GeoRenus Editorial Team

বিশ্বের ইতিহাসে এমন কোনো পণ্য নেই যার জন্য এত মানুষের রক্ত ঝরেছে যতটা ঝরেছে তেলের জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ভেনেজুয়েলা ও ইরান সংকট পর্যন্ত — তেলকে ঘিরে যে রক্তাক্ত ইতিহাস তৈরি হয়েছে তার পূর্ণ চিত্র এই লেখায় তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৪৪ সাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি গোপন নথিতে লেখা ছিল —
"সৌদি আরবের তেল হলো পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বস্তুগত পুরস্কার এবং সবচেয়ে বড় ক্ষমতার উৎস।"
সেই একটি বাক্য পরবর্তী ৮০ বছরের বৈশ্বিক রাজনীতির সারসংক্ষেপ।
তেলকে ঘিরে যুদ্ধের ইতিহাস পড়লে একটা প্যাটার্ন বারবার চোখে পড়ে। বড় শক্তিগুলো কখনো সরাসরি বলে না যে তারা তেলের জন্য যুদ্ধ করছে। তারা বলে "গণতন্ত্র রক্ষার জন্য", "গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিরুদ্ধে", "সন্ত্রাসবাদ দমনে"। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় — যেখানে যুদ্ধ হয়েছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই মাটির নিচে তেল আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে জার্মানির একটি বিশাল সামরিক দুর্বলতা ছিল — দেশে নিজের কোনো তেল নেই। জার্মানির তেলের চাহিদার বেশিরভাগ আসত রোমানিয়ার প্লোয়েস্তি তেলক্ষেত্র থেকে এবং কৃত্রিম তেল তৈরির মাধ্যমে।
হিটলার বুঝেছিলেন — দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চালাতে হলে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দরকার। সোভিয়েত ইউনিয়নের বাকু (আধুনিক আজারবাইজান) তেলক্ষেত্র ছিল ইউরোপের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদন কেন্দ্র।
মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড ওভেরির গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৪১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে জার্মান আক্রমণের (অপারেশন বার্বারোসা) অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বাকুর তেলক্ষেত্র দখল করা।
১৯৪২ সালে হিটলার "কেস ব্লু" বা "অপারেশন ব্লু" পরিচালনা করেন — যার মূল লক্ষ্য ছিল ককেশাসের তেলক্ষেত্র দখল। স্তালিনগ্রাদ ছিল সেই পথের একটি মূল পয়েন্ট।
| জার্মানির তেলের উৎস (১৯৪২) | পরিমাণ |
| রোমানিয়ার প্লোয়েস্তি | ৫২% |
| কৃত্রিম তেল (কয়লা থেকে) | ৩৬% |
| অন্যান্য | ১২% |
স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে জার্মানির পরাজয় (১৯৪২-৪৩) মূলত বাকুর তেলক্ষেত্রে পৌঁছানোর স্বপ্নও ধুলিসাৎ করে দেয়। এরপর থেকে জার্মানির তেল সংকট ক্রমশ তীব্র হতে থাকে।
মার্কিন সামরিক ইতিহাসবিদ ডেভিড গ্লান্টজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৪৪ সালের শেষ দিকে জার্মান বিমানবাহিনীর (Luftwaffe) পাইলটরা প্রশিক্ষিত ছিলেন কিন্তু জ্বালানির অভাবে তাদের বিমান মাটিতেই পড়ে থাকত। এই তেল সংকট সরাসরি জার্মানির যুদ্ধ হারার কারণ হয়েছিল।
জাপানের ক্ষেত্রেও তেল ছিল যুদ্ধের কেন্দ্রীয় বিষয়। ১৯৪১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানে তেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। কারণ ছিল চীনে জাপানের আগ্রাসন।
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা আর্কাইভের তথ্যমতে, অবরোধের সময় জাপানের তেলের মজুদ ছিল মাত্র ১৮ মাসের। জাপানি সামরিক নেতৃত্ব হিসাব করে দেখল — হয় তারা চীন থেকে সরে আসবে (যা রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব ছিল), অথবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেলক্ষেত্র দখল করবে।
ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) ছিল তখন এশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী — প্রতিদিন প্রায় ৬৫ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন হত। জাপান সেই তেল পেতে চাইলে আমেরিকার সাথে সংঘাত অনিবার্য ছিল।
