ভূমিকা
ব্যবসার জগতে নতুন করে প্রবেশ করা সব সময় সহজ হয় না। একটি নতুন কোম্পানি যখন কোনো নির্দিষ্ট বাজারে প্রবেশ করতে চায়, তখন তাকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। এই প্রতিবন্ধকতাগুলোকেই 'বাজারে প্রবেশের বাধা' বলা হয়। এগুলো বিদ্যমান কোম্পানিগুলোকে সুরক্ষা দেয় এবং নতুনদের জন্য প্রতিযোগিতা করা কঠিন করে তোলে। এই বাধাগুলো একটি বাজারের কাঠামো, প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদী লাভজনকতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এই বাধাগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো নতুন উদ্যোগের বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
বাজারে প্রবেশের বাধা
বাজারে প্রবেশের বাধা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে এবং প্রতিটি বাধারই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব রয়েছে। নিম্নে প্রধান কিছু বাধার প্রকারভেদ ও তাদের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
১। পুঁজির প্রয়োজনীয়তা
একটি নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রায়শই প্রচুর পুঁজির প্রয়োজন হয়। যেমন - একটি উৎপাদনমুখী কারখানার জন্য জমি, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এবং শ্রমিকদের বেতন বাবদ বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার হয়। বাংলাদেশে, যেখানে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হার এবং জামানতের প্রয়োজনীয়তা থাকে, সেখানে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য নতুন করে ব্যবসায় স্থাপন করা বেশ কঠিন হয়ে পরে। উদাহরণস্বরূপ, সিমেন্ট বা ইস্পাত শিল্পের মতো ভারী শিল্পে প্রবেশের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ করতে হয়, যা নতুন কোম্পানির পক্ষে যোগাড় করা অসম্ভব।
২। সরকারের নীতি ও প্রবিধান
সরকার বিভিন্ন শিল্পে প্রবেশের জন্য লাইসেন্স, পারমিট এবং নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন বাধ্যতামূলক করে দেয়। যেমন - ঔষধ শিল্প, ব্যাংকিং বা টেলিকমিউনিকেশন সেক্টরে কাজ করতে হলে কঠোর সরকারি অনুমোদন ও নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। বাংলাদেশে, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবের প্রয়োজন হয়। পরিবেশগত ছাড়পত্র বা ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্সের মতো বিষয়গুলোও নতুন ব্যবসার জন্য সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হতে পারে। যার কারণে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারলেও নতুন উদ্যোগের জন্য ব্যবসায় শুরু করা হয়ে পরে প্রায় অসম্ভব।
৩। প্রযুক্তির সুবিধা ও জ্ঞান
প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর কাছে প্রায়শই উন্নত প্রযুক্তি এবং গভীর জ্ঞান থাকে, যা তাদের উৎপাদন খরচ কমাতে বা মান উন্নত করতে সাহায্য করে। নতুনদের পক্ষে এই প্রযুক্তি ও জ্ঞান অর্জন করা কঠিন ও ব্যয়বহুল হতে পারে। যেমন - সেমিকন্ডাক্টর বা উন্নত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের মতো শিল্পে প্রবেশের জন্য উচ্চ স্তরের গবেষণা ও উন্নয়নের প্রয়োজন হয়, যা ছোট কোম্পানির জন্য প্রায় অসম্ভব। এছাড়াও বাজারে ভালো মানের পণ্য নিয়ে আসা, কাস্টমারদের যথাযথ চাহিদা পরিমাপ করা ও অন্যান্য কারণে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার প্রয়োজন হয়, যা নতুন উদ্যাগের জন্য কঠিন হয়ে পরে।
৪। সাপ্লাই চেইনের নিয়ন্ত্রণ
অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো পণ্যের সাপ্লাই চেইনের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখে, যা নতুনদের জন্য তাদের পণ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন করে তোলে। যেমন - বড় ব্র্যান্ডগুলো খুচরা বিক্রেতাদের সাথে এক্সক্লুসিভ চুক্তি করে রাখতে পারে। যার কারণে খুচরা বিক্রেতাগণ নতুন কোম্পানির পণ্যকে প্রাধান্য দেন না বা অনেক সময় পণ্যই রাখতে চান না। তাই বাংলাদেশে, ভোগ্যপণ্য বা ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর বাজারে বড় ডিস্ট্রিবিউটর নেটওয়ার্ক তৈরি করা নতুনদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
৫। ব্র্যান্ড পরিচিতি ও কাস্টমার লয়ালটি
প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোর ভালো পরিচিতি এবং কাস্টমার লয়ালটি থাকে। নতুনদের পক্ষে এই আনুগত্য ভেঙে নিজেদের জন্য বাজার তৈরি করা কঠিন হয়। যেমন - কোকা-কোলা বা পেপসির মতো পানীয় ব্র্যান্ডগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করা নতুন কোমল পানীয় ব্র্যান্ডের জন্য প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এমন শক্তিশালী ব্র্যান্ড পরিচিতি রয়েছে। এই ব্র্যান্ড লয়ালটিতে ভাগ বসাতে চাইলে যেকোনো নতুন ব্র্যান্ডকে মার্কেটিং ও লয়ালটি তৈরির পেছনে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয়, যা বেশিরভাগ ব্র্যান্ডের জন্য সম্ভব হয় না।
৬। কাঁচামাল ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ
অনেক ক্ষেত্রে, বাজারে থাকা বড় কোম্পানিগুলো প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহ বা গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাখে। যেমন - বাংলাদেশের গ্যাস-নির্ভর শিল্পে বা কাঁচা চামড়া সংগ্রহে বড় কোম্পানিগুলোর আধিপত্য থাকে। নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তখন ন্যায্য মূল্যে বা পর্যাপ্ত পরিমাণে এই উপাদানগুলো সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে নতুন ব্যবসা শুরু করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, যা বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয় এবং উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করে।
পরিসংহার
বাজারে প্রবেশের বাধাগুলো যেকোনো অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলো একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোকে সুরক্ষা দেয়, অন্যদিকে নতুনদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এসব বাধা দূর করা গেলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি হবে, যা প্রতিযোগিতা বাড়াবে, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। একটি সুস্থ ও গতিশীল অর্থনীতির জন্য এই বাধাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর কার্যকর সমাধান করা জরুরি।









