ভূমিকা
পর্ব - ১-এ আমরা দেখেছিলাম কীভাবে তেল একটি শিল্পপণ্য থেকে ভূরাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, কীভাবে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং সেই নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে কীভাবে OPEC জন্ম নিয়েছিল।
এই পর্বে সেই গল্পের পরের অধ্যায় — যেখানে OPEC প্রথমবার তার আসল শক্তি দেখায়, যেখানে তেলকে কেন্দ্র করে আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে নতুন ক্ষমতার লড়াই শুরু হয় এবং যেখানে প্রশ্ন ওঠে — তেলের যুগ কি শেষ হতে চলেছে?
পর্ব - ২
এই পর্বে থাকছে — ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব, পেট্রোডলার ব্যবস্থার জন্ম ও আমেরিকার আর্থিক আধিপত্য, ইরান বিপ্লব ও দ্বিতীয় তেল সংকট, উপসাগরীয় যুদ্ধ ও তেলের নিরাপত্তা, রাশিয়ার তেল কূটনীতি, আমেরিকার শেল বিপ্লব, চীনের পেট্রো-ইউয়ান কৌশল এবং নবায়নযোগ্য শক্তির যুগে তেলের ভবিষ্যৎ।
১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ: বিশ্ব যেদিন থমকে গিয়েছিল
১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ: বিশ্ব যেদিন থমকে গিয়েছিল
প্রেক্ষাপট: ১৯৬৭ সালের পরাজয়ের ক্ষত
১৯৭৩ সালের ঘটনা বুঝতে হলে ছয় বছর আগে ফিরে যেতে হবে। ১৯৬৭ সালের জুনে ইসরায়েল মাত্র ছয় দিনের যুদ্ধে মিশর, জর্ডান ও সিরিয়াকে পরাজিত করল। মিশরের সিনাই উপদ্বীপ, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং জর্ডানের পশ্চিম তীর দখল হয়ে গেল। আরব বিশ্বের জন্য এটা ছিল অপমানজনক পরাজয়।
মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এই অপমান মুছে দিতে চাইলেন। কিন্তু সরাসরি সামরিক শক্তিতে ইসরায়েলকে হারানো কঠিন — কারণ আমেরিকা সবসময় ইসরায়েলের পাশে থাকে। সাদাত একটি নতুন কৌশল ভাবলেন। শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নয় — তেলকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
গোপন পরিকল্পনা: সামরিক ও তেল — দুটো অস্ত্র একসাথে
১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে সাদাত দুটো গোপন আলোচনা একসাথে চালালেন। এক দিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের সাথে সামরিক পরিকল্পনা। ইসরায়েলে একযোগে আক্রমণ করতে হবে — উত্তরে সিরিয়া গোলান থেকে, পশ্চিমে মিশর সিনাই থেকে।
অন্য দিকে সৌদি আরবের রাজা ফয়সালের সাথে গোপন বৈঠক। সাদাত বললেন — "যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকা ইসরায়েলকে সাহায্য করবে। তখন তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।" রাজা ফয়সাল প্রথমে দ্বিধায় ছিলেন। সৌদি আরবের সাথে আমেরিকার গভীর সম্পর্ক। এই সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলা কি ঠিক হবে?
কিন্তু সাদাত বললেন — "ইসরায়েলকে আমেরিকা যে সমর্থন দিচ্ছে তা আরব বিশ্বের সম্মানের প্রশ্ন। আপনি যদি এখন না দাঁড়ান, তাহলে আরব জনগণ কখনো ক্ষমা করবে না।" ফয়সাল রাজি হলেন।
যুদ্ধের ট্রিগার: ইয়োম কিপুর
১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর। ইহুদি ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র দিন — ইয়োম কিপুর। এই দিনে ইহুদিরা রোজা রাখেন, প্রার্থনা করেন, রেডিও-টেলিভিশন বন্ধ থাকে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ ছুটিতে। ঠিক এই মুহূর্তটাই বেছে নিল মিশর ও সিরিয়া।
বেলা দুইটায় একযোগে আক্রমণ শুরু হলো। মিশরীয় বাহিনী সুয়েজ খাল পেরিয়ে সিনাইতে ঢুকে পড়ল। সিরিয়ান বাহিনী গোলান মালভূমিতে। ইসরায়েল সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। প্রথম কয়েক দিনে মিশর ও সিরিয়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করল। ইসরায়েলের জন্য পরিস্থিতি সঙ্কটজনক হয়ে উঠল।
অপারেশন নিকেল গ্রাস: আমেরিকার সরাসরি হস্তক্ষেপ
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেইর আমেরিকার কাছে জরুরি সাহায্য চাইলেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার সিদ্ধান্ত নিলেন — ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ সহায়তা দিতে হবে।
শুরু হলো "অপারেশন নিকেল গ্রাস"। মার্কিন বিমান বাহিনীর বিশাল C-5 গ্যালাক্সি কার্গো বিমানগুলো দিনরাত উড়তে লাগল ইসরায়েলে। ট্যাংক, কামান, গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র — সব কিছু। মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় ২২,৩২৫ টন সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছাল ইসরায়েলে। এই সামরিক সহায়তায় ইসরায়েল যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিল। মিশর ও সিরিয়া পিছু হটতে বাধ্য হলো। কিন্তু আরব দেশগুলো এই মার্কিন হস্তক্ষেপ দেখে যা করল তা পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিল।
অবরোধের ঘোষণা: তেল যেদিন অস্ত্র হলো
১৯৭৩ সালের ১৭ অক্টোবর কুয়েত সিটিতে OAPEC-এর জরুরি বৈঠক বসল। আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল।
সিদ্ধান্ত ছিল দুটো।
প্রথমত, আমেরিকা এবং ইসরায়েলকে সমর্থনকারী যেকোনো দেশে তেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ। প্রধান লক্ষ্য আমেরিকা, নেদারল্যান্ডস (রটারডাম বন্দরের মাধ্যমে ইউরোপে তেল যেত), পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও রোডেশিয়া।
দ্বিতীয়ত, প্রতি মাসে উৎপাদন ৫% করে কমানো হবে — যতক্ষণ না ইসরায়েল দখলকৃত আরব ভূখণ্ড ছেড়ে দেয়।
সৌদি তেলমন্ত্রী আহমেদ জাকি ইয়ামানি বললেন — "তেল আর শুধু ব্যবসার পণ্য নয়। এটা এখন থেকে রাজনৈতিক অস্ত্র।"
বিশ্বের প্রতিক্রিয়া: ধাক্কার গভীরতা
এই ঘোষণার পরে যা হলো তা ছিল অভূতপূর্ব।
আমেরিকায়:
পেট্রোল স্টেশনগুলোতে লম্বা লাইন পড়ে গেল। মানুষ ভোরবেলা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত। অনেক স্টেশনে "No Gas" সাইন ঝুলতে লাগল।
সরকার নিয়ম করল — বিজোড় নম্বরের গাড়ি বিজোড় তারিখে, জোড় নম্বরের গাড়ি জোড় তারিখে পেট্রোল পাবে। হাইওয়েতে সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৫৫ মাইলে বেঁধে দেওয়া হলো।
