ভূমিকা
১৮৫৯ সাল। আমেরিকার পেনসিলভানিয়া রাজ্যের টাইটাসভিল শহর। এডউইন ড্রেক নামের একজন সাবেক রেলওয়ে কর্মী মাটির গভীরে ড্রিল করে চলেছেন। আশেপাশের সবাই তাকে পাগল ডাকছে। কিন্তু ২১ অগাস্ট সেই দিন এলো — মাটির ২১ মিটার নিচ থেকে উঠে এলো কালো তরল। মানুষ তখনও বুঝতে পারেনি, এই মুহূর্তটি পৃথিবীর ইতিহাস চিরতরে বদলে দিচ্ছে।
পরের দেড়শ বছরে তেলকে ঘিরে যুদ্ধ হয়েছে, সাম্রাজ্য গড়েছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে। নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয়েছেন, লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। আজও বিশ্বের বড় বড় কূটনৈতিক সমীকরণের পেছনে কাজ করছে এই একটি পদার্থ। এই পর্বে আমরা জানবো — কীভাবে একটি কালো তরল পদার্থ ধাপে ধাপে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠল।
পর্ব - ১
এই পর্বে থাকছে — তেল শিল্পের জন্ম ও স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের উত্থান, দুই বিশ্বযুদ্ধে তেলের ভূমিকা, মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্য, সেভেন সিস্টার্সের যুগ, ইরানের জাতীয়করণ ও CIA অভ্যুত্থান এবং OPEC-এর জন্ম।
তেল শিল্পের জন্ম ও স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের উত্থান
প্রথম তেলকূপ থেকে শিল্পের শুরু
গল্পটা শুরু হয় একটা মোমবাতি কোম্পানি থেকে...
১৮৫০-এর দশকে আমেরিকায় রাতের আলোর জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হতো তিমি মাছের তেল থেকে তৈরি মোমবাতি। কিন্তু সমস্যা ছিল — তিমি শিকার এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তিমি মাছ দুর্লভ হয়ে পড়ছিল। ফলে তিমির তেলের দাম আকাশচুম্বী।
এই সময় পেনসিলভানিয়ার কিছু এলাকায় মানুষ লক্ষ্য করল — মাটির কিছু জায়গায় কালো তৈলাক্ত পদার্থ চুইয়ে বের হয়। স্থানীয়রা এটাকে বলত "rock oil" বা পাথরের তেল। কেউ কেউ এটা ওষুধ হিসেবে বিক্রি করত।
তখন "Seneca Oil Company" নামের একটি ছোট কোম্পানি চিন্তা করল — এই পাথরের তেল যদি পরিমাণে পাওয়া যায়, তাহলে এটা দিয়ে কেরোসিন বানানো যাবে। কেরোসিন দিয়ে বাতি জ্বালানো যায়, তিমির তেলের চেয়ে সস্তায়।
কিন্তু কাকে পাঠাবে মাটি খুঁড়তে? কে যাবে এই "পাগলামির" কাজে?
ড্রেক কীভাবে এলেন?
এডউইন ড্রেক ছিলেন একজন বেকার রেলওয়ে কন্ডাক্টর। অসুস্থতার কারণে চাকরি হারিয়েছিলেন। তেমন অভিজ্ঞতা নেই, টাকাপয়সা নেই, তবে সময় আছে প্রচুর।
Seneca Oil Company-র প্রধান জর্জ বিসেল তাঁকে বললেন — "পেনসিলভানিয়ার টাইটাসভিলে যাও। মাটি খুঁড়ে দেখো তেল পাওয়া যায় কিনা।"
কোম্পানি ড্রেককে একটা চালাকি করে চিঠি পাঠাল — "Colonel Drake" নামে সম্বোধন করে। আসলে তিনি কখনো কর্নেল ছিলেন না। কিন্তু স্থানীয় মানুষ যাতে তাঁকে সম্মান করে এবং জমি ব্যবহার করতে দেয়, তাই এই কৌশল।
কেন সবাই পাগল বলত?
ড্রেক টাইটাসভিলে পৌঁছে বললেন — "আমি মাটির নিচে ড্রিল করে তেল বের করব।"
স্থানীয়রা হাসল। কারণ তখন পর্যন্ত কেউ কখনো মাটি ড্রিল করে তেল বের করার চেষ্টা করেনি। তেল সংগ্রহের একমাত্র পদ্ধতি ছিল মাটির উপর থেকে যেটুকু চুইয়ে বের হয় সেটুকু কুড়িয়ে নেওয়া।
ড্রিল করে তেল বের করার ধারণাটা এতটাই অদ্ভুত ছিল যে যন্ত্রপাতি বানাতে রাজি হওয়া কামারদের খুঁজে পেতেই কষ্ট হলো। যে কাঠমিস্ত্রিকে ড্রিলিং যন্ত্রের কাঠামো বানাতে বলা হয়েছিল, সে কাজ ছেড়ে চলে গেল লোকলজ্জার ভয়ে।
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ড্রেক খুঁড়তে থাকলেন। টাকা ফুরিয়ে গেল। কোম্পানি হাল ছেড়ে দিল। চিঠি পাঠাল — "কাজ বন্ধ করো, ফিরে এসো।"
কিন্তু সেই চিঠি পৌঁছানোর আগেই ১৮৫৯ সালের ২৭ আগস্ট, মাটির মাত্র ২১ মিটার নিচ থেকে উঠে এলো কালো তরল।
তেল জ্বর
এই খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। কয়েক মাসের মধ্যে পেনসিলভানিয়ার পুরো অঞ্চল জুড়ে হাজার হাজার মানুষ তেলকূপ খুঁড়তে শুরু করে। শুরু হয় আমেরিকার প্রথম "তেল জ্বর"। কিন্তু তখনো তেলের প্রধান ব্যবহার ছিল সীমিত — মূলত কেরোসিন তৈরিতে, রাতের বেলা ঘরে আলো জ্বালানোর জন্য। পেট্রোল তখন তেল পরিশোধনের একটি অপ্রয়োজনীয় উপজাত পদার্থ, যা প্রায়ই নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।
পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলায় ১৮৭৬ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে। জার্মান প্রকৌশলী নিকোলাস অটো চারচক্র অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন (Internal Combustion Engine) তৈরি করেন। কার্ল বেঞ্জ ১৮৮৫ সালে পেট্রোলচালিত প্রথম আধুনিক গাড়ি বাজারে আনেন। হঠাৎ করে পেট্রোলের চাহিদা তৈরি হলো — এবং যে পদার্থটি আগে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো, তা হয়ে উঠল সোনার চেয়েও দামি।
এই মুহূর্তটির অপেক্ষাতেই যেন ছিলেন জন ডেভিসন রকফেলার।
পরিস্থিতি বদলায় ১৮৮০-এর দশকে, যখন অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন (internal combustion engine) আবিষ্কার হয়। হঠাৎ করে পেট্রোলের চাহিদা তৈরি হয়। আর এই সুযোগ কাজে লাগান জন ডি রকফেলার।
রকফেলার ও স্ট্যান্ডার্ড অয়েল: ইতিহাসের প্রথম তেল একচেটিয়া
রকফেলার: কে ছিলেন এই মানুষ?
