GeoRenus Editorial Team

ফিফা মানে বিশ্ব ফুটবলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণকারী। ১৯০৪-এ প্যারিসে সাত দেশের প্রতিনিধি নিয়ে জন্ম। জুরিখে সদর দপ্তর। সুইস অলাভজনক অ্যাসোসিয়েশন। ২১১টা সদস্য ফেডারেশন (জাতিসংঘের চেয়ে বেশি)। ৬টা কনফেডারেশন। ২০১৯-২০২২ চক্রে আয় $৭.৫ বিলিয়ন। ২০২৬-২০৩০-এ $১১B প্রত্যাশা। আয়ের ৫ উৎস। সম্প্রচার ৫৫%, স্পন্সরশিপ ২০%, টিকিট ১৫%, লাইসেন্সিং ৫%, অন্যান্য ৫%। ৭ স্টেকহোল্ডার। ফেডারেশন, কনফেডারেশন, খেলোয়াড়/ক্লাব, স্পন্সর, সম্প্রচারক, আয়োজক দেশ, ভক্ত। শাসন: কংগ্রেস (২১১ ভোট), কাউন্সিল (৩৭ সদস্য), প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো। ২০১৫-এর $২B দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ও ইনফান্তিনো সংস্কার। ফিফা vs উয়েফা vs ক্লাব আধুনিক দ্বন্দ্ব। বাংলাদেশ BFF ফরওয়ার্ড প্রোগ্রামে বছরে $১.৫-২M পায়।
১৯ জুলাই ২০২৬। নিউইয়র্কের ইস্ট রাদারফোর্ড। মেটলাইফ স্টেডিয়াম। ৮২,৫০০ আসন কানায় কানায় পূর্ণ। এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল। আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন। মাঠে মুখোমুখি দুই প্রজন্ম। একদিকে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি, সম্ভবত তাঁর জীবনের শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল। অন্যদিকে ১৯ বছরের লামিন ইয়ামাল, স্পেনের নতুন প্রজন্মের নেতা। শেষ পর্যন্ত শেষ হাসিটা হাসল তরুণ প্রজন্মই, মেসির আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেন হলো নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
স্টেডিয়ামের বাইরে হাজার হাজার ভক্ত। যাঁরা টিকিট পাননি। তবু ফিরে যাননি। ব্লু-হোয়াইট আর্জেন্টিনার জার্সিতে দক্ষিণ আমেরিকান ভক্তরা। লাল স্প্যানিশ জার্সিতে ইউরোপীয়রা। বাংলাদেশে তখন রাত ১টা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, সব শহরে চা-য়ের দোকান খোলা। মানুষ টেলিভিশনের সামনে। কেউ ঘুমাননি সারা রাত।
এই এক ম্যাচ টেলিভিশন ও স্ট্রিমিংয়ে দেখেছেন প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষ, ফিফার অন্তত তেমনটাই ধারণা। সত্যি হলে ২০২২ কাতার ফাইনালের চেয়ে ৫০০ মিলিয়ন বেশি। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দেখা ক্রীড়া ম্যাচ। কিন্তু এই এক ম্যাচের পিছনে চার বছরের একটা বিশাল আর্থিক যন্ত্র। যার নাম ফিফা।
২০২৩-২০২৬ চক্রে ফিফার প্রত্যাশিত আয় প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯-২০২২-এর ৭.৫ বিলিয়ন থেকে ৪৫% বৃদ্ধি। এই আয়ের প্রতিটা ডলারের পিছনে একটা গল্প। সম্প্রচার অধিকার, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি, লাইসেন্সিং। প্রতিটার নিজস্ব বাজার। নিজস্ব ক্রেতা। নিজস্ব ইতিহাস।
খেলা শেষ, শিরোপার ঠিকানা নির্ধারিত। কিন্তু একটা সরল প্রশ্ন রয়েই যায়। এই বিশ্বকাপে ফিফা মোট কত কামাল? এই টাকা কার কাছে যায়? কারা সিদ্ধান্ত নেন এই ব্যবসার? চ্যাম্পিয়ন স্পেন যে ৪২ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার পেল, তার পিছনের অর্থনীতি কী? বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন যে বার্ষিক অনুদান পায়, সেটার উৎস কী?
অনেকে ভাবেন ফিফা মানে শুধু একটা ফুটবল সংস্থা। কাগজে অলাভজনক। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ছোট একটা অফিস। প্রেসিডেন্ট কিছু সিদ্ধান্ত নেন। বাকিটা রেফারি আর জাতীয় দলগুলোর ব্যাপার। এই ধারণা অর্ধেক সত্য। কারণ ফিফা একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক ক্রীড়া-ব্যবসাও। রিজার্ভ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। ২১১টা দেশে সদস্য। ৯০০ কর্মী। ২ বিলিয়ন ডলারের ঘুষ কেলেঙ্কারির ইতিহাস। এবং কয়েকটা মহাদেশীয় রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
এই লেখা সেই ব্যবসাটাকে ভেঙে দেখানোর চেষ্টা। শুধু সংখ্যা না। সংখ্যার পিছনের কাঠামো। কে কীভাবে টাকা কামায়। কে ভাগ পায়। সিদ্ধান্ত কে নেয়। ২০১৫-এর দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে কী ঘটেছিল। কেন ইউরোপীয় ক্লাব ফিফার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে ফিফার সম্পর্ক ঠিক কেমন। এবং সামনের দশ বছরে এই ব্যবসা কোথায় যাচ্ছে।
এক বাক্যে বললে, ফিফা মানে বিশ্ব ফুটবলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণকারী। ১৯০৪-এ প্যারিসে জন্ম। জুরিখে সদর দপ্তর। সুইস আইনে অলাভজনক অ্যাসোসিয়েশন। তবে ব্যবসা মানে বিশাল। ২১১টা সদস্য ফেডারেশন এবং ৬টা কনফেডারেশনের একটা পিরামিড। মূল ইঞ্জিন চার বছরের বিশ্বকাপ। যা আয়ের প্রায় ৯০% আনে। সম্প্রচার অধিকার সবচেয়ে বড় উৎস, তারপর স্পন্সরশিপ, টিকিট, লাইসেন্সিং। এই লেখায় পুরো ইকোসিস্টেম।
আলোচনা শুরু হবে ইতিহাস দিয়ে। তারপর একে একে আয়ের পাঁচটা উৎস, বিশ্বকাপের অর্থনীতি, সাত ধরনের স্টেকহোল্ডার, শাসন কাঠামো, ২০১৫-এর কেলেঙ্কারি, উয়েফা ও ক্লাবের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, বাংলাদেশ সংযোগ, এবং ভবিষ্যৎ। সব একসঙ্গে দেখলে ফিফা শুধু একটা ফুটবল সংস্থা মনে হবে না। বরং বিশ্বের অন্যতম চমকপ্রদ ব্যবসা মডেল মনে হবে। যা মানুষের প্যাশনকে সরাসরি রাজস্বে রূপান্তরিত করে।
ফিফার পুরো নাম Fédération Internationale de Football Association। ফরাসি ভাষায়। বাংলায় করলে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক ফুটবল সংঘ ফেডারেশন। এই ফরাসি নামটাই বলে দেয় ফিফার জন্ম কোথায়। ইংল্যান্ডে না, প্যারিসে।
ফুটবল খেলাটা ইংল্যান্ডের। ১৮৬৩ সালে লন্ডনে গঠিত হয়েছিল ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। বিশ্বের প্রথম আধুনিক ফুটবল সংস্থা। কিন্তু ইংল্যান্ড আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে চায়নি। কারণ ব্রিটিশরা ভাবতেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম মানে তাঁদের নিজেদের নিয়ম বদলাতে হবে।
ফলে বাকি ইউরোপ নিজেদের মধ্যে সংগঠিত হলো। ১৯০৪ সালের ২১ মে। প্যারিসের একটা ছোট অফিস। রুই সেন্ট-অনরে। সাতটা দেশের প্রতিনিধি বসলেন। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড। প্রথম প্রেসিডেন্ট হলেন রবার্ট গের্যাঁ। ফরাসি সাংবাদিক। বাজেট ছিল ৫০ ফ্রাঁ। কর্মী শূন্য।
প্রথম দশ বছরে ফিফার ভূমিকা প্রায় শূন্য। কারণ তখন ফুটবল মূলত মহাদেশীয় ব্যাপার। ইংল্যান্ড অলিম্পিকে খেলত। কিন্তু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ধারণা তখন নতুন।
ফিফার আসল উত্থান ১৯৩০-এ। উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ। ১৩টা দল। ফাইনালে উরুগুয়ে হারাল আর্জেন্টিনাকে। সেই টুর্নামেন্ট থেকেই ফিফা বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াল। তবে প্রথম কয়েকটা বিশ্বকাপ আর্থিকভাবে ছোট। ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকা মিলে চলত। টেলিভিশন ছিল না।