প্রেসিডেন্ট নিক্সন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। বললেন — থার্মোস্ট্যাট কমিয়ে রাখুন, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ বন্ধ করুন, বড়দিনের আলোকসজ্জা এবার নয়। আমেরিকার GDP ৪.৭% কমে গেল। মূল্যস্ফীতি ১১%-এ পৌঁছাল। শেয়ার বাজার ধসে পড়ল।
ইউরোপে:
পশ্চিম জার্মানিতে রবিবার গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ হলো। অটোবানে গাড়ির বদলে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে — এ দৃশ্য ছিল অবিশ্বাস্য। সরকার গতিসীমা কমিয়ে দিল, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনা এলো।
ব্রিটেনে তিন দিনের কর্মসপ্তাহ চালু হলো — শিল্প কারখানা সপ্তাহে মাত্র তিন দিন চলবে, বিদ্যুৎ বাঁচাতে। টেলিভিশন রাত ১০টার পর বন্ধ।
নেদারল্যান্ডসে রবিবার পুরোপুরি গাড়ি বন্ধ। আমস্টারডামের বিখ্যাত হাইওয়েতে মানুষ সাইকেল চালাচ্ছে, বাচ্চারা খেলছে — কারণ রাস্তায় একটাও গাড়ি নেই।
জাপানে:
জাপানের জন্য ধাক্কাটা ছিল সবচেয়ে তীব্র। দেশটির তেলের ৯০% আসত মধ্যপ্রাচ্য থেকে। শিল্প উৎপাদন ২০% কমে গেল। সুপারমার্কেটে টয়লেট পেপার কেনার হিড়িক পড়ে গেল — মানুষ ভাবল সব কিছুই শেষ হয়ে যাবে। সরকার বিজ্ঞাপন সীমিত করল, নিয়ন বোর্ড বন্ধ করল, গোসলের পানি কম ব্যবহারের আবেদন করল।
বাংলাদেশে:
সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে লড়াই করছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত শুকায়নি। এর মধ্যে হঠাৎ তেলের দাম চারগুণ হলো।
সার কারখানা চলে তেলে, সেচ পাম্প চলে তেলে, পরিবহন চলে তেলে। সবকিছুর খরচ একসাথে বেড়ে গেল। সদ্যস্বাধীন দেশটির জন্য এই ধাক্কা সামলানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে এই তেল সংকটের পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।
| দেশ | তেল সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব |
| আমেরিকা | পেট্রোল স্টেশনে মাইলের পর মাইল লাইন, জিডিপি ঋণাত্মক, মূল্যস্ফীতি ১১%-এ |
| জাপান | শিল্প উৎপাদন ২০% হ্রাস, প্রথমবার যুদ্ধ-পরবর্তী মন্দা |
| পশ্চিম জার্মানি | রবিবার গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ, গতিসীমা কমানো |
| ব্রিটেন | তিন দিনের কর্মসপ্তাহ চালু, বিদ্যুৎ রেশনিং |
| নেদারল্যান্ড | সম্পূর্ণ গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ (রবিবার) |
| বাংলাদেশ | সদ্যস্বাধীন দেশে আমদানি খরচ হঠাৎ কয়েকগুণ বৃদ্ধি |
তেলের দামের ইতিহাস বদলে গেল
মাত্র কয়েক মাসে যা হলো তা ছিল অভূতপূর্ব।
| সময় | তেলের দাম (ব্যারেল প্রতি) |
| অক্টোবর ১৯৭৩ (আগে) | $৩.০০ |
| নভেম্বর ১৯৭৩ | $৫.১১ |
| ডিসেম্বর ১৯৭৩ | $১১.৬৫ |
| জানুয়ারি ১৯৭৪ | $১১.৬৫ (স্থিতিশীল) |
তিন মাসে দাম বাড়ল প্রায় চারগুণ। ইতিহাসে এত দ্রুত এত বড় মূল্যবৃদ্ধি আর কখনো হয়নি।
সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
১৯৭৪ সালের মার্চে অবরোধ উঠে গেল। কিন্তু তেলের দাম আর আগের জায়গায় ফিরে গেল না। এই সংকট বিশ্বকে তিনটি গভীর শিক্ষা দিল।
প্রথম শিক্ষা — তেল নির্ভরতা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি। আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো কৌশলগত তেল মজুদ গড়তে শুরু করল। ১৯৭৪ সালে International Energy Agency বা IEA গঠিত হলো — উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট মোকাবেলা।
দ্বিতীয় শিক্ষা — বিকল্প শক্তি দরকার। ১৯৭৩-এর পরে পশ্চিমে পারমাণবিক, সৌর ও বায়ু শক্তির গবেষণায় বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়ল। ফ্রান্স ১৯৭৪ সালেই সিদ্ধান্ত নিল দেশের বিদ্যুতের বেশিরভাগ পারমাণবিক থেকে আসবে — আজ ফ্রান্সের ৭০%-এর বেশি বিদ্যুৎ পারমাণবিক থেকে।
তৃতীয় শিক্ষা — OPEC একটি সত্যিকার বৈশ্বিক শক্তি। ১৯৬০ সালে যে সংগঠনটাকে পশ্চিম "টকশো" বলে উড়িয়ে দিয়েছিল, সেটা মাত্র ১৩ বছরে প্রমাণ করে দিল — তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো একসাথে দাঁড়ালে পুরো পশ্চিমা অর্থনীতি কাঁপিয়ে দিতে পারে।
এই ঘটনার পর থেকে তেলের ভূরাজনীতি চিরতরে বদলে গেল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বুঝল তাদের হাতে কী অসাধারণ অস্ত্র আছে। আর পশ্চিমা দেশগুলো বুঝল — তেলের উপর নির্ভরতা তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
পেট্রোডলার: তেলকে ডলারের সাথে বেঁধে ফেলার কৌশল
প্রেক্ষাপট: ব্রেটন উডস ভেঙে পড়ার পর
১৯৭৩ সালের তেল সংকট বুঝতে হলে আরও দুই বছর পেছনে যেতে হবে।
১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস শহরে ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা বসলেন। সিদ্ধান্ত হলো — বিশ্বের সব মুদ্রা মার্কিন ডলারের সাথে নির্দিষ্ট হারে বাঁধা থাকবে। আর ডলার বাঁধা থাকবে সোনার সাথে — প্রতি আউন্স সোনা ৩৫ ডলার।
এই ব্যবস্থা কাজ করল দুই দশকের বেশি। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধের খরচ মেটাতে প্রচুর ডলার ছাপাতে লাগল। ফলে সোনার সাথে ডলারের অনুপাত বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল।
১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট প্রেসিডেন্ট নিক্সন ঘোষণা করলেন — ডলার আর সোনার সাথে বাঁধা থাকবে না। ইতিহাসে এটি "নিক্সন শক" নামে পরিচিত।
এই ঘোষণার পরে পুরো বিশ্ব একটা বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হলো — ডলারের মূল্য এখন কীসের উপর নির্ভর করবে? সোনার গ্যারান্টি নেই, তাহলে ডলার ধরে রাখব কেন?
আমেরিকার জন্য এটা ছিল অস্তিত্বের সংকট। এই সংকটের সমাধান বের হলো ১৯৭৩-৭৪ সালের তেল সংকটের মধ্য দিয়েই — পেট্রোডলারের রূপে।
কিসিঞ্জারের মাথায় যে পরিকল্পনা এলো
১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ আমেরিকাকে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু হেনরি কিসিঞ্জার — নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী — এই সংকটের মধ্যে একটা সুযোগ দেখলেন।
কিসিঞ্জার ভাবলেন — আরবরা তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমেরিকা কি এই পরিস্থিতিকে নিজের পক্ষে কাজে লাগাতে পারে না?
