GeoRenus Editorial Team

পর্ব ২-এ দেখেছিলাম গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের স্বর্ণযুগ থেকে ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডসে পাউন্ডের সিংহাসন হারানো পর্যন্ত। পর্ব ৩ এবং শেষ পর্বে সেই পরবর্তী নাটকীয় অধ্যায় — যুদ্ধ-পরবর্তী ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন, ১৯৭৬ সালে IMF-এর কাছে হাত পাতা, থ্যাচারের মুদ্রাবাদী পরীক্ষা, ১৯৯২ সালে জর্জ সোরোসের কাছে পরাজয়, ব্রেক্সিটের ধাক্কা, লিজ ট্রাসের ৪৫ দিনের বিপর্যয় এবং আজকের পাউন্ড — এই পুরো গল্প এবং বিশ্বের যেকোনো মুদ্রার জন্য এর শিক্ষা।
পর্ব ২-এ আমরা দেখেছিলাম পাউন্ডের মধ্যবর্তী অধ্যায় — ১৮১৬ সালের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড থেকে শুরু করে স্টার্লিং এরিয়ার বিশাল সাম্রাজ্য, তারপর দুটি বিশ্বযুদ্ধে ধীরে ধীরে ক্ষয়, চার্চিলের মারাত্মক ১৯২৫ সালের ভুল, এবং সবশেষে ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনে ডলারের কাছে বিশ্বের শীর্ষ মুদ্রার সিংহাসন হারানো।
পর্ব ৩ হলো সেই গল্পের চূড়ান্ত অধ্যায় — সিংহাসন হারানোর পরেও পাউন্ড কীভাবে লড়াই করেছে, বারবার হোঁচট খেয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেনে পাউন্ডের পতন থেমে থাকেনি। ১৯৪৯ সালে ৩০% অবমূল্যায়ন, ১৯৬৭ সালে আরেকটি অবমূল্যায়ন — আর সেটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এমন একটি বক্তব্য যা রাজনৈতিক ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে গেছে। তারপর ১৯৭৬ সালে জাতীয় অপমান — পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশগুলোর একটি IMF-এর কাছে হাত পেতে বাঁচার জন্য ভিক্ষা চাইল।
এই পর্বে আমরা দেখব: অবমূল্যায়নের যুগ, IMF বেইলআউটের অপমান, থ্যাচারের রোলারকোস্টার, ব্ল্যাক ওয়েডনেসডেতে সোরোসের কাছে পরাজয়, ব্রেক্সিটের ধাক্কা, ট্রাসের ৪৫ দিনের বিপর্যয়, আজকের পাউন্ডের অবস্থান — এবং এই পুরো ১,২০০ বছরের যাত্রা থেকে বিশ্বের জন্য কী শিক্ষা।
"পাউন্ডের পতন হয়েছে ধীরে ধীরে, তারপর হঠাৎ করে। এটাই বড় পতনের নিয়ম।" — আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (রূপান্তরিত)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো ১৯৪৫ সালে। ব্রিটেন জিতেছে — কিন্তু দেউলিয়া হয়ে। জাতীয় ঋণ GDP-র ২৫০%। আমেরিকার কাছে বিশাল ঋণ। শিল্প কারখানা ধ্বংস। রেশনিং চলছে।
ক্লিমেন্ট অ্যাটলির লেবার সরকার এসে দেখল — পাউন্ড মারাত্মকভাবে অতিমূল্যায়িত। £১ = $৪.০৩ রেট ছিল ব্রেটন উডসে নির্ধারিত। কিন্তু ব্রিটিশ অর্থনীতির অবস্থা সেই মানের নয়।
১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার একটি বড় সিদ্ধান্ত নিল। এক রাতের মধ্যে পাউন্ডের মূল্য কমিয়ে দেওয়া হলো — £১ = $৪.০৩ থেকে $২.৮০-তে। এটি ছিল ৩০% অবমূল্যায়ন।
অবাক করার বিষয় হলো — ব্রিটেনের সাথে সাথে আরও ৩০টি দেশ তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করল। কারণ এই দেশগুলো পাউন্ডের সাথে পেগড ছিল বা পাউন্ডে ব্যবসা করত।
এই অবমূল্যায়নের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ রপ্তানিকে সস্তা করা এবং অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করা। কিছুটা কাজ হলো — কিন্তু পাউন্ডের আন্তর্জাতিক মর্যাদায় আরেকটি গভীর আঘাত লাগল।
১৯৬৭ সাল। ব্রিটেন আবার সংকটে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কায় সুয়েজ খাল বন্ধ। বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। পাউন্ডের উপর চাপ বাড়ছে।
