ভূমিকা
পরিবারে কেউ যখন অসুস্থ হয় তাকে দেখানোর জন্য আমরা ডাক্তারের কাছে যায়। কারণ একজন ডাক্তার এই বিষয়ে এক্সপার্ট। ঠিক একইভাবে একটা বিজনেস এর অবস্থা কিরকম? সেখানে কোন সমস্যা আছে কিনা? থাকলে সেগুলো কতটুকু ক্ষতিকর আর কিভাবে সলিউশন করা যায় সেটার জন্যই একটা কোম্পানি অডিট করিয়ে থাকেন। অডিটে একটা কোম্পানির সকল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট, অ্যাকাউন্টিং স্টেটমেন্ট খুঁটিনাটি ভাবে চেক করা হয়।
অডিটিং এর ফিচার কি
কেন শুধু শুধু লাখ লাখ টাকা খরচ করে একটা কোম্পানি অডিটিং করায়
- অনেক বড় বড় কোম্পানিতে কোটি টাকার ট্রান্সেকশন হয়। এই ক্ষেত্রে টেক দিয়ে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা হলেও সেই টেকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে মানুষেরা। তাই ভুল এর সম্ভাবনা থাকে। কিছু কিছু ভুলের জন্য কোম্পানিকে কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দিতে হয় আর অনেক ক্লায়েন্ট দের সাথে সম্পর্কে নষ্ট হইয়ে যায়। এজন্য অডিটিং করা হয়।
- একটা স্টুডেন্ট লেখাপড়ার অবস্থা বুঝতে হলে যেভাবে একটা রিপোর্ট কার্ডের দিকে চোখ যায় কারণ রিপোর্ট কার্ড টা কোম্পানির জন্য একটা মানদন্ড । ঠিক একইভাবে সিএ ফার্ম যদি আপনার ফার্ম অডিট করে দেয় আর রিপোর্ট ভালো হয় তাহলে এটা একটা সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট যে আপনার ফার্ম অনেক ভালো করছে।
- অডিটিং প্রক্রিয়াটি সেই ফিল্ডের এস্কপার্টদের দ্বারা হয়ে থাকে যারা সেই ফিল্ড নিয়ে যথেষ্ট ধারণা রাখে আর খুবই সূক্ষ্ম যাচাই বাছাই হয় যার কারণে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা একদমই থাকে না।
ইন্টারনাল অডিটিং আর এক্সটারনাল অডিটিং
অডিটিং ইন্টারনাল আর এক্সটারনাল ২ ভাবেই করা যায়। ইন্টারনাল অডিটিং এ কোম্পানির নিজেদের স্পেশিয়ালিস্ট রা করে থাকে। কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড মেন্টেইন করছে কিনা, ইনভেন্টরি এর হিসাব কি এইসকল বিষয়গুলো বের করা হয়। এগুলোর রিপোর্ট বানিয়ে ডিপার্ট্মেন্ট হেড এর কাছে পাঠানো হয়। সেগুলো তিনি পরবর্তীতে রিপোর্ট বানিয়ে সিইও এর কাছে পাঠায় যেটা পরবর্তীতে সে রিপোর্ট আকারে পাবলিশ করে। আর এক্সটারনাল রিপোর্টিং করা হয় ইন্ডিপেন্ডেন্ট লাইস্যান্স ফার্ম দ্বারা। এটার মূল কারণ থাকে কোম্পানির ভিতরে কেউ ভুল তথ্য পাঠাচ্ছে কিনা আর কেউ ফ্রড করার চেষ্টা করছে কিনা । প্রতিটি কোম্পানি কেই ২ বছর পর পর অডিটিং ফার্ম চেঞ্জ করতে হয়।
অডিটিং টাইপ
১৫ ধরনের অডিটিং রয়েছে
- ১ কমপ্লায়েন্স অডিট
- ২ অপারেশনাল অডিট
- ৩ ইন্টারনাল অডিট
- ৪ এক্সটারনাল অডিট
- ৫ পে রোল অডিট
- ৬ ট্যাক্স অডিট
- ৭ ফাইন্যান্সিয়াল অডিট
- ৮ ইনফরমেশন সিস্টেম অডিট
- ৯ পে অডিট
- ১০ ইন্টিগ্রেটেড অডিট
- ১১ ফরেন্সিক অডিট
- ১২ স্ট্যাচুয়োরি অডিট
- ১৩ ভ্যালু ফর মানি অডিট
- ১৪ এগ্রিড আপন প্রসিডিউর অডিট
- ১৫ স্পেশাল অডিট
অডিট প্রিন্সিপাল
অডিটিং এর প্রিন্সিপাল হলো
সততা, ইন্ডিপেনডেন্স-
