ভূমিকা
ধরুন আজ রাতে হঠাৎ সব পেট্রোল স্টেশন বন্ধ হয়ে গেল। গাড়ি চলবে না, পণ্যবাহী ট্রাক থামবে, কলকারখানা অচল হবে, এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনও বিঘ্নিত হবে। পুরো সভ্যতা যেন এক ঝটকায় থেমে যাবে। এটা কোনো কাল্পনিক দুঃস্বপ্ন নয় — ১৯৭৩ সালে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল, যখন আরব দেশগুলো তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল।
তেল হলো আধুনিক বিশ্বের রক্ত। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে এই একটি পদার্থ বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং যুদ্ধ-শান্তির সমীকরণকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। যে দেশের কাছে তেল আছে, তার কাছে ক্ষমতা আছে। আর যে দেশ তেলের উপর নির্ভরশীল, তাকে সেই ক্ষমতার কাছে মাথা নত করতে হয়। আজকের এই লেখায় আমরা জানবো তেলের ভূরাজনীতির ইতিহাস, তার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতে কোথায় যাচ্ছে এই শক্তির লড়াই।
তেলের ইতিহাস: যেভাবে শুরু হলো ক্ষমতার লড়াই
প্রথম তেলকূপ থেকে বিশ্বযুদ্ধ
আধুনিক তেল শিল্পের শুরু ১৮৫৯ সালে, যখন আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় এডউইন ড্রেক প্রথম সফলভাবে তেল উত্তোলন করেন। কিন্তু তেল যে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, সেটা স্পষ্ট হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন যখন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো কয়লার বদলে তেলে চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তেলের কৌশলগত গুরুত্ব রাতারাতি বহুগুণ বেড়ে যায়। তৎকালীন ব্রিটিশ নৌপ্রধান লর্ড ফিশার বলেছিলেন, "তেলই হবে পরবর্তী যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি।" সেই প্রেক্ষাপটে ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে তেলের আবিষ্কার ও পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ
১৯০৮ সালে পারস্য (বর্তমান ইরান)-এ তেল আবিষ্কার হওয়ার পর ব্রিটিশ কোম্পানি অ্যাংলো-পার্শিয়ান অয়েল কোম্পানি (পরবর্তীতে BP) সেখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ব্রিটিশ সরকার এই কোম্পানির ৫১% মালিকানা কিনে নেয় এবং ইরানের তেল নিজেদের জাতীয় স্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।
এরপর ১৯৩৮ সালে সৌদি আরবে এবং কুয়েত ও বাহরাইনে তেল আবিষ্কার হওয়ার পর এই অঞ্চলটি বৈশ্বিক তেলের ভূরাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। মার্কিন কোম্পানিগুলো, বিশেষত স্ট্যান্ডার্ড অয়েল (পরবর্তীতে Aramco), সৌদি আরবে শক্তিশালী অবস্থান নেয়।
| দেশ | তেল আবিষ্কারের সাল | প্রধান পশ্চিমা কোম্পানি |
| ইরান | ১৯০৮ | Anglo-Persian Oil (BP) |
| ইরাক | ১৯২৭ | Iraq Petroleum Company |
| সৌদি আরব | ১৯৩৮ | Standard Oil (Aramco) |
| কুয়েত | ১৯৩৮ | Gulf Oil / BP |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | ১৯৫৮ | BP / Shell |
মোসাদ্দেগ থেকে OPEC: যেভাবে ক্ষমতার পট পরিবর্তন হলো
ইরানের জাতীয়করণ ও CIA-র অভ্যুত্থান
১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ ইরানের তেলশিল্প জাতীয়করণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর যুক্তি ছিল সহজ — ইরানের মাটির নিচের তেল ইরানের জনগণের সম্পদ, কোনো বিদেশি কোম্পানির নয়।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ব্রিটেন ও আমেরিকাকে ক্ষুব্ধ করে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা MI6 এবং আমেরিকার CIA মিলে ১৯৫৩ সালে "অপারেশন আজাক্স" পরিচালনা করে মোসাদ্দেগ সরকারকে উৎখাত করে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে ক্ষমতায় বসায়। এই ঘটনা তেলের ভূরাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় লেখে — প্রমাণ করে যে পশ্চিমা শক্তিগুলো তেলের স্বার্থ রক্ষায় সরকার পর্যন্ত বদলে দিতে প্রস্তুত।
OPEC-এর জন্ম: তেল উৎপাদনকারীদের পাল্টা অস্ত্র
পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর একতরফা নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো ১৯৬০ সালে বাগদাদে একটি ঐতিহাসিক বৈঠকে বসে। সেই বৈঠক থেকে জন্ম নেয় OPEC — Organization of the Petroleum Exporting Countries।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিল পাঁচটি দেশ: সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত এবং ভেনেজুয়েলা। পরবর্তীতে আরও দেশ যোগ দেয়। OPEC-এর লক্ষ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা এবং তেলের দামের উপর সম্মিলিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
| বছর | ঘটনা |
| ১৯৬০ | OPEC প্রতিষ্ঠা (৫ সদস্য নিয়ে) |
| ১৯৬৮ | আরব পেট্রোলিয়াম কংগ্রেস গঠন |
| ১৯৭৩ | প্রথম তেল সংকট / আরব অবরোধ |
| ১৯৭৬ | OPEC-এর সর্বোচ্চ প্রভাবের সময় |
| ২০১৬ | OPEC+ গঠন (রাশিয়াসহ) |
১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ: বিশ্ব যেদিন থমকে গিয়েছিল
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট
১৯৭৩ সালের অক্টোবরে মিশর ও সিরিয়া ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, যা "ইয়োম কিপুর যুদ্ধ" নামে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন করলে আরব দেশগুলো সিদ্ধান্ত নেয় — তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
OPEC-এর আরব সদস্যরা (OAPEC) আমেরিকা এবং ইসরায়েলকে সমর্থনকারী পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে তেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। একইসাথে তেলের উৎপাদনও ব্যাপক হারে কমিয়ে দেওয়া হয়।
ফলাফল: বিশ্বজুড়ে ধাক্কা
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক এবং ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)-এর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৩ ডলার থেকে বেড়ে ১২ ডলারে পৌঁছায় — অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসে তেলের দাম ৪ গুণ বৃদ্ধি পায়।
আমেরিকায় পেট্রোল স্টেশনের সামনে মাইলের পর মাইল লম্বা লাইন পড়ে। ইউরোপে সাপ্তাহিক গাড়ি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। জাপানে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। এই সংকট বিশ্বকে প্রথমবার বুঝিয়ে দেয় — তেলের উপর নির্ভরশীলতা একটি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি।
| দেশ | ১৯৭৩ সংকটের প্রভাব |
| আমেরিকা | জিডিপি প্রবৃদ্ধি শূন্যের নিচে, মূল্যস্ফীতি ১১% |
| জাপান | শিল্প উৎপাদন ২০% হ্রাস |
| পশ্চিম জার্মানি | রবিবার গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ |
| ব্রিটেন | তিন দিনের কর্মসপ্তাহ চালু |
OPEC-এর ক্ষমতা ও দ্বন্দ্ব
কার্টেল হিসেবে OPEC-এর শক্তি
OPEC মূলত একটি কার্টেল — যেখানে সদস্য দেশগুলো মিলে উৎপাদন কোটা নির্ধারণ করে এবং এভাবে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, OPEC+ বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৪০% নিয়ন্ত্রণ করে।
OPEC-এর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
OPEC সবসময় একমত নয়। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্ব OPEC-এর মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। ২০১৪ সালে যখন তেলের দাম দ্রুত পড়তে শুরু করে, তখন সৌদি আরব উৎপাদন না কমিয়ে বরং আমেরিকার শেল তেল শিল্পকে চাপে রাখার কৌশল নেয় — এতে ইরান, ভেনেজুয়েলার মতো দেশ যারা তেলের উচ্চমূল্যের উপর নির্ভরশীল, তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাশিয়া: তেলকে ভূরাজনৈতিক অস্ত্র বানানোর আধুনিক উদাহরণ
রাশিয়ার তেল নির্ভর অর্থনীতি
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। রাশিয়ান ফেডারেল বাজেট অফিসের তথ্যমতে, ২০২১ সালে তেল ও গ্যাস থেকে রাশিয়ার মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৪৫% আসে। এই বিশাল নির্ভরশীলতাই রাশিয়াকে তেল ও গ্যাসকে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে অনুপ্রাণিত করে।
ইউরোপের উপর রাশিয়ার গ্যাস নির্ভরতার ফাঁদ
