ভূমিকা: বাজেটের দিনে আমরা যে প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করি
প্রতি বছর জুন মাসে আমরা একটা অভ্যাস পালন করি। অর্থমন্ত্রী বাজেট দেন। পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা ছাপে। টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান চলে রাতভর। চা দোকান, অফিসের ক্যান্টিন, পরিবারের ডিনার টেবিল, সর্বত্র একই ধরনের প্রশ্ন উঠে আসে। বাজেটের আকার কত? কোন জিনিসের দাম বাড়বে? কোন জিনিসের দাম কমবে? করের হার কমলো না বাড়লো? আমার মাসিক বাজেটে কত প্রভাব পড়বে?
এই প্রশ্নগুলো ভুল না। তবে এগুলোই যদি আমাদের একমাত্র প্রশ্ন হয়, তাহলে আমরা আসলে বাজেট পড়ছি না। আমরা একটা মুদির দোকানের হিসাব দেখছি।
বাজেট হলো একটা গল্প। একটা দেশ কোথা থেকে আয় করে, কোথায় খরচ করে, জনগণের জন্য কী রেখে যায়, এবং কী নিয়ে যায়, সেই গল্প। এর সংখ্যাগুলো শুধু সংখ্যা না। প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা সিদ্ধান্ত আছে। সেই সিদ্ধান্ত পড়তে পারলে বোঝা যায়, সরকার ভবিষ্যৎ গড়তে চাইছে, না পুরোনো ক্ষতে মলম লাগাচ্ছে।
একটা ভালো বাজেট চেনার পাঁচটা মাপকাঠি আছে। বাজেটের আকার এদের কোনোটাতেই নেই। চলুন একে একে দেখি।
পাঁচ মাপকাঠির সংক্ষিপ্ত তালিকা:
- এক, টাকা আসছে কোথা থেকে? নিজের কর থেকে, না ধার থেকে?
- দুই, খরচ ভবিষ্যৎ গড়ছে, না পুরোনো ঋণ শোধ করছে?
- তিন, ঘাটতি মেটানো হচ্ছে কীভাবে? অভ্যন্তরীণ ধার, বিদেশি ঋণ, না টাকা ছাপানোয়?
- চার, সরকার আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই দিকে যাচ্ছে, নাকি বিপরীত?
- পাঁচ, এই বাজেট কাকে সুরক্ষা দিচ্ছে? গরিব এবং মধ্যবিত্ত, নাকি ক্ষমতার কাছাকাছি যাঁরা?
FY27-এর বাজেট ৯.৩৮ লক্ষ কোটি টাকা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। তবে এই সংখ্যা একটা ভাষ্য মাত্র। পুরো গল্পটা ভেতরে লুকানো। চলুন ভেতরে ঢুকি।
মাপকাঠি ১: টাকা আসছে কোথা থেকে?
একটা সহজ পরীক্ষা দিয়ে শুরু করি। আপনার পাশের পরিবারের মাসিক আয় কত, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরেকটা প্রশ্ন আছে যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই আয় আসছে কোথা থেকে? নিজের চাকরি, ব্যবসা, ভাড়া থেকে? নাকি প্রতি মাসে কাছের আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার নিচ্ছেন?
যে পরিবার প্রতি মাসে ধার করে চলে, তাদের ধনী বলা যায় না। তারা চলে অন্যের ভরসায়। দেশের বেলায়ও একই কথা। ভালো বাজেট হলো সেটা, যেখানে আয়ের সিংহভাগ আসে দেশের ভেতর থেকে। মূলত কর থেকে। এবং সেই কর-ও আসে ন্যায্যভাবে।
বাংলাদেশের অবস্থান: দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন
বাংলাদেশের Tax-to-GDP অনুপাত (অর্থাৎ মোট জিডিপির কত শতাংশ সরকার কর হিসেবে তুলতে পারে) ২০২৬ সালে মাত্র ৭.৪ শতাংশ। এই সংখ্যাটা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। পৃথিবীর অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়ও নিচের দিকে।
তুলনার জন্য কিছু সংখ্যা দেখি। ভারতের Tax-to-GDP প্রায় ১৭ শতাংশ। ভিয়েতনামের ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। নেপালের ১৯ শতাংশ। এমনকি পাকিস্তানেরও প্রায় ৯.৫ শতাংশ। অর্থাৎ আমরা শুধু পিছিয়ে আছি তা না, আমাদের প্রতিবেশী সব দেশেরও পিছনে।
এর মানে কী? যে দেশ নিজের নাগরিকদের কাছ থেকে যথেষ্ট কর তুলতে পারে না, তাকে অন্যের কাছ থেকে ধার নিতেই হয়। আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কথা মেনে চলতে হয়। সংস্কারের শর্ত পূরণ করতে হয়। সহজ কথায়, নিজের ঘরের চাবি অন্যের হাতে দিতে হয়।
কর কে দিচ্ছে: উল্টো হিসাব
কর কম তুলতে পারা একটা সমস্যা। কিন্তু আরও বড় সমস্যা আছে। যেটুকু কর তোলা হচ্ছে, সেটা কার কাছ থেকে আসছে?
এনবিআরের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে VAT অর্থাৎ পরোক্ষ কর জিডিপির ৩.৮৬ শতাংশ। আয়কর মাত্র ২.২৬ শতাংশ। পার্থক্য প্রায় দ্বিগুণ। পরোক্ষ কর কী? VAT, সম্পূরক শুল্ক, আমদানি শুল্ক। সবাই দেয়, ধনী-গরিব নির্বিশেষে। সাবান কিনলে, সিম-কার্ড রিচার্জ করলে, রেস্তোরাঁয় খেলে, সবার একই হারে।
আয়কর কী? আপনার বার্ষিক আয়ের উপর কর। ধনী বেশি দেবে, গরিব কম, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তাহলে যে দেশে পরোক্ষ কর আয়করের দ্বিগুণ, সেখানে আসলে কী হচ্ছে? গরিব এবং মধ্যবিত্তের পকেট থেকে বেশি, ধনীদের আয় থেকে কম। মানে কর-ব্যবস্থা নিজেই বৈষম্য বাড়াচ্ছে।
এনবিআর-এর নিজের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের নিবন্ধিত করদাতা প্রায় ১ কোটি। কিন্তু রিটার্ন দাখিল করেন ৪০ লক্ষের কাছাকাছি। এর মধ্যে শূন্য আয় দেখান অনেকে। আসলে কর দেন প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ। ১৭ কোটি জনসংখ্যার একটা দেশে ২০ লক্ষ প্রকৃত আয়করদাতা। প্রায় ১.২ শতাংশ। বিশ্বের অন্যতম নিম্ন।
সহজ কথায়: বাংলাদেশের কর-আদায় কাঠামো দুই দিক থেকেই দুর্বল। মোট আদায় কম (Tax-to-GDP ৭.৪%), এবং যা আদায় হচ্ছে সেটাও বেশির ভাগ গরিব-মধ্যবিত্তের পকেট থেকে (VAT দ্বিগুণ আয়করের)। ভালো বাজেট চেনার প্রথম পরীক্ষায় আমরা ফেল করছি।
মাপকাঠি ২: খরচ ভবিষ্যৎ গড়ছে, না ঋণ শোধ?
