GeoRenus Editorial Team

Forex Market = এক মুদ্রা থেকে আরেক মুদ্রায় কনভার্সনের বাজার — বিশ্বের সবচেয়ে বড়, দৈনিক ৭.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন। Currency Pair (Major, Minor, Exotic), Spot/Forward/Swap — এই হলো কাঠামো। Exchange Rate তিন স্তরে নির্ধারিত — চাহিদা-সরবরাহ, Interest/Inflation, PPP। বাংলাদেশ ব্যাংক Crawling Peg Regime চালাচ্ছে ২০২৪ থেকে। ২০২২-২৪-এর ডলার সংকটের পাঁচ কাঠামোগত কারণ এবং পাঁচ সমাধানের পথ। ১৯৪৪ ব্রেটন উডস থেকে ২০২৬-এর De-dollarization পর্যন্ত ইতিহাস।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির এক সকাল। হোসনে আরা বেগম, ৫২ বছর। বিধবা, তিন সন্তানের মা। ছোট ছেলে ইমরান গত ছয় বছর ধরে সৌদি আরবের রিয়াদে কাজ করছেন — একটা কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে। প্রতি মাসে ৪০০ ডলার বাড়িতে পাঠান। আজ সকালে এজেন্ট বাড়িতে এসেছেন টাকা পৌঁছাতে।
৪০০ ডলার — সংখ্যাটা একই, কিন্তু প্রতি বছর এর দাম বদলেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে যখন এক ডলার ৮৬ টাকা ছিল, তখন হোসনে আরা পেতেন ৩৪,৪০০ টাকা। তবে ২০২৪-এর মাঝামাঝি দেশে ডলার সংকট তীব্র হয়ে উঠল — সরকারি দর ১১৮, কিন্তু কার্ব মার্কেটে ১২৫-১২৮ পর্যন্ত। মানে একই ৪০০ ডলারে তিনি পেতেন ৫০,০০০ টাকার বেশি। এখন ২০২৬-এ দর স্থিতিশীল হয়েছে ১২০-১২২-এর কাছাকাছি, কার্ব প্রিমিয়াম ১-২%-এ নেমেছে। হোসনে আরা আজ পেলেন ৪৮,৪০০ টাকা।
এই দরটা কে ঠিক করেন? দাম কেন উঠে, কেন নামে? বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে কাজ করে এই বাজারে? মানে — এই এক টাকা ওঠানামার পেছনে কত ধরনের শক্তি কাজ করে, সেটা না বুঝলে হোসনে আরার মতো লক্ষ লক্ষ পরিবারের আয়ের রহস্য বোঝা যাবে না।
চলুন তাহলে যাই ঢাকার মতিঝিল-এ — বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে। সেখানে সাইফ আহমেদের ডেস্ক। ৩৬ বছর বয়স। গত আট বছর ধরে এই বাজারের অন্য দিক থেকে দেখছেন। হোসনে আরা যেটা শেষ ফলাফল হিসেবে পান, সাইফ সেটা তৈরি হওয়ার পেছনের প্রতিটা স্তর দেখেন।
সাইফের ডেস্কে আজকের সকালের প্রস্তুতিমূলক বৈঠক। দু'টা স্ক্রিনে রয়টার্স ইকন, একটায় ইন্টারনাল রিজার্ভ ড্যাশবোর্ড। আজকের ছবি — বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৪.৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২১-এর আগস্টে যা ছিল ৪৮ বিলিয়নের চূড়ায়, ২০২৩-এর শেষে ১৯ বিলিয়নে নেমে গিয়েছিল। এখন ধীরে ধীরে রিকভারি হচ্ছে — মানে আইএমএফ-এর ঋণ, রেমিটেন্স বৃদ্ধি, আর আমদানি কমানোর সম্মিলিত ফল।
সাইফের সকালের কাজ — অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে আজকের হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা ঠিক করা। কোন ব্যাংক আজ ডলার চাইবে, কতটা রিজার্ভ থেকে ছাড়তে হবে, কার্ব মার্কেটের সাথে সরকারি দরের ফাঁক কতটা — এই সব হিসাব। তবে এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই বড় কিছু। মানে — তাঁর প্রতিটা সিদ্ধান্ত হোসনে আরার মতো লক্ষ লক্ষ পরিবারের আয়কে স্পর্শ করে। দরে এক টাকার পরিবর্তন মানে দেশের সব রেমিটেন্স প্রাপকের আয়ে কোটি কোটি টাকার পার্থক্য।
এই দু'জনের গল্প Forex Market-এর সারমর্ম। এক পাশে হোসনে আরা — যিনি বুঝতে চান কেন তাঁর ছেলের পাঠানো ৪০০ ডলারের দাম প্রতি বছর বদলায়। অন্য পাশে সাইফ — যিনি জানেন এই দর ঠিক করতে গিয়ে কতগুলো শক্তি, কতটা রিজার্ভ, কতটা রাজনৈতিক চাপ একসাথে কাজ করে। দু'জনের মধ্যে কোনো সরাসরি যোগাযোগ নেই, কিন্তু একজনের সিদ্ধান্ত আরেকজনের জীবনকে প্রতিদিন স্পর্শ করছে। সহজ কথায়: Forex Market একটা অদৃশ্য জাল।
Financial Market Series-এর ষষ্ঠ পর্ব। আগের পর্বে Derivative Market-এ আমরা USD/BDT Forward দেখেছিলাম নাইমুরের চোখে। নাইমুরের ক্লায়েন্ট রশিদ সাহেব যখন ১ কোটি ডলারের Hedge করছিলেন, তখন underlying-টা ছিল foreign exchange। আজ সেই underlying বাজারেই ঢুকব — বিশ্বের সবচেয়ে বড় financial market। দৈনিক ৭.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন। সহজ কথায়: আমেরিকার শেয়ারবাজারের দৈনিক ভলিউমের কয়েক গুণ। অথচ এই বাজার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা প্রায় শূন্য।
এই লেখায় হোসনে আরা এবং সাইফ — দু'জনের চোখ দিয়ে দেখব Forex Market-এর গঠন, Currency Pair কেমন, Exchange Rate কীভাবে নির্ধারিত হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা কী, ২০২২-২৪-এর ডলার সংকটের আসল কারণ কী ছিল, ইতিহাস, ঝুঁকি, এবং ভবিষ্যৎ।