জন ডি রকফেলার ১৮৩৯ সালে নিউইয়র্কের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা — অনেকটা প্রতারকের মতো কাজ করতেন। এই অস্থির পরিবারে বড় হওয়া রকফেলার ছোটবেলা থেকেই শিখেছিলেন — টিকে থাকতে হলে শৃঙ্খলা, হিসাব এবং নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি একটি ছোট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কেরানির কাজ শুরু করেন। ২৩ বছর বয়সে নিজেই একটি পণ্য ব্যবসা খোলেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ হিসাবনিকাশে দক্ষ এবং যেকোনো ব্যবসায়িক সুযোগকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগাতে পারতেন।
১৮৬৩ সালে রকফেলার ক্লিভল্যান্ডে তেল পরিশোধনে বিনিয়োগ করলেন। তখন তেল শিল্পটি ছিল বিশৃঙ্খল — দাম ওঠানামা করত, মান ছিল অনিশ্চিত, প্রতিযোগিতা ছিল লাগামছাড়া। রকফেলার বুঝলেন — যে এই বিশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সে-ই আসল মালিক।
স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের জন্ম ও কৌশল
১৮৭০ সালের ১০ জানুয়ারি রকফেলার ওহাইওতে প্রতিষ্ঠা করলেন "Standard Oil Company"। নামের মধ্যেই তাঁর উদ্দেশ্য স্পষ্ট — একটি মানদণ্ড (standard) প্রতিষ্ঠা করা, বাজারে বিশৃঙ্খলা দূর করা।
কিন্তু তাঁর আসল কৌশল ছিল আরও গভীর ও নিষ্ঠুর। রকফেলার তেল উত্তোলনে আগ্রহী ছিলেন না — তিনি বুঝেছিলেন, তেল তোলা লটারির মতো। কখনো পাবে, কখনো পাবে না। কিন্তু পরিশোধনের ব্যবসা নিশ্চিত — কারণ যে-ই তেল তুলুক না কেন, সেই তেল পরিশোধন করাতে হবে।
তাই রকফেলার সম্পূর্ণ মনোযোগ দিলেন পরিশোধনাগার (refinery) নিয়ন্ত্রণে।
তাঁর কৌশলের তিনটি মূল স্তম্ভ ছিল:
প্রথমত, রেলপথের সাথে গোপন চুক্তি। সেই যুগে তেল পরিবহনের একমাত্র উপায় ছিল রেলগাড়ি। রকফেলার রেলওয়ে কোম্পানিগুলোর সাথে — বিশেষত New York Central, Erie এবং Pennsylvania Railroad-এর সাথে — গোপন চুক্তি করলেন। চুক্তির শর্ত ছিল: স্ট্যান্ডার্ড অয়েল প্রচুর পরিমাণে তেল রেলে পাঠাবে, বিনিময়ে রেলওয়ে কোম্পানি সাধারণ ভাড়ার চেয়ে অনেক কম রেটে — "রিবেট" — দেবে। এমনকি প্রতিযোগীরা যে ভাড়া দেবে, তার একটি অংশও রকফেলারের কাছে ফেরত আসবে।
এই ব্যবস্থার মানে হলো — একজন স্বাধীন তেল পরিশোধক যখন তেল পাঠাবে বেশি ভাড়ায়, তখন সেই বাড়তি ভাড়ার অংশও যাবে রকফেলারের পকেটে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ল।
দ্বিতীয়ত, "একীভূত কর না হয় ধ্বংস করো" নীতি। রকফেলার প্রতিযোগী পরিশোধকদের কাছে দুটো অফার নিয়ে যেতেন। হয় তাঁর কাছে কোম্পানি বিক্রি করো ন্যায্য মূল্যে, নাহয় আমার সাথে প্রতিযোগিতায় ধ্বংস হয়ে যাও। অনেকে স্বেচ্ছায় বিক্রি করেছেন কারণ তারা বুঝতেন — রকফেলারের সাথে লড়াই করে টেকা যাবে না।
তৃতীয়ত, উল্লম্ব একীভূতকরণ (Vertical Integration)। রকফেলার শুধু পরিশোধনাগারেই থামলেন না। তিনি একে একে দখল করলেন পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, ট্যাংকার ওয়াগন, গুদামঘর এবং বিতরণ ব্যবস্থা। ফলে প্রতিযোগী কেউ পরিশোধন করলেও পরিবহন করার পথ পাবে না — কারণ সব পাইপলাইন স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের।
ক্লিভল্যান্ড গণহত্যা: ১৮৭২ সালের কালো অধ্যায়
১৮৭২ সালে রকফেলার এমন একটি কাজ করলেন যা ইতিহাসে "ক্লিভল্যান্ড গণহত্যা" বা "Cleveland Massacre" নামে পরিচিত। মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে তিনি ক্লিভল্যান্ডের ২২টি প্রতিদ্বন্দ্বী পরিশোধনাগারের মধ্যে ২১টি কিনে নেন বা ধ্বংস করেন। যারা বিক্রি করতে রাজি হননি তারা শীঘ্রই আবিষ্কার করলেন তাদের রেল পরিবহনের খরচ হঠাৎ বেড়ে গেছে, কাঁচামাল পাওয়া কঠিন হয়েছে এবং ব্যবসা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই সময় সংবাদপত্রে রকফেলারের বিরুদ্ধে বিস্তর লেখালেখি হয়। কিন্তু তিনি নির্বিকার ছিলেন।
ট্রাস্ট কাঠামো: আইনের ফাঁকে একচেটিয়া
১৮৮২ সালে রকফেলারের আইনজীবী স্যামুয়েল ডড একটি অভূতপূর্ব কাঠামো তৈরি করলেন — "Standard Oil Trust"। বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা ৪০টিরও বেশি আলাদা কোম্পানির শেয়ার একটি কেন্দ্রীয় "ট্রাস্টি বোর্ড"-এর হাতে অর্পণ করা হয়। রকফেলার নিজে ছিলেন প্রধান ট্রাস্টি।
এই কাঠামো আইনিভাবে একটি চতুর ফাঁকির সুযোগ নিয়েছিল। প্রযুক্তিগতভাবে প্রতিটি কোম্পানি আলাদা সত্তা হিসেবে নিবন্ধিত — কিন্তু নিয়ন্ত্রণ একই হাতে। ফলে কোনো একটি রাজ্যের আইনে এই কাঠামো ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ল।
১৮৭০ সালে জন ডি রকফেলার প্রতিষ্ঠা করেন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি। মাত্র এক দশকের মধ্যে তিনি প্রতিযোগীদের একে একে কিনে নেন, চাপে ফেলেন বা ধ্বংস করেন। মার্কিন সরকারের তথ্যমতে, ১৮৮০ সালের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল আমেরিকার মোট তেল পরিশোধনের প্রায় ৯০% নিয়ন্ত্রণ করছিল।
| সাল | স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের মার্কেট শেয়ার |
| ১৮৭০ | ৪% (প্রতিষ্ঠার বছর) |
| ১৮৭৯ | ৯০% (আমেরিকান রিফাইনিং) |
| ১৮৮২ | ট্রাস্ট গঠন, ১৪টি রাজ্যে শাখা |
| ১৯০৪ | ৯১% পেট্রোলিয়াম উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ |
| ১৯১১ | সুপ্রিম কোর্টের আদেশে ৩৪টি কোম্পানিতে বিভক্ত |
আইডা টার্বেল: এক নারী সাংবাদিকের লড়াই
রকফেলারের পতনের গল্পে একজন অপ্রত্যাশিত নায়িকার কথা না বললে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকবে।
আইডা টার্বেল ছিলেন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ছোট তেল উৎপাদক — যিনি রকফেলারের কৌশলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তিগত ক্রোধ ও পেশাদার সততা মিলিয়ে তিনি ১৮৯০-এর দশকে স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের বিরুদ্ধে গভীর তদন্ত শুরু করেন।
১৯০২ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে তিনি "McClure's Magazine"-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করলেন "The History of the Standard Oil Company" — ১৯টি পর্বে। এটি ছিল তেল শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতামূলক কাজ। তিনি দলিল দিয়ে প্রমাণ করলেন রকফেলারের গোপন রেলওয়ে চুক্তি, প্রতিযোগীদের উপর চাপ এবং বাজার কারচুপির বিস্তারিত।
এই লেখাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করল। রকফেলার টার্বেলকে "মিস টার্বেল" বলে তাচ্ছিল্য করতেন। কিন্তু তাঁর লেখা আর থামানো গেল না।
শেরম্যান অ্যান্টিট্রাস্ট আইন ও মামলার সূচনা
স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের কারণে আমেরিকার ব্যবসায়িক জগতে একচেটিয়া সংস্কৃতি এতটাই বিস্তৃত হয়েছিল যে কংগ্রেস ১৮৯০ সালে "Sherman Antitrust Act" পাস করে — আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম একচেটিয়া বিরোধী আইন। কিন্তু প্রথম দশ বছর এই আইনের প্রয়োগ ছিল নামেমাত্র।
পরিবর্তন এলো ১৯০১ সালে, যখন প্রেসিডেন্ট হলেন থিওডোর রুজভেল্ট — ইতিহাসে যিনি "ট্রাস্ট-বাস্টার" নামে পরিচিত। রুজভেল্ট বিশ্বাস করতেন বড় একচেটিয়া কোম্পানিগুলো গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। ১৯০৬ সালে তাঁর প্রশাসন স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের বিরুদ্ধে Sherman Antitrust Act-এর অধীনে মামলা দায়ের করল।
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ও ভাঙন
দীর্ঘ পাঁচ বছরের আইনি লড়াইয়ের পর ১৯১১ সালের ১৫ মে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল — Standard Oil Trust আইনবিরোধী একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান এবং এটিকে ৩৪টি আলাদা কোম্পানিতে ভেঙে দিতে হবে।
রায়টি পড়ে শোনানো হলে রকফেলার গলফ খেলছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি কোনো আবেগ দেখালেন না — শুধু বললেন, "কেনাকাটার ভালো সুযোগ।"