হ্যারল্ড উইলসনের লেবার সরকার আরেকটি অবমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিল — £১ = $২.৮০ থেকে $২.৪০-তে। আরেকটি ১৪% পতন।
সমস্যা হলো সরকার কীভাবে সেটা ব্যাখ্যা করল। ১৯৬৭ সালের ১৯ নভেম্বর রাতে প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন টেলিভিশনে এলেন জনগণকে আশ্বস্ত করতে। তিনি বললেন:
"The pound in your pocket has not been devalued." — হ্যারল্ড উইলসন, ১৯ নভেম্বর ১৯৬৭
অর্থাৎ — "আপনার পকেটের পাউন্ড অবমূল্যায়িত হয়নি।" তার যুক্তি ছিল, অবমূল্যায়ন শুধু আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিপরীতে, দেশের ভেতরে পাউন্ডের ক্রয়ক্ষমতা একই থাকবে।
জনগণ বুঝল — এটি সরাসরি মিথ্যা না হলেও চরম বিভ্রান্তিকর। দাম বাড়বে, আমদানি মহার্ঘ হবে, তেলের দাম বাড়বে। ব্রিটিশ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমবে।
এই বক্তব্যটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ভুল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আর ১৯৬৭ সালের অবমূল্যায়নের পর বেশিরভাগ দেশ তাদের রিজার্ভ থেকে পাউন্ড সরিয়ে ডলারে রাখতে শুরু করল। পাউন্ডের রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা কার্যত শেষ হয়ে গেল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই স্টার্লিং এরিয়া ভাঙতে শুরু করেছিল। একে একে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলো স্বাধীন হচ্ছিল এবং নিজস্ব মুদ্রা নিচ্ছিল।
ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হয়ে ভারতীয় রুপি চালু করল। অস্ট্রেলিয়া ১৯৬৬ সালে অস্ট্রেলিয়ান ডলারে গেল। মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, ঘানা — সবাই সরে গেল।
একসময় যে স্টার্লিং এরিয়া বিশ্বের ২৫% ভূমি আচ্ছাদন করত, ৫০টিরও বেশি দেশ পাউন্ডে পেগড ছিল — সেটি ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে কার্যত শেষ হয়ে গেল।
আজকের ইউরোজোন সংকটের সাথে মিল আছে — একটি মুদ্রা অঞ্চল তৈরি করা সহজ, ভাঙা কঠিন, কিন্তু মূল ক্ষমতা দুর্বল হলে টেকানো অসম্ভব।
পাউন্ডের প্রধান অবমূল্যায়নসমূহ:
| বছর | আগের মান | নতুন মান | % পরিবর্তন | প্রধানমন্ত্রী / অর্থমন্ত্রী | কারণ |
| ১৯৪৯ | £১ = $৪.০৩ | £১ = $২.৮০ | −৩০% | অ্যাটলি / ক্রিপস | যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতা |
| ১৯৬৭ | £১ = $২.৮০ | £১ = $২.৪০ | −১৪% | উইলসন / ক্যালাহান | বাণিজ্য ঘাটতি, সুয়েজ সংকট |
| ১৯৭৬ | £১ ≈ $২.০০ | £১ = $১.৫৭ | −২১% | ক্যালাহান / হিলি | IMF বেইলআউট |
| ১৯৮৫ | £১ ≈ $১.৩০ | £১ = $১.০৫ | −১৯% | থ্যাচার / লসন | উচ্চ সুদের হার, মুদ্রাবাদী নীতি |
| ১৯৯২ | £১ ≈ $২.০০ | £১ = $১.৭০ | −১৫% | মেজর / ল্যামন্ট | ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে, ERM থেকে বের হওয়া |
| ২০১৬ | £১ ≈ $১.৫০ | £১ = $১.৩৩ | −১১% | ক্যামেরন (পদত্যাগ) | ব্রেক্সিট গণভোট |
| ২০২২ | £১ ≈ $১.১৫ | £১ = $১.০৩ | −১০% | ট্রাস (পদত্যাগ) | মিনি-বাজেট বিপর্যয় |
১৯৭৬ সাল। জেমস ক্যালাহানের লেবার সরকার। ব্রিটেনে মুদ্রাস্ফীতি ২৫%-এ পৌঁছেছে। বেকারত্ব বাড়ছে। পাউন্ড ডুবছে। বাজার আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।
সেপ্টেম্বর ১৯৭৬-এ ব্রিটেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছে গেল সাহায্যের জন্য — £২.৩ বিলিয়নের ঋণ চেয়ে। এটি ছিল সেই সময়ের IMF ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক ঋণের আবেদন।
