লোগো আসলে কী?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, লোগো হলো একটি গ্রাফিক্স মার্ক বা প্রতীক যা কোনো কিছুর পরিচয় বহন করে।
তবে লোগো শুধু ব্যবসা বা কোম্পানির জন্য না। কোনো ধর্ম, জাতি বা সংস্কৃতির পরিচয় দিতেও লোগো ব্যবহার হয়। আরজেতো বলতে পারেন, বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার মাঝের লাল বৃত্তটাও একটা প্রতীক যা দেখলেই মানুষ বাংলাদেশকে চিনতে পারে।
একটা ভালো লোগোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো — কেউ মনোযোগ না দিয়ে, কিছু না পড়েও যেন এক ঝলকে বুঝতে পারে কোন ব্র্যান্ড বা কোম্পানির কথা বলা হচ্ছে। Nike এর Swoosh দেখলে কি আর বলতে হয় এটা কোন ব্র্যান্ড? Apple এর কামড়ানো আপেল দেখলে? এটাই একটা সফল লোগোর শক্তি।
লোগোর প্রকারভেদ
১. লেটারমার্ক বা মনোগ্রাম লোগো
ফলত এই ধরনের লোগো পুরোপুরি টাইপোগ্রাফি নির্ভর। কোম্পানির নামের প্রথম অক্ষরগুলো নিয়ে এই লোগো তৈরি করা হয়। যাদের কোম্পানির নাম বড় বা জটিল, তাদের জন্য এই স্টাইল খুব কাজের।
পরিচিত উদাহরণ হলো HBO, CNN, HP, NASA, IBM, BMW এবং PwC।
উদাহরণ: CNN এর লোগো দেখুন। Cable News Network — এই তিনটি শব্দের প্রথম অক্ষর C, N, N নিয়ে একটি কাস্টম বোল্ড টাইপোগ্রাফিতে লোগো তৈরি করা হয়েছে। আলাদা কোনো ছবি নেই, কোনো সিম্বল নেই — শুধু তিনটি অক্ষর। অথচ সারা পৃথিবী চেনে।
২. সিঙ্গেল লেটার বা লেটারফর্ম লোগো
মূলত এটা লেটারমার্কেরই আরও মিনিমাল ভার্সন। পুরো লোগো মাত্র একটি অক্ষর দিয়ে তৈরি। একটাই অক্ষর — কিন্তু সেই একটা অক্ষরকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যেন পুরো ব্র্যান্ডের ভার সেটা একা বহন করতে পারে।
পরিচিত উদাহরণ হলো McDonald's এর M, Netflix এর N, Unilever এর U, Yahoo এর Y এবং WordPress এর W।
উদাহরণ: Netflix এর লোগো বহুবার পরিবর্তন হতে হতে এখন সিঙ্গেল লেটারফর্মে এসে থিতু হয়েছে। বর্তমান N লোগোতে একটা কালো আর্কের মধ্যে আয়তাকার শেপ আর দুটো লাল শেড ব্যবহার করা হয়েছে। সিম্পল, কিন্তু দেখলেই চেনা যায়।
৩. ওয়ার্ডমার্ক বা লোগোটাইপ
এই ধরনের লোগোতে কোম্পানির পুরো নামটাই লোগো। কোনো আলাদা সিম্বল বা আইকন নেই, কোনো ভারী গ্রাফিক্স নেই। শুধু একটা ইউনিক ফন্ট আর স্টাইলে কোম্পানির নাম লেখা — এটাই লোগো।
আরজেতো মনে হতে পারে এটা খুব সহজ। কিন্তু আসলে এই স্টাইলে সফল হতে হলে ফন্ট সিলেকশন, রঙ এবং স্টাইল এতটাই নিখুঁত হতে হয় যে নামটা নিজেই একটা ভিজুয়াল আইডেন্টিটি হয়ে ওঠে।
পরিচিত উদাহরণ হলো Google, VISA, Coca-Cola, Pinterest, Microsoft, Canon, Facebook এবং Disney।
উদাহরণ: VISA এর লোগো দেখুন। শুধু VISA শব্দটা লেখা, কিন্তু একটু ইটালিক টাইপফেসে — V এর উপরে বাম কোণায় সামান্য হেলানো। এই সামান্য কৌশলটাই লোগোটাকে ইউনিক করে তুলেছে। সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এই লোগো দেখছে এবং বিশ্বাস করছে।
