ডিমার্কেটিং
পণ্যের চাহিদা অনুসারে পর্যাপ্ত পণ্যের যোগান দিতে কি কখনো ব্যর্থ হয়েছেন? বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য না থাকায় আপনার কাস্টমার ও রিটেইলাররা কি আপনার উপর বিরক্ত? পণ্যের অতিরিক্ত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এই মুহুর্তে ব্যবসায়ের সম্প্রসারণ করা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়? এমন পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে আপনি ডিমার্কেটিং কনসিডার করতে পারেন।
১৯৭১ সালে ফিলিপ কটলার ও সিডনি জে লিভাই মিলে “Demarketing, Yes, Demarketing” শিরোনামে একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেন যেখানে তারা পণ্যের ঘাটতি ও এই ঘাটতির কারণে পণ্যের চাহিদার উপর প্রভাব সম্পর্কে তারা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন [1]। সেখানেই তারা সর্বপ্রথম ডিমার্কেটিং করার কথা বলেন। কারণ, নির্দিষ্ট কোনো পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে তা ব্র্যান্ডের অন্যান্য পণ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সরবরাহ বৃদ্ধি করতে না চাইলে পণ্যের ডিমার্কেটিং করার মাধ্যমে চাহিদা কমিয়ে আনা উচিত।
ডিমার্কেটিং হল কোনো পণ্য বা পরিষেবার চাহিদা কমানোর একটি পদ্ধতি।
আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, উদ্যোক্তাদের জন্য কোনো পণ্য বিক্রয় করা এবং উক্ত পণ্য থেকে লাভ অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় ডিমার্কেটিং-এর ব্যবহার পণ্যের অত্যধিক চাহিদা হ্রাস করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডিমার্কেটিং-এর নীতি অনুসারে যখন অত্যধিক চাহিদার পণ্যটির সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয় বা নির্দিষ্ট কিছু ক্রেতার জন্য পণ্যটি বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন কোম্পানির কোনো ধরণের ক্ষতি না হয়ে বরং লাভ হয়।
ডিমার্কেটিং এর প্রকারভেদ
ডিমার্কেটিং কৌশলকে প্রধাণত ৪ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা -
জেনারেল ডিমার্কেটিং
যখন কোনো কোম্পানি তাদের সমস্ত ব্যবহারকারীর জন্য একটি পণ্যের ব্যবহার কমাতে চায়, এক্ষেত্রে সেই কোম্পানি ডিমার্কেটিং কৌশল ব্যবহার করতে পারে। এর মাধ্যমে কোনো পুরনো বা কম কার্যকর পণ্যের প্রসারণ বা ব্যবহার কমতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, একটি ল্যাপটপ কোম্পানি সাধারণ ডিমার্কেটিং কৌশল ব্যবহার করে একটি পুরানো ল্যাপটপ মডেলের ক্রয় সীমিত করতে পারে, গ্রাহকদের কোম্পানির নতুন মডেল কেনার জন্য উৎসাহিত করতে পারে৷
সিলেক্টিভ ডিমার্কেটিং
সিলেক্টিভ ডিমার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি ব্যবহারের মাধ্যমে কোম্পানি নির্দিষ্ট কোনো কাস্টমার সেগমেন্টের জন্য পণ্যের ব্যবহার সীমিত করে দিতে পারে। মূলত এক অঞ্চল থেকে সাপ্লাই কমিয়ে অন্য অঞ্চলে সাপ্লাই বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে এই স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করা হয়। আবার সাধারণ কাস্টমারদের কম পণ্য সাপ্লাই করে প্রিমিয়াম কাস্টমারদের বেশি পণ্য সাপ্লাই করার উদ্দেশ্যে’ও এটি করা যেতে পারে।
ওপেন ডিমার্কেটিং
এই ডিমার্কেটিং পদ্ধতিটি ব্যবহার করে গ্রাহকদেরকে এটা বিশ্বাস করানো হয় যে একটি নির্দিষ্ট পণ্য খুব দ্রুতই বাজারে দুষ্প্রাপ্য অর্থাৎ আর না পাওয়া যেতে পারে। গ্রাহকদেরকে এমন বিশ্বাস করাতে চায় যে, একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য না কিনলে তারা উক্ত পণ্যটি কখনোই আবার এত কম দামে কিনতে পারবে না। এই পদ্ধতিটি কি প্রভাব ফেলে?