২০২২ সালের আগ পর্যন্ত ইউরোপ তার প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৪০% রাশিয়া থেকে আমদানি করত — ইউরোপিয়ান কমিশনের হিসাব অনুযায়ী। জার্মানি ছিল সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, যার গ্যাসের প্রায় ৫৫% আসত রাশিয়া থেকে। এই নির্ভরতার কারণে ইউরোপ দীর্ঘদিন রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধায় ভুগেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও তেল-গ্যাসের অস্ত্রায়ন
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করার পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়। নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনের মাধ্যমে যে গ্যাস যেত, তা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)-এর তথ্যমতে, ২০২২ সালে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম এক বছরের মধ্যে প্রায় ৩০০% বৃদ্ধি পায়। জার্মানি, ইতালিসহ অনেক দেশে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের গৃহস্থালি জ্বালানি খরচ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
| সংকট | সময়কাল | তেল/গ্যাসের দাম বৃদ্ধি |
| ১৯৭৩ আরব অবরোধ | ৬ মাস | ৪ গুণ (৩$ → ১২$) |
| ১৯৭৯ ইরান বিপ্লব | ১ বছর | ২.৫ গুণ |
| ১৯৯০ উপসাগরীয় যুদ্ধ | ৬ মাস | ২ গুণ |
| ২০২২ রাশিয়া-ইউক্রেন | চলমান | ইউরোপে গ্যাস ৩ গুণ |
মার্কিন শেল বিপ্লব: ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেল
শেল তেল কী?
শেল তেল হলো পাথুরে শিলার মধ্যে আটকে থাকা তেল, যা বের করতে "ফ্র্যাকিং" (hydraulic fracturing) প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়। দীর্ঘদিন এই তেল বের করা ব্যয়বহুল ছিল, কিন্তু ২০০০-এর দশকে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এটি লাভজনক হয়ে ওঠে।
শেল বিপ্লবের প্রভাব
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA)-এর তথ্যমতে, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মার্কিন তেল উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় — প্রতিদিন ৫ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে বেড়ে ১৩ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছায়। এতে করে আমেরিকা তেল আমদানিনির্ভর দেশ থেকে তেল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়।
এই পরিবর্তনের ভূরাজনৈতিক প্রভাব ছিল বিশাল:
- মধ্যপ্রাচ্যের উপর আমেরিকার কৌশলগত নির্ভরতা কমে যায়
- সৌদি আরবের সাথে আমেরিকার সম্পর্কে নতুন গতিশীলতা তৈরি হয়
- রাশিয়ার তেল রাজস্ব চাপে পড়ে
- OPEC-এর একচেটিয়া ক্ষমতা আগের চেয়ে কমে আসে
চীন: নতুন তেলের খেলোয়াড়
চীনের তেল চাহিদা ও কৌশল
চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA)-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে চীন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করেছে। এই বিশাল চাহিদা মেটাতে চীন একটি সুচিন্তিত তেল কূটনীতি পরিচালনা করছে।
চীনের কৌশলের মূল স্তম্ভগুলো হলো:
১. মধ্যপ্রাচ্যে বিনিয়োগ ও সম্পর্ক উন্নয়ন: চীন সৌদি আরব, ইরান, ইরাক সবার সাথেই ভালো সম্পর্ক রাখছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়।
২. পেট্রো-ইউয়ান: চীন চাইছে তেলের বাণিজ্য ডলারের বদলে চীনা ইউয়ানে পরিচালিত হোক। ২০২৩ সালে সৌদি আরবের সাথে ইউয়ানে তেল কেনার কিছু চুক্তি হয়েছে, যা "পেট্রোডলার" ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
৩. আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ায় বিনিয়োগ: চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করছে।
পেট্রোডলার: তেলের পেছনে ডলারের রাজনীতি
তেলের ভূরাজনীতি বুঝতে হলে "পেট্রোডলার" ব্যবস্থা বোঝা জরুরি। ১৯৭৪ সালে আমেরিকা ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি গোপন চুক্তি হয় — সৌদি আরব তেল বেচবে শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে, আর আমেরিকা সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন ডলার বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে তার আধিপত্য ধরে রাখতে পেরেছে। কারণ তেল কিনতে হলে সব দেশকেই ডলার রাখতে হয়, এতে করে ডলারের চাহিদা সবসময় থাকে।
