছু ছোট ছোট লক্ষ্যে পরিণত করতে হবে। মনে করুন, আপনার ৬০,০০০ টাকা ঋণ আছে এবং আপনি এই বছরের মাঝেই এই ঋণ পরিশোধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন। তাহলে ৬০,০০০ টাকা একবারে পরিশোধ করার চেষ্টা না করে বরং প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা করে পরিশোধ করা শুরু করুন। তাহলে এই মুহুর্তে আপনার প্রধান লক্ষ্য হবে বছরে ৬০,০০০ টাকা পরিশোধ করা নয়, বরং এই মাসে ৫,০০০ টাকা পরিশোধ করা। এভাবেই প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা করে পরিশোধ করা শুরু করলে আপনাকে আর বছর শেষে ৬০,০০০ টাকা নিয়ে ভাবতে হবে না। অপরদিকে, আপনি যদি এখনই ৬০,০০০ টাকা নিয়ে চিন্তা করা শুরু করেন তাহলে দুঃচিন্তার শিকার হয়ে আপনি আগেই ভেঙে পরতে পারেন।
আপনার অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর করে তুলতে বাজেট তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই। বাজেট দেখলেই আপনি বুঝে যাবেন যে আপনার আয় ও ব্যয় কতো হচ্ছে। আয়-ব্যয় সম্পর্কে ক্লিয়ার ধারণা থাকলে আপনি এমনিতেই বুঝে যাবেন যে আপনার কোন খাতে অর্থ ব্যয় করা উচিত, আর কোন খাতে উচিত না।
আপনার আয়ের তুলনায় ব্যয় যদি কম হয়ে থাকে, তাহলে তো চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে আপনার প্রতি মাসে যেই পরিমাণ অর্থ সেইভ হচ্ছে, তা যদি আপনার আর্থিক লক্ষ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে আপনাকে অবশ্যই আয় বাড়ানো বা খরচ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। বাজেট তৈরি করা ও আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই, বছর শেষে নিজের আর্থিক লক্ষ্য অর্জন করা। তাই সেই হিসেবেই প্রতি মাসে নিজের বাজেট তৈরি করুন।
যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে যেকোনো প্রফেশনাল ব্যাক্তির পরামর্শ নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যখন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, তখন অনেক ধরণের বায়াসের শিকার হয়ে সেই সিদ্ধান্ত নেই। তবে প্রফেশনালরা কোনো ধরণের বায়াসকে গ্রাহ্য না করে, তা’ই আমাদের পরামর্শ দেন, যাতে করে আমাদের সবচেয়ে ভালো হয়। তাই নিজের জীবনের যেকোনো বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে প্রফেশনাল কারো সাথে এই বিষয়ে অবশ্যই পরামর্শ করে নিবেন। যেমন - বাড়ি করা, গাড়ি ক্রয়, বড় অংকের বিনিয়োগ ইত্যাদি।
এইসব সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণত আমাদেরকে অনেক লম্বা সময় ধরে বহন করতে হয়। তাই এইসব সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় কোনোভাবেই শুধু নিজের জাজমেন্টের উপর নির্ভর করা যাবে না। কারণ আমাদের নিজেদের বায়াসগুলো আমরা নিজেরা সাধারণত বুঝতে পারি না।
শেষ স্টেপ হিসেবে আপনি মননশীলতার (Mindfulness) চর্চা করতে পারেন। মাইন্ডফুলনেস আমাদের ইমোশনাল অ্যাওয়ারনেস বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। আপনি যখন আপনার চিন্তা-ভাবনা ও ফিলিংস পর্যবেক্ষণ করা শুরু করবেন, তখন বুঝতে পারবেন যে আপনার আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো ঠিক কিভাবে নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমরা এমন কিছু করা থেকে বেচে যেতে পারি যা আসলে আমাদের করা উচিত নয়।
অর্থ বেশ ইমোশনাল একটি টপিক। আবার আমাদের আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো অনেকাংশেই অর্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। তাই স্মার্ট আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আমাদের সাইকোলজিকে বোঝার কোনো বিকল্প নেই। আবার আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আমরা আমাদের ইমোশনকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে এমন সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিতে পারি যা আমাদের আর্থিক লক্ষ্যের সাথে বেশি অ্যালাইন করে। তাই অর্থকে অনেক জটিল কোনো বিষয় হিসেবে চিন্তা করে বরং নিজেদের জীবনকে আরো সুন্দর করে তোলার একটি টুল হিসেবে চিন্তা করা উচিত।

প্রতিটি উদ্যোক্তাই চায় তার পণ্য বা সেবা বাজারে আনার আগে সেটাকে একদম নিখুঁত করে তুলতে। কিন্তু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর সময় আর অর্থ ব্যয় করে একটা পণ্য পুরোপুরি তৈরি করার পর যদি দেখা যায় বাজারে তার কোনো চাহিদাই নেই — এটা একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। মূলত এই সমস্যার সমাধান দিতেই তৈরি হয়েছে মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট বা এমভিপি কৌশল। পুরো পণ্য একসাথে না বানিয়ে শুধু সবচেয়ে জরুরি ফিচারগুলো নিয়ে বাজারে আসুন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সত্যিকারের মতামত নিন এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে পণ্য উন্নত করুন। বাংলাদেশের পাঠাও, বিশ্বের উবার এবং ড্রপবক্স — এরা সবাই এই একই পথ ধরে এগিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।