৪. পিকটোরিয়াল বা ব্র্যান্ড মার্ক লোগো
ফলত যখন কোনো কোম্পানি বা ব্র্যান্ডকে উপস্থাপন করতে শুধু একটা আইকন বা গ্রাফিক ছবি ব্যবহার করা হয়, তখন সেটা পিকটোরিয়াল লোগো। এখানে কোম্পানির নাম লেখার দরকার নেই — ছবিটাই সব বলে দেয়।
এটা সবচেয়ে শক্তিশালী লোগো ধরন। কিন্তু এই পর্যায়ে পৌঁছাতে একটা ব্র্যান্ডকে অনেক বছর ধরে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে হয়।
পরিচিত উদাহরণ হলো Apple এর কামড়ানো আপেল, Twitter এর নীল পাখি, Snapchat এর ভূত, Target এর লাল বৃত্ত, Nike এর Swoosh এবং WWF এর পান্ডা।
উদাহরণ: Apple এর লোগো পিকটোরিয়াল লোগোর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। রঙ পরিবর্তন হয়েছে বহুবার, কিন্তু সেই কামড়ানো আপেলটা একই আছে। Apple লেখা না থাকলেও সারা পৃথিবী চেনে। প্রযুক্তি দুনিয়ায় এই ছোট্ট ছবিটা মানে উদ্ভাবন, ডিজাইন এবং মান — একসাথে।
৫. ম্যাসকট লোগো
মূলত যখন কোনো চরিত্র বা ইলাস্ট্রেশনকে লোগোর কেন্দ্রবিন্দু করা হয়, তখন সেটা ম্যাসকট লোগো। এই ধরনের লোগো মানুষের সাথে একটা আবেগিক সম্পর্ক তৈরি করে। চরিত্রটার একটা ব্যক্তিত্ব থাকে, একটা গল্প থাকে।
পরিচিত উদাহরণ হলো KFC এর Colonel Sanders, Planters এর Mr. Peanut, Pillsbury Doughboy এবং Starbucks এর সাইরেন।
উদাহরণ: KFC এর Colonel Sanders সারা পৃথিবীতে পরিচিত। এই ভদ্রলোক আসলে KFC এর প্রতিষ্ঠাতা Colonel Harland Sanders — তাঁর ছবিই লোগো হয়ে গেছে। সাদা স্যুট, লাল অ্যাপ্রোন, উষ্ণ হাসি — দেখলেই ফ্রাইড চিকেনের কথা মাথায় আসে। বাংলাদেশেও KFC এখন বেশ পরিচিত এবং এই ম্যাসকটটা সবাই চেনে।
৬. অ্যাবস্ট্র্যাক্ট লোগো মার্কস
পিকটোরিয়াল লোগোর সাথে অ্যাবস্ট্র্যাক্ট লোগোর পার্থক্যটা হলো — পিকটোরিয়ালে চেনা জিনিসের ছবি থাকে, অ্যাবস্ট্র্যাক্টে থাকে জিওমেট্রিক বা ধারণাগত শেপ যেটা সরাসরি কোনো বাস্তব জিনিসকে উপস্থাপন করে না।
আরজেতো ভাবতে পারেন — এরকম শেপ দিয়ে ব্র্যান্ড পরিচিত হয় কীভাবে? হয়। কারণ শেপ, রঙ এবং ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্কে একটা ইম্প্রেশন তৈরি হয়ে যায়।
পরিচিত উদাহরণ হলো Nike এর Swoosh, Pepsi এর ভাগ করা বৃত্ত, Adidas এর তিনটি স্ট্রাইপ এবং Chanel এর ডাবল C।
উদাহরণ: Adidas এর Trefoil বা তিনটি স্ট্রাইপ — তিনটি সমান্তরাল রেখা একটু বাঁদিকে হেলানো। এর মধ্যে কোনো ছবি নেই, কোনো চরিত্র নেই। শুধু তিনটি লাইন। অথচ সারা পৃথিবীতে স্পোর্টস জগতে এই তিনটি লাইন মানে Adidas — শক্তি, গতি এবং স্টাইল।
৭. কম্বিনেশন মার্কস লোগো