তেল সংকটের কারণে আরব দেশগুলো হঠাৎ অকল্পনীয় পরিমাণ অর্থ পাচ্ছে। সৌদি আরবের তেল আয় ১৯৭৩ সালে ছিল ৪.৩ বিলিয়ন ডলার। ১৯৭৪ সালে সেটা লাফিয়ে ২২.৫ বিলিয়নে পৌঁছাল। এই বিশাল অর্থ কোথায় যাবে?
কিসিঞ্জার বুঝলেন — যদি এই অর্থ আমেরিকার দিকে আনা যায়, তাহলে দুটো কাজ হবে। আমেরিকার অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। আর ডলারের চাহিদা থাকবে — কারণ তেল বিক্রির টাকা ডলারে এলে সেই ডলার আমেরিকায় বিনিয়োগ হবে।
সৌদি আরবের সাথে গোপন আলোচনা
১৯৭৩ সালের শেষ দিকে এবং ১৯৭৪ সালের শুরুতে কিসিঞ্জার একাধিকবার সৌদি আরবে গেলেন। আলোচনা হলো রাজা ফয়সালের সাথে।
কিসিঞ্জারের প্রস্তাব ছিল মোটামুটি এরকম — আমরা তোমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। তোমার রাজপরিবারকে রক্ষা করব। তোমার দেশে অস্ত্র দেব, সামরিক প্রশিক্ষণ দেব। বিনিময়ে তুমি দুটো কাজ করো। তেল বিক্রি শুধু ডলারে। আর উদ্বৃত্ত অর্থ আমেরিকার ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ কর।
১৯৭৪ সালের জুনে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি উইলিয়াম সাইমন সৌদি আরবে গেলেন। তাঁর সাথে গেলেন ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তারা। বৈঠক হলো রিয়াদে।
এই বৈঠকে যে চুক্তি হলো তা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়নি, কোনো নথিতে প্রকাশ্যে লেখা হয়নি। কিন্তু দুই পক্ষ বুঝে নিল কী করতে হবে।
চুক্তির মূল বিষয় দুটো। সৌদি আরব তেল বিক্রি করবে শুধু মার্কিন ডলারে — অন্য কোনো মুদ্রায় নয়। সৌদি আরবের উদ্বৃত্ত তেল আয় বিনিয়োগ হবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ও আমেরিকান বাজারে। বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি রাজপরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, অস্ত্র দেবে এবং যেকোনো বাইরের হুমকি থেকে সৌদি আরবকে রক্ষা করবে।
OPEC-এর অন্যান্য সদস্যরা ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থায় এলো। ১৯৭৫ সালের মধ্যে OPEC-এর সব সদস্য তেল বিক্রি করছে শুধু ডলারে।
পেট্রোডলার কীভাবে কাজ করে: একটি সহজ উদাহরণ
ধরো জাপান মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কিনতে চায়।
প্রথমে জাপানকে ইয়েন দিয়ে ডলার কিনতে হবে। তারপর সেই ডলার দিয়ে সৌদি আরব থেকে তেল কিনবে। সৌদি আরব ডলার পাবে। সেই ডলার আমেরিকার ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ হবে। আমেরিকা সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারবে।
এই চক্রে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে আমেরিকা। কারণ পুরো বিশ্ব তেল কিনতে ডলার চাইছে — ডলারের চাহিদা সবসময় উচ্চ। ফলে আমেরিকা কম সুদে ঋণ নিতে পারছে, ডলার ছাপিয়ে খরচ করতে পারছে, এবং তবু মুদ্রার মান টিকে থাকছে।
এই ব্যবস্থাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন "exorbitant privilege" বা "অসাধারণ সুবিধা" — এটি আমেরিকার একটি বিশেষ মর্যাদা যা অন্য কোনো দেশের নেই।
| পেট্রোডলার ব্যবস্থার সুবিধা (আমেরিকার জন্য) | পরিমাণ / প্রভাব |
| বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের অংশ (২০২৩) | ৫৯% (IMF তথ্য) |
| সৌদি আরবের মার্কিন ট্রেজারি বন্ড হোল্ডিং | প্রায় ১১৯ বিলিয়ন ডলার (২০২৩) |
| বার্ষিক সাশ্রয় (ডলারের রিজার্ভ মুদ্রা মর্যাদার কারণে) | আনুমানিক ১০০ বিলিয়ন ডলার+ |
IMF-এর তথ্যমতে ২০২৩ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের অংশ ৫৯%। সৌদি আরবের মার্কিন ট্রেজারি বন্ড হোল্ডিং প্রায় ১১৯ বিলিয়ন ডলার।
পেট্রোডলার ভাঙলে কী হয়: দুটো সতর্কতামূলক উদাহরণ
ইতিহাসে দুটো ঘটনা আছে যা থেকে বোঝা যায় পেট্রোডলার ব্যবস্থা ভাঙার চেষ্টা করলে কী হতে পারে।
সাদ্দাম হোসেনের ইউরো পরীক্ষা
২০০০ সালের নভেম্বরে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ঘোষণা করলেন — ইরাক এখন থেকে তেল বিক্রি করবে ইউরোতে, ডলারে নয়। তাঁর যুক্তি ছিল আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ঘোষণা ওয়াশিংটনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। মাত্র তিন বছর পর ২০০৩ সালে আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করল। যুদ্ধের পর ইরাকের তেল বিক্রি আবার ডলারে ফিরে এলো।
এই দুটো ঘটনার মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক আছে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু সময়টা অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ।
গাদ্দাফির গোল্ড দিনার পরিকল্পনা
লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি আরও সাহসী পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন। তিনি আফ্রিকার দেশগুলোকে প্রস্তাব দিলেন — আমরা একটি "গোল্ড দিনার" চালু করব। আফ্রিকার তেল ও সম্পদ এই সোনা-সমর্থিত মুদ্রায় বিক্রি হবে। ডলারের উপর নির্ভরতা শেষ।
এই পরিকল্পনা সফল হলে আফ্রিকার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ আমেরিকার ডলার ব্যবস্থার বাইরে চলে যেত।
২০১১ সালে ন্যাটো বাহিনীর সহায়তায় গাদ্দাফি সরকারের পতন হলো। গাদ্দাফি নিহত হলেন। গোল্ড দিনার পরিকল্পনা চিরতরে শেষ।
এই ঘটনাগুলো থেকে যে বার্তা বের হয় তা হলো — পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা আমেরিকার কাছে একটি অস্তিত্বের হুমকি। এবং সেই হুমকির মোকাবেলায় আমেরিকা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
২০১৬ সালে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন
দীর্ঘ ৪২ বছর এই চুক্তির বিস্তারিত জানাশোনা ছিল না। ২০১৬ সালে ব্লুমবার্গ নিউজের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথমবার গোপনীয়তা মুক্ত নথির ভিত্তিতে এই চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশিত হলো।
প্রতিবেদনে জানা গেল — আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগ বিশেষ ব্যবস্থায় সৌদি আরবের ট্রেজারি বন্ড হোল্ডিং আলাদাভাবে গোপন রেখেছিল। অন্য সব দেশের হোল্ডিং প্রকাশ করা হতো, কিন্তু সৌদি আরবের তথ্য ৪০ বছর ধরে গোপন ছিল।
এই প্রতিবেদনের পর নিশ্চিত হলো — পেট্রোডলার চুক্তি শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়, এটি একটি বাস্তব ব্যবস্থা যা চার দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থার মূলে কাজ করে আসছে।
পেট্রোডলারের ভবিষ্যৎ: চ্যালেঞ্জ আসছে
পেট্রোডলার ব্যবস্থা এখন চাপে আছে। চীন তেল বিক্রিতে ইউয়ান ব্যবহারের জন্য চাপ দিচ্ছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব চীনের সাথে কিছু তেল লেনদেন ইউয়ানে করেছে। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর তেল বিক্রি করছে রুবল ও ইউয়ানে।
কিন্তু পেট্রোডলার ব্যবস্থা এখনো শক্তিশালী। কারণ ডলারের বিকল্প হিসেবে এমন কোনো মুদ্রা নেই যার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ডলারের সমান।
তবে ইতিহাস বলে — যে ব্যবস্থাগুলো অপরিবর্তনীয় মনে হয়, সেগুলোও একদিন বদলায়। ব্রেটন উডসও একসময় অপরিবর্তনীয় মনে হয়েছিল।
পেট্রোডলার ব্যবস্থা বদলালে আমেরিকার "exorbitant privilege" শেষ হবে। সেটা হবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন — যার প্রভাব পড়বে ঢাকার বাজার থেকে নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট পর্যন্ত।
ইরান বিপ্লব ও দ্বিতীয় তেল সংকট (১৯৭৯)
প্রেক্ষাপট: শাহের পতনের বীজ কোথায় ছিল
১৯৫৩ সালের CIA অভ্যুত্থানের পর থেকে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী ইরানে একচেটিয়া ক্ষমতায় ছিলেন। তেলের বিশাল আয় দিয়ে তিনি দেশকে আধুনিক করার চেষ্টা করলেন — "শ্বেত বিপ্লব" নামে একটি সংস্কার কর্মসূচি চালু করলেন। নারীদের ভোটাধিকার দিলেন, জমি বিতরণ করলেন, শিল্পায়নে বিনিয়োগ করলেন।
কিন্তু একইসাথে তাঁর গোপন পুলিশ SAVAK বিরোধীদের নির্যাতন করছিল, কারাগারে পুরছিল। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না। যে আধুনিকায়ন হচ্ছিল তার সুফল যাচ্ছিল মূলত অভিজাত শ্রেণির কাছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষত ধর্মপরায়ণ মুসলিমরা অনুভব করছিলেন শাহ তাদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয় মুছে দিতে চাইছেন।
তেলের দাম ১৯৭৩ সালে চারগুণ হওয়ার পর ইরানের হঠাৎ বিশাল আয় এলো। কিন্তু এই অর্থ সুষমভাবে বিতরণ না হয়ে কেন্দ্রীভূত হলো। মূল্যস্ফীতি বাড়ল। বৈষম্য বাড়ল। শাহের পরিবার ও ঘনিষ্ঠরা অবিশ্বাস্য ধনী হলো। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে লাগল।
এই পরিস্থিতিতে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি হয়ে উঠলেন প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর। ইরাক ও ফ্রান্সে নির্বাসনে থেকেও ক্যাসেট টেপে রেকর্ড করা বার্তায় লক্ষ লক্ষ ইরানিকে উদ্বুদ্ধ করছিলেন।
বিপ্লবের পথে: ১৯৭৭-৭৮
১৯৭৭ সালের শেষ দিক থেকে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হলো। শুরুতে ছোট ছোট প্রতিবাদ, তারপর ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।
১৯৭৮ সালে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে। শাহ দমন করার চেষ্টা করলেন। সেপ্টেম্বরে তেহরানের জালেহ স্কোয়ারে বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালানো হলো — শত শত মানুষ নিহত হলো। এই ঘটনা "ব্ল্যাক ফ্রাইডে" নামে পরিচিত।
কিন্তু দমন আরও বেশি মানুষকে রাস্তায় নামাল।
তেল শিল্পের শ্রমিকরা ধর্মঘটে গেলেন। ইরানের তেল উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল। বিশ্ববাজারে উদ্বেগ তৈরি হলো।
শাহের পলায়ন ও খোমেইনির প্রত্যাবর্তন
১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি শাহ পাহলভী "চিকিৎসার জন্য বিদেশ" যাচ্ছেন বলে ইরান ছেড়ে চলে গেলেন। আর কখনো ফেরেননি।
তেহরানে মানুষ রাস্তায় নামল উৎসবে। গাড়ির হর্ন বাজছে, মিষ্টি বিতরণ হচ্ছে।
১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯। প্যারিস থেকে বিমানে ফিরলেন আয়াতুল্লাহ খোমেইনি। বিমানবন্দরে লক্ষাধিক মানুষ তাঁকে স্বাগত জানাতে এসেছে। বিমান থেকে নামার পর সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলেন — ইরানে ফিরে কেমন লাগছে?
খোমেইনি বললেন — "হিচ" — ফার্সিতে যার অর্থ "কিছুই না।"
এই একটি শব্দ পরে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তাঁর সমর্থকরা বলেছেন তিনি বুঝিয়েছিলেন দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সমালোচকরা বলেছেন এটা ছিল ইরানের মানুষের প্রতি তাঁর উদাসীনতার প্রকাশ।
১১ ফেব্রুয়ারি ইসলামিক বিপ্লব সম্পূর্ণ হলো। রাজতন্ত্রের পতন, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের জন্ম।
তেলের বাজারে বিপ্লবের ধাক্কা
বিপ্লব শুরু হওয়ার আগে থেকেই তেল শ্রমিকদের ধর্মঘটে ইরানের উৎপাদন কমে আসছিল। বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো।
IEA-এর তথ্যমতে বিপ্লবের আগে ইরান উৎপাদন করত প্রতিদিন প্রায় ৬ মিলিয়ন ব্যারেল। বিপ্লবের পরে সেটা নেমে আসে মাত্র ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেলে। বিশ্ববাজারে হঠাৎ প্রতিদিন ৪.৫ মিলিয়ন ব্যারেলের ঘাটতি।
কিন্তু এই পরিমাণ মোট বৈশ্বিক উৎপাদনের মাত্র ৪-৫%। তাহলে দাম এত বাড়ল কেন?
