GeoRenus Editorial Team

TAM, SAM এবং SOM-এর পূর্ণরুপ হচ্ছে যথাক্রমে Total Addressable Market, Serviceable Addressable Market এবং Share of Market। কোনো পণ্য বা সেবার টোটাল মার্কেট সাইজ, পটেনশিয়াল মার্কেট সাইজ এবং বর্তমান মার্কেট শেয়ার গণনা করার কাজে এই ৩টি মেট্রিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, একটি ব্যবসা বা কোম্পানী আদতে ঠিক কতোটা লাভজনক হতে পারে।
যেকোনো স্টার্টআপ শুরুর আগেই সেই স্টার্টআপের ভবিষ্যত সম্পর্কে একটি ধারণা নিয়ে নেয়া দরকার। কারণ, অনেকসময় দেখা যায় যে, আপনি এমন একটি প্রোডাক্ট বা সার্ভিস নিয়ে কাজ করা শুরু করলেন, যার আসলে কোনো ডিমান্ড নেই। যদি ডিমান্ড না থাকে তাহলে আপনি সেটি বিক্রয় করতে পারবেন না এবং আপনার স্টার্টআপ ফেইল করবে। আবার অনেক সময় এমন হয় যে, আপনি খুব আশা নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেন, কিন্তু কিছুদিন পর বুঝতে পারলেন যে সেই ব্যবসার মার্কেট সাইজ আসলে খুবই ছোট।
এমন ক্ষেত্রে কিন্তু আপনি ব্যবসা বড় করার উদ্দেশ্যে ফান্ডিং পাবেন না। কারণ ইনভেস্টররা যেকোনো স্টার্টআপে বিনিয়োগ করার আগে সেটির পটেনশিয়াল গ্রোথ এবং রেভিনিউ সম্পর্কে ঘাটাঘাটি করেন। যদি সেটির সম্ভাব্য গ্রোথ ভালো না হয়, তবে ইনভেস্টরগণ বিনিয়োগ করতে চান না। তাই যেকোনো ব্যবসা শুরু আগেই সেটির মার্কেট সাইজ, পটেনশিয়াল গ্রোথ, রেভিনিউ ইত্যাদি সম্পর্কে জেনে নেয়া প্রয়োজন। আর এই কাজেই আমাদের সাহায্য করে TAM, SAM এবং SOM।
TAM, SAM এবং SOM হচ্ছে মূলত একটি পণ্য বা সেবার মার্কেট সাইজ নির্ধারণ, সেই ব্যবসার পটেনশিয়াল গ্রোথ এবং সেই ব্যবসার বর্তমান মার্কেট শেয়ার নিরূপণের প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ রূপ। এই ৩টির পূর্ণরুপ হচ্ছে -
Total Addressable Market বা পণ্য বা সেবার টোটাল মার্কেট সাইজ
Serviceable Addressable Market বা উক্ত পণ্য বা সেবা দিয়ে কোম্পানী যেই পরিমান মার্কেট দখল করতে পারবে
Share of Market বা কোম্পানীর বর্তমান মার্কেট শেয়ার
এখন এই ৩টি ম্যাট্রিক সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জানবো।
আপনি যেই পণ্য বা সেবাটি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন তার টোটাল মার্কেট সাইজকে ইংরেজিতে Total Addressable Market এবং সংক্ষেপে TAM বলা হয়। অর্থাৎ, সেই পণ্য বা সেবা যদি পৃথিবীর প্রত্যেকজন ব্যবহারকারী শুধু আপনার থেকেই ক্রয় করেন তাহলে আপনি ঠিক কতো টাকার রেভিনিউ জেনারেট করতে পারবেন, সেটাকেই TAM বলা হচ্ছে। এটি ব্যবহার করলে আমরা জানতে পারি যে, আমাদের ব্যবসায়টিকে ঠিক কতোটা বড় করা সম্ভব এবং সর্বোচ্চ এফোর্টের মাধ্যমে ব্যবসায়টি ঠিক কতো টাকা রেভিনিউ জেনারেট করতে পারবে।
TAM ক্যালকুলেট করার জন্য আপনার দুটো এলিমেন্ট লাগবে। এক, পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উক্ত পণ্য বা সেবার সকল সম্ভাব্য কাস্টমারের সংখ্যা। দুই, প্রতিটি কাস্টমারের এভারেজ অর্ডার ভ্যালু। প্রথম এলিমেন্টটি আপনি অনলাইনে ঘাটাঘাটি করে অথবা নিজেই রিসার্চ করে বের করে ফেলতে পারেন যে আসলে পৃথিবীতে ঠিক কতোজন মানুষের উক্ত পণ্য বা সেবাটি প্রয়োজন। দ্বিতীয় এলিমেন্টটি আপনি আপনার কোম্পানীর রেকর্ড ঘাটালেই জানতে পারবেন যে প্রতিজন কাস্টমার আপনার থেকে গড়ে প্রতি বছর ঠিক কতো টাকার পণ্য বা সেবা ক্রয় করছেন। শেষে, এই দুটো এলিমেন্ট গুণ করে দিলেই আপনি আপনার পণ্য বা সেবার Total Addressable Market পেয়ে যাবেন।
