GeoRenus Editorial Team

আজকের দিনের ১০০ টাকা সবসময় আগামী দিনের ১০০ টাকার থেকে বেশি ভ্যালু বহন করে, এটাই হচ্ছে অর্থের সময়মূল্যের ধারণা। ব্যাংকে টাকা রাখা বা অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করা, ঋণ পরিশোধ করা, গাড়ি/বাড়ি ক্রয় করা সর্বক্ষেত্রেই অর্থের সময়মূল্যের ধারণা প্রযোজ্য। মূলত মুদ্রাস্ফীতি ও চক্রবৃদ্ধি সুদের কনসেপ্টের কারণে আধুনিক যুগে অর্থের সময়মূল্য এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমরা যদি অর্থকে কাজে না লাগিয়ে তা ফেলে রাখি, তাহলে মুদ্রাস্ফীতির কারণে তা ধীরে ধীরে ক্রয়ক্ষমতা হারায়।
আধুনিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় এখন আমরা সকলেই জানি যে, মুদ্রাস্ফীতি কি এবং কিভাবে এটি আমাদের অর্থের ক্রয়ক্ষমতাকে কমিয়ে আনে। তাই বড় বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে একক ব্যাক্তিবর্গ, সকলেই মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে নিজের অর্থকে বাচানোর পথ খুজে থাকেন। জি, মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে নিজের কষ্টার্জিত অর্থকে বাচানোর সবচেয়ে উত্তম উপায় হচ্ছে কোনো ভালো খাতে বিনিয়োগ করা। তবে কিভাবে বুঝবেন যে কোন খাত ভালো আর কোন খাত ভালো না? জি, সেটা বোঝার জন্যই ব্যবহার করা হয় অর্থের সময়মূল্যের ধারণা। অর্থের সময়মূল্য সম্পর্কে যদি আপনার কোনো ধারণা না থেকে থাকে, তাহলেও কোনো সমস্যা নেই। আজকের লেখা পুরোটা পড়লে আশা করি অর্থের সময়মূল্য সম্পর্কে একটি ভালো ধারণা পেয়ে যাবেন।
Time Value of Money’কে বাংলায় অর্থের সময়মূল্য বলা হয়। এই কনসেপ্ট অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের মূল্য বর্তমানে সবচেয়ে বেশি, ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ের তুলনায়। অর্থের সময়মূল্য ফাইন্যান্সের একটি কোর কনসেপ্ট। মূলত অর্থের ‘আয়’ করার সক্ষমতা থেকে এই ধারণার সূচনা হয়েছিল। ধরে নিন, আপনার হাতে এখন ১০০ টাকা আছে। আর ১ বছর পর কোনো নির্দিষ্ট উৎস থেকে আপনার ১০০ টাকা আয় হওয়ার কথা আছে। তাহলে আপনি ভাবতে পারেন যে আপনার হাতে থাকা ১০০ টাকা এবং ১ বছর পর আসা ১০০ টাকার মূল্য একই। কিন্তু না, অর্থের সময়মূল্যের কনসেপ্ট অনুযায়ী আপনার হাতে থাকা ১০০ টাকার মূল্য বেশি। তাই অর্থের সময়মূল্যকে অনেক সময় অর্থের বর্তমান মূল্য বলা হয়।
আপনার মনে এখন প্রশ্ন আসবে যে, বর্তমান সময়ের অর্থের মূল্য কেনো বেশি! কারণ, আপনার হাতে যদি কিছু অর্থ থাকে এবং সেই অর্থ আপনি নির্দিষ্ট কোনো খাতে বিনিয়োগ করেন, তাহলে সেই বিনিয়োগ থেকে আপনার ‘আয়’ হবে। সেই আয়কৃত টাকা এবং আপনার আসল টাকা মিলে আপনার মোট অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। সেই কারণেই বর্তমান সময়ের অর্থের মূল্য বেশি। আর এই একই কারণে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট সময় পরে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাওয়ার থেকে সেই একই পরিমাণ টাকা বর্তমানে পাওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী থাকেন। কারণ সেই টাকা হাতে পেয়ে তারা অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করবেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে পর সেই বিনিয়োগের টাকা বৃদ্ধি পাবে।
তাই অর্থের সময়মূল্যের পুরো কনসেপ্ট অর্থকে ‘কাজে লাগানো’র উপর দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে যে, অর্থকে কাজে না লাগালে বা কোথাও বিনিয়োগ না করলে কি হবে? সহজ ভাষায় বললে, আপনার হাতে যদি কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ থাকে এবং আপনি সেই অর্থকে কোথাও বিনিয়োগ না করে নিজের কাছে রেখে দেন, তাহলে আপনার ক্ষতি হবে। কিন্তু কিভাবে ক্ষতি হবে?
