ভূমিকা
ধরো তুমি বাংলাদেশে বসে সৌদি আরব থেকে তেল কিনতে চাও। তোমার হাতে আছে টাকা। কিন্তু সৌদি আরব টাকা নেবে না। তারা চাইবে ডলার।
তাহলে প্রথমে তোমাকে ডলার কিনতে হবে। ডলার কিনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার যাবে। সেই ডলার পৌঁছাবে সৌদি আরবে। সৌদি আরব সেই ডলার রাখবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে।
এই চক্রটা শুধু বাংলাদেশের সাথে নয় — চীন, ভারত, জাপান, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া — পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সাথে। প্রতিদিন ১০৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কেনা হচ্ছে ডলারে।
এই একটি নিয়মের কারণে আমেরিকা ছাড়া অন্য কোনো দেশ যা পারে না তা আমেরিকা পারে — নিজের মুদ্রায় ঋণ নিতে পারে সীমাহীনভাবে, এবং তবুও বিশ্ব সেই মুদ্রা ধরে রাখে কারণ তেল কিনতে ডলার লাগে।
এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতার নাম পেট্রোডলার।
ব্রেটন উডসের পতন: যে সংকট পেট্রোডলার জন্ম দিয়েছিল
পেট্রোডলার বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে — ১৯৪৪ সালে।
ব্রেটন উডস: সোনার উপর ডলার
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস শহরে বসল ৪৪টি দেশের অর্থনৈতিক সম্মেলন। উদ্দেশ্য — যুদ্ধের পরে বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কীভাবে চলবে তা ঠিক করা।
সিদ্ধান্ত হলো সহজ একটি কাঠামোয়। বিশ্বের সব মুদ্রা বাঁধা থাকবে মার্কিন ডলারের সাথে নির্দিষ্ট বিনিময় হারে। আর ডলার বাঁধা থাকবে সোনার সাথে — প্রতি ৩৫ ডলারে এক আউন্স সোনা।
এই ব্যবস্থায় ডলার ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রার সমতুল্য। কারণ যে কেউ চাইলে ডলার দিয়ে সোনা কিনতে পারবে আমেরিকার কাছ থেকে।
দুই দশক এই ব্যবস্থা ভালোই চলল। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো ১৯৬০-এর দশকে।
সমস্যার শুরু: ভিয়েতনাম যুদ্ধের খরচ
ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার খরচ বাড়ছিল হু হু করে। যুদ্ধ চালাতে গেলে টাকা লাগে — আমেরিকা বেশি বেশি ডলার ছাপাতে লাগল।
কিন্তু সমস্যা হলো — বেশি ডলার ছাপালে সোনার সাথে অনুপাত বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ আমেরিকার সোনার মজুদ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ, কিন্তু ডলার ছাপা হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি।
ইউরোপীয় দেশগুলো, বিশেষত ফ্রান্স, বুঝতে পারল। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট দ্য গল রাগী ভাষায় বললেন — আমেরিকা কাগজ ছাপিয়ে সেই কাগজ দিয়ে আমাদের কাছ থেকে আসল পণ্য কিনছে। এটা অগ্রহণযোগ্য।
ফ্রান্স ডলার দিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সোনা নিতে শুরু করল। অন্য দেশগুলোও করতে লাগল।
আমেরিকার সোনার মজুদ দ্রুত কমছিল।
নিক্সন শক: সোনার সাথে ডলারের সম্পর্ক ছিন্ন
১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট। রবিবার রাতে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন টেলিভিশনে এলেন। ঘোষণা করলেন — আজ থেকে ডলার আর সোনার সাথে বাঁধা থাকবে না। যে কেউ ডলার দিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সোনা কিনতে পারবে না।
এটাই ইতিহাসে "নিক্সন শক"।
এক মুহূর্তে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা শেষ হয়ে গেল।
সারা বিশ্বে প্রশ্ন উঠল — এখন ডলারের মূল্য কীসের উপর নির্ভর করবে? সোনার গ্যারান্টি নেই, তাহলে ডলার রাখব কেন?
এই অস্তিত্বের সংকট সমাধান করতেই তৈরি হলো পেট্রোডলার।
পেট্রোডলারের জন্ম: ১৯৭৪ সালের গোপন চুক্তি
১৯৭৩ সালের তেল সংকট: সংকটের মধ্যে সুযোগ
১৯৭৩ সালের তেল অবরোধে আমেরিকা মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছিল। কিন্তু হেনরি কিসিঞ্জার — নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী — এই সংকটের মধ্যে একটি অসাধারণ সুযোগ দেখলেন।
কিসিঞ্জার বুঝলেন দুটো জিনিস একসাথে।
প্রথমত — আরব দেশগুলো তেলের কারণে হঠাৎ বিশাল ধনী হয়ে যাচ্ছে। এই অর্থ কোথায় যাবে?