১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবার আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবাহিনীকে অকার্যকর করে দেওয়া, যাতে জাপান নিরাপদে দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রা চালাতে পারে এবং ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের তেলক্ষেত্র দখল করতে পারে।
এই ঘটনার বিস্তারিত পর্ব-১-এ এসেছিল, তবে এর রক্তাক্ত পরিণতির পূর্ণ চিত্র এখানে তুলে ধরা দরকার।
মোসাদ্দেগকে সরানোর পর শাহ পাহলভী ক্ষমতায় আসেন এবং তার গোপন পুলিশ SAVAK দিয়ে বছরের পর বছর বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ১৯৭৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে তখন বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক বন্দী ছিল।
এই দমননীতির প্রতিক্রিয়াতেই ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব এত ব্যাপক জনসমর্থন পায়। আর সেই বিপ্লব থেকেই জন্ম নেয় আমেরিকা-ইরানের দীর্ঘ শত্রুতা — যা আজও মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার কারণ।
একটি CIA অভ্যুত্থানের মূল্য দিতে হয়েছে দশকের পর দশক ধরে, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন দিয়ে।
১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইরানে আক্রমণ করেন। সরকারি কারণ ছিল সীমান্ত বিরোধ ও শাত আল-আরব জলপথের নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এর পেছনে ছিল আরও গভীর হিসাব।
ইরানের বিপ্লব সবে হয়েছে, সেনাবাহিনী বিশৃঙ্খল। সাদ্দাম ভেবেছিলেন এই সুযোগে খুজেস্তান প্রদেশ দখল করা যাবে। খুজেস্তান ছিল ইরানের তেল উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র — ইরানের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৮০% আসত এই প্রদেশ থেকে।
এই যুদ্ধে আমেরিকা, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সবাই কোনো না কোনোভাবে ইরাককে সমর্থন করেছে। কারণ ছিল সহজ — ইরানের ইসলামিক বিপ্লব তেলের ধারাবাহিক সরবরাহের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা আর্কাইভ থেকে ডিক্লাসিফাইড নথি অনুযায়ী, আমেরিকা ইরাককে স্যাটেলাইট ইন্টেলিজেন্স, অর্থ সহায়তা এবং রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির উপকরণ সরবরাহ করেছে। ১৯৮৮ সালে হালাবজায় কুর্দি জনগোষ্ঠীর উপর সাদ্দামের রাসায়নিক হামলায় প্রায় ৫,০০০ মানুষ নিহত হয় — সেই রাসায়নিক অস্ত্র তৈরিতে পশ্চিমা সহায়তার ভূমিকা নিয়ে পরে তদন্ত হয়েছে।
| ইরান-ইরাক যুদ্ধের মানবিক মূল্য | |
| মোট নিহত (উভয় পক্ষ) | আনুমানিক ৫-১০ লক্ষ |
| আহত | ১৭-২০ লক্ষ |
| শরণার্থী | ১৮ লক্ষ+ |
| অর্থনৈতিক ক্ষতি (দুই দেশ মিলে) | ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার (আনুমানিক) |
| যুদ্ধকাল | ৮ বছর (১৯৮০-১৯৮৮) |
৮ বছরের এই যুদ্ধ দুটো দেশকেই পঙ্গু করে দেয়। কিন্তু পশ্চিমা তেল কোম্পানি ও সরকারগুলোর কাছে এই যুদ্ধ ছিল উপকারী — কারণ এতে ইরান ও ইরাক উভয়ই দুর্বল থাকল, কোনো একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি তেলের উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারল না।
এই যুদ্ধকে "সবচেয়ে সৎ" বলার কারণ হলো — এখানে তেলের স্বার্থটা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে অনেক মার্কিন কর্মকর্তা নিজেরাই প্রায় স্বীকার করে ফেলেছিলেন।
তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডিক চেনি ১৯৯০ সালে কংগ্রেসে বলেছিলেন — "আমরা কি এমন একটি বিশ্বে বাস করতে চাই যেখানে সাদ্দাম হোসেন বিশ্বের তেল মজুদের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে?"