Forex Market — সংক্ষেপে FX, বা Foreign Exchange Market — সেই বাজার যেখানে এক দেশের মুদ্রা আরেক দেশের মুদ্রার বিনিময়ে কেনা-বেচা হয়। হোসনে আরার ছেলে রিয়াদে SAR (সৌদি রিয়াল)-এ বেতন পান, সেটা SAR থেকে USD-এ রূপান্তরিত হয়, তারপর USD থেকে BDT-এ। মানে — একটা রেমিটেন্সের পেছনে দু'টা FX লেনদেন লুকিয়ে আছে।
এই বাজারের আকার শুনলে চমকে যাবেন। ২০২২-এর বিআইএস ট্রিয়েনিয়াল সার্ভে অনুযায়ী, দৈনিক বৈশ্বিক FX Turnover ৭.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তুলনায় বললে — বিশ্বের মোট বার্ষিক জিডিপি প্রায় ১০৫ ট্রিলিয়ন ডলার, এই FX বাজারে মাত্র ১৪ দিনে এতটা লেনদেন হয়। এক বছরে FX বাজারে ১,৯০০-২,০০০ ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন। সহজ কথায়: অন্য কোনো financial বাজার এর কাছেও আসে না।
কেন এই বাজার এত বড়? কারণ এটা শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য না। প্রকৃতপক্ষে অ্যাকচুয়াল বাণিজ্যের জন্য মাত্র ৫-৭% FX ভলিউম ব্যবহৃত হয়। বাকি ৯৩-৯৫% কী? Speculation (বাজি ধরা), Hedging (ঝুঁকি কমানো), কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ, এবং financial লেনদেন (যেমন একজন আমেরিকান বিনিয়োগকারী ভারতীয় শেয়ার কিনতে গেলে আগে রুপি লাগে)। মানে — যে কোনো আন্তঃদেশীয় financial কাজে FX লেনদেন আছে।
সহজ কথায়: Forex Market = এক মুদ্রা থেকে আরেক মুদ্রায় কনভার্সনের বাজার। বিশ্বের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে Liquid বাজার — দৈনিক ৭.৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
Forex Market-এর আরেকটা মজার বৈশিষ্ট্য — এটা সপ্তাহে পাঁচ দিন, ২৪ ঘণ্টা চলে। মানে সোমবার সকাল থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো বিরতি নেই। কেন? কারণ বিশ্বের বিভিন্ন টাইম জোনে ট্রেডিং সেন্টার রয়েছে। সিডনি বন্ধ হলে টোকিও খোলে, টোকিও বন্ধ হলে ফ্রাঙ্কফুর্ট, ফ্রাঙ্কফুর্ট বন্ধ হলে লন্ডন, লন্ডন বন্ধ হলে নিউ ইয়র্ক। মাঝখানে কোনো ফাঁক নেই। শনি-রবি বন্ধ। তবে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জে Stablecoin (USDT, USDC) ব্যবহার করে এখন ২৪/৭ FX-এর সমতুল্য কিছু চলে।
FX-এ একটা মুদ্রা কেনা মানে আরেকটা মুদ্রা বিক্রি — সবসময় দু'মুদ্রার যুগল। সেজন্যই এদের বলা হয় Currency Pair।
Major Pair: USD-এর সাথে অন্য বড় মুদ্রার যুগল — EUR/USD, USD/JPY, GBP/USD, USD/CHF, USD/CAD, AUD/USD, NZD/USD। মানে এই ৭টা Pair-ই বৈশ্বিক FX Turnover-এর ৭০%-এর বেশি। শুধু EUR/USD একাই ২৫% — বিশ্বের সবচেয়ে বেশি Traded Asset।
Minor Pair (Cross): USD ছাড়া দু'টা Major মুদ্রার মধ্যে — EUR/GBP, EUR/JPY, GBP/JPY, AUD/JPY। তুলনামূলক কম Liquid, Spread একটু বেশি।
Exotic Pair: একটা Major মুদ্রা এবং একটা উন্নয়নশীল দেশের মুদ্রা — USD/BDT, USD/INR, USD/TRY, USD/ZAR। এই Pair-এ Liquidity আরো কম, Spread আরো বড়। হোসনে আরার ছেলে যে USD পাঠান, সেটা USD/BDT Pair-এর মাধ্যমেই BDT হয়।
FX লেনদেনের তিন প্রধান রূপ। প্রথমে Spot — দু' ব্যবসায়িক দিনের মধ্যে Settlement। মানে আজ আপনি ১০ লক্ষ ডলার ১২০ টাকায় কিনলেন, পরশু লেনদেনের Settlement হয়ে যাবে। এটাই সবচেয়ে সাধারণ — বৈশ্বিক FX ভলিউমের ৩৩%।
এরপর Forward — ভবিষ্যৎ তারিখে Settlement, কিন্তু আজই দর Fix। নাইমুর আর রশিদ সাহেবের Forward আমরা গত পর্বে দেখেছি। তৃতীয় রূপ FX Swap — দু'মুদ্রার Spot এবং Forward একসাথে। মানে আজ USD কেনা against BDT, ৬ মাস পরে উল্টে দেওয়া। সহজ কথায়: এটাই বৈশ্বিক FX ভলিউমের সবচেয়ে বড় অংশ — ৫০%। প্রধানত ব্যাংকের তরল্যের জন্য, মানে দৈনিক Funding-এ ব্যবহৃত হয়।
ধরন | Settlement | বৈশ্বিক ভলিউম | ব্যবহারকারী |
Spot | T+2 (দু' ব্যবসায়িক দিন) | ~৩৩% | বাণিজ্য, Retail FX, কেন্দ্রীয় ব্যাংক |
Forward | Custom তারিখ | ~১৫% | Corporate Hedger, রপ্তানিকারক, আমদানিকারক |
FX Swap | Spot + Forward | ~৫০% | ব্যাংক ট্রেজারি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক |
Option/NDF | Custom | ~২% | Advanced Hedger, Speculator |
সহজ কথায়: Currency Pair = দু'মুদ্রার একসাথে কেনা-বেচা। Spot (দু'দিন), Forward (Custom তারিখ), Swap (Combined) — তিন প্রধান রূপ। FX Swap-এর ভলিউম সবচেয়ে বড়, কারণ ব্যাংকের ট্রেজারি দৈনন্দিন Funding-এ এটাই ব্যবহার করে।