বিষয়টা কতটা অপমানজনক ছিল সেটা বোঝার জন্য প্রেক্ষাপট দরকার — ব্রিটেন সেই দেশ যে একসময় বিশ্বের ব্যাংক ছিল। যার মুদ্রায় বিশ্ব বাণিজ্য হতো। যে অন্যদের ঋণ দিত। সেই ব্রিটেন এখন IMF-এর শর্ত মানতে বাধ্য হচ্ছে।
IMF-এর শর্ত ছিল কঠোর: সরকারি ব্যয় কাটাতে হবে, পাবলিক সেক্টরের মজুরি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কল্যাণ রাষ্ট্রের কিছু সুবিধা কাটছাঁট করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী ডেনিস হিলির ঘটনাটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসে বিখ্যাত। তিনি IMF-এর সাথে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন যাচ্ছিলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরে সিদ্ধান্ত নিলেন ফিরে যাবেন — কারণ মনে হচ্ছিল শর্তগুলো রাজনৈতিকভাবে টেকানো অসম্ভব। তারপর আবার মন পাল্টালেন এবং গেলেন।
"Going cap in hand to the IMF" — এই বাক্যাংশটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক বক্তৃতায় জায়গা পেয়ে গেল। 'হাত পেতে IMF-এর কাছে যাওয়া' মানে জাতীয় অপমান।
পাউন্ড সেই সময় $১.৫৭-এ নামল। ব্রিটেনের বৈশ্বিক অবস্থান তখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন বিন্দুতে।
তবে একটি মজার বিষয় — পরে জানা গেছে ব্রিটেন আসলে ততটা খারাপ অবস্থায় ছিল না যতটা ভাবা হয়েছিল। উত্তর সাগরের তেল আবিষ্কার হচ্ছিল এবং সেই রাজস্ব শীঘ্রই আসবে। কিন্তু বাজার সেটা বিশ্বাস করেনি — এবং বাজারের আস্থাই তখন সত্য।
১৯৭৯ সালে মার্গারেট থ্যাচার ক্ষমতায় এলেন। ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু অর্থনৈতিক নীতির দিক থেকে তিনি একটি সম্পূর্ণ নতুন দিক নিলেন।
থ্যাচার মুদ্রাবাদ (Monetarism) গ্রহণ করলেন — মিল্টন ফ্রিডম্যানের তত্ত্ব। মূল ধারণা: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর জন্য উচ্চ সুদের হার।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সুদের হার গেল ১৭%-এ! ১৯৮০ সালে।
ফলাফল দুদিকে। একদিকে পাউন্ড শক্তিশালী হলো — বিনিয়োগকারীরা ব্রিটিশ পাউন্ডে বিনিয়োগ করতে ছুটল কারণ এত উচ্চ সুদ অন্য কোথাও নেই। পাউন্ড উঠে গেল £১ = $২.৪০-এ (১৯৮০)।
অন্যদিকে — ব্রিটিশ উৎপাদন শিল্প ধ্বংস হলো। শক্তিশালী পাউন্ডের কারণে ব্রিটিশ পণ্য বিদেশে ব্যয়বহুল হয়ে গেল। রপ্তানি মার খেল। উত্তর ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের শিল্প অঞ্চলগুলো ধ্বংস হয়ে গেল।
বেকারত্ব পৌঁছাল ৩০ লাখে। থ্যাচার বলতেন — TINA: "There Is No Alternative" — অন্য কোনো পথ নেই। এই কষ্ট সহ্য করতে হবে মুদ্রাস্ফীতি মারতে।
"There Is No Alternative." — মার্গারেট থ্যাচার। পরে TINA নামে পরিচিত হয়।
কিন্তু থ্যাচারের উচ্চ সুদের নীতির একটি অপ্রত্যাশিত পরিণতি হলো। আমেরিকাতেও রেগান সরকার উচ্চ সুদ রাখছিল। ডলার দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছিল।
১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাউন্ড পড়ল ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন $১.০৫-এ। এক পাউন্ডে মাত্র এক ডলার পাঁচ সেন্ট।
এটি তখন পর্যন্ত পাউন্ডের সর্বকালীন নিম্নতম বিনিময় হার। যে পাউন্ড একসময় প্রতিটি ডলার থেকে ৪-৫ গুণ বেশি মূল্যবান ছিল, সেটি প্রায় ডলারের সমান হয়ে গেল।
তবে এরপর Plaza Accord হলো। ১৯৮৫ সালে G5 দেশগুলো মিলে ডলারকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করার সিদ্ধান্ত নিল। ফলে পাউন্ড কিছুটা পুনরুদ্ধার করল।