উদাহরণস্বরুপ, ধরে নিন যে আপনি একজন তরুণ বিজ্ঞানী এবং অনেকদিনের গবেষণার পর আপনি একটি রোবোটিক পা তৈরি করেছেন যেটি এমন মানুষদের কাজে লাগবে, যারা কোনো অসুস্থতা অথবা দূর্ঘটনার ফলে একটি বা দুটি পা হারিয়েছেন। এই পুরো আর্টিকেলে আমরা এই উদাহরণটিই ব্যবহার করে সবগুলো এলিমেন্ট বোঝার চেষ্টা করবো। এখন আপনাকে এই কৃত্রিম পা-এর TAM বের করতে হবে। আপনি অনলাইনে রিসার্চ করে জানতে পারলেন যে, পুরো পৃথিবীতে আনুমানিক ৫০ লক্ষ মানুষ রয়েছেন, যারা কোনো দূর্ঘটনায় নিজের একটা অথবা দুটো পা’ই হারিয়েছেন। তাদেরকে যদি সুলভ মূল্যে এই কৃত্রিম পা পৌছে দেয়া হয়, তারা সানন্দে তা গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ, আমরা TAM এর প্রথম এলিমেন্ট পেয়ে গেলাম।
এখন, আপনি ঠিক করলেন যে, প্রতিটি কৃত্রিম পা আপনি ৫০,০০০ টাকা করে বিক্রয় করবেন। আর এটি যেহেতু একজন কাস্টমার একবারই ক্রয় করবেন, তাই এটাই আপনার গড় কাস্টমার অর্ডার ভ্যালু। তাহলে এখন আমরা এই দুটো এলিমেন্টকে গুণ করে দিলেই TAM পেয়ে যাব।
TAM = ৫০,০০,০০০ × ৫০,০০০ = ২৫ হাজার কোটি টাকা
এখন কথা হচ্ছে, প্রতিটি কোম্পানীর মতোই আপনার কোম্পানীরও নিশ্চয়ই কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যেগুলোর কারণে পৃথিবীর সকল কাস্টমারকে আপনার পক্ষে একা সার্ভ করা পসিবল না। এটি হতে পারে বিজনেস মডেলের সীমাবদ্ধতা অথবা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা। এমনিতেও কোনো একটি কোম্পানী পক্ষের ঐ পণ্য বা সেবার ১০০% মার্কেট শেয়ার দখল করা কখনোই সম্ভব নয়।
বর্তমান বিজনেস মডেল ব্যবহার করে আপনার কোম্পানী TAM-এর ঠিক যতো শতাংশ দখল করতে পারবে বলে আপনি মনে করছেন, সেটাকেই বলা হচ্ছে SAM। অর্থাৎ, আপনি নিশ্চয়ই মার্কেটের কোনো একটি নির্দিষ্ট সেগমেন্টকে টার্গেট করবেন। সেই টার্গেট মার্কেটটার সাইজই হচ্ছে Serviceable Addressable Market বা SAM।
আপনি যেই নির্দিষ্ট মার্কেট সেগমেন্টকে টার্গেট করে আপনার পণ্য বা সেবা বিক্রয় করার চেষ্টা করবেন, সেই টার্গেট মার্কেটের কাস্টমারের সংখ্যা আপনাকে জেনে নিতে হবে। এটিও আপনি অনলাইনে রিসার্চ করে বের করে নিতে পারেন অথবা আসল সংখ্যার কাছাকাছি একটি সংখ্যা ধরে নিয়েও কাজ করতে পারেন। তারপর সেই মার্কেট সেগমেন্টের টোটাল কাস্টমারের সংখ্যাকে আপনার গড় কাস্টমার অর্ডার ভ্যালু দিয়ে গুণ করতে হবে। তাহলেই আপনি SAM এর ভ্যালু বের করে ফেলতে পারবেন।
ধরে নেই যে, আপনি শুধু বাংলাদেশে আপনার কৃত্রিম পা বিক্রয় করবেন। কারণ, শুরুতেই আপনার পক্ষে গ্লোবাল লেভেলে এটা লঞ্চ করা সম্ভব হবে না। তাই আপনি শুধু বাংলাদেশকে টার্গেট করে কৃত্রিম পা’গুলো বিক্রয় করবেন। আপনি অনলাইনে রিসার্চ করে দেখলেন যে বাংলাদেশে বার্ষিক কৃত্রিম পা-এর চাহিদা রয়েছে প্রায় ৯,০০০টি। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সম্পূর্ণ মার্কেট আপনি একাই দখল করতে পারলেও বছরে ৯,০০০টির বেশি কৃত্রিম পা বিক্রয় করতে পারবেন না। আর আপনার গড় কাস্টমার ভ্যালু হচ্ছে ৫০,০০০ টাকা। সুতরাং,