USD/BDT আজ ১২০ — এই সংখ্যাটা কে ঠিক করল? উত্তর সহজ না — তিন স্তরে আসে। সকালের চাহিদা-সরবরাহ এক দিকে নাড়া দেয়, মাসিক অর্থনৈতিক উপাদান অন্য দিকে টানে, এবং কয়েক বছরের কাঠামোগত ভিত্তি দীর্ঘমেয়াদে দিক ঠিক করে। চলুন একটা একটা করে দেখি।
প্রথমে কাঠামো বুঝে নিই। বিশ্বে Currency Regime মূলত তিন ধরনের। Fixed Rate — সরকার একটা দর ঘোষণা করে, সেটাই বজায় থাকবে; প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। যেমন সৌদি আরবের SAR আজও USD-এর সাথে Fixed (৩.৭৫ SAR per USD)। হংকং ডলার-ও Fixed (৭.৮০ per USD)।
দ্বিতীয় — Floating Rate। মানে বাজারই ঠিক করবে; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ নেই বা খুব কম। আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, যুক্তরাজ্য — Major মুদ্রাগুলো সব Floating। তৃতীয় — Managed Float, দু'টোর মাঝামাঝি। বাজার ঠিক করে কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাঝে মাঝে হাত দেয়। বাংলাদেশের USD/BDT এই Managed Float Regime-এ। ভারতের USD/INR-ও তাই।
দৈনিক ভিত্তিতে দর চলে চাহিদা-সরবরাহে। বাংলাদেশে যখন আমদানি বেশি (তেল, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল) — তখন USD-এর চাহিদা বেশি, BDT-এর সরবরাহ বেশি। ফলে USD-এর দাম বাড়ে। উল্টোদিকে যখন রেমিটেন্স এবং রপ্তানি বেশি — USD-এর সরবরাহ বেশি, BDT-এর চাহিদা বেশি। তখন USD-এর দাম কমে। সাইফ আহমেদের ডেস্ক দৈনিক এই অসামঞ্জস্য দেখেন — যদি ফাঁক বড় হয়, তাহলেই হস্তক্ষেপ।
৬ মাস থেকে ২ বছরের হরাইজনে দর চলে Interest Rate এবং Inflation-এর পার্থক্যে। বাংলাদেশের Repo Rate এখন ৮.০০%, ইউএস Fed Funds ৩.২৫-৩.৫০% — মানে BDT-তে বিনিয়োগ করলে ইউএস ডলার-এর চেয়ে ৪.৫-৫% বেশি Interest পাওয়ার সুযোগ। তাহলে কি বিদেশি বিনিয়োগ BDT-তে আসবে? তত্ত্বে হ্যাঁ, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের Capital Control-এর কারণে এই Flow সীমিত। তবে Interest Differential Forward Rate-এর Pricing ঠিক করে — Interest Rate Parity-র ফর্মুলা আগের পর্বে দেখেছি।
Inflation-এর পার্থক্যও কাজ করে। ২০২২-২৪-এ বাংলাদেশে Inflation ৯-১০%, আমেরিকায় ৩-৫% — মানে BDT দ্রুত ক্ষয় হচ্ছিল, দীর্ঘমেয়াদে USD/BDT দর বাড়ার চাপ। সেটাই হয়েছে — ৮৬ থেকে ১২২-এ।
দীর্ঘ হরাইজনে একটা তত্ত্ব আছে — Purchasing Power Parity। মানে দু'দেশে একই পণ্য একই দামে পাওয়ার কথা (Exchange Rate Adjust-এর পর)। যদি একটা বিগ ম্যাক আমেরিকায় ৫ ডলার, ভারতে ১৫০ রুপি — তাহলে USD/INR-এর PPP Rate ৩০। কিন্তু অ্যাকচুয়াল Rate ৮৭ (২০২৬)। এই বিশাল ফাঁক বলে দেয় রুপি দারুণভাবে Undervalued (অথবা আমেরিকার বিগ ম্যাক Overpriced)। বিশ্বে কোনো দেশই Perfect PPP-তে নেই — তবে দীর্ঘমেয়াদে এই দিকে Nudge হয়।
সহজ কথায়: Exchange Rate তিন স্তরে নির্ধারিত — Short-term-এ চাহিদা-সরবরাহ, Medium-term-এ Interest/Inflation-এর পার্থক্য, Long-term-এ PPP। বাংলাদেশের দর Managed Float-এ চলে — বাজার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যৌথ প্রভাব।
Forex বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা দু'রকম — Referee এবং Player। চলুন সাইফের ডেস্ক থেকে দেখি।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে USD, EUR, GBP, JPY, সোনা জমা আছে। ২০২১-এর আগস্টে এটা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের চূড়ায় পৌঁছেছিল। তারপর বৈশ্বিক এনার্জি ক্রাইসিস, ডলার সংকট, আইএমএফ-এর শর্ত — সবমিলিয়ে দ্রুত পতন। ২০২৩-এর শেষে ১৯ বিলিয়নে নেমেছিল। ২০২৬-এর শুরুতে ২৪.৩ বিলিয়ন — মানে আইএমএফ-এর সহায়তা, রেমিটেন্স বৃদ্ধি, এবং আমদানি কমানোর সম্মিলিত ফল।
রিজার্ভ থাকার কারণ কী? কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। এক, আমদানি পেমেন্ট — দেশের ৩-৫ মাসের আমদানির জন্য যথেষ্ট USD থাকা চাই। দুই, Exchange Rate স্থিতিশীল রাখতে হস্তক্ষেপ। তিন, বিদেশি ঋণ পরিশোধ। চার, বাজারের আস্থা — কম রিজার্ভ মানে মুদ্রা চাপে, তখন Capital Flight শুরু হতে পারে। সহজ কথায়: রিজার্ভ একটা দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় সূচক।
যখন USD/BDT হঠাৎ অস্বাভাবিক ওঠানামা করে — যেমন ২০২২-এর জুনে এক সপ্তাহে দর ৮৬ থেকে ৯২-এ গিয়েছিল — বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে। কীভাবে? ব্যাংকগুলোর কাছে USD বিক্রি করে। এতে USD-এর সরবরাহ বাড়ে, চাহিদা মেটে, দর স্থিতিশীল হয়। ২০২২-২৩-এ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল হস্তক্ষেপ হিসেবে।