১৯৮৬ সালে থ্যাচার সরকার আর্থিক বাজারের বড় সংস্কার করল — এটি পরিচিত হলো "Big Bang" নামে।
সিটি অব লন্ডনের আর্থিক বাজার সম্পূর্ণ নতুন রূপ পেল। বিদেশী ব্যাংকগুলোকে ব্রিটিশ স্টক মার্কেটে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলো। ট্রেডিং সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক হলো। কমিশন রেট নিয়ন্ত্রণমুক্ত হলো।
ফলাফল অসাধারণ ছিল — লন্ডন আবার বিশ্বের শীর্ষ আর্থিক কেন্দ্র হয়ে উঠল। কিন্তু এবার পাউন্ডের শক্তির কারণে নয়, আর্থিক সেবার শ্রেষ্ঠত্বের কারণে।
এই পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ — পাউন্ড আর বিশ্বের প্রভাবশালী মুদ্রা নয়, কিন্তু লন্ডন এখনো বিশ্বের শীর্ষ আর্থিক বাজার। শক্তিটা এখন মুদ্রায় নয়, অবকাঠামো, দক্ষতা এবং নেটওয়ার্কে।
১৯৯০ সাল। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তখন জন মেজর। ইউরোপীয় মুদ্রা ঐক্যের দিকে এগোচ্ছে মহাদেশ। Exchange Rate Mechanism বা ERM হলো ইউরোর আগের পদক্ষেপ — ইউরোপীয় মুদ্রাগুলো একে অপরের বিপরীতে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করবে।
ব্রিটেন ERM-এ যোগ দিল ১৯৯০ সালের অক্টোবরে। নির্ধারিত হার: £১ = DM ২.৯৫ (জার্মান মার্ক)।
সমস্যা ছিল — এই হারটি অতিমূল্যায়িত ছিল। ব্রিটিশ অর্থনীতি তখন মন্দায়। মুদ্রাস্ফীতি ছিল। কিন্তু ERM-এর কারণে সুদের হার কমানো যাচ্ছিল না — কারণ সুদ কমালে পাউন্ড দুর্বল হবে এবং নির্ধারিত সীমা ভেঙে যাবে।
বাজারের বিশেষজ্ঞরা দেখতে পাচ্ছিলেন — পাউন্ড ধরে রাখা অসম্ভব। শুধু সময়ের প্রশ্ন।
সেদিনটা ছিল বুধবার। ইতিহাসে "ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে" নামে পরিচিত।
সকাল থেকেই পাউন্ডের উপর প্রচণ্ড চাপ। হেজ ফান্ডগুলো পাউন্ডের বিরুদ্ধে বাজি ধরছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড রিজার্ভ ব্যয় করে পাউন্ড কিনছে — মূল্য ধরে রাখতে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সিদ্ধান্ত নিল সুদের হার বাড়াবে। সকালে ১০% থেকে বাড়িয়ে ১২% করা হলো। বাজারে কোনো প্রভাব পড়ল না। দুপুরে আবার বাড়িয়ে ১৫% করা হলো।
এক দিনে সুদের হার ১০% থেকে ১৫% — ৫ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি। এটি আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসে অভূতপূর্ব।
কিন্তু কাজ হলো না। হেজ ফান্ডগুলো জানত সরকার হারবে। তারা আরও বেশি পাউন্ড বিক্রি করতে থাকল।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সেদিন মোট £৩.৩ বিলিয়ন রিজার্ভ খরচ করল পাউন্ড রক্ষার চেষ্টায়। ব্যর্থ হলো।
সন্ধ্যায় ব্রিটেন ঘোষণা করল — পাউন্ড ERM থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। পাউন্ড সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেল।
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে বড় বিজয়ী ছিলেন হাঙ্গেরীয়-আমেরিকান বিলিয়নিয়ার জর্জ সোরোস এবং তার Quantum Fund।
সোরোস কয়েক মাস ধরে বুঝেছিলেন — পাউন্ড অতিমূল্যায়িত, সরকার টিকিয়ে রাখতে পারবে না।
তিনি একটি বিশাল "short position" নিয়েছিলেন — অর্থাৎ প্রচুর পাউন্ড ধার করে বিক্রি করেছিলেন, পরে সস্তায় কিনে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায়। মোট বাজি ছিল প্রায় £১০ বিলিয়নেরও বেশি।
ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে-তে সোরোসের Quantum Fund এক দিনেই $১ বিলিয়নেরও বেশি মুনাফা করল।