কারণ ছিল আতঙ্ক। ১৯৭৩ সালের স্মৃতি তখনো তাজা। ব্যবসায়ীরা, সরকারগুলো সবাই আগেভাগে তেল মজুদ করতে শুরু করল। এই মজুদের হিড়িকই দাম আরও বাড়িয়ে দিল।
তেলের দামের যাত্রা ছিল নাটকীয়।
| সময়কাল | তেলের দাম | পরিবর্তন |
| ১৯৭৮ সালের শুরু | ব্যারেল প্রতি $১৩ | স্বাভাবিক |
| ১৯৭৯ সালের শুরু | $১৫-১৬ | সামান্য বৃদ্ধি |
| ১৯৭৯ মাঝামাঝি | $২০-২৫ | দ্রুত বৃদ্ধি |
| ১৯৮০ সালে | $৩৫-৩৯.৫ | সর্বোচ্চে |
মাত্র দুই বছরে তেলের দাম বাড়ল প্রায় ১৭০%। এটা ছিল ইতিহাসের দ্বিতীয় বড় তেল সংকট।
আমেরিকায় দ্বিতীয় ধাক্কা
আমেরিকা তখনো ১৯৭৩ সালের ধাক্কা পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে আবার তেল সংকট।
পেট্রোল স্টেশনে আবার লম্বা লাইন। অনেক রাজ্যে আবার বিজোড়-জোড় রেশনিং চালু হলো।
এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ১৯৭৯ সালের ১৫ জুলাই একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন — "Crisis of Confidence" বক্তৃতা। পরে এই ভাষণ "মেলেজ স্পিচ" নামে পরিচিত হয়।
কার্টার বললেন — "আমরা একটি আত্মার সংকটের মুখোমুখি। আমেরিকান মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। এই সংকট তেল সংকটের চেয়েও গভীর।"
তিনি আমেরিকানদের কম গাড়ি চালাতে, সোলার প্যানেল ব্যবহার করতে এবং শক্তি সাশ্রয়ের কথা বললেন। হোয়াইট হাউসের ছাদে তিনি সোলার প্যানেল লাগিয়েছিলেন।
কিন্তু আমেরিকানরা এই বার্তা পছন্দ করল না। ১৯৮০ সালের নির্বাচনে কার্টার রোনাল্ড রিগানের কাছে বড় ব্যবধানে হারলেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধ: আগুনে ঘি
বিপ্লবের মাত্র দেড় বছর পরে ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ইরানে আক্রমণ করলেন।
সাদ্দামের হিসাব ছিল সহজ — ইরান এখন দুর্বল। বিপ্লবের পর সেনাবাহিনী এলোমেলো। শাহের আমলের অনেক অফিসারকে মেরে ফেলা হয়েছে বা পালিয়ে গেছেন। এই সুযোগে ইরানের তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশ দখল করা যাবে।
কিন্তু সাদ্দামের হিসাব ভুল ছিল। ইরানিরা দেশ রক্ষায় অসাধারণ প্রতিরোধ গড়ল। বিপ্লবের জোশে সাধারণ মানুষও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
যুদ্ধ চলল ৮ বছর — ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮।
দুটো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলও বিপদে পড়ল — ইরান ও ইরাক উভয়ই তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালাতে লাগল।
এই "ট্যাংকার যুদ্ধ" চলল ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত। এই সময়ে পারস্য উপসাগরে ৫০০-এরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হয়েছিল।
আমেরিকার মাঠে নামা: কার্টার ডকট্রিন
এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট কার্টার ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে কংগ্রেসে একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য দিলেন। সেই বক্তব্যে তিনি ঘোষণা করলেন — পারস্য উপসাগরের তেল সরবরাহ বিঘ্নিত করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে আমেরিকা তার জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে বিবেচনা করবে।
বক্তব্যের সেই অংশটি ছিল এরকম —
"যেকোনো বহিরাগত শক্তি যদি পারস্য উপসাগর অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করে, সেটাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জীবনস্বার্থের উপর আঘাত হিসেবে গণ্য করা হবে। এবং এই ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করতে আমরা সামরিক শক্তি সহ সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।"
এই ঘোষণাটি ইতিহাসে "কার্টার ডকট্রিন" নামে পরিচিত হলো।
এর অর্থ কী ছিল সহজ ভাষায় — পারস্য উপসাগরের তেল আমেরিকার জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এটা রক্ষা করতে সামরিক বল প্রয়োগ করতেও আমেরিকা পিছপা হবে না।
কার্টার ডকট্রিনের বাস্তব প্রয়োগ হলো পরবর্তী দশ বছরে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর মাধ্যমে। "Rapid Deployment Force" গঠিত হলো — যা পরবর্তীতে "Central Command" বা CENTCOM-এ পরিণত হলো। আজও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতির ভিত্তি এই CENTCOM।
আমেরিকার দ্বিমুখী নীতি: ইরাককে সাহায্য
এই যুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান ছিল অত্যন্ত জটিল এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
আমেরিকা ইরানকে পছন্দ করছিল না — কারণ বিপ্লবীরা আমেরিকার দূতাবাস দখল করে ৪৪৪ দিন ৫২ জন কূটনীতিককে জিম্মি রেখেছিল। এটা ছিল চরম অপমানজনক।
তাই আমেরিকা চাইল ইরান এই যুদ্ধে দুর্বল হোক। সাদ্দামের ইরাককে গোপনে সাহায্য করা শুরু হলো। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা আর্কাইভ থেকে পরে জানা গেছে — আমেরিকা ইরাককে স্যাটেলাইট ইন্টেলিজেন্স দিচ্ছিল, অর্থ দিচ্ছিল এবং কিছু সামরিক সরঞ্জামও দিচ্ছিল।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো — সাদ্দাম ১৯৮৮ সালে কুর্দি জনগোষ্ঠীর উপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করল, হালাবজায় হাজার হাজার মানুষ মারা গেল। পরবর্তীতে তদন্তে বেরিয়ে আসে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে সরবরাহ করা রাসায়নিকের সাহায্যে এই অস্ত্র তৈরি হয়েছিল।
এই একই সাদ্দামকে মাত্র ১৫ বছর পরে ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে আক্রমণ করবে আমেরিকা — এই বৈপরীত্য ইতিহাসের অন্যতম বড় কূটনৈতিক পরিহাস।
দ্বিতীয় তেল সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
১৯৭৯-৮০ সালের তেল সংকটের প্রভাব ছিল বহুমাত্রিক।
অর্থনৈতিক দিক থেকে মুদ্রাস্ফীতি আবার বেড়ে গেল পশ্চিমে। আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান পল ভলকার সুদের হার অবিশ্বাস্য রকম বাড়িয়ে দিলেন — একসময় ২০%-এরও উপরে উঠল। এতে মুদ্রাস্ফীতি কমল ঠিকই, কিন্তু ১৯৮১-৮২ সালে তীব্র মন্দা দেখা দিল।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির উপর বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়ল। জাপানি ছোট গাড়ি আমেরিকান বাজার দখল করল। গাড়ির জ্বালানি দক্ষতা মান আইন করে বাধ্যতামূলক হলো।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি স্থায়ী রূপ নিল। কার্টার ডকট্রিনের মাধ্যমে পারস্য উপসাগর হয়ে গেল কার্যত "আমেরিকার স্বার্থ সংরক্ষিত এলাকা"।
আর ইরানের ক্ষেত্রে বিপ্লবের পর থেকে আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক এমন জায়গায় গেল যেখান থেকে আজ পর্যন্ত সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। এই শত্রুতা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে আজও বিদ্যমান।
উপসাগরীয় যুদ্ধ (১৯৯০-৯১): তেলের জন্য যুদ্ধ, সরাসরি
প্রেক্ষাপট: সাদ্দামের সমস্যা কোথায় ছিল
১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শেষ হলো। আট বছরের যুদ্ধে ইরাক জিততে পারেনি, হারেনিও। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
ইরাক ছিল দেউলিয়াপ্রায়। যুদ্ধের খরচ মেটাতে ইরাক প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিশাল ঋণ নিয়েছিল। শুধু সৌদি আরব ও কুয়েতের কাছেই ঋণ ছিল প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। সৈনিকরা ফিরে এসেছে কিন্তু কাজ নেই। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বেকারত্ব বাড়ছে।
সাদ্দামের এই সংকট থেকে বের হওয়ার একটাই পথ মনে হলো — তেলের দাম বাড়াতে হবে।
তেলের দাম বাড়লে ইরাকের রাজস্ব বাড়বে। ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু সমস্যা হলো কুয়েত।
কুয়েতের বিরুদ্ধে সাদ্দামের অভিযোগ
সাদ্দাম কুয়েতের বিরুদ্ধে দুটো বড় অভিযোগ তুললেন।
প্রথম অভিযোগ — OPEC কোটা লঙ্ঘন। কুয়েত OPEC-নির্ধারিত উৎপাদন কোটার চেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করছে। বাজারে বেশি তেল মানেই দাম কম। সাদ্দাম হিসাব করে দেখালেন — কুয়েতের এই অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১ ডলার কমে যাচ্ছে। ইরাকের মতো তেলনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটা বিশাল ক্ষতি।
দ্বিতীয় অভিযোগ — রুমাইলা তেলক্ষেত্র চুরি। ইরাক-কুয়েত সীমান্তে রুমাইলা নামে একটি বিশাল তেলক্ষেত্র আছে যা দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা। সাদ্দাম দাবি করলেন কুয়েত কৌশলে তাদের অংশের সীমা বাড়িয়ে ইরাকের তেল চুরি করছে। ইরাকের তরফে দাবি করা হলো ২.৪ বিলিয়ন ডলারের তেল চুরি হয়েছে।
কিন্তু এর বাইরেও একটি গভীর আকাঙ্ক্ষা ছিল সাদ্দামের। কুয়েত দখল করলে সমুদ্রে ইরাকের প্রবেশাধিকার বাড়বে। বিশাল তেল মজুদ পাওয়া যাবে। আর সৌদি আরবের হুমকি দিয়ে পুরো OPEC-কে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
আমেরিকার সবুজ সংকেত?