তবে এই হস্তক্ষেপের সীমা আছে। রিজার্ভ কমে গেলে আর হস্তক্ষেপ করা সম্ভব না — তখন বাজারের চাপ মেনে নিতে হয়। সেটাই হয়েছিল ২০২৩-এ — বাংলাদেশ ব্যাংক এক ধাপ পিছিয়ে গেল, BDT ৯২ থেকে ১২২-এ চলে গেল। এই অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
২০২৪-এর মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক একটা নতুন কাঠামো ঘোষণা করল — Crawling Peg। মানে একটা নির্দিষ্ট Mid-rate থেকে ±১% Band-এ রাখা হবে। প্রতি মাসে এই Mid-rate ১-২% Adjust হতে পারে। মানে এটা পুরোপুরি Floating-ও না, পুরোপুরি Fixed-ও না — আইএমএফ-এর দিকনির্দেশনায় একটা ক্রান্তিকালীন Regime। ২০২৬-এর মাঝামাঝি পুরোপুরি Market-based Rate চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সহজ কথায়: বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ ম্যানেজ করে, বাজারে হস্তক্ষেপ করে, এবং Exchange Rate Regime ঠিক করে। ২০২৪ থেকে Crawling Peg, ২০২৬-এ পুরোপুরি Market-based Rate-এর পথে।
Forex বাজারে অংশীদার পাঁচ-ছয় ধরনের। প্রত্যেকের মোটিভ এবং পরিসর ভিন্ন।
ফেডারেল রিজার্ভ (আমেরিকা), ইসিবি (ইউরোপ), ব্যাংক অফ জাপান, আরবিআই (ভারত), বাংলাদেশ ব্যাংক — সব কেন্দ্রীয় ব্যাংক FX বাজারে সক্রিয়। উদ্দেশ্য — Reserve Management, Exchange Rate-এ হস্তক্ষেপ, Currency Swap Line বজায় রাখা। বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের বাজারের সবচেয়ে বড় Domestic Player।
বাংলাদেশের ৬১টা ব্যাংকই FX Dealing করে। এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিটিব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক — সবার ট্রেজারি বিভাগ। দু'রকম কাজ — ক্লায়েন্টের জন্য (RMG রপ্তানিকারকের Export Proceed, আমদানিকারকের Payment) এবং Proprietary Trading (নিজেদের জন্য)। ২০২৬-এ বাংলাদেশে দৈনিক Inter-bank FX Turnover প্রায় ৫০-৭০ কোটি ডলার।
RMG ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশের Largest FX Participant — বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রপ্তানি, সব USD-এ আসে। তারপর বেক্সিমকো, ওয়ালটন, স্কয়ার — কেউ রপ্তানি করেন, কেউ আমদানি। আমদানির পাশে সোনারবাংলা এলপিজি (তেল), বিপিসি (জ্বালানি), ডেসকো (বিদ্যুৎ), বড় Textile Manufacturer (Raw Cotton, Fabric)। এই কর্পোরেট-দের প্রায় সবাই Forward দিয়ে Hedge করেন।
বাংলাদেশের জন্য এটা বিশেষ গোষ্ঠী। ২০২৬-এ বার্ষিক রেমিটেন্স প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার (FY25)। হোসনে আরার ছেলে ইমরানের মতো ১.৫ কোটি+ প্রবাসী বাংলাদেশি এই Inflow তৈরি করেন। মানে — প্রতিজনের পরিমাণ ছোট (মাসে ৩০০-৫০০ ডলার), কিন্তু Aggregate-এ বাংলাদেশের ডলার Inflow-এর সবচেয়ে বড় উৎস। RMG রপ্তানি এবং রেমিটেন্স — দু'টা মিলে দেশের ৭৫%+ বৈদেশিক আয়।
Foreign Portfolio Investor (FPI) যাঁরা DSE বা Bond বাজারে বিনিয়োগ করেন। Hedge Fund এবং Proprietary Trader যাঁরা USD/BDT-এ Speculate করেন। বাংলাদেশে এই দু'টোই ছোট — Capital Control-এর কারণে। তবে বিশ্বে Speculator FX বাজারের ৪০%+ ভলিউমের কারণ।
অনলাইন FX প্ল্যাটফর্মে (যেমন ওয়ান্ডা, ফরেক্স.কম) সাধারণ মানুষ ছোট আকারে FX Trade করেন। বাংলাদেশে এটা Legally অনুমোদিত না — তবু অনেকে অফশোর প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। Leverage ১০০-৫০০ গুণ পর্যন্ত Available। সহজ কথায়: ৯৫%+ Retail FX Trader শেষে ক্ষতি করেন (ইন্ডাস্ট্রি ডেটা)।
এই সেকশনটা একটু বিস্তারিত — কারণ ২০২২-২৪-এর ডলার সংকট বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। চলুন তিন কোণ থেকে দেখি — কেন হয়েছিল, কী প্রভাব পড়েছিল, এবং ২০২৬-এ কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।
২০২২-এর শুরু থেকে কয়েকটা কারণ একসাথে আঘাত করল। এক — রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বৈশ্বিক এনার্জি এবং খাদ্যের দাম দ্বিগুণ। মানে বাংলাদেশের আমদানি বিল হঠাৎ ৭০-৮০ বিলিয়ন ডলার থেকে ৯০+ বিলিয়নে চলে গেল। দুই — ইউএস ফেড-এর Rate বৃদ্ধি — বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী উন্নয়নশীল বাজার থেকে USD তুলে নিচ্ছিল। তিন — বাংলাদেশে কোভিড-পরবর্তী চাহিদার Pent-up চাপ, আমদানি বাড়ছিল। চার — RMG রপ্তানি কিছুটা ধীর হয়ে গেল। পাঁচ — হুন্ডি বাজারের শক্তি, বহু রেমিটেন্স সরকারি চ্যানেল ছেড়ে কার্ব মার্কেটে যাচ্ছিল।