সোরোস হয়ে গেলেন "The Man Who Broke the Bank of England" — যে মানুষটি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে ভেঙেছে। এটি আর্থিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রেডগুলোর একটি।
"When I saw a one-way bet, I bet big." — জর্জ সোরোস, ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে প্রসঙ্গে
ব্রিটেন ERM থেকে বের হওয়ার পর পাউন্ড ১৫% পড়ল। অর্থমন্ত্রী নরম্যান ল্যামন্টকে পদত্যাগ করতে হলো। কনজারভেটিভ পার্টি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তাদের সুনাম হারাল।
কিন্তু একটি মজার বিষয় ঘটল — ERM ছাড়ার পরে ব্রিটিশ অর্থনীতি ভালো হতে শুরু করল।
পাউন্ড দুর্বল হওয়ায় রপ্তানি সস্তা হলো। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদ কমাতে পারল। ব্যবসা চাঙ্গা হলো। ১৯৯২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ব্রিটেনে টানা ১৫ বছর প্রবৃদ্ধি হলো — "The Long Boom" নামে পরিচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি: ব্রিটেন ইউরো গ্রহণ করল না। ব্ল্যাক ওয়েডনেসডের ট্রমার কারণে ব্রিটিশ জনমত ইউরোপীয় মুদ্রার বিরুদ্ধে চলে গেল।
ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে-র সময়রেখা:
| সময় | ঘটনা | সুদের হার | পাউন্ডের স্তর |
| সকাল ৭টা | পাউন্ডের উপর বিক্রির চাপ শুরু | ১০% | DM ২.৭৭ (সীমার কাছে) |
| সকাল ১০টা | BoE সুদ বাড়াল | ১২% | DM ২.৭৫ |
| দুপুর ২টা | BoE আবার সুদ বাড়াল | ১৫% | DM ২.৭৩ (সীমা ভাঙার মুখে) |
| বিকেল ৪টা | £৩.৩ বিলিয়ন রিজার্ভ শেষ, লড়াই ব্যর্থ | ১৫% | DM ২.৭০ (সীমা ভেঙে) |
| সন্ধ্যা ৭টা | ERM ত্যাগের ঘোষণা | ১২% | DM ২.৫১ (১৫% পতন) |
| পরের দিন | অর্থমন্ত্রী ল্যামন্টের কার্যত পদত্যাগ | ৬% | পুনরুদ্ধার শুরু |
১৯৯৭ সালে টোনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে লেবার পার্টি ক্ষমতায় এলো। অর্থমন্ত্রী হলেন গর্ডন ব্রাউন। ইউরো তখন চালু হওয়ার পথে — ১৯৯৯ সালে হবে।
প্রশ্ন উঠল — ব্রিটেন কি ইউরো নেবে? ব্লেয়ার চাইতেন ইউরোপের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। কিন্তু গর্ডন ব্রাউন একটি চালাক পদক্ষেপ নিলেন।
তিনি ঘোষণা করলেন — ইউরো নেওয়ার আগে পাঁচটি অর্থনৈতিক শর্ত পূরণ করতে হবে।
এই পাঁচটি শর্ত ছিল — অর্থনৈতিক চক্রের সামঞ্জস্য, যথেষ্ট নমনীয়তা, বিনিয়োগে প্রভাব, আর্থিক সেবা শিল্পে প্রভাব, এবং প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে প্রভাব।
এই শর্তগুলো কখনো পূরণ ঘোষণা করা হয়নি। ব্রিটেন ইউরো নেয়নি।
পরবর্তীতে এটি সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে — ২০১০ সালের পরে ইউরোজোনের সংকটে গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল, ইটালি ভুগেছে। নিজস্ব মুদ্রা থাকায় ব্রিটেন অনেক বেশি নমনীয়তা পেয়েছিল।
২০০৮ সাল। আমেরিকায় সাব-প্রাইম মর্টগেজ সংকট বিশ্বব্যাপী আর্থিক মহাসংকটে পরিণত হলো। লেহম্যান ব্রাদার্স দেউলিয়া হলো।
ব্রিটেনে পাউন্ড ২৫% পড়ল — £১ = $২.০০ থেকে £১ = $১.৫০-এ।
ব্রিটিশ ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ল। Royal Bank of Scotland (RBS) এবং HBOS মুখ থুবড়ে পড়ার মুখে। সরকার £৫০০ বিলিয়নের ব্যাংকিং রেসকিউ প্যাকেজ ঘোষণা করল।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার কমিয়ে ০.৫%-এ নামিয়ে আনল — তার ৩১৫ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