দ্বিতীয়ত — ডলারের ভিত্তি হিসেবে সোনা গেছে। নতুন ভিত্তি দরকার।
যদি তেল বিক্রির অর্থ ডলারে আসে এবং সেই ডলার আমেরিকায় বিনিয়োগ হয়, তাহলে একসাথে দুটো সমস্যার সমাধান হয়। ডলারের চাহিদা থাকবে — কারণ তেল কিনতে ডলার লাগবে। আর আরব দেশের অর্থ আমেরিকায় আসবে — আমেরিকার অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
কিসিঞ্জার সৌদি আরবের দিকে মনোযোগ দিলেন। কারণ সৌদি আরব OPEC-এর সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী এবং আরব বিশ্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী।
সাইমনের গোপন মিশন
১৯৭৪ সালের জুনে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি উইলিয়াম সাইমন সৌদি আরবে গেলেন। সাথে ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তারা।
বৈঠক হলো অত্যন্ত গোপনে। সাধারণত এই ধরনের কূটনৈতিক বৈঠকের খবর মিডিয়া পায়। কিন্তু এটা এতটাই গোপন রাখা হলো যে পরবর্তী ৪২ বছর কেউ জানতে পারেনি পুরো বিষয়টা।
আলোচনার মূল প্রস্তাব ছিল সাইমনের তরফ থেকে এরকম —
"আপনারা তেল বিক্রি করুন শুধু ডলারে। উদ্বৃত্ত অর্থ বিনিয়োগ করুন মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে। বিনিময়ে আমরা আপনাদের নিরাপত্তা দেব, অস্ত্র দেব এবং যেকোনো হুমকি থেকে রক্ষা করব।"
সৌদি রাজপরিবারের জন্য এই প্রস্তাব ছিল লোভনীয়। ১৯৭৩ সালের বিপ্লব দেখিয়ে দিয়েছিল — মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্র কতটা নাজুক। ইরানে শাহের পরিণতি কী হয়েছিল সেটাও তারা দেখেছিল।
আমেরিকার নিরাপত্তা গ্যারান্টি মানে রাজপরিবার টিকে থাকবে। এই প্রস্তাব তারা গ্রহণ করল।
চুক্তিটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়নি। কোনো সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না। কিন্তু দুই পক্ষ বুঝে নিল কী করতে হবে।
২০১৬ সালে রহস্য উন্মোচন
দীর্ঘ ৪২ বছর পর ২০১৬ সালে ব্লুমবার্গ নিউজের একটি অনুসন্ধানী দল মার্কিন সরকারের Freedom of Information Act-এর মাধ্যমে গোপনীয়তামুক্ত নথি সংগ্রহ করে।
সেই নথি থেকে বেরিয়ে এলো পুরো গল্প। জানা গেল — আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগ বিশেষ ব্যবস্থায় সৌদি আরবের ট্রেজারি বন্ড হোল্ডিং আলাদাভাবে গোপন রেখেছিল। অন্য সব দেশের তথ্য প্রকাশ করা হতো, কিন্তু সৌদি আরবের তথ্য ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে গোপন ছিল।
এই প্রতিবেদনের পর নিশ্চিত হলো — পেট্রোডলার কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এটি একটি বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা।
পেট্রোডলার কীভাবে কাজ করে: ধাপে ধাপে
ধাপ ১ — বাংলাদেশের হাতে টাকা আছে, কিন্তু সমস্যা আছে
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) সিদ্ধান্ত নিল এই মাসে সৌদি আরব থেকে ১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনবে। তেলের দাম ধরো ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলার। মোট দাম হলো ৮ কোটি ডলার।
BPC-র কাছে আছে বাংলাদেশি টাকা। কিন্তু সৌদি আরামকো বলবে — আমরা টাকা নেব না। ডলার দাও।
কেন? কারণ পেট্রোডলার চুক্তি অনুযায়ী সব তেল বিক্রি হয় শুধু ডলারে।
ধাপ ২ — বাংলাদেশকে আগে ডলার কিনতে হবে
BPC বাংলাদেশ ব্যাংকে গেল। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ডলার দিল। বিনিময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৮ কোটি ডলার কমে গেল।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — বাংলাদেশের কাছে ডলার এলো কোথা থেকে?