২০২২-এর জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হঠাৎ চাপে। আগস্টে আইএমএফ-এর কাছে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের আবেদন। নভেম্বরে শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হবে কিনা সেই আশঙ্কা সবার মুখে। ২০২৩-এর শুরুতে আইএমএফ প্রোগ্রাম অনুমোদিত — তিন বছরে ৭ ধাপে মোট ৪.৭ বিলিয়ন ডলার। তবে শর্ত ছিল — Exchange Rate Reform, ভর্তুকি কমানো, ট্যাক্স বাড়ানো।
কার্ব মার্কেটের প্রিমিয়াম এই সময়ে বিস্ফোরিত। ২০২৩-এর আগস্টে সরকারি দর ১০৯, কার্ব ১২২ — ১২% প্রিমিয়াম। এই ফাঁক মানে যে প্রবাসী হুন্ডিতে টাকা পাঠাচ্ছেন, তিনি ১২% বেশি BDT পাচ্ছেন সরকারি চ্যানেলের তুলনায়। ফলে বহু রেমিটেন্স সরকারি চ্যানেল থেকে হুন্ডিতে স্থানান্তরিত হলো — যা আরো ডলার সংকট বাড়াল। মানে এটা একটা Vicious Cycle।
২০২৪-এর মে মাসে Crawling Peg চালু — দর ১১৮-এ আনা হলো। সরকারি এবং কার্ব-এর ফাঁক কমতে শুরু করল। মানে রেমিটেন্স আবার সরকারি চ্যানেলে ফিরতে শুরু করল। আইএমএফ-এর কিস্তিও আসতে লাগল। ২০২৪-এর শেষে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে নতুন গভর্নর (আহসান মনসুর) এলেন — আইএমএফ-এর সাথে আরো Fuller Alignment, Reform-ও দ্রুত হলো। ২০২৫-এর মাঝামাঝি রিজার্ভ ২২ বিলিয়ন ডলারে রিকভারি। ২০২৬-এর শুরুতে ২৪.৩ বিলিয়ন।
তবে কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে। প্রথম — RMG-নির্ভরতা। বাংলাদেশের রপ্তানির ৮৫% RMG, Diversification নেই। দ্বিতীয় — রেমিটেন্স সৌদি আরব, ইউএই, মালয়েশিয়ার উপর Over-dependent। মানে কোনো একটা দেশে রিসেশন হলে আঘাত আসবে। তৃতীয় — FDI এখনো জিডিপি-র মাত্র ১-২%। চতুর্থ — বিদেশি ঋণ বাড়ছে — ২০২৬-এ মোট ১০৫ বিলিয়ন ডলার (সরকারি + বেসরকারি)। এই দুর্বলতা মোকাবেলায় গভীর কাঠামোগত Reform দরকার।
সহজ কথায়: ২০২২-২৪-এর ডলার সংকট একটা ঝড়ের মতো এসেছিল — এনার্জি ক্রাইসিস, ফেড Rate বৃদ্ধি, হুন্ডি বিস্তার সব একসাথে। ২০২৬-এ রিকভারি চলছে, কিন্তু RMG-নির্ভরতা আর প্রবাসী Dependence — এই দুটো কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।
দেশ/অঞ্চল | মুদ্রা | রিজার্ভ (২০২৬) | Regime | FX দৈনিক ভলিউম (২০২৬) |
বাংলাদেশ | BDT | ~২৪ বিলিয়ন ডলার | Crawling Peg (Floating-এ যাচ্ছে) | ৫০-৭০ মিলিয়ন ডলার Inter-bank |
ভারত | INR | ~৬৮০ বিলিয়ন ডলার | Managed Float | ~৫০ বিলিয়ন ডলার |
আমেরিকা | USD | ~১৬০ বিলিয়ন + সোনা | Free Float (USD Reserve Currency) | ~২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার |
চীন | CNY | ~৩.২ ট্রিলিয়ন ডলার | Managed Float (পিবিওসি-controlled) | ~১ ট্রিলিয়ন ডলার |
জাপান | JPY | ~১.২ ট্রিলিয়ন ডলার | Free Float (Heavy বিওজে হস্তক্ষেপ) | ~৬০০ বিলিয়ন ডলার |
সিঙ্গাপুর | SGD | ~৩৭০ বিলিয়ন ডলার | Managed Float (Basket-linked) | ~৭০০ বিলিয়ন ডলার |
এই টেবিল থেকে দু'টো অবজার্ভেশন। এক — বাংলাদেশের রিজার্ভ কম, কিন্তু আমাদের আমদানির তুলনায় ৩-৪ মাসের কভার — যা আইএমএফ-এর সুপারিশ। তবে প্রতিবেশী ভারতের ৬৮০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় তুচ্ছ। দুই — FX বাজারের পরিসরে আমরা বিশ্বে অনেক পিছিয়ে — সিঙ্গাপুর আমাদের চেয়ে আকারে ছোট দেশ, কিন্তু FX Hub হিসেবে বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম।
Forex বাজারের আধুনিক ইতিহাস ১৯৪৪ থেকে। পাঁচটা প্রধান মোড় আজকের সিস্টেম তৈরি করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে আমেরিকার ব্রেটন উডস-এ ৪৪টি দেশ মিলে একটা নতুন আন্তর্জাতিক Monetary System প্রতিষ্ঠা করল। USD-কে সোনার সাথে Fix করা হলো (১ আউন্স = ৩৫ ডলার)। অন্য সব মুদ্রা USD-এর সাথে Fix। মানে Indirect Gold Standard। সেই সাথে জন্ম হলো ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং আইএমএফ-এর। ২৫ বছর এই সিস্টেম বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দিয়েছিল।
১৯৭১-এর আগস্টে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সন ঘোষণা দিলেন — USD আর সোনায় Convertible না। কারণ ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং গ্রেট সোসাইটি Spending-এ আমেরিকার USD-এর সরবরাহ এতই বেড়েছিল যে সোনা দিয়ে কভার করা সম্ভব না। ব্রেটন উডস ভেঙে পড়ল। মানে সব Major মুদ্রা Floating হয়ে গেল। আজকের Free Float Regime-এর জন্ম হলো।