এই সংকটের একটি ইতিবাচক দিক — পাউন্ড দুর্বল হওয়ায় ব্রিটিশ রপ্তানি সস্তা হলো। অর্থনীতি আমেরিকার তুলনায় দ্রুত পুনরুদ্ধার শুরু করল। কিন্তু একটি দুর্বল পাউন্ডের চাপ টানতে টানতে ব্রিটেন পরবর্তী সংকটের দিকে এগোল।
২৩ জুন ২০১৬। ব্রিটেনে EU সদস্যপদ নিয়ে গণভোট। বাজার বিশেষজ্ঞরা প্রায় সবাই ধরে নিয়েছিলেন Remain জিতবে। পাউন্ড ছিল £১ = $১.৫০-এ।
রাত বাড়ার সাথে সাথে ফলাফল বেরোতে শুরু করল। প্রথম ঘণ্টায় Remain এগিয়ে। তারপর হঠাৎ মোড় ঘুরল।
ভোর ৪টায় পরিষ্কার হয়ে গেল — Leave জিতছে। এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে পাউন্ডের বিক্রি শুরু হলো প্রচণ্ড গতিতে।
সেই রাতে পাউন্ড ১০% পড়ল — $১.৫০ থেকে $১.৩৩-এ। এটি আধুনিক ইতিহাসে পাউন্ডের একক দিনে সবচেয়ে বড় পতন।
ব্রিটিশ ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো — এবং পাউন্ডের জন্যও। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন পদত্যাগ করলেন। ব্রিটেনের EU ত্যাগের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হলো।
ব্রেক্সিটের পরে পাউন্ড আর কখনো প্রাক-ব্রেক্সিট স্তরে ফেরেনি।
যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান লন্ডনে ইউরোপীয় কার্যালয় চালাত, তাদের অনেকে ডাবলিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, প্যারিসে অফিস খুলল। Euro-clearing — অর্থাৎ ইউরো-ডিনমিনেটেড ডেরিভেটিভের লেনদেন নিষ্পত্তি — লন্ডন থেকে কিছুটা সরে গেছে।
তবে সব ক্ষতি হয়নি। লন্ডন এখনো বিশ্বের শীর্ষ ফরেক্স কেন্দ্র। কিন্তু ব্রেক্সিটের অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল পাউন্ড একটি স্থায়ী চাপ তৈরি করেছে।
ব্রেক্সিট প্রমাণ করল — রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সরাসরি আর্থিক মূল্য আছে। এবং সেই মূল্য দেয় দেশের মুদ্রা।
সেপ্টেম্বর ২০২২। ব্রিটেনে মুদ্রাস্ফীতি ১০%-এর উপরে। জ্বালানি সংকট। কোভিড-পরবর্তী অর্থনীতি নড়বড়ে। নতুন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস সবে ক্ষমতায় এসেছেন।
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২। নতুন অর্থমন্ত্রী কোয়াসি কোয়ার্টেং ঘোষণা করলেন একটি বিশাল মিনি-বাজেট — £৪৫ বিলিয়নের করছাড়। কিন্তু এই করছাড়ের জন্য কোনো অর্থায়নের পরিকল্পনা নেই।
বাজার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাল — প্রচণ্ড আতঙ্কে।
পাউন্ড মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পড়ে গেল — $১.১০ থেকে সর্বকালীন সর্বনিম্ন $১.০৩-এ।
ব্রিটিশ সরকারি বন্ড (Gilt)-এর সুদের হার দ্রুত বাড়ল। ব্রিটিশ পেনশন ফান্ডগুলো বিপদে পড়ল — তাদের অনেকেই Liability-Driven Investment (LDI) কৌশল নিয়েছিল যা বন্ড মূল্য পড়লে ভেঙে যায়।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে জরুরি ভিত্তিতে বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হলো — £৬৫ বিলিয়নের বন্ড কেনার কর্মসূচি ঘোষণা হলো পেনশন ফান্ড বাঁচাতে।
লিজ ট্রাস মাত্র ৪৫ দিনে পদত্যাগ করলেন। ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী।
এই পুরো ঘটনা একটি অমোঘ সত্য প্রমাণ করল — বাজারের আস্থা হারালে কোনো সরকার, কোনো নীতি, কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা টিকতে পারে না। বাজার সরকারকে শাস্তি দেয় — পাউন্ডের মাধ্যমে।
পাউন্ড সংকটের তুলনামূলক চিত্র:
| ঘটনা | বছর | পাউন্ড পড়ল | সময়কাল | প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ? |
| ১৯৪৯ অবমূল্যায়ন | ১৯৪৯ | $৪.০৩ → $২.৮০ | পরিকল্পিত | না |