গ্রাহকেরা উক্ত পণ্যটি দুষ্প্রাপ্য অর্থাৎ হারিয়ে যাওয়ার আগেই তাড়াহুড়ো করে কিনতে চাইবে। সুতরাং, কোম্পানিটিকে উক্ত পণ্যটির দাম বাড়াতে এবং আরও বেশি লাভ অর্জন করতে সক্ষম করবে।
২০২০ সালের COVID-19 লকডাউনের কিছু দিন আগে অভিজ্ঞতা হয়েছিল যেখানে ক্রেতারা বিশ্বাস করেছিল যে, তারা যদি এখন খাদ্যসামগ্রী না কিনে তবে তারা আর কখনও খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারবে না। এমন অনেকে আছে যারা অনির্দিষ্টকালের লকডাউনের মাধ্যে তাদের নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে রাখতে অনেক খাদ্যসামগ্রী সঞ্চয় রেখে ছিল।
ডিমার্কেটিং এর কারণ
ডিমার্কেটিং মূলতা কেন করা হয়? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই ডিমার্কেটিং এর কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ নিচে চিহ্নিত করা হয়েছেঃ
- যখন সরবরাহের চেয়ে চাহিদা বেশি।
- যখন রিসোর্স সেইভ করা উচিত।
- যখন একটি পণ্যের বিক্রির মূল্য অত্যন্ত বেশি হয়
- গ্রাহকদের স্বাস্থ্যগত জটিলতা থেকে বাঁচানো।
ডিমার্কেটিং এর উদাহরণ
(১) উদাহরণ হিসেবে একজন উদ্যোক্তার কথা চিন্তা করা যায় যিনি কিনা তার প্রথম ব্যাচের পণ্যগুলো সবেমাত্র বের করেছেন এবং একটি বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইন অর্থ্যাৎ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্যের প্রচারণার কাজ শুরু করেছেন এবং তার প্রত্যাশা এমন যে, প্রথম ব্যচের পণ্যগুলো বিক্রি করে যা অর্থ পাবে সেগুলো প্রচার কাজে খরচ করবে এবং দ্বিতীয় ব্যাচের পণ্য ক্রয় করার প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন।
পরবর্তীতে, তার পণ্যের চাহিদা অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়তে শুরু করার পর, পণ্য সংগ্রহ করতে সক্ষমতা বা ইচ্ছা না থাকার কারনে উদ্যোক্তা দ্রুতগতিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারে না।
এই পরিস্থিতিতে হতে মুক্তি পাওয়ার একটাই উপায় আর তা হলো পণ্যের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া অর্থাৎ ডিমার্কেটিং করা। এক্ষেত্রে ডিমার্কেটিং গাড়ির চালকের মতো কাজ করে অর্থাৎ ভীষণ গতিতে চলা ঘোড়ার গাড়িকে থামিয়ে দেওয়ার মতো।
(২) প্রায়শই, ডিমার্কেটিং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট পণ্যের ব্যবহারের হার কমাতে ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ হল সিগারেট এবং অ্যালকোহলের চাহিদা কমানোর প্রচারণা৷
(৩) যখন কোনো কোম্পানি বাজার থেকে তার পণ্য প্রত্যাহার করে দেবে তখন তা সম্পূর্ণ ডিমার্কেটিং এর অন্তর্ভুক্ত হবে। পণ্য ব্যবহারের ত্রুটি বা বিপজ্জনক পরিণতি সনাক্ত করার সময় এটি ব্যপকভাবে প্রয়োজনীয়। যেমন - বিষ্ফোরণের বেশ কিছু ঘটনা ঘটায় স্যামসাং মার্কেট থেকে তাদের বেশ কিছু গ্যালাক্সি নোট সিরিজের ফোন তুলে নিয়েছিল
ডিমার্কেটিং এর সুবিধা
ডিমার্কেটিং-এর বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমন -
খড়চ হ্রাস করে এবং লাভ বৃদ্ধি করে
কোনো একটি কোম্পানি যদি তার উৎপাদিত কোনো পণ্য থেকে একটা সময় পর আর পর্যাপ্ত পরিমাণে লাভ করতে পারে না, তখন সেই কোম্পানি ডিমার্কেটিং ব্যবহার করে উক্ত পণ্যটির উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে খরচ কমাতে পারে।
একটি কোম্পানির কোনো পণ্যের আশানুরূপ লাভ না করতে পারার অন্যতম কারণ হচ্ছে উৎপাদনের ক্ষেত্রে বেশি খরচ করা। ডিমার্কেটিং উক্ত খরচ কমিয়ে দিতে পারে।
ডিমার্কেটিং এর মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যগুলোর মার্কেটিং করে, আরও উন্নত মানের অর্থাৎ আরও লাভজনক পণ্য উৎপাদনের দিকে মনযোগ দেয়। এই পদ্ধতিটি গ্রাহকদের সাথে কোম্পানি গুলোর যোগাযোগ রক্ষা করে এবং গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করে পণ্য ক্রয় করা নিয়ন্ত্রন করে।
বাজার অবস্থান নিয়ন্ত্রণ
