ভূমিকা -- পাগলা ঘোড়া ইতিমধ্যেই ছুটছে
ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স (IIF)-এর ২০২৫ সালের গ্লোবাল ডেট মনিটর অনুযায়ী, বৈশ্বিক মোট ঋণ $315 trillion ছাড়িয়েছে -- এই সংখ্যা এত বড় যে মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। এটি বৈশ্বিক GDP-র ৩৩০%। অর্থাৎ পৃথিবীর সব মানুষ যা উৎপাদন করে, তার ৩.৩ গুণ বেশি ঋণ তাদের ঘাড়ে।
২০০০ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র $87 trillion (IIF historical data)। মাত্র ২৫ বছরে $228 trillion বেড়েছে। কোনো বিশ্বযুদ্ধ ছাড়া, কোনো বিশ্বজয় ছাড়া -- শুধু ধার করে করে।
"Global debt levels are at record highs and pose significant risks to economic stability." -- Kristalina Georgieva, IMF Managing Director, 2024
IIF-এর হিসাবে ২০২৪ সালের মাত্র প্রথম ৯ মাসে বৈশ্বিক ঋণ $12 trillion বেড়েছে। মানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় $44 billion নতুন ঋণ যোগ হয়েছে বিশ্বে। প্রতি সেকেন্ডে $510,000। এই গতি যদি অব্যাহত থাকে, ২০৩০ সালের আগেই বৈশ্বিক ঋণ $400 trillion ছাড়িয়ে যাবে।
এটি শুধু সংখ্যা নয় -- এটি একটি টাইম বোমা। ২০০৮ সালে মাত্র $60 trillion সরকারি ঋণে বিশ্ব অর্থনীতি কাঁপতে শুরু করেছিল। আজ শুধু সরকারি ঋণই $100 trillion-এর উপরে (IMF Fiscal Monitor 2025)। পরিস্থিতি তখনকার চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর।
পৃথিবীর ৮ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি -- প্রায় ৪.৩ বিলিয়ন -- উন্নয়নশীল দেশে বাস করে যেখানে সরকারি সেবা ইতিমধ্যেই ঋণের চাপে সংকুচিত হচ্ছে। World Bank-এর 2024 Human Capital Index দেখায়, ঋণ সংকটে থাকা দেশগুলোতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সূচক ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে।
এই নিবন্ধ একটি প্রশ্নের উত্তর দেবে না -- 'ঋণ কি ভালো না খারাপ?' সেই বিতর্ক শেষ। এই নিবন্ধ একটি তথ্যভিত্তিক অভিযোগপত্র তৈরি করবে: বিশ্বের ঋণ ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এবং এটিই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক হুমকি।
প্রতিটি দাবি প্রমাণ করা হবে -- IMF, World Bank, IIF, BIS, Federal Reserve, Eurostat-এর প্রকাশিত রিপোর্ট দিয়ে। কোনো ব্যক্তিগত মতামত নেই এখানে। শুধু সংখ্যা, শুধু তথ্য, শুধু ইতিহাস।
IMF-এর Fiscal Monitor 2025 অনুযায়ী, ৬০%-এরও বেশি স্বল্প আয়ের দেশ এখন 'উচ্চ ঋণ ঝুঁকি' বা 'ঋণ সংকটে' আছে। উন্নত দেশগুলোতেও ঋণ-GDP অনুপাত সর্বোচ্চ উচ্চতায়। ঘোড়া শুধু পাগল হয়নি -- সে ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ গতিতে ছুটছে।
ইতিহাস সাক্ষী -- ১৯২৯, ১৯৮২, ১৯৯৭, ২০০৮, ২০১০, ২০২২ -- প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক সংকটের মূলে ছিল অনিয়ন্ত্রিত ঋণ। এটা কাকতালীয় নয়, এটা একটি প্যাটার্ন। এবং সেই প্যাটার্ন আবার তৈরি হচ্ছে -- এবার আরও বড় স্কেলে।
বর্তমান পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা কারণ -- এখন একসাথে সরকার, কোম্পানি এবং পরিবার তিনটি স্তরেই ঋণ রেকর্ড উচ্চতায়। Federal Reserve Bank of New York-এর Q1 2025 রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু মার্কিন পরিবারের ঋণই $17.5 trillion ছাড়িয়েছে।
প্রশ্ন এখন আর 'ঋণ কি ভালো না খারাপ?' নয়। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা হওয়া উচিত: যখন একসাথে সরকার, কর্পোরেট এবং পরিবার -- তিনটি স্তরেই ঋণের বোমা টিকটিক করছে, তখন সেই বিস্ফোরণের ব্যাপ্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
কিন্তু ঠিক কতটা খারাপ পরিস্থিতি? চলুন সংখ্যা দিয়ে দেখি -- $315 trillion মানে আসলে কী।
$315 Trillion -- সংখ্যাটা কতটা ভয়ংকর
$315 trillion। এই সংখ্যাটা লিখতে গেলে ৩১৫ এর পরে ১২টি শূন্য বসাতে হয়। মানুষের মস্তিষ্ক এত বড় সংখ্যা স্বাভাবিকভাবে ধরতে পারে না। তাই চলুন এটাকে ছোট ছোট উদাহরণে বুঝি -- যাতে ভয়টা সত্যিকার অর্থে অনুভব করা যায়।
কল্পনা করুন $315 Trillion
পৃথিবীতে এখন প্রায় ৮ বিলিয়ন মানুষ। IIF-এর $315 trillion ঋণকে সবার মধ্যে ভাগ করলে প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু পড়ে প্রায় $39,375। সদ্যজাত শিশু থেকে শুরু করে ৯০ বছরের বৃদ্ধ -- সবার হিস্যা সমান। একটি পরিবারে চারজন সদস্য থাকলে সেই পরিবারের ভাগে পড়ে প্রায় $157,500।
আরেকটা হিসাব করুন: যদি $100 ডলারের নোট দিয়ে $315 trillion রাখা শুরু করা হয়, সেই নোটের স্তূপ চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছাতো এবং পৃথিবীতে ফিরে আসতো, এই ভাবে চলতো -- ১৭ বার! পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব প্রায় ৩,৮৪,০০০ কিলোমিটার। একবার ভেবে দেখুন এই সংখ্যাটা কত বড়, এই সংখ্যাটা শুধু বড় নয় -- এটি অকল্পনীয়।
আরও একটি তুলনা: মার্কিন স্বাধীনতার সময় (১৭৭৬) থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ জমা হয়েছিল $5 trillion। তারপর মাত্র ২৫ বছরে সেই ঋণ হয়েছে $36 trillion-এর বেশি (US Treasury, CBO 2025)। এটি কোনো স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির প্যাটার্ন নয়।
IIF data অনুযায়ী $315 trillion ঋণের বিভাজন: সরকারি ঋণ $100 trillion-এরও বেশি (IMF Fiscal Monitor 2025), কর্পোরেট ঋণ $90 trillion-এর উপরে (BIS 2025), পারিবারিক ঋণ $55 trillion-এরও বেশি (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য), এবং আর্থিক খাতের ঋণ প্রায় $70 trillion (IIF)।
যদি ১ সেকেন্ডে ১ ডলার খরচ করা হয়, $315 trillion শেষ করতে লাগবে প্রায় ১ কোটি বছর। মানব সভ্যতার পুরো ইতিহাস মাত্র ১০,০০০ বছরের (মানে যেটুকু আমরা জানি আরকি)। এই তুলনা হাস্যকর মনে হলেও এটিই বাস্তবতা -- বৈশ্বিক ঋণ এত বড় যে এর আসল আকার বোঝার কোনো স্বাভাবিক মানবিক রেফারেন্স নেই।
ঋণ বৃদ্ধির গতি -- GDP-কে ছাড়িয়ে গেছে
IIF-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক GDP বেড়েছে প্রায় ৪০%, কিন্তু ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫৮%। ঋণ GDP-র চেয়ে ১.৪৫ গুণ দ্রুত বাড়ছে। এই ব্যবধান প্রতি বছর বাড়ছে -- যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
COVID-19 মহামারিতে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। IMF Fiscal Monitor 2021 অনুযায়ী, ২০২০-২১ সালে সরকারগুলো মাত্র দুই বছরে $17 trillion-এরও বেশি নতুন ঋণ নিয়েছে। এটি ২০০৮ সংকটের তুলনায় তিনগুণ বেশি ঋণ-বৃদ্ধি। মহামারি কেটে গেছে, কিন্তু সেই ঋণ রয়ে গেছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয়: ২০২২-২০২৪ সালে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ০% থেকে ৫.২৫%-এ নিয়ে গেছে -- চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি। সাধারণত উচ্চ সুদ ঋণ নিরুৎসাহিত করে। কিন্তু IIF-এর তথ্য বলছে, ২০২২-২৪ সালেও বৈশ্বিক ঋণ কমেনি -- বরং বেড়েছে।
BIS-এর Annual Economic Report 2024 এই ঘটনাকে 'debt addiction' বলে বর্ণনা করেছে। ঋণ নেওয়া এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে -- সরকার, কোম্পানি এবং পরিবারের জন্য। সুদ বাড়লেও অভ্যাস ভাঙছে না। এটি একটি structural সমস্যা -- শুধু সুদের হার পরিবর্তন করে ঠিক হবে না।
Debt-to-GDP: বিপদ সীমা অনেক আগেই পার
IMF-এর গবেষণায় সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে GDP-র ৯০% কে বিপদসীমা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সীমা অতিক্রমের পরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে যায়। কিন্তু বৈশ্বিক মোট ঋণ (সরকারি + বেসরকারি সব মিলিয়ে) এখন GDP-র ৩৩০% -- বিপদসীমার ৩.৭ গুণ!