১৯৯২-এর সেপ্টেম্বরের "ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে" — যুক্তরাজ্যের পাউন্ড ইউরোপিয়ান এক্সচেঞ্জ রেট মেকানিজম (ERM)-এ আটকে ছিল। জর্জ সোরোস-এর কোয়ান্টাম ফান্ড বুঝে গেল পাউন্ড Overvalued। তারা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার Short করল। যুক্তরাজ্যের সরকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হস্তক্ষেপ করেও বাঁচাতে পারল না। শেষে পাউন্ড-কে ERM থেকে বের করতে হলো। সোরোস একদিনে ১ বিলিয়ন ডলার লাভ করলেন — তাই তাঁকে বলা হয় "The Man Who Broke the Bank of England।" সহজ শিক্ষা: একজন Speculator কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও হারাতে পারে।
থাইল্যান্ডের বাট ছিল USD-এর সাথে Peg। কিন্তু Overvalued, চলতি হিসাবের ঘাটতি বড়। ১৯৯৭-এর জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক Peg Defend করতে পারল না। বাট ৫০% অবমূল্যায়ন। কন্টেজিয়ন ছড়াল — মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন — সবার মুদ্রা ভেঙে পড়ল। আইএমএফ Bailout। লক্ষ লক্ষ মানুষ গরিব হলো। শিক্ষা — Fixed Exchange Rate অপ্রতিরোধ্য, যদি না Real Economy-র সাথে Align থাকে।
লেহম্যান ভেঙে পড়ার পরে বিশ্বে "Flight to Safety" শুরু — সবাই USD-এ আশ্রয় খুঁজল। আমেরিকার সংকট হলেও USD ৪০% বেড়ে গেল অন্য মুদ্রার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের জন্য তখন একটা শক্ত সময় — আমদানির খরচ বাড়ল, RMG রপ্তানি কমল। তবে রেমিটেন্স ভালো ছিল।
আগে ছ' নম্বর সেকশনে বিস্তারিত বলেছি। সংক্ষেপে — এনার্জি ক্রাইসিস, ফেড-এর Rate বৃদ্ধি, আইএমএফ Intervention, Crawling Peg, রাজনৈতিক পরিবর্তন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক FX ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সহজ কথায়: Forex বাজারের ৮০ বছরের ইতিহাসে পাঁচটা মোড় — ব্রেটন উডস (১৯৪৪), নিক্সন শক (১৯৭১), সোরোস vs ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড (১৯৯২), এশিয়ান ক্রাইসিস (১৯৯৭), জিএফসি (২০০৮)। প্রতিটা ঘটনায় Regulation পরিবর্তন এসেছে।
FX বাজারে সাত ধরনের ঝুঁকি প্রধান।
সবচেয়ে অবভিয়াস। আপনার বিনিয়োগ বা ব্যবসা যে মুদ্রায় Exposed, সেটার দাম বিপরীত দিকে গেলে ক্ষতি। যেমন ২০২২-এ বাংলাদেশের আমদানিকারকরা ৪০% বাড়তি খরচ বহন করেছেন BDT-র অবমূল্যায়নের কারণে।
আপনার কাছে BDT থাকলে USD-এ Convert করতে পারবেন কিনা — সেটা সবসময় নিশ্চিত না। বাংলাদেশে এই ঝুঁকি বাস্তব — ২০২৩-এর কয়েক মাস সরকারি চ্যানেলে সাধারণ মানুষ USD পাচ্ছিলেন না। মানে — Capital Control থাকলেই এই ঝুঁকি।
আপনি যে দেশের মুদ্রায় আছেন, সেই দেশে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অস্থিরতা হলে। যেমন আর্জেন্টিনার পেসো ২০২০-২৪-এ ৯৯%+ অবমূল্যায়ন হয়েছে। যাঁদের কাছে পেসো ছিল, প্রায় সবকিছু হারিয়েছেন।
দু'দেশের Interest Rate-এর পার্থক্য বদলালে Forward Rate বদলায়। তখন Forward Holder-দের ক্ষতি বা লাভ। ২০২২-এ ইউএস ফেড-এর Rate বৃদ্ধির সময় বিশাল FX Volatility — এই ঝুঁকির বাস্তব উদাহরণ।
Exotic Pair-এ সংকটে বাজার Freeze হয়ে যায়। ২০২৩-এর বাংলাদেশে একসময় ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যেও USD Trade করতে পারছিল না — কেউ বিক্রি করছিল না।
Retail FX-এ ১০০-৫০০ গুণ Leverage সাধারণ। ছোট ভুলে Account Wipe Out। সেজন্যই ৯৫%+ Retail FX Trader শেষে ক্ষতি করেন।
১৯৭৪-এ ব্যাংকহাউস হেরস্ট্যাট-এর Failure থেকে এই কনসেপ্টের জন্ম। দু'মুদ্রার লেনদেনে যদি এক Side Settle হওয়ার পরে অন্য Side Fail করে। CLS (Continuous Linked Settlement) সিস্টেম এই ঝুঁকি কমিয়েছে, তবে পুরোপুরি দূর হয়নি।
সহজ কথায়: Forex-এর সাত ঝুঁকি — Exchange Rate, Convertibility, Country, Interest Rate, Liquidity, Leverage, Settlement। সবচেয়ে আন্ডাররেটেড Convertibility এবং Country Risk।
Forex বাজার থেকে বিভিন্ন দল বিভিন্ন কিছু পায়। সুবিধা-অসুবিধা সবার জন্য একই না।
এক — আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্ভব। FX বাজার না থাকলে কেউ অন্য দেশ থেকে কিছু কিনতে পারতেন না। দুই — Capital Mobility — বিনিয়োগ বিভিন্ন দেশে যেতে পারে। তিন — Hedging — রপ্তানিকারক, আমদানিকারক ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে পারেন। চার — Price Discovery — একটা মুদ্রার দাম তাৎক্ষণিক জানা যায়। পাঁচ — Diversification — বিনিয়োগকারীরা পোর্টফোলিও বিদেশি মুদ্রায় ছড়িয়ে দিতে পারেন।
