GeoRenus Editorial Team

নোবেল বিজয়ী পল স্যামুয়েলস এর মতে ফিন্যান্স হলো ভবিষ্যতে নিশ্চিত কিংবা অনিশ্চিত পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে অর্থ বিনিয়োগ করার জ্ঞান। ফিন্যান্স এর মূল কাজই হলো অর্থ বিনিয়োগ, ট্রান্সফার, খরচ এইসকল বিষয় ট্র্যাক করা। বিভিন্ন ব্যবসা, সরকারি ক্ষেত্র এমনকি একজন এর ব্যক্তিগত জীবনে ফাইন্যান্স এর ডেইলি ইউসেজ রয়েছে।
ফিন্যান্স অনেক জটিল একটি সিস্টেম যেটি বিশ্বে ব্যক্তি এবং সংস্থা উভয়ের মধ্যে আর্থিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে । ফিন্যান্স এর মূল লক্ষ্য হলো সম্পদ বরাদ্দ এর সাথে জড়িত বিষইয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান, কীভাবে আর্থিক সম্পদগুলিকে দক্ষতার সাথে বিনিয়োগ এবং ব্যবহার করতে হয় সে বিষয়ে ধারণা দেওয়া । ফিন্যান্স একটি ব্যবসাকে বিনিয়োগের সাথে জড়িত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে মূলধন গঠন পর্যন্ত বিষয়ে সাহায্য করে। এগুলো ছাড়াও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যক্তি, ব্যবসা এবং সরকারের জন্য একটি আর্থিক কাঠামো তৈরি করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফাইন্যান্স যেই সেক্টরগুলোতে রোল প্লে করে সেগুলো নিয়ে ধারণা নেওয়া যাকঃ
একটি ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পিলারগুলোর মধ্যে একটি হল ফিন্যান্স। বড় অঙ্কের অর্থ, একটি ধারাবাহিক নগদ প্রবাহ, এবং চলমান লেনদেনের সাথে ব্যবসা পরিচালনা এবং পর্যবেক্ষণ করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য ডেডিকেটেড আর্থিক প্রশাসন থাকে যাদের কাজ হলো কী ব্যয় করতে হবে, কোথায় ব্যয় করতে হবে ,কখন ব্যয় করতে হবে, অর্থের হিসাব সংক্রান্ত তথ্য এইসকল বিষয়ে সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা। এটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার একটি পরিষ্কার চিত্র প্রদান করে এবং এর আর্থিক ব্যবস্থাপনার আরও সুগঠিত বিবরণ দেয়।
আপনার যেমন কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আগে একটি খরচের তালিকা বানান যেখানে আপনার একটি বাজেট ঠিক করেন, ঠিক তেমনি একটি কোম্পানিকেও তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য একটি বাজেট তৈরি করতে হয়। একটি বাজেট তৈরি করা হয় কোম্পানীর অবজেক্টিভ সেট করার পর । পরবর্তীতে টপ ম্যানেজমেন্ট রা সেই লক্ষ্যগুলিতে পৌঁছানোর সাথে প্রয়োজনীয় খরচগুলি হিসেব করে।
ব্যবসার জগত অনেক পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত। ব্যবসাগুলোকে এই ফিল্ডে টিকে থাকতে হলে একটি লং টার্ম প্ল্যান নিয়ে আগাতে হয়। এটি করার জন্য, ব্যবসাগুলো তাদের বর্তমান পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে লং টার্ম প্রফিট কস্টিং হিসেব করে একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে হয় যেটি তাদের ভবিষ্যতে কোথায় কি পরিমাণ খরচ করতে হবে তার জন্য একটি গাইডেন্স হিসেবে কাজ করে।