আপনার মাসিক বেতন থেকে ৪০ শতাংশ যদি পুরোনো ক্রেডিট কার্ডের সুদে চলে যায়, আপনি কি ভবিষ্যৎ গড়তে পারছেন? সন্তানের টিউশন, নিজের সঞ্চয়, ঘরের মেরামত, কিছুই করতে পারছেন কি? দেশের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন।
দু'রকমের খরচ আছে একটা বাজেটে। প্রথম, যা ভবিষ্যৎ তৈরি করে। দ্বিতীয়, যা শুধু আজকের দিন চালায়।
ভবিষ্যৎ গড়ে কোন খরচ? নতুন স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহ, গবেষণা, প্রযুক্তি, কৃষি গবেষণাগার। এসব ব্যয়ের ফল আমরা ১০ বছর, ২০ বছর, ৫০ বছর ধরে পাই।
শুধু আজকের দিন চালায় কোন খরচ? সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতা, পেনশন, বিভিন্ন ভর্তুকি, এবং সবচেয়ে বড়, পুরোনো ঋণের সুদ। এই খরচগুলোর কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু এদের পেছনে গেলে ভবিষ্যৎ গড়া যায় না।
FY27-এর সবচেয়ে বড় খরচ: সুদ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের বাজেট নথি অনুযায়ী, FY27-এর মোট বাজেট ৯.৩৮ লক্ষ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড়। তবে এই বাজেটের ভেতরে শুধু সুদ মেটাতে যাচ্ছে ১.৪২ লক্ষ কোটি টাকা। গণনা করলে দাঁড়ায়, মোট বাজেটের প্রায় ১৫.১ শতাংশ।
মানে কী দাঁড়াল? প্রতি ১০০ টাকার বাজেটের ১৫ টাকা পুরোনো ধারের সুদ দিতে চলে যাচ্ছে। নতুন কোনো রাস্তা না, নতুন স্কুল না, নতুন হাসপাতাল না। শুধু আগের বছরগুলোতে নেওয়া ধারের মাশুল।
তুলনার জন্য দেখি। FY27 বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৯৪,৭০০ কোটি, স্বাস্থ্য খাতে ৪২,৭০০ কোটি। অর্থাৎ পুরো শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য বরাদ্দ মিলিয়েও সুদ-পরিশোধের সমান হয় না। ১৭ কোটি মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের চেয়ে আগের সরকারগুলোর সিদ্ধান্তের মাশুল পরিশোধ আমাদের জন্য বড় চাপ।
ঋণের ফাঁদ
এই অবস্থাটাই ঋণের ফাঁদ। সুদ শোধ করতে আরও ধার। সেই নতুন ধারের সুদ শোধ করতে আরও ধার। গত ৫ বছরে বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণ ১২ লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে ২২ লক্ষ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। প্রায় দ্বিগুণ। জিডিপির অনুপাতে ঋণ এখন প্রায় ৪০ শতাংশ। গবেষকদের ভাষায়, একটা উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটা ঝুঁকির সীমার কাছাকাছি।
এখানে একটা ভুল ধারণা পরিষ্কার করি। অনেকে মনে করেন আসল সমস্যা সুদের হার। কমালেই সমস্যা মিটে যাবে। তবে এটা ভুল ধারণা। আসল সমস্যা সুদ না। আসল সমস্যা মূল ঋণ। যত ঋণ বাড়বে, তত সুদ বাড়বে, যত সুদ বাড়বে, তত নতুন ধার লাগবে।
সহজ কথায়: FY27-এর সবচেয়ে বড় একক ব্যয় সুদ পরিশোধ, যা পুরো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বরাদ্দ মিলিয়েও বেশি। যত দিন এই pattern থাকবে, তত দিন বাজেট ভবিষ্যৎ গড়ার বদলে অতীত পরিশোধের কাজ করবে।
মাপকাঠি ৩: ঘাটতি মেটানো হচ্ছে কীভাবে?
প্রায় প্রতিটা বাজেটে ঘাটতি থাকে। এটা স্বাভাবিক। বিশ্বের প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশের বাজেটে। প্রশ্ন হলো ঘাটতির আকার, এবং সেই ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে কীভাবে।
FY27-এর প্রস্তাবিত ঘাটতি ২.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা। জিডিপির প্রায় ৫.১ শতাংশ। আইএমএফের সুপারিশ অনুযায়ী এই সীমা সর্বোচ্চ ৪.৫ শতাংশ হওয়া উচিত। অর্থাৎ আমরা সীমা ছাড়িয়ে গেছি।
এই ঘাটতি পূরণের তিনটে রাস্তা আছে। প্রত্যেকটার আলাদা মূল্য আছে। চলুন এক এক করে দেখি।
পথ ১: দেশের ব্যাংক থেকে ধার
এটাই সবচেয়ে ব্যবহৃত পথ। সরকার বন্ড ইস্যু করে, ব্যাংকগুলো সেই বন্ড কিনে। সরকারের হাতে টাকা আসে, ব্যাংকের পোর্টফোলিওতে বন্ড।
এর সমস্যা কী? ব্যাংকের কাছে যে সীমিত টাকা থাকে, তার একটা বড় অংশ সরকারের কাছে চলে যায়। ফলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় crowding out effect। সরকার বড় ভাইয়ের মতো লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে যায়, বাকি সবাই পিছনে অপেক্ষা করেন।
পথ ২: বিদেশ থেকে ঋণ
আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি, এবং দ্বিপক্ষীয় ঋণ যেমন চীন, ভারত, জাপান থেকে। সাধারণত সুদের হার কম, ১-৩ শতাংশ। কাগজে কলমে আকর্ষণীয়।
তবে এর একটা লুকানো সমস্যা আছে। এই ঋণ ডলারে পরিশোধ করতে হয়। যদি টাকা দুর্বল হয়, যেমন গত পাঁচ বছরে ৮৫ টাকা থেকে ১২২ টাকায় এসেছে ডলারের দাম, তাহলে ঋণের প্রকৃত বোঝা বেড়ে যায়। ২০২০ সালে যিনি ১ মিলিয়ন ডলার নিয়েছিলেন ৮.৫ কোটি টাকায়, আজ তাঁকে পরিশোধ করতে হচ্ছে ১২.২ কোটি টাকা। শুধু ডলারের কারণে ৪৩ শতাংশ বেশি।
পথ ৩: কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়ে টাকা ছাপানো
এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক পথ। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বাজারে নতুন টাকা ছাড়ে, তা সরাসরি দামে প্রভাব ফেলে। কারণ পণ্যের উৎপাদন বাড়েনি, কিন্তু টাকার সরবরাহ বেড়েছে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি।
মুদ্রাস্ফীতি এমন একটা কর, যা সংসদে অনুমোদন লাগে না। সরকার ঘোষণা করে না। ব্যাংক চিঠি পাঠায় না। তবু আপনার পকেট থেকে প্রতি মাসে কেটে নেয়। বাজারে গিয়ে দেখেন একই বাজেটে গত বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ কম জিনিস। এই কাটাটাকেই অর্থনীতিবিদরা নীরব চুরি বলেন।
FY27-এর ভাগাভাগি
FY27-এর ২.৩৫ লক্ষ কোটি ঘাটতির মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা করেছে, প্রায় ১.২৫ লক্ষ কোটি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এর মধ্যে বেশির ভাগ ব্যাংক থেকে। প্রায় ১.১০ লক্ষ কোটি বিদেশি উৎস থেকে। তাত্ত্বিকভাবে টাকা ছাপানো নেই, তবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের একটা অংশ পরোক্ষভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাণ্ডার থেকে আসে।
এই কাঠামোর সরাসরি ফল কী? প্রথমত, ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণের জন্য সরকারের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছেন। সুদের হার বর্তমানে ১৪-১৬ শতাংশ, ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। নতুন কারখানা যিনি খুলতে চান, তিনি ঋণ পান না। পেলেও এত দামে যে নতুন উদ্যোগ লাভজনক করা প্রায় অসম্ভব।
দ্বিতীয়ত, এর সরাসরি প্রভাব private investment-এ। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের private investment-to-GDP অনুপাত ২০২৬ সালে প্রায় ২২ শতাংশ। গত ১৫ বছরের সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়ে না। কর্মসংস্থান ছাড়া আয় বাড়ে না। আয় ছাড়া কর তোলা যায় না। এই চক্রটাই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির গভীর সমস্যা।
সহজ কথায়: ঘাটতির আকার বড় হওয়া যত বড় সমস্যা না, ঘাটতি পূরণের পদ্ধতি তার চেয়ে বড় সমস্যা। FY27-এ ব্যাংক ঋণে ভারী নির্ভরতা private investment-কে রেকর্ড নিম্নে নামিয়েছে। অর্থনীতির সবচেয়ে অগ্রসরী যান্ত্রিকতা থেমে আছে।
মাপকাঠি ৪: সরকার আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই দিকে?