উদাহরণস্বরুপ, আপনার হাতে এখন ১০০০ টাকা আছে। এই ১০০০ টাকা আগামী ১ বছরে আপনার কোনো কাজে আসবে না। তাই আপনার কাছে একটি সুযোগ আছে এই ১০০০ টাকাকে ১ বছরের জন্য কোনো ব্যাংকে রেখে দেয়ার। ১ বছরের জন্য ব্যাংকে ১০০০ টাকা রাখলে ব্যাংক আপনাকে ১ বছর পর সুদাসল (সুদ + আসল) হিসেবে ১০১০ টাকা ফেরত দিবে। তবে আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আপনি ব্যাংকে টাকা রাখবেন না। পুরো ১০০০ টাকা আপনি ১ বছরের জন্য নিজের কাছে রাখলেন এবং ১ বছর পর তা খরচ করলেন।
তাহলে আপনি ভাবতে পারেন যে ১ বছর পরেও আপনি তো ১০০০ টাকা’ই খরচ করতে পেরেছেন। তাহলে আপনার লাভ (ব্যাংকের অতিরিক্ত ১০ টাকা) না হলেও, ক্ষতি তো হয়নি! জি, ক্ষতি হয়েছে। ১ বছর আগে আপনি ১০০০ টাকা খরচ করে যেসব পণ্য বা সেবা ক্রয় করতে পারতেন, সম্ভাবনা বেশি যে ঐ একই পরিমাণ পণ্য বা সেবা ক্রয় করার জন্য ১ বছর পর আপনাকে ১০১০ বা তার বেশি টাকা খরচ করতে হয়েছে। প্রতিবছরই মুদ্রাস্ফীতির কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তাই ১০০০ টাকা আপনি খরচ করলেও, বাকি ১০ টাকা আপনাকে নিজের পকেট থেকে অরিতিক্ত খরচ করতে হয়েছে।
আর এভাবেই অর্থের সময়মূল্যের ধারণার অভাবে আমাদের ক্ষতি হয়ে থাকে। আর এই যে, ব্যাংকে ১ বছরের জন্য অর্থ রাখার মাধ্যমে অতিরিক্ত ১০ টাকা আয় করার একটি সুযোগ আপনার ছিল, কিন্তু আপনি সেটি ব্যবহার করেননি, আর এতে করে আপনার অতিরিক্ত ১০ টাকা পকেট থেকে খরচ করতে হলো, ফাইন্যান্সের ভাষায় একে বলা হয় সুযোগ ব্যয়।
অর্থের সময়মূল্যের সাথে মুদ্রাস্ফীতির একটি ঋণাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান। কারণ, মুদ্রাস্ফীতি যতো বৃদ্ধি পাবে, অর্থের মূল্য ততোই হ্রাস পেতে থাকবে। আজকের এক কেজি গরুর মাংসের দাম যদি ৭৫০ টাকা থেকে মুদ্রাস্ফীতির কারণে ১ বছর পরে ৮৫০ টাকা হয়ে যায়, তাহলে আপনি আর ৭৫০ টাকা দিয়ে তা ক্রয় করতে পারবেন না। গরুর মাংস ক্রয় করার জন্য আপনাকে অতিরিক্ত ১০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
অর্থাৎ, মুদ্রাস্ফীতির কারণে ৭৫০ টাকা দিয়ে ১ বছর আগে যা ক্রয় করা যেতো, আজ তা ৮৫০ টাকা দিয়ে ক্রয় করতে হচ্ছে। অর্থাৎ, এই ১ বছরের মাঝে অর্থের মূল্য ১০০ টাকা হ্রাস পেলো। এই কারণেই বলা হয় যে অর্থের সময়মূল্য ও মুদ্রাস্ফীতির মাঝে ঋণাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান।
অর্থের সময়মূল্য সম্পর্কে আরো গভীরে যাওয়ার আগে আমাদের অর্থের সময়মূল্যের বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি কম্পোনেন্ট সম্পর্কে জেনে নিতে হবে, তা হচ্ছে চক্রবৃদ্ধি সুদ। চক্রবৃদ্ধি সুদকে ইংরেজি তে Compounding Interest বলা হয়। চক্রবৃদ্ধি সুদের কনসেপ্ট অনুযায়ী, ব্যাংক আপনাকে প্রথম বছর আসল টাকার উপর সুদ দিবে। তবে দ্বিতীয় বছর থেকে ব্যাংক আপনাকে সুদাসলের উপর সুদ দিবে। একইভাবে দ্বিতীয় বছর পাওয়া সুদাসলের উপর আপনি তৃতীয় বছর সুদ পাবেন। চলুন, একটি উদাহরণের মাধ্যমে চক্রবৃদ্ধি সুদের কনসেপ্ট বুঝে নেয়া যাক।