ব্যবসার গ্রাফ কখনো সম্পূর্ণ সোজা হয় না। বরং একটি ব্যবসার গ্রোথ হলো উঁচু এবং নিম্নের মিশ্রণ, যা বিভিন্ন কারণের হতে পারে। ব্যবসা জগতে মন্দা,ডিপ্রেশন, বুম বা ব্যর্থতা একটি কোম্পানির বন্ধ হওয়ার পিছনে অবদান রাখে এবং এগুলো নিত্যদিনের পরিস্থিতি। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, একটি ব্যবসাকে যেকোনো সময় প্রস্তুত থাকতে হয় এইসকল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য।
ব্যবসার টাকা ম্যানেজ করছে কে? ফিন্যান্স এর লোক। একটি ছোট ব্যবসার মালিককে কোম্পানির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স সম্পর্কে ক্রমাগত সজাগ থাকতে হয়। কোম্পানির সরবরাহকারী এবং কর্মচারীদের সময়মত স্যালারি প্রদানের জন্য ব্যালেন্সে পর্যাপ্ত অর্থ আছে তা নিশ্চিত করার জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপক দায়ী। নগদ প্রবাহ কমে গেলে ফাইন্যান্স টিম কোম্পানির ব্যাঙ্ক লাইন অফ ক্রেডিট ব্যবহার করার ব্যবস্থা করবে। অন্যদিকে, একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অতিরিক্ত অর্থ অলস বসে থাকার কারণে একটি কোম্পানির বিনিয়োগের রিটার্ন বাধাগ্রস্ত হয়। আর্থিক বিশ্লেষক রা এই অবস্থাগুলোকে বের করে এবং বিনিয়োগগুলিকে সনাক্ত করবে যা উচ্চতর রিটার্ন দেয়।
এটি কেবলমাত্র বোধগম্য হয় যে লাভজনকতা বাড়ানোর জন্য কৌশলগুলি খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে অর্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, এই শর্তে যে একটি ব্যবসার ভিত্তি হল লাভ করা। এতে লাভজনক পণ্য নির্ধারণ করা, হারানোদের নির্মূল করা এবং বিজয়ীদের প্রচার করা হতে পারে। ফাইন্যান্স উত্পাদন উত্পাদনশীলতা বাড়ানো বা কাঁচামালের আরও সাশ্রয়ী মূল্যের উত্স সনাক্ত করার উপায়গুলির পরামর্শ দিতে পারে।
একটি ব্যবসার কোন অংশগুলো থেকে মুনাফা আসছে তা জানার জন্য অর্থ প্রধানরা ব্যবসার বিশ্লেষণ করেন। তারা একটি ব্যবসার বিভিন্ন বিভাগ কীভাবে আর্থিকভাবে কাজ করছে সে সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে পারে। কোন পণ্যগুলি ভাল মুনাফা দিচ্ছে তা মূল্যায়ন করা আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি দায়িত্ব। তারা একটি ব্যবসার প্রতিটি কার্যকলাপের জন্য এই তথ্য ব্যবহার করতে পারেন। এই ধরনের বিশ্লেষণ দুর্বল ক্ষেত্রগুলির উন্নতিতে সাহায্য করবে এবং লাভজনক কাজগুলোকে আরও ভাল করতে সহায়তা করবে।
গ্রোথ ইন্ডাইস এর কাজ হলো বাজারের শেয়ার বৃদ্ধি যাচাই করে এবং নগদ প্রবাহ, লাভের মার্জিন এবং বিনিয়োগের উপর রিটার্ন হ্রাসের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির গ্রহণযোগ্য ট্রেড-অফ নির্ধারণ করে। মাঝে মাঝে ব্যবসায় গ্রোথ নিশ্চিত করতে সাধারণত নগদ এবং রিজার্ভ ঋণ তহবিল, এবং কখনও কখনও, যথেষ্ট নগদ এবং সীমিত ঋণ নিশ্চিত করার জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা একটু কঠোর করার প্রয়োজন হয়। যখন বৃদ্ধির হার বাজারে কম্পিটিটর নিয়ম থেকে পিছিয়ে থাকে বা যখন তাদের উচ্চ অপারেটিং লিভারেজ থাকে তখন ফিন্যানসিয়ালিস্টদের অবশ্যই গ্রোথ পয়েন্ট গুলো বের করে থাকে।