একজন অডিটর কোন ফার্মের সাথে বায়াসনেস দেখাতে পারবেন না। তাকে সম্পূর্ণ নিউট্রাল থেকে স্টেটমেন্ট তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যে ফার্মে একজন অডিটর অডিট করবেন সে ফার্মের সাথে তার কোনরকম সম্পৃক্ততা থাকা যাবে না যার জন্য তিনি ফার্মের হয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন
কনফিডেনশিয়ালিটি-
একটা কোম্পানির কাছে তাদের ক্লায়েন্ট এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে অনেক সেন্সিটিভ ডেটা থাকবে। একজন অডিটর সেই ডেটাগুলো নিয়ে অডিট করতে পারবেন কিন্তু সেগুলো চাইলেই তিনি কাউকে কিছু বলতে পারবে না যদি না সেটা ল এর এগেইন্সট এ যায় এবং তাকে সেই তথ্য আদালতে পেশ করতে হয়।
স্কিল এন্ড কম্পিটেন্স-
একজন অডিটর অ্যাকাউন্টিং ফিল্ড এ সর্বোচ্চ টি অর্জন করেছে। তাই তাকে একজন দক্ষ নিরক্ষক হতে হবে। এর পাশপাশি মার্কেটে যেই নতুন নিয়ম আসে সেগুলো সম্পর্কে তাকে জানা থাকতে হবে এবং সেগুলো নিয়ে নিজেকে আপডেট রাখতে হবে।
ওয়ার্ক পারফর্মড বাই আথারস-
একজন অডিটর চাইলেই বড় বড় কোম্পানির অডিট করতে পারেন না। এর জন্য অনেক সময় আর দক্ষ লোক প্রয়োজন। তাই এজজন অডিটর চাইলে তার আন্ডারে লোক নিয়োগ করতে পারবে। তাদেরকেও এই কাজে দক্ষ হতে হবে এবং একজন অডিটরকে তার আন্ডারে কাজ করা সকলের কাজের জন্য রেসপন্সিবিলিটি নিতে হবে।
ডকুমেন্টেশন-
একজন অডিটর টেক এর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না। অনেক কাজের ক্ষেত্রে তাকে নোটপ্যাড রাখতে হয় এবং সব কিছুর ডকুমেন্টেশন করতে হয় ।
অডিট এভিডেন্স-
একটা অডিট কমপ্লিট হলে সেটার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একজন অডিটরের কাছে যথেষ্ট প্রুফ থাকতে হয়। এই প্রুফ ২ ভাবে কাল্কেট করা যায়। একটা হচ্ছে ইন্টারনাল প্রুফ যেটা মূলত কোম্পানির ডেটা থেকেই পাওয়া যায় আরেকটা হলো এক্সটারনাল প্রুফ যেটার জন্য অডিটর এক্সটারনাল রিসোর্স থেকে প্রুফ কালেক্ট করে।
প্ল্যানিং-
একটা কোম্পানি কে অডিট করার জন্য একটা স্ট্যান্ডার্ড প্ল্যান প্রয়োজন হয়। কোম্পানি অনুসারে এই প্ল্যানিং গুলো চেঞ্জ হয়। এটা একজন অডিটরকে সম্পূর্ণ আইডিয়া দিয়ে রাখে তার অডিট অ্যাকশন নিয়ে।
ইন্টারনাল কন্ট্রোল-
একজন কোম্পানি রিপ্রেসেনটেটিভ কে দেখাতে হবে কোম্পানির রেকর্ড যা দেখানো হয়েছে এবং একজন অডিটরকে প্রমাণ করতে হবে সবগুলো ডেটা রেকর্ড করা হয়েছে এবং কোম্পানি যেই রিপোর্ট দিয়েছে তা সঠিক
রিপোর্টিং-
অডিট শেষ হওয়ার পর একজন অডিটরকে রিপোর্ট দিতে হয় । যেখানে থাকে
- সকল বুককিপিং আর সার্ভিস ঠিক আছে
- বাজেট রিপোর্ট গাইডলাইন আর লিগঅ্যাাল ফ্রেমওয়ার্ক এর সাথে মিল রয়েছে
- সকল ডেটা এক্সপ্লোর করা হয়েছে
অডিটিং এ যা যা হয়ে থাকে
১ সম্পূর্ণ সিস্টেমের একটা এক্সামিনেশন
অডিটিং এ একটা কোম্পানির ফাইন্যান্সিয়াল আর অ্যাকাউন্টিং ডেটার টপ টু বটম চেক করা হয়। এটা হচ্ছে কমপ্লিট বেসিক চেক। এটা অডিটিং করার আগে সবগুলো অডিটরকে করতে হয় যেটা তার সামনে কোম্পানির একটা সম্পূর্ণ ফ্রেমওয়ার্ক আর ফাংশনকে তুলে ধরে।
২ ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যাসেসমেন্ট