মনে করুন, আপনি ৩ বছরের জন্য তুরাগ ব্যাংকে ১০০০ টাকা জমা রাখতে চাইছেন। ব্যাংকের সাথে কথা বলে জানতে পারলেন যে ব্যাংক আপনাকে এই ১০০০ টাকার উপর ১০% বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি সুদ প্রদান করবে। তাহলে ব্যাংক হতে আপনি পাবেন -
১ম বছর - ১০০০ টাকার উপর ১০% সুদ, অর্থাৎ ১০০। তাহলে ১ম বছর শেষে সুদ আর আসল টাকা মিলে আপনার জমাকৃত অর্থ হয়ে যাবে ১১০০ টাকা।
২য় বছর - পূর্ববর্তী বছরের সুদাসল ছিল ১১০০ টাকা। তাহলে ২য় বছর এই ১১০০ টাকার উপর আপনি সুদ পাবেন। তাহলে ২য় বছর শেষে আপনার জমাকৃত অর্থ হবে {১১০০ টাকা + (১১০০*১০%)} = ১২১০ টাকা।
৩য় বছর - পূর্ববর্তী বছরের সুদাসল ছিল ১২১০ টাকা। তাহলে ৩য় বছর এই ১২১০ টাকার উপর আপনি সুদ পাবেন। তাহলে ৩য় বছর শেষে আপনার জমাকৃত অর্থ হবে {১২১০ টাকা + (১২১০*১০%)} = ১৩৩১ টাকা।
এখানে উল্লেখ্য যে, ব্যাংক বিভিন্ন হারে চক্রবৃদ্ধি করতে পারে, যেমন - দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক ও বার্ষিক। প্রতিটি ক্ষেত্রে চক্রবৃদ্ধির হার হবে -
সরল সুদকে ইংরেজিতে Simple Interest বলা হয়। এই কনসেপ্ট অনুযায়ী, আপনাকে প্রতি বছর শুধু আসল টাকার উপর সুদ দেয়া হয়। অর্থাৎ, পূর্ববর্তী উদাহরণ অনুযায়ী যদি সরল সুদকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি, তাহলে -
চক্রবৃদ্ধি সুদের ক্ষেত্রে আপনি ৩ বছর পর পাবেন ১৩৩১ টাকা। আর সরল সুদের ক্ষেত্রে আপনি ৩ বছর পর পাবেন ১৩০০ টাকা। সময় ও চক্রবৃদ্ধির হার যতো বৃদ্ধি পাবে, সরল সুদ ও চক্রবৃদ্ধি সুদের মাঝে পার্থক্য ততোই বৃদ্ধি পাবে।
অর্থের সময়মূল্যের একদম বেসিক সূত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয় -
এইসব কিছু বিবেচনা করে অর্থের সময়মূল্যের সবচেয়ে বেসিক সূত্রটি হচ্ছে -
FV = [PV {1 + (i / m)}m*n]
তবে চলুন, আমরা প্রথমে তুরাগ ব্যাংকের যেই উদাহরণটি দেখেছিলাম, তা এখন সূত্রের মাধ্যমে নির্ণয় করা যাক।
উদাহরণস্বরুপ - আপনি ৩ বছরের জন্য তুরাগ ব্যাংকে ১০০০ টাকা জমা রাখতে চাইছেন। ব্যাংকের সাথে কথা বলে জানতে পারলেন যে ব্যাংক আপনাকে এই ১০০০ টাকার উপর ১০% বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি সুদ প্রদান করবে। তাহলে ৩ বছর পর আপনি ব্যাংক হতে পাবেন -
এখানে -
FV = [PV {1 + (i / m)}m*n]
=> FV = [1000 {1 + (10% / 1)}1*3]
=> FV = 1331 BDT
এতোক্ষণ আমরা শুধু অর্থের ভবিষ্যত মূল্য নির্ণয়ের সূত্র দেখেছি। এখন চলুন অর্থের বর্তমান মূল্য নির্ণয় করা দেখে নেয়া যাক। অর্থের বর্তমান মূল্য নির্ণয় করার জন্য উপরিউক্ত সূত্রকে কিছুটা পরিবর্তন করে নিতে হবে।
PV = [FV / {1 + (i / m)}m*n]
এবার বর্তমান মূল্য নির্ণয়ের স্বার্থে উপরিউক্ত উদাহরণকে কিছুটা পরিবর্তন করে নেয়া যাক।
মনে করুন, আপনার ৩ বছর পর ১৩৩১ টাকা প্রয়োজন। ৩ বছর পর এই টাকা পাওয়ার জন্য আপনি ১০% সুদের হারে তুরাগ ব্যাংকে কিছু টাকা জমা রাখতে চান। আজ তুরাগ ব্যাংকে কতো টাকা জমা রাখলে আপনি ৩ বছর পর ১৩৩১ টাকা পাবেন?