গার্মেন্টস রপ্তানি করে। প্রবাসীরা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠায়। বিদেশি বিনিয়োগ আসে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে ডলার উপার্জন করতে হয় রপ্তানি বা ঋণ করে — তারপর সেই ডলার দিয়ে তেল কেনে।
এই ধাপেই পেট্রোডলারের প্রথম বড় প্রভাব — বাংলাদেশ সবসময় চেষ্টা করে ডলার রিজার্ভ ধরে রাখতে। কারণ ডলার না থাকলে তেল কেনা যাবে না, তেল না থাকলে বিদ্যুৎ নেই, কলকারখানা নেই, পরিবহন নেই।
ধাপ ৩ — বাংলাদেশের ডলার গেল সৌদি আরবে
BPC সেই ৮ কোটি ডলার পাঠাল সৌদি আরামকোকে। সৌদি আরামকো তেল পাঠাল চট্টগ্রাম বন্দরে।
এখন সৌদি আরবের হাতে ৮ কোটি ডলার। শুধু বাংলাদেশ থেকে নয় — চীন, ভারত, জাপান, কোরিয়া, ইউরোপ সবাই থেকে এভাবে ডলার আসছে।
২০২৩ সালে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির আয় ছিল প্রায় ২১০ বিলিয়ন ডলার। এত বিশাল পরিমাণ ডলার সৌদি আরব কোথায় রাখবে? দেশে রেখে কী করবে? দেশের অর্থনীতির চেয়ে অনেক বেশি।
ধাপ ৪ — সৌদির পেট্রোডলার ফিরে গেল আমেরিকায়
এখানেই পেট্রোডলার চুক্তির দ্বিতীয় অংশ কাজ করে।
সৌদি আরব সেই ২১০ বিলিয়ন ডলারের বড় অংশ বিনিয়োগ করে তিনটি জায়গায়।
মার্কিন ট্রেজারি বন্ড — আমেরিকা সরকার যে বন্ড ছাড়ে সেটা কিনে। ২০২৩ সালে সৌদি আরবের হাতে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ছিল প্রায় ১১৯ বিলিয়ন ডলারের। এই বন্ড কেনা মানে আমেরিকাকে ঋণ দেওয়া। আমেরিকা সুদ দেয় এবং মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেয়।
মার্কিন শেয়ার বাজার — সৌদির সার্বভৌম সম্পদ তহবিল PIF (Public Investment Fund) আমেরিকার বড় বড় কোম্পানির শেয়ার কিনে রেখেছে। উবার, ডিজনি, বোয়িং — অনেক কোম্পানিতে সৌদির বিনিয়োগ আছে।
মার্কিন অস্ত্র কেনা — সৌদি আরব প্রতিবছর কয়েকশো কোটি ডলারের আমেরিকান অস্ত্র কেনে। এই অস্ত্রের টাকা আসে তেল বিক্রির ডলার থেকেই।
তার মানে সহজ ভাষায় — বাংলাদেশ যে ডলার সৌদিকে দিল তেলের বিনিময়ে, সেই ডলার ঘুরে ঘুরে আমেরিকায় চলে গেল।
ধাপ ৫ — আমেরিকা কী পেল এই চক্রে
এখন হিসাব করো আমেরিকা কী পেল।
বাংলাদেশ তেল কিনল ৮ কোটি ডলারে। সেই ডলার গেল সৌদিতে। সৌদি সেই ডলারে কিনল আমেরিকার ট্রেজারি বন্ড।
মানে — বাংলাদেশ আসলে পরোক্ষভাবে আমেরিকাকে ঋণ দিল। একইভাবে চীন দিল, ভারত দিল, জাপান দিল।
প্রতিদিন ১০৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কেনা হচ্ছে ডলারে। প্রতিদিন ডলারের প্রবাহ যাচ্ছে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোয়। সেই ডলার বিনিয়োগ হচ্ছে আমেরিকায়।
এতে আমেরিকা কী সুবিধা পাচ্ছে তা একটু বিস্তারিত দেখা যাক।
সুবিধা ১ — কম সুদে ঋণ
ধরো বাংলাদেশ সরকার বন্ড ছাড়ল — বিশ্বের কেউ কিনতে রাজি না হলে বেশি সুদ দিতে হবে। কিন্তু আমেরিকার ট্রেজারি বন্ড কেনার জন্য লাইন পড়ে যায় — কারণ তেল বিক্রির ডলার কোথাও না কোথাও রাখতেই হবে, আর আমেরিকার ট্রেজারি সবচেয়ে নিরাপদ।
ফলে আমেরিকা অনেক কম সুদে ঋণ নিতে পারে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী এই সুবিধা আমেরিকাকে প্রতিবছর কমপক্ষে ১০০-২০০ বিলিয়ন ডলার বাঁচায়।
সুবিধা ২ — ডলার দুর্বল হয় না
স্বাভাবিক নিয়মে কোনো দেশ বেশি মুদ্রা ছাপালে সেই মুদ্রার মূল্য কমে। কিন্তু আমেরিকা বেশি ডলার ছাপালেও বিশ্ব সেই ডলার কিনে নেয় — কারণ তেল কিনতে ডলার লাগে।