কোম্পানির ইন্টারনাল এনভায়রনমেন্ট কে একটা অডিটরের জন্য হেল্পফুল হতে হবে। একটা কোম্পানির যদি ফ্রড করা বা কোন কিছু লুকানোর ইন্টেনশন না থাকে সেক্ষেত্রে ইন্টারনালি তারা অনেক অর্গানাইজড হবে । একজন অডিট্রের কাছে কোম্পানির সব ডেটা ট্রান্সপারেন্টলি তুলে ধরা হয় সেক্ষেত্রে তার জন্য পজিটিভ রিপোর্ট তৈরি করা আরো সুবিধাজনক হয়। সে অ্যাকাউন্টিং ইনফরমেশন অ্যানালাইসিস এর উপর একটু কম জোর দিতে পারে। আর সেটি না হলে অডিটরকে আরো সূক্ষ্মভাবে রিপোর্টিং এর উপর জোর দিতে হয় এবং কোম্পানি সম্পর্কে তার বা তাদের মাথায় একটা নেগেটিভ ইনফো পোট্রে হয়।
৩ নিখুঁত হিসেব
একজন সি এ কে অ্যাকাউন্টিং ফিল্ড এর স্পেশিয়ালিস্ট বলা হয় কারণ তারা এই হিসাব বিজ্ঞান আর রিপোর্ট অ্যানালাইসিসে বাকিদের তুলনায় দক্ষ হয়। একজন অডিটরকে এই ক্ষেত্রে প্রতিটি অ্যাকাউন্টিং বই কে নিখুতভাবে চেক করতে হয়। কোথাও যাতে কোন লুপহোল বা ক্যাল্কুলেশন এরর না থাকে তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়।
৪ প্রিন্সিপালস অব অ্যাকাউন্টিং
অডিটরকে ইনকাম স্টেটমেন্ট, ব্যালেন্স শিট, ক্যাশফ্লো স্টেটমেন্ট গুলোকে ভালো ভাবে দেখতে হয়। ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট গুলো সাধারণত ২ টি ভাগে পড়ে। একটি হচ্ছে রেভেনিউ আর আরেকটি হচ্ছে ক্যাপিটাল । এই ২ টার পাশপাশি আয় আর খরচ এর খাতাগুলো নিয়ে তাকে ঘাটাঘাটি করতে হয় আর সব ইনফরমেশনের অ্যাকুরেসি যাচাই করতে হয়।
৫ অ্যাসেট ভেরিফিকেশন
একটা কোম্পানির সকল অ্যাসেট অডিটরের সামনে পেশ করতে হবে। তাকে সব লিগ্যাল ডকুমেন্ট, সার্টিফিকেট, অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট গুলো চেক করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সবগুলোর মালিক কোম্পানি কিনা। ব্যালেন্স শিট থেকে কোন এসেট বাদ পড়ে গিয়েছে কিনা সেটা নিয়েও তাকে খেয়াল রাখতে হবে।
৬ দায় বা লায়েবিলিটি ভেরিফিকেশন
একটা কোম্পানির যেরকম সম্পদ থাকে ঠিক একই ভাবে তার অনেক দায় ও থাকে। কোম্পানি সাধারণত লোন, স্টক বিক্রি করে টাকা তুলে থাকে। একজন অডিটরকে সকল ডকুমেন্ট, লেটার, সার্টিফিকেট এবং যাদের থেকে কোম্পানি লোন নিয়েছে তাদের সাথে কথা বলয়ে নিশ্চিত করতে হবে সবগুলো সঠিক কিনা । যাতে করে কোম্পানি ভুল তথ্য দিয়ে ট্যাক্স ফাকি দিতে না পারে।
৭ সংযুক্তি
প্রতিটি ফাইন্যান্সিয়াল ্ট্রান্সেকশনে একটা ডকুমেন্ট থাকে। এই ডকুমেন্ট গুলোর সত্যতা একজন অডিটরকে চেক করতে হয়। এটাকে ভাউচিং বলা হয়। ধরেন একটা কোম্পানি ১২ লাখ টাকার পণ্য কিনেছে কোন এক প্রতিষ্ঠান থেকে। তাহলে অডিটরকে সেই ডকুমেন্ট দেখে নিশ্চিত করতে হবে সেটা সঠিক নাকি মিথ্যা। এর জন্য চাইলে অডিটর সেই কোম্পানিতে ফোন দিতে পারে।
৮ আইনি বিষয়গুলো দেখা
একজন এক্সটারনাল অডিটর এর কাজ থাকে কোম্পানি সরকার আর ইন্টারন্যাশনাল ল মেনে চলছে কিনা। সে কর ফাকি কিংবা তথ্য গোপন করছে কিনা। তাই তাকে দেখতে হয় কোম্পানির অ্যাকাউন্ট Companies Act 2003, Income Tax Act 1961 মেনে চলছে কিনা ।
উপসংহার
সহজ ভাবে বলতে গেলে অডিটিং একটা কোম্পানির জন্য সার্টিফিকেট যেটা বাইরের মানুষদের বিশ্বাস করায় যে এই কোম্পানি টা ভালো আছে এখানে বিনিয়োগ করা সম্ভব। অডিটিং একটা কোম্পানির ভুল আর ফাইন্যান্সিয়াল রিস্ক নিয়েও ধারণা দেয় যেটি তাদের একটা ওভারল স্ট্রাকচার বিল্ডআপ এ সাহায্য করে। এটা একটা ফার্মকে ফিউচার প্ল্যান নিয়ে সাজেশন প্রোভাইড করে যা তাদের ভালো ডিসিশন নিতে সাহায্য করে।