PV = [FV / {1 + (i / m)}m*n]
=> PV = [1331 / {1 + (10% / 1)}1*3]
=> PV = 1000 BDT
মনে করুন, আপনি একটি ব্যাংকে ১ বছরের জন্য ১০,০০০ টাকা জমা রাখলেন। ব্যাংকে প্রতি বছরে ১ বার চক্রবৃদ্ধি হবে এবং ব্যাংক আপনাকে আসল টাকার উপর ১০% সুদ দিবে। তাহলে ১০,০০০ টাকা ভবিষ্যত মূল্য হবে -
FV = ১০,০০০ {১ + (১০% / ১)১*১
= ১১,০০০ টাকা।
একই উদাহরণকে আমরা উলটোভাবে দেখতে পারি। মনে করুন, আজ থেকে ১ বছর পর আপনি ১১,০০০ টাকা দিয়ে একটি স্মার্টফোন ক্রয় করতে চান। তাই, ব্যাংকের সুদের হার যদি ১০% হয় এবং ব্যাংক আপনাকে বার্ষিক চক্রবৃদ্ধির প্যাকেজ অফার করে, তাহলে আজ আপনাকে ব্যাংকে কতো টাকা জমা রাখতে হবে? আসুন, বর্তমান মূল্যের সূত্র ব্যবহার করে উত্তরটা জেনে নেই।
PV = ১১,০০০ / {১ + (১০% / ১)}১*১
= ১০,০০০ টাকা।
অর্থাৎ, আজ ব্যাংকে ১০,০০০ টাকা রাখলে আপনি ১ বছর পর ১১,০০০ টাকা ব্যাংক থেকে ফেরত পাবেনে এবং স্মার্টফোনটি ক্রয় করতে পারবেন।
বছরে চক্রবৃদ্ধির পরিমাণ যতো বৃদ্ধি পাবে, অর্থের ভবিষ্যতমূল্য’ও ততো বাড়তে থাকবে। মনে করুন, আপনি একটি ব্যাংকে ১ বছরের জন্য ১০,০০০ টাকা জমা রাখলেন।ব্যাংক আপনাকে আসল টাকার উপর ১০% সুদ দিবে। ব্যাংক আপনাকে ৩টি প্যাকেজ অফার করলো, যথা - ত্রৈমাসিক চক্রবৃদ্ধি, মাসিক চকৃবৃদ্ধি ও দৈনিক চক্রবৃদ্ধি। তাহলে আসুন অংকের মাধ্যমে জেনে নেই যে আপনার আসলে কোন প্যাকেজটি সিলেক্ট করা উচিত।
ত্রৈমাসিক চক্রবৃদ্ধিতে ভবিষ্যত মূল্য -
FV = ১০,০০০ {১ + (১০%/৪)৪*১
= ১১,০৩৮ টাকা
মাসিক চক্রবৃদ্ধিতে ভবিষ্যত মূল্য -
FV = ১০,০০০ {১ + (১০%/১২)১২*১
= ১১,০৪৭ টাকা
দৈনিক চক্রবৃদ্ধিতে ভবিষ্যত মূল্য -
FV = ১০,০০০ {১ + (১০%/৩৬৫)৩৬৫*১
= ১১,০৫২ টাকা
অর্থাৎ, আপনার উচিত সর্বোচ্চ (দৈনিক) চক্রবৃদ্ধির প্যাকেজটি সিলেক্ট করা। কারণ, এতে করে আপনি ভবিষতে সর্বোচ্চ পরিমাণ রিটার্ন পাবেন।
অর্থের সময়মূল্যের সাথে সুদের হারের দুই ধরণের সম্পর্ক বিদ্যমান।
বিনিয়োগের সাথে কম্পাউন্ডিং এর ধারণা জড়িত। চক্রবৃদ্ধিকরণ হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে আপনি আপনার আসল টাকার উপর সুদ অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে উক্ত সুদ আসল টাকার সাথে যোগ করা হয়, এতে করে আপনার আসল সুদাসলে পরিণত হয়। তার পরেরবার থেকে শুধু আসলের উপর সুদ ধার্য না করে বরং সুদাসলের উপর সুদ ধার্য করা হয়। অর্থাৎ, এই পদ্ধতি ভবিষ্যত মূল্যের সাথে জড়িত। এতে করে আপনার আসল টাকা চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। সুদের হার যতো বেশি হয়, চক্রবৃদ্ধির কারণে টাকার পরিমাণ ততোই বাড়তে থাকে।