ইরাকের সাদ্দাম হোসেন যখন ২০০০ সালে ইউরোতে তেল বেচার ঘোষণা দেন, এবং লিবিয়ার গাদ্দাফি যখন আফ্রিকান গোল্ড দিনারে তেল বেচার পরিকল্পনা করেন — দুজনকেই কিছুদিনের মধ্যে পতনের মুখে পড়তে হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি: তেলের বাজার ২০২৪-২৫
OPEC+-এর উৎপাদন কাটছাঁট
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে OPEC+ বারবার উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেলের দাম নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখতে। ২০২৩-২৪ সালে OPEC+ প্রতিদিন প্রায় ৩.৬৬ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন কমিয়ে রেখেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ও তেলের বাজার
ইসরায়েল-হামাস সংঘর্ষ এবং লোহিত সাগরে হুতি আক্রমণের ফলে ২০২৩-২৪ সালে সামুদ্রিক তেল পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে যায়, ফলে এই অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতা তেলের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
নবায়নযোগ্য শক্তি: তেলের যুগের শেষ কি আসছে?
শক্তি পরিবর্তনের সংকেত
বিশ্বব্যাপী সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুত বিস্তার তেলের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার উপর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। IEA-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে তারপর কমতে শুরু করবে।
তবে এই পরিবর্তন রাতারাতি হবে না। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এই বাস্তবতা বুঝতে পেরে নিজেদের অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে:
- সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনা তেল-নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে পর্যটন, প্রযুক্তি ও বিনোদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে
- আরব আমিরাত ২০২৩ সালে COP28 আয়োজন করেছে এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিশাল বিনিয়োগ করছে
তবুও তেলের গুরুত্ব কমছে না
শিল্প উৎপাদন, পেট্রোকেমিক্যাল, বিমান চলাচল এবং শিপিং — এই খাতগুলো এখনও তেলের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। নবায়নযোগ্য শক্তি এই জায়গাগুলো দখল করতে আরও কয়েক দশক লাগবে। তাই তেলের ভূরাজনীতি নিকট ভবিষ্যতে বিদায় নিচ্ছে না।
বাংলাদেশ ও তেলের ভূরাজনীতি
বাংলাদেশ একটি তেল আমদানিনির্ভর দেশ। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC)-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৬-৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল আমদানি করে। বৈশ্বিক তেলের দামের ওঠানামার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ভর্তুকি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতির উপর।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশ সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম ৫০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়, যা দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। এটি প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি শুধু দূরের বিষয় নয় — এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ঢাকার বাজার থেকে শুরু করে গ্রামের কৃষকের সেচ পাম্প পর্যন্ত।
উপসংহার
তেল শুধু একটি পণ্য নয় — এটি শক্তির প্রতীক, ক্ষমতার হাতিয়ার এবং ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। গত এক শতাব্দীতে তেলকে ঘিরে যত যুদ্ধ হয়েছে, যত সরকার পড়েছে, যত জোট তৈরি হয়েছে — তার ইতিহাস পড়লে বোঝা যায় এই একটি সম্পদ কতটা গভীরভাবে মানব সভ্যতার গতিপথ নির্ধারণ করেছে।
ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যাত্রা শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই যাত্রা সহজ নয়। তেলের ভূরাজনীতি হয়তো রূপ বদলাবে, কিন্তু শক্তির উপর নিয়ন্ত্রণের লড়াই থামবে না। হয়তো আগামী দিনে তেলের জায়গায় লিথিয়াম, সৌরশক্তি বা হাইড্রোজেন নিয়ে নতুন ভূরাজনীতি তৈরি হবে। কিন্তু মূল সত্যটা বদলাবে না — যে দেশ শক্তির উৎস নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই বিশ্বের মঞ্চে সবচেয়ে শক্তিশালী।