| IMF বেইলআউট | ১৯৭৬ | ~$২.০০ → $১.৫৭ | কয়েক মাস | না (পরে নির্বাচনে হার) |
| ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে | ১৯৯২ | $২.০০ → $১.৭০ | এক দিন | না (অর্থমন্ত্রী পরে পদত্যাগ) |
| ব্রেক্সিট গণভোট | ২০১৬ | $১.৫০ → $১.৩৩ | এক রাত | হ্যাঁ (ক্যামেরন) |
| ট্রাস মিনি-বাজেট | ২০২২ | $১.১০ → $১.০৩ | কয়েক ঘণ্টা | হ্যাঁ (ট্রাস, ৪৫ দিনে) |
এত সংকট, এত পতন, এত ইতিহাসের পরেও পাউন্ড কিন্তু সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। এখনো এটি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রাগুলোর একটি।
BIS ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী — পাউন্ড বিশ্বের চতুর্থ সর্বাধিক লেনদেনকৃত মুদ্রা। বৈশ্বিক ফরেক্স লেনদেনের ১৩% পাউন্ডে (ডলার ৮৮%, ইউরো ৩১%, ইয়েন ১৭% — নোট: প্রতিটি লেনদেনে দুটি মুদ্রা, তাই মোট ২০০%)।
লন্ডন এখনো বিশ্বের শীর্ষ ফরেক্স ট্রেডিং কেন্দ্র — প্রতিদিন $৩.৮ ট্রিলিয়নের ফরেক্স লেনদেন। নিউইয়র্কের দ্বিগুণেরও বেশি।
বৈশ্বিক রিজার্ভে পাউন্ডের অংশ প্রায় ৫%। একসময় ৬০% ছিল — কিন্তু শূন্য নয়।
সিটি অব লন্ডন এখনো বিশ্বের শীর্ষ আর্থিক কেন্দ্র — আর্থিক সেবা, বীমা, আইনি পরিষেবা, ফরেক্স ট্রেডিং সব মিলিয়ে। পাউন্ডের দুর্বলতা সত্ত্বেও লন্ডনের এই শ্রেষ্ঠত্ব টিকে আছে।
পাউন্ডের ১,২০০ বছরের ইতিহাস থেকে ৭টি বড় শিক্ষা:
১. কোনো আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়। পাউন্ড ১৩০ বছর রাজত্ব করেছিল। ডলার ৮০ বছর ধরে আধিপত্যে আছে। ইতিহাস বলছে — পরিবর্তন আসবেই।
২. যুদ্ধ মুদ্রা ধ্বংস করে। দুটি বিশ্বযুদ্ধ পাউন্ডকে ভেঙে দিয়েছিল। যুদ্ধের খরচ শেষ হয় না — ব্রিটেন ২০০৬ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঋণ শোধ করেছে।
৩. অতিমূল্যায়ন শিল্পকে হত্যা করে। চার্চিলের ১৯২৫ সালের ভুল, থ্যাচারের উচ্চ সুদের নীতি — উভয়ই শক্তিশালী পাউন্ড রেখে উৎপাদন শিল্প ধ্বংস করেছে।
৪. বাজার সরকারের চেয়ে শক্তিশালী। সোরোস ১৯৯২ সালে প্রমাণ করেছেন — কেন্দ্রীয় ব্যাংকের £৩.৩ বিলিয়নও বাজারের বিরুদ্ধে টিকতে পারে না।
৫. রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আর্থিক মূল্য আছে। ব্রেক্সিট, ট্রাসের মিনি-বাজেট — উভয়ই প্রমাণ করেছে রাজনীতি ও অর্থনীতি আলাদা নয়।
৬. রিজার্ভ মুদ্রার পরিবর্তন দশকের বিষয়। ১৯৪৪ সালে পাউন্ড সিংহাসন হারাল, কিন্তু ১৯৭০ সালেও কিছু দেশ পাউন্ডে রিজার্ভ রাখত। পরিবর্তন ধীরে হয়।
৭. আজকের ডলারও একই ঝুঁকিতে আছে। আমেরিকার জাতীয় ঋণ $৩৪ ট্রিলিয়নের উপরে। চীন BRICS ব্লকে ডলার-বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছে। পাউন্ডের গল্প ডলারের ভবিষ্যতের আয়না।
পাউন্ডের গল্প শুধু ইতিহাস নয় — এটি বাংলাদেশ সহ সব উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশি টাকা গত ১০ বছরে ডলারের বিপরীতে প্রায় ৫০% হারিয়েছে। এটি কি ব্যর্থতা? নাকি স্বাভাবিক? পাউন্ডের ইতিহাস বলছে — উভয়ই।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উন্নয়নশীল দেশের জন্য:
প্রথমত: রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটেন ১৯৭৬ সালে বিপদে পড়েছিল কারণ রিজার্ভ কম ছিল। বাংলাদেশের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা জরুরি।
দ্বিতীয়ত: কৃত্রিমভাবে মুদ্রা অতিমূল্যায়িত রাখা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। চার্চিল ১৯২৫ সালে এই ভুল করেছিলেন। অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনো একই ভুল করে।