অপরদিকে, ডিস্কাউন্টিং হচ্ছে কোনো ভবিষ্যত অর্থের বর্তমান মূল্য নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া। ভবিষ্যতের কোনো টাকার বর্তমান মূল্য কতো হতে পারে তা জানার জন্য এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। বাট্টাকরণ প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় দায় পরিশোধের সময়। আপনার কোনো দেনা আজ পরিশোধ করলে ভালো হবে নাকি একটি নির্দিষ্ট সময় পর ভবিষ্যতে পরিশোধ করলে ভালো হবে তা জানার জন্য ডিস্কাউন্টিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, এই পদ্ধতি বর্তমান মূল্যের সাথে জড়িত।
অর্থের সময়মূল্য আমাদের দৈনন্দিন আর্থিক সিদ্ধান্তে’ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থের সময়মূল্য সম্পর্কে জেনে আমাদের দৈনন্দিন আর্থিক সিদ্ধান্তগুলোকে তাই আরো বেশ ইফেক্টিভ এবং এফিশিয়েন্ট করে তোলা সম্ভব। এই সেকশনে আমরা দেখার চেষ্টা করবো কিভাবে অর্থের সময়মূল্য আমাদের দৈনন্দিন আর্থিক সিন্ধান্তগুলোকে আরো কার্যকর করে তুলতে পারে।
অর্থের সময়মূল্য আমাদেরকে বেহিসেবি খরচ করা থেকে বিরত থাকতে এবং অর্থ সঞ্চয় করতে মোটিভেট করে থাকে। কারণ, আমরা জানি যে আজকে কোনো বারতি খরচ না করে বরং সেই টাকা জমিয়ে কোনো খাতে বিনিয়োগ করলে তা নির্দিষ্ট সময় পর আরো বেশি রিটার্ন নিয়ে আসবে। তাই যতো দ্রুত সম্ভব বিনিয়োগের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। অন্যদিকে, আজকেই যদি আমাদের আয়ের সম্পূর্ণ টাকা আমরা খরচ করে ফেলি, তাহলে ভবিষ্যতে উক্ত টাকা থেকে আসা সম্ভাব্য রিটার্ন থেকে আমরা বঞ্চিত হবো।
আপনার কাছে যদি কিছু টাকা থাকে এবং কিছু ঋণ থাকে, তাহলে সেই টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে ফেলবেন নাকি কোথাও বিনিয়োগ করবেন - এটা বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে অর্থের সময়মূল্যের ধারণা সাহায্য করতে পারে। আপনি উক্ত টাকা কোথাও বিনিয়োগ করলে কি হারে রিটার্ন পাবেন এবং আপনার ঋণের বিপরীতে আপনাকে কি হারে সুদ দিতে হচ্ছে এই দুই অ্যামাউন্টকে আপনার তুলনা করতে হবে।
যদি বিনিয়োগ থেকে বেশি রিটার্ন আসে, তাহলে অর্থ বিনিয়োগ করা আপনার জন্য ভালো সিদ্ধান্ত হবে। এতে করে বিনিয়োগ থেকে আসা রিটার্নের মাধ্যমে আপনি ঋণের সুদ পরিশোধ করতে পারবেন এবং আপনার কাছে অতিরিক্ত অর্থ জমা হবে। অন্যদিকে, ঋণের জন্য যদি আপনাকে বেশি সুদ দিতে হয় তাহলে উক্ত অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে ফেলা হবে ভালো সিদ্ধান্ত।
এখন পর্যন্ত পড়ে আপনার মনে হতে পারে যে অর্থের সময়মূল্য শুধু বিনিয়োগ করতেই উৎসাহ প্রদান করে। কিন্তু তা সত্য নয়। বরং, অর্থের সময়মূল্য আপনাকে আপনার সব টাকা বিনিয়োগ না করে কিছু টাকা ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনের জন্য সবসময় হাতে রাখতে উৎসাহ প্রদান করে। এতে করে আপনার হঠাৎ কোনো টাকা প্রয়োজন হলে আপনাকে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণ করতে হবে না বা ক্ষতিতে আপনার বিনিয়োগ বিক্রয় করে ফেলতে হবে না।