এই অংশটা একটু কঠিন। তবে এটাই বাংলাদেশের আজকের সবচেয়ে গভীর সমস্যা। ধীরে ধীরে বুঝি।
একটা গাড়ির কথা ভাবুন। সামনের সিটে দু'জন বসা। একজন accelerator চাপছেন, আরেকজন brake। দু'জনের ইচ্ছা ভিন্ন। গাড়িটা তখন কী করে? কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে চলে, ইঞ্জিন পুড়ে যায়, ব্রেক ক্ষয় হয়, শেষমেশ থেমে যায়। তবু গন্তব্যে পৌঁছায় না।
অর্থনীতিতে এই দু'জন হলেন সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা আজ ঘটছে, ঠিক এই গাড়ির গল্প।
দু'জনের দু'রকম কথা
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান কী? মুদ্রাস্ফীতি কমাতে হবে। গত দু'বছর ধরে মুদ্রাস্ফীতি ৯-১০ শতাংশের কাছাকাছি। লক্ষ্যমাত্রা ৬ শতাংশ। বহু দূর। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সুদের হার বাড়াও, টাকার চলাচল কমাও, ক্রেডিট সংকুচিত করো। অর্থাৎ অর্থনীতির গতি একটু ধীর করো। ইনফ্লেশন তখন কমবে।
সরকারের অবস্থান কী? উন্নয়ন করতে হবে। জিডিপি বৃদ্ধির হার ধরে রাখতে হবে। অবকাঠামো প্রকল্প চালু রাখতে হবে। তাই সরকার বলছে, ব্যাংক থেকে ধার নাও, খরচ বাড়াও, প্রকল্প চালু রাখো। অর্থাৎ অর্থনীতির গতি বাড়াও।
এই দুটো বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। একজন brake চাপছেন, আরেকজন accelerator।
Policy Trap-এর গণিত
এর ফল কী? একটা চক্রের জন্ম, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ দেখা যায় না। এটাকেই অর্থনীতিবিদরা বলেন policy trap। ধাপে ধাপে দেখি কীভাবে কাজ করে।
ধাপ ১: কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ায় (২০২৪ সালে ৭% থেকে ২০২৬-এ ১০%-এ এসেছে repo rate)।
ধাপ ২: ব্যাংকগুলো সরকারের কাছে যে ঋণ দেয়, সেই ঋণের সুদও বাড়ে। কারণ ব্যাংক উচ্চ সুদে আমানত নিচ্ছে, সরকারকে কম সুদে দিতে পারে না।
ধাপ ৩: সরকারের সুদ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ে। FY24-এ ছিল ৯৫,০০০ কোটি, FY27-এ ১.৪২ লক্ষ কোটি। প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি মাত্র তিন বছরে।
ধাপ ৪: বাড়তি সুদ-ব্যয় মেটাতে সরকারের আরও ধার দরকার। ঘাটতি আরও বড় হয়।
ধাপ ৫: বড় ঘাটতি পূরণে আরও বন্ড ইস্যু। বন্ড বেচতে আরও বেশি সুদ দিতে হয়। সুদের হার আরও চড়ে।
ধাপ ১-এ আবার ফেরা। চক্র চলতে থাকে।
এই ফাঁদ থেকে বেরোনো
এই ফাঁদ থেকে বেরোনোর দুটো রাস্তা আছে। দু'টোই কঠিন।
প্রথম রাস্তা, সরকারি খরচ অনেক কমাও। তবে এটা রাজনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব। কোন প্রকল্প বাতিল হবে? কোন ভর্তুকি কাটা যাবে? কোন কর্মচারী ছাঁটাই হবে? প্রতিটা সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক মূল্য আছে। কোনো সরকারের পক্ষেই সহজ না।
দ্বিতীয় রাস্তা, মুদ্রাস্ফীতি মেনে নাও। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চাপ দাও সুদ না বাড়াতে, প্রয়োজনে কমাতে। তখন সরকারের সুদ-ব্যয় কমবে, ঘাটতি সামলানো সহজ হবে। তবে এই পথের মূল্য পরিশোধ করবে সাধারণ মানুষ, প্রতিদিনের বাজারে।
বেশিরভাগ সরকার দ্বিতীয়টা বেছে নেয়। কারণ মুদ্রাস্ফীতি ধীরে আসে। ভোটের সময় কেউ সরাসরি ধরতে পারে না। কিন্তু রাজস্ব বিলে ৫ শতাংশ VAT বাড়ালে রাস্তায় বিক্ষোভ। এই political asymmetry-ই বাংলাদেশের আজকের policy trap-এর গভীরতম কারণ।
সহজ কথায়: Policy trap মানে এমন একটা পরিস্থিতি, যেখানে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপরীত দিকে কাজ করে এবং দু'জনের কেউই থামতে পারে না। বাংলাদেশ ২০২৬-এ এই ফাঁদে আছে। সুদ চড়া, সরকারের সুদ-ব্যয় বাড়ছে, ঘাটতি বাড়ছে, নতুন ধার লাগছে। বেরোনোর সহজ পথ নেই।
মাপকাঠি ৫: এই বাজেট কাকে বাঁচাচ্ছে?
প্রতিটা বাজেট আসলে একটা সিদ্ধান্ত। কাকে সুরক্ষা দেব, কাকে ছেড়ে দেব। এই সিদ্ধান্তই বাজেটের আসল চরিত্র। সংখ্যা শুধু প্রকাশ মাত্র।
এই সিদ্ধান্ত খুঁজতে গেলে কোথায় তাকাবেন? ভর্তুকির হিসাব। কারণ ভর্তুকি মানে সরকার কারো হয়ে দাম পরিশোধ করছে। কার হয়ে? এই প্রশ্নের উত্তরে বাজেটের চরিত্র ধরা পড়ে।
FY27-এর ভর্তুকি বরাদ্দ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী FY27-এ প্রধান ভর্তুকি বরাদ্দ:
খাত | বরাদ্দ (কোটি টাকা) | মোট ভর্তুকির শতাংশ |
বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি | ৩৭,০০০ | ৪১% |
সার | ২৭,০০০ | ৩০% |
এলএনজি আমদানি | ৬,৫০০ | ৭% |
খাদ্য সহায়তা | ৯,৬০০ | ১১% |
রপ্তানি প্রণোদনা | ৬,৮০০ | ৮% |
অন্যান্য | ২,৫০০ | ৩% |
মোট | প্রায় ৮৯,৪০০ | ১০০% |
এই টেবিল দেখে প্রথম প্রশ্ন আসে, সবচেয়ে বড় ভর্তুকি কোথায়? বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে, পুরো ভর্তুকির ৪১ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রশ্ন আসে, এই ভর্তুকির বেশি সুবিধা কে পায়? এই প্রশ্নের উত্তর অস্বস্তিকর।
কে কত পায়
একটা ছোট পরিবার মাসে যে বিদ্যুৎ পোড়ায়, তার ভর্তুকির পরিমাণ গড়ে ২০০-৪০০ টাকা। বছরে ২,৫০০-৫,০০০ টাকা। ১৭ কোটি মানুষের প্রায় ৩.৭ কোটি পরিবার। মোট ভর্তুকি বিতরণ এই কাঠামোতে ২০,০০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। কিন্তু মোট বিদ্যুৎ ভর্তুকি ৩৭,০০০ কোটি। বাকি ১৭,০০০ কোটি কোথায় যায়?