IMF WEO 2025 অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোর গড় সরকারি ঋণ-GDP অনুপাত এখন ১২০%-এরও বেশি। উন্নয়নশীল দেশে গড়ে ৬০-৭০%। কিন্তু এই গড়ের পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক দেশের ভয়াবহ চিত্র -- যেমন জাপান (২৬৪%), যুক্তরাষ্ট্র (১২৪%), গ্রিস (১৬০%+)।
| বছর | মোট ঋণ ($T) (IIF) | বৈশ্বিক GDP ($T) (IMF) | ঋণ/GDP (%) | বৃদ্ধির ধারা |
| ২০০০ | $87 | $34 | 256% | বেসলাইন |
| ২০০৭ | $142 | $58 | 245% | +৬৩% (৭ বছরে) |
| ২০১০ | $200 | $66 | 303% | +৪১% (৩ বছরে, পোস্ট-ক্রাইসিস) |
| ২০১৫ | $220 | $75 | 293% | +১০% (৫ বছরে) |
| ২০১৯ | $253 | $87 | 291% | +১৫% (৪ বছরে) |
| ২০২০ | $281 | $85 | 331% | +১১% (১ বছরে, COVID) |
| ২০২৫ | $315 | $105 | 330% | +১২% (৫ বছরে) |
Note: সকল তথ্য IIF Global Debt Monitor 2025 এবং IMF World Economic Outlook 2025 থেকে। GDP পরিসংখ্যান nominal GDP। ঋণ সরকারি, কর্পোরেট, পারিবারিক ও আর্থিক খাত মিলিয়ে।
IIF-এর তথ্য আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে: উন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল দেশ উভয়েই ঋণের গতি সমান। চীনের মোট ঋণ-GDP অনুপাত ৩০০%-এর কাছে (BIS 2025)। ভারতের সরকারি ঋণ GDP-র ৮৫%+ (IMF 2025)। বাংলাদেশেও বৈদেশিক ঋণ ক্রমবর্ধমান। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয় -- এটি সর্বজনীন।
এই সংখ্যা ভয়ংকর। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও ভয়ংকর হলো -- এই ঋণ কোথায় যাচ্ছে, এবং কেন সেটা উৎপাদনশীল কিছুতে পরিণত হচ্ছে না।
ঋণ কোথায় যাচ্ছে -- এবং কেন উৎপাদনশীল কিছুতে পরিণত হচ্ছে না
ঋণ নিজেই সমস্যা আর আরো সমস্যা হলো ঋণ দিয়ে কী করা হচ্ছে। একটি কারখানা তৈরিতে নেওয়া ঋণ এবং সরকারের বেতন দিতে নেওয়া ঋণ -- একই পরিমাণ হলেও তাদের পরিণতি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথমটা তথাকথিত অর্থনীতি তৈরি করে, দ্বিতীয়টা শুধু বোঝা বাড়ায়।
সরকারি ঋণ -- খরচ, বিনিয়োগ নয়
UNDP-এর ২০২৫ সালের রিপোর্ট একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেছে: উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন স্বাস্থ্য ও শিক্ষার চেয়ে বেশি অর্থ ঋণ পরিশোধে খরচ করছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয় -- এটি একটি মানবিক বিপর্যয়ের পূর্বলক্ষণ।
World Bank International Debt Report 2024 অনুযায়ী, ২০২৩ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলো মিলিয়ে $443.5 billion ঋণ পরিশোধ করেছে -- ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এই বিপুল অর্থ যদি স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা অবকাঠামোতে যেত, কতগুলো জীবন বদলে যেত? কিন্তু সেটা গেছে বিদেশি ঋণদাতাদের অ্যাকাউন্টে।
World Bank-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় -- অনেক দেশ ঋণ নিয়ে ভর্তুকি, সরকারি কর্মীদের বেতন, এবং পুনর্নির্বাচনমুখী স্বল্পমেয়াদী প্রকল্পে খরচ করছে। দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যাচ্ছে না সেই অর্থ -- যা থেকে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হতো।
ঋণের অনুৎপাদনশীল ব্যবহারের আরেকটি উদাহরণ: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্বের প্রয়োজন বছরে $3-5 trillion বিনিয়োগ (IEA World Energy Outlook 2024)। কিন্তু সরকারি ঋণের বেশিরভাগ সেখানে যাচ্ছে না -- যাচ্ছে চলতি খরচে। এটি ভবিষ্যতের ঋণের বোঝা আরও বাড়াবে যখন জলবায়ু সংকটের খরচ গুনতে হবে।
IMF-এর Fiscal Monitor 2025-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: যে দেশগুলো ঋণ দিয়ে শিক্ষা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধ করতে পেরেছে। কিন্তু যারা চলতি ব্যয়ে খরচ করেছে, তারা ঋণের ফাঁদে পড়েছে। কোরিয়া ১৯৬০-৮০-র দশকে ঋণ নিয়ে শিল্পায়নে লাগিয়েছিল -- আজ সে উন্নত দেশ।
কর্পোরেট ঋণ -- Zombie কোম্পানি বাঁচিয়ে রাখা
Zombie কোম্পানি হলো এমন একটি কোম্পানি যেটা ঋণের সুদ পরিশোধ করতে পারে, কিন্তু আসল কখনো শোধ করতে পারে না। এরা টিকে থাকে শুধুমাত্র ব্যাংক লোন রোলওভার বা সরকারি সাপোর্টের উপর ভর করে — নিজেদের আয় বা প্রবৃদ্ধি দিয়ে নয়।
নামটা এসেছে Zombie ধারণা থেকেই — মরেও মরে নেই। বাইরে থেকে দেখতে চলমান মনে হলেও ভেতরে কোনো প্রাণ নেই। এই ধরনের কোম্পানি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর, কারণ এরা মূলধন, শ্রম এবং ব্যাংক ঋণ আটকে রাখে — যেটা অন্য সুস্থ কোম্পানি কাজে লাগাতে পারত।
Japan-এর ১৯৯০-এর দশক এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সেখানে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার মুখে থাকা কোম্পানিগুলোকে বারবার লোন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল, ফলে পুরো অর্থনীতি এক দশকেরও বেশি সময় স্থবির হয়ে পড়ে।
BIS-এর ২০২৫ সালের গবেষণা একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে: উন্নত অর্থনীতিতে ১৫-২০% তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন 'zombie' -- যাদের আয় দিয়ে ঋণের কিস্তিও দেওয়া যায় না। এরা টিকে আছে কারণ হয় সুদ হার কম ছিল, অথবা ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিয়েছে পুরাতন ঋণ চাপা দিতে।
২০২২-২৪ সালে সুদের হার বাড়তেই এই zombie কোম্পানিগুলো ভাঙতে শুরু করেছে। S&P Global-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কর্পোরেট defaults ৮০% বেড়েছে আগের বছরের তুলনায়। এই কোম্পানিগুলো বাজারে থাকা মানে মূলধন, কর্মী এবং সম্পদ অনুৎপাদনশীল খাতে আটকে থাকা -- সুস্থ কোম্পানির বৃদ্ধির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
BIS-এর গবেষণা আরও দেখায়: zombie কোম্পানিগুলো তাদের সুস্থ প্রতিযোগীদের ক্ষতি করে। এরা কম দামে পণ্য বেচে টিকে থাকে কারণ সুদের কিস্তি মেটাতে পারলেই হয়, মুনাফার দরকার নেই। ফলে পুরো শিল্প খাতের মুনাফা কমে যায় -- এটি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন কমিয়ে দেয়।
পরিবারের ঋণ -- ক্রেডিট কার্ডের জাল
পারিবারিক ঋণের সমস্যা শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা UK-তে নয়। IMF-এর Global Debt Database 2025 দেখায়, চীনেও household debt দ্রুত বাড়ছে -- ২০১০ সালে GDP-র ১৮% থেকে ২০২৪ সালে ৬০%-এর বেশি। মাত্র ১৫ বছরে তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি। চীনের real estate crisis এই ঋণেরই পরিণতি।
Federal Reserve Bank of New York-এর Q1 2025 রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন পরিবারের মোট ঋণ $17.5 trillion ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ঋণ $1.2 trillion-এরও বেশি (Fed data) -- যার গড় সুদের হার ২০%-এরও বেশি। অর্থাৎ প্রতি $1,000 ক্রেডিট কার্ড ঋণে বছরে $200 শুধু সুদ।
Bank of England-এর তথ্য দেখায়, UK-এর পরিবারগুলোর ঋণ তাদের disposable income-এর প্রায় ১৪০%। এর মানে একটি পরিবার যা আয় করে তার চেয়ে ৪০% বেশি ঋণ আছে। এই পরিবারগুলো ভোক্তা ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতি চালায় -- কিন্তু ঋণ বাড়লে সেই ব্যয় কমে যায়।
নতুন ঋণ দিয়ে পুরাতন ঋণ পরিশোধ -- Ponzi Economics
IMF-এর বিভিন্ন দেশের Article IV পরামর্শ রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়ংকর প্যাটার্ন দেখা যায়: অনেক সরকার নতুন ঋণ নিচ্ছে শুধু পুরাতন ঋণের সুদ পরিশোধ করতে। মূলধন পরিশোধ তো দূরের কথা -- সুদ দিতেই নতুন ঋণ লাগছে।
এই গণিতটা Ponzi scheme-এর মতো। চার্লস পঞ্জি যেমন পুরাতন বিনিয়োগকারীদের নতুন বিনিয়োগকারীদের টাকা দিয়ে পরিশোধ করতেন -- এই সরকারগুলোও তেমনি নতুন ঋণ দিয়ে পুরাতন ঋণ চাপা দিচ্ছে। যতক্ষণ আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, চলে। যখন বাজার আস্থা হারায় -- তখন ধস।