১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচার। কালো-সাদা। ইউরোপে। এই একটা ঘটনা ফিফার ভবিষ্যৎ বদলাল। কারণ টেলিভিশন মানে বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন মানে স্পন্সরশিপ। স্পন্সরশিপ মানে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা।
আজকের ফিফা একটা পিরামিড। শীর্ষে ফিফা নিজে। জুরিখের হিটজি হিলে সদর দপ্তর। ৯০০ কর্মী। বার্ষিক পরিচালন বাজেট প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার।
তার নিচে ছ'টা মহাদেশীয় কনফেডারেশন। প্রথম উয়েফা, মানে ইউরোপ। ৫৫টা সদস্য। সবচেয়ে ধনী। বার্ষিক আয় ৪ বিলিয়ন ইউরোর বেশি। ইউরো টুর্নামেন্ট, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপা লিগ, এদের হাতে।
দ্বিতীয় কনমেবল, মানে দক্ষিণ আমেরিকা। মাত্র ১০টা সদস্য। কিন্তু ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ জয়ী। ব্রাজিল ৫বার, আর্জেন্টিনা ৩বার, উরুগুয়ে ২বার। কোপা আমেরিকা এদের টুর্নামেন্ট।
তৃতীয় এএফসি, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন। ৪৭টা সদস্য। বাংলাদেশ এই কনফেডারেশনে। সদর দপ্তর কুয়ালালামপুরে। এশিয়া কাপ, এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, অস্ট্রেলিয়া (যারা ২০০৬-এ ওএফসি থেকে এএফসিতে এসেছে), সবাই এখানে।
চতুর্থ ক্যাফ, কনফেডারেশন অফ আফ্রিকান ফুটবল। ৫৪টা সদস্য। আফ্রিকা কাপ অব নেশনস। মিশর, ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া, সেনেগাল প্রধান শক্তি।
পঞ্চম কনকাকাফ। উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান। ৪১টা সদস্য। মেক্সিকো আর যুক্তরাষ্ট্র এখানকার প্রধান শক্তি।
ষষ্ঠ ওএফসি। ওশেনিয়া। ১৪টা সদস্য। সবচেয়ে ছোট। প্রকৃত বড় দেশ নেই। কারণ অস্ট্রেলিয়া এশিয়ায় চলে গেছে।
সব মিলিয়ে ২১১টা জাতীয় ফেডারেশন। ফিফার সদস্য দেশ সংখ্যা জাতিসংঘের চেয়েও বেশি। কারণ জাতিসংঘে ১৯৩টা সদস্য। কিন্তু ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, উত্তর আয়ারল্যান্ড, চারটে আলাদা ফুটবল ফেডারেশন। ফিলিস্তিন, তাইওয়ান, কসোভো, জিব্রাল্টার, সবই সদস্য।
ফিফা আইনগতভাবে একটা সুইস অ্যাসোসিয়েশন। মানে অলাভজনক সংস্থা। ১৯০৪ থেকে এই মর্যাদা। কেন সুইজারল্যান্ড বেছে নিলেন? কারণ সুইস আইন খুব সহজ। ন্যূনতম অডিট। কম কর। স্বাধীনতা বেশি।
এই অলাভজনক মর্যাদা ফিফার জন্য সোনার খনি। কারণ শেয়ারহোল্ডার নেই। ফলে ডিভিডেন্ড দিতে হয় না। ট্যাক্স রেট প্রায় শূন্য। যত আয় হয়, প্রায় সব ভেতরে রাখতে পারে। বা ফুটবল উন্নয়নে খরচ করতে পারে।
তবে অলাভজনক মানে দরিদ্র না। ২০২৩ সালের শেষে ফিফার হাতে ছিল প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ। এই রিজার্ভ বিনিয়োগে থাকে। মূলত সরকারি বন্ড, উচ্চ-মানের কর্পোরেট বন্ড, কিছু ইক্যুইটি। বার্ষিক বিনিয়োগ আয় ১০০-২০০ মিলিয়ন ডলার।
সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন। অলাভজনক সংস্থা ৪ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কেন রাখে? উত্তর ফিফার, ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপে কোনো সংকট হলে (যেমন কোভিড) যাতে চালিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু এই যুক্তি সবাইকে সন্তুষ্ট করে না। ২০১৫-এর কেলেঙ্কারির পর এই রিজার্ভ নিয়ে আরো প্রশ্ন উঠেছে।
সহজ কথায়: ফিফা ১৯০৪-এ প্যারিসে সাত দেশের প্রতিনিধি নিয়ে জন্ম। ১৯৩০-এ প্রথম বিশ্বকাপ। ১৯৫৪-এ টেলিভিশন যুগে প্রবেশ। জুরিখে সদর দপ্তর। সুইস অলাভজনক অ্যাসোসিয়েশন। ২১১টা সদস্য (জাতিসংঘের চেয়ে বেশি), ৬টা কনফেডারেশন। রিজার্ভ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার।
ফিফার আয় বোঝার জন্য ফিফার হিসাব চক্র বুঝতে হবে। ফিফা কর্পোরেট বছর হিসাব করে না। বরং চার বছরের একটা চক্র। যার কেন্দ্রে বিশ্বকাপ। ২০১৯-২০২২ চক্রের কেন্দ্র ছিল কাতার বিশ্বকাপ। ২০২৩-২০২৬ চক্রের কেন্দ্র হবে আমেরিকান বিশ্বকাপ।
এই চক্র হিসাবে ২০১৯-২০২২-এ মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৭.৫ বিলিয়ন ডলার। তার আগের চক্র ২০১৫-২০১৮ (রাশিয়া বিশ্বকাপ) আয় ছিল ৬.৪ বিলিয়ন। মানে প্রতি চক্রে গড়ে ১৫% বৃদ্ধি। ২০২৩-২০২৬-এ ১১ বিলিয়ন প্রত্যাশা। যা আরো ৪৫% বেশি। কারণ আমেরিকান বিশ্বকাপ ৪৮ দলের এবং ১০৪ ম্যাচের।
উৎস | ২০১৯-২০২২ আয় | শতাংশ |
সম্প্রচার অধিকার | $৪.১ বিলিয়ন | ৫৫% |
স্পন্সরশিপ ও মার্কেটিং | $১.৫ বিলিয়ন | ২০% |
টিকিট ও হসপিটালিটি | $১.১ বিলিয়ন | ১৫% |
লাইসেন্সিং | $৪০০ মিলিয়ন | ৫% |
অন্যান্য (বিনিয়োগ, ফিফা+) | $৪০০ মিলিয়ন | ৫% |
মোট | $৭.৫ বিলিয়ন | ১০০% |
সম্প্রচার অধিকার ফিফার সবচেয়ে বড় আয়। ৫৫% শেয়ার। এটা বোঝার জন্য একটা কথা মনে রাখুন। বিশ্বকাপ দেখতে চাইলে যেকোনো টেলিভিশন চ্যানেল বা স্ট্রিমিং প্লাটফর্মকে ফিফার কাছ থেকে অধিকার কিনতে হয়। এই অধিকার সাধারণত দুটো বিশ্বকাপের একটা প্যাকেজে বিক্রি হয়। মানে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ একসঙ্গে। বা ২০২৬ ও ২০৩০ একসঙ্গে।
সবচেয়ে বড় বাজার আমেরিকা। ফক্স কর্পোরেশন ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের জন্য ৪২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। এই অধিকার আসলে প্রথমে ইএসপিএনের ছিল। ২০১১-এ ফক্স ছিনিয়ে নেয়। ২০২৬-২০৩০-এর জন্য ফক্স আবার প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন দিয়েছে। যা প্রথম চুক্তির চেয়ে ১১% বেশি।
স্প্যানিশ-ভাষী আমেরিকান বাজারে ইউনিভিসিয়ন। মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকা, স্প্যানিশ-ভাষী ইউরোপ এদের বাইরে। ২০১৮-২০২২ চক্রে ৩০০ মিলিয়ন। আরো বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় বিইন স্পোর্টস। কাতারি চ্যানেল। ২০১৮-২০২২ চক্রে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার। কাতার বিশ্বকাপ আয়োজক ছিল বলে বিশেষ চুক্তি। ২০২৬-এর জন্য আবার বিডে। প্রতিযোগী সৌদি এসএসসি।
যুক্তরাজ্যে বিবিসি ও আইটিভি মিলে। এদের নিয়ম আলাদা। যেহেতু পাবলিক ব্রডকাস্টার, বিশ্বকাপ বিনামূল্যে দেখাতে হয়। ২০১৮-২০২২ প্যাকেজ ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড।
চীনে সিসিটিভি একচেটিয়া। মূল্য গোপন। বাজার-বিশ্লেষকদের অনুমান ৩০০ মিলিয়ন ডলার। এত বেশি কেন? কারণ চীনে ১.৪ বিলিয়ন ফুটবল ভক্ত।
বাংলাদেশে গল্প ভিন্ন। ছোট বাজার। ২০২২-এ টি স্পোর্টস আর নাগরিক টিভি মিলে অধিকার কিনেছিল। মূল্য প্রায় ৮-১০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৬-এ ফিফা মূল্য বাড়াতে চাইবে। কারণ দলসংখ্যা ৪৮ এবং ম্যাচ ১০৪।