বাকিটা যায় বড় কারখানায়। সিআইপি বিদ্যুৎ গ্রাহকরা (Commercial and Industrial Premium), বৃহৎ টেক্সটাইল, সিমেন্ট, ইস্পাত, কাচ, রাসায়নিক কারখানা। একটা মাঝারি টেক্সটাইল মিল মাসে বিদ্যুৎ পোড়ায় ৩ থেকে ৫ কোটি টাকার। সেই বিলের একটা বড় অংশ সরকারি ভর্তুকিতে।
একইভাবে এলএনজি ভর্তুকি। এলএনজি আমদানি মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ভারী শিল্পে যায়। গৃহস্থালী রান্নায় নয়। অর্থাৎ এই ৬,৫০০ কোটি ভর্তুকির বেনিফিশিয়ারি গৃহিণী না, বরং শিল্পপতি।
খাদ্য সহায়তা, যা সরাসরি গরিব মানুষের পাতে যায়, বিদ্যুৎ ভর্তুকির এক-চতুর্থাংশও না। ৯,৬০০ কোটি। অথচ এটাই দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর সরাসরি সাহায্য। বাজেটের অগ্রাধিকার এখানে স্পষ্ট হয়।
এই pattern কেন
এর কারণ রাজনৈতিক অর্থনীতির একটা পুরনো সমস্যা। ছোট কিন্তু সংগঠিত গোষ্ঠীর চাপ বড় কিন্তু অসংগঠিত জনসংখ্যার চাপের চেয়ে শক্তিশালী। বড় কারখানার মালিকরা সংগঠিত। তাঁদের চেম্বার আছে, লবিং আছে, রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে। গরিব গৃহিণী একা। তাঁর কোনো সংগঠন নেই, কোনো লবিং নেই। তাই ভর্তুকির লড়াইয়ে তিনি হারেন প্রতিবার।
এর মানে এই না যে শিল্প-ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কিছু সমর্থন দরকার। তবে যখন শিল্প-ভর্তুকি খাদ্য সহায়তার চারগুণ, তখন বাজেট আর গণমুখী থাকে না। ক্ষমতার কাছাকাছি যাঁরা, তাঁদের পক্ষে চলে যায়।
সহজ কথায়: বাজেট কাকে বাঁচাচ্ছে, এই প্রশ্নে FY27 বাজেটের চরিত্র অস্বস্তিকর। সবচেয়ে বড় ভর্তুকি যাচ্ছে বড় শিল্পে, সরাসরি গরিব সাহায্য একপাশে। এটাই pattern। ভালো বাজেট হলে এই পাল্টা হিসাব হতো।
পাঁচ মাপকাঠিতে FY27 বাজেটের রিপোর্ট কার্ড
এখন পর্যন্ত আমরা পাঁচটা মাপকাঠি দেখলাম। চলুন একসঙ্গে FY27 বাজেটের রিপোর্ট কার্ড দেখি।
মাপকাঠি | মান | FY27 অবস্থা | রায় |
১. কর-ভিত্তি | Tax-to-GDP | ৭.৪% (দ. এশিয়ার সর্বনিম্ন) | দুর্বল |
২. উৎপাদনশীল ব্যয় | সুদ-পরিশোধের অংশ | ১৫% (শিক্ষা+স্বাস্থ্যের চেয়ে বেশি) | দুর্বল |
৩. ঘাটতি পদ্ধতি | Crowding out | Private investment ১৫ বছরে সর্বনিম্ন (২২%) | দুর্বল |
৪. সমন্বয় | সরকার-বাংলাদেশ ব্যাংক alignment | Policy trap বিদ্যমান | ভাঙা |
৫. বণ্টন | ভর্তুকির ন্যায্যতা | শিল্প-ভর্তুকি খাদ্য সহায়তার ৪x | অসমঞ্জস |
পাঁচটা মাপকাঠির একটাতেও FY27 বাজেট ভালো ফলাফল দেখাচ্ছে না। সংখ্যায় ambitious, বাস্তবে বিভ্রম।
এর মানে এই না যে বাজেটের কোনো ভালো দিক নেই। নারী এবং শিশু উন্নয়ন বরাদ্দ বেড়েছে। জলবায়ু খাতে ১৫,০০০ কোটি বরাদ্দ একটা নতুন উদ্যোগ। ডিজিটাল গভর্নেন্সে কিছু বরাদ্দ। তবে এগুলো ছোট ছোট ইতিবাচক উদ্যোগ, পুরো বাজেটের কাঠামো বদলায় না।
ভালো বাজেট আসলে কেমন হয়: ৯টা স্তম্ভ
এখন প্রশ্ন উল্টে দেই। যদি ভালো বাজেট লিখতে হতো, কেমন হতো? শুধু পাঁচটা মাপকাঠি ঠিক করলেই হবে না। আরো গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। চলুন নয়টা স্তম্ভ দেখি, যা একটা ভালো বাজেটের ভিত্তি গড়ে।
স্তম্ভ ১: কর-জাল ৭.৪ থেকে ১২ শতাংশে
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ বছরে Tax-to-GDP ৭.৪ থেকে ১২ শতাংশে নিতে হবে। কীভাবে? তিনটে ধাপে।
এক, করের জাল বাড়ানো। ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে ২০ লক্ষ মানুষ কর দেন। এই সংখ্যাটা ৫০ লক্ষে নেওয়া সম্ভব। যাঁরা ব্যবসা করেন, যাঁদের ফ্ল্যাট বা গাড়ি আছে, যাঁদের বিদেশ ভ্রমণের অভ্যাস আছে, তাঁদের সকলের কর-জালে আনতে হবে। ডিজিটাল ট্যাক্সেশন (এনআইডি-লিঙ্কড কর কার্ড) এর সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
দুই, ক্যাপিটাল গেইন কর। শেয়ার বাজার, রিয়েল এস্টেট, ক্রিপ্টো, সব ক্যাপিটাল লেনদেনের উপর কর। ভারতে ক্যাপিটাল গেইন কর জিডিপির ০.৬ শতাংশ আদায় হয়। বাংলাদেশে প্রায় শূন্য।
তিন, সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার কর। যাঁরা ১০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক, তাঁদের উপর বার্ষিক ০.৫-১ শতাংশ সম্পদ কর। উত্তরাধিকারে যে সম্পদ যায়, তার উপর ১৫-২০ শতাংশ কর। আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সব দেশে চালু। বাংলাদেশে নেই।
স্তম্ভ ২: সুদ-পরিশোধ ১৫ থেকে ১০ শতাংশে
এটা সম্ভব শুধু একভাবে। নতুন ঋণ কমানো। বড় প্রকল্পগুলোর অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা। কিছু প্রকল্প স্থগিত। কিছু পুনঃনকশা। ১০ বছরের roadmap। একদিনে সম্ভব না। তবে নীতিগত সিদ্ধান্ত আজই নিতে হবে।
একই সঙ্গে পুরোনো ঋণের পুনর্গঠন। ৭ শতাংশ সুদে আজকের বাজারে নতুন বন্ড ইস্যু করে ১২ শতাংশের পুরোনো বন্ড পরিশোধ। এটা একটা প্রযুক্তিগত কাজ, কিন্তু বছরে ৩০,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব।
স্তম্ভ ৩: ঘাটতি অভ্যন্তরীণ ঋণে কম, বিদেশি ছাড় বেশি
ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা কমিয়ে আনলে private investment বাড়বে। বিদেশি কম-সুদের ছাড় (জাপানি, ইউরোপীয়, এআইআইবি) বাড়ানো যেতে পারে। তবে ডলার ঝুঁকি সচেতনভাবে hedge করতে হবে। পাশাপাশি Sukuk-এর মতো ইসলামি বন্ড ইস্যু করে মধ্যপ্রাচ্য থেকেও পুঁজি আনা সম্ভব।
স্তম্ভ ৪: সরকার-কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীকরণ
এটা সবচেয়ে কঠিন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা থাকতে হবে, কিন্তু সমন্বিত নীতিও দরকার। উদাহরণ হিসেবে নিউজিল্যান্ডের মডেল উল্লেখযোগ্য। সেখানে সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি ৫ বছরে যৌথ চুক্তি করে। মুদ্রাস্ফীতি এবং বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে। কে কী করবে স্পষ্ট থাকে।
বাংলাদেশের জন্য একটা সম্ভাবনা হলো Fiscal Council প্রতিষ্ঠা। এটা একটা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান যা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয় তদারক করে। নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, সবার আছে।
স্তম্ভ ৫: ভর্তুকি লক্ষ্যকেন্দ্রিক
এক ছাঁদের ভর্তুকি ব্যবস্থা বাদ। লক্ষ্যকেন্দ্রিক ভর্তুকি দরকার। গরিব পরিবারের বিদ্যুৎ ফ্রি, ৫০ ইউনিট পর্যন্ত। তার উপরে স্বাভাবিক হার। মধ্যবিত্ত পরিবার subsidized হার, কিন্তু কম। বড় কারখানার সম্পূর্ণ commercial rate। ভর্তুকি কাটা টাকা সরাসরি দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর কাছে cash transfer-এ। বিশ্বে এই মডেল কাজ করছে। ভারতের ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (ডিবিটি) সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ৪০০ মিলিয়ন মানুষ সরাসরি ভর্তুকি পান, ভোক্তা মূল্যে নয়।