এবং আশ্চর্যজনকভাবে, রকফেলার ঠিকই বলেছিলেন। কোম্পানি ভাগ হওয়ার পর এর শেয়ারের দাম বহুগুণ বেড়ে গেল। কারণ বাজার বুঝল এই ৩৪টি স্বাধীন কোম্পানি একসাথে আগের চেয়ে বেশি মূল্যবান। রকফেলার ছিলেন সব কোম্পানিরই বড় শেয়ারহোল্ডার। ১৯১৬ সালে তিনি আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম বিলিয়নেয়ার হলেন।
ভাঙা কোম্পানিগুলোর উত্তরাধিকার
সেই ৩৪টি কোম্পানি থেকে জন্ম নিয়েছে আজকের তেল জগতের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলো:
| তৎকালীন নাম | বর্তমান পরিচয় |
| Standard Oil of New Jersey | ExxonMobil (অংশ) |
| Standard Oil of New York | ExxonMobil (অংশ) |
| Standard Oil of California | Chevron |
| Standard Oil of Indiana | Amoco → BP |
| Standard Oil of Ohio | BP |
| Atlantic Richfield | ARCO → BP |
| Continental Oil | ConocoPhillips |
এই কোম্পানিগুলো পরবর্তীতে নিজেরাই আন্তর্জাতিক তেল বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। ১৯৫০-এর দশকে এদের মধ্যে সাতটি মিলে "সেভেন সিস্টার্স" নামে পরিচিত হয় এবং বিশ্বের ৮৫% তেল নিয়ন্ত্রণ করে — যা পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
রকফেলার নিজে ১৯৩৭ সালে ৯৭ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর সময় তাঁর সম্পদ ছিল আনুমানিক ৪০০ বিলিয়ন ডলার (আজকের মূল্যমানে) — যা তাঁকে ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন করে রাখে।
একটি কেরানির ছেলে থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী শিল্পপতি — এবং তাঁর তৈরি কাঠামো ভেঙে যাওয়ার পরেও সেই ভাঙা টুকরোগুলোই আজ বিশ্বের শক্তি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
দুই বিশ্বযুদ্ধ: তেল যেদিন সামরিক অস্ত্র হলো
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: তেলের কৌশলগত গুরুত্বের উপলব্ধি
কয়লার যুগ থেকে তেলের যুগে
১৯০০ সালের শুরুতে বিশ্বের সব নৌবাহিনী চলত কয়লায়। কয়লাচালিত জাহাজ ছিল সেই যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক প্রযুক্তি — কিন্তু এর বেশ কিছু মারাত্মক দুর্বলতা ছিল।
কয়লা পোড়ালে কালো ধোঁয়া বের হয়, যা দূর থেকে দেখা যায়। শত্রুপক্ষ আগেভাগে সতর্ক হয়ে যায়। কয়লা ভারী, জায়গাও বেশি নেয়। এক টন কয়লায় যতটা পথ যাওয়া যায়, এক টন তেলে তার তিনগুণ যাওয়া যায়। কয়লার জাহাজ থামিয়ে কয়লা ভরতে অনেক সময় লাগে — তেলে তা অনেক দ্রুত।
এই বাস্তবতা বুঝলেন উইনস্টন চার্চিল। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রথম লর্ড অব দ্য অ্যাডমিরালটি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি একটি সাহসী — অনেকের কাছে পাগলামির মতো — সিদ্ধান্ত নিলেন। পুরো ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে কয়লা থেকে তেলে রূপান্তরিত করতে হবে।
সংসদে এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিয়ে চার্চিল বললেন — "জ্বালানি তেলের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা একটিমাত্র বিষয়ের উপর নির্ভর করে — বৈচিত্র্য এবং শুধুমাত্র বৈচিত্র্যের উপর।"
কিন্তু এখানেই সমস্যা শুরু। ব্রিটেনে নিজের তেল নেই। কয়লার জন্য ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডের খনিই যথেষ্ট। কিন্তু তেলের জন্য নির্ভর করতে হবে বাইরের উপর। এই একটি সিদ্ধান্তের কারণেই তেল হয়ে গেল ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তেলের ভূমিকা
১৯১৪ সালে যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথমবারের মতো সামরিক অভিযানে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হলো মোটরচালিত যান — ট্রাক, ট্যাংক, বিমান। এর সবকিছুই চলে তেলে।
সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত এলো ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বরে। জার্মান বাহিনী প্যারিসের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছিল। ফ্রান্সের সামনে সংকট — মার্নে নদীর কাছে প্রতিরোধ গড়তে হবে, কিন্তু সৈন্য পৌঁছাবে কীভাবে?
প্যারিসের সামরিক গভর্নর জেনারেল গ্যালিয়েনি একটি অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিলেন — শহরের সব ট্যাক্সিক্যাব সামরিক কাজে নিলেন। প্রায় ছয়শো ট্যাক্সি রাতের মধ্যে ছয় হাজার সৈন্য বহন করে মার্নের সম্মুখভাগে পৌঁছে দিল।
এই ঘটনাকে ইতিহাসে বলা হয় "মার্নের ট্যাক্সি মিরাকেল"। প্যারিস বাঁচল। কিন্তু এই ঘটনা একটি গভীর সত্য প্রমাণ করে দিল — আধুনিক যুদ্ধে তেলচালিত যান ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব।
যুদ্ধের শেষে ১৯১৮ সালে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্লেমেন্সো মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনকে একটি জরুরি চিঠি লিখলেন। তাতে লেখা ছিল — "যুদ্ধের এই মুহূর্তে পেট্রোল রক্তের মতোই প্রয়োজনীয়। পেট্রোলের অভাব মানে হার নিশ্চিত।"
আর সেই বিখ্যাত উক্তিটি করলেন পরে — "একটি তেলের ড্রপ হাজার সৈন্যের রক্তের সমান।"
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: তেলই নির্ধারণ করে দিল যুদ্ধের ফলাফল
হিটলারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তেল শুধু সাহায্যকারী ভূমিকায় থাকল না — সরাসরি যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করল।
হিটলারের জার্মানি ছিল সামরিক দিক থেকে অসাধারণ শক্তিশালী — শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলী, সেরা অস্ত্র, অদম্য সৈনিক। কিন্তু একটি মারাত্মক দুর্বলতা ছিল — নিজের কোনো তেল নেই।
যুদ্ধ শুরুর আগে জার্মানির তেলের উৎস ছিল মূলত দুটো। রোমানিয়ার প্লোয়েস্তি তেলক্ষেত্র — মোট চাহিদার প্রায় ৫০%। আর কয়লা থেকে কৃত্রিম তেল তৈরির প্রযুক্তি "সিনথেটিক ফুয়েল" — বাকি ৩৫-৪০%।
কিন্তু যুদ্ধ যত বাড়তে লাগল, ট্যাংক, বিমান, জাহাজ, ট্রাক — সবকিছুর তেলের চাহিদা বাড়তে থাকল। জার্মানি বুঝল — এই চাহিদা রোমানিয়া আর কৃত্রিম তেলে মেটানো সম্ভব হবে না।
অপারেশন ব্লু: বাকুর দিকে ছুটে চলা
১৯৪২ সালের গ্রীষ্মে হিটলার একটি মহাপরিকল্পনা নিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের আজারবাইজানে বাকু তেলক্ষেত্র দখল করতে হবে। বাকু তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৭০% সরবরাহ করত।
এই পরিকল্পনা ছিল দ্বিমুখী। বাকু দখল করলে জার্মানি বিশাল তেলের উৎস পাবে। একইসাথে সোভিয়েত বাহিনী তাদের সবচেয়ে বড় জ্বালানির উৎস হারাবে — তারা ট্যাংক চালাতে পারবে না, বিমান উড়াতে পারবে না।
এই পরিকল্পনার নাম দেওয়া হলো "Case Blue" বা "Fall Blau"। জার্মান বাহিনী দুই ভাগ হলো — একটি দল যাবে স্তালিনগ্রাদ দখল করতে (ভোলগা নদীর নিয়ন্ত্রণ নিতে), অন্য দল যাবে কাকেশাস পর্বতমালা পেরিয়ে বাকুর দিকে।
প্রথমদিকে জার্মান বাহিনী দ্রুত এগোচ্ছিল। কাকেশাসের দিকে যাওয়া দলটি অগাস্ট ১৯৪২-এ এলব্রুস পর্বতের চূড়ায় নাৎসি পতাকা পুঁতে দিল। বাকু আর মাত্র কয়েকশো কিলোমিটার দূরে।
কিন্তু তারপরেই সব বদলে গেল।
স্তালিনগ্রাদ: তেলের জন্য যুদ্ধ যেখানে শেষ হলো
স্তালিনগ্রাদ দখলের দায়িত্ব পেয়েছিল জার্মানির ষষ্ঠ সেনাবাহিনী — ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। কিন্তু সোভিয়েত প্রতিরোধ ছিল অপ্রত্যাশিত রকম তীব্র।
শহরে শহরে, ঘরে ঘরে, এমনকি একটি বাড়ির ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন তলায় জার্মান ও সোভিয়েত সৈনিকরা লড়াই করেছে। এই যুদ্ধে জার্মান সামরিক কৌশলের সবচেয়ে বড় সুবিধা — দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাওয়া — একেবারে অকার্যকর হয়ে পড়ল।
১৯৪২ সালের নভেম্বরে সোভিয়েত বাহিনী পাল্টা আক্রমণ শুরু করল। "অপারেশন ইউরেনাস" নামে পরিচিত এই অভিযানে স্তালিনগ্রাদে আটকে পড়া পুরো জার্মান ষষ্ঠ সেনাবাহিনীকে ঘিরে ফেলা হলো।