কুয়েত দখলের মাধ্যমে সাদ্দাম একসাথে পেয়ে যান ইরাক ও কুয়েত মিলিয়ে বিশ্বের প্রমাণিত তেল মজুদের প্রায় ১৯%। যদি সৌদি আরবও তার নাগালে আসত, তাহলে মোট ৪৫% নাগালে আসত।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ১৯৯১ সালের একটি বিতর্কে তৎকালীন সাংসদ টনি বেন সরাসরি বলেছিলেন — "এই যুদ্ধ তেলের জন্য।" পরবর্তীতে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিনস্প্যান তার ২০০৭ সালের আত্মজীবনীতে লিখেছেন — "সবাই জানে উপসাগরীয় যুদ্ধ মূলত তেলের জন্য ছিল।"
যুদ্ধে মোট মৃতের সংখ্যা:
| পক্ষ | আনুমানিক মৃত্যু |
| ইরাকি সামরিক বাহিনী | ২০,০০০-৩৫,০০০ |
| ইরাকি বেসামরিক নাগরিক | ৩,৫০০+ |
| জোটবাহিনী | ২৯২ |
| কুয়েতি নাগরিক | ১,০০০+ |
পরাজয় নিশ্চিত জেনে পিছু হটার সময় ইরাকি বাহিনী কুয়েতের প্রায় ৭০০টি তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। কুয়েত ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের তথ্যমতে, এই আগুন নেভাতে সময় লেগেছিল প্রায় ৮ মাস এবং প্রতিদিন প্রায় ৬০ লক্ষ ব্যারেল তেল পুড়ে যাচ্ছিল। পরিবেশগত ক্ষতি ছিল ভয়াবহ — কুয়েতের আকাশ মাসের পর মাস কালো ধোঁয়ায় ঢাকা ছিল।
২০০৩ সালের ২০ মার্চ আমেরিকা ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে জোটবাহিনী ইরাকে আক্রমণ করে। সরকারিভাবে কারণ ছিল — সাদ্দামের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এবং আল-কায়েদার সাথে তার সংযোগ আছে।
পরে প্রমাণিত হয়েছে — গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না। আল-কায়েদার সাথে সংযোগও প্রমাণিত হয়নি।
তাহলে কি তেল ছিল আসল কারণ?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে। কিন্তু কিছু তথ্য লক্ষণীয়:
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA)-এর তথ্যমতে, ইরাকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রমাণিত তেল মজুদ আছে — প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ব্যারেল। যুদ্ধের আগে ইরাক তার তেল বিক্রি করছিল ইউরোতে, ডলারে নয়। যুদ্ধের পর ইরাকের তেল বিক্রি আবার ডলারে ফিরে আসে।
সাবেক মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিনস্প্যান তার ২০০৭ সালের আত্মজীবনী "দ্য এজ অব টার্বুলেন্স"-এ লিখেছেন — "ইরাক যুদ্ধ মূলত তেলের জন্য ছিল এটা স্বীকার করা রাজনৈতিকভাবে অসুবিধাজনক।"
ইরাক যুদ্ধের মানবিক মূল্য ছিল ভয়াবহ।
| ইরাক যুদ্ধের মানবিক মূল্য | তথ্যসূত্র |
| ইরাকি বেসামরিক মৃত্যু | ১,৫১,০০০ — ৬,০০,০০০+ (Iraq Body Count / Lancet Study) |
| মার্কিন সৈনিক মৃত্যু | ৪,৪৩১ |
| জোট সৈনিক মৃত্যু | ৩১৮ |
| অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত | ২৭ লক্ষ+ |
| বাইরে পালানো শরণার্থী | ২০ লক্ষ+ |
| যুদ্ধের মোট খরচ (আমেরিকার) | ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার (Brown University গবেষণা) |
ইরাক যুদ্ধের পর দেশটিতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তা থেকেই পরবর্তীতে ISIS-এর উত্থান ঘটে — যা আরও লক্ষাধিক মানুষের জীবন কেড়ে নেয়।
২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউয়ে লিবিয়ায় গাদ্দাফিবিরোধী বিদ্রোহ শুরু হয়। ন্যাটো বাহিনী "বেসামরিক নাগরিক রক্ষার" নামে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
লিবিয়া আফ্রিকার সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদের দেশ — US EIA-এর তথ্যমতে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ব্যারেল। গাদ্দাফি তার শেষ বছরগুলোতে আফ্রিকান দেশগুলোকে একটি সোনা-সমর্থিত মুদ্রা "গোল্ড দিনার" চালু করার এবং তেল বিক্রিতে ডলারের পরিবর্তে এই মুদ্রা ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছিলেন।