নামেই বোঝা যাচ্ছে — একাধিক স্টাইলের লোগো একসাথে ব্যবহার করা হয় এই ধরনে। সাধারণত ওয়ার্ডমার্কের সাথে পিকটোরিয়াল বা ম্যাসকট বা অ্যাবস্ট্র্যাক্ট মার্ক মিলিয়ে দেওয়া হয়।
এই ধরনের লোগোর সুবিধা হলো ফ্লেক্সিবিলিটি। পুরো লোগো একসাথেও ব্যবহার করা যায়, আবার যখন ব্র্যান্ড যথেষ্ট পরিচিত হয়ে যায় তখন শুধু সিম্বল বা শুধু নামও আলাদাভাবে ব্যবহার করা যায়।
পরিচিত উদাহরণ হলো Lacoste, Toblerone, Taco Bell, Doritos, MasterCard এবং Burger King।
উদাহরণ: Burger King এর লোগোতে বার্গার বানের শেপের মধ্যে কোম্পানির নাম লেখা। একটা পিকটোরিয়াল রেফারেন্স আর একটা ওয়ার্ডমার্ক — দুটো মিলিয়ে একটা কম্বিনেশন মার্ক। দেখলেই বোঝা যায় এটা ফুডের ব্র্যান্ড, নাম না পড়লেও।
৮. এমব্লেম লোগো
ফলত এমব্লেম লোগো দেখতে অনেকটা ব্যাজ, সিল বা ক্রেস্টের মতো। কোনো শেপ বা বর্ডারের মধ্যে টাইপোগ্রাফি আর সিম্বল একসাথে থাকে। এই ধরনের লোগো সাধারণত একটা ঐতিহ্য, কর্তৃত্ব বা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বের অনুভূতি দেয়।
পরিচিত উদাহরণ হলো Harvard University, Stella Artois এবং Perrier।
উদাহরণ: Warner Bros এর লোগোতে একটা ঢালের মতো শিল্ড শেপের মধ্যে কাস্টম ফন্টে WB লেখা, আর উপরে রিবনের মতো একটা শেপে পুরো নাম। পুরো ডিজাইনটা দেখলেই মনে হয় এটা একটা বড়, প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির লোগো — যেটা সিনেমার দুনিয়ার সাথে মানানসই।
৯. স্প্ল্যাশ বা স্লাইম লোগো
মূলত এই লোগো ডিজাইনে কোনো নির্দিষ্ট জিওমেট্রিক শেপ মানা হয় না। পুরো ডিজাইনটা কার্টুনিশ, ফ্রি-ফর্ম এবং তরল ধরনের। টাইপফেসও ফর্মাল না — হাতে লেখার মতো বা খেলাধুলার ধাঁচের।
এই স্টাইল সাধারণত শিশু বা তরুণদের টার্গেট করা ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করে, কারণ এটা মজাদার এবং প্রাণবন্ত মনে হয়।
সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো Nickelodeon।
উদাহরণ: Nickelodeon এর লোগোতে একটা হাতে লেখার মতো ফন্টের পেছনে কমলা রঙের একটা মসৃণ স্লাইম ইফেক্ট। কোনো শার্প এজ নেই, কোনো কঠোর কাঠামো নেই — পুরো ব্যাপারটাই মজাদার এবং শিশুবান্ধব। দেখলেই মনে হয় কার্টুন দেখার সময় হয়েছে।
১০. ডায়নামিক মার্কস লোগো
আরজেতো ভাবুন — এমন একটা লোগো যেটা প্রতিবার একটু আলাদা দেখায়। প্ল্যাটফর্ম বদলালে লোগো বদলায়, কনটেক্সট বদলালে ডিজাইন বদলায়। এটাই ডায়নামিক মার্কস লোগোর ধারণা।
ডিজিটাল যুগে এই ধারণা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ একটা ব্র্যান্ড এখন ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া, অ্যাপ, বিলবোর্ড — অনেক জায়গায় দেখা যায়। ডায়নামিক লোগো প্রতিটা জায়গায় একটু ভিন্নভাবে উপস্থিত হয়, তবু মূল পরিচয়টা একই থাকে।
পরিচিত উদাহরণ হলো AOL, Nickelodeon এবং MIT Media Lab।