বর্তমান সময়ে ব্যবসাগুলো প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে যাচ্ছে যার কারণে অনেক কর্মজীবী তাদের চাকরি হারাচ্ছে। কিনতি একই সময়ে এই মেশিন বা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমন মানুষের চাহিদা ও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিভাইসগুলি পরিচালনার জন্য লোকেদের প্রোগ্রামিং সম্পর্কে জানতে হয় । এই কারণে যে কোনও ব্যবসার জন্য মানুষ এর প্রয়োজন সবসময় থাকবে। এই সকল এফিশিয়েন্ট কর্মী খুঁজে বের করতে এবং তাদের স্যালারি ফিক্স করতে ফাইন্যান্স টিম এর প্রয়োজন পড়ে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ যাতে তারা আর্থিক প্রতিবেদনের আইনি নিয়ম মেনে চলে। ফিন্যান্স বিভাগ এমন পদ্ধতি এবং নিয়ম তৈরি করে যা কোম্পানির অর্থের যথাযথ রেকর্ড তৈরি করে, নিশ্চিত করে যে কোম্পানির প্রত্যেক হিসেব যথাযথভাবে রয়েছে । আর্থিক নিয়ন্ত্রণে কোম্পানির আর্থিক হিসেব অডিট করা, নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা এবং কোম্পানির সম্পদ এবং অর্থ এর হিসেব আর্থিক রেকর্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা নিশ্চিত করা । তারা কোম্পানির লাভ বা আর্থিক নীতির উপর রিপোর্ট তৈরি করে সেটি জনসাধারণের জনসাধারণের কাছে তুলে ধরে।
একটি ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট কারা কারা থাকে
ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট আকারে ১০-১৫ জনের একটি টিম হয় যেটি অ্য ডিপার্ট্মেন্ট এর সাথে তুলনা করলে অনেকাংশে ছোট। এদের মধ্যে থাকে
প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা, বা সিএফও, কোম্পানির ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট এর হেড। তিনি কোম্পানির ফাইন্যান্স স্ট্র্যাটেজি তৈরির জন্য দায়ী । ব্যবসার আর্থিক তথ্যের সাথে জড়িত যেকোনো কাজ এই ব্যক্তির অধীনে সম্পন্ন করা হয়।
আর্থিক নিয়ন্ত্রকরা একটি ব্যবসার মধ্যে অ্যাকাউন্টিং কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করে, যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন পলিসি তৈরি করা এবং সেগুলো কমপ্লায়েন্সের জন্য রিপোর্টিং তৈরি করা । তারা ব্যবসার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল প্রচারের জন্য পুরো অর্থ বিভাগের জন্য বিলিং, লেজার রিপোর্ট, আর্থিক বিশ্লেষণ এবং অ্যাকাউন্টিং ডাটাবেস তৈরি করে।
ব্যবসার আকারের উপর নির্ভর করে, অর্থ বিভাগের একাধিক হিসাবরক্ষক থাকতে পারে যারা ক্লায়েন্ট লেনদেন ট্র্যাকিং এবং কোম্পানির আর্থিক উন্নয়নের প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে সহায়তা করে। অ্যাকাউন্ট্যান্টরাও বাজেট তৈরি করে, ট্যাক্স নথি জমা দিতে এবং ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের জন্য আর্থিক কাগজপত্র পরিচালনা করতে সহায়তা করে।
ফাইন্যান্স বিভাগে, আর্থিক বিশ্লেষকরা কীভাবে সংস্থাটি পরিচালনা করবেন সে সম্পর্কে ডেটা পর্যালোচনা করেন এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের বিষয়ে নির্বাহীদের পরামর্শ দেন। তারা বিনিয়োগের সুযোগ, বাজারের অবস্থা, আর্থিক মডেল এবং বিক্রয় কৌশলগুলি নিয়ে গবেষণা করে যাতে লাভ বাড়ানোর এবং খরচ কমানোর উপায় খুঁজে পাওয়া যায়।