এটা এমন যেন তুমি যত ইচ্ছা নোট ছাপাও, কিন্তু সেই নোটের দাম কমে না — কারণ অন্যদের সেই নোট নিতেই হবে।
সুবিধা ৩ — অস্ত্র বিক্রির নিশ্চিত বাজার
সৌদি আরব তেল বিক্রির ডলারে আমেরিকার অস্ত্র কেনে। ২০২২ সালে সৌদি আরব আমেরিকা থেকে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছিল। এই টাকার মূল উৎস — বাংলাদেশ, চীন, ভারতসহ বিশ্বের তেল আমদানিকারক দেশগুলোর দেওয়া ডলার।
ধাপ ৬ — চক্রটা কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখে
এখানে একটা চমৎকার ব্যাপার আছে — এই চক্রটা নিজেই নিজেকে টিকিয়ে রাখে।
আমেরিকা সৌদিকে নিরাপত্তা দেয়, অস্ত্র দেয়। সৌদি রাজপরিবার টিকে থাকে। টিকে থাকার জন্য তারা আমেরিকার উপর নির্ভরশীল থাকে। নির্ভরশীল থাকতে হলে চুক্তি মানতে হয় — তেল বিক্রি ডলারে।
আবার বিশ্বের সব দেশকে তেল কিনতে ডলার লাগে। তাই তারা ডলার উপার্জন করার চেষ্টা করে — রপ্তানি বাড়ায়, আমেরিকার সাথে বাণিজ্য করে। এতে আমেরিকার ক্রেতার বাজার তৈরি হয়।
একটা সহজ ছকে দেখলে —
বিশ্ব তেল কেনে → ডলার দিয়ে → ডলার যায় সৌদিতে → সৌদি বিনিয়োগ করে আমেরিকায় → আমেরিকা শক্তিশালী থাকে → আমেরিকা সৌদিকে নিরাপত্তা দেয় → সৌদি ডলারে তেল বিক্রি করতে থাকে → বিশ্ব আবার ডলারে তেল কেনে।
এই চক্র থেমে নেই ১৯৭৪ সাল থেকে।
বাংলাদেশের জন্য এর মানে কী
এই পুরো ব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিকারক দেশ একটু চাপে থাকে।
তেলের দাম বাড়লে বেশি ডলার লাগে। বেশি ডলার লাগলে রিজার্ভে চাপ পড়ে। রিজার্ভে চাপ পড়লে টাকার মান কমে। টাকার মান কমলে সব আমদানির দাম বাড়ে। সব আমদানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে।
২০২২ সালে ঠিক এটাই হয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তেলের দাম হঠাৎ বাড়ল। বাংলাদেশের রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন থেকে কমে ২০ বিলিয়নে নামল। সরকার জ্বালানির দাম ৫০% বাড়াতে বাধ্য হলো। মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে পৌঁছাল।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা সৌদির উৎপাদন কাটছাঁটের প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে ঢাকার বাজারে — এটাই পেট্রোডলার ব্যবস্থার বাস্তবতা।
একটাই নিয়ম কিন্তু কতটা গভীর তার প্রভাব
পুরো বিষয়টা শেষ পর্যন্ত একটামাত্র নিয়মের উপর দাঁড়িয়ে — তেল শুধু ডলারে বিক্রি হবে।
এই একটি নিয়মের কারণে আমেরিকা সস্তায় ঋণ পায়। ডলার শক্তিশালী থাকে। সৌদি রাজপরিবার টিকে থাকে। বাংলাদেশকে ডলার রিজার্ভ ধরে রাখতে হয়। চীনকে রপ্তানি বাড়িয়ে ডলার উপার্জন করতে হয়। ইরানের মতো নিষেধাজ্ঞায় পড়া দেশের তেল বেচা কঠিন হয়ে যায়।
একটি ছোট্ট নিয়ম — কিন্তু তার প্রভাব পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি জুড়ে।
"ডলার কীভাবে চলাচল করে।"
ডলার একটি নদীর মতো। নদীর পানি সমুদ্রে যায়, কিন্তু বাষ্প হয়ে আবার বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসে। ডলারও তেমনি — আমেরিকায় জমে, কিন্তু বিভিন্ন পথে আবার বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
ছড়িয়ে পড়ার পথগুলো হলো মূলত পাঁচটি।
পথ ১ — আমেরিকা বিশাল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে
আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ।