সব মিলিয়ে ২০০+ দেশে সম্প্রচার। ২০১৯-২০২২ চক্রে মোট ৪.১ বিলিয়ন। ২০২৬-এ ৫.৫ বিলিয়ন প্রত্যাশা।
স্পন্সরশিপ মানে কোম্পানিগুলো ফিফাকে টাকা দিয়ে বিশ্বকাপের সঙ্গে নিজেদের ব্র্যান্ড যুক্ত করে। এই ব্যবসার তিন স্তর। প্রতিটার নিজস্ব মূল্য এবং সুবিধা।
সর্বোচ্চ স্তর ফিফা পার্টনার। মাত্র সাতটা কোম্পানি এই স্তরে থাকতে পারে। চার বছরের চুক্তি। খরচ প্রায় ১০০-১৫০ মিলিয়ন ডলার। বিনিময়ে ফিফার সব টুর্নামেন্টে ব্র্যান্ড উপস্থিতি। বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামের সবচেয়ে ভালো জায়গায় লোগো।
২০২৬-এর ফিফা পার্টনার সাতটা। অ্যাডিডাস। ১৯৭০ থেকে ফিফার সঙ্গে। বিশ্বকাপের বল সরবরাহ করে। কোকা-কোলা। ১৯৭৪ থেকে। ট্রফির পাশে সবচেয়ে বেশি দেখা হয়। ওয়ান্ডা গ্রুপ। চীনা কনগ্লোমারেট। ২০১৬-এ যোগ। হুন্দাই-কিয়া। কোরিয়ান অটো। ১৯৯৯ থেকে। ভিসা। ২০০৭ থেকে। কার্ড পেমেন্ট একচেটিয়া। কাতার এয়ারওয়েজ। ২০১৭ থেকে। কাতার বিশ্বকাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। সৌদি আরামকো। ২০২৪-এর নতুন সংযোজন। ২০৩৪ সৌদি বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত।
দ্বিতীয় স্তর বিশ্বকাপ স্পন্সর। শুধু একটা নির্দিষ্ট বিশ্বকাপের জন্য। খরচ ২০-৫০ মিলিয়ন। ২০২৬-এর জন্য ম্যাকডোনাল্ডস, বাডওয়াইজার (এবি ইনবেভ), লেনোভো (চীনা), আলিবাবা, বাইজুস। এরা মূলত এক দেশ বা এক অঞ্চলে বেশি প্রভাবশালী।
তৃতীয় স্তর আঞ্চলিক সমর্থক। মূল্য ৫-২০ মিলিয়ন। শুধু একটা অঞ্চলে ব্র্যান্ড ব্যবহারের অধিকার। যেমন লাতিন আমেরিকায় কোনো বিয়ার ব্র্যান্ড। বা এশিয়ায় কোনো টেলিকম।
সব মিলিয়ে ২০১৯-২০২২ চক্রে ১.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬-এ ২ বিলিয়ন প্রত্যাশা। কারণ সৌদি আরামকো এসেছে এবং নতুন এশিয়ান কোম্পানি আসছে।
বিশ্বকাপের ম্যাচের টিকিট। ২০২২ কাতারে ৩ মিলিয়নের বেশি টিকিট বিক্রি। গড় দাম ২০০ ডলার। শুধু টিকিট থেকে ৬০০ মিলিয়ন। গ্রুপ ম্যাচের সবচেয়ে সস্তা টিকিট ছিল ১১ ডলার (স্থানীয়দের জন্য)। ফাইনালের সবচেয়ে দামি ১,৬০০ ডলার।
কিন্তু আসল লাভ হসপিটালিটি প্যাকেজে। এই প্যাকেজ বিক্রি করে ম্যাচ হসপিটালিটি নামে একটা সংস্থা। যা ফিফা আর ইনফ্রন্ট স্পোর্টসের যৌথ উদ্যোগ। ম্যাচ প্রতি প্যাকেজ ৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ ডলার। অন্তর্ভুক্ত ভিআইপি বক্স, খাবার, পানীয়, বিশেষজ্ঞ ভাষ্যকার। ২০২২-এ শুধু হসপিটালিটি থেকে ৪০০ মিলিয়ন।
সব মিলিয়ে ২০১৯-২০২২ চক্রে ১.১ বিলিয়ন। ২০২৬-এ ১৬টা শহরে ১০৪ ম্যাচ। প্রত্যাশা ১.৭ বিলিয়ন।
বিশ্বকাপ ট্রফির ছবি ব্যবহার। মাসকট। ভিডিও গেম। এসব লাইসেন্সিং আয়। ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় ছিল ভিডিও গেম চুক্তি। ইএ স্পোর্টস (এখন ইলেক্ট্রনিক আর্টস) ১৯৯৩ থেকে ফিফা নামে ভিডিও গেম বানাত। বছরে ১৫০ মিলিয়ন ডলার দিত। ২০২৩-এ চুক্তি শেষ। কারণ ইএ চেয়েছিল আরো স্বাধীনতা। ফিফা চেয়েছিল আরো টাকা। ইএ তাদের গেমের নাম বদলে ইএ ফুটবল করেছে। ফিফা এখন নতুন লাইসেন্স খুঁজছে। ২০২৫-এ তিন-চারটে গেম বেরিয়েছে ফিফা নামে। কিন্তু ইএ-এর মতো সফল না।
অন্য লাইসেন্সিং। বিশ্বকাপ ট্রফির রেপ্লিকা। কেন্দ্রীয় মাসকট বিক্রি। বই। ২০১৯-২০২২ চক্রে সব মিলিয়ে ৪০০ মিলিয়ন।
বিনিয়োগ থেকে আয়। ৪ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভে ২-৩% রিটার্ন মানে বছরে ১০০-১৫০ মিলিয়ন।
এছাড়া ফিফা+। ২০২২-এ চালু। একটা স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম। বিনামূল্যে। এখন পর্যন্ত রাজস্ব কম। কিন্তু ভবিষ্যতে বাড়বে প্রত্যাশা।
সব মিলিয়ে ৪০০ মিলিয়ন।
সহজ কথায়: ফিফার আয়ের ৫ উৎস। সম্প্রচার অধিকার ৫৫% ($৪.১B, ফক্স/বিইন/সিসিটিভি/টি স্পোর্টস), স্পন্সরশিপ ২০% ($১.৫B, ৭ ফিফা পার্টনার), টিকিট ১৫% ($১.১B), লাইসেন্সিং ৫% ($৪০০M, ইএ চুক্তি হারানোর পর কমছে), অন্যান্য ৫%। মোট ৭.৫ বিলিয়ন এক চক্রে।
ফিফার আয়ের একটা গোপন সত্য আছে। প্রায় ৯০% আসে চার বছরের একটা মাসের টুর্নামেন্ট থেকে। বিশ্বকাপ। বাকি ১০% আসে মহিলা বিশ্বকাপ, বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট, ফিফা কনফেডারেশনস কাপ (এখন বাতিল), সদস্যপদ ফি, এসব থেকে।
এই তথ্য একটা প্রশ্ন তোলে। ফিফা কি ক্রীড়া সংস্থা, নাকি একটা চার-বছরের ইভেন্ট ম্যানেজার? সমালোচকদের উত্তর দ্বিতীয়টা। ফিফা প্রকৃতপক্ষে একটা বিশাল ইভেন্ট। যার মূল কাজ প্রতি চার বছরে একবার বিশ্বকাপ চালানো এবং তার আশপাশে ৭.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করা।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল। কাতার সরকার প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল। এর বেশিরভাগ অবকাঠামো। নতুন সাতটা স্টেডিয়াম। একটা নতুন শহর (লুসাইল)। মেট্রো লাইন। বিমানবন্দর সম্প্রসারণ। হোটেল।
কিন্তু ফিফার নিজের আয়-খরচ আলাদা। কাতার বিশ্বকাপে ফিফার মোট আয় ৭.৫ বিলিয়ন। খরচের বিভাজন নিচে।
মাত্রা | মূল্য |
মোট আয় | $৭.৫ বিলিয়ন |
প্রাইজ মানি (৩২টা দলে) | $৪৪০ মিলিয়ন |
ক্লাব ক্ষতিপূরণ | $২০৯ মিলিয়ন |
সদস্য ফেডারেশনে বরাদ্দ | $১ বিলিয়ন |
কনফেডারেশনে বরাদ্দ | $২০০ মিলিয়ন |
পরিচালন খরচ | $১ বিলিয়ন |
ফিফার নিট রাজস্ব | $১.১ বিলিয়ন |
প্রাইজ মানির বিস্তারিত। চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৪২ মিলিয়ন ডলার। রানার্স-আপ ফ্রান্স ৩০ মিলিয়ন। তৃতীয় স্থানের ক্রোয়েশিয়া ২৭ মিলিয়ন। চতুর্থ স্থানের মরক্কো ২৫ মিলিয়ন। কোয়ার্টার-ফাইনালিস্ট চার দল ১৭ মিলিয়ন করে। রাউন্ড অব ১৬-এ বাদ পড়া আট দল ১৩ মিলিয়ন করে। গ্রুপ পর্বে বাদ পড়া ১৬ দল ৯ মিলিয়ন করে।
মানে বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপে যেত, শুধু গ্রুপ পর্বে খেললেও ৯ মিলিয়ন পেত। বাংলাদেশের বার্ষিক ফুটবল বাজেটের চেয়ে বেশি।
ক্লাব ক্ষতিপূরণ একটা নতুন ধারণা। ২০১০ থেকে চালু। ইউরোপীয় বড় ক্লাবরা অভিযোগ করেছিলেন, তাঁরা খেলোয়াড় বেতন দেন, কিন্তু বিশ্বকাপে খেলোয়াড় আঘাত পান। ক্লাব ক্ষতিতে পড়ে। ফিফা তাই ২০২২-এ ক্লাবগুলোকে ২০৯ মিলিয়ন দিয়েছে। প্রতিটা খেলোয়াড়ের প্রতি দিন প্রায় ১০,০০০ ডলার। মেসি যেমন পিএসজিতে খেলতেন। পিএসজি পেয়েছে মেসির প্রতিটা দিনের ক্ষতিপূরণ।
সদস্য ফেডারেশনে বরাদ্দ ১ বিলিয়ন। মানে ২১১টা ফেডারেশন গড়ে ৫ মিলিয়ন করে পেয়েছে। বিএফএফও পেয়েছে।
সব খরচের পর ফিফার নিট রাজস্ব ১.১ বিলিয়ন ডলার। এই টাকা রিজার্ভে যোগ হয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড়। কারণ ফিফা একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দল সংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮ করা।
কেন এই সম্প্রসারণ? আনুষ্ঠানিক কারণ, ছোট দেশের জন্য সুযোগ। কাবো ভের্দে, উজবেকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, এসব দেশের বিশ্বকাপ পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে বেশি দল যাবে।