স্তম্ভ ৬: মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো
এক বছরের বাজেট মানসিকতা ভাঙতে হবে। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে এমটিবিএফ (Medium Term Budget Framework) আছে। ২০০৬ সাল থেকে। তবে কাগজে। বাস্তবে প্রতি বছরের বাজেট আগের বছর থেকে স্বতন্ত্রভাবে তৈরি হয়। তিন বছরের পরিকল্পনার নাম শুধু একটা তালিকা।
ভালো বাজেট তিন বছরের একটা সমন্বিত পরিকল্পনা। প্রথম বছর বরাদ্দ, পরের দু'বছর প্রক্ষেপণ। প্রকল্প শুরু করার আগেই পুরো তিন বছরের অর্থ চিহ্নিত। মাঝপথে প্রকল্প স্থগিত করার অভ্যাস ভাঙা যায়। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, এই মডেলে চলে।
স্তম্ভ ৭: পারফরম্যান্স-ভিত্তিক বাজেট
প্রতিটা মন্ত্রণালয় কেবল টাকা চাইলেই হবে না। কী লক্ষ্য, কী ফলাফল, সেটাও বলতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৪২,৭০০ কোটি চাইছেন। বিনিময়ে কী? শিশু মৃত্যুর হার কত কমবে? টিকা কভারেজ কত বাড়বে? প্রতিটা টাকার বিপরীতে একটা পরিমাপযোগ্য ফলাফল।
যুক্তরাষ্ট্রের জিপিআরএ (Government Performance and Results Act) ১৯৯৩ সাল থেকে চালু। প্রতি ফেডারেল এজেন্সিকে প্রতিবছর performance report দিতে হয়। বাজেট অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত।
স্তম্ভ ৮: জলবায়ু-সংবেদনশীল বাজেট
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটা। অথচ FY27-এ জলবায়ু খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ১.৬ শতাংশ। ভালো বাজেট হলে এটা ৫-৭ শতাংশ হতো। উপকূলীয় বাঁধ, পলি ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য শক্তি, খরা-প্রতিরোধী কৃষি, এগুলোতে আগাম বিনিয়োগ। জলবায়ু-আক্রান্ত হলে পরে কোটি গুণ বেশি খরচ হবে।
স্তম্ভ ৯: নাগরিক বাজেট স্বচ্ছতা
বাজেট মানুষের জন্য, মানুষেরই বোঝা উচিত। বাংলাদেশের বাজেট নথি ১,২০০ পৃষ্ঠার। কোনো সাধারণ নাগরিক পড়তে পারেন না। প্রয়োজন একটা "নাগরিক বাজেট" যা সংক্ষেপে, সহজ ভাষায়, ভিজ্যুয়াল আকারে। ২০ পৃষ্ঠার নথি। প্রতিটা পরিবারে যেতে পারে। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া এই মডেল চালু করেছে। ওপেন বাজেট সার্ভে-তে বাংলাদেশ ৩৬ পয়েন্ট পায়, ১০০-র মধ্যে। দক্ষিণ আফ্রিকা পায় ৮৩।
সহজ কথায়: ভালো বাজেটের অর্থ বড় সংখ্যা না। বরং নয়টা স্তম্ভ। কর-জাল সম্প্রসারণ, সুদ-পরিশোধ কমানো, ঘাটতি কাঠামো বদল, সরকার-কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমন্বয়, ভর্তুকি targeting, মধ্যমেয়াদি কাঠামো, পারফরম্যান্স বাজেটিং, জলবায়ু-সংবেদনশীলতা, এবং নাগরিক স্বচ্ছতা। সংখ্যা পরে, গঠন আগে।
কারা ভালো বাজেট দেয়: পৃথিবীর উদাহরণ
তাত্ত্বিক কথা শুনলাম। বাস্তবে কারা ভালো বাজেট দেয়? কী কী সংখ্যায় বোঝা যায় তাঁদের শৃঙ্খলা? চলুন পৃথিবীর কিছু উদাহরণ দেখি। প্রত্যেকটার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা।
সিঙ্গাপুর: শৃঙ্খলার চূড়া
১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর স্বাধীন হয়েছিল। তখন একটা ছোট দ্বীপ, কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, পানি পর্যন্ত প্রতিবেশী মালয়েশিয়া থেকে আনতে হতো। আজ মাথাপিছু আয় ৮২,০০০ ডলার। বাংলাদেশের ২৮ গুণ। কীভাবে?
প্রধান কারণ বাজেট শৃঙ্খলা। ২০২৬-এ সিঙ্গাপুরের Tax-to-GDP ১৪ শতাংশ। বাজেট প্রায় সবসময় surplus, ২০-৩০ বছর ধরে। ঋণ প্রায় শূন্য (যা আছে, সব ভবিষ্যৎ পেনশন reserve থেকে borrowed, বাহ্যিক ঋণ একদম নেই)। সরকারি কর্মচারীর বেতন বিশ্বে সর্বোচ্চ, কিন্তু সংখ্যা কম এবং দুর্নীতি প্রায় নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সিঙ্গাপুরের একটা সার্বভৌম সম্পদ ফান্ড আছে, জিআইসি (Government Investment Corporation)। তেমাসেক হোল্ডিংস তাঁদের আরেকটা ফান্ড। দু'টোর মোট সম্পদ প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার। মানে প্রতিটা সিঙ্গাপুরী নাগরিকের পেছনে ১.৫ লক্ষ ডলার সঞ্চয় আছে সরকারি ভাণ্ডারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা? আমাদের কোনো সার্বভৌম সম্পদ ফান্ড নেই। ঋণ আছে ২২ লক্ষ কোটি টাকা। সিঙ্গাপুর ৫০ বছরে শূন্য থেকে যা গড়েছে, আমরা ৫০ বছরে যা গড়েছি ঠিক উল্টো।
নরওয়ে: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য
নরওয়ের সরকারি পেনশন ফান্ড গ্লোবাল (জিপিএফজি)-এর সম্পদ ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর বৃহত্তম সার্বভৌম তহবিল। কীভাবে এত বড়? ১৯৭০-এর দশকে উত্তর সমুদ্রে তেল আবিষ্কারের পর নরওয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তেলের আয়ের প্রায় পুরোটা ফান্ডে রাখা হবে। প্রতিদিনের বাজেটে শুধু ফান্ডের রিটার্নের একটা অংশ ব্যবহার (৩ শতাংশ ক্যাপ)।
ফলাফল কী? নরওয়ের তেল ফুরিয়ে গেলেও তাঁদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ফান্ডের আয়ে চলতে পারবে। তেল ফুরোলে অন্য দেশের মতো সংকট হবে না।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা? আমাদের তেমন প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, কিন্তু রেমিট্যান্স আছে। বছরে ২৫ বিলিয়ন ডলার। ৫০ বছরে মোট হিসাব করলে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এসেছে। যদি এর ১০ শতাংশও সংরক্ষিত হতো, আজ আমাদের সার্বভৌম তহবিল ৫০ বিলিয়ন ডলার হতো। কিন্তু আমরা সব খরচ করেছি, কিছুই রাখিনি।
জার্মানি: সাংবিধানিক ঋণ-ব্রেক
জার্মানিতে ২০০৯ সালে সংবিধানে একটা নতুন ধারা যোগ করা হয়েছিল। নাম, শুলদেনব্রেমজে, বাংলায় ঋণ-ব্রেক। এই নিয়ম বলে, ফেডারেল সরকারের কাঠামোগত বাজেট ঘাটতি জিডিপির ০.৩৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। কোনো বছর। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামন্দার মতো বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া।
এর সঙ্গে জার্মানি ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত surplus বাজেট দিয়েছে। ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৮৫ থেকে ৬০ শতাংশে নামিয়েছে। এর মূল্য কী? কোভিড সংকটে জার্মানি ইউরোপের অর্থনীতিকে rescue করতে পেরেছিল। কারণ ভাণ্ডার ছিল।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা? আমাদের সংবিধানে এমন কিছু নেই। বাজেট সীমার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। সরকার ইচ্ছামতো ঘাটতি নিতে পারে।