একটু ভাবো — আইফোন বানায় চীন, গার্মেন্টস আসে বাংলাদেশ থেকে, গাড়ির যন্ত্রাংশ আসে জার্মানি থেকে, ওষুধ আসে ভারত থেকে, কফি আসে ব্রাজিল থেকে।
আমেরিকানরা এই সব পণ্য কিনে ডলারে। তাই আমেরিকা থেকে প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে — চীনে, ভারতে, বাংলাদেশে, ইউরোপে।
মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের তথ্যমতে ২০২৩ সালে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৭৭৩ বিলিয়ন ডলার। মানে আমেরিকা রপ্তানির চেয়ে ৭৭৩ বিলিয়ন ডলার বেশি আমদানি করেছে।
এই বিশাল পরিমাণ ডলার প্রতিবছর আমেরিকা থেকে বেরিয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টসের ডলার আসে এভাবেই।
পথ ২ — আমেরিকা বিদেশে বিনিয়োগ করে
আমেরিকান কোম্পানিগুলো সারা বিশ্বে বিনিয়োগ করে। ম্যাকডোনাল্ডস ভারতে খোলে, অ্যাপল চীনে কারখানা দেয়, এক্সনমোবিল নাইজেরিয়ায় তেল তোলে।
এই বিনিয়োগের ডলার আমেরিকা থেকে বেরিয়ে সেই দেশে যায়।
পথ ৩ — আমেরিকা বিদেশে সামরিক খরচ করে
আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি আছে ৭০টিরও বেশি দেশে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, কাতার — সব জায়গায়।
সেই ঘাঁটিগুলো চালাতে লাগে ডলার। স্থানীয় কর্মী নিয়োগ, খাবার কেনা, নির্মাণকাজ — এই সব ডলার স্থানীয় অর্থনীতিতে ঢোকে।
পথ ৪ — ফেডারেল রিজার্ভ নতুন ডলার ছাপায়
এটা পেট্রোডলারের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক।
সাধারণ কোনো দেশ বেশি মুদ্রা ছাপালে সেই মুদ্রার মান পড়ে যায় — কারণ বেশি মুদ্রা মানে প্রতিটি নোটের মূল্য কম।
কিন্তু আমেরিকা বেশি ডলার ছাপালেও সমস্যা নেই। কারণ বিশ্ব সেই ডলার কিনে নেয় — তেল কিনতে ডলার লাগবেই।
ফলে আমেরিকা নতুন ডলার ছাপিয়ে সেই ডলার দিয়ে বিশ্বে পণ্য কিনতে পারে, সামরিক খরচ দিতে পারে, বিনিয়োগ করতে পারে। এই নতুন ডলার বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকটে ফেডারেল রিজার্ভ ৪ ট্রিলিয়ন ডলার নতুন ছাপিয়েছিল। করোনার সময় আরও ৪-৫ ট্রিলিয়ন। এই ডলার বিভিন্ন পথে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।
পথ ৫ — আমেরিকা বিদেশি সরকারকে ঋণ ও সাহায্য দেয়
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক — এই সংস্থাগুলোতে আমেরিকার সবচেয়ে বেশি প্রভাব। এই সংস্থাগুলো ডলারে ঋণ দেয় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে।
বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে ঋণ পেলে সেই ডলার বাংলাদেশের রিজার্ভে আসে। তারপর সেই ডলারে তেল কেনা হয়। চক্র চলতে থাকে।
পুরো ছবিটা একসাথে
ডলার আমেরিকা থেকে বেরোয় — আমদানি, বিনিয়োগ, সামরিক খরচ, নতুন মুদ্রা ছাপানো — এই পথে।
ডলার আমেরিকায় ফেরে — তেলের দাম পরিশোধ হিসেবে, ট্রেজারি বন্ড কেনার মাধ্যমে, শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে।
মাঝখানে বিশ্বের বাকি দেশগুলো এই ডলার ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য করছে — কারণ ডলার সবাই চেনে, সবাই নেয়।
একটু মজার উদাহরণ দিই। বাংলাদেশ যদি ভারত থেকে পেঁয়াজ কিনতে চায়, সেটাও হয় ডলারে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে ডলার গেল। ভারত সেই ডলারে সৌদি থেকে তেল কিনল। সৌদি সেই ডলার আমেরিকার বন্ডে রাখল।
দুটো এশিয়ান দেশের পেঁয়াজের ব্যবসায়ও মাঝখানে ডলার এবং শেষমেশ সুবিধা পাচ্ছে আমেরিকা