প্রকৃত কারণ, আয় বাড়ানো। বেশি দল মানে বেশি ম্যাচ। বেশি ম্যাচ মানে বেশি সম্প্রচার অধিকার, বেশি টিকিট, বেশি স্পন্সর। ৬৪ থেকে ১০৪ ম্যাচ মানে ৬৩% বৃদ্ধি।
আয়োজক তিন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র (১১ শহর), মেক্সিকো (৩), কানাডা (২)। মোট ১৬টা শহর। ৩২ দিনের টুর্নামেন্ট। প্রত্যাশিত আয় ১১ বিলিয়ন ডলার। যা কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে ৪৫% বেশি।
কিন্তু এই সম্প্রসারণ বিতর্কিত। ইউরোপীয় বড় ক্লাবরা বলেন, খেলোয়াড়রা আরো বেশি খেলবেন। বছরে ৭০+ ম্যাচ। আঘাত বাড়বে। খেলার মান কমবে। প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো বলেন, বিশ্বকাপ ফুটবলের গণতান্ত্রিকীকরণ।
২০৩৪ বিশ্বকাপ সৌদি আরবকে দেওয়া হয়েছে ডিসেম্বর ২০২৪-এ। এই সিদ্ধান্ত ফিফার সবচেয়ে বিতর্কিত।
কেন বিতর্কিত? প্রথম, বিডিং প্রক্রিয়া। সৌদিই একমাত্র বিডার। কোনো প্রতিযোগিতা নেই। অন্য দেশগুলো বিডই করেনি। কারণ ফিফা রোটেশন নিয়ম করে দিয়েছিল ২০৩৪ এশিয়া বা ওশেনিয়া। এশিয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রতিযোগী ছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু তারা বিড করেনি। কেন? ফিফার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চুক্তি অনুমান।
দ্বিতীয়, মানবাধিকার। মহিলাদের অধিকার সৌদিতে সীমিত। শ্রমিকদের অধিকার, বিশেষ করে অভিবাসী শ্রমিকদের, দুর্বল। কাতারে ২০১০ থেকে ২০২০, এই দশকে প্রায় ৬,৫০০ অভিবাসী শ্রমিক মারা গিয়েছিলেন। সবাই সরাসরি স্টেডিয়াম নির্মাণে না, মৃত্যুর কারণও নানা। তবু এই শ্রমিক-স্রোত বিশ্বকাপ ঘিরেই। সৌদিতে ঝুঁকি আরো বেশি। এলজিবিটি অধিকার প্রায় শূন্য। মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিবাদ করছে।
তৃতীয়, স্পোর্টসওয়াশিং। সৌদি আরব বিশ্ব ফুটবলে বিলিয়ন ডলার ঢালছে গত দশ বছরে। রোনালদো, নেইমার, বেনজেমার আগমন। সৌদি প্রো লিগ। নিউক্যাসল ইউনাইটেড কেনা (সৌদি পিআইএফ)। এলআইভি গল্ফ। সৌদি আরামকো ফিফা পার্টনার। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ সৌদিকে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ভালো করার সুযোগ।
তবু ফিফা সৌদিকে দিয়েছে। কারণ আর্থিক সুবিধা। সৌদি বিনিয়োগ অসীম। সরকার পাশে। ইনফান্তিনো আর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক জানা কথা।
সহজ কথায়: বিশ্বকাপ ফিফার আয়ের ৯০%। কাতার ২০২২-এ $৭.৫B আয়, $১.১B নিট। প্রাইজ মানি $৪৪০M, ক্লাব ক্ষতিপূরণ $২০৯M। ২০২৬ আমেরিকান বিশ্বকাপ ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ, $১১B প্রত্যাশা। ২০৩৪ সৌদি বিশ্বকাপ মানবাধিকার ও স্পোর্টসওয়াশিং প্রশ্নে বিতর্কিত।
৭.৫ বিলিয়ন ডলারের কেক কে কে ভাগ পান? এই প্রশ্নের উত্তরে ফিফার ক্ষমতার কাঠামো ফুটে ওঠে। মূলত সাত ধরনের স্টেকহোল্ডার। তবে ভাগ সমান না। কেউ কেউ শতাংশে ভাগ পান। কেউ শুধু পরোক্ষ সুবিধা পান।
ফিফার সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার সদস্য ফেডারেশন। ২১১টা। প্রত্যেকে ভোটাধিকার সমান। কিন্তু আর্থিক শক্তি একদম আলাদা।
ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রতি চার বছরে প্রতিটা ফেডারেশন প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার পায়। এটা মূলত ঋণ না, অনুদান। কিন্তু শর্ত আছে। মাঠ নির্মাণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নারী ফুটবল, যুব উন্নয়ন, এসব খাতে খরচ করতে হবে। বিলাসিতায় না।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন এই টাকা পায়। বছরে প্রায় ১.৫-২ মিলিয়ন ডলার। মোট চার বছরে ৮ মিলিয়ন। বিএফএফের বার্ষিক বাজেটের একটা বড় অংশ এই ফিফা অনুদান।
তবে অভিযোগ আছে। ছোট ফেডারেশন এই টাকার হিসাব ঠিকভাবে রাখে না। ২০১৫-এর কেলেঙ্কারিতে দেখা গিয়েছিল, ক্যারিবিয়ান ফুটবল ইউনিয়নের অনেক ছোট সদস্য এই অনুদান ব্যক্তিগত পকেটে নিতেন। বিনিময়ে ফিফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট।
ছ'টা কনফেডারেশন প্রতি চক্রে ২০০-৪০০ মিলিয়ন ডলার পায়। উয়েফা সবচেয়ে বড়। প্রায় ৪০০ মিলিয়ন। কিন্তু উয়েফার নিজস্ব আয় ফিফার চেয়ে বেশি। বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ইউরো। মূলত চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং ইউরো থেকে। ফলে উয়েফার কাছে ফিফা বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ না। কিন্তু ছোট কনফেডারেশনগুলোর জন্য এই বরাদ্দই আসল।
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) বিশ্বকাপ চক্রে প্রায় ২০০ মিলিয়ন পায়। এই টাকায় তাঁরা এশিয়া কাপ চালান। এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগ। এশিয়ান বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশের ম্যাচগুলোর অনেক আয়োজন এই এএফসি অর্থে।
ক্যাফ (আফ্রিকা) এবং কনকাকাফ (উত্তর আমেরিকা) প্রায় ২০০ মিলিয়ন করে পায়। কনমেবল (দক্ষিণ আমেরিকা) কম পায়, কিন্তু মহাদেশের প্রেস্টিজ বেশি। ওএফসি (ওশেনিয়া) সবচেয়ে ছোট, ১০০ মিলিয়নের নিচে।
খেলোয়াড় ফিফার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কারণ তাঁদের কারণেই দর্শক আসেন। কিন্তু ফিফা সরাসরি খেলোয়াড়কে টাকা দেয় না। বরং জাতীয় ফেডারেশন দেয়। প্রাইজ মানি ফেডারেশনের কাছে যায়। ফেডারেশন খেলোয়াড়দের ভাগ করে।
খেলোয়াড়দের সংগঠন ফিফপ্রো। প্রায় ৬৫,০০০ পেশাদার খেলোয়াড়ের প্রতিনিধিত্ব করে। ফিফার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেন। খেলার সময়সূচি, বেতন, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য বিষয়ে। ২০২৩-এ ফিফপ্রো ফিফার বিরুদ্ধে মামলা করেছে ক্যালেন্ডার-জটিলতার কারণে।
ক্লাবরাও ফিফার স্টেকহোল্ডার। কারণ ক্লাবের খেলোয়াড় বিশ্বকাপে যান। ক্লাব বেতন দেয় সারা বছর। বিশ্বকাপে ম্যাচ পান না। খেলোয়াড় আঘাত পেয়ে ফিরে এলে ক্লাব ক্ষতিতে। সমাধান ফিফা ক্লাব বেনিফিট প্রোগ্রাম। ২০২২-এ ২০৯ মিলিয়ন দিয়েছিল। ২০২৬-এ ৩৫০ মিলিয়ন প্রত্যাশা।
স্পন্সরের সম্পর্ক দ্বিমুখী। স্পন্সর ফিফাকে টাকা দেয়। ফিফা স্পন্সরের ব্র্যান্ড বিশ্বব্যাপী প্রচার করে। এই সম্পর্ক দশকের পুরনো। অ্যাডিডাস ১৯৭০ থেকে। কোকা-কোলা ১৯৭৪ থেকে।
কিন্তু স্পন্সরশিপে সমস্যা আছে। ২০১৫-এর দুর্নীতি কেলেঙ্কারির পর কিছু স্পন্সর সরে গিয়েছিল। সনি চলে গিয়েছিল। এমিরেটস নবায়ন করেনি। ২০১৭-এ ফিফা দ্বিতীয়-স্তরের স্পন্সর খুঁজে পাচ্ছিল না। কাতার এয়ারওয়েজ এসেছিল। ২০২৪-এ সৌদি আরামকো এসেছে। কিন্তু আধুনিক পশ্চিমা কোম্পানিরা মানবাধিকার প্রশ্নে আসতে দ্বিধা করেন।