২০১১ সালে হিলারি ক্লিনটনের ইমেইল যখন পরবর্তীতে ফাঁস হয়, তখন দেখা যায় তার একজন উপদেষ্টা লিখেছিলেন — গাদ্দাফির সোনার রিজার্ভ ও তেল বাণিজ্যের ডলারবিরোধী পরিকল্পনা পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগের কারণ ছিল।
গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া আজও গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। দেশটি কার্যত দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারে বিভক্ত — এবং তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু।
নাইজেরিয়া আফ্রিকার বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। ১৯৫৮ সালে নাইজার ডেল্টায় তেল আবিষ্কারের পর থেকে দেশটি তেল রপ্তানিতে ট্রিলিয়ন ডলার আয় করেছে। কিন্তু সেই অর্থ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি।
OPEC-এর তথ্যমতে, নাইজেরিয়া ২০২২ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১.৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে। অথচ বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, নাইজেরিয়ার ৬০%-এরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।
নাইজার ডেল্টায় তেলের পাইপলাইন ও উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্র করে দশকের পর দশক সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।
নাইজেরিয়ার তেলের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায় হলো কেন-সারো-উইওয়ার গল্প।
অগোনি জাতিগোষ্ঠীর নেতা ও লেখক কেন-সারো-উইওয়া ১৯৯০-এর দশকে শেল অয়েলের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন — অগোনিল্যান্ডে তেল উত্তোলনে পরিবেশ দূষণ ও স্থানীয় মানুষের ন্যায্য ভাগ না পাওয়ার প্রতিবাদে। আন্তর্জাতিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ১৯৯৫ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন সামরিক সরকার তাকে আটজন সহযোগীসহ ফাঁসি দেয় — বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ উপেক্ষা করে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ ছিল, শেল অয়েল নাইজেরিয়ার সামরিক সরকারের সাথে যোগসাজশ করেছিল। ২০০৯ সালে শেল অয়েল কেন-সারো-উইওয়ার পরিবারের সাথে ১৫.৫ মিলিয়ন ডলারের মীমাংসায় রাজি হয় — কিন্তু কোনো দায় স্বীকার করেনি।
২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু এই বিভাজনের পেছনে ধর্মীয় ও জাতিগত কারণের পাশাপাশি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কারণ — তেল।
US EIA-এর তথ্যমতে, বিভাজনের পর সুদানের মোট তেল মজুদের প্রায় ৭৫% চলে যায় দক্ষিণ সুদানে। কিন্তু তেল রপ্তানির পাইপলাইন চলে উত্তর সুদানের মধ্য দিয়ে।
ফলে স্বাধীনতার পরেও দুই দেশের মধ্যে তেল রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ চলতে থাকে। ২০১২ সালে দক্ষিণ সুদান তেল উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় — কারণ উত্তর সুদান পাইপলাইন ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত ফি নিচ্ছিল। দুই দেশের মধ্যে সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘর্ষও হয়।
দক্ষিণ সুদান স্বাধীনতার পরপরই গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল মূল লড়াইয়ের বিষয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, এই গৃহযুদ্ধে ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ মারা যায়।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ (২০১১ থেকে চলমান) শুধু আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয় — এর পেছনে আছে জটিল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের ভূরাজনীতি।