SAM = ৯,০০০ × ৫০,০০০ = ৪৫ কোটি টাকা
আপনার অঞ্চলে যদি শুধুই আপনার একারই রাজত্ব না থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই আপনি SAM এর পুরোটা দখল করতে পারবেন না। কারণ, সবসময়ই এমন কোনো না কোনো কোম্পানী আপনার প্রতিদ্বন্দী হিসেবে থাকবে যারা আপনার সাথে একই মার্কেট সেগমেন্টকে টার্গেট করে ব্যবসা দাড়া করাবেন। তাই SAM এর যে অংশটুকু আপনি আসলেই দখল করতে পারবেন বা ইতোমধ্যেই পেরেছেন তাকেই বলা হচ্ছে Share of Market বা SOM।
SOM ক্যালকুলেট করার জন্য আপনার গত বছরের টোটাল রেভিনিউকে গতবছরের SAM দিয়ে ভাগ করতে হবে। এভাবে আপনি গতবছরের মার্কেট শেয়ার পেয়ে যাবেন। এবার গত বছরের মার্কেট শেয়ারকে এই বছরের SAM দিয়ে গুণ করতে হবে। তাহলেই আপনি এই বছরের মার্কেট শেয়ার বা SOM পেয়ে যাবেন।
ধরে নিলাম যে, আপনি গত বছর মোট ৪.৫ কোটি টাকার কৃত্রিম পা বিক্রয় করেছিলেন এবং গতবছর বাংলাদেশে কৃত্রিম পায়ের SAM ছিল ৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, গতবছর আপনার মার্কেট শেয়ার ছিল -
SOM = (৪.৫ / ৪৫) = ০.১০ বা ১০ শতাংশ
বাংলাদেশে দূর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এই বছর বাংলাদেশে কৃত্রিম পায়ের চাহিদা বা SAM বেড়ে দাড়িয়েছে ৪৭ কোটি টাকা। গতবছর আপনার মার্কেট শেয়ার ছিল ১০ শতাংশ। এটি যদি আপনি ধরে রাখতে পারেন তাহলে এই বছর আপনার মার্কেট শেয়ার বা SOM -
SOM = ৪৭ কোটি × ১০% = ৪.৭ কোটি টাকা
অর্থাৎ, আপনার কৃত্রিম পায়ের ব্যবসায়ের TAM হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি টাকা, SAM হচ্ছে ৪৫ কোটি টাকা এবং আপনার SOM হচ্ছে ৪.৭ কোটি টাকা।
আপনি যদি শুধু কোনো একটি আইডিয়া নিয়ে ইনভেস্টরদের পেছনে ছোটেন, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই আপনার উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করবেন। কারণ, আপনার কাছে কোনো ডেটা নেই যে আসলে আপনার উদ্যোগের ভবিষ্যত ঠিক কতোটা উজ্জ্বল। তাই, ইনভেস্টরদের কাছে যাওয়ার আগে অবশ্যই আপনার TAM, SAM এবং SOM ক্যালকুলেট করে নিবেন। এতে করে তারা সহজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন।

প্রতিটি উদ্যোক্তাই চায় তার পণ্য বা সেবা বাজারে আনার আগে সেটাকে একদম নিখুঁত করে তুলতে। কিন্তু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর সময় আর অর্থ ব্যয় করে একটা পণ্য পুরোপুরি তৈরি করার পর যদি দেখা যায় বাজারে তার কোনো চাহিদাই নেই — এটা একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। মূলত এই সমস্যার সমাধান দিতেই তৈরি হয়েছে মিনিমাম ভায়েবল প্রোডাক্ট বা এমভিপি কৌশল। পুরো পণ্য একসাথে না বানিয়ে শুধু সবচেয়ে জরুরি ফিচারগুলো নিয়ে বাজারে আসুন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সত্যিকারের মতামত নিন এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে পণ্য উন্নত করুন। বাংলাদেশের পাঠাও, বিশ্বের উবার এবং ড্রপবক্স — এরা সবাই এই একই পথ ধরে এগিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।