একটা সমস্যা আছে
এই ব্যবস্থায় একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে।
আমেরিকাকে ডলার বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হলে বাণিজ্য ঘাটতিতে থাকতে হবে — অর্থাৎ রপ্তানির চেয়ে বেশি আমদানি করতে হবে। এটা দেখতে দুর্বলতার মতো, কিন্তু আসলে এটাই ডলারকে বিশ্বে ছড়িয়ে রাখে।
আর বিশ্বের বাকি দেশগুলোকে রপ্তানি বাড়িয়ে ডলার উপার্জন করতে হয় — তারপর সেই ডলার আমেরিকাকে ফেরত দেয় তেলের মূল্য হিসেবে।
সহজ ভাষায় — আমেরিকা পণ্য পায়, বিশ্ব পায় ডলার। সেই ডলার আবার তেল কিনতে আমেরিকার বন্ধু সৌদির কাছে যায়। সৌদি সেই ডলার আমেরিকায় রাখে।
পুরো চক্রে আমেরিকা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে — কারণ চক্রের কেন্দ্রে আছে তার মুদ্রা।
পেট্রোডলার থেকে আমেরিকার অসাধারণ সুবিধা
ফরাসি অর্থমন্ত্রী ভ্যালেরি জিসকার দেস্তাঁ ১৯৬০-এর দশকে বলেছিলেন — ডলারের বৈশ্বিক মর্যাদা আমেরিকাকে দিয়েছে "exorbitant privilege" বা "অসাধারণ সুবিধা"।
এই সুবিধা ঠিক কতটা বড়? সংখ্যায় দেখা যাক।
সুবিধা ১: সস্তায় ঋণ
যখন সারা বিশ্ব ডলার চায়, তখন আমেরিকার ট্রেজারি বন্ডেরও বিশাল চাহিদা থাকে। বিশাল চাহিদা মানে কম সুদ দিলেও চলে। এই কারণে আমেরিকা অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম সুদে ঋণ নিতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী এই সুবিধা আমেরিকাকে প্রতিবছর বাঁচায় কয়েকশো বিলিয়ন ডলার।
সুবিধা ২: ডলার ছেপে সমস্যা সমাধান
আমেরিকা যখন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, তখন ডলার ছাপিয়ে সমস্যা সামাল দেওয়া সম্ভব। অন্য দেশ এটা করলে মুদ্রার মান পড়ে যায়, মূল্যস্ফীতি আসে। কিন্তু আমেরিকা পারে — কারণ সেই ছাপানো ডলারও বিশ্ব কিনে নেয় তেলের প্রয়োজনে।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকটে ফেডারেল রিজার্ভ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার "কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং" করেছিল। অন্য কোনো দেশ এটা করলে তাদের মুদ্রা ধ্বংস হয়ে যেত। আমেরিকার যায়নি।
সুবিধা ৩: নিষেধাজ্ঞার অস্ত্র
যেহেতু তেল কেনাবেচা ডলারে হয় এবং ডলার পরিশোধ করতে হয় আমেরিকার ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে, তাই আমেরিকা যেকোনো দেশকে এই ব্যবস্থা থেকে বাদ দিতে পারে।
ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আমেরিকা তাদের তেল বেচা কঠিন করে দিয়েছে। রাশিয়াকে SWIFT থেকে বাদ দিয়েছে। এই ক্ষমতা আছে কারণ পুরো বিশ্বের লেনদেন ডলারে ও আমেরিকার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় হয়।
| পেট্রোডলারের সুবিধা | আনুমানিক পরিমাণ |
| বার্ষিক সুদ সাশ্রয় | ১০০-২০০ বিলিয়ন ডলার |
| সৌদি ট্রেজারি বন্ড হোল্ডিং (২০২৩) | ১১৯ বিলিয়ন ডলার |
| বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের অংশ | ৫৯% (IMF ২০২৩) |
| বার্ষিক তেলের বাজারের আকার | ~৩ ট্রিলিয়ন ডলার |
পেট্রোডলার ভাঙার চেষ্টা ও পরিণতি
ইতিহাসে দুটো উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে যেখানে রাষ্ট্রনেতারা পেট্রোডলার ব্যবস্থা ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন।
সাদ্দাম হোসেন ও ইউরো পরীক্ষা