বিশ্বজুড়ে ২০০+ টেলিভিশন চ্যানেল আর স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম বিশ্বকাপের অধিকার কেনেন। ফক্স, বিইন, বিবিসি, সিসিটিভি, স্টার স্পোর্টস, টি স্পোর্টস। সম্পর্ক দ্বিমুখী। সম্প্রচারক টাকা দেন, ফিফা কন্টেন্ট দেয়।
সাম্প্রতিক প্রবণতা, স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের উত্থান। আমাজন প্রাইম, অ্যাপল টিভি, ডিজনি+, নেটফ্লিক্স, এদের সঙ্গে সম্প্রচার চ্যানেলের প্রতিযোগিতা। ২০৩০-নাগাদ বিশ্বকাপ সরাসরি স্ট্রিমিংয়েই দেখা যেতে পারে।
বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বানান। কাতার ২০২২-এ ২২০ বিলিয়ন। রাশিয়া ২০১৮-এ ১৫ বিলিয়ন। ব্রাজিল ২০১৪-এ ১৫ বিলিয়ন। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০-এ ৪ বিলিয়ন।
কিন্তু টিকিট বিক্রি বা সম্প্রচারের লাভ ফিফা রাখে। আয়োজক দেশ পায় পর্যটন, চাকরি সৃষ্টি, প্রেস্টিজ। এসব পরোক্ষ। সরাসরি লাভের হিসাব প্রায়ই নেতিবাচক।
গবেষণা বলে, ব্রাজিল ২০১৪ থেকে ১৩ বিলিয়ন খরচ করে ফিরে পেয়েছিল ৬ বিলিয়ন। ৭ বিলিয়ন ক্ষতি। রাশিয়া ২০১৮-এ প্রায় সমান-সমান। কাতার ২০২২-এ ২২০ বিলিয়ন খরচ করেছে মূলত বৃহত্তর অবকাঠামোর জন্য। ফিরে পেয়েছে ২০-৩০ বিলিয়ন।
তবু দেশগুলো আয়োজনে আগ্রহী কেন? সরাসরি টাকা না, বরং সফট পাওয়ার। বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমানতা। কূটনৈতিক সুবিধা।
সবশেষ, তবে সবচেয়ে বড়। বিশ্বজুড়ে ৫ বিলিয়ন ফুটবল ভক্ত। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছিলেন ১.৫ বিলিয়ন মানুষ। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দেখা ম্যাচ। মোট বিশ্বকাপে ৫ বিলিয়ন দর্শক-ঘণ্টা।
দর্শক সরাসরি ফিফার কাছে কিছু চান না। শুধু ভালো খেলা। বিনামূল্যে বা কম দামে দেখতে চান। তবু দর্শকই ফিফার আসল সম্পদ। কারণ দর্শক আছে বলেই স্পন্সর আছে, সম্প্রচারক আছে, বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা আছে।
সহজ কথায়: ফিফার ৭ স্টেকহোল্ডার। সদস্য ফেডারেশন (২১১, প্রত্যেকে $৮M/চক্র), কনফেডারেশন (উয়েফা $৪০০M, বাকি $২০০M), খেলোয়াড় ও ক্লাব (২০২২-এ $২০৯M ক্লাব ক্ষতিপূরণ), স্পন্সর, সম্প্রচারক, আয়োজক দেশ (প্রায়ই আর্থিক ক্ষতিতে), ভক্ত (৫ বিলিয়ন)।
৭.৫ বিলিয়ন ডলারের সিদ্ধান্ত নেয় কে? এই প্রশ্নের উত্তর ফিফার শাসন কাঠামোয়। তিন স্তরে বিভক্ত। কংগ্রেস, কাউন্সিল, প্রেসিডেন্ট।
সবার উপরে ফিফা কংগ্রেস। ফিফার সংসদ বলা যায়। প্রতিটা সদস্য ফেডারেশনের একটা ভোট। ২১১টা ভোট। বাংলাদেশের ভোট, ফ্রান্সের ভোট, চীনের ভোট, সবই সমান। এই এক-দেশ-এক-ভোট নিয়মই ফিফার রাজনীতির মূল।
কেন? কারণ ছোট দেশগুলোর ভোট নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ফিফার প্রেসিডেন্ট হওয়া যায়। ইউরোপের ৫৫টা ভোট। কিন্তু আফ্রিকার ৫৪, এশিয়ার ৪৭, কনকাকাফের ৪১, মিলে ১৪২। ইউরোপের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ফিফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাধারণত ছোট দেশ নিয়ে জোট বাঁধতে হয়।
কংগ্রেস বছরে একবার বসে। সাধারণ কংগ্রেস। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় চার বছরে একবার। বাজেট পাস। নীতিমালা অনুমোদন। বিশ্বকাপ আয়োজক নির্বাচন (২০১৭ থেকে)।
কংগ্রেসের নিচে ফিফা কাউন্সিল। আগে বলা হতো Executive Committee, সংক্ষেপে ExCo। ২০১৬-এর সংস্কারে নাম বদলে কাউন্সিল।
৩৭ জন সদস্য। প্রেসিডেন্ট, ৮ জন ভাইস প্রেসিডেন্ট (কনফেডারেশন থেকে), এবং ২৮ জন সদস্য (কনফেডারেশন প্রতিনিধি)। এই কাউন্সিল সব বড় সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বকাপ কোথায় হবে, নিয়ম পরিবর্তন, বড় বরাদ্দ। মাসে একবার বসে।
কাউন্সিলে ইতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে। ২০১৫-এর কেলেঙ্কারিতে ExCo-র ৯ জন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সংস্কারের পর কাউন্সিলে নারী সদস্য বাধ্যতামূলক। কমপক্ষে ছ'জন।
ফিফার প্রেসিডেন্ট সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি বিশ্ব ফুটবলে। কেন? কারণ শুধু ফিফাই না, পরোক্ষভাবে ছ'টা কনফেডারেশন, ২১১টা জাতীয় ফেডারেশন, লক্ষ লক্ষ ক্লাব, লক্ষ লক্ষ খেলোয়াড়, বিলিয়ন ভক্ত, সবার উপরে প্রভাব।
চার বছরের মেয়াদ। তিন মেয়াদ পর্যন্ত থাকতে পারেন। মানে সর্বোচ্চ ১২ বছর। এই সীমা ২০১৬-এর সংস্কারে চালু। আগে কোনো সীমা ছিল না। সেপ ব্লাটার ছিলেন ১৭ বছর (১৯৯৮-২০১৫)। জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ ২৪ বছর (১৯৭৪-১৯৯৮)।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। সুইস-ইতালিয়ান। আইনজীবী। উয়েফার সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি। ২০১৬-এর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত। ব্লাটারের পতনের পর। ২০২৩-এ তৃতীয় মেয়াদ শুরু। ২০২৭ পর্যন্ত।
তাঁর বেতন কত? গোপনীয়। কিন্তু ২০২২-এ ফিফা রিপোর্টে ৪.৩ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ প্রকাশিত। প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার। এতে বেস বেতন, বোনাস, পেনশন, ভ্রমণ। ফিফা কাউন্সিল সদস্যদের বেতনও প্রকাশিত। বছরে ২৫০,০০০ ডলার প্লাস ম্যাচ প্রতি বোনাস।
প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক পদ। দৈনন্দিন কাজ চালান জেনারেল সেক্রেটারি। কর্পোরেট জগতে সিইওর সমতুল্য। ৯০০ কর্মীর প্রশাসনিক প্রধান।
বর্তমানে ফাত্মা সামুরা। সেনেগালী মহিলা। ২০১৬ থেকে। প্রথম নারী জেনারেল সেক্রেটারি ফিফা ইতিহাসে। জাতিসংঘের পটভূমি। শরণার্থী সংস্থায় দীর্ঘ কাজ। ইনফান্তিনো তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন লিঙ্গ-সাম্য এবং আফ্রিকান প্রতিনিধিত্বের জন্য।
সামুরা ২০২৩-এ পদত্যাগ ঘোষণা করেছেন। প্রকৃত কারণ অজানা। কিন্তু গুজব, ইনফান্তিনোর সঙ্গে মতভেদ। কাউন্সিলের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে। উত্তরসূরি নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে।
সহজ কথায়: ফিফার তিন স্তরের শাসন। কংগ্রেস (২১১ ভোট, প্রত্যেকে সমান), কাউন্সিল (৩৭ সদস্য, মাসে বসে), প্রেসিডেন্ট (ইনফান্তিনো থেকে $৫M বেতন, ১২ বছর সীমা)। জেনারেল সেক্রেটারি (ফাত্মা সামুরা, ২০২৩-এ পদত্যাগ) দৈনন্দিন সিইও।
ফিফার ইতিহাস দু'ভাগে বিভক্ত। ২০১৫-এর আগে এবং পরে। কারণ ২০১৫ সালের ২৭ মে সকালে ঘটেছিল এমন একটা ঘটনা, যা ফিফার প্রতিটা স্তরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
সেই দিন ছিল ফিফা কংগ্রেসের আগের দিন। জুরিখে বাউয়ার আউ ল্যাক হোটেল। পাঁচ তারা। ফিফা কর্মকর্তারা সবাই এখানে উঠেছিলেন। বিশ্বকাপ আয়োজক নির্বাচন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, বাজেট আলোচনা, সব কর্মসূচি।
সকাল ৬টায় সুইস পুলিশ হোটেলে ঢুকল। এফবিআইয়ের সহযোগিতায়। ঠিক ৭ জন ফিফা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার। মূলত কনকাকাফ ও কনমেবল থেকে। তাঁরা তখন ব্রেকফাস্ট করছিলেন।