IMF-এর Fiscal Monitor 2025 দেখাচ্ছে, অনেক দেশে primary balance ঘাটতি চলছে -- মানে সুদ বাদ দেওয়ার আগেই ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি। এই অবস্থায় ঋণ কমানো গাণিতিকভাবে অসম্ভব যদি না অর্থনীতি অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পায় -- যা অনেক দেশের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয়।
| ঋণের ধরন | পরিমাণ (২০২৫) | মোটের % | উৎপাদনশীল? | তথ্যসূত্র |
| সরকারি ঋণ | $100T+ | ~৩২% | আংশিক | IMF Fiscal Monitor 2025 |
| কর্পোরেট ঋণ | $90T+ | ~২৯% | মিশ্র (zombie ১৫-২০%) | BIS Quarterly Review 2025 |
| পারিবারিক ঋণ | $55T+ | ~১৭% | বেশিরভাগ না | Fed NY, BoE 2025 |
| আর্থিক খাত | $70T+ | ~২২% | পরিবর্তনশীল | IIF Global Debt Monitor 2025 |
| মোট | $315T+ | ১০০% | বৃহদাংশ অনুৎপাদনশীল | IIF 2025 |
Note: সকল তথ্য IIF Global Debt Monitor 2025, IMF Fiscal Monitor 2025, BIS Quarterly Review 2025, Federal Reserve Bank of New York Q1 2025, Bank of England, UNDP 2025 থেকে।
World Bank-এর 'Poverty and Shared Prosperity Report 2024' আরেকটি ভয়াবহ দিক দেখায়: ঋণ পরিষেবার বোঝা দরিদ্র মানুষের উপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেট কাটলে সেই ক্ষতি সরাসরি দরিদ্রদের জীবনে লাগে -- ধনীরা বেসরকারি সেবা কিনতে পারেন।
"The debt crisis is not just a financial crisis. It is a development crisis, a human rights crisis." -- UN Secretary-General Antonio Guterres, 2023
ঋণ বাড়ছে, অনুৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে -- কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো: এই ঋণের গণিত এমন যে একবার ফাঁদে পড়লে বের হওয়ার পথ প্রায় নেই।
সুদের ফাঁদ -- যখন ঋণ নিজেই ঋণ তৈরি করে
সুদের ফাঁদ শুধু উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪-২৫ সালে ফেডারেল সরকারের সুদ পরিশোধ $1 trillion ছাড়িয়েছে (CBO 2025)। এটি প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি। CBO সতর্ক করছে, এই প্রবণতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে সুদ হবে সবচেয়ে বড় একক ফেডারেল ব্যয়।
ঋণের সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য হলো -- এটি নিজে নিজে বাড়তে পারে। সুদের উপর সুদ, সুদ দিতে নতুন ঋণ, নতুন ঋণের উপর আবার সুদ -- এই চক্রটা এমন যে একবার শুরু হলে থামানো কঠিন। গণিতের ভাষায় বললে, এটি একটি exponential function -- যেখানে ঋণ সরলরেখায় নয়, বক্ররেখায় বাড়ে।
চক্রবৃদ্ধি সুদ -- ঋণের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র
একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। ১০ লাখ টাকা ১২% বার্ষিক সুদে ১০ বছরে হয় ৩১ লাখ টাকা। ২০ বছরে হয় ৯৬ লাখ -- প্রায় ১ কোটি! ৩০ বছরে হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা। মূল ঋণের ৩০ গুণ। শুধু সময়ের সাথে বসে থাকলেই ঋণ এই পরিমাণে বেড়ে যায়।
Rule of 72 বলছে: যেকোনো সুদের হারকে ৭২ দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় ঋণ দ্বিগুণ হওয়ার বছর। ১২% সুদে মাত্র ৬ বছরে ঋণ দ্বিগুণ। ৮% সুদে ৯ বছরে। ২০% সুদে মাত্র ৩.৬ বছরে। এটি ব্যক্তি, কোম্পানি এবং দেশ -- সবার জন্য সমানভাবে মারাত্মক।
চক্রবৃদ্ধি সুদের ক্ষমতা আইনস্টাইনও বুঝেছিলেন। কথিত আছে তিনি বলেছিলেন: মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হলো চক্রবৃদ্ধি সুদ। এটি বিনিয়োগকারীর বন্ধু, কিন্তু ঋণগ্রহীতার শত্রু। বৈশ্বিক $315 trillion ঋণের উপর এই শক্তি কাজ করছে -- প্রতিটি মুহূর্তে।
Debt Spiral -- যখন বের হওয়ার পথ থাকে না
Debt Spiral বা ঋণ-চক্র কীভাবে কাজ করে তা বোঝা দরকার। প্রথমে ঋণ বাড়ে। ঋণ বাড়লে সুদের বোঝাও বাড়ে। সুদ দিতে আরও ঋণ নিতে হয়। নতুন ঋণে আবার সুদ -- এবং এভাবে চক্র চলতে থাকে। একটি পর্যায়ে ঋণ এত বড় হয়ে যায় যে নতুন আয়ের পুরোটাই সুদ দিতে চলে যায় -- grow করার জন্য কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
"Debt is like any other trap, easy enough to get into, but hard enough to get out of." -- Henry Wheeler Shaw (Josh Billings), 19th century American humorist
IMF-এর Fiscal Monitor October 2025 একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে: কিছু দেশে সরকারি রাজস্বের ৩০%-এরও বেশি শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে যাচ্ছে। এই দেশগুলোর কাছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা -- সব মিলিয়ে বাকি ৭০% দিয়ে চলতে হয়। এটি টেকসই নয় -- এটি একটি slow-motion collapse।
IMF-এর নথিভুক্ত ঘটনা: আর্জেন্টিনা চারবার ঋণ খেলাপি করেছে (IMF staff papers বিস্তারিত বিশ্লেষণ দিয়েছে)। প্রতিবারই প্রাথমিকভাবে বেশি ঋণ নিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে -- প্রতিবারই সংকট আরও গভীর হয়েছে।
গ্রিস ২০১০-২০১৫ সালে এই Debt Spiral-এর শিকার হয়। IMF evaluation report অনুযায়ী, গ্রিসের GDP ২৫% সংকুচিত হয়েছিল -- Great Depression-এর পরে ইউরোপে কোনো দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পতন। শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য হওয়ার পরে IMF program-এ যেতে বাধ্য হয়েছে (IMF Staff Report 2023 দ্রষ্টব্য)।
সুদের হার বৃদ্ধি -- ঘোড়াকে আরও পাগল করছে
Federal Reserve ২০২২-২৩ সালে সুদের হার ০% থেকে ৫.২৫%-এ উন্নীত করেছে। প্রতি $1 trillion variable-rate ঋণে এই বৃদ্ধির মানে বাড়তি $52.5 billion সুদ প্রতি বছর। বিশ্বে শত শত trillion ডলার variable-rate ঋণ আছে -- এই সুদ বৃদ্ধির ধাক্কা কতটা বিশাল তা কল্পনা করুন।
World Bank-এর অনুমান: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক সুদের হারে প্রতি ১% বৃদ্ধিতে ঋণ পরিশোধের বোঝা $500 million-এরও বেশি বাড়ছে। এই দেশগুলো প্রায়ই আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারে ঋণ নেয় -- কিন্তু আয় করে স্থানীয় মুদ্রায়। ডলার শক্তিশালী হলে বা সুদ বাড়লে তাদের বোঝা দ্বিগুণ হয়।
IMF-এর Debt Relief under the HIPC Initiative এবং Common Framework দেখায়: ঋণ সংকটে পড়া দেশগুলো সাহায্য পেলেও সেই সাহায্য অনেক সময় অপর্যাপ্ত ও দেরিতে আসে। G20-এর Common Framework প্রক্রিয়া ধীর -- Zambia ২০২০ সালে default করেছে, কিন্তু debt restructuring সম্পন্ন হতে ২০২৩ পর্যন্ত সময় লেগেছে।
এই সুদের ফাঁদ থেকে বেরোনোর দুটো পথ: হয় অর্থনীতি এত দ্রুত বাড়ে যে ঋণ-GDP অনুপাত কমে যায়, নয়তো ঋণ পুনর্গঠন করতে হয় -- যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করে ভবিষ্যৎ ঋণ আরও মহার্ঘ করে দেয়। দুটো পথই কঠিন। আর বেশিরভাগ দেশ দুটোর কোনোটাই নিতে পারছে না।
| মূল পরিমাণ | সুদের হার | ১০ বছরে | ২০ বছরে | ৩০ বছরে |
| ১০ লাখ টাকা | ৮% | ২১.৬ লাখ | ৪৬.৬ লাখ | ১ কোটি ০.৬ লাখ |
| ১০ লাখ টাকা | ১০% | ২৫.৯ লাখ | ৬৭.৩ লাখ | ১ কোটি ৭৪.৫ লাখ |
| ১০ লাখ টাকা | ১২% | ৩১.১ লাখ | ৯৬.৫ লাখ | ২ কোটি ৯৯.৬ লাখ |
| ১০ লাখ টাকা | ১৫% | ৪০.৫ লাখ | ১ কোটি ৬৪.৬ লাখ | ৬ কোটি ৬৭.৯ লাখ |
| ১০ লাখ টাকা | ২০% | ৬১.৯ লাখ | ৩ কোটি ৮৩.৪ লাখ | ২৩ কোটি ৭৩.৮ লাখ |
Note: চক্রবৃদ্ধি সুদের সূত্র: A = P(1+r)^n। ৮% এবং ১০% হার সাধারণ ব্যবসায়িক ঋণের কাছাকাছি। ১২-১৫% উন্নয়নশীল দেশের ঋণ ও ক্ষুদ্রঋণের হারের কাছাকাছি। ২০% ক্রেডিট কার্ডের গড় হার (Fed data 2025)।
সুদের ফাঁদের আরেকটি দিক হলো -- currency risk। যখন একটি দেশ বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নেয়, তখন তার নিজের মুদ্রা দুর্বল হলে ঋণের বোঝা আপনিতেই বাড়ে। টাকার অবমূল্যায়ন মানে ডলার-ঋণের টাকার হিসাবে বৃদ্ধি -- IMF-এর গবেষণায় এটিকে 'original sin' বলা হয় (Eichengreen & Hausman, IMF WP)।
এই গণিত থেকে একটাই শিক্ষা: উচ্চ সুদের ঋণ থেকে বের না হলে পরিণাম অবশ্যম্ভাবী। এখন প্রশ্ন হলো -- ইতিহাস কি এই পরিণামের সাক্ষী?