২০০০ সালের নভেম্বরে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ঘোষণা করলেন — ইরাক এখন থেকে জাতিসংঘের "তেল-খাদ্য কর্মসূচি"র আওতায় তেল বিক্রি করবে ইউরোতে, ডলারে নয়।
তাঁর যুক্তি ছিল — আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ হিসেবে ডলার থেকে সরে আসা।
এই ঘোষণা ওয়াশিংটনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। একটি বড় তেল উৎপাদনকারী যদি ডলার ছেড়ে ইউরোতে চলে যায়, অন্যরাও ভাবতে পারে।
মাত্র আড়াই বছর পর ২০০৩ সালে আমেরিকা "গণবিধ্বংসী অস্ত্র" এর অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করল। পরে প্রমাণিত হলো সেই অস্ত্র ছিলই না। যুদ্ধের পর ইরাকের তেল বিক্রি আবার ডলারে ফিরে এলো।
সাদ্দামের ইউরো পরীক্ষা এবং ইরাক আক্রমণের মধ্যে সরাসরি কারণ-পরিণতির সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু সময়সীমাটা অনেকের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গাদ্দাফির গোল্ড দিনার পরিকল্পনা
লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পরিকল্পনা ছিল আরও সাহসী এবং আরও বিপদজনক।
তিনি আফ্রিকার দেশগুলোকে একটি প্রস্তাব দিলেন — আমরা একটি সোনা-সমর্থিত আফ্রিকান মুদ্রা "গোল্ড দিনার" চালু করব। আফ্রিকার তেল ও সোনাসহ সব সম্পদ এই মুদ্রায় বিক্রি হবে।
লিবিয়ার কাছে সেই সময় প্রায় ১৪৪ টন সোনা মজুদ ছিল। ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থার একটি নথিতে পরে উঠে আসে — ফ্রান্স গাদ্দাফিকে হটানোর পেছনে একটা কারণ ছিল এই গোল্ড দিনার পরিকল্পনা থেকে আফ্রিকার সম্পদ রক্ষা করা।
২০১১ সালে ন্যাটো বাহিনীর সহায়তায় গাদ্দাফি সরকারের পতন হলো। গাদ্দাফি নিহত হলেন। গোল্ড দিনার পরিকল্পনা চিরতরে শেষ।
লিবিয়া আজও গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত।
এই দুটো ঘটনা থেকে অনেক বিশ্লেষক একটি সরল পাঠ পড়েন — পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পেট্রোডলারের বর্তমান চ্যালেঞ্জ
২০২৩-২৪ সালে এসে পেট্রোডলার ব্যবস্থা এমন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে যা আগে কখনো হয়নি।
চীনের পেট্রো-ইউয়ান কৌশল
চীন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক। প্রতিদিন ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ ডলার দরকার — এটা চীনের জন্য একটা বড় দুর্বলতা।
২০১৮ সালে চীন সাংহাইতে ইউয়ানে তেলের ফিউচার ট্রেডিং চালু করল। ২০২৩ সালে সৌদি আরবের সাথে কিছু তেল লেনদেন ইউয়ানে সম্পন্ন হলো।
এটা ছোট পদক্ষেপ কিন্তু ঐতিহাসিক — কারণ প্রায় ৫০ বছরে এই প্রথম কোনো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রায় কিছুটা লেনদেন করল।
রাশিয়ার রুবল ও ইউয়ান
২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়াকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় SWIFT থেকে বাদ দেওয়া হলো। রাশিয়া বাধ্য হলো তেল বিক্রি করতে রুবলে ও ইউয়ানে।
ভারত এখন রাশিয়ার তেল কিনছে রুপিতে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে কিছু লেনদেন হচ্ছে দিরহামে।
এই ঘটনাগুলো ছোট ছোট, কিন্তু একসাথে দেখলে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে — তেলের লেনদেন আস্তে আস্তে বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
সৌদি আরবের হিসাব বদলাচ্ছে কি?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — সৌদি আরব কি পেট্রোডলার ব্যবস্থা ছেড়ে আসবে?