কাতার দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির জন্য সৌদি আরব, জর্ডান, সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্য দিয়ে একটি পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু সিরিয়ার আসাদ সরকার ২০০৯ সালে এই পরিকল্পনায় অসম্মতি জানায়। পরিবর্তে সিরিয়া, ইরাক ও ইরানের মধ্য দিয়ে একটি ইরানি গ্যাস পাইপলাইনের চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
ফলে কাতার ও সৌদি আরবের স্বার্থ বিপরীত মেরুতে চলে যায় সিরিয়ার আসাদ সরকারের সাথে। বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, এই পাইপলাইন ভূরাজনীতি সিরিয়ার বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি কাতার ও সৌদি আরবের সমর্থনের অন্যতম কারণ।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ৩-৫ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইয়েমেনকে অনেকে মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্রতম দেশ হিসেবে জানে। কিন্তু ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত — বাব আল-মান্দাব প্রণালি, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ৬% যাতায়াত করে।
২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে জোটবাহিনী ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। হুতিরা ইরান সমর্থিত, এবং তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছের অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে।
জাতিসংঘের ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, ইয়েমেন যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার মানুষ মারা গেছে — যার মধ্যে সরাসরি যুদ্ধে নিহতের চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে যুদ্ধজনিত দুর্ভিক্ষ ও রোগে।
এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বৈপরীত্যগুলোর একটি।
ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদ — আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা সৌদি আরবের ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেলকেও ছাড়িয়ে যায়। অথচ সেই দেশের মানুষ না খেয়ে রাস্তার ধারে ময়লার স্তূপ থেকে খাবার খুঁজেছে।
হুগো চাভেজ ১৯৯৮ সালে ক্ষমতায় এসে ভেনেজুয়েলার তেল রাজস্বকে সামাজিক কর্মসূচিতে ঢালেন — স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন। যতদিন তেলের দাম বেশি ছিল, এই মডেল কাজ করেছে। কিন্তু পুরো অর্থনীতিকে তেলের উপর নির্ভরশীল করে ফেলা হয়েছিল।
২০১৪ সালে তেলের দাম পড়ে গেলে ভেনেজুয়েলার আমদানি করা খাদ্য কেনার সামর্থ্য শেষ হয়ে যায়। ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় ৭৫% ভেনেজুয়েলান গড়ে ৮ কেজির বেশি ওজন হারিয়েছিল।
২০০৮ সালে ভেনেজুয়েলা বিশ্বের শীর্ষ ১০ তেল উৎপাদক দেশের মধ্যে ছিল, প্রতিদিন প্রায় ৩০ লক্ষ ব্যারেল উৎপাদন হত। ২০২৫ সালের শেষে সেই উৎপাদন নেমে আসে প্রতিদিন মাত্র ৯ লক্ষ ২১ হাজার ব্যারেলে। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প কার্যত ভেঙে পড়ে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭৭ লক্ষ ভেনেজুয়েলান দেশ ছেড়ে চলে যায় — দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভোরবেলা ঘটে ইতিহাসের অন্যতম সাহসী এবং বিতর্কিত সামরিক অভিযান।
মার্কিন ডেল্টা ফোর্স ও CIA-র যৌথ অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে কারাকাসে আটক করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসা হয় মাদক ও সন্ত্রাস সংক্রান্ত অভিযোগে।
ট্রাম্প প্রশাসন বলেছিল এটি "মাদক যুদ্ধের" অংশ। কিন্তু খুব দ্রুতই আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায়।
ট্রাম্প নিজেই বলেন আমেরিকা ভেনেজুয়েলাকে "পরিচালনা করবে" এবং ২.৮ বিলিয়ন ডলারের তেল সম্পদ "আমার নিয়ন্ত্রণে" থাকবে। PDVSA-র (ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি) নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়।