ইতিহাস সাক্ষী -- প্রতিটি বড় সংকটের মূলে ঋণ
যদি কেউ বলে 'ঋণ সংকট ঘটে না' -- ইতিহাস তাকে মিথ্যা প্রমাণ করে। যদি কেউ বলে 'এবারটা আলাদা' -- ইতিহাস তাকে সতর্ক করে। গত একশ বছরের প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক সংকটে ঋণের ভূমিকা ছিল -- এটি কাকতালীয় নয়, এটি একটি প্যাটার্ন।
১৯২৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত -- প্রতিটি সংকটের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল: সংকটের আগে ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি। BIS Working Paper No. 1002 (Jordà, Schularick, Taylor) ১৭টি উন্নত দেশের ১৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে: অতিরিক্ত ঋণ-বৃদ্ধি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য 'financial crisis predictor'।
ঋণ সংকটের প্যাটার্ন বোঝার জন্য আরেকটি কাঠামো আছে -- Carmen Reinhart ও Kenneth Rogoff-এর 'This Time Is Different' (২০০৯)। ৮০০ বছরের আর্থিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন: প্রতিটি সংকটের আগে মানুষ ভেবেছে 'এবার আলাদা'। কিন্তু পরিণতি সবসময় একই।
১৯২৯ মহামন্দা -- Margin Debt ও Bank Leverage
১৯২৯ সালের Wall Street Crash-এর আগে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা 'margin debt' ব্যবহার করে শেয়ার কিনছিলেন -- মাত্র ১০% নিজের টাকা, বাকি ৯০% ব্যাংকের ঋণ। বাজার পড়তেই margin call এল, বিক্রির হিড়িক পড়ল, ব্যাংক ভাঙল। Federal Reserve-এর ঐতিহাসিক তথ্য দেখায়, ১৯২৯-৩৩ সালে ৯,০০০-এরও বেশি মার্কিন ব্যাংক বন্ধ হয়েছিল।
GDP ১৯২৯-৩৩ সালে ৩০% সংকুচিত হয়েছিল। বেকারত্ব ২৫%-এ পৌঁছায়। এটি আর্থিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতন -- এবং এর মূলে ছিল leverage এবং ঋণ-চালিত সট্টা।
তথ্যসূত্র: Federal Reserve History, Ben Bernanke's Essays on the Great Depression।
১৯৮২ Latin America -- বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণের ফাঁদ
১৯৭০-এর দশকে Latin America-র দেশগুলো সস্তা সুদে ডলার-ঋণ নিয়েছিল। তারপর ১৯৮১-৮২ সালে মার্কিন ফেড সুদের হার ২০%-এ উঠিয়ে দেয়। রাতারাতি ঋণের বোঝা দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে গেল। মেক্সিকো ১৯৮২ সালে ঋণ খেলাপি ঘোষণা করে -- শুরু হয় Latin America-র 'হারানো দশক'।
IMF-এর নথি অনুযায়ী, এই সংকটে ১৬টিরও বেশি Latin American দেশ প্রভাবিত হয়েছিল। এক দশকে সেই অঞ্চলের মাথাপিছু আয় কমেছিল। সমস্যার মূলে ছিল -- বিদেশি মুদ্রায় ঋণ, সুদের হারের অনিশ্চয়তা, এবং অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা।
১৯৯৭ এশিয়া সংকট -- Short-term বৈদেশিক ঋণ
IMF Working Paper WP/98/21 (Corsetti, Pesenti, Roubini) বিশ্লেষণ করেছে: থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়াসহ এশিয়ার দেশগুলো স্বল্পমেয়াদী বৈদেশিক ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করেছিল। ১৯৯৭ সালে থাই baht-এর মান ভাঙতেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঋণ ফিরিয়ে নিতে চাইল -- কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল না।
ইন্দোনেশিয়ার GDP ১৯৯৮ সালে ১৩% সংকুচিত হয়েছিল। থাইল্যান্ডে ১০%। কোরিয়ায় ৬.৯%। বেকারত্ব ও দারিদ্র্য তীব্রভাবে বেড়েছিল। এশিয়ার 'অর্থনৈতিক মিরাকল'-এর দেশগুলো রাতারাতি সংকটে পড়েছিল -- শুধুমাত্র ঋণের কাঠামোর ত্রুটির কারণে।
২০০৮ গ্লোবাল ক্রাইসিস -- Subprime ও 30:1 Leverage
Financial Crisis Inquiry Commission (FCIC) Final Report 2011 স্পষ্টভাবে বলেছে: এই সংকট ছিল মূলত একটি ঋণ ও leverage-এর সংকট। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো ৩০:১ leverage-এ কাজ করছিল -- মানে $1 নিজের মূলধনে $30 ঋণ। Lehman Brothers ব্যর্থ হওয়ার আগে তাদের leverage ratio ছিল ৩১:১।
সাবপ্রাইম মর্টগেজ বাজারে ঋণ দেওয়া হয়েছিল এমন মানুষদের যারা পরিশোধ করতে পারবে না -- সেটা ব্যাংকগুলো জানত। কিন্তু সেই ঋণ প্যাক করে 'সিকিউরিটি' বানিয়ে বিক্রি করা হয়েছিল। IMF-এর অনুমান, এই সংকট বৈশ্বিক আর্থিক সম্পদ থেকে $4 trillion মুছে দিয়েছিল।
২০১০ ইউরোপ -- Sovereign Debt সংকট
Eurostat-এর তথ্য দেখায়, গ্রিসের সরকারি ঋণ ২০১০ সালে GDP-র ১৪৭%-এ পৌঁছেছিল। গ্রিস, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, ইতালি -- পাঁচটি দেশ একসাথে সংকটে পড়ল। IMF ও EU মিলিয়ে 500 billion euro-এরও বেশি বেলআউট দিতে হয়েছিল। গ্রিসে GDP ২০০৮-১৬ সালে ২৫% সংকুচিত হয়েছে -- IMF evaluation দেখায় এটি ইউরোপের শান্তিকালীন ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর মন্দা।
২০২২ শ্রীলঙ্কা -- Foreign Debt ও Reserve Depletion
IMF Staff Report 2023 (Sri Lanka) বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছে: শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২২ সালে প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ২০১০-এর দশকে দেশটি চীন ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত রিটার্ন দেয়নি। ২০২২ সালে জ্বালানি, ওষুধ, খাবার কিনতে পারছিল না সরকার।
বিশ্বব্যাংকের 'Global Economic Prospects June 2024' রিপোর্ট দেখায় -- ২০১০-এর দশকে উন্নয়নশীল দেশের দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির পরিণতিতে এই দশকে অনেক দেশ debt crisis-এর সম্মুখীন হবে। World Bank-এর ভাষায়: 'the most vulnerable economies face a wave of debt distress'।
২০২২ Crypto -- Leveraged Speculation
FTX bankruptcy court documents ও SEC filing দেখায়: FTX এবং অন্যান্য ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম গ্রাহকদের ডিপোজিট ব্যবহার করে leveraged speculation করছিল। TerraLuna-র পতন, Celsius-এর দেউলিয়া, FTX-এর কেলেঙ্কারি -- সবই ছিল leverage ও unregulated debt-এর পরিণতি। $2 trillion-এর বেশি ক্রিপ্টো মার্কেট মূল্য মুছে গিয়েছিল।
| সংকট | বছর | ঋণের ধরন | ট্রিগার | GDP প্রভাব | তথ্যসূত্র |
| মহামন্দা | ১৯২৯-৩৩ | Margin debt, bank leverage | Stock crash, bank runs | US GDP -৩০% | Fed History, Bernanke |
| Latin America | ১৯৮২ | বৈদেশিক মুদ্রা ঋণ | US সুদ ২০%-এ উঠল | ১০+ দেশ সংকটে | IMF Staff Papers |
| এশিয়া সংকট | ১৯৯৭-৯৮ | Short-term foreign debt | Currency পতন | Indonesia -১৩% | IMF WP/98/21 |
| গ্লোবাল ক্রাইসিস | ২০০৮-০৯ | Subprime, 30:1 leverage | Lehman Brothers | Global -$4T wealth | FCIC Report 2011 |
| ইউরো সংকট | ২০১০-১৫ | Sovereign debt | Bond yield spike | Greece GDP -২৫% | Eurostat, IMF Eval. |
| শ্রীলঙ্কা | ২০২২ | Foreign currency debt | Reserve শূন্য | Severe contraction | IMF Staff Report 2023 |
| Crypto Crash | ২০২২ | Leveraged speculation | TerraLuna collapse | -$2T market cap | SEC, FTX Court Docs |
Note: তথ্যসূত্র: Federal Reserve Historical Data, IMF Staff Papers, IMF WP/98/21, FCIC Final Report 2011, Eurostat Government Finance Statistics, IMF Article IV Sri Lanka 2023, SEC FTX filings।
এই ইতিহাস থেকে একটি সার্বজনীন সূত্র বের হয়: ঋণ সংকট কখনো হঠাৎ আসে না। এটি ধীরে ধীরে জমে, তারপর হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। Hemingway-এর উপন্যাসে একটি চরিত্র বলেছিল সে কীভাবে দেউলিয়া হয়েছে: 'Gradually, then suddenly.' ঋণ সংকটও ঠিক এভাবেই আসে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করুন: এই প্রতিটি সংকটের আগে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন 'এবার ভালো থাকব'। ২০০৭ সালে Ben Bernanke বলেছিলেন সাবপ্রাইম সমস্যা 'contained'। ২০১০ সালে ইউরোপীয় নেতারা বলেছিলেন গ্রিস সংকট 'manageable'। ইতিহাস দেখায় -- আত্মবিশ্বাস সংকটকে আটকায় না, সতর্কতা আটকায়।
ইতিহাস বারবার একই গল্প বলছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি কি আগের চেয়ে খারাপ?