২০২৩ সালে সৌদি আরব SCO (Shanghai Cooperation Organisation)-তে যোগ দেওয়ার আলোচনায় ছিল। চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করল। ইউয়ানে কিছু তেল বিক্রি করল।
কিন্তু সৌদি আরব এখনো আমেরিকার নিরাপত্তার উপর নির্ভরশীল। রাজপরিবারের সুরক্ষা এখনো মার্কিন ছাতার নিচে। পুরোপুরি সরে আসা সহজ নয়।
| মুদ্রা | বৈশ্বিক তেল লেনদেনে অংশ (আনুমানিক ২০২৩) |
| মার্কিন ডলার | ৮০%+ |
| ইউরো | ১০% প্রায় |
| চীনা ইউয়ান | ৫% এর কম |
| অন্যান্য | বাকি অংশ |
পেট্রোডলার ভাঙলে কী হবে?
এটা কোনো কাল্পনিক প্রশ্ন নয়। অনেক অর্থনীতিবিদ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন।
ডলারের মূল্য পড়বে
যদি তেল কিনতে আর ডলার না লাগে, তাহলে বিশ্বের দেশগুলো তাদের ডলার রিজার্ভ কমাবে। ডলারের চাহিদা কমবে, মূল্য পড়বে।
ডলারের মূল্য পড়লে আমেরিকার আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়বে। মূল্যস্ফীতি বাড়বে। আমেরিকার মানুষের জীবনযাত্রার মান কমবে।
আমেরিকার সামরিক খরচে চাপ
আমেরিকার বিশাল সামরিক বাজেট সম্ভব হয়েছে কারণ সস্তায় ঋণ পাওয়া যায়। ডলারের আধিপত্য গেলে ঋণের সুদ বাড়বে। সামরিক খরচ কমাতে হবে।
এর মানে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমবে। ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বদলাবে।
নতুন মুদ্রা কে হবে?
পেট্রোডলার শেষ হলে তার জায়গায় কী আসবে — এটা স্পষ্ট নয়। ইউয়ান? ইউরো? SDR? নাকি কোনো ডিজিটাল মুদ্রা?
প্রতিটি বিকল্পের নিজস্ব জটিলতা আছে। ইউয়ান এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত মুদ্রা নয়। ইউরোর পেছনে ইউরোপের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। SDR সীমিত ব্যবহারের।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন পেট্রোডলার ভাঙলে কোনো একটি মুদ্রার আধিপত্য আসবে না — বরং বহুমুখী ব্যবস্থা তৈরি হবে যেখানে ডলার, ইউয়ান, ইউরো সবই ব্যবহার হবে আঞ্চলিকভাবে।
বাংলাদেশের উপর পেট্রোডলারের প্রভাব
পেট্রোডলার শুধু বড় দেশগুলোর বিষয় নয়। বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্যও এটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্যমতে বাংলাদেশ প্রতিবছর ৬-৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল আমদানি করে। এই তেলের দাম দিতে হয় ডলারে। তাই বাংলাদেশকে সবসময় ডলার রিজার্ভ ধরে রাখতে হয়।
যখন বৈশ্বিক তেলের দাম বাড়ে, বাংলাদেশের ডলার রিজার্ভে চাপ পড়ে। ২০২২ সালে ঠিক এটাই হয়েছিল — বাংলাদেশের রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন থেকে কমে ২০ বিলিয়নের কাছে নেমে এসেছিল।
পেট্রোডলার ব্যবস্থা যদি বদলায় এবং তেল আঞ্চলিক মুদ্রায় কেনা সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো দেশ সরাসরি উপকৃত হবে — কারণ ডলার সংকটের চাপ কমবে।
উপসংহার
পেট্রোডলার ব্যবস্থা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে চতুর আর্থিক কৌশলগুলোর একটি। একটি গোপন চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা তার মুদ্রার মূল্য সোনার সাথে না বেঁধে বেঁধে ফেলল তেলের সাথে। ফলে যতদিন তেলের দরকার আছে, ততদিন ডলারের দরকার।
ব্রেটন উডস মারা গিয়েছিল ১৯৭১ সালে। কিন্তু পেট্রোডলার সেই শূন্যস্থান পূরণ করে দিল নীরবে, গোপনে।
পেট্রোডলার ব্যবস্থা বদলাচ্ছে — ধীরে ধীরে, অনিশ্চিতভাবে। কিন্তু এটা যখন বদলাবে, সেটা হবে বৈশ্বিক ইতিহাসের একটি বাঁকবদলের মুহূর্ত — ব্রেটন উডসের পতনের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। সেই পরিবর্তনের ঢেউ ঢাকার বাজার থেকে নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট পর্যন্ত সবাই টের পাবে।