অভিযানের পর মার্কিন কর্মকর্তারা ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানো এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ শোষণের পরিকল্পনা নিয়ে কারাকাসে ভ্রমণ শুরু করেন। চীনের কাছে ভেনেজুয়েলার খনিজ সরবরাহ বন্ধ করাও ছিল একটি মূল লক্ষ্য।
| ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির গন্তব্য | পরিবর্তন |
| ২০২৪ সালে চীনে যেত | ৪০% |
| ২০২৪ সালে আমেরিকায় যেত | ৩৫% |
| ২০২৫ সালে (ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার পর) চীনে | ৮০% |
| ২০২৫ সালে আমেরিকায় | মাত্র ১০% |
মাদুরো ধরার আগে মার্কিন নৌবাহিনী ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজে ২৫টি আক্রমণ চালায়, যাতে কমপক্ষে ৯৫ জন নিহত হয়।
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে — মাদক যুদ্ধের আবরণে এটি ছিল সরাসরি তেল ও কৌশলগত সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযান। ইরাক ২০০৩-এর মতো আরেকটি অধ্যায়।
ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকার দ্বন্দ্ব শুধু ধর্ম বা আদর্শের লড়াই নয় — এর কেন্দ্রে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ।
হর্মুজ প্রণালি দিয়ে ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল যাতায়াত করেছে — যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম ভোগের প্রায় ২০ শতাংশ। এই একটি সরু পথ বন্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতি রাতারাতি সংকটে পড়বে।
ইরান এই প্রণালির এক পাশেই অবস্থিত। এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক অস্ত্র।
২০২৪ সালের ১ অক্টোবর ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রায় ১৮০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করে — হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে। ২৭ অক্টোবর ইসরায়েল ইরানের ইসফাহান অঞ্চলে পাল্টা মিসাইল হামলা করে।
২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বড় আকারের হামলা চালায়। ইরান পাল্টা "অপারেশন ট্রু প্রমিস ৩" পরিচালনা করে — ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলের মূল শহরগুলোতে আঘাত।
ইসরায়েলি হামলায় তেহরানের শাহরান জ্বালানি ডিপো এবং শহর-রে তেল শোধনাগারে আঘাত লাগে। ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাস মজুদ সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি অংশেও আঘাত করে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের তেহরান, ইসফাহান, কোম, কারাজ ও কেরমানশাহে সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় বড় আকারের বিমান হামলা শুরু করে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হন।
ইরান পাল্টা হামলা চালায় — উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর, বন্দর, হোটেল এমনকি বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাই-রাইজ ভবনেও। হর্মুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়ে।
এশিয়ার অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে — ২০২৪ সালে হর্মুজ দিয়ে যাওয়া তেলের ৮৪% এবং এলএনজির ৮৩% গিয়েছে এশিয়ার বাজারে। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলে হর্মুজের তেলের ৬৯% ব্যবহার করে।
চীনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ১৫% আসে ইরান থেকে। ইরানের ৯০% তেল রপ্তানি যায় চীনে। হর্মুজ বন্ধ হলে চীনের শিল্প উৎপাদন যে কতটা চাপে পড়বে, সেটা ভাবলেই বোঝা যায় এই যুদ্ধের বৈশ্বিক মাত্রা কতটা গভীর।
| হর্মুজ বন্ধ হলে কার কতটা ক্ষতি | |
| চীন | দৈনিক ~৬-৭ মিলিয়ন ব্যারেল সরবরাহ বিঘ্নিত |