২০২৫ সালে পাগলা ঘোড়া কোথায় -- বর্তমান বিপদ মানচিত্র
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া গেলে ভালো হতো। কিন্তু ২০২৫ সালের বিপদের মানচিত্র দেখলে বোঝা যায় -- শিক্ষা নেওয়া হয়নি। বরং ঝুঁকি আরও বেড়েছে, আরও বেশি দেশে ছড়িয়েছে, এবং এবার সংকটের সম্ভাব্য বিস্তার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়।
IMF-এর World Economic Outlook 2025 একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে: বৈশ্বিক ঋণের এই পরিমাণ কি টেকসই? উত্তর নির্ভর করে প্রবৃদ্ধির হার এবং সুদের হারের পার্থক্যের উপর। যদি প্রবৃদ্ধি > সুদের হার, তাহলে ঋণ ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। কিন্তু ২০২২-পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনেক দেশে সুদের হার প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে।
Debt Distress-এ থাকা দেশ -- IMF Classification 2025
IMF-এর Debt Sustainability Analysis (DSA) framework অনুযায়ী, ৬০%-এরও বেশি স্বল্প আয়ের দেশ (Low-Income Countries) এখন 'high risk' বা 'in distress' বিভাগে। IMF-এর নিজস্ব প্রকাশিত তালিকায় Zambia, Ghana, Ethiopia, Malawi, Chad, Somalia, Sudan, Zimbabwe-সহ একাধিক দেশ 'debt distress'-এ আছে বলে চিহ্নিত।
UNCTAD-এর Trade and Development Report 2024 জানাচ্ছে: উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋণ পরিশোধে যে অর্থ খরচ করছে, তার পরিমাণ তাদের মোট জাতীয় আয়ের ১০-৩৫% পর্যন্ত পৌঁছেছে কিছু দেশে। এই দেশগুলোতে UN-এর Sustainable Development Goals (SDGs) অর্জন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে -- কারণ বিনিয়োগের টাকাই নেই।
Zambia ২০২০ সালে ইউরোবন্ড ঋণ খেলাপি করেছে -- Sub-Saharan Africa-তে COVID-পরবর্তী প্রথম sovereign default। Ghana ২০২২ সালে IMF-এর কাছে সাহায্য চেয়েছে এবং ২০২৩ সালে বন্ড ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। Ethiopia Eurobond payment স্থগিত করেছে। এগুলো IMF-এর Article IV রিপোর্টে বিস্তারিত নথিভুক্ত।
IMF-এর World Economic Outlook April 2025 অনুযায়ী, অনেক মধ্যম আয়ের দেশও এখন 'elevated debt vulnerabilities'-এর তালিকায়। পাকিস্তান, মিশর, তিউনিসিয়া, আর্জেন্টিনা -- এই দেশগুলো IMF সহায়তায় চলছে বা সম্প্রতি চলেছে। ঋণ পরিষেবার বোঝা তাদের উন্নয়ন বাজেটকে গ্রাস করছে।
উন্নত দেশেও ঋণ বোমা
উন্নত দেশগুলোও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। জাপানের সরকারি ঋণ GDP-র ২৬৪% (IMF WEO 2025) -- বিশ্বের সর্বোচ্চ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ $36 trillion ছাড়িয়েছে, GDP-র ১২৪% (US Treasury, CBO 2025)। ইতালির ঋণ-GDP ১৪০% (Eurostat 2025)। ফ্রান্সের ১১২% (Eurostat 2025)।
তবে উন্নত দেশগুলোর কিছু সুরক্ষা আছে যা উন্নয়নশীল দেশের নেই। জাপান তার ঋণের বেশিরভাগ নিজের দেশের প্রতিষ্ঠানের কাছে। মার্কিন ডলার বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা। ইতালির পেছনে আছে ECB। এই বিষয়গুলো ঝুঁকি কমায় -- কিন্তু শেষ করে না। একটি পর্যায়ে এই সুরক্ষাগুলোও কাজ করা বন্ধ করতে পারে।
US Congressional Budget Office (CBO) Long-Term Budget Outlook 2025 সতর্ক করছে: বর্তমান ধারায় চললে ২০৫৪ সালের মধ্যে মার্কিন ঋণ GDP-র ১৬৬%-এ পৌঁছাবে। CBO-র ভাষ্য: এটি 'unprecedented in United States history' হবে এবং 'significant risks to the fiscal and economic outlook' তৈরি করবে।
লুকানো ঋণ -- সবচেয়ে বিপজ্জনক
William & Mary বিশ্ববিদ্যালয়ের AidData গবেষণা সংস্থার হিসাবে, চীনের বিদেশি ঋণ কার্যক্রম প্রায় $1.3 trillion -- এবং এর বড় অংশ আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এই ঋণগুলো সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে বা state-owned enterprise-এর (SOE) মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে, যা IMF-এর standard debt reporting-এ আসে না।
এই 'hidden debt' সমস্যা শুধু চীনা ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। IMF-এর Article IV consultation রিপোর্টগুলো নিয়মিতভাবে off-balance-sheet liabilities, contingent guarantees এবং SOE ঋণের বিষয়ে সতর্ক করে। অনেক সরকার রাজনৈতিক কারণে এই ঋণ সরকারি হিসাবে দেখায় না -- কিন্তু সংকটে সেই ঋণের দায় সরকারের উপরেই পড়ে।
AidData-র 'Hidden Debt' রিপোর্ট (২০২১, ২০২৩) দেখিয়েছে -- উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রকৃত বৈদেশিক ঋণ official statistics-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই লুকানো ঋণ যখন হঠাৎ প্রকাশ পায় -- বাজারের আস্থা তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে পড়ে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও অনেক ঋণ সঠিকভাবে রিপোর্ট করা হয়নি।
| অঞ্চল / দেশ | ঋণ/GDP | ঝুঁকির স্তর (IMF) | মূল দুর্বলতা | তথ্যসূত্র |
| জাপান | ২৬৪% | মাঝারি (domestic-held) | Aging population, deflation risk | IMF WEO 2025 |
| যুক্তরাষ্ট্র | ১২৪% | মাঝারি-উচ্চ | Political gridlock on fiscal | CBO, US Treasury 2025 |
| ইতালি | ১৪০% | উচ্চ | Low growth, ECB dependency | Eurostat 2025 |
| ফ্রান্স | ১১২% | মাঝারি-উচ্চ | Fiscal deficit, political risk | Eurostat 2025 |
| Zambia | ১২০%+ | Distress | Sovereign default 2020 | IMF Article IV 2024 |
| Ghana | ৯০%+ | High risk/Distress | Bond restructuring | IMF Program 2023 |
| পাকিস্তান | ৭৫%+ | High risk | IMF program dependency | IMF Article IV 2025 |
| আর্জেন্টিনা | ৮৯%+ | High risk | Repeated defaults | IMF Staff Report 2025 |
| Sub-Saharan Africa | গড় ৬০%+ | ৬০%+ দেশ High risk | Hidden debt, dollar exposure | IMF DSA 2025 |
Note: সকল তথ্য IMF WEO April 2025, IMF Debt Sustainability Analysis 2025, Eurostat Government Finance Statistics 2025, US Congressional Budget Office Long-Term Budget Outlook 2025, AidData (William & Mary) 2023 এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে।
IMF-এর Global Financial Stability Report April 2025 আরেকটি নতুন ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে: private credit market-এর দ্রুত বৃদ্ধি। ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ কড়া হওয়ায় অনেক ঋণ এখন shadow banking ও private equity-তে চলে গেছে। এই বাজারের স্বচ্ছতা কম, নিয়ন্ত্রণ কম -- সংকটে এখানে কী আছে তা কেউ জানে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো -- এই সংকটগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। একটি দেশের সংকট দ্রুত অন্য দেশে ছড়ায়। ২০০৮ সালে মার্কিন সাবপ্রাইম সংকট কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকায় পৌঁছে গিয়েছিল। IMF-এর Global Financial Stability Report 2025 এই interconnectedness-কে বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
"Debt is a prolific mother of folly and of crime." -- Benjamin Disraeli, former UK Prime Minister
Moody's ও Fitch-এর ২০২৪-২৫ সালের sovereign credit outlook রিপোর্ট দেখায়: আরও বেশি দেশের ক্রেডিট রেটিং 'negative outlook'-এ নামছে। রেটিং কমলে ঋণের সুদ বাড়ে -- যা সেই দেশের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাকে আরও কমিয়ে দেয়। এটি একটি self-fulfilling prophecy -- ঋণ সংকটের আশঙ্কাই ঋণ সংকট তৈরি করে।
IMF-এর World Economic Outlook October 2025 আরেকটি উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণ দিয়েছে: বৈশ্বিক বৃদ্ধি ধীর হচ্ছে। ২০২৫-২৬ সালে বৈশ্বিক GDP বৃদ্ধি মাত্র ৩.০-৩.২% পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে -- যা ঐতিহাসিক গড় ৩.৮%-এর নিচে। কম বৃদ্ধি মানে কর রাজস্ব কম, মানে ঋণ পরিশোধ আরও কঠিন।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই বৈশ্বিক ঋণ সংকটের মানে কী? বৈশ্বিক সুদের হার বাড়লে আন্তর্জাতিক ঋণের খরচ বাড়ে। বিনিয়োগকারীরা 'safe haven'-এ অর্থ সরালে উন্নয়নশীল দেশ থেকে মূলধন পালায়। রেমিট্যান্স পাঠানো দেশগুলোতে মন্দা হলে প্রবাসী আয় কমে। World Bank-এর Migration and Development Brief 2025 এই ঝুঁকিগুলো বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছে।
বিপদের মানচিত্র পরিষ্কার। ঘোড়া শুধু পাগল হয়নি -- সে এখন বিশ্বের প্রতিটি কোণে ছুটছে। পরবর্তী অংশে আমরা দেখব -- এই বিপদ থেকে বেরোনোর পথ কি আছে, নাকি ঘোড়া আর থামার নয়?
কে দায়ী — কারা ঘোড়াকে পাগল করলো?
এখানে কোনো ব্যক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে না। অভিযোগ সিস্টেমের বিরুদ্ধে, প্যাটার্নের বিরুদ্ধে — এবং সেই প্যাটার্নগুলো তথ্য দিয়ে প্রমাণিত।
IIF Global Debt Monitor ২০২৫-এর তথ্য: বৈশ্বিক ঋণ ২০২৪ সালে আরো ১২ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে — মোট ৩১৫ ট্রিলিয়ন ছাড়িয়েছে। এই বৃদ্ধির গতি কমছে না, বরং বাড়ছে। প্রশ্ন হলো: কে এই ঋণের সৃষ্টিকর্তা?