১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মান ষষ্ঠ সেনাবাহিনীর ফিল্ড মার্শাল পাউলাস আত্মসমর্পণ করলেন। প্রায় তিন লক্ষ জার্মান সৈনিকের মধ্যে মাত্র ৯১,০০০ জীবিত ধরা পড়ল।
স্তালিনগ্রাদের পরাজয়ের মানে শুধু একটা যুদ্ধ হারা নয় — বাকুর স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে গেল। জার্মানি আর কখনো পূর্বদিকে বড় আক্রমণ করতে পারেনি।
তেলের অভাবে জার্মানির পতন
স্তালিনগ্রাদের পর থেকে জার্মানির তেল সংকট তীব্র হতে লাগল।
১৯৪৪ সালে মিত্র বাহিনীর বিমান হামলা শুরু হলো জার্মানির কৃত্রিম তেল কারখানাগুলোর উপর। "অপারেশন পয়েন্টব্ল্যাংক" নামের এই বিমান হামলায় একের পর এক তেল পরিশোধনাগার ধ্বংস হতে লাগল।
১৯৪৪ সালের শেষ দিকে এবং ১৯৪৫ সালের শুরুতে জার্মান বিমানবাহিনীর পাইলটরা প্রশিক্ষিত ছিলেন, বিমান প্রস্তুত ছিল — কিন্তু মাঠে নামার জ্বালানি ছিল না।
জার্মান সামরিক কর্মকর্তার ডায়েরিতে লেখা ছিল — "আমাদের বিমানগুলো মাটিতে পড়ে আছে জ্বালানির অভাবে। পাইলটরা বসে আছেন, শত্রুর বিমান মাথার উপর ঘুরছে — কিন্তু আমরা উঠতে পারছি না।"
এই তেলসংকটই ছিল জার্মানির চূড়ান্ত পতনের অন্যতম মূল কারণ।
জাপান: তেলের টিকটিকি ফাঁদ
এশিয়ার রণাঙ্গনে তেলের ভূমিকা ছিল আরও সরাসরি এবং আরও নাটকীয়।
জাপান ছিল সম্পূর্ণ তেলনির্ভর কিন্তু নিজের কোনো তেল নেই। ১৯৪০ সালে জাপানের তেলের প্রায় ৮০% আসত আমেরিকা থেকে।
জাপান ১৯৩৭ সাল থেকে চীনে আক্রমণ চালাচ্ছিল। ১৯৪০ সালে নাৎসি জার্মানির সাথে মৈত্রী চুক্তি করল। এই দুটো পদক্ষেপে আমেরিকা ক্ষুব্ধ হলো।
১৯৪১ সালের জুলাইয়ে জাপান ফ্রেঞ্চ ইন্দোচীনায় (বর্তমান ভিয়েতনাম) সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করল। এর জবাবে আমেরিকা একটি মারাত্মক পদক্ষেপ নিল — জাপানে সমস্ত তেল রপ্তানি বন্ধ।
জাপানের সামরিক নেতারা হিসাব কষলেন। হাতে মজুদ তেল আছে মাত্র ১৮ মাসের। তারপর সব থামবে — জাহাজ, বিমান, ট্যাংক — সব।
সামনে দুটো পথ — হয় চীন থেকে সরে আসো এবং আমেরিকার শর্ত মানো, নয়তো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেলক্ষেত্র দখল করো নিজের তেল নিশ্চিত করতে।
প্রথম পথে রাজনৈতিক পতন নিশ্চিত। দ্বিতীয় পথে আমেরিকার সাথে সংঘাত অনিবার্য।
জাপানি সামরিক নেতারা দ্বিতীয় পথ বেছে নিলেন।
পার্ল হারবার: তেলের জন্য যুদ্ধের শুরু
ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) ছিল এশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল। জাপান সেখানে পৌঁছাতে চাইলে মাঝপথে আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবাহিনী বাধা দেবে।
তাই সিদ্ধান্ত হলো — প্রথমে হাওয়াইয়ের পার্ল হারবারে আমেরিকার প্যাসিফিক ফ্লিট ধ্বংস করে দাও। তারপর নিরাপদে দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রা।
১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর। ভোর সাড়ে সাতটায় ৩৫৩টি জাপানি বিমান পার্ল হারবারে আক্রমণ করল। আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ৪টি যুদ্ধজাহাজ ডুবে গেল, ৪টি ক্ষতিগ্রস্ত হলো, ১৮৮টি বিমান ধ্বংস হলো। ২,৪০৩ মার্কিন সেনা নিহত।
এই আক্রমণের মূল কারণ ছিল একটাই — তেল।
যুদ্ধের শেষে শিক্ষা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো ১৯৪৫ সালে। এই যুদ্ধ থেকে সব বড় শক্তি একটি অমোঘ শিক্ষা নিল —
জার্মানি হেরেছে কারণ তেলক্ষেত্র দখল করতে পারেনি। জাপান হেরেছে কারণ তেল সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমেরিকা জিতেছে কারণ তার নিজের বিশাল তেল মজুদ ছিল — টেক্সাস, ওকলাহোমা, ক্যালিফোর্নিয়ার তেলক্ষেত্র থেকে অবিরাম জ্বালানি সরবরাহ পেয়েছে।
বিশ্বের সব বড় শক্তির কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে গেল — তেল নিয়ন্ত্রণ মানেই যুদ্ধ জয়ের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ। তেল নিয়ন্ত্রণ মানেই বৈশ্বিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ।
এই উপলব্ধিই পরবর্তী দশকগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যকে পরিণত করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডে।
| শক্তি | তেলের পরিস্থিতি | যুদ্ধের ফলাফলে প্রভাব |
| আমেরিকা | নিজস্ব বিশাল তেল মজুদ | অসীমিত সামরিক সক্ষমতা |
| ব্রিটেন | মধ্যপ্রাচ্য ও মার্কিন সরবরাহ | সংকটে পড়েনি |
| জার্মানি | কৃত্রিম তেল + রোমানিয়া | ১৯৪৪ থেকে তীব্র ঘাটতি |
| জাপান | সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর | ঘাটতি যুদ্ধের গতি থামিয়ে দেয় |
| সোভিয়েত ইউনিয়ন | বাকু তেলক্ষেত্র রক্ষা পায় | সামরিক সক্ষমতা অটুট থাকে |
মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্য: যেভাবে তেলের মালিকানা কেড়ে নেওয়া হলো
প্রেক্ষাপট: কেন পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্যে এলো?
বিষয়টা বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে।
বিশ শতকের শুরুতে ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা ছিল তার নৌবাহিনী। সেই সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনী ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী — কিন্তু সব জাহাজ চলত কয়লায়। কয়লাচালিত জাহাজের সমস্যা হলো এটি ধীর, বেশি জায়গা নেয় এবং কালো ধোঁয়া দিয়ে শত্রুপক্ষকে আগেভাগে সতর্ক করে দেয়।
তৎকালীন ব্রিটিশ নৌপ্রধান উইনস্টন চার্চিল ১৯১১ সালে সিদ্ধান্ত নিলেন — ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে কয়লা থেকে তেলে রূপান্তরিত করতে হবে। তেলচালিত জাহাজ দ্রুততর, বেশি কার্যকর এবং কম ধোঁয়া তৈরি করে।
কিন্তু এখানেই সমস্যা। ব্রিটেনে নিজের কয়লা প্রচুর ছিল — কিন্তু তেল ছিল না এক ফোঁটাও। কয়লার জন্য বিদেশের উপর নির্ভর করতে হতো না, কিন্তু তেলের জন্য হবে।
চার্চিল পার্লামেন্টে বললেন — "Safety and certainty in oil lie in variety and variety alone." অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে তেল নিশ্চিত করতে হবে।
এই একটি সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ আধিপত্যের গল্প।
উইলিয়াম ডার্সি: এক অস্ট্রেলিয়ান সোনার খনির মালিক যিনি ইতিহাস বদলে দিলেন
উইলিয়াম নক্স ডার্সি ছিলেন একজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে সোনার খনি থেকে বিশাল সম্পদ অর্জন করেছিলেন। ১৯০০ সালে লন্ডনে থাকতেন, আর খুঁজছিলেন নতুন বিনিয়োগের সুযোগ।
ঠিক এই সময় ব্রিটিশ সরকারের একজন এজেন্ট তাঁর কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে এলেন। পারস্যের (বর্তমান ইরান) কিছু এলাকায় মাটির উপর দিয়ে কালো তৈলাক্ত পদার্থ চুইয়ে বের হয়। এটা হয়তো বড় তেলক্ষেত্রের ইঙ্গিত।
ডার্সি রাজি হলেন। কিন্তু তেল খোঁজার আগে একটা জরুরি কাজ ছিল — পারস্যের শাহের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।
শাহকে কীভাবে রাজি করানো হলো
১৯০১ সালে ডার্সি তাঁর প্রতিনিধি আলফ্রেড মেরিওটকে পাঠালেন তেহরানে। শাহ মোজাফফর আদ-দিন শাহ ছিলেন তখন প্রচণ্ড অর্থকষ্টে। দেশের কোষাগার প্রায় শূন্য।
মেরিওট শাহকে অফার করলেন — নগদ ২০,০০০ পাউন্ড এখনই দেওয়া হবে। আরও ২০,০০০ পাউন্ড শেয়ার আকারে। এবং ভবিষ্যতে তেল পাওয়া গেলে মোট মুনাফার ১৬% পাবে পারস্য সরকার।
শাহ সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। তিনি চুক্তিতে সই করলেন কোনো পরামর্শদাতা ছাড়াই, বুঝেও উঠলেন না যে এই চুক্তিতে তাঁর দেশের কতটা ক্ষতি হচ্ছে।
চুক্তির শর্ত ছিল — ডার্সি পারস্যের দক্ষিণাঞ্চল বাদে পুরো দেশে ৬০ বছরের জন্য তেল অনুসন্ধানের একচেটিয়া অধিকার পাবেন।
মাত্র ৪০,০০০ পাউন্ড এবং ১৬% মুনাফার প্রতিশ্রুতিতে পারস্যের বিশাল ভূখণ্ডের তেল সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ চলে গেল একজন বিদেশির হাতে।
সাত বছরের ব্যর্থতা ও শেষ মুহূর্তের আবিষ্কার
খনন শুরু হলো। কিন্তু বছরের পর বছর কিছু পাওয়া গেল না।