১৯৯০ সালের ২৫ জুলাই সাদ্দাম আমেরিকার রাষ্ট্রদূত অ্যাপ্রিল গ্লাস্পিকে ডেকে পাঠালেন। বৈঠকে সাদ্দাম কুয়েতের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ জানালেন এবং পরিষ্কারভাবে বোঝালেন তিনি কুয়েতের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারেন।
গ্লাস্পি উত্তরে কী বললেন সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। পরে প্রকাশিত ট্রান্সক্রিপ্ট অনুযায়ী তিনি বলেছিলেন — "আমাদের সরকারের আরব-আরব বিরোধে কোনো অবস্থান নেই।"
সাদ্দাম এটাকে আমেরিকার নীরব সম্মতি হিসেবে ব্যাখ্যা করলেন। পরে গ্লাস্পি দাবি করেছেন তাঁর বক্তব্যকে ভুল বোঝা হয়েছে। কিন্তু ওই বৈঠকের মাত্র আট দিন পরে সাদ্দাম কুয়েত আক্রমণ করলেন।
২ আগস্ট ১৯৯০: কুয়েত দখল
১৯৯০ সালের ২ আগস্ট ভোররাতে ইরাকের ট্যাংক ও সৈন্যরা কুয়েত সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়ল। কুয়েতের ছোট্ট সেনাবাহিনী মাত্র কয়েক ঘণ্টা প্রতিরোধ করতে পারল।
কুয়েতের আমির শেখ জাবের আল-সাবাহ সৌদি আরবে পালিয়ে গেলেন। কুয়েত সিটি দখল হলো। ইরাক ঘোষণা করল কুয়েত এখন ইরাকের ১৯তম প্রদেশ।
বিশ্ব হতবাক। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠকে বসল। তাৎক্ষণিক নিন্দা প্রস্তাব পাস হলো।
কিন্তু আসল প্রশ্ন ছিল — শুধু নিন্দায় কি সাদ্দাম থামবে?
তেলের হিসাব: কেন বিশ্ব এত উদ্বিগ্ন হলো
কুয়েত দখলের খবরে বিশ্বের তেলের বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কারণটা সহজ হিসেব।
| দেশ | প্রমাণিত তেল মজুদ (১৯৯০) | বৈশ্বিক অংশ |
| সৌদি আরব | ২৬০ বিলিয়ন ব্যারেল | ২৫% |
| ইরাক | ১০০ বিলিয়ন ব্যারেল | ১০% |
| কুয়েত | ৯৫ বিলিয়ন ব্যারেল | ৯% |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | ৯৮ বিলিয়ন ব্যারেল | ৯% |
আমেরিকার নেতৃত্বে ৩৪ দেশের জোট যুদ্ধে নামে। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরাককে কুয়েত থেকে হটিয়ে দেওয়া হয়। এই যুদ্ধকে অনেক বিশ্লেষক সরাসরি "তেলের যুদ্ধ" বলে অভিহিত করেন।
কুয়েত দখলের মাধ্যমে সাদ্দামের হাতে এলো ইরাক ও কুয়েত মিলিয়ে মোট ১৯৫ বিলিয়ন ব্যারেল — বৈশ্বিক মজুদের প্রায় ১৯%।
এখন সাদ্দামের সৈন্যরা কুয়েত-সৌদি সীমান্তে দাঁড়িয়ে। যদি সৌদি আরবেও ঢোকে, তাহলে এক সাদ্দামের হাতে চলে আসবে বিশ্বের তেল মজুদের ৪৪%।
এটা ছিল আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডিক চেনি কংগ্রেসে বললেন — "আমরা কি এমন একটি বিশ্বে বাস করতে চাই যেখানে সাদ্দাম হোসেন বিশ্বের তেল মজুদের এত বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে?"
উত্তর ছিল স্পষ্ট — না।
অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড: সৌদি রক্ষা
কুয়েত দখলের মাত্র চার দিন পর ৬ আগস্ট মার্কিন সেনাবাহিনী সৌদি আরবে প্রবেশ শুরু করল — "অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড" নামে।
এটা ছিল আমেরিকার সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত বড় মোতায়েন। কয়েক মাসের মধ্যে সৌদি আরবে জমা হলো ৫ লাখেরও বেশি মার্কিন সৈন্য। সাথে ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ ৩২টি দেশের সৈন্য।
মোট জোট বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ।
এত বড় সামরিক জোট গঠন করা সম্ভব হয়েছিল কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন দুর্বল হয়ে পড়ছে — শীতল যুদ্ধ প্রায় শেষ। তাই রাশিয়া আমেরিকার এই উদ্যোগে বাধা দিল না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরাকের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস হলো — এমনকি রাশিয়া ও চীনও ভেটো দিল না।
কূটনীতির ব্যর্থতা ও যুদ্ধের সিদ্ধান্ত
জাতিসংঘ সাদ্দামকে ১৫ জানুয়ারি ১৯৯১-এর মধ্যে কুয়েত ছেড়ে দেওয়ার আলটিমেটাম দিল।
কিন্তু সাদ্দাম পিছু হটলেন না। তিনি হুঁশিয়ারি দিলেন — যুদ্ধ হলে "সকল যুদ্ধের মা" হবে এবং আমেরিকা হাজার হাজার লাশ নিয়ে ফিরে যাবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার জেনেভায় ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারেক আজিজের সাথে আলোচনায় বসলেন। ছয় ঘণ্টার বৈঠক কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হলো।
১৫ জানুয়ারি ডেডলাইন পেরিয়ে গেল।
অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম: ৪২ দিনের বিমান হামলা
১৭ জানুয়ারি ১৯৯১। রাত দুইটায় জোট বাহিনীর বিমান হামলা শুরু হলো। আমেরিকার নতুন প্রযুক্তি দেখল বিশ্ব — স্টেলথ বিমান, লেজার নির্দেশিত বোমা, ক্রুজ মিসাইল। সিএনএন সরাসরি সম্প্রচার করতে লাগল তেহরান থেকে।
টানা ৪২ দিন বিমান হামলা চলল। ইরাকের বায়ুসেনা, রাডার ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সেতু, কারখানা একে একে ধ্বংস হলো।
তারপর স্থলযুদ্ধ শুরু হলো ২৪ ফেব্রুয়ারি। মাত্র ১০০ ঘণ্টা। এতেই ইরাকি বাহিনী সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ল। কুয়েত মুক্ত হলো ২৭ ফেব্রুয়ারি।
পুড়িয়ে দেওয়া তেলকূপ: পরাজয়ের আগুন
পিছু হটার আগে ইরাকি বাহিনী এমন একটা কাজ করল যা পরিবেশগত বিপর্যয়ের নতুন মাত্রা দিল।
কুয়েতের প্রায় ৭৩০টি তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। কুয়েত ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের তথ্যমতে প্রতিদিন ৬০ লক্ষ ব্যারেল তেল জ্বলছিল। কালো ধোঁয়ায় কুয়েতের আকাশ ঢেকে গেল।
বিশ্বের সেরা অগ্নিনির্বাপক দলগুলো কুয়েতে এলো। টেক্সাসের লিজেন্ডারি "রেড অ্যাডায়ার" সহ বিশ্বের নানা দেশের দল। তবু আগুন নেভাতে সময় লাগল প্রায় ৯ মাস।
এই আগুন নেভানোর খরচ ছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। পরিবেশগত ক্ষতি ছিল অপরিমেয়।
যুদ্ধের মানবিক মূল্য
| পক্ষ | মৃত্যু | আহত |
| ইরাকি সামরিক বাহিনী | ২০,০০০-৩৫,০০০ (আনুমানিক) | হাজার হাজার |
| ইরাকি বেসামরিক | ৩,৫০০+ | হাজার হাজার |
| মার্কিন সৈন্য | ২৯২ | ৪৫৭ |
| অন্য জোট সৈন্য | ৯২ | কয়েকশো |
| কুয়েতি নাগরিক | ১,০০০+ | হাজার হাজার |
যুদ্ধের অসম্পূর্ণতা: কেন বাগদাদ পর্যন্ত যাওয়া হলো না
একটা প্রশ্ন অনেকের মনে জাগে — জোট বাহিনী যখন এত শক্তিশালী এবং ইরাকি সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, তখন বাগদাদ পর্যন্ত গিয়ে সাদ্দামকে হটানো হলো না কেন?