কম সুদের নীতি — ঋণের আসক্তি তৈরি
ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস (BIS)-এর গবেষণা বলছে, ২০০৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ultra-low সুদের হার "encouraged excessive risk-taking and debt accumulation" — অর্থাৎ এই নীতি সরাসরি অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণকে উৎসাহিত করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ১৪ বছর ধরে সুদের হার প্রায় শূন্যের কোঠায় রেখেছিল। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক, ব্যাংক অফ জাপান — সবাই একযোগে এই নীতি অনুসরণ করেছে। ফলে ঋণ হয়ে গেছে অস্বাভাবিক সস্তা, এবং ব্যক্তি, কর্পোরেট ও সরকার সবাই মিলে ঋণের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
BIS Annual Report 2023 স্পষ্ট ভাষায় লিখেছে: "prolonged monetary easing has contributed to debt vulnerabilities." এটি কোনো বিশেষজ্ঞের মতামত নয় — এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন।
২০০৮ সালের আগে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান Alan Greenspan নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে তার দীর্ঘকালীন কম-সুদ নীতি সম্পদের মূল্যবুদবুদ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। এটি Congressional Testimony-তে লিপিবদ্ধ।
ফলাফল: ব্যক্তি ঋণ নিল কারণ সুদ সস্তা। কর্পোরেট ঋণ নিল leverage বাড়াতে। সরকার ঋণ নিল ঘাটতি পূরণ করতে। এবং সবাই ধরে নিল — সুদ সস্তাই থাকবে চিরকাল।
রাজনৈতিক ঋণচক্র
IMF-এর গবেষণাপত্রগুলো বারবার দেখিয়েছে যে নির্বাচনী চক্র এবং সরকারি ঋণ বৃদ্ধির মধ্যে একটি শক্তিশালী পারস্পরিক সম্পর্ক আছে। নির্বাচনের আগে সরকারগুলো ব্যয় বাড়ায়, ভর্তুকি দেয়, প্রকল্প উদ্বোধন করে — এবং ঘাটতি বাড়ে।
IMF Fiscal Monitor বারবার এই প্যাটার্ন নথিভুক্ত করেছে: নির্বাচনের বছরগুলোতে fiscal discipline ভেঙে পড়ে। এটি কোনো একটি দেশের সমস্যা নয় — উন্নত এবং উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশেই এই প্যাটার্ন দেখা যায়। গণতন্ত্রের একটি কাঠামোগত দুর্বলতা হলো: ভোটাররা স্বল্পমেয়াদী সুবিধা পছন্দ করেন, দীর্ঘমেয়াদী ঋণের বোঝা নয়।
এই সমস্যাটি শুধু উন্নয়নশীল দেশের নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান — সর্বত্রই নির্বাচনী রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সুস্থিরতাকে বলিদান দিয়েছে। স্বল্পমেয়াদী রাজনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সুস্থিরতা প্রায়ই সংঘাতে থাকে।
আর্থিক খাতের লোভ ও অনিয়ম
Financial Crisis Inquiry Commission (FCIC)-এর ২০১১ সালের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়েছে: "The crisis was the result of human action and inaction, not of Mother Nature." এই কমিশন মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক গঠিত ছিল — এটি কোনো বামপন্থী সমালোচকের বক্তব্য নয়।
রেটিং এজেন্সিগুলো বিষাক্ত ঋণ-পণ্যকে AAA রেটিং দিয়েছিল। CDO (Collateralised Debt Obligation) এবং CDS (Credit Default Swap)-এর মতো জটিল আর্থিক হাতিয়ার তৈরি করা হয়েছিল মূলত ঝুঁকি লুকাতে — এটি FCIC Report এবং SEC-এর তদন্তে বিস্তারিত নথিভুক্ত। ব্যাংকগুলো জেনেশুনে বিষাক্ত পণ্য বিক্রি করেছে, এবং রেটিং এজেন্সিগুলো ফি-এর বিনিময়ে সেই পণ্যকে নিরাপদ সার্টিফিকেট দিয়েছে।
২০০৮-পরবর্তী সংস্কারের পরেও কি পরিস্থিতি বদলেছে? BIS-এর ২০২৩ সালের রিপোর্ট বলছে: কিছুটা উন্নতি হয়েছে, কিন্তু systemic risk সম্পূর্ণ দূর হয়নি। Non-bank financial institutions (NBFI) — hedge fund, private equity, money market fund — এখন ব্যাংকের চেয়ে বেশি assets ধরে রাখছে, কিন্তু তাদের উপর regulation কম।
COVID — জরুরি ঋণ যা স্থায়ী হয়ে গেছে
IMF Fiscal Monitor 2021 স্বীকার করেছে যে মহামারিকালীন "extraordinary fiscal support was necessary" — কিন্তু একই রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে: "exit strategies are critical."
IMF-এর ২০২৫ সালের মূল্যায়ন দেখাচ্ছে, বেশিরভাগ দেশ এখনো কোভিড-পূর্ব ব্যয় স্তরে ফিরে আসেনি। জরুরি ব্যয় স্থায়ী খরচে পরিণত হয়েছে। এক্সিট স্ট্র্যাটেজি কাগজেই থেকে গেছে।
কোভিড-পরবর্তী মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার দ্রুত বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু উচ্চ সুদের হারে সরকারের ঋণ পরিশোধের খরচও বেড়েছে। IMF-এর হিসাবে, উন্নত অর্থনীতিগুলোতে সুদ ব্যয় ২০২৫ সালে GDP-র ৩% ছুঁতে পারে — যা স্বাস্থ্য বা শিক্ষায় ব্যয়ের চেয়ে বেশি।
| Actor (কে) | How (কীভাবে) | Evidence (প্রমাণ) | Source (সূত্র) |
| কেন্দ্রীয় ব্যাংক | ১৪ বছর শূন্য সুদ নীতি | ঋণ সস্তা করে অতিরিক্ত গ্রহণ উৎসাহিত | BIS Annual Report 2023 |
| সরকার | নির্বাচনের আগে ব্যয় বৃদ্ধি | রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণ বৃদ্ধি | IMF Fiscal Monitor (বিভিন্ন বছর) |
| ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান | CDO, CDS তৈরি করে ঝুঁকি লুকানো | ২০০৮ বৈশ্বিক আর্থিক সংকট | FCIC Report 2011 |
| রেটিং এজেন্সি | বিষাক্ত পণ্যে AAA রেটিং | বিনিয়োগকারীদের ভুল তথ্য প্রদান | FCIC Report, SEC তদন্ত |
| সরকার (কোভিড) | জরুরি ব্যয় স্থায়ী করা | ব্যয় কমানো হয়নি | IMF Fiscal Monitor 2021, 2025 |
Note: BIS Annual Report 2023, IMF Fiscal Monitor (বিভিন্ন বছর), FCIC Final Report 2011, SEC Investigation Reports থেকে সংকলিত।
কোভিডের পরে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলো 'exit strategy' ঘোষণা করেছে কিন্তু বাস্তবে সরকারি ব্যয় কমেনি। IMF-এর ২০২৫ Fiscal Monitor দেখাচ্ছে, G7 দেশগুলোর গড় প্রাথমিক ঘাটতি এখনো কোভিড-পূর্ব স্তরে নামেনি। "জরুরি" ব্যয় এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
মূল বার্তা: পাগলা ঘোড়া একা পাগল হয়নি। তাকে পাগল করা হয়েছে — সিস্টেমেটিকভাবে, প্রণোদনার কাঠামো দিয়ে, লোভ দিয়ে এবং দায়িত্বহীনতা দিয়ে।
পরিণতি কী হবে — বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
যখন একাধিক স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা একই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন, তখন সেটাকে উপেক্ষা করা যায় না।
IMF-এর সতর্কবাণী
IMF Global Financial Stability Report 2025 সরাসরি বলছে: "elevated debt levels pose risks to financial stability" — এটি কোনো তাত্ত্বিক ঝুঁকি নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতার মূল্যায়ন।
IMF Managing Director Kristalina Georgieva বলেছেন: "We are in an era of high debt and must prepare for potential shocks." এই বক্তব্যটি ২০২৫ সালে IMF Annual Meetings-এ দেওয়া — এটি সতর্কবাণী, অভিনন্দন বার্তা নয়।
IMF-এর World Economic Outlook 2025 আরো স্পষ্ট: উন্নত অর্থনীতিগুলোতে ঋণ/GDP অনুপাত ২০২৫ সালে আবার বাড়তে শুরু করেছে। ২০১০-২০১৯ সালে সামান্য যে উন্নতি হয়েছিল, কোভিড ও পরবর্তী ব্যয় তা মুছে দিয়েছে। পাঁচ বছরের অগ্রগতি দুই বছরে বিলীন।
BIS-এর উদ্বেগ
BIS Annual Report 2025 উল্লেখ করেছে: "the global financial system remains vulnerable to debt-related risks." BIS হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক — এই প্রতিষ্ঠান রক্ষণশীল ভাষায় কথা বলে। তারা যখন 'vulnerable' শব্দ ব্যবহার করে, তখন সেটা গুরুত্বের সাথে নিতে হয়।
BIS General Manager Agustin Carstens zombie companies এবং maturity walls নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। Zombie company হলো সেইসব প্রতিষ্ঠান যারা শুধু ঋণ নিয়ে বেঁচে আছে — সুদের হার বাড়লেই এরা দেউলিয়া হয়ে যাবে। Maturity wall হলো সেই মুহূর্ত যখন একসাথে বিশাল পরিমাণ ঋণের মেয়াদ শেষ হয় — পরিশোধ বা পুনর্অর্থায়ন করতে হয়।
World Bank-এর হুঁশিয়ারি
World Bank Global Economic Prospects 2025 উন্নয়নশীল বিশ্বের ঋণ টেকসইতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষত নিম্ন আয়ের দেশগুলো যেখানে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা সীমিত, সেখানে এই ঋণের বোঝা সামাজিক সেবা খাতকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সাবেক World Bank President David Malpass তার কার্যকালে বারবার সতর্ক করেছেন unsustainable debt buildup নিয়ে। তিনি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন চীনা ঋণের অস্বচ্ছতা নিয়ে — অনেক দেশ চীন থেকে ঋণ নিয়েছে যার সম্পূর্ণ শর্তাবলী সর্বজনীনভাবে প্রকাশিত নয়।
World Bank-এর International Debt Report 2024 জানাচ্ছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো ২০২৩ সালে ঋণ পরিশোধে রেকর্ড ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এই বিশাল পরিশোধের বোঝা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে।
Ray Dalio-র Big Debt Cycle Theory
Ray Dalio তার গ্রন্থ "Principles for Navigating Big Debt Crises"-এ দীর্ঘমেয়াদী ঋণ চক্রের তত্ত্ব বিস্তারিত উপস্থাপন করেছেন। তার মূল থিসিস: বর্তমান বিশ্ব একটি দীর্ঘমেয়াদী ঋণ চক্রের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
Dalio-র ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ বলছে, দীর্ঘমেয়াদী ঋণ চক্রের পরিসমাপ্তি সাধারণত তিনটি পথে হয়: (১) বড় আকারের ঋণ পুনর্গঠন, (২) মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে ঋণের প্রকৃত মূল্য কমানো, অথবা (৩) অর্থনৈতিক সংকট। তিনটিরই মানবিক মূল্য বিশাল।
Dalio আরো বলছেন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন একটি পর্যায়ে যেখানে সরকারকে নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণের সুদ দিতে হচ্ছে — এটি Ponzi finance-এর কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য। Congressional Budget Office (CBO) নিজেও নিশ্চিত করেছে যে মার্কিন সুদ পরিশোধ ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা ব্যয় ছাড়িয়ে গেছে।
Nouriel Roubini (Dr. Doom)
Nouriel Roubini তার ২০২২ সালের গ্রন্থ "MegaThreats"-এ ঋণকে বিশ্বের শীর্ষ অস্তিত্বগত অর্থনৈতিক হুমকিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