পারস্যের গরম মরুভূমিতে কাজ করা ছিল অসহনীয়। তাপমাত্রা গ্রীষ্মে ৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেত। বিচ্ছু আর সাপের ভয়, পানির অভাব, স্থানীয় উপজাতিদের বিরোধিতা — সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
সাত বছর পরে ১৯০৮ সালের শুরুতে ডার্সির টাকা প্রায় শেষ। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন — আর একটা কূপ খোঁড়া হবে, তারপরেও না পাওয়া গেলে সব বন্ধ।
১৯০৮ সালের ২৬ মে মাসজেদ সোলেইমানে সেই শেষ কূপ খোঁড়া হচ্ছিল। মাটির ৩৬০ মিটার নিচে ড্রিল পৌঁছানোর পর হঠাৎ বিকট শব্দ। তেলের বিশাল ফোয়ারা ছুটে বের হলো — ৫০ ফুট উঁচুতে।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম বড় তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলো।
অ্যাংলো-পার্শিয়ান অয়েল কোম্পানির জন্ম
এই আবিষ্কারের পরে ডার্সি একা এই বিশাল সম্পদ সামলাতে পারবেন না বুঝলেন। ১৯০৯ সালে গঠিত হলো "Anglo-Persian Oil Company" বা APOC।
কিন্তু তখনো এটি একটি বেসরকারি কোম্পানি। পরিবর্তন এলো ১৯১৪ সালে।
চার্চিল বুঝলেন — এই কোম্পানিটা শুধু ব্যবসায়িক মুনাফার জন্য রাখলে হবে না। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সরকারকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।
১৯১৪ সালের জুন মাসে — প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে — ব্রিটিশ সরকার APOC-এর ৫১% শেয়ার কিনে নিল। মূল্য ছিল ২.২ মিলিয়ন পাউন্ড।
এখন থেকে পারস্যের তেল কার্যত ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
চুক্তির আসল হিসাব: পারস্য কতটুকু পেল?
এই চুক্তির শর্তগুলো ছিল অবিশ্বাস্যরকম একতরফা। পারস্য সরকার পেত মোট মুনাফার মাত্র ১৬%। কিন্তু এই ১৬% হিসাব করা হতো APOC-এর ঘোষিত মুনাফার উপর — কোম্পানি নিজেই মুনাফা কত দেখাবে সেটা নির্ধারণ করত।
ব্রিটিশ সরকারকে যে ট্যাক্স দেওয়া হতো সেটা মুনাফার হিসাব থেকে বাদ যেত। বিভিন্ন অপারেশনাল খরচের নামে মুনাফা কমিয়ে দেখানো হতো। পারস্যের কোনো নিরীক্ষকের হিসাব যাচাই করার সুযোগ ছিল না।
ফলে বছরের পর বছর ধরে পারস্য পেত সামান্য কিছু, আর বিশাল মুনাফা চলে যেত লন্ডনে।
একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। ১৯৪৯ সালে APOC ইরানকে দিয়েছিল মাত্র ১৩ মিলিয়ন পাউন্ড মুনাফার ভাগ হিসেবে। একই বছর ব্রিটিশ সরকার শুধু কর বাবদ পেয়েছিল ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড। অর্থাৎ ইরানের নিজের মাটির তেল থেকে ব্রিটিশ সরকার একা পেয়েছে ইরানের চার গুণ।
এই অপমানজনক বাস্তবতাই পরে মোসাদ্দেগের জাতীয়করণ আন্দোলনের মূল জ্বালানি হয়েছিল।
সৌদি আরবে আমেরিকার প্রবেশ: একটি ভিন্ন কৌশল
ব্রিটেন যেভাবে পারস্যে ঢুকেছিল — সরাসরি কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করে — আমেরিকার কৌশল ছিল একটু আলাদা।
১৯৩২ সালে বাহরাইনে তেল পাওয়া গেল। বিশেষজ্ঞরা বললেন — পাশের সৌদি আরবেও থাকতে পারে।
কিন্তু সৌদি আরবের রাজা ইবনে সউদ ছিলেন সতর্ক মানুষ। ব্রিটেনের সাথে তাঁর সম্পর্ক ভালো ছিল না — ব্রিটেন আরব উপদ্বীপে তাদের নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল। তাই তিনি আমেরিকানদের সুযোগ দিলেন, ব্রিটিশদের নয়।
১৯৩৩ সালে Standard Oil of California বা SoCal সৌদি আরবে তেল অনুসন্ধানের অধিকার পেল। শর্ত ছিল সামান্য — ৫০,০০০ ডলার সোনায় এবং আরও কিছু ঋণ।
১৯৩৮ সালের মার্চে দাহরানে পাওয়া গেল বিশাল তেলক্ষেত্র। পরে আরও বড় মজুদ আবিষ্কৃত হলো। পরবর্তীতে একাধিক আমেরিকান কোম্পানি যুক্ত হয়ে গড়ে উঠল "Arabian American Oil Company" বা Aramco।
রুজভেল্ট-ইবনে সউদ বৈঠক: আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য নীতির ভিত্তি
১৯৪৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ইয়াল্টায় স্তালিন ও চার্চিলের সাথে বৈঠক শেষ করে ফেরার পথে সুয়েজ খালের কাছে USS Quincy নামের যুদ্ধজাহাজে অপেক্ষা করছেন।
অপর একটি জাহাজে এলেন সৌদি রাজা আবদুল আজিজ ইবনে সউদ — তাঁর সাথে রাঁধুনি, দেহরক্ষী, দরবারের লোকজন মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশজনের বিশাল দল। রাজা কখনো জাহাজে চড়েননি আগে, সমুদ্রে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শূন্য।
রুজভেল্ট নিজে তখন গুরুতর অসুস্থ — মাত্র দুই মাস পরে তিনি মারা যাবেন। কিন্তু এই বৈঠক তাঁর কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে অসুস্থ শরীরে জাহাজে বসেই আলোচনা করলেন।
বৈঠকে সরাসরি কোনো চুক্তি সই হয়নি। কিন্তু দুই নেতার মধ্যে একটি অলিখিত বোঝাপড়া তৈরি হলো, যার মূল কথা ছিল দুটি —
আমেরিকা সৌদি রাজপরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, বাইরের যেকোনো হুমকি থেকে রক্ষা করবে। বিনিময়ে সৌদি আরবের তেল শিল্পে আমেরিকার কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।
এই একটি বৈঠক থেকে জন্ম নিল আধুনিক মার্কিন-সৌদি সম্পর্কের ভিত্তি — যা আজ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে।
পশ্চিমা আধিপত্যের আসল চিত্র
এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি প্যাটার্ন স্পষ্ট। ব্রিটেন এবং আমেরিকা দুটো আলাদা পদ্ধতিতে একই কাজ করেছে।
ব্রিটেন পারস্যে ঢুকেছিল দুর্বল শাহকে সামান্য টাকা দিয়ে বিশাল ছাড় আদায় করে। তারপর সরকারিভাবে কোম্পানির মালিক হয়ে সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
আমেরিকা সৌদি আরবে ঢুকেছিল বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে, কিন্তু পেছনে ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। সৌদি রাজপরিবারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার গ্যারান্টি দিয়ে তেলের নিশ্চিত সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।
দুই ক্ষেত্রেই যে দেশের মাটির নিচে তেল ছিল, সেই দেশের মানুষ পেয়েছে সবচেয়ে কম। এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই পরবর্তীতে জন্ম নিয়েছে ইরানের জাতীয়করণ আন্দোলন, OPEC এবং আরও অনেক ঘটনা — যা তেলের ইতিহাসের পরের অধ্যায় তৈরি করেছে।
| দেশ | তেলের রাজস্বের যে ভাগ পেত | পশ্চিমা কোম্পানির ভাগ |
| ইরান (১৯৫০ পর্যন্ত) | ১৬% | ৮৪% |
| সৌদি আরব (১৯৫০ পর্যন্ত) | ২০% | ৮০% |
| ইরাক (১৯৫০ পর্যন্ত) | ২০% | ৮০% |
| সৌদি আরব (১৯৫০ পরে, নতুন চুক্তি) | ৫০% | ৫০% |
সেভেন সিস্টার্স: যে সাত কোম্পানি বিশ্বের তেল চালাত
১৯৫০-এর দশকে বিশ্বের তেল শিল্প নিয়ন্ত্রণ করত মাত্র সাতটি পশ্চিমা কোম্পানি, যাদের একসাথে বলা হত "সেভেন সিস্টার্স।" ইতালীয় তেল কর্মকর্তা এনরিকো মাত্তেই এই নামটি দিয়েছিলেন তাচ্ছিল্যের সাথে।
এই সাতটি কোম্পানি মিলে ১৯৫০-এর দশকে বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৮৫% নিয়ন্ত্রণ করত — ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এনার্জি কমিটির ঐতিহাসিক নথি থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়। এই কোম্পানিগুলো শুধু তেল উত্তোলনই করত না, তারা তেলের দামও নিজেরাই নির্ধারণ করত — উৎপাদনকারী দেশগুলোর সাথে কোনো পরামর্শ ছাড়াই।
| কোম্পানির নাম | দেশ | বর্তমান পরিচয় |
| Standard Oil of New Jersey | আমেরিকা | ExxonMobil |
| Royal Dutch Shell | নেদারল্যান্ড/ব্রিটেন | Shell |
| Anglo-Iranian Oil Company | ব্রিটেন | BP |
| Standard Oil of California | আমেরিকা | Chevron |
| Gulf Oil | আমেরিকা | Chevron-এ একীভূত |
| Texaco | আমেরিকা | Chevron-এ একীভূত |
| Standard Oil of New York | আমেরিকা | ExxonMobil |
এই ব্যবস্থার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের নিজেদের সম্পদ থেকে ন্যায্য মুনাফা পাচ্ছিল না। সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নিয়েছিল তেলের জাতীয়করণ আন্দোলন।
মোসাদ্দেগ ও CIA অভ্যুত্থান: তেলের ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায়
মোসাদ্দেগ কে ছিলেন?
মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে তিনি কোথা থেকে এসেছিলেন।
মোসাদ্দেগ জন্মেছিলেন ১৮৮২ সালে ইরানের একটি অভিজাত পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। সুইজারল্যান্ডের নেউশাটেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডক্টরেট করেছিলেন — মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের মধ্যে তখন এটা ছিল অত্যন্ত বিরল।
তিনি রাজনীতিতে এলেন ১৯২০-এর দশকে। তখন থেকেই তাঁর একটাই লক্ষ্য — ইরানকে বিদেশি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা। তিনি বিশ্বাস করতেন গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনই পারে ইরানকে একটি মর্যাদাশীল স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে।
কিন্তু তাঁর পথ ছিল কঠিন। শাহ এবং পশ্চিমা শক্তি কেউই চাইত না ইরান সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হোক।
যে বঞ্চনা মোসাদ্দেগকে তৈরি করেছিল
১৯৫১ সালে মোসাদ্দেগ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই ইরানে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বছরের পর বছর ধরে।
অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি বা AIOC ইরানের তেলক্ষেত্রে কাজ করছিল ১৯০৮ সাল থেকে। কিন্তু ইরানের শ্রমিকরা কাজ করতেন তৃতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে। AIOC-এর আবাসিক এলাকায় ইরানিদের প্রবেশ নিষেধ ছিল — ঠিক যেন ঔপনিবেশিক আফ্রিকার মতো। ব্রিটিশ কর্মীরা পাকা বাড়িতে থাকতেন, ইরানি শ্রমিকরা ঝুপড়িতে।
আর তেলের মুনাফার হিসাব ছিল চরম বৈষম্যমূলক। ১৯৪৯ সালে AIOC মোট মুনাফা করেছিল ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ড। ইরান পেয়েছিল মাত্র ১৩ মিলিয়ন পাউন্ড। একই বছর ব্রিটিশ সরকার শুধু ট্যাক্স বাবদ পেয়েছিল ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড — ইরানের চেয়ে চার গুণ।
এই বাস্তবতা ইরানের শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছিল। মোসাদ্দেগ ছিলেন সেই ক্ষোভের মুখপাত্র।
মোসাদ্দেগের উত্থান ও জাতীয়করণের ঘোষণা
১৯৫১ সালের মার্চে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আলী রাজমারাকে একজন ধর্মান্ধ আততায়ী হত্যা করল। এই পরিস্থিতিতে পার্লামেন্ট মোসাদ্দেগকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করল।
মোসাদ্দেগ দায়িত্ব নিয়েই একটি শর্ত দিলেন — তেল জাতীয়করণ করতে হবে, নাহলে তিনি দায়িত্ব নেবেন না।
১৯৫১ সালের ১৫ মার্চ ইরানের পার্লামেন্ট — মজলিশ — AIOC জাতীয়করণের পক্ষে ভোট দিল। ২৮ এপ্রিল মোসাদ্দেগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হলেন।
১ মে ১৯৫১ — ইরানের ইতিহাসে স্মরণীয় একটি দিন। সরকারিভাবে ঘোষণা হলো অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি এখন থেকে "National Iranian Oil Company" বা NIOC।
সারা ইরানে উৎসব শুরু হলো। মানুষ রাস্তায় নামল। মোসাদ্দেগ রাতারাতি জাতীয় বীর হয়ে উঠলেন — কেবল ইরানে নয়, সারা মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায়।
কিন্তু লন্ডন ও ওয়াশিংটনে শুরু হলো গোপন পরিকল্পনা।
ব্রিটেনের প্রথম প্রতিক্রিয়া: অবরোধ
ব্রিটেন প্রথমে কূটনৈতিক পথে চেষ্টা করল। আলোচনার প্রস্তাব দিল। কিন্তু মোসাদ্দেগের দাবি ছিল স্পষ্ট — জাতীয়করণ চূড়ান্ত, শুধু ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ব্রিটেন রাজি হলো না। তারা বেছে নিল অর্থনৈতিক চাপের পথ।
ব্রিটিশ নৌবাহিনী ইরানের তেলবাহী ট্যাংকার আটকে দিল। অন্য দেশগুলোকে চাপ দেওয়া হলো ইরানের জাতীয়করণ করা তেল না কিনতে — কারণ সেই তেল কিনলে তারাও আন্তর্জাতিক আইনি ঝামেলায় পড়বে। AIOC-এর ব্রিটিশ প্রযুক্তিবিদরা ইরান ছেড়ে চলে গেল — তেলক্ষেত্র চালানোর জানাশোনা ইরানিদের ছিল না।
ইরানের অর্থনীতি দ্রুত চাপে পড়তে লাগল। তেল বিক্রি করতে না পারায় সরকারি কোষাগার শূন্য হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মোসাদ্দেগ পিছু হটলেন না।
১৯৫২ সালে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গেলেন। এবং জিতলেন — আদালত রায় দিল ব্রিটেনের এই বিষয়ে এখতিয়ার নেই।
ব্রিটেন বুঝল — আইনি পথে কাজ হবে না। এবার অন্য পথ।
আমেরিকাকে রাজি করানো
ব্রিটেন আমেরিকার কাছে গেল সাহায্য চাইতে। কিন্তু শুরুতে আমেরিকা রাজি ছিল না।
প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান মনে করতেন মোসাদ্দেগ হয়তো একটু বেশি জাতীয়তাবাদী, কিন্তু তিনি একজন গণতান্ত্রিক নেতা। তাঁকে উৎখাত করলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পরিবর্তন এলো ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে, যখন আইজেনহাওয়ার প্রেসিডেন্ট হলেন। নতুন প্রশাসন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক।
ব্রিটেন এবার নতুন যুক্তি দিল। তারা বলল — মোসাদ্দেগ যদি টিকে থাকেন, ইরানে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসবে। তুদেহ পার্টি (ইরানের কমিউনিস্ট পার্টি) শক্তিশালী হচ্ছে। ইরান সোভিয়েত প্রভাবে চলে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল সোভিয়েতের হাতে যাবে।
শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই যুক্তি কাজ করল। CIA-র নতুন পরিচালক অ্যালেন ডালেস এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস — দুই ভাই — আইজেনহাওয়ারকে রাজি করালেন।
অপারেশন আজাক্স: গণতন্ত্র হত্যার পরিকল্পনা
১৯৫৩ সালের গ্রীষ্মে CIA এবং MI6 যৌথভাবে শুরু করল "অপারেশন আজাক্স" — আমেরিকায় এই নামে, ব্রিটেনে "অপারেশন বুট" নামে।
পরিকল্পনার মূল স্থপতি ছিলেন CIA কর্মকর্তা কার্মিট রুজভেল্ট জুনিয়র — প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের নাতি। তিনি ছদ্মবেশে তেহরানে প্রবেশ করলেন।
অভিযানের কৌশল ছিল বহুমাত্রিক।
প্রথমে শুরু হলো মিথ্যা প্রচারণা। ইরানের পত্রিকাগুলোতে টাকা দিয়ে মোসাদ্দেগের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ ছাপানো হলো। তাঁকে কমিউনিস্ট, ইসলামবিরোধী, দেশদ্রোহী বলে প্রচার করা হলো।
এরপর শুরু হলো ভাড়াটে দাঙ্গা। CIA টাকা দিয়ে গুণ্ডা ভাড়া করল। এই লোকগুলো তেহরানের রাস্তায় নেমে মোসাদ্দেগের সমর্থকদের উপর হামলা করল, মসজিদে ভাঙচুর করল এবং দাবি করল এটা মোসাদ্দেগের সমর্থকরাই করছে।
শহরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলো। মানুষ ভয় পাচ্ছে। কেউ বুঝতে পারছে না কে কী করছে।
এরপর এলো সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে বিভেদ তৈরির কাজ। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের টাকা দেওয়া হলো মোসাদ্দেগের বিরুদ্ধে যেতে।
১৯ আগস্ট ১৯৫৩: সেই কালো রাত
১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট ভোরবেলা। তেহরানের রাস্তায় সামরিক ট্যাংক নামল। বিশ্বস্ত জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদির নেতৃত্বে সৈন্যরা এগোল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে।
মোসাদ্দেগ বুঝলেন কী হচ্ছে। তিনি বাড়ির পেছনের দেওয়াল টপকে পালালেন। পরদিন আত্মসমর্পণ করলেন। গ্রেফতার হলেন।
বিচার হলো সামরিক আদালতে। অভিযোগ — রাষ্ট্রদ্রোহ। তাঁর আইনজীবীরা বলার চেষ্টা করলেন যে এটা অবৈধ অভ্যুত্থান। কিন্তু আদালত শুনল না।
মোসাদ্দেগকে তিন বছর কারাদণ্ড দেওয়া হলো। তারপর বাকি জীবন গৃহবন্দিত্ব। আহমাদাবাদের নিজের গ্রামের বাড়িতে বন্দী থাকলেন ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত। ৮৪ বছর বয়সে সেখানেই মারা গেলেন। কখনো মুক্তি পাননি।
তাঁর শেষ কথাগুলোর মধ্যে একটি ছিল — "আমার অপরাধ ছিল শুধু এটুকু যে আমি আমার দেশের তেল আমার দেশের মানুষের জন্য চেয়েছিলাম।"
অভ্যুত্থানের পরে: দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি
শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী ক্ষমতায় ফিরে আসলেন। ইরানের তেল আবার পশ্চিমাদের হাতে গেল — এবার শুধু ব্রিটেন নয়, আমেরিকাও অংশ পেল।
নতুন চুক্তিতে ইরান পেল মুনাফার ৫০%। কিন্তু এবার সত্যিকার অর্থে কোনো গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ রইল না।
শাহ ক্ষমতা সুদৃঢ় করলেন তাঁর গোপন পুলিশ SAVAK-এর মাধ্যমে। বিরোধীদের জেলে ভরা হলো, নির্যাতন করা হলো। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ১৯৭৬ সালে রিপোর্ট দিল — ইরানে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক বন্দী আছে।
এই দীর্ঘ দমন-নিপীড়নের প্রতিক্রিয়া জমতে জমতে বিস্ফোরিত হলো ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে। আয়াতুল্লাহ খোমেইনির নেতৃত্বে শাহের পতন হলো। কিন্তু এই বিপ্লব থেকে জন্ম নিল আমেরিকা-ইরানের যে শত্রুতা — তা আজও মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার কারণ।
একটি CIA অভ্যুত্থানের মূল্য দিতে হলো সত্তর বছর ধরে, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন দিয়ে।
২০১৩ সালের স্বীকারোক্তি
দীর্ঘ ৬০ বছর পর ২০১৩ সালে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এবং CIA আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করল — হ্যাঁ, ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান তারাই পরিচালনা করেছিল।
গোপন নথিতে লেখা ছিল — "এটি ছিল CIA-র প্রথম সফল বিদেশি সরকার উৎখাত অভিযান।"
"সফল" শব্দটি তারা ব্যবহার করেছে। কিন্তু কার জন্য সফল?
ইরানের জনগণের জন্য এই "সাফল্য" মানে ছিল — তাদের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা কারাগারে, তাদের তেলের আয় বিদেশিদের পকেটে, তাদের দেশ একনায়কের শাসনে।
এই একটি ঘটনা থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের মনে গেঁথে গেল একটি বিশ্বাস — পশ্চিমারা গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু যখন গণতন্ত্র তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখন তারা সেই গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে।
এই অবিশ্বাসের ছায়া আজও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি কোণে অনুভূত হয়।
তেল সম্পদের বণ্টন: উৎপাদনকারী দেশগুলোর বঞ্চনা
১৯৫০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর প্রাপ্তির হিসাবটা দেখলে বোঝা যায় কেন তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
ইরান ১৯৫০ পর্যন্ত তেলের রাজস্বের মাত্র ১৬% পেত, বাকি ৮৪% পশ্চিমা কোম্পানির কাছে যেত। সৌদি আরব ও ইরাক পেত ২০%।
১৯৫০ সালে সৌদি আরব আমেরিকার সাথে "৫০-৫০" ভাগের চুক্তি করতে সফল হয়। এই চুক্তি দেখে অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যেও একই দাবি তোলার সাহস জন্মায়। ইরানের মোসাদ্দেগ এর চেয়ে এগিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ জাতীয়করণের দাবি করেন — এবং সেই কারণেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
OPEC-এর জন্ম: পাল্টা শক্তির উত্থান
OPEC-এর জন্ম: পাল্টা শক্তির উত্থান
পটভূমি: কেন OPEC দরকার হয়েছিল?
১৯৫০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো ছিল একেবারে অসহায়। তাদের মাটির নিচের তেল বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু কতটুকু উৎপাদন হবে, কোন দামে বিক্রি হবে — এসব সিদ্ধান্ত নিত পশ্চিমা কোম্পানিগুলো নিজেরাই। উৎপাদনকারী দেশকে জিজ্ঞেসও করা হতো না।
এই ব্যবস্থার নাম ছিল "পোস্টেড প্রাইস" সিস্টেম। পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলো — সেভেন সিস্টার্স — নিজেরা বসে তেলের দাম নির্ধারণ করত। সেই দামের উপর ভিত্তি করে উৎপাদনকারী দেশ রয়্যালটি পেত। দাম কমালে দেশের আয় কমে যেত — কিন্তু প্রতিবাদ করার কোনো প্ল্যাটফর্ম ছিল না।
দেশগুলো একে অপরের সাথে কথাও বলত না। প্রতিটি দেশ আলাদাভাবে আলোচনা করত পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সাথে — এবং প্রতিবারই কোম্পানিগুলো সুবিধা নিত এই বিভক্ততার।
এই পরিস্থিতিতে দুজন মানুষ ঠিক করলেন — এভাবে আর চলবে না।
দুই স্বপ্নদ্রষ্টা: আল-তারিকি ও পেরেজ আলফোন্সো
আব্দুল্লাহ আল-তারিকি ছিলেন সৌদি আরবের তেলমন্ত্রী। তাঁর ডাকনাম ছিল "রেড শেখ" — কারণ তিনি পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিতেন।
আল-তারিকি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলেন। আমেরিকায় পড়তে গিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন আমেরিকার তেল শিল্প কীভাবে কাজ করে — সরকার কীভাবে নিজের স্বার্থ রক্ষা করে। ফিরে এসে তিনি ভাবলেন — সৌদি আরব কেন পারবে না?