কেন এই অভিযান? আমেরিকান বিচার বিভাগ তখন দীর্ঘ তদন্তে। জ্যাক ওয়ার্নার, সাবেক ফিফা ভাইস প্রেসিডেন্ট, ট্রিনিদাদের। চাক ব্লেজার, সাবেক ExCo সদস্য। এদের বিরুদ্ধে ২ বিলিয়ন ডলারের ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ।
অভিযোগগুলো ভয়াবহ। প্রথম, বিশ্বকাপ আয়োজক নির্বাচনে ঘুষ। ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপ আয়োজনে ExCo সদস্যদের ভোট কেনা। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০-এ ১০ মিলিয়ন ডলার ঘুষ দিয়েছে অভিযোগ। ব্রাজিল ২০১৪-এর জন্যও একই।
দ্বিতীয়, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ঘুষ। এটা সবচেয়ে বিতর্কিত। কাতার ২০১০-এর ডিসেম্বরে ভোট জিতেছিল। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে। অনেকে সন্দেহ করেন, কাতার ExCo সদস্যদের কাছে বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছিল। ফরাসি সংবাদপত্র লে মন্ডে ২০২০-এ প্রমাণ প্রকাশ করেছিল।
তৃতীয়, সম্প্রচার অধিকার বিক্রিতে কমিশন। কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পকেটে টাকা নিয়েছিলেন সম্প্রচার চ্যানেলগুলো থেকে। লাতিন আমেরিকান সম্প্রচার অধিকার বিক্রিতে বিশেষ করে। ফক্স স্পোর্টসের কর্মকর্তারাও পড়েছেন এই মামলায়।
চতুর্থ, ল্যাটিন আমেরিকান ফুটবল টুর্নামেন্টে ঘুষ। কনমেবল আর কনকাকাফের সম্প্রচার চুক্তিতে ১৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যক্তিগত পকেটে।
সেপ ব্লাটার তখন ফিফার প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৮ থেকে। মানে ১৭ বছর। ২৭ মে সকালে গ্রেপ্তারি ছিল বিশাল ধাক্কা। তিনি নিজে গ্রেপ্তার হননি। কিন্তু কাউন্সিলের অর্ধেক সদস্য অভিযুক্ত।
দু'দিন পরে, ২৯ মে, ফিফা কংগ্রেসে ব্লাটার পুনর্নির্বাচিত। এশিয়ান, আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান ভোটে জয়। ইউরোপ তাঁর বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু ছোট দেশের ভোট নিয়ে জেতা যায়।
কিন্তু চারদিন পরে, ২ জুন। ব্লাটার হঠাৎ পদত্যাগ ঘোষণা। কী হয়েছিল? সঠিক জানা যায় না। ঘুম বলা হয়। বলা হয়, এফবিআই আরো বেশি কর্মকর্তার নাম প্রকাশের হুমকি দিয়েছিল। ব্লাটার নিজে বাঁচার জন্য পদত্যাগ।
পরে তদন্তে দেখা গেল, ব্লাটার নিজে ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ অনৈতিক পেমেন্ট নিয়েছিলেন উয়েফা প্রেসিডেন্ট মিশেল প্লাতিনির কাছ থেকে। প্লাতিনি বলেছিলেন, এটা পরামর্শদাতা ফি। কিন্তু কোনো চুক্তি ছিল না। কোনো কাগজ নেই। ফিফা এথিক্স কমিটি দু'জনকে ৮ বছরের জন্য ব্যান করেছিল। পরে কমিয়ে ৬ বছর।
২০১৬ ফেব্রুয়ারিতে ফিফা কংগ্রেস। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রার্থী পাঁচজন। জিয়ান্নি ইনফান্তিনো (সুইস)। প্রিন্স আলি (জর্ডান)। শেখ সালমান (বাহরাইন)। জেরোম চ্যাম্পাগন (ফরাসি)। টোকিও সেক্সওয়ালে (দক্ষিণ আফ্রিকান)।
প্রথম রাউন্ডে কেউ ৫০% পাননি। দ্বিতীয় রাউন্ডে ইনফান্তিনো জয়ী। ১১৫ ভোট। শেখ সালমান ৮৮। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, কিছু আফ্রিকান দেশ ইনফান্তিনোকে ভোট দিয়েছিল।
ইনফান্তিনো তখনই সংস্কার ঘোষণা করলেন। বেশ কয়েকটা মূল পরিবর্তন।
প্রথম, ExCo বদলে ফিফা কাউন্সিল। আরো সদস্য (২৪ থেকে ৩৭)। প্রতিটা কনফেডারেশন থেকে বাধ্যতামূলক নারী সদস্য। মোট কমপক্ষে ছ'জন নারী।
দ্বিতীয়, প্রেসিডেন্টের মেয়াদ সীমিত। চার বছরের তিন মেয়াদ। সর্বোচ্চ ১২ বছর। ব্লাটারের ১৭ বছর আর সম্ভব না।
তৃতীয়, বেতন প্রকাশ। প্রেসিডেন্ট, কাউন্সিল সদস্য, সবার বেতন প্রকাশিত। বার্ষিক অডিট বাধ্যতামূলক।
চতুর্থ, স্বাধীন এথিক্স কমিটি। ফিফা কর্মকর্তাদের যাচাই। ইনভেস্টিগেশন ক্ষমতা।
পঞ্চম, বিশ্বকাপ আয়োজক নির্বাচনে ভোট সমস্ত কংগ্রেস সদস্যদের। আগে শুধু ২৪ জন ExCo সদস্য ভোট দিতেন। এখন ২১১টা ফেডারেশন।
এই সংস্কারগুলো প্রশংসিত। কিন্তু সমালোচকরা বলেন, কাগজে ভালো, বাস্তবে দুর্বল। কারণ ২০২৩-এ ফিফা এথিক্স কমিটি ইনফান্তিনো নিজের বিরুদ্ধেই তদন্ত বন্ধ করে দিয়েছে। ২০৩৪ সৌদি আরব বিশ্বকাপ দেওয়ার সিদ্ধান্তে আবার প্রশ্ন। প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না।
সহজ কথায়: ২৭ মে ২০১৫ জুরিখে বাউয়ার আউ ল্যাক হোটেলে এফবিআই অভিযান। ৭ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার। $২B+ ঘুষের অভিযোগ। বিশ্বকাপ ভোট কেনা (কাতার ২০২২), সম্প্রচার অধিকার কমিশন। ব্লাটার পদত্যাগ। ইনফান্তিনো নির্বাচিত। সংস্কার: কাউন্সিল, ১২-বছর সীমা, বেতন প্রকাশ, স্বাধীন এথিক্স। তবু ২০৩৪ সৌদি বিতর্কে ফিরে আসছে সন্দেহ।
ফিফার আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেলেঙ্কারি না। বরং ক্ষমতার লড়াই। তিন পক্ষের মধ্যে। ফিফা নিজে। উয়েফা মহাদেশীয় কনফেডারেশন হিসেবে। আর ইউরোপীয় বড় ক্লাবগুলো।
ইউরোপীয় বড় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার সিটি, বায়ার্ন মিউনিখ, জুভেন্টাস, লিভারপুল, পিএসজি। এই ক্লাবগুলো বছরের ৭০-৮০% ম্যাচ খেলেন। খেলোয়াড় বেতন সারা বছর দেন। কিন্তু বিশ্বকাপের সময় খেলোয়াড় জাতীয় দলে চলে যান। ক্লাব ক্ষতিতে পড়েন। বিশেষ করে যদি আঘাত পান।
উদাহরণ। ২০২৩-এ ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার ভিনিসিয়াস জুনিয়র রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে। বেতন প্রায় ১০ মিলিয়ন ইউরো বছরে। কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের হয়ে খেলতে গিয়ে হ্যামস্ট্রিং আঘাত। রিয়াল মাদ্রিদ তিন মাস তাঁকে পায়নি। কিন্তু বেতন দিতেই হয়েছে। ক্ষতি প্রায় ২.৫ মিলিয়ন।
ক্লাব ক্ষতিপূরণ প্রোগ্রাম এই সমস্যা কিছুটা সমাধান করেছে। কিন্তু ক্লাবরা বলেন, ২০০ মিলিয়ন ডলার যথেষ্ট না। যদি বছরে সব জাতীয় দল খেলা যোগ করেন, প্রকৃত ক্ষতি ৫০০ মিলিয়ন।
তাছাড়া অভিযোগ, ফিফা ম্যাচের ক্যালেন্ডার ঘন করে দিচ্ছে। ৭০+ ম্যাচ বছরে। খেলোয়াড়রা ক্লান্ত। বার্নআউট। ২০২৩-এ খেলোয়াড়দের সংগঠন ফিফপ্রো ফিফার বিরুদ্ধে মামলা করেছে বেলজিয়ামের আদালতে।
উয়েফা ফিফার সবচেয়ে বড় ও ধনী কনফেডারেশন। কিন্তু ফিফার সঙ্গে ক্রমশ দ্বন্দ্ব বাড়ছে।
প্রথম বড় দ্বন্দ্ব, ২০২১-এ ইনফান্তিনো ঘোষণা দিলেন, বিশ্বকাপ দুই বছরে একবার হবে। তাঁর যুক্তি, চার বছরে একবার মানে একটা প্রজন্মের অনেকে বিশ্বকাপ কম দেখতে পাবেন। দুই বছরে করলে বাজার বাড়বে।
উয়েফা তীব্র প্রতিবাদ করল। কারণ ইউরো টুর্নামেন্ট প্রতি চার বছরে একবার হয়। বিশ্বকাপও চার বছরে। এই দু'টো মিলে প্রতি দু'বছরে একটা বড় টুর্নামেন্ট। ফিফার প্রস্তাব মানে বছরে একবার বড় টুর্নামেন্ট। ফলে ইউরোর গুরুত্ব কমবে। উয়েফার আয়ও।