Roubini ২০০৬-২০০৭ সালেই ২০০৮-এর সংকট পূর্বাভাস দিয়েছিলেন — যখন মূলধারার অর্থনীতিবিদরা তাকে অতিমাত্রায় হতাশাবাদী বলে খারিজ করেছিলেন। সেই পূর্বাভাস সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান ঋণ সংকট নিয়ে তার সতর্কবাণীকে আমলে না নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
একটি নির্মম সত্য: IMF, BIS, World Bank, Dalio, Roubini — এরা সবাই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একই উপসংহারে পৌঁছেছেন। পাগলা ঘোড়া থামছে না — এবং পরিণতি গুরুতর হতে পারে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো — এই সতর্কবাণীগুলো শুধু একাডেমিক গবেষণা নয়। IMF, BIS এবং World Bank — এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থিত। এরা তথ্য দিয়ে কাজ করে, অনুমান দিয়ে নয়। তাদের একমত হওয়া মানে আলার্ম বেল বাজছে।
তাহলে কি সব শেষ? — বাস্তবসম্মত প্রতিক্রিয়া
হ্যাঁ, ঋণ বিপজ্জনক। হ্যাঁ, পরিস্থিতি গুরুতর। কিন্তু কিছু সমাধান আছে। সৎভাবে বলতে গেলে — সমস্যা সমাধানের চেয়ে বড়। তবু সমাধানের পথগুলো জানা দরকার।
ঋণ পুনর্গঠন — কাজ করে কিন্তু যথেষ্ট নয়
G20 Common Framework for Debt Restructuring — IMF ও World Bank সমর্থিত — একটি কাঠামো যার মাধ্যমে সংকটগ্রস্ত দেশ ঋণ পুনর্গঠন করতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে এটি কার্যকর।
বাস্তবতা: জাম্বিয়া ২০২০ সালে ডিফল্ট করার পর পুনর্গঠন চুক্তিতে পৌঁছাতে ৩ বছরেরও বেশি সময় লেগেছে — IMF-এর নিজস্ব টাইমলাইন ডেটা অনুযায়ী। এই সময়ে দেশটির অর্থনীতি স্থবির, বিনিয়োগ বন্ধ, মানুষের জীবনমান পড়ে গেছে। প্রক্রিয়াটি এত ধীর যে সংকট সমাধানের আগেই বড় ক্ষতি হয়ে যায়।
মুদ্রাস্ফীতি দিয়ে ঋণ গলানো — বিপজ্জনক
ঐতিহাসিকভাবে সরকারগুলো একটি কৌশল ব্যবহার করেছে: টাকা ছেপে মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করো, যাতে ঋণের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। কাগজে-কলমে এটি কাজ করে — কিন্তু এর মানবিক মূল্য ভয়াবহ।
তুরস্ক এবং আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা — IMF Article IV Consultation ডেটা অনুযায়ী — দেখাচ্ছে যে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধ্বংস করে। আর্জেন্টিনায় মুদ্রাস্ফীতি ২০২৩ সালে ১০০%-এর উপরে উঠেছিল। তুরস্কেও একই চিত্র। ঋণ হয়তো কমেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে।
ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ জার্মানির Weimar Republic: ১৯২০-এর দশকে মুদ্রাস্ফীতি এতটাই বেড়েছিল যে মানুষ রুটি কিনতে ঠেলাগাড়ি ভরে টাকা নিয়ে যেত। BIS-এর ঐতিহাসিক গবেষণা বলছে, hyperinflation সমাজকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে যা দশকের পর দশক ধরে প্রভাব ফেলে।
রাজস্ব শৃঙ্খলা — কথায় সহজ, বাস্তবে কঠিন
IMF fiscal consolidation বা ব্যয় সংকোচনের পরামর্শ দেয় — কিন্তু নিজেই স্বীকার করে এর রাজনৈতিক কঠিনতার কথা। কোনো নির্বাচিত সরকারের পক্ষে জনপ্রিয় খরচ কমানো সহজ নয়।
গ্রিসের উদাহরণ: IMF-এর নিজস্ব মূল্যায়নে স্বীকার করা হয়েছে যে গ্রিসে আরোপিত austerity measures সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। ২০১০-২০১৫ সময়কালে গ্রিসে বেকারত্ব ২৭% ছুঁয়েছিল, দারিদ্র্য বেড়েছিল, এবং রাস্তায় বিক্ষোভ হয়েছে। ব্যয় কমানো সহজ নয় — মানুষ ভোগান্তিতে পড়লে প্রতিবাদ করে।
কাঠামোগত সংস্কার — দীর্ঘমেয়াদী কিন্তু অনিশ্চিত
World Bank সুপারিশ করে: কর ভিত্তি বিস্তার করো, ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াও, দুর্নীতি কমাও। এগুলো সঠিক পরামর্শ। কিন্তু IMF-এর নিজস্ব সংস্কার বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় দেখা যায় বেশিরভাগ দেশে সংস্কার বাস্তবায়নের হার হতাশাজনকভাবে কম।
একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে: যদি সমাধান জানা থাকে, তাহলে কেন বাস্তবায়ন হয় না? IMF-এর নিজস্ব গবেষণা বলছে, political economy — অর্থাৎ ক্ষমতার রাজনীতি — প্রায়ই সঠিক নীতিকে বাধা দেয়। যারা সংস্কার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত এবং সংস্কার ঠেকিয়ে রাখে।
সারসংক্ষেপ: সমাধান আছে। কিন্তু সেগুলো ধীর, রাজনৈতিকভাবে কঠিন, এবং বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। সমস্যার স্কেল যে পরিমাণে বেড়েছে, সমাধানের গতি সেই তুলনায় অপ্রতুল। পাগলা ঘোড়ার গতি আর লাগামের টান — এখনো ঘোড়াই এগিয়ে।
সবচেয়ে হতাশাজনক বাস্তবতা হলো: বিশ্বের অর্থনীতিবিদরা সমাধান জানেন। IMF প্রতিটি দেশকে প্রতি বছর Article IV-এ কী করতে হবে তা বলে দেয়। কিন্তু করা হয় না। কারণ সমাধান বেদনাদায়ক, আর রাজনৈতিক ব্যবস্থা বেদনাকে এড়িয়ে যায়।
প্যারাডক্স: ঋণ সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা — এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাই এই সমস্যার অন্যতম কারণ। এই বৃত্তটি ভাঙা এ সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ — পাগলা ঘোড়া কি আমাদের দরজায়?
বৈশ্বিক ঋণ সংকটের কথা জানলাম। এখন প্রশ্ন — বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? তথ্যগুলো Bangladesh Bank, IMF Article IV Consultation, এবং World Bank থেকে নেওয়া।
সংখ্যা যা বলছে (Bangladesh Bank / IMF ডেটা)
সরকারি ঋণ/GDP অনুপাত প্রায় ৪০% — Bangladesh Bank এবং IMF উভয়ের তথ্য এটি নিশ্চিত করে। বৈশ্বিক গড়ের (৯৩%) তুলনায় এটি নিম্নস্তরে। এটি একটি ইতিবাচক দিক।
কিন্তু Bangladesh Bank-এর প্রকাশিত তথ্য দেখাচ্ছে বৈদেশিক ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে। মোট বৈদেশিক ঋণ ৯৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে (২০২৪ সালের শেষভাগ পর্যন্ত তথ্য)। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শীর্ষ $৪৮ বিলিয়ন থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে — এটি Bangladesh Bank-এর নিজস্ব তথ্য।
Bangladesh Bank Financial Stability Report (FSR) অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতে Non-Performing Loan (NPL) হার ১০-১২% এর আশেপাশে — যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উচ্চ এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
রাজস্ব আদায়ের চিত্রটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কর-GDP অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্নের কাছাকাছি — IMF Article IV-এ এটি বারবার উল্লেখ পেয়েছে। কম রাজস্ব মানে সরকারকে ঋণের উপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
ঝুঁকির জায়গা
পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল — মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ঘনিয়ে আসছে। এই প্রকল্পগুলো সরকারিভাবে নথিভুক্ত এবং এদের ঋণ শর্তাবলী সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে।
ডলার-মূল্যায়িত ঋণ + টাকার অবমূল্যায়ন = বাস্তব ঋণ বোঝা বৃদ্ধি। ২০২২-২৪ সালে টাকার বিনিময় হার উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। বৈদেশিক ঋণ টাকায় পরিশোধ করতে হলে বেশি টাকা লাগছে — এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিদ্যুৎ খাতে capacity payment — অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও কেন্দ্রগুলোকে দিতে হয় এমন অর্থ — উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এটি সরকারের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।
রফতানি আয়ের উপর নির্ভরশীলতাও একটি ঝুঁকির কারণ। বাংলাদেশের রফতানির প্রায় ৮৩% পোশাক খাত থেকে আসে (EPB তথ্য)। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় এই খাতে রফতানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমবে — এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে।
তুলনামূলক অবস্থান
IMF Article IV Consultation বাংলাদেশের ঋণকে বর্তমানে "manageable" বলছে — কিন্তু "growing fiscal risks"-এর বিষয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এটি আশ্বাসবাণী নয়, সতর্কতাও।
শ্রীলঙ্কার সাথে তুলনা: বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ২০১৯-২০২০ সালের শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভালো। কিন্তু শ্রীলঙ্কা ২০১৯-এও বেশিরভাগ সূচকে 'ঠিকঠাক' দেখাচ্ছিল — ২০২২ সালে সংকট এসেছে দ্রুতগতিতে। Trajectory গুরুত্বপূর্ণ, শুধু বর্তমান সংখ্যা নয়।
| সূচক (Indicator) | মান (Value) | সূত্র (Source) | ঝুঁকি মূল্যায়ন (Risk Assessment) |
| সরকারি ঋণ/GDP | ~৪০% | Bangladesh Bank, IMF | মাঝারি — বৈশ্বিক গড়ের নিচে |
| মোট বৈদেশিক ঋণ | >$৯৫ বিলিয়ন | Bangladesh Bank | ক্রমবর্ধমান — পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন |
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | শীর্ষ $৪৮B থেকে হ্রাস | Bangladesh Bank | চাপে — উদ্বেগজনক প্রবণতা |
| NPL অনুপাত (ব্যাংকিং) | ~১০-১২% | Bangladesh Bank FSR | উচ্চ — সেক্টর দুর্বলতা |
| মেগা প্রকল্প ঋণ পরিশোধ | নিকট ভবিষ্যতে আসছে | সংসদীয় নথি, সরকারি তথ্য | ঊর্ধ্বমুখী চাপ |
| IMF মূল্যায়ন | "Manageable, but growing risks" | IMF Article IV Consultation | সতর্ক নজরদারি প্রয়োজন |
Note: Bangladesh Bank Annual Report, Bangladesh Bank Financial Stability Report (FSR), IMF Article IV Consultation (Bangladesh), World Bank Data থেকে সংকলিত।
বাংলাদেশ এখনো সেই বিপজ্জনক সীমানায় পৌঁছায়নি যেখানে শ্রীলঙ্কা পৌঁছেছিল। কিন্তু সতর্কতার সংকেতগুলো উপেক্ষা করার উপায় নেই। IMF Article IV-এর ভাষায়: এখনই সংস্কার না করলে ভবিষ্যতের options সংকুচিত হয়ে যাবে।
করণীয় ও বর্জনীয়
ঋণের পাগলা ঘোড়া সামাল দিতে হলে — ব্যক্তি, ব্যবসা এবং নীতিনির্ধারক প্রত্যেকেরই করণীয় এবং বর্জনীয় কিছু আছে। IMF ও World Bank-এর সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি এই তালিকা।
করণীয়
১. ঋণের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করুন: IMF-এর পরামর্শ অনুযায়ী, উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য নেওয়া ঋণ (education, productive assets) ভোগব্যয়ের জন্য নেওয়া ঋণের চেয়ে অনেক ভালো। ঋণ নেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করুন: এটি কি আমার আয় বাড়াবে?