ব্যবসার হিসেব ঠিক আছে কিনা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ হিসেবে কোন গড়মিল আছে কিনা তার জন্য অডিট টিম থাকে। তাদের কাজ হলো কোম্পানির আর্থিক হিসেব পর্যালোচনা করা। অডিটররা পদ্ধতিগতভাবে আর্থিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাছাই করে ব্যবসার হিসেবে কোন ভুল থাকলে সেগুলো বের করে এবং কীভাবে ডকুমেন্টেশন মান উন্নত করা যায় সে সম্পর্কে পরামর্শ দেয়।
বাজেট, লং টার্ম প্ল্যানিং করা আর্থিক পরিকল্পনাকারীদের প্রধান দায়িত্ব। তারা কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক লক্ষ্যগুলি চিহ্নিত করে, তাদের বর্তমান সংস্থানগুলি পর্যালোচনা করে এবং সেই লক্ষ্যগুলি অর্জনের জন্য একটি বাজেট এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করে।
ব্যংক মুনাফা অর্জন করে লোন এর উপর সুদ দিয়ে। আর এই লোন দেওয়া, নেওয়া, সুদ নির্ধারণ নিয়ে অনেক নিয়ম রয়েছে । এর জন্য ব্যাংক লোন অফিসার নিয়োগ দেয়। একজন ঋণ কর্মকর্তা ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়া মূল্যায়ন এবং সহজতর করার কাজ করেন। তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল ব্যক্তি বা ব্যবসার কাছ থেকে ঋণের আবেদনগুলি মূল্যায়ন করা, আর্থিক নথি, ক্রেডিট ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তাদের ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ করা। লোন অফিসারদের লক্ষ্য হল ক্লায়েন্টদের ঋণ আবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাইড করা, নিশ্চিত করা যে ঋণ যথাযথভাবে গঠন করা হয়েছে এবং ঋণ গ্রহীতাদের চাহিদা মেটানোর সাথে সাথে ঋণের ঝুঁকি যাতে কমানো যায়।
উপসংহারে, একটি ব্যবসায় ফাইন্যান্স টিমের ভূমিকাগুলি বহুমুখী, যা ব্যবসার জন্য একটি কম্পাস হিসাবে কাজ করে। সম্পদ বরাদ্দ এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সকল ক্ষেত্রেই ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্ট একটি ক্রশ্যাল কি রোল প্লে করে। দিনশেষে ফিন্যান্স আপনাকে মার্কেট অ্যানালাইসিস করে একটি কস্ট ইফেক্টিভ স্ট্র্যাটেজি বিল্ড করে ব্যবসার সাকসেস কে নিশ্চিত করে।

প্রতিটি উদ্যোক্তাই চায় তার পণ্য বা সেবা বাজারে আনার আগে সেটাকে একদম নিখুঁত করে তুলতে। কিন্তু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর সময় আর অর্থ ব্যয় করে একটা পণ্য পুরোপুরি তৈরি করার পর যদি দেখা যায় বাজারে তার কোনো চাহিদাই নেই — এটা একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। মূলত এই সমস্যার সমাধান দিতেই তৈরি হয়েছে মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট বা এমভিপি কৌশল। পুরো পণ্য একসাথে না বানিয়ে শুধু সবচেয়ে জরুরি ফিচারগুলো নিয়ে বাজারে আসুন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সত্যিকারের মতামত নিন এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে পণ্য উন্নত করুন। বাংলাদেশের পাঠাও, বিশ্বের উবার এবং ড্রপবক্স — এরা সবাই এই একই পথ ধরে এগিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।