ভিয়েতনাম: উন্নয়নশীলের রোল-মডেল
ভিয়েতনাম প্রায় বাংলাদেশের মতো একটা দেশ। জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি, ভৌগোলিক আকারও কাছাকাছি। ১৯৮৬ সাল থেকে সংস্কার শুরু (ডোই মোই নীতি)। তখন জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে কম ছিল।
আজ ভিয়েতনামের মাথাপিছু আয় ৪,৪০০ ডলার, বাংলাদেশের ২,৭০০ ডলার। প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। কীভাবে? বাজেট শৃঙ্খলা একটা বড় কারণ। ভিয়েতনামের Tax-to-GDP ১৮ শতাংশ। ঘাটতি জিডিপির ৩.৫ শতাংশের নিচে। মোট ঋণ জিডিপির ৩৭ শতাংশ, কম এবং সুদ-বহনযোগ্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভিয়েতনামের বাজেটের অবকাঠামো বরাদ্দ জিডিপির ৬-৭ শতাংশ। বাংলাদেশের ৩ শতাংশের কাছাকাছি। ভিয়েতনাম নতুন বন্দর, এক্সপ্রেসওয়ে, রেলওয়ে তৈরি করছে দ্রুত। এর ফলে রপ্তানি বাড়ছে। স্যামসাং, ইনটেল, অ্যাপল, সবাই ভিয়েতনামে কারখানা খুলছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা? আমাদের কর কম, ঘাটতি বেশি, সুদ বেশি, অবকাঠামো বরাদ্দ অর্ধেক। ভিয়েতনাম যা ২০ বছরে করেছে, আমরা একই সময়ে অর্ধেকও করতে পারিনি।
দক্ষিণ কোরিয়া: তিন দশকের রূপান্তর
দক্ষিণ কোরিয়ার গল্পটা আরো অনুপ্রেরণাদায়ক। ১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের চেয়ে দরিদ্র ছিল। মাথাপিছু আয় ১০০ ডলার, যেখানে বাংলাদেশের ছিল ১২০ ডলার। আজ দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু আয় ৩৬,০০০ ডলার। বাংলাদেশের ১৩ গুণ।
কীভাবে? পরপর তিনটে দশকে বাজেট ছিল নির্দিষ্ট অগ্রাধিকারে। ১৯৬০-৭০ দশকে শিক্ষা এবং অবকাঠামো (পার্ক চুং-হি যুগ)। ১৯৮০-৯০ দশকে প্রযুক্তি এবং ভারী শিল্প। ২০০০-এর পরে আরঅ্যান্ডডি এবং উচ্চশিক্ষা।
প্রতিটা যুগে বাজেটের সবচেয়ে বড় বরাদ্দ ছিল ভবিষ্যৎ-গড়া খাতে। আজও দক্ষিণ কোরিয়ার আরঅ্যান্ডডি ব্যয় জিডিপির ৪.৬ শতাংশ, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের ০.৬ শতাংশের কাছাকাছি।
চিলি: ল্যাটিন আমেরিকার ব্যতিক্রম
ল্যাটিন আমেরিকা সাধারণত বাজেট সংকটের জন্য কুখ্যাত। আর্জেন্টিনা, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, সবাই নিয়মিত সংকটে পড়েন। তবে চিলি ব্যতিক্রম।
১৯৮০-এর দশক থেকে চিলি একটা কাঠামোগত নিয়ম চালু করেছিল। বাজেটের ভিত্তি হবে দশ বছরের গড় তামার দাম (চিলির প্রধান রপ্তানি), বর্তমান দামের ভিত্তিতে নয়। যদি তামার দাম বেশি হয়, অতিরিক্ত আয় একটা স্থিতিশীলতা ফান্ডে। যদি কম হয়, সেই ফান্ড থেকে ব্যবহার।
ফলাফল? চিলি কখনো বাজেট সংকটে পড়েনি। প্রতিবেশী আর্জেন্টিনা পড়েছে ৭ বার। ২০২৬-এ চিলির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৬ শতাংশ, আর্জেন্টিনার ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশের জন্য চিলির মডেল রেমিট্যান্স-ভিত্তিক স্থিতিশীলতা ফান্ডে অনুকরণযোগ্য।
খারাপ বাজেটের পরিণতি: গ্রিস ২০১০, শ্রীলঙ্কা ২০২২
ভালো বাজেটের উদাহরণ যেমন আছে, খারাপ বাজেটের পরিণতিও আছে। দুটো সাম্প্রতিক উদাহরণ।
গ্রিস ২০১০। ইউরো ব্যবহারের সুবিধায় গ্রিস কম সুদে বিদেশি ঋণ পেতে শুরু করেছিল। সরকার সেই ঋণ ব্যবহার করেছিল সরকারি চাকরি বাড়াতে, পেনশন বাড়াতে, ভর্তুকি বাড়াতে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ১৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। ২০১০-এ ক্রেডিট এজেন্সিগুলো গ্রিসের রেটিং নামিয়ে দিল। সুদের হার এক রাতে ১২ শতাংশে। দেশ দেউলিয়া। ইইউ এবং আইএমএফ থেকে ২৬০ বিলিয়ন ইউরোর উদ্ধার-প্যাকেজ। শর্ত? পেনশন কাটা, বেতন কাটা, কর বাড়ানো। ১০ বছর কঠিন kemerebandi। লক্ষ মানুষ চাকরি হারালেন। বাজেট অসাবধানতার মূল্য।
শ্রীলঙ্কা ২০২২। আরো সাম্প্রতিক। ২০১৯-এ নতুন সরকার বড় কর-ছাড় ঘোষণা করেছিল। ভ্যাট ১৫ থেকে ৮ শতাংশে, করপোরেট কর ২৮ থেকে ২৪ শতাংশে। ফলাফল? Tax-to-GDP ১২ থেকে ৮ শতাংশে নামল। সরকারি আয় ৩০ শতাংশ কম। ঘাটতি বাড়ল ১২ শতাংশে। বিদেশি ঋণ-পরিশোধে অক্ষম। মে ২০২২-এ ইতিহাসে প্রথম সার্বভৌম ডিফল্ট। জ্বালানি নেই, ওষুধ নেই, খাদ্য নেই, মাসের পর মাস। প্রেসিডেন্ট পালালেন। বাজেট অহংকারের মূল্য।
দেশ | Tax-to-GDP | ঋণ-জিডিপি | বাজেট ঘাটতি | মাথাপিছু আয় | বাংলাদেশের তুলনা |
সিঙ্গাপুর | ১৪% | প্রায় ০% | Surplus | ৮২,০০০ ডলার | ২৮ গুণ বেশি |
নরওয়ে | ৩৮% | ৪০% | Surplus | ৯৩,০০০ ডলার | ৩১ গুণ বেশি |
জার্মানি | ৩৮% | ৬০% | ০.৩% | ৫২,০০০ ডলার | ১৮ গুণ বেশি |
দক্ষিণ কোরিয়া | ২৭% | ৫৫% | ১.৫% | ৩৬,০০০ ডলার | ১৩ গুণ বেশি |
ভিয়েতনাম | ১৮% | ৩৭% | ৩.৫% | ৪,৪০০ ডলার | ১.৬ গুণ বেশি |
চিলি | ২২% | ৩৬% | ১.৮% | ১৬,০০০ ডলার | ৬ গুণ বেশি |
গ্রিস | ৩৭% | ১৫০% | ৩% | ২২,০০০ ডলার | ক্রাইসিস উদাহরণ |
শ্রীলঙ্কা | ৮% | ১২০% | ১২% | ৩,৭০০ ডলার | ব্যর্থতার উদাহরণ |
বাংলাদেশ | ৭.৪% | ৪০% | ৫.১% | ২,৭০০ ডলার | আমরা এখানে |
এই টেবিল দেখলে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়। যেসব দেশে Tax-to-GDP বেশি, ঘাটতি কম, ঋণ-শৃঙ্খলা ভালো, তাঁদের মাথাপিছু আয়ও বেশি। যেখানে এর উল্টো, সেখানে সংকট। বাংলাদেশ তালিকার শেষ দিকে। সিঙ্গাপুর, নরওয়ে, জার্মানির অবস্থানে যেতে চাইলে বাজেট কাঠামো বদলাতেই হবে।
সহজ কথায়: ভালো বাজেটের নাম শৃঙ্খলা। সিঙ্গাপুর সম্পদ গড়ছে, নরওয়ে ভবিষ্যৎ রাখছে, জার্মানি নিজেকে বেঁধেছে, ভিয়েতনাম অবকাঠামো গড়ছে, দক্ষিণ কোরিয়া রূপান্তর করেছে। আর গ্রিস, শ্রীলঙ্কা, পথে বিপদ। বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত আজ। কোন তালিকায় যেতে চাই?
একটা ভালো বাজেট কতটা গুরুত্বপূর্ণ: অর্থনীতির গতিপথ বদলায় কীভাবে
অনেকে মনে করেন বাজেট একটা প্রযুক্তিগত কাগজ। সরকারি কর্মকর্তারা বানান, অর্থনীতিবিদরা বিশ্লেষণ করেন, সাধারণ মানুষের তেমন কিছু আসে যায় না। এই ধারণা ভুল। গভীরভাবে ভুল।
বাজেট হলো একটা দেশের ভাগ্য-নির্ধারণী দস্তাবেজ। প্রতিটা বছরের বাজেট পরের ৫-১০ বছরের অর্থনৈতিক গতিপথ ঠিক করে। চলুন চারটে চ্যানেল দেখি, যেখানে বাজেট সরাসরি অর্থনীতি বদলায়।
চ্যানেল ১: বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত
একজন ব্যবসায়ী কেন আজ একটা নতুন কারখানা খুলবেন? এই সিদ্ধান্তের পিছনে অনেক কিছু আছে। চাহিদা, প্রযুক্তি, শ্রম, কাঁচামাল। তবে এই সবের ভিত্তিতে আছে একটা বড় প্রশ্ন। ভবিষ্যৎ স্থিতিশীল কি না?