উয়েফার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন কনমেবল, ফিফপ্রো এবং ইউরোপীয় বড় ক্লাবগুলো। সবাই বিরোধিতায়। ফলাফল, ২০২২-এ ইনফান্তিনো প্রস্তাব প্রত্যাহার। উয়েফার শক্তি প্রমাণ।
দ্বিতীয় দ্বন্দ্ব, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। ২০১৯-এ উয়েফা প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার সেফেরিন ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে প্রার্থী করতে চেয়েছিলেন। তিন সপ্তাহের নাটক। শেষে সরে গেলেন। কিন্তু দ্বন্দ্ব বাড়ল।
২০২১ এপ্রিলের এক রাতে ইউরোপের ১২টা বড় ক্লাব ঘোষণা দিল, তাঁরা নতুন একটা লিগ গড়বেন। নাম, ইউরোপিয়ান সুপার লিগ। প্রতিষ্ঠাতা রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, জুভেন্টাস, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটি, টটেনহ্যাম, এসি মিলান, ইন্টার মিলান, আটলেটিকো মাদ্রিদ।
লক্ষ্য উয়েফার চ্যাম্পিয়নস লিগের বিকল্প। এই ক্লাবগুলো বলেছিলেন, চ্যাম্পিয়নস লিগে আয় কম। প্রতিটা ক্লাব বছরে ৫০ মিলিয়ন ইউরো পান। সুপার লিগে ৩০০ মিলিয়ন প্রত্যাশা।
কিন্তু ভক্তরা বিদ্রোহ করলেন। ইংলিশ ভক্তরা রাস্তায়। জার্মান ভক্তরাও। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ, সবাই বিরোধিতা। ৪৮ ঘণ্টায় ৯টা ক্লাব সরে গেল। শুধু রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, জুভেন্টাস থাকল।
কিন্তু গল্প শেষ না। রিয়াল মাদ্রিদ ইইউ কোর্টে মামলা করল উয়েফার বিরুদ্ধে। যুক্তি, উয়েফা একচেটিয়া প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করে। যা ইইউ প্রতিযোগিতা আইনের বিরুদ্ধে। ২০২৩-এ ইইউ কোর্ট রিয়ালের পক্ষে রায় দিল। সুপার লিগ ঠেকাতে উয়েফার ক্ষমতা নেই।
প্রকল্প এখনো সজীব। ২০২৭-২৮-এ চালুর প্রস্তুতি। নতুন কাঠামো, বেশি দল, বেশি নমনীয়তা। বাস্তবে চালু হবে কি না, নিশ্চিত না।
এই সব দ্বন্দ্বের মাঝে ফিফা একটা কার্ড খেলেছে। ফিফা কাব বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ।
আগের ফিফা কাব বিশ্বকাপ ছোট ছিল। মাত্র ৭ দল। বছরে একবার। মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়ন ক্লাবরা যেত। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ চ্যাম্পিয়ন, কনমেবল কোপা লিবার্তাদোরেস চ্যাম্পিয়ন, এশিয়া, আফ্রিকা, কনকাকাফ, ওএফসি চ্যাম্পিয়ন। ফাইনাল ফিফা কাব বিশ্বকাপ। কম দর্শক। কম আয়।
কিন্তু ২০২৫-এ ইনফান্তিনো নতুন ফরম্যাট ঘোষণা করলেন। ৩২ দল। প্রতি চার বছরে একবার। আমেরিকায় ২০২৫-এর জুন-জুলাই। মোট ১ বিলিয়ন ডলার প্রাইজ পুল। চ্যাম্পিয়ন পাবে ১২৫ মিলিয়ন।
এই সম্প্রসারণ ইউরোপীয় বড় ক্লাবদের জন্য টোপ। ১২৫ মিলিয়নের প্রলোভনে অস্বীকার করা কঠিন। ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়াল মাদ্রিদ, চেলসি, বায়ার্ন, সবাই যোগ দিয়েছেন।
কিন্তু খেলোয়াড় সংগঠন ফিফপ্রো প্রতিবাদ করেছে। ২০২৫-এ ৩২ দলের কাব বিশ্বকাপ মানে ক্লাব ফুটবলে আরো ৭ ম্যাচ। বছরে খেলোয়াড় ৭৫+ ম্যাচ। ক্লান্তি চরম।
সহজ কথায়: তিন লড়াই। ফিফা vs ইউরোপীয় ক্লাব (খেলোয়াড় চাপ ও ক্ষতিপূরণ), ফিফা vs উয়েফা (২ বছরের বিশ্বকাপ, ২০২২-এ প্রত্যাহার), ক্লাব vs উয়েফা (সুপার লিগ ২০২১, ২০২৩-এ ইইউ কোর্টের রায়)। ফিফার পাল্টা: কাব বিশ্বকাপ ৩২ দলে সম্প্রসারণ, $১B পুরস্কার। খেলোয়াড় সংগঠন মামলায়।
ফিফার ইকোসিস্টেমে বাংলাদেশের অবস্থান পিরামিডের অনেক নিচে। বিশ্ব ফুটবল র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ ১৮৪ (জুলাই ২০২৬)। এশিয়ার মধ্যেও নিচের দিকে। বিশ্বকাপে যাওয়া কখনো হয়নি। এশিয়া কাপে শেষবার ১৯৮০-এ। মানে ৪৬ বছর।
তবু ফিফার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘ। কারণ ২১১টা সদস্যের একটা বাংলাদেশ। ভোট সমান। অর্থনৈতিক সংযোগ ছোট, কিন্তু আছে।
বিএফএফ ১৯৭২-এ প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার পরে। প্রথম সভাপতি এম কামরুজ্জামান। ফিফা সদস্যপদ ১৯৭৪-এ। এএফসি সদস্যপদ ১৯৭৬-এ। স্বাধীন দেশের ফুটবল যাত্রা শুরু।
সদর দপ্তর মতিঝিলের বাফুফে ভবনে। এখন প্রায় ৪০ জন কর্মী। সভাপতি নির্বাচিত। কাউন্সিলর ৭২ জন। জেলা ফুটবল সংস্থা, ক্লাব, ফুটবল ইউনিভার্সিটি, এসব থেকে।
২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। চার মেয়াদ, ১৬ বছর। এই দীর্ঘ শাসনে অনেক অভিযোগ। স্বেচ্ছাচারিতা। আর্থিক অস্বচ্ছতা। ২০২৪-এর নির্বাচনে সালাউদ্দিন হারলেন। নতুন সভাপতি তাবিথ আউয়াল। ব্যবসায়ী।
ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম থেকে বিএফএফ চার বছরে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার পায়। মানে বছরে ১.৫-২ মিলিয়ন। এটা বিএফএফের বার্ষিক বাজেটের একটা বড় অংশ।
খরচ চারটে খাতে বাধ্যতামূলক। প্রথম, জাতীয় দলের অপারেশন। ম্যাচ, প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ, কোচ। দ্বিতীয়, যুব উন্নয়ন। বয়সভিত্তিক দল (অনূর্ধ্ব ১৭, ২০, ২৩)। অ্যাকাডেমি। তৃতীয়, নারী ফুটবল। এটা বিশেষ জোর। কারণ বিএফএফের নারী দল এশিয়া কাপ ২০২২-এ যোগ্য। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ২০২২-এ চ্যাম্পিয়ন। তহবিল প্রায়ই বাড়ানো হচ্ছে। চতুর্থ, অবকাঠামো। মাঠ। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। কমলাপুরের বাফুফে টেকনিক্যাল সেন্টার এই টাকায় ২০১৬-এ চালু।
কিন্তু অভিযোগ আছে। বিএফএফের হিসাবের স্বচ্ছতা কম। ২০২৩-এ ফিফা একবার সতর্ক করেছিল, রিপোর্টিং ঠিকমতো না হলে ভবিষ্যৎ বরাদ্দ বন্ধ হতে পারে। বিএফএফ কিছু সংস্কার করেছে। তবে সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের ইতিহাসও চমকপ্রদ। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত অধিকার ছিল বিটিভির (বাংলাদেশ টেলিভিশন)। সরকারি চ্যানেল। বিনামূল্যে দেখানো হতো।
২০১০ ও ২০১৪-এ মাছরাঙা টিভি ও চ্যানেল আই মিলে অধিকার কেনে। বেসরকারি চ্যানেল। বিজ্ঞাপন-নির্ভর। মূল্য প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার প্রতি চক্র।
২০১৮-এর গল্প ভিন্ন। কোনো বাংলাদেশী চ্যানেল অধিকার কেনেনি। ফিফা মূল্য বাড়িয়েছিল। বাংলাদেশী চ্যানেল বিজ্ঞাপন থেকে সেই পরিমাণ আয় করতে পারেনি বুঝে সরে যায়। ফলে বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তরা ২০১৮ বিশ্বকাপ দেখেছিলেন ভারতীয় সনি টেন চ্যানেলে। ডিটিএইচ বা কেবলে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফিরে এসেছিল বাংলাদেশী সম্প্রচার। টি স্পোর্টস আর নাগরিক টিভি মিলে অধিকার কিনেছিল। মূল্য প্রায় ৮-১০ মিলিয়ন ডলার। মূল্য বাড়ানোর জন্য বসুন্ধরা গ্রুপ এবং প্রাণ-আরএফএল স্পন্সর হিসেবে সাহায্য করেছিল।
২০২৬-এর জন্য ফিফা আরো বেশি চাইছে। কারণ ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ। প্রত্যাশা ১৫ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী চ্যানেল যদি না কেনে, আবার ভারতীয় চ্যানেলে দেখতে হবে।