হুয়ান পাবলো পেরেজ আলফোন্সো ছিলেন ভেনেজুয়েলার তেলমন্ত্রী। তিনি ছিলেন একজন আইনজীবী এবং গভীর পরিবেশবাদী — অনেকটা তাঁর সময়ের আগে জন্মানো মানুষ। তিনি তেলকে বলতেন "শয়তানের মলমূত্র" — কারণ তিনি দেখেছিলেন তেল ভেনেজুয়েলাকে সমৃদ্ধ করার বদলে দুর্নীতিতে ডুবিয়েছে।
কিন্তু তিনি বুঝতেন — সংগঠিত না হলে উৎপাদনকারী দেশগুলো সবসময় ঠকবে।
১৯৫৯ সালে কায়রোতে একটি আরব পেট্রোলিয়াম সম্মেলনে এই দুজনের দেখা হলো। দুজনেই বুঝলেন তাদের লক্ষ্য এক। গোপনে বসলেন। পরিকল্পনা করলেন — উৎপাদনকারী দেশগুলোকে একসাথে আনতে হবে।
শেষ ঠেলা: ১৯৫৯ ও ১৯৬০ সালের দাম কাটছাঁট
১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে BP একতরফাভাবে তেলের পোস্টেড প্রাইস ব্যারেল প্রতি ১৮ সেন্ট কমিয়ে দিল। কোনো আলোচনা নেই, কোনো পূর্বসতর্কতা নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রতিবাদ করল। কিন্তু কে শুনবে? প্রতিটি দেশ আলাদাভাবে চিৎকার করছে — কেউ পাত্তা দিচ্ছে না।
এর ঠিক এক বছর পর ১৯৬০ সালের আগস্টে আরও বড় ধাক্কা। এবার Standard Oil of New Jersey — পরবর্তীতে Exxon — তেলের পোস্টেড প্রাইস আবার কমাল, এবারও ব্যারেল প্রতি ১০ সেন্ট।
মাত্র দুই বছরে তেলের দাম কমল ২৮ সেন্ট। শুনতে সামান্য মনে হলেও উৎপাদনকারী দেশগুলোর মোট বার্ষিক রাজস্বে এর প্রভাব ছিল কোটি কোটি ডলার।
সৌদি তেলমন্ত্রী আল-তারিকি রাগে ফেটে পড়লেন। বললেন — "তারা আমাদের কোনো নোটিশও দেয়নি। যেন আমরা তাদের কর্মচারী।"
আল-তারিকি ইরাকের তেলমন্ত্রী আব্দুল করিম কাসেমকে ফোন করলেন। বললেন — এখনই বাগদাদে একটি জরুরি সম্মেলন ডাকুন।
বাগদাদ সম্মেলন: ১০-১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬০
১৯৬০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বাগদাদে পাঁচটি দেশের প্রতিনিধিরা বসলেন একটি গোপন সম্মেলনে। পশ্চিমা মিডিয়া বা তেল কোম্পানিগুলোকে কিছু জানানো হয়নি।
প্রতিনিধিরা ছিলেন — সৌদি আরব থেকে আব্দুল্লাহ আল-তারিকি। ভেনেজুয়েলা থেকে হুয়ান পেরেজ আলফোন্সো। ইরাক থেকে তেলমন্ত্রী। ইরান থেকে ফুয়াদ রুহানি। কুয়েত থেকে আব্দুল্লাহ আল-রিমি।
চার দিন ধরে আলোচনা হলো। মূল প্রশ্ন ছিল — আমরা একসাথে কী করতে পারি?
পেরেজ আলফোন্সো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন — "আমেরিকার টেক্সাসে একটি সংস্থা আছে, Texas Railroad Commission, যেটা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে দাম স্থিতিশীল রাখে। আমাদেরও এই ধরনের একটি সংস্থা দরকার — কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে।"
আল-তারিকি যোগ করলেন — "দাম যদি আমাদের না জানিয়ে কমানো হয়, তাহলে আমরাও একসাথে উৎপাদন কমাব। তখন দেখা যাবে কে কাকে বেশি প্রয়োজন।"
১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ — চার দিনের আলোচনা শেষে যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হলো। জন্ম নিল OPEC — Organization of the Petroleum Exporting Countries।
OPEC-এর প্রথম সদস্য ও লক্ষ্য
প্রতিষ্ঠাতা পাঁচ সদস্য ছিল সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত ও ভেনেজুয়েলা।
OPEC-এর গঠনতন্ত্রে তিনটি মূল উদ্দেশ্য লেখা হলো।
প্রথমত, সদস্য দেশগুলোর তেল নীতি সমন্বয় ও একীভূত করা — যাতে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় না পড়তে হয়।
দ্বিতীয়ত, তেলের মূল্য স্থিতিশীল রাখা — পশ্চিমা কোম্পানিগুলো যাতে একতরফাভাবে দাম না কমাতে পারে।
তৃতীয়ত, উৎপাদনকারী দেশগুলোর ন্যায্য ও স্থায়ী আয় নিশ্চিত করা — তাদের নিজের সম্পদ থেকে ন্যায্য ভাগ পাওয়ার অধিকার।
সদর দপ্তর স্থাপিত হলো প্রথমে জেনেভায়, পরে ১৯৬৫ সালে ভিয়েনায়।
পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া: উপেক্ষা ও তাচ্ছিল্য
OPEC গঠনের খবর পেয়ে পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলো ও সরকারগুলো কী করল? তারা হাসল।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের একজন সাংবাদিক লিখলেন — "উন্নয়নশীল দেশগুলোর এই জোট বেশিদিন টিকবে না। তাদের মধ্যে স্বার্থের বিরোধ বেশি।"
একজন আমেরিকান তেল কর্মকর্তা বললেন — "এটা একটা টকশো, আর কিছু না।"
তেল কোম্পানিগুলো OPEC-কে সরকারি আলোচনায় অংশীদার হিসেবে স্বীকারই করল না। তারা আগের মতোই নিজেদের মধ্যে দাম ঠিক করতে থাকল।
এই উপেক্ষাটা ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
OPEC-এর প্রথম দশক: ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয়
১৯৬০-এর দশকে OPEC এখনো দুর্বল। সদস্য দেশগুলোর নিজেদের তেল খাত পরিচালনার প্রযুক্তি ও দক্ষতা নেই। পশ্চিমা কোম্পানিগুলো ছাড়া তেল তুলতেও পারবে না।
কিন্তু এই সময়ে OPEC একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করল — সদস্য দেশগুলো একে অপরের কাছ থেকে শিখতে লাগল। কোন দেশ পশ্চিমা কোম্পানির সাথে কী শর্তে চুক্তি করেছে, কীভাবে তেলের হিসাব পরীক্ষা করতে হয়, কীভাবে আইনি লড়াই লড়তে হয় — এই জ্ঞান ভাগাভাগি হলো।
১৯৬৮ সালে OPEC একটি ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র প্রকাশ করল — "Declaratory Statement of Petroleum Policy in Member Countries"। এতে বলা হলো — প্রতিটি দেশের নিজের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে। বিদেশি কোম্পানি শুধু অতিথি, মালিক নয়।
এই ঘোষণাপত্র ছিল আগামী দশকের বিপ্লবের মঞ্চ প্রস্তুতি।
OPEC-এর বিস্তার ও শক্তি সঞ্চয়
১৯৬০-এর দশকের শেষ দিক থেকে OPEC-এ একের পর এক নতুন দেশ যোগ দিতে লাগল।
| সাল | নতুন সদস্য |
| ১৯৬১ | কাতার |
| ১৯৬২ | লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া |
| ১৯৬৭ | আবু ধাবি (পরে UAE) |
| ১৯৬৯ | আলজেরিয়া |
| ১৯৭১ | নাইজেরিয়া, ইকুয়েটরিয়াল গিনি |
| ১৯৭৩ | ইকুয়েডর, গ্যাবন |
| সাল | সদস্য দেশ | বৈশ্বিক তেল উৎপাদনে অংশ |
| ১৯৬০ | ৫টি | ~৪০% |
| ১৯৭৩ | ১৩টি | ~৫৫% |
| ১৯৮০ | ১৩টি | ~৬৭% |
| ২০২৩ | ১৩টি | ~৩৮% (OPEC+ মিলে ~৫৭%) |
১৯৭৩ সাল নাগাদ OPEC-এর সদস্যরা বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৫৫% নিয়ন্ত্রণ করছিল।
কিন্তু সংখ্যা বাড়লেই শক্তি আসে না। আসল পরীক্ষা আসবে সেদিন যেদিন OPEC সত্যিকার অর্থে বলবে — না।
সেই দিনটি এলো ১৯৭৩ সালে। সেই গল্প পরের অধ্যায়ে।
OPEC-এর জন্মের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
OPEC গঠনের সময় পেরেজ আলফোন্সো একটি কথা বলেছিলেন যা পরে ইতিহাসে বারবার উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি বলেছিলেন — "আমরা বসে আছি সোনার উপর, কিন্তু পাচ্ছি কপার দাম। এটা আর চলবে না।"
OPEC শুধু একটি সংগঠন ছিল না। এটি ছিল একটি ধারণার জন্ম — উন্নয়নশীল দেশগুলো সংগঠিত হলে পশ্চিমা শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
এই ধারণা পরবর্তীতে অনুপ্রাণিত করেছে G77 গঠনকে, জাতিসংঘে নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দাবিকে এবং দক্ষিণের দেশগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠস্বরকে।
একটি সম্মেলন, পাঁচটি দেশ, চার দিনের আলোচনা — এবং বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য চিরতরে একটু বদলে গেল।
পশ্চিমা সরকার ও কোম্পানিগুলো প্রথমে OPEC-কে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তারা মনে করেছিল এটি বেশিদিন টিকবে না। কিন্তু পরবর্তী দশকগুলো প্রমাণ করে — এই অনুমান কতটা ভুল ছিল।
উপসংহার (পর্ব - ১)
১৮৫৯ সালে এডউইন ড্রেকের তেলকূপ থেকে ১৯৬০ সালে OPEC গঠন পর্যন্ত — এই একশ বছরে তেল শুধু একটি পণ্য থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধে এটি সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। মোসাদ্দেগের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতারা তেলের স্বার্থের কারণে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু OPEC-এর জন্মের মাধ্যমে প্রথমবার তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো সংগঠিত হয়েছে। আগামী পর্বে দেখা যাবে এই সংগঠন কীভাবে ১৯৭৩ সালের অবরোধের মাধ্যমে সারা পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিল এবং তেলের ভূরাজনীতি কীভাবে আজকের বিশ্বকে আকার দিয়েছে।