| ভারত | মোট আমদানির ৬০%+ বন্ধ |
| জাপান | মোট তেল আমদানির ৮০%+ বন্ধ |
| দক্ষিণ কোরিয়া | শিল্প উৎপাদন কার্যত অচল |
| বৈশ্বিক তেল দাম | সম্ভাব্য ৫০-১০০% লাফ |
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে ইসরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্ট বা পশ্চিমা কোম্পানির মালিকানাধীন জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে।
লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে বিশ্বের মোট সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় ১২-১৫% যাতায়াত করে। ইউরোপ-এশিয়ার তেল বাণিজ্যের জন্য এটি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ।
হামলার ফলে বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো — Maersk, MSC, CMA CGM — লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাওয়া শুরু করে। এতে জাহাজ চলার পথ বেড়ে যায় প্রায় ৩,৫০০ মাইল এবং সময় বাড়ে দুই সপ্তাহ।
অক্টোবর ২০২৪ থেকে বৈশ্বিক শিপিং খরচ প্রায় ৪৫% বৃদ্ধি পায়। এই বাড়তি খরচের ভার শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার উপর — বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ব্রাজিল পর্যন্ত আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো (DRC) তেলসমৃদ্ধ না হলেও কোবাল্ট ও কোলতানের বিশ্বের সবচেয়ে বড় মজুদ এখানে — যা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরিতে অপরিহার্য। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বিশ্বের মোট কোবাল্ট সরবরাহের প্রায় ৭০% আসে কঙ্গো থেকে।
এই সম্পদকে ঘিরে গত তিন দশকে কঙ্গোতে চলা সংঘাতে ৬০ লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা গেছে বলে জাতিসংঘের তথ্যে উঠে আসে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো খনি নিয়ন্ত্রণ করে, শিশুদের খনিতে কাজ করায় এবং সেই অর্থ দিয়ে অস্ত্র কেনে।
অ্যাঙ্গোলা আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী। OPEC-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে অ্যাঙ্গোলা প্রতিদিন প্রায় ১.১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে। কিন্তু UNDP-এর মানব উন্নয়ন সূচকে (HDI) দেশটির অবস্থান তলানিতে। ২৭ বছরের গৃহযুদ্ধে (১৯৭৫-২০০২) প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ মারা গেছে — আর সেই যুদ্ধেও তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল মূল লড়াইয়ের বিষয়।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ার কাজাখস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তানের বিশাল তেল ও গ্যাস মজুদ হঠাৎ বৈশ্বিক বাজারে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
EIA-এর তথ্যমতে, কাজাখস্তানে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুদ আছে। এই তেল বের করতে এবং রপ্তানি করতে হলে পাইপলাইন লাগবে। কিন্তু সেই পাইপলাইন কোন দেশের মধ্য দিয়ে যাবে — রাশিয়া, ইরান, চীন নাকি পশ্চিমমুখী? এই প্রশ্নকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতি।
আমেরিকা ও ইউরোপ চাইছে বাকু-তিবলিসি-জেইহান (BTC) পাইপলাইনের মতো রাশিয়া ও ইরানকে এড়িয়ে পশ্চিমমুখী পথে তেল আনতে। রাশিয়া চাইছে এই তেল তার পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে যাক। চীন চাইছে নিজের দিকে পাইপলাইন আনতে।
এই তিন শক্তির টানাটানিতে মধ্য এশিয়ার ছোট দেশগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
সব যুদ্ধ, সব সংঘাত, সব অভ্যুত্থানের মানবিক মূল্য যদি একটি টেবিলে রাখা হয়:
| সংঘাত | সময়কাল | আনুমানিক মৃত্যু | তেলের সম্পর্ক |
| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (তেল সংশ্লিষ্ট) | ১৯৩৯-৪৫ | কোটি+ | তেলক্ষেত্র দখলের লড়াই |