যদি বাজেট দেখে মনে হয় সরকার দায়িত্বশীল, ঋণ-শৃঙ্খলা ভালো, কর-নীতি পূর্বানুমেয়, ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করেন। উল্টোটা হলে তিনি অপেক্ষা করেন। তাঁর টাকা বিদেশে চলে যায়। অথবা সোনা-রিয়েল এস্টেটে রাখা থাকে, যা অর্থনীতিতে কোনো নতুন উৎপাদন তৈরি করে না।
বাংলাদেশের পরিসংখ্যান এটাই প্রমাণ করে। ২০১৫-২০ সময়ে বাজেট তুলনামূলক ভালো ছিল, private investment-to-GDP ছিল ২৭ শতাংশ। ২০২১-এর পরে ঘাটতি বাড়ল, ঋণ চড়ল, FY27-এ private investment নেমেছে ২২ শতাংশে। ৫ শতাংশ পয়েন্টের পার্থক্য মানে বছরে ২.৩ লক্ষ কোটি টাকার কম বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ থাকলে প্রায় ১৫ লক্ষ নতুন চাকরি হতো।
চ্যানেল ২: মুদ্রাস্ফীতি
বাজেটের সঙ্গে দামের সম্পর্ক সরাসরি। যদি সরকার বেশি ধার নেয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চাপ পড়ে, টাকা ছাপাতে হয় (পরোক্ষভাবে), মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। যদি বাজেট ঘাটতি কম থাকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে দাম স্থিতিশীল রাখতে পারে।
একটা উদাহরণ। তুরস্ক। এরদোয়ান সরকার ২০২০-২৩ সময়ে বিশাল ঘাটতি দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চাপ দিয়েছে সুদ না বাড়াতে। ফলাফল? তুর্কি লিরা ৭ থেকে ৩৫-এ পড়ল ডলারের বিপরীতে। মুদ্রাস্ফীতি ৭০ শতাংশে। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় উবে গেল।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা? আমরা তুরস্কের পথে যাচ্ছি না, কিন্তু চিহ্ন আছে। মুদ্রাস্ফীতি ৯-১০ শতাংশ, টাকা ৮৫ থেকে ১২২-এ। এর মূল কারণ বাজেট ঘাটতি। যদি বাজেট ঠিক হতো, এই দুটোই কম হতো।
চ্যানেল ৩: ক্রেডিট রেটিং এবং বৈদেশিক পুঁজি
প্রতিটা দেশের একটা ক্রেডিট রেটিং থাকে। মুডি'স, এসঅ্যান্ডপি, ফিচ, তিন আন্তর্জাতিক এজেন্সি দেয়। এই রেটিং নির্ধারণ করে দেশটা বিদেশে কত সুদে ধার পাবে। ভালো রেটিং (এ গ্রেড) মানে ৩-৪ শতাংশ সুদে ধার। খারাপ রেটিং (বি গ্রেড) মানে ৮-১০ শতাংশ। জাঙ্ক গ্রেড হলে ১৫ শতাংশ বা ধার একদম মিলবে না।
এই রেটিং কীভাবে নির্ধারিত হয়? প্রধান উপাদান বাজেট শৃঙ্খলা। ঘাটতি, ঋণ-জিডিপি, কর-আদায়। বাংলাদেশের রেটিং ২০১৫-এ ছিল বিএ৩ (মুডি'স স্কেলে)। ২০২৫-এ নেমেছে বি১-এ। প্রতি ধাপ মানে বছরে বিদেশি ঋণে অতিরিক্ত ১ শতাংশ সুদ। বছরে ৫,০০০ কোটি টাকা।
একই সঙ্গে এফডিআই (বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ) রেটিং-সংবেদনশীল। ভালো রেটিং মানে বহুজাতিক কোম্পানি কারখানা বসাবে। খারাপ রেটিং মানে পাবে না। বাংলাদেশের এফডিআই ২০২৬-এ মাত্র ১.৪ বিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনাম পেয়েছে ২৪ বিলিয়ন। প্রায় ১৭ গুণ পার্থক্য। কারণ তাঁদের বাজেট শৃঙ্খলা ভালো।
চ্যানেল ৪: প্রজন্ম-পরিবর্তনকারী অবকাঠামো
একটা ভালো বাজেট দশ বছর পরে দেশের মুখ বদলায়। কীভাবে? বড় অবকাঠামোর মাধ্যমে।
চীনের গল্পটা দেখি। ১৯৮০-এর দশকে চীনের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে ভালো ছিল না। ১৯৯০-এর দশক থেকে চীন প্রতি বছর জিডিপির ৮-৯ শতাংশ অবকাঠামোতে ঢেলেছে। হাইস্পিড রেল, এক্সপ্রেসওয়ে, বন্দর, বিমানবন্দর, ৫জি, সব। আজকের চীন সেই বিনিয়োগের ফসল।
বাংলাদেশের অবকাঠামো বরাদ্দ জিডিপির ২.৫-৩ শতাংশ। ভিয়েতনামের ৬-৭ শতাংশ। ইথিওপিয়ার ৮ শতাংশ। আমরা পদ্মা সেতু এবং কিছু মেগা-প্রকল্প করেছি, কিন্তু systematic দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগ নেই। ফলে একটা গার্মেন্টস কারখানা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পাঠাতে ৩ দিন লাগে। ভিয়েতনামে একদিন।
চ্যানেল ৫: সামাজিক স্থিতিশীলতা
এটা পরিমাপ করা সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট ন্যায্য হলে সমাজ স্থিতিশীল থাকে। অন্যায্য হলে অস্থিরতা।
শ্রীলঙ্কা ২০২২। বাজেট সংকটের পরে রাজপথে মিছিল, প্রেসিডেন্ট ভবন আক্রান্ত, প্রেসিডেন্ট পলায়ন। আর্জেন্টিনায় গত ২০ বছরে ৫ বার বাজেট-সংকটে সরকার পরিবর্তন। গ্রিসে ২০১০-১৫ সময়ে রাস্তায় বিক্ষোভ। বাজেট অস্থিরতা সরাসরি রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপান্তরিত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন কীভাবে এসেছিল? সরাসরি বাজেট সংকট না, তবে অর্থনৈতিক চাপ ছিল গভীর কারণ। মুদ্রাস্ফীতি ১১-১২ শতাংশ, কর্মসংস্থান ভালো নয়, তরুণদের হতাশা। এই সব শেষমেশ বাজেটের কাঠামোগত সমস্যা থেকে। ভালো বাজেট সামাজিক বিস্ফোরণ ঠেকায়।
সংখ্যায় গল্পটা: ৩০ বছরের চিত্র
একটা গাণিতিক চিত্র দিয়ে শেষ করি। ধরা যাক দু'টো দেশ আছে। দেশ A এবং দেশ B। দু'জনেরই জিডিপি বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার, জনসংখ্যা ১৭ কোটি।
দেশ A-র বাজেট ভালো। বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধি ৭ শতাংশ। কারণ private investment বেশি, অবকাঠামো ভালো, মুদ্রাস্ফীতি কম। ৩০ বছরে দেশ A-র জিডিপি ৩০০ থেকে ২,২৮২ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ৭.৬ গুণ। মাথাপিছু আয় ১,৮০০ ডলার থেকে ১৪,০০০ ডলার।
দেশ B-র বাজেট খারাপ। বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধি ৪ শতাংশ। ৩০ বছরে দেশ B-র জিডিপি ৩০০ থেকে ৯৭৩ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ৩.২ গুণ। মাথাপিছু আয় ১,৮০০ ডলার থেকে ৬,০০০ ডলার।
পার্থক্য? দেশ A-র গড় মানুষ দেশ B-র গড় মানুষের চেয়ে ২.৩ গুণ ধনী। ৩০ বছরে। শুধু বাজেট শৃঙ্খলার পার্থক্যে। ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পার্থক্যের চক্রবৃদ্ধি ফলাফল।
এই A এবং B হলো দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপাইন। ১৯৬০-এ দুই দেশের অবস্থা প্রায় একই ছিল। আজ দক্ষিণ কোরিয়া ফিলিপাইনের ৫ গুণ ধনী। মূল কারণ, বাজেট সিদ্ধান্ত।
সহজ কথায়: বাজেট প্রযুক্তিগত কাগজ না। এটা ভাগ্য-নির্ধারক। বিনিয়োগ, মুদ্রাস্ফীতি, ক্রেডিট রেটিং, অবকাঠামো, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সব এর উপর নির্ভর। ৩০ বছরের চক্রবৃদ্ধিতে এই সিদ্ধান্তগুলো একটা প্রজন্মের ভাগ্য বদলায়। দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপাইনের আজকের ৫ গুণ পার্থক্য, ৬০ বছর আগের বাজেট সিদ্ধান্তের ফসল।
শেষ কথা: Ambition বনাম Illusion
প্রতি বছর বাজেট পেশের সময় একটাই শব্দ শোনা যায়। "Ambitious"। সরকারের ভাষায়, সমালোচকদের ভাষায়, সম্পাদকীয় ভাষায়, একই শব্দ। বাজেট বড়, লক্ষ্য বড়, পরিকল্পনা বড়।