উদাহরণ: MIT Media Lab এর লোগো সিস্টেমে ৪০,০০০ এরও বেশি ভিন্ন শেপ ছিলো এবং সেগুলোর সাথে ১২ রকমের কালার কম্বিনেশন। অর্থাৎ প্রতিটা ব্যবহারেই লোগোটা একটু আলাদা। এটা শুধু একটা লোগো না — এটা একটা বার্তা যে MIT Media Lab সবসময় নতুন কিছু নিয়ে ভাবছে।
১১. কনটোর্ড ওয়ার্ডস বা শেপের মধ্যে ফন্ট লোগো
ফলত এই লোগোতে কোম্পানির নাম একটা জিওমেট্রিক শেপের মধ্যে আটকানো থাকে। আয়তক্ষেত্র, বৃত্ত, ওভাল — যেকোনো শেপ হতে পারে। এটা মূলত ওয়ার্ডমার্কের একটা উন্নত সংস্করণ যেখানে শেপটা লোগোকে আরও সম্পূর্ণ এবং স্বতন্ত্র করে তোলে।
পরিচিত উদাহরণ হলো Samsung, IKEA, BBC এবং Levi's।
উদাহরণ: Samsung এর লোগোতে কাস্টম ফন্টে SAMSUNG লেখাটা একটা মসৃণ ওভাল শেপের মধ্যে আটকানো। শুধু নাম লিখলে যতটা শক্তিশালী দেখাত, ওভালটা যোগ হওয়ার পরে লোগোটা আরও প্রফেশনাল আর সম্পূর্ণ মনে হয়। বাংলাদেশেও Samsung এর পণ্য অনেক জনপ্রিয়, আর এই লোগো সবাই চেনে।
আপনার ব্র্যান্ডের জন্য কোন লোগো সঠিক?
এই প্রশ্নের কোনো একটা নির্দিষ্ট উত্তর নেই। তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
প্রথমত ভাবুন আপনার ব্র্যান্ড কতটা পরিচিত। যদি নতুন ব্যবসা শুরু করছেন, তাহলে ওয়ার্ডমার্ক বা কম্বিনেশন মার্ক ভালো হয় — কারণ নাম না থাকলে মানুষ চিনবে না। আর যদি ব্র্যান্ড পরিচিত হয়ে যায়, তখন শুধু সিম্বলও যথেষ্ট।
দ্বিতীয়ত ভাবুন আপনার ব্র্যান্ডের চরিত্র কী। মর্যাদাশীল এবং ঐতিহ্যবাহী মনে করাতে চান? এমব্লেম বেছে নিন। আধুনিক এবং মিনিমাল? লেটারমার্ক বা পিকটোরিয়াল। মজাদার এবং তরুণমনা? ম্যাসকট বা স্প্ল্যাশ।
তৃতীয়ত ভাবুন আপনার টার্গেট কাস্টমার কারা। শিশু বা তরুণ? ম্যাসকট বা ডায়নামিক লোগো কাজ করবে। কর্পোরেট ক্লায়েন্ট? লেটারমার্ক বা এমব্লেম বেশি মানানসই।
উপসংহার
লোগো একটা কোম্পানির ভিজুয়াল পরিচয় — এই কথাটা সবাই জানে। কিন্তু একটা ভালো লোগো শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য না। এটা মানুষের মনে একটা ছাপ ফেলার জন্য, একটা আস্থা তৈরি করার জন্য এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেকে আলাদা করে তোলার জন্য।
বাংলাদেশে এখন ব্যবসার পরিবেশ অনেক বদলেছে। অনলাইন ব্যবসা বাড়ছে, স্টার্টআপ হচ্ছে, ব্র্যান্ডিং নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। এই পরিবেশে একটা ভালো লোগো আর বিলাসিতা না — এটা প্রয়োজনীয়তা।
মূলত মনে রাখতে হবে একটাই কথা — লোগো তৈরি হয় টার্গেট কাস্টমারের কথা মাথায় রেখে। রঙ, ফন্ট, শেপ — সব কিছুই হওয়া উচিত সেই মানুষগুলোকে প্রভাবিত করার জন্য যাদের কাছে আপনার পণ্য বা সেবা পৌঁছাতে চান। বিভ্রান্তিকর বা জটিল লোগো কখনোই কাজ করে না — সহজ, স্মার্ট এবং অর্থবহ লোগোই টিকে থাকে।