| ইরান অভ্যুত্থান পরবর্তী দমন | ১৯৫৩-৭৯ | হাজার+ | তেল নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার |
| ইরান-ইরাক যুদ্ধ | ১৯৮০-৮৮ | ৫-১০ লক্ষ | তেলক্ষেত্র ও জলপথ নিয়ন্ত্রণ |
| উপসাগরীয় যুদ্ধ | ১৯৯০-৯১ | ২৫,০০০+ | তেল মজুদের ২০% রক্ষা |
| অ্যাঙ্গোলা গৃহযুদ্ধ | ১৯৭৫-২০০২ | ৫ লক্ষ | তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ |
| ইরাক যুদ্ধ | ২০০৩-১১ | ১.৫-৬ লক্ষ | তেল (বিতর্কিত) |
| নাইজেরিয়া সংঘাত | চলমান | হাজার প্রতি বছর | নাইজার ডেল্টার তেল |
| লিবিয়া | ২০১১-বর্তমান | ৩০,০০০+ | আফ্রিকার বৃহত্তম তেল মজুদ |
| সিরিয়া গৃহযুদ্ধ | ২০১১-বর্তমান | ৩-৫ লক্ষ | পাইপলাইন ভূরাজনীতি |
| ইয়েমেন যুদ্ধ | ২০১৫-বর্তমান | ৩.৭৭ লক্ষ+ | হর্মুজ ও বাব আল-মান্দাব |
| কঙ্গো সংঘাত | ১৯৯৬-বর্তমান | ৬০ লক্ষ+ | কোবাল্ট-কোলতান |
| দক্ষিণ সুদান গৃহযুদ্ধ | ২০১৩-২০২০ | ৪ লক্ষ | তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ |
| ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা | ২০২৪-বর্তমান | হাজার+ (চলমান) | হর্মুজ ও ইরানি তেল |
| ভেনেজুয়েলা অভিযান | ২০২৬ | ৯৫+ (প্রাথমিক) | বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুদ |
অর্থনীতিবিদরা "রিসোর্স কার্স" বা "সম্পদের অভিশাপ" বলে একটি ঘটনা চিহ্নিত করেছেন — যেখানে দেখা যায় প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশগুলো প্রায়ই সম্পদহীন দেশগুলোর চেয়ে ধীর গতিতে উন্নয়ন হয় এবং বেশি রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভোগে।
বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে তেলসমৃদ্ধ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাথাপিছু আয় তেলহীন দেশগুলোর তুলনায় গড়ে কম বেড়েছে।
| তেলসমৃদ্ধ দেশ | বাস্তব অবস্থা (২০২৩) |
| নাইজেরিয়া | ৬০%+ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে |
| ভেনেজুয়েলা | ৯০%+ মানুষ দারিদ্র্যে, হাইপারইনফ্লেশন |
| অ্যাঙ্গোলা | মানব উন্নয়ন সূচকে তলানিতে |
| ইরাক | তেল রাজস্ব আছে, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা চলমান |
| দক্ষিণ সুদান | স্বাধীনতার পর থেকে গৃহযুদ্ধ |
এই "অভিশাপ" কেন হয়? অর্থনীতিবিদদের মতে — তেল থেকে সহজ অর্থ আসলে সরকারের জবাবদিহিতার প্রয়োজন কমে, দুর্নীতি বাড়ে, অন্য শিল্প গড়ে ওঠে না এবং তেলের দামের উঠানামায় পুরো অর্থনীতি অস্থির হয়ে পড়ে।
এই টেবিলের দিকে তাকালে একটা প্রশ্ন মাথায় আসে — এত কোটি মানুষের জীবন, এত দেশের ধ্বংস, এত শিশুর ভবিষ্যৎ শেষ করে যে তেল পাওয়া গেছে, তার আসল মূল্য কত?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে তা আসলে ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ার পথেই হাঁটছে — প্রতিবারই বাইরের শক্তি শাসনব্যবস্থা সরিয়ে দিয়েছে কিন্তু রেখে গেছে বিশৃঙ্খলা, প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা।
ইতিহাস বারবার একই কথা বলছে — তেলের মালিক হওয়া অনেক সময় অভিশাপ। আর তেলের জন্য যুদ্ধ করা সবসময়ই মানবতার পরাজয়।
নবায়নযোগ্য শক্তির যুগ হয়তো এই চক্র ভাঙবে। কিন্তু তার আগে লিথিয়াম, কোবাল্ট ও সেমিকন্ডাক্টরকে ঘিরে একই লড়াই শুরু হয়ে গেছে — শুধু নামটা বদলেছে।

সামাজিক উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা আরো সহজ করে দেয় সোশ্যাল বিজনেস মডেল ক্যানভাস টুল। মূলত বহুল ব্যবহৃত বিজনেস মডেল ক্যানভাস টুল থেকেই সামাজিক সংগঠনের কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযোগী করে এই মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের সামাজিক উন্নয়নে কোনো আইডিয়া এই টুলের মাধ্যমে পর্যালোচনা করে সুনির্দিষ্ট সিন্ধান্তে আসা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি।