প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লু বুশ এবং জেনারেল কোলিন পাওয়েল পরে ব্যাখ্যা করেছেন কারণগুলো। জাতিসংঘের ম্যান্ডেট ছিল শুধু কুয়েত মুক্ত করা, ইরাক দখল নয়। বাগদাদ পর্যন্ত গেলে জোট ভেঙে যেত — আরব দেশগুলো কখনো সমর্থন করত না। ইরাক ভেঙে পড়লে ইরান শক্তিশালী হতো — যেটা আমেরিকা চাইত না।
তাই সাদ্দাম থেকে গেলেন। কিন্তু মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে।
যুদ্ধের পরে তেলের বাজার
যুদ্ধ শেষে কুয়েতের তেল উৎপাদন স্বাভাবিক হতে দেড় বছর লাগল। তেলের দাম যুদ্ধের সময় বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৩০ ডলার পর্যন্ত গিয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হতেই দ্রুত কমে আসে।
কিন্তু এই যুদ্ধ বিশ্বকে একটি স্থায়ী বার্তা দিল। মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হলে আমেরিকা সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে — এটা কার্টার ডকট্রিনের বাস্তব প্রয়োগ।
এই দৃষ্টান্ত পরবর্তী দশকগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
রাশিয়া: ইউরোপকে গ্যাসের ফাঁদে ফেলার কৌশল
সোভিয়েত পতন ও রাশিয়ার নতুন অস্ত্র
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে। কিন্তু রাশিয়ার কাছে ছিল একটি বিশাল সম্পদ — বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ এবং বিশাল তেল মজুদ।
রাশিয়ান ফেডারেল বাজেট অফিসের তথ্যমতে, ২০২১ সালে তেল ও গ্যাস থেকে রাশিয়ার মোট রাজস্বের প্রায় ৪৫% আসত। ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই সম্পদকে সরাসরি কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়।
ইউরোপের নির্ভরতার ফাঁদ
ইউরোপিয়ান কমিশনের তথ্যমতে, ২০২১ সালে ইউরোপ তার প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৪০% রাশিয়া থেকে আমদানি করত। জার্মানি ৫৫%, অস্ট্রিয়া ৮০%, হাঙ্গেরি ৮৫%, বুলগেরিয়া ৯০%+।
| দেশ | রাশিয়ান গ্যাসের উপর নির্ভরতা (২০২১) |
| জার্মানি | ৫৫% |
| ইতালি | ৪৫% |
| অস্ট্রিয়া | ৮০% |
| ফিনল্যান্ড | ৬৭% |
| হাঙ্গেরি | ৮৫% |
| বুলগেরিয়া | ৯০%+ |
রাশিয়া এই নির্ভরতাকে কাজে লাগায় বারবার। ২০০৬ সালে ইউক্রেনের সাথে মূল্য বিরোধে রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় — যার প্রভাব পড়ে পশ্চিম ইউরোপেও। ২০০৯ সালে আবার একই ঘটনা।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও পেট্রো-অস্ত্রের সীমাবদ্ধতা
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ করার পর পশ্চিমা দেশগুলো ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। রাশিয়া পাল্টা ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়।
IEA-এর তথ্যমতে, ২০২২ সালে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম এক বছরে প্রায় ৩০০% বৃদ্ধি পায়। জার্মানিতে অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
কিন্তু এবার ফলাফল ভিন্ন হলো। ইউরোপ এলএনজি আমদানির জন্য আমেরিকা, কাতার ও নরওয়ের দিকে ঘুরল। দ্রুত নতুন এলএনজি টার্মিনাল তৈরি হলো। ইউরোপিয়ান কমিশনের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের শেষে ইউরোপের রাশিয়ান গ্যাসের উপর নির্ভরতা ৪০% থেকে কমে ১৫%-এর নিচে নেমে আসে।
রাশিয়া যে অস্ত্রটি ব্যবহার করতে চেয়েছিল, সেই অস্ত্রটি ব্যবহার করতে গিয়ে সে নিজেই দীর্ঘমেয়াদে তার সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের হারাল।
আমেরিকার শেল বিপ্লব: ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেল
শেল তেল কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
শেল তেল হলো পাথুরে শিলার মধ্যে আটকে থাকা তেল। "হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং" বা ফ্র্যাকিং প্রযুক্তিতে উচ্চচাপে পানি, বালু ও রাসায়নিক পদার্থ পাথরের মধ্যে ঢুকিয়ে পাথর ভেঙে তেল বের করা হয়। ২০০০-এর দশকের আগে এই প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতি এবং তেলের উচ্চমূল্যের কারণে ২০০৮ সাল থেকে আমেরিকায় শেল বিপ্লব শুরু হয়।
শেল বিপ্লবের সংখ্যা
EIA-এর তথ্যমতে: ২০০৮ সালে মার্কিন উৎপাদন ৫.০ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন, ২০১৯ সালে ১২.৯ মিলিয়ন (সর্বকালীন রেকর্ড), ২০২৩ সালে ১৩.২ মিলিয়ন (নতুন রেকর্ড)।
| বছর | মার্কিন তেল উৎপাদন (মিলিয়ন ব্যারেল/দিন) |
| ২০০৮ | ৫.০ |
| ২০১২ | ৬.৫ |
| ২০১৫ | ৯.৪ |
| ২০১৯ | ১২.৯ (সর্বকালীন রেকর্ড) |
| ২০২৩ | ১৩.২ (নতুন রেকর্ড) |
এই উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে আমেরিকা ২০১৯ সালে সৌদি আরব ও রাশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব
শেল বিপ্লবের ভূরাজনৈতিক পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর আমেরিকার কৌশলগত নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
২০১৪ সালে তেলের দাম দ্রুত পড়তে শুরু করলে সৌদি আরব কৌশলগতভাবে উৎপাদন না কমিয়ে দাম আরও পড়তে দেয় — উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার শেল কোম্পানিগুলো লোকসানে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ শেল তেলের খরচ ব্যারেল প্রতি ৫০-৬০ ডলার ছিল, যেখানে সৌদি তেলের খরচ মাত্র ৫-১০ ডলার।
কিন্তু আমেরিকান শেল কোম্পানিগুলো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে টিকে থাকে। ২০১৬ সালের মধ্যে শেল তেলের উৎপাদন খরচ ব্যারেল প্রতি ৩০-৪০ ডলারে নেমে আসে।
চীন: নতুন তেলের খেলোয়াড়
চীনের বিশাল তেল চাহিদা
IEA-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে চীন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করেছে — যা বিশ্বের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৫%। চীনের নিজের তেল উৎপাদন চাহিদার মাত্র ৩০% মেটাতে পারে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ও তেলের নিরাপত্তা