কিন্তু ambition আর illusion-এর মধ্যে পার্থক্য আছে। একটা ভবিষ্যৎ গড়ে। অন্যটা পুরোনো ঋণের সুদ মেটায় এবং সেটাকেই অগ্রগতি বলে চালিয়ে দেয়।
বড় বাজেট মানে ভালো বাজেট না। ভালো বাজেট মানে নিজের পায়ে দাঁড়ানো, ভবিষ্যৎ তৈরি করা, কম ঋণে চলা, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বয়, এবং ন্যায্য বণ্টন।
FY27 বাজেট সংখ্যায় ambitious। বাস্তবে বাজেটের ১৫ শতাংশ সুদ মেটাতে চলে যাচ্ছে। Tax-to-GDP দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন। Private investment ১৫ বছরে সর্বনিম্ন। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপরীত দিকে দৌড়াচ্ছে। ভর্তুকির বড় অংশ যাচ্ছে তাঁদের কাছে, যাঁদের সবচেয়ে কম দরকার।
তবু আশা হারানোর কারণ নেই। ভিয়েতনাম ১৯৮৬-এ যেখানে ছিল, আমরা প্রায় সেখানে। সিঙ্গাপুর ১৯৬৫-এ যেখানে ছিল, আমরা অনেক উপরে। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৬০-এ যেখানে ছিল, আমরা বহু উপরে। তিনটে দেশই বাজেট শৃঙ্খলার মাধ্যমে রূপান্তর করেছে। আমরাও পারি।
কিন্তু পারি বলেই হবে না। সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আজ। এই বছরের বাজেটে নয়। পরের বছরের বাজেটে নয়। দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারে। কর-জাল সম্প্রসারণে, ঋণ-শৃঙ্খলায়, ভর্তুকি targeting-এ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমন্বয়ে।
মূল রোগ একটাই। আমরা এখনো ঋণের পিরামিডের উপর দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রতিটা ইট ধার করা। নতুন বাজেট সেই পিরামিডের উপরে আরেকটা ধার-করা ইট যোগ করছে। তবু আমরা একে "উন্নয়ন" বলছি।
ভালো বাজেট বাড়িয়ে দেওয়া সংখ্যা না। ভালো বাজেট হলো সেটা, যেটা পড়ে আপনি দেশের সামনের দিন দেখতে পান। পেছনের ঋণ না।
"প্রতিটা বাজেট আসলে একটা প্রশ্নের উত্তর। প্রশ্নটা হলো, পরের প্রজন্মকে কী দিয়ে যাব? স্কুল-হাসপাতাল-রাস্তা, নাকি ঋণের পাহাড়? যে দেশ ৭.৪ শতাংশ কর তোলে এবং বাজেটের ১৫ শতাংশ সুদে দেয়, তার উত্তর সংখ্যায় লেখা। দক্ষিণ কোরিয়া ৬০ বছর আগে এই প্রশ্নের একটা উত্তর দিয়েছিল। ফিলিপাইন আরেকটা। আজ দু'দেশের পার্থক্য পাঁচ গুণ। আমাদের প্রশ্ন এখনো খোলা। উত্তর এখনো আমাদের হাতে।"
References
Article Sources
- Bangladesh Ministry of Finance — Budget Speech and Documents FY26-27 (June 2026)
- Bangladesh Bank — Monetary Policy Statement, January 2026
- National Board of Revenue (NBR) — Annual Report 2025-26
- World Bank — Bangladesh Development Update, April 2026
- IMF — Bangladesh Article IV Consultation, February 2026
- Asian Development Bank — Bangladesh Macroeconomic Update 2026
- Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) — Monthly Statistical Bulletin, May 2026
- Centre for Policy Dialogue (CPD) — Bangladesh Economy in FY27, June 2026
- OECD — Tax Statistics 2026 (cross-country comparison)
- International Budget Partnership — Open Budget Survey 2025
- Norges Bank Investment Management — GPFG Annual Report 2025
- Ministry of Finance Singapore — Budget Statement 2026
- World Bank — Government Finance Statistics 2026
Facts and Figures
- FY27 Budget total: 9.38 lakh crore taka — Ministry of Finance
- Interest payment: 1.42 lakh crore taka (15.1% of budget) — Ministry of Finance
- Tax-to-GDP ratio: 7.4% (2026) — NBR / IMF Article IV
- VAT-to-GDP: 3.86% vs Income-tax-to-GDP: 2.26% — NBR Annual Report
- Budget deficit FY27: 2.35 lakh crore taka (~5.1% of GDP) — Ministry of Finance
- Lending rate range 2026: 14-16% — Bangladesh Bank Statistical Department
- Private investment-to-GDP: ~22% (2026, 15-year low) — World Bank
- Repo rate raised from 7% (2024) to 10% (2026) — Bangladesh Bank
- Total public debt: ~22 lakh crore taka (2026) vs 12 lakh crore (2021) — BB
- South Asia Tax-to-GDP: India 17%, Vietnam 18%, Nepal 19%, Pakistan 9.5% — IMF FAD
- FY27 Subsidies: Electricity 37,000 cr, Fertilizer 27,000 cr, LNG 6,500 cr, Food 9,600 cr — Finance Division
- Singapore SWF AUM ~$900B (GIC + Temasek) — official disclosures
- Norway GPFG AUM $1.7 trillion (2026) — NBIM
- Germany Schuldenbremse threshold: 0.35% structural deficit — Bundesfinanzministerium
- Vietnam infrastructure spend: 6-7% of GDP — Vietnam Ministry of Planning
- Korea R&D-to-GDP: 4.6% — OECD MSTI
- Bangladesh R&D-to-GDP: ~0.6% — BANBEIS
- Bangladesh FDI inflow 2026: $1.4B vs Vietnam $24B — UNCTAD
- Greece 2010 deficit: 15% of GDP, peak debt ~180% — Eurostat
- Sri Lanka 2022 default — first sovereign default in Asia since 2017, IMF EFF
- Open Budget Index: Bangladesh 36/100, South Africa 83/100 — IBP 2025
Concepts Referenced
- Crowding out effect — Bangladesh Bank Research Department working papers
- Policy trap — IMF Working Paper WP/24/176 on fiscal-monetary coordination
- Inflation as silent tax — Milton Friedman, original framing
- Public Choice subsidies capture — James M. Buchanan, public choice theory
- Compounding effect on growth — Solow growth model
- Schuldenbremse (Debt Brake) — Article 109/115 of German Basic Law (2009)
International Case Studies Referenced
- Singapore: GIC, Temasek, balanced budget 30+ years — IMF Singapore Article IV
- Norway: GPFG, oil revenue management — Ministry of Finance Norway
- Germany: Schuldenbremse, post-2009 fiscal discipline — Bundesbank
- Vietnam: Doi Moi reforms, infrastructure investment — ADB Vietnam Country Diagnostic
- South Korea: 1960-2020 transformation — World Bank 'Korea as a Knowledge Economy'
- Chile: Structural fiscal rule, copper-based stabilization fund — IMF Working Paper WP/12/123
- Greece 2010 crisis — IMF EFF, Eurogroup bailout history
- Sri Lanka 2022 default — IMF EFF, World Bank crisis brief
- South Korea vs Philippines 1960-2026 divergence — World Bank Development Indicators