এক — Speculation-এর Dominance। ৯৩-৯৫% FX ভলিউম Speculation, মাত্র ৫-৭% রিয়াল বাণিজ্য। দুই — সংকটের জন্ম। ১৯৯২, ১৯৯৭-এর ক্রাইসিস FX বাজার থেকেই এসেছিল। তিন — Capital Flight — সংকটে বিদেশি বিনিয়োগ দ্রুত বের হয়ে যায়। চার — উন্নয়নশীল দেশের জন্য Vulnerability — Exchange Rate কারসাজি বা আক্রমণ হলে সামলানো কঠিন। পাঁচ — Retail Trader-দের জন্য বিপজ্জনক — Leverage এবং জটিলতা।
রেমিটেন্স প্রাপক (হোসনে আরার মতো): সবসময় সরকারি চ্যানেল ব্যবহার করুন — বিকাশ, ব্যাংক, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন। ২.৫% সরকারি প্রণোদনা পাবেন। তবে কখনো কখনো হুন্ডির দর বেশি দেখাবে — তারপরও সরকারি চ্যানেল ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ভালো এবং ব্যক্তিগতভাবে নিরাপদ।
রপ্তানিকারক/আমদানিকারক: Forward দিয়ে Hedge করুন। অর্ডার পাওয়ার পরের দিনই FX ডেস্কে যান। Speculation-এ যাবেন না।
সাধারণ মানুষ: USD সঞ্চয় রাখতে চাইলে অথরাইজড FX ব্যাংকের সাথে — সীমা ৫,০০০ ডলার পর্যন্ত Legally। Retail FX Trading অফশোর প্ল্যাটফর্মে এড়িয়ে চলুন — অনুমোদিত না এবং বিপজ্জনক।
সহজ কথায়: Forex বাজার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অর্থায়নের ভিত্তি, কিন্তু Speculation-এর Dominance এটাকে বিপজ্জনক করে। Hedging-এ ব্যবহার ভালো, Speculation-এ না।
ছ' নম্বর সেকশনে আমরা ২০২২-২৪-এর গল্প সংক্ষেপে দেখেছি। এই সেকশনে আরো গভীরে যাব — কারণ এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে আগামী ১০ বছরে আবার একই সংকটে পড়তে পারি।
এক — RMG Over-concentration। বাংলাদেশের রপ্তানির ৮৫% তৈরি পোশাক। মানে কোনো একটা ক্রেতা দেশে ধীরগতি এলে সরাসরি আঘাত। দুই — এনার্জি আমদানি-নির্ভরতা। ৭৫%+ এনার্জি আসে বিদেশ থেকে। বৈশ্বিক এনার্জি-র দাম বাড়লে আমদানি বিল দ্বিগুণ। তিন — Limited FDI — জিডিপি-র ১-২%, ভারতের ২.৫%, ভিয়েতনামের ৫-৬%। চার — রেমিটেন্স Vulnerability — সৌদি আরব এবং ইউএই-র উপর Over-dependence; কোনো একটা দেশে ইমিগ্রেশন পলিসি বদলালে আঘাত। পাঁচ — হুন্ডি Parallel বাজার — অনুমান করা হয় যে বিদেশ থেকে আসা রেমিটেন্স-এর ৩০-৪০% হুন্ডিতে আসে, সরকারি চ্যানেলের বাইরে।
এক — রপ্তানি Diversification। RMG-র পাশাপাশি ফার্মাসিউটিক্যাল, আইটি সার্ভিসেস, চামড়া, পাটজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাবার — সব Potential খাত। বছরে কিছু কিছু Progress হচ্ছে — ২০২৬-এ ফার্মাসিউটিক্যাল রপ্তানি ২.৫ বিলিয়ন ডলার (২০২০-এর ১.৫ বিলিয়ন থেকে বেশি)। দুই — এনার্জি Transition — লোকাল নবায়নযোগ্য, কম আমদানি-নির্ভরতা। তিন — FDI Attraction — বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (BIDA) Reform, স্পেশাল ইকোনমিক জোন-গুলো Operationalize করা। চার — Diaspora Outreach — উন্নত দেশের বাংলাদেশি প্রবাসীদের সাথে সম্পৃক্ততা, Diaspora Bond ছাড়া। পাঁচ — হুন্ডি Network ভাঙা — সরকারি চ্যানেলে দর এবং প্রণোদনা আকর্ষণীয় করা।
সাইফের অনুমান — যদি Reform-এর গতি বজায় থাকে এবং কোনো বড় বাহ্যিক ধাক্কা না আসে, ২০২৬-৩০-এ বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৫-৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। RMG রপ্তানির অংশ ৮৫% থেকে ৭৫%-এ নামতে পারে Diversification-এ। Crawling Peg থেকে পুরোপুরি Floating Rate-এ যাওয়াও সম্ভব হবে — যা দীর্ঘমেয়াদে ভালো। তবে এই সব শর্তসাপেক্ষ — কোনো একটা ভাঙলে আবার সংকট।
সহজ কথায়: বাংলাদেশের ডলার সংকট একদিনের সংকট নয় — পাঁচটা কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। সমাধানও পাঁচ পথে — Diversification, এনার্জি Transition, FDI, প্রবাসী Outreach, হুন্ডি ভাঙা।
সামনের ৫ বছরে Forex বাজারের কয়েকটা ট্রেন্ড ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান।
USD-এর বৈশ্বিক Reserve Currency Status ধীরে ধীরে চাপে। ২০০০-এ বৈশ্বিক রিজার্ভের ৭২% USD, ২০২৬-এ ৫৮%। মানে — চীনের ইউয়ান, ইউরো, সোনার অংশ বাড়ছে। ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের লোকাল মুদ্রায় Trade Settlement বাড়াচ্ছে। ভারত এবং রাশিয়ার মধ্যে INR-RUB Trade চালু। বাংলাদেশও ভারতের সাথে কিছু INR-এ Trade Settlement শুরু করেছে ২০২৪-এ।