ব্যাক্তিগত লেনদেন থেকে শুরু করে ব্যবসায়ের বিশাল বিশাল অংকের লেনদেন, সর্বক্ষেত্রেই অর্থের সময়মূল্যের কনসেপ্ট বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ব্যবসায়ের বড় বড় লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থের সময়মূল্য বেশ ভালো প্রভাব রাখে। উদাহরণস্বরুপ, একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে দুটি বিনিয়োগের সুযোগ আছে।
প্রথম বিনিয়োগ থেকে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ১০০০ কোটি টাকা পাবে।
দ্বিতীয় বিনিয়োগ থেকে প্রতিষ্ঠানটি ১০০০ কোটি টাকা পাবে, তবে আজ থেকে ২ বছর পর।
তাহলে অর্থের সময়মূল্যের কনসেপ্ট ব্যবহার করে আমরা ক্লিয়ারলি বুঝতে পারি যে আজকের ১০০০ কোটি টাকা এবং ২ বছর পরের ১০০০ কোটি টাকা সমান নয়। তাই প্রতিষ্ঠানটির উচিত ১ম সুযোগে বিনিয়োগ করা। এভাবেই অর্থের সময়মূল্যের কনসেপ্ট ব্যবহার করে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক অপশন থেকে সবচেয়ে বেটার অপশন খুজে বের করে।
এখানে উল্লেখ্য যে, সকলের বোঝার স্বার্থে আমরা এখানে বেশ সহজ কিছু উদাহরণ ব্যবহার করেছি। তবে বাস্তব জীবনে অর্থের সময়মূল্যের ব্যবহার অনেক জটিল হতে পারে এবং বিভিন্ন স্থানে কাজে লাগানোর জন্য অর্থের সময়মূল্যের সূত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করে নেয়া যায়।
স্বল্পমেয়াদে অর্থের সময়মূল্যের প্রভাব তেমন বোঝা না গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে অর্থের সময়মূল্যে ছোট ছোট পরিবর্তন বেশ ভালো প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাই আমাদের উচিত যেকোনো বিনিয়োগ করার আগে অর্থের সময়মূল্যের কনসেপ্ট ব্যবহার করে অর্থের ভবিষ্যত মূল্য বা বর্তমান মূল্যে জেনে নেয়া।

প্রতিটি উদ্যোক্তাই চায় তার পণ্য বা সেবা বাজারে আনার আগে সেটাকে একদম নিখুঁত করে তুলতে। কিন্তু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর সময় আর অর্থ ব্যয় করে একটা পণ্য পুরোপুরি তৈরি করার পর যদি দেখা যায় বাজারে তার কোনো চাহিদাই নেই — এটা একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। মূলত এই সমস্যার সমাধান দিতেই তৈরি হয়েছে মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট বা এমভিপি কৌশল। পুরো পণ্য একসাথে না বানিয়ে শুধু সবচেয়ে জরুরি ফিচারগুলো নিয়ে বাজারে আসুন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সত্যিকারের মতামত নিন এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে পণ্য উন্নত করুন। বাংলাদেশের পাঠাও, বিশ্বের উবার এবং ড্রপবক্স — এরা সবাই এই একই পথ ধরে এগিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।