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) শুধু বাণিজ্য পথ নয় — এটি মূলত শক্তি সরবরাহ নিরাপত্তার একটি বৈশ্বিক কৌশল।
পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দর থেকে শুরু হওয়া চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরাসরি চীনে নিয়ে আসার একটি বিকল্প পথ তৈরি করছে — মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে। কারণ মালাক্কা প্রণালি দিয়ে চীনের ৮০% তেল আসে, এবং এই প্রণালি মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে — এটিকে চীন "মালাক্কা দিলেমা" বলে।
পেট্রো-ইউয়ান: ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ
২০১৮ সালে সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এক্সচেঞ্জ (INE) চালু হয় — যেখানে ইউয়ানে তেলের ফিউচার ট্রেডিং শুরু হয়। ২০২৩ সালে চীন ও সৌদি আরবের মধ্যে কিছু পরিমাণ তেল ইউয়ানে কেনার চুক্তি সম্পন্ন হয়।
২০২৩ সালে তেল বাণিজ্যে ডলারের অংশ ৮০%+, ইউরো প্রায় ১০%, ইউয়ান ও অন্যান্য ১০% বা কম। পেট্রো-ইউয়ানের পথ এখনও দীর্ঘ, কিন্তু এই প্রবণতা পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে চাপে ফেলছে।
| তেল বাণিজ্যের মুদ্রা | অংশ (২০২৩ আনুমানিক) |
| মার্কিন ডলার | ৮০%+ |
| ইউরো | ১০% প্রায় |
| ইউয়ান ও অন্যান্য | ১০% বা কম |
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনীতি
২০২৩ সালের মার্চে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান — যারা সাত বছর ধরে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন রেখেছিল — তারা পুনরায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। মধ্যপ্রাচ্যে এই ধরনের কূটনৈতিক ভূমিকা আগে শুধু আমেরিকাই পালন করত।
বাংলাদেশ ও তেলের ভূরাজনীতি: দূরের আগুন, কাছের উত্তাপ
বাংলাদেশ একটি তেল আমদানিনির্ভর দেশ। BPC-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশ প্রতিবছর ৬-৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন পরিশোধিত তেল পণ্য আমদানি করে, যার প্রায় পুরোটাই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
২০২২ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম ৫০% বৃদ্ধি। ২০২৩ লোহিত সাগর সংকটে শিপিং খরচ বৃদ্ধি ও পণ্যমূল্যে প্রভাব।
| ঘটনা | বাংলাদেশে প্রভাব |
| ২০২২ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ | জ্বালানি তেলের দাম ৫০% বৃদ্ধি |
| ২০২২ তেল দাম বৃদ্ধি | বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে চাপ, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি |
| ২০২৩ লোহিত সাগর সংকট | শিপিং খরচ বৃদ্ধি, পণ্যমূল্যে প্রভাব |
মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি সমস্যা তৈরি করে। কারণ বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় অংশও আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তাই তেলের ভূরাজনীতি বাংলাদেশের কাছে কেবল বইয়ের বিষয় নয় — এটি সরাসরি ঢাকার বাজারের দ্রব্যমূল্য এবং লক্ষ লক্ষ প্রবাসী পরিবারের জীবনকে প্রভাবিত করে।
নবায়নযোগ্য শক্তির যুগ: তেলের শেষ কি আসছে?
শক্তি পরিবর্তনের গতি
IEA-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে তারপর কমতে শুরু করবে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী ১ কোটি ছাড়িয়েছে — যা মোট গাড়ি বিক্রির প্রায় ১৪%।
| শক্তি উৎস | ২০১০ | ২০২৩ | ২০৩০ (প্রক্ষেপণ) |
| তেল (বৈশ্বিক চাহিদায় অংশ) | ৩৩% | ৩১% | ২৮% (আনুমানিক) |
| সৌরশক্তি (বৈশ্বিক বিদ্যুতে অংশ) | ০.১% | ৫% | ১৫%+ |
| বায়ুশক্তি | ০.৫% | ৭% | ১৫%+ |
তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো কী করছে?
বুদ্ধিমান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এই বাস্তবতা বুঝতে পেরে নিজেদের অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় করছে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনায় পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনোদন ও নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। আরব আমিরাত মাসদার সিটির মতো সোলার এনার্জি প্রকল্পে বিশ্বনেতায় পরিণত হচ্ছে।
নতুন ভূরাজনীতি: লিথিয়ামের যুদ্ধ
তেলের যুগ শেষ হলেই ভূরাজনৈতিক লড়াই শেষ হবে না। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারির জন্য লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের মতো খনিজের চাহিদা বাড়ছে। এই খনিজগুলো মূলত আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় পাওয়া যায়।
IEA-এর তথ্যমতে, ২০৪০ সালের মধ্যে লিথিয়ামের চাহিদা ২০২০ সালের তুলনায় ৪০ গুণ বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের তেল হবে লিথিয়াম — এবং তাকে ঘিরেও জন্ম নিচ্ছে নতুন ভূরাজনীতি।
উপসংহার
১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ থেকে ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পর্যন্ত — গত পঞ্চাশ বছরে তেল বারবার প্রমাণ করেছে যে এটি শুধু একটি পণ্য নয়, এটি একটি ভূরাজনৈতিক অস্ত্র। যে দেশ তেল নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে বৈশ্বিক মঞ্চে ক্ষমতায় থেকেছে। যে দেশ তেলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, সে সেই নির্ভরতার মাশুল দিয়েছে — কখনো অর্থনৈতিকভাবে, কখনো সামরিকভাবে।
নবায়নযোগ্য শক্তির যুগ আসছে — এবং তেলের ভূমিকা ধীরে ধীরে কমবে। কিন্তু শক্তির উৎসের উপর নিয়ন্ত্রণের লড়াই থামবে না। তেলের জায়গায় আসবে লিথিয়াম, সৌরশক্তি, হাইড্রোজেন। বদলে যাবে খেলোয়াড়, কিন্তু খেলার নিয়ম একই থাকবে — যে শক্তির উৎস নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই বিশ্বের মঞ্চে সবচেয়ে শক্তিশালী।