বিশ্বকাপ ফিফা পার্টনার হওয়ার মতো বাংলাদেশী কোম্পানি নেই। কারণ ন্যূনতম চুক্তি ১০০ মিলিয়ন ডলার। এত টাকা বাংলাদেশী একক কোম্পানির নেই। থাকলেও ফিফা পার্টনার হওয়ার আর্থিক ROI কম।
তবে স্থানীয় স্পন্সরশিপে বাংলাদেশী ব্র্যান্ডরা অংশ নেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে টি স্পোর্টসের সম্প্রচারে ওয়ালটন, প্রাণ, বসুন্ধরা, বিকাশ, নগদ, ফ্রেশ, এসব বড় স্পন্সর ছিলেন। প্রতিটা ব্র্যান্ড ২-১০ কোটি টাকা করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ফুটবলের ভবিষ্যৎ কী? আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে দু'টো সম্ভাবনা।
প্রথম, নারী ফুটবলে অগ্রগতি। সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানী সরকার, সানজিদা আক্তার, এই খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জনের কাছাকাছি। ২০২৭ ব্রাজিল বিশ্বকাপের এশিয়ান বাছাইপর্বে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থানে।
দ্বিতীয়, যুব ফুটবলে বিনিয়োগ। বেঙ্গল সেলুলার ফুটবল লিগ, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, বসুন্ধরা কিংস, শেখ রাসেল, এসব ক্লাব যুব খেলোয়াড় গড়ছে। ২০৩৪-এ বাংলাদেশ পুরুষ বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন সম্ভব যদি এই বিনিয়োগ অব্যাহত থাকে।
সহজ কথায়: বিএফএফ ১৯৭২-এ প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৪-এ ফিফা সদস্য। ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রামে বছরে $১.৫-২M। খরচ চার খাতে (জাতীয় দল, যুব, নারী, অবকাঠামো)। বিশ্বকাপ সম্প্রচার T Sports ২০২২-এ $১০M। ২০২৬-এ $১৫M প্রত্যাশা। বাংলাদেশী ফিফা পার্টনার নেই ($১০০M ন্যূনতম)। ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নারী ফুটবল ও যুব বিনিয়োগে।
ফিফার ভবিষ্যৎ কোথায়? গত দশ বছরে যা ঘটেছে, তার থেকে বোঝা যায় সামনের দশ বছরও চ্যালেঞ্জিং। কয়েকটা প্রবণতা স্পষ্ট।
২০২৬ আমেরিকান বিশ্বকাপ ৪৮ দল। ২০৩০-এ ছ' দেশ আয়োজক (পর্তুগাল-স্পেন-মরক্কো-আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ে-প্যারাগুয়ে)। ২০৩৪-এ সৌদি আরব। প্রতিটা বিশ্বকাপ আগেরটার চেয়ে বড়।
কোথায় থামবে? ইনফান্তিনো ২০৩৮-এ ৬৪ দলের বিশ্বকাপ প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে খেলোয়াড় সংগঠন প্রতিবাদে। কারণ এত বেশি ম্যাচ খেলোয়াড় শারীরিকভাবে অসম্ভব।
এতদিন ফিফা মূলত জাতীয় দল সামলাত। এখন কাব ফুটবলে ঢুকছে। ২০২৫-এ ৩২ দলের কাব বিশ্বকাপ। ভবিষ্যতে বার্ষিক করার প্রস্তাব। এটা উয়েফা ও ইউরোপীয় ক্লাবের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা। কারণ চ্যাম্পিয়নস লিগ উয়েফার। কাব বিশ্বকাপ ফিফার। দু'টো একই ম্যানেজমেন্ট ও খেলোয়াড় ব্যবহার করে।
নারী বিশ্বকাপ ২০১৯ ফ্রান্স, ২০২৩ অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড, ২০২৭ ব্রাজিল। আয় দ্রুত বাড়ছে। ২০১৯-এ ২৫০ মিলিয়ন, ২০২৩-এ ৫৭০ মিলিয়ন, ২০২৭-এ ১ বিলিয়ন প্রত্যাশা।
নারী ফুটবলের বিজ্ঞাপন মূল্য বাড়ছে। কারণ নতুন দর্শক। মহিলা এবং মেয়ে। ফিফা এই বাজার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। নারী বিশ্বকাপ প্রাইজ মানি ২০২৩-এ ১৫০ মিলিয়ন। যা এখনো পুরুষদের তুলনায় ৩ গুণ কম। কিন্তু বাড়ছে।
ফিফা+ চালু হয়েছে ২০২২-এ। একটা স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম। বিনামূল্যে। বছরে ৪০ মিলিয়ন ব্যবহারকারী। ছোট টুর্নামেন্ট, নারী ফুটবল, বয়সভিত্তিক ম্যাচ, ফিফা+-এ।
ভবিষ্যতে ফিফা+ আরো বাড়বে। বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচ সরাসরি ফিফা+-এ হতে পারে। ইএসপিএন বা স্কাইকে টেক্কা দেবে।
সৌদি আরামকো ২০২৪-এ ফিফা পার্টনার হয়েছে। ২০৩৪ বিশ্বকাপ সৌদি। সৌদি প্রো লিগে বিলিয়ন ডলার। নেইমার, রোনালদো, বেনজেমা। সৌদি পিআইএফ নিউক্যাসল ইউনাইটেড কিনেছে। সৌদি বিশ্ব ফুটবলে ক্রমশ বড় হচ্ছে।
ফিফায় সৌদির প্রভাব ২০৩০-নাগাদ ফিফা পার্টনারদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হবে। রাজনৈতিক প্রভাবও।
সব সম্প্রসারণে ভক্তরা ক্লান্ত হচ্ছেন। খুব বেশি ম্যাচ। খেলোয়াড়দের চাপ। খেলার মান কমছে। ইউরোপীয় ফ্যান ফোরামগুলো ক্রমাগত অভিযোগ করছেন।
একটা উদাহরণ। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ শুরুতে ইউরোপীয় ভক্তরা প্রায় বয়কট করেছিলেন মানবাধিকার প্রশ্নে। জার্মান দল প্রথম ম্যাচে মুখে হাত দিয়েছিল প্রতিবাদে। ২০৩৪ সৌদি বিশ্বকাপে আরো বেশি বয়কটের সম্ভাবনা।
ভক্তদের বিদ্রোহ ফিফার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কারণ ভক্ত ছাড়া সম্প্রচার নেই। সম্প্রচার ছাড়া টাকা নেই।
ফিফার গল্প শেষে দাঁড়িয়ে একটা মূল সত্য বের হয়ে আসে। এই ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের যন্ত্র চলে একটা জিনিসে। মানুষের প্যাশন। ঢাকার একজন রিকশাচালক তাঁর ২০০ টাকার ভাড়ার একটা অংশ দিয়ে চা খেতে খেতে ম্যাচ দেখেন। একজন ব্রাজিলিয়ান শিশু প্রিয় খেলোয়াড়ের নামের জার্সি পরে স্বপ্ন দেখে। একজন সৌদি রাজপুত্র ভিআইপি বক্সে বসে ফুটবলে বিনিয়োগ করেন। তিনজনের প্যাশন একই। ভিন্ন শুধু প্রকাশ।
এই প্যাশনকে সম্প্রচার অধিকার, স্পন্সরশিপ, টিকিট, লাইসেন্সিং, চার-স্তরের রাজস্বে রূপান্তরিত করাই ফিফার আসল ব্যবসা মডেল। যত বেশি প্যাশন, তত বেশি টাকা। তত বেশি টাকা, তত বড় বিশ্বকাপ। তত বড় বিশ্বকাপ, তত বেশি প্যাশন। একটা চক্র।
কিন্তু এই চক্রের একটা সীমা আছে। যখন ম্যাচ এত বেশি যে ভক্ত ক্লান্ত হন। যখন কেলেঙ্কারি এত বেশি যে বিশ্বাস কমে। যখন বিশ্বকাপ এত বাণিজ্যিক যে খেলার সৌন্দর্য হারায়। তখনই এই চক্র ভাঙতে শুরু করে।
ফিফার সামনে সেই বাঁকই। ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। ২০ বছর পরে ২০ বিলিয়নে যাবে, নাকি প্যাশন কমে গিয়ে ৫ বিলিয়নে নামবে? উত্তর সময়ের হাতে।
"ফিফা মানে ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের একটা বিশাল যন্ত্র। কিন্তু এই যন্ত্র চলে মানুষের প্যাশনে। বাংলাদেশী রিকশাচালক থেকে সৌদি রাজপুত্র পর্যন্ত। সেই প্যাশনকে সম্প্রচার, স্পন্সর, টিকিট, লাইসেন্সে রূপান্তরিত করাই ফিফার আসল ব্যবসা। এই প্যাশন কমলে ফিফা কিছুই না।"

ইম্প্যাথি ম্যাপিং মূলত একধরনের ট্যুলস। এটি গ্রাহকদের ভাবনা-চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, অনুভব, উপলব্ধি সহ নানাবিধ তথ্য, উপাত্ত এর সমন্বয়ে গঠিত সুশৃঙ্খল এবং সুবিন্যস্ত একটি চার্ট। উল্লেখিত বিষয় সমূহ সম্পর্কিত তথ্য উপাত্তের খুব চমৎকার একটা ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন পাওয়া যায় এই ইম্প্যাথি ম্যাপিং এর মাধ্যমে। যা মূলত আপনার কাঙ্ক্ষিত গ্রাহককে ভালভাবে বুঝতে সহায়তা করে।