চীনের ডিজিটাল ইউয়ান, ইসিবি-র ডিজিটাল ইউরো, ভারতের ডিজিটাল রুপি — সব চালু। এমব্রিজ প্রজেক্ট (বিআইএস-এর সাথে চীন, হংকং, থাইল্যান্ড, ইউএই) আন্তঃদেশীয় CBDC Settlement টেস্ট করছে। ভবিষ্যতে SWIFT-এর বিকল্প হিসেবে CBDC-based Corridor — বাংলাদেশের জন্য রেমিটেন্স খরচ কমাতে পারবে।
USDT, USDC-এর মতো Stablecoin ইতিমধ্যে FX-এর Parallel স্তর হয়ে গেছে। বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনেকে USDT ব্যবহার করেন অফশোর রেমিটেন্স এবং Hedge-এর জন্য। ২০২৪-এ বাংলাদেশ ব্যাংক একটা Stablecoin Policy জারি করেছে, তবে ফরমাল কাঠামো এখনো শৈশবে।
বৈশ্বিক FX বাজারের ৮০%+ Trading এখন Algorithmic। AI মডেল ম্যাক্রো ভ্যারিয়েবলস (Rate, Inflation, ভূ-রাজনীতি) থেকে তাৎক্ষণিক Pricing করতে পারছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত (ফেড Dot Plot, ইসিবি Statement) AI কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডে ব্যাখ্যা করে। বাংলাদেশে এটা এখনো ম্যানুয়াল।
Crawling Peg ২০২৪-এর ক্রান্তিকালীন Regime। আইএমএফ-এর ২০২৫ আর্টিকেল IV কনসালটেশন-এ সুপারিশ — ২০২৬-২৭-এর মধ্যে পুরোপুরি Market-based Rate। মানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ সীমিত, চাহিদা-সরবরাহই দর ঠিক করবে। এটা ভালো না খারাপ? তত্ত্বে ভালো, কিন্তু বাস্তবে নির্ভর করছে রিজার্ভের কুশন এবং Speculation নিয়ন্ত্রণের উপর।
ভিসা, মাস্টারকার্ড, ওয়াইজ, রেভল্যুট — সবাই আন্তঃদেশীয় রেমিটেন্স খরচ কমাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের Target SDG 10.c — ২০৩০-এ রেমিটেন্স খরচ ৩%-এর নিচে। বাংলাদেশে এই Revolution-এর প্রভাব শুরু হয়েছে — বিকাশ, নগদ-এর সাথে ইন্টারন্যাশনাল Partner-দের ইন্টিগ্রেশন।
হোসনে আরা এবং সাইফের গল্পে ফিরি। ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির সেই সকাল। হোসনে আরা ৪৮,৪০০ টাকা পেলেন। সাইফ তাঁর হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা তৈরি করলেন। দু'জনের মধ্যে কোনো সরাসরি যোগাযোগ নেই। তবু একজনের সিদ্ধান্ত আরেকজনের জীবনকে স্পর্শ করছে। সহজ কথায়: এটাই Forex বাজার — একটা অদৃশ্য নেটওয়ার্ক যা পৃথিবীর সমস্ত অর্থনীতিকে এক সুতোয় গাঁথে।
বাংলাদেশের জন্য আগামী দশক হবে Exchange Rate Maturity-র দশক। যদি Reform চলে, যদি রপ্তানি Diversify হয়, যদি রেমিটেন্স সরকারি চ্যানেলে থাকে — আমরা একটা Stable, Market-based, পূর্বাভাসযোগ্য FX এনভায়রনমেন্ট-এ যেতে পারব। যদি না হয়, আবার ২০২২-এর মতো সংকট। সিদ্ধান্ত আমাদের।
পরের পর্ব — Interbank Market। এই পর্বে আমরা Forex বাজার দেখেছি — যেখানে ব্যাংক, সরকার, কর্পোরেট, Retail সবাই থাকেন। কিন্তু এর ভেতরেই একটা আরো ছোট, আরো Specialized বাজার আছে — যেখানে শুধু ব্যাংক-ব্যাংকের লেনদেন। Call Money, Repo, FX Swap, Syndicated Loan — এই বাজার financial system-এর প্রকৃত প্লাম্বিং। আমরা ফিরে যাব মুজিবুল ভাইয়ের সাথে — যিনি Money Market পর্বে ছিলেন। তাঁর সাথে একদিনের গভীর Interbank Journey-তে।
"Forex বাজার একটা আয়না — যেখানে একটা দেশের সমস্ত ভালো-মন্দ প্রতিফলিত হয়। অর্থনীতি শক্ত হলে মুদ্রা শক্ত হয়; দুর্বল হলে মুদ্রা দুর্বল। কোনো নীতিনির্ধারক, কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকার Exchange Rate-কে Stable করতে পারে না যদি Real Economy দুর্বল থাকে। মুদ্রার Value হলো National Strength-এর Scorecard।"

প্রতিটি উদ্যোক্তাই চায় তার পণ্য বা সেবা বাজারে আনার আগে সেটাকে একদম নিখুঁত করে তুলতে। কিন্তু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর সময় আর অর্থ ব্যয় করে একটা পণ্য পুরোপুরি তৈরি করার পর যদি দেখা যায় বাজারে তার কোনো চাহিদাই নেই — এটা একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। মূলত এই সমস্যার সমাধান দিতেই তৈরি হয়েছে মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট বা এমভিপি কৌশল। পুরো পণ্য একসাথে না বানিয়ে শুধু সবচেয়ে জরুরি ফিচারগুলো নিয়ে বাজারে আসুন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সত্যিকারের মতামত নিন এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে পণ্য উন্নত করুন। বাংলাদেশের পাঠাও, বিশ্বের উবার এবং ড্রপবক্স — এরা সবাই এই একই পথ ধরে এগিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।