ডিমার্কেটিং এর মাধ্যমে একটি কোম্পানি নির্দিষ্ট স্থানে পণ্যের চাহিদা সীমিত করতে পারে। পাশাপাশি, কোম্পানিগুলোকে সঠিক গ্রাহকের কাছে পণ্য বিক্রি করার অনুমতি দিতে পারে (ডিমার্কেটিং)।
এছাড়াও, কোনো কোম্পানি ডিমার্কেটিং এর মাধ্যমে তার পণ্য সেইসব স্থানে বিক্রি করতে অনুমতি দিতে পারে যেখানে উক্ত পণ্যটি সর্বাধিক লাভ করতে পারে।
ডিমার্কেটিং স্ট্রাটেজি
চলুন তবে এবার ডিমার্কেটিং করার কিছু স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি
বিভিন্ন ডিমার্কেটিং পরিকল্পনা যখন ব্যবহার করা হয় তখন পণ্যের চাহিদা সাধারন ভাবেই হ্রাস পাওয়া উচিত। পণ্যের চাহিদা কমানোর একটি অন্যতম উপায় হচ্ছে পণ্যের দাম বৃদ্ধি করা।
ফলে যেসকল ক্রেতার জন্য পণ্যটি দামি হয়ে যাবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই উক্ত পণ্যটি ব্যহার করা ছেড়ে দিবে। অপর দিকে পণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে এর বিপরীত কাজটিও হতে পারে - দামী পণ্যের জন্য গ্রাহকদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পাবে যা গ্রাহকদের স্টকে পণ্য কিনতে বাধ্য করবে।
বিজ্ঞাপন সীমাবদ্ধতা
কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন যখন বিভিন্ন চ্যানেলে সেট আপ করা হয় এবং উক্ত পণ্যের চাহিদা যদি গ্রাহকদের কাছে অনেক বেশি হয়ে থাকে, তখন বিজ্ঞাপন প্রচারণা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মিডিয়া গুলোতে বিজ্ঞাপন প্রচারনা বন্ধ করে দিয়ে কেবল মাত্র সামাজিক নেটওয়ার্ক গুলিতে বিজ্ঞাপন প্রচার করা উচিত ।
পরবর্তীতে, উক্ত পণ্যের চাহিদা যখন কমে যাবে এবং কোম্পানি যখন গ্রাহকদেরকে অধিক পরিমাণে পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম হবে, তখন পুনরায় যোগাযোগের চ্যানেলগুলো (বিজ্ঞাপন মাধ্যম) ব্যবহার করা যেতে পারে।
অন্যান্য ব্র্যান্ড পণ্যে মনোযোগ পরিবর্তন
ডিমার্কেটিং পদ্ধতিটি তখনই ব্যবহার করা হয় যখন কোনো কোম্পানি তার সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্যটি থেকে আশানুরূপ লাভ করতে না পারে। এক্ষেত্রে কোম্পানি নির্মাতারা তাদের গ্রাহকদেরকে অন্য কোনো পণ্যের প্রতি আগ্রহ বা আকর্ষণ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে।
এই পদ্ধতিটির উদাহরন খুচরা ব্যাবসায়ীদের দোকানে প্রায়ই দেখা যায়। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদেরকে এই বলে আকৃষ্ট করেন যে, একই কোম্পানি থেকে প্রস্তুত করা অন্য একটি পণ্য কিনলে আপনি অনেক বেশি ডিসকাউন্টে কিনতে পারবেন। এ পর্যায়ে গ্রাহকেরা অর্থাৎ ক্রেতারা উক্ত পণ্যটি কিনতে স্বাভাবিক ভাবেই ইচ্ছুক থাকেন।
এইভাবেই ডিমার্কেটিং এর মাধ্যমে দ্বিতীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি করা হয় এবং পণ্যটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে।এর ফলে কোম্পানি তার পণ্য থেকে আশানুরূপ লাভ অর্জন করে।
কীভাবে ডিমার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়?
ডিমার্কেটিং এ সাফল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক কৌশল এর পাশাপাশি তা কীভাবে উন্নত করা যায়- সেগুলো জানা প্রয়োজন। নিচে ডিমার্কেটিং স্ট্রাটেজি বা কৌশল উন্নত করার কিছু টিপস দেওয়া হলোঃ
- কোন কৌশলটি গ্রহণ করতে হবে তা নিশ্চিত করার জন্য গ্রাহকদের আচরণ যথেষ্ট ভালভাবে বোঝা বা পর্যবেক্ষণ করা।
- কোনো কোম্পানির মার্কেটিং লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যগুলো বোঝা এবং সে অনুযায়ী ডিমার্কেটিং কৌশল বেছে নেওয়া যা কোম্পানিকে লক্ষ্যগুলো অর্জনে সহায়তা করে।
উপসংহার
আপনি যদি মার্কেটিং অথবা অন্যান্য ব্যবসার মাধ্যমে আপনার ক্যারিয়ার গড়তে চান,তাহলে ডিমার্কেটিং এর নীতিগুলো ব্যবসায় প্রয়োগ করতে হবে। আপনার নিজে ব্যবসায় করে সফল হতে চাইলেও আপনার ডিমার্কেটিং-এর সঠিক ব্যবহার জানা প্রয়োজন। এছাড়া পুরোনো পণ্যের চাহিদা হ্রাস করে নতুন পণ্য তৈরি করে সেটার মাধ্যমে লাভ করতে চাইলে, ডিমার্কেটিংকে বিবেচনায় রাখতে পারেন।