তৃতীয়ত: প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি মুদ্রার শক্তি। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ৩৩০ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠান। বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান ছাড়া শক্তিশালী মুদ্রা সম্ভব নয়।
প্রধান বিশ্ব মুদ্রার তুলনামূলক চিত্র (২০২৪):
| মুদ্রা | ফরেক্স শেয়ার (BIS ২০২২) | রিজার্ভ শেয়ার (IMF ২০২৪) | প্রবণতা |
| মার্কিন ডলার (USD) | ৮৮% | ৫৮% | আধিপত্য বজায়, কিছুটা কমছে |
| ইউরো (EUR) | ৩১% | ২০% | স্থিতিশীল |
| জাপানি ইয়েন (JPY) | ১৭% | ৬% | দুর্বল হচ্ছে |
| ব্রিটিশ পাউন্ড (GBP) | ১৩% | ৫% | স্থিতিশীল, পোস্ট-ব্রেক্সিট চাপে |
| চীনা ইউয়ান (CNY) | ৭% | ২% | দ্রুত বাড়ছে |
| অস্ট্রেলিয়ান ডলার (AUD) | ৭% | ২% | স্থিতিশীল |
| কানাডিয়ান ডলার (CAD) | ৬% | ২% | স্থিতিশীল |
৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দ। রাজা অফা তার রাজ্যের জন্য একটি রৌপ্য মুদ্রা তৈরি করলেন — পেনি। সেই ছোট্ট রৌপ্য মুদ্রা থেকে শুরু হয়েছিল পাউন্ডের যাত্রা।
১,২০০ বছরের পথ পেরিয়ে সেই মুদ্রা দেখেছে অনেক কিছু: মধ্যযুগীয় রাজত্ব ও যুদ্ধ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অভূতপূর্ব বিস্তার, শিল্প বিপ্লবের গর্জন, দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংস, সাম্রাজ্যের পতন, সংসদীয় গণতন্ত্রের উত্থান, এবং বারবার সংকট থেকে ফিরে আসা।
১৯১৪ সালে পাউন্ড ছিল যেখানে আজ ডলার আছে — বিশ্বের নির্বিরোধ একচ্ছত্র সম্রাট। বিশ্ব বাণিজ্যের ৬০% পাউন্ডে, বিশ্ব রিজার্ভের ৬০% পাউন্ডে, সারা পৃথিবীর আর্থিক লেনদেন লন্ডনে।
আজ ডলার ঠিক সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আর পাউন্ডের গল্পটা বলছে — এই অবস্থান স্থায়ী নয়।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে একসময় বলা হতো "সূর্য যেখানে কখনো অস্ত যায় না।" The sun never sets on the British Empire. সেই সূর্য অস্ত গেছে — ধীরে, বেদনাদায়কভাবে, কিন্তু অবশ্যম্ভাবীভাবে।
"The sun never sets on the British Empire" — একসময়ের সত্য। কিন্তু প্রতিটি সূর্যাস্তের পর নতুন সূর্যোদয় হয়। পাউন্ডের গল্পটা হুঁশিয়ারি — আজকের আধিপত্যশালীদের জন্য।
পাউন্ড আজ মৃত নয়। বরং এটি একটি অসাধারণ রূপান্তরের গল্প — বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতা থেকে একটি সম্মানজনক, টেকসই, আঞ্চলিক ও আংশিক বৈশ্বিক ভূমিকায়। সাম্রাজ্য ছাড়াও একটি শক্তিশালী মুদ্রা বেঁচে থাকতে পারে — যদি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী থাকে, নীতি বিশ্বাসযোগ্য থাকে, এবং বাজার আস্থা রাখে।
পর্ব ১ থেকে পর্ব ৩ পর্যন্ত এই তিন পর্বের যাত্রায় আমরা দেখলাম — একটি মুদ্রার জন্ম, উত্থান, শীর্ষ, পতন এবং টিকে থাকার গল্প। ইতিহাসের সেরা অর্থনৈতিক গল্পগুলোর একটি।
"History doesn't repeat itself, but it often rhymes." — মার্ক টোয়েন। পাউন্ডের গল্প পড়ে ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন। ছন্দটা পরিচিত লাগবে।

ফ্রিমিয়াম মডেলে মূলত গ্রাহকদের মূল সেবাটির সীমিত কিছু ফিচার বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। সেবাটি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন গ্রাহকদের বিনামূল্যে ফিচারগুলো ব্যবহার করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেবাটির প্রতি আস্থা এবং নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হয়।