২. Debt-to-Income ratio পর্যবেক্ষণ করুন: World Bank-এর household finance গবেষণা বলছে, মাসিক ঋণ পরিশোধ আয়ের ৩৫%-এর বেশি হওয়া উচিত নয়। এই সীমা অতিক্রম করলেই ঝুঁকি বাড়ে।
৩. জরুরি তহবিল গড়ুন: IMF-এর household resilience বিশ্লেষণ বলছে, অন্তত ৩-৬ মাসের খরচের সমপরিমাণ জরুরি সঞ্চয় থাকলে ঋণ সংকটে পড়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
৪. ঋণের সুদের হার তুলনা করুন: উচ্চ সুদের ক্রেডিট কার্ড বা ভোক্তা ঋণ আগে পরিশোধ করুন। এটি personal finance-এর মৌলিক নীতি যা World Bank-এর financial literacy কার্যক্রমেও বারবার জোর দেওয়া হয়।
৫. নীতিনির্ধারকদের জন্য — fiscal rules মেনে চলুন: IMF Fiscal Monitor সুপারিশ করে দেশগুলোর মধ্যমেয়াদী fiscal frameworks তৈরি করতে, যেখানে ঋণ/GDP অনুপাতের উর্ধ্বসীমা নির্ধারিত থাকবে।
৬. ঋণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন: World Bank-এর DSSI (Debt Service Suspension Initiative) এবং G20 Common Framework উভয়ই জোর দিয়েছে ঋণের সম্পূর্ণ তথ্য সর্বজনীনভাবে প্রকাশের উপর। লুকানো ঋণ সংকট আরো ঘনীভূত করে।
৭. বৈচিত্র্যময় আয়ের উৎস তৈরি করুন: ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা বাড়ানোর সেরা উপায় হলো আয় বাড়ানো। IMF-এর growth strategy গবেষণা বলছে, বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাত এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা দীর্ঘমেয়াদে ঋণ সহনীয় রাখার সেরা পথ।
ব্যক্তি পর্যায়ে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো আর্থিক শিক্ষা বৃদ্ধি। World Bank-এর Financial Capability Surveys দেখিয়েছে, আর্থিকভাবে সচেতন মানুষরা ঋণ সংকটে কম পড়েন। সুদের চক্রবৃদ্ধি বোঝা, ঝুঁকি পরিমাপ করা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা — এই তিনটি দক্ষতাই যথেষ্ট পার্থক্য তৈরি করে।
নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে: IMF-এর Medium-Term Fiscal Framework সুপারিশ অনুযায়ী, দেশগুলোর উচিত স্বাধীন fiscal councils গঠন করা যারা সরকারের বাজেটের উপর নিরপেক্ষ নজরদারি করবে। রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত এই ধরনের প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে fiscal discipline বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বর্জনীয়
১. ভোগব্যয়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ নেওয়া: বিলাসপণ্য, ছুটি, বা নিত্যপণ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ নেওয়া — IMF-এর household vulnerability analysis অনুযায়ী এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক ঋণ আচরণ।
২. ঋণ দিয়ে ঋণ শোধ করা (Ponzi borrowing): নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণ পরিশোধ করা — Minsky-র financial instability hypothesis এবং IMF-এর debt sustainability analysis উভয়েই এটিকে সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
৩. অস্বচ্ছ শর্তে ঋণ গ্রহণ: বিশেষত জাতীয় পর্যায়ে — World Bank এবং IMF বারবার সতর্ক করেছে সম্পূর্ণ শর্তাবলী জানা ছাড়া ঋণ না নিতে। অস্বচ্ছ ঋণ পরে সার্বভৌমত্বের ক্ষতি করতে পারে।
৪. অর্থনৈতিক উন্নতির আশায় ব্যয় না কমানো: "অর্থনীতি ভালো হলে পরিশোধ করব" — এই যুক্তিতে ঋণ বাড়ানো বিপজ্জনক। IMF-এর historical debt crisis analysis দেখায়, সংকট প্রায়ই প্রত্যাশার চেয়ে আগে আসে।
৫. সুদের হার চিরকাল কম থাকবে ধরে নেওয়া: ২০২২-২৩ সালে বৈশ্বিক সুদের হার দ্রুত বৃদ্ধি অনেক ঋণগ্রহীতাকে বিপদে ফেলেছে। BIS-এর ২০২৩ সালের সতর্কবাণী: variable rate ঋণের ঝুঁকি কখনো উপেক্ষা করবেন না।
৬. রাজনৈতিক সুবিধার জন্য fiscal rules ভাঙা: IMF এবং বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা একমত: নির্বাচনী বছরে fiscal rules শিথিল করা স্বল্পমেয়াদী জনপ্রিয়তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিপদ ডেকে আনে।
৭. সংকটের জন্য অপেক্ষা করা: IMF-এর সবচেয়ে জোরালো বার্তা হলো: সংস্কার করার সেরা সময় সংকটের আগে। সংকট এলে options কমে যায়, শর্ত কঠিন হয়, মানুষের কষ্ট বাড়ে।
এই করণীয় ও বর্জনীয় তালিকা শুধু তাত্ত্বিক নয়। ২০০৮ সালের সংকট, ২০১০-১৫ সালের ইউরোজোন সংকট এবং ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে বারবার প্রমাণিত হয়েছে — যারা সতর্কবাণী উপেক্ষা করেছে, তারা চড়া মূল্য দিয়েছে।
উপসংহার — পাগলা ঘোড়া থামবে কি?
সৎ উত্তর হলো: সম্ভবত শীঘ্রই নয়।
IIF, IMF, BIS, World Bank — বিশ্বের চারটি প্রধান আর্থিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা — সবাই একমত যে বর্তমান ঋণের গতিপথ টেকসই নয়। চারটি স্বাধীন সংস্থা একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কাকতালীয় নয়।
কিন্তু "unsustainable" মানে এই নয় যে আগামীকাল সব ভেঙে পড়বে। এর মানে হলো — যদি পথ না বদলানো হয় — একটা নির্দিষ্ট সময়ে ভাঙবেই। প্রশ্ন শুধু কখন। এবং কতটা বেদনাদায়কভাবে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা: Carmen Reinhart এবং Kenneth Rogoff-এর যুগান্তকারী গবেষণা "This Time Is Different: Eight Centuries of Financial Folly" দেখিয়েছে যে ঋণ চক্রের পরিণতি সাধারণত তিনটি পথে হয়: (১) সুশৃঙ্খল ঋণ পুনর্গঠন, (২) মুদ্রাস্ফীতি, অথবা (৩) সংকট। তিনটিরই অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য বিশাল।
Reinhart ও Rogoff-এর মূল বার্তা: প্রতিটি ঋণ সংকটের আগে লোকেরা বলেছে, "এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন।" প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু মানুষের লোভ ও সংকটের গণিত বদলায়নি। ৮০০ বছরের ইতিহাস একই কথা বলে।
তাহলে আমাদের কী করণীয়? আতঙ্কিত হওয়া নয়। কিন্তু সতর্ক থাকা — ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঋণ কমানো, সঞ্চয় বাড়ানো, এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতা দাবি করা। কারণ পাগলা ঘোড়ার ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়।
বিশ্ব এখন ৩১৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই ঋণ পৃথিবীর সমস্ত মানুষের — জন্মের আগেই ঋণী হয়ে জন্মানো প্রজন্মের। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সতর্ক করছে, ইতিহাস সতর্ক করছে, গণিত সতর্ক করছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: IIF-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক ঋণ আরো ১২ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে। একটি বছরে ১২ ট্রিলিয়ন। এই গতিতে চললে ২০৩০ সালে বৈশ্বিক ঋণ কোথায় পৌঁছাবে? হিসাবটা কেউ জোরে করতে চায় না।
পাগলা ঘোড়াটি এখনো ছুটছে। লাগাম নেই। ব্রেক নেই। শুধু প্রার্থনা আছে।
"When you owe the bank $100, that is your problem. When you owe the bank $100 million, that is the bank's problem. When the world owes $315 trillion — that is everyone's problem."
পাগলা ঘোড়া থামবে। ইতিহাস বলছে, সব ঘোড়াই একদিন থামে। প্রশ্ন হলো — নিজে থেকে থামবে, নাকি দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে থামবে। সেই দেওয়ালে আপনিও আছেন, আমিও আছি।
প্রতিটি প্রজন্ম মনে করেছে — 'আমাদের সময়ে এই সংকট আসবে না।' Reinhart ও Rogoff-এর বইয়ের শিরোনামই বলে দেয়: 'This Time Is Different.' কিন্তু এবারও আলাদা নয়। গণিত বদলায় না। ঋণের গাণিতিক সীমা আছে।
শেষ কথা: ঋণ একটি হাতিয়ার — এটি নিজে থেকে ভালো বা খারাপ নয়। কিন্তু $৩১৫ ট্রিলিয়ন ঋণ নিয়ে বিশ্ব এখন যে পর্যায়ে, সেখানে হাতিয়ার আর নিয়ন্ত্রণকারীর হাতে নেই — হাতিয়ার নিজেই নিয়ন্ত্রণকারী হয়ে গেছে।
IMF, BIS, World Bank এবং IIF একসাথে যা বলছে: বিশ্ব ঋণের পরিমাণ কমাতে হলে রাজনৈতিক সাহস দরকার, এবং সেই সাহস এখন সবচেয়ে দুর্লভ পণ্য।









