19 articles
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর Basel III হলো ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। Basel I থেকে Basel III পর্যন্ত বিবর্তন, মূলধন প্রয়োজনীয়তা, তারল্য অনুপাত, লিভারেজ অনুপাত এবং বাংলাদেশে এর বাস্তবায়ন — সব কিছু সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা।

ব্যাংক মানে টাকার ভল্ট নয় — এটি একটি অর্থ-কারখানা। Bank of England ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে নতুন টাকা তৈরি করে। প্রতিটি ঋণ অনুমোদনের সময় দুটি কম্পিউটার এন্ট্রি দিয়ে নতুন অর্থ জন্ম নেয়, আর ঋণ পরিশোধে সেই অর্থ ধ্বংস হয়। এই আর্টিকেলে আমরা জানব ব্যাংক ঠিক কী কী করে, কীভাবে টাকা তৈরি হয়, Fractional Reserve Banking কী, বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের বাস্তব চিত্র — এবং একজন সচেতন গ্রাহক হিসেবে আপনার কী জানা দরকার।

ব্যাংকে গেলে এমন অনেক শব্দ শোনা যায় যেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত — EMI, FDR, KYC, RTGS, CIB, CAR। এই পরিভাষাগুলো না বুঝলে ব্যাংকিং সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, এমনকি আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়। বাংলাদেশে ৬৫% এরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যাংক হিসাব থাকলেও অধিকাংশই মৌলিক ব্যাংকিং শব্দগুলো জানেন না। এই গাইডে ৫০টিরও বেশি জরুরি ব্যাংকিং পরিভাষা সহজ বাংলায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে আপনি আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যাংকিং করতে পারেন।

M0, M1 এবং M2 হলো অর্থের তিনটি স্তর — যেগুলো দেখলে বোঝা যায় একটা অর্থনীতিতে আসলে কতটুকু "সত্যিকারের" অর্থ আছে আর কতটুকু ব্যাংকের তৈরি ঋণ-ভিত্তিক অর্থ। M0 হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো নোট ও কয়েন — এটাই একমাত্র "আসল" অর্থ। M1 এবং M2 যত বাড়ে, বুঝতে হবে ব্যাংক তত বেশি ঋণের মাধ্যমে অর্থ সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোতে M2 এবং M0-এর অনুপাত দেখলে স্পষ্ট হয় যে সত্যিকারের অর্থের চেয়ে ব্যাংকের তৈরি অর্থ কয়েকগুণ বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চিত্র আরো বেশি উদ্বেগজনক কারণ উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এই অনুপাতকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

ঋণ-ভিত্তিক অর্থ সৃষ্টি বা Debt-based Money Creation হলো আধুনিক অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং কম আলোচিত সত্য — প্রতিটা ব্যাংক ঋণ আসলে নতুন অর্থের জন্ম দেয়, এবং সেই ঋণ শোধ হলে সেই অর্থ আবার ধ্বংস হয়ে যায়। অর্থাৎ আমরা যে টাকা প্রতিদিন ব্যবহার করি তার বেশিরভাগই সরকার ছাপায়নি — ব্যাংক তৈরি করেছে, শূন্য থেকে, একটা কম্পিউটার এন্ট্রির মাধ্যমে। এই আবিষ্কার শুনতে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মতো লাগলেও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ২০১৪ সালে এটা সরকারিভাবে স্বীকার করেছে। এই সিস্টেম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সম্ভব করেছে, কিন্তু একই সাথে এমন একটা ফাঁদ তৈরি করেছে যেখান থেকে বের হওয়ার পথ নেই — কারণ ঋণ থামলেই অর্থ ধ্বংস হয়, এবং অর্থ ধ্বংস হলে অর্থনীতি ভাঙে।

ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং হলো আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল কাঠামো, যেখানে ব্যাংক তার কাছে জমা রাখা আমানতের পুরোটা সংরক্ষণ না করে মাত্র একটা নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ রিজার্ভ হিসেবে রেখে বাকিটা ঋণ হিসেবে দিয়ে দেয়। এই একটা নীতির উপর ভিত্তি করে একটা আমানত থেকে বহুগুণ বেশি অর্থ পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে মানি মাল্টিপ্লায়ার বলে। সিস্টেমটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সম্ভব করলেও এটি মূলত বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে — বিশ্বাস ভাঙলেই ব্যাংক রান, সিস্টেম ভাঙে। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ এই পদ্ধতিতে চললেও ইসলামিক ব্যাংকিং এবং Full Reserve-এর মতো বিকল্প সিস্টেম এই ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করছে।

দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বেড়াজালে আমাদের ব্যাংকিং সেক্টর জর্জরিত। ইতোমধ্যে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছে লক্ষাধিক কোটি টাকা। ব্যাংকিং সেক্টর পুনর্গঠনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করে দিয়েছেন। সবার আগে এনশিওর করতে হবে যাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে আর কোনো ব্যাংক কাউকে ঋণ না দিতে পারে।

ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং হচ্ছে এমন একটি ব্যাংক ব্যবস্থা, যেখানে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ডিপোজিটের একটি নির্দিষ্ট অংশ রিজার্ভ হিসেবে জমা রেখে বাকি টাকা লোন হিসেবে অন্যান্য গ্রাহকদের দেয়। গ্রাহকদের টাকা ব্যবহার করার কারণে সেই লোন থেকে প্রাপ্ত লাভের একটি অংশ ব্যাংক তার গ্রাহকদের সুদ হিসেবে প্রদান করে। বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা’ই ফ্র্যাকশনা রিজার্ভ ব্যাংকিং সিস্টেম ফলো করছে।

কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো বর্তমানে ডিপোজিট গ্রহণ, ঋণ প্রদান, পেমেন্ট প্রসেসিং ও কারেন্সি এক্সচেঞ্জ সার্ভিসের পাশাপাশি আরো বিভিন্ন সেবা অফার করছে যেমন - মূলধন সরবরাহ করা, রিস্ক ট্রান্সফরম্যাশন, লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি। এইসকল সার্ভিস অফার করার মাধ্যমে কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো একদিকে যেমন ব্যাক্তি পর্যায়ে ব্যাংকিং সার্ভিস পাওয়া সহজ করে দিচ্ছে, আবার বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে’ও ভূমিকা পালন করছে।

ব্যাংক রান হচ্ছে এমন একটি ঘটনা যেখানে কোনো ব্যাংকের বেশিরভাগ ডিপোজিটর একসাথে ব্যাংক থেকে নিজেদের টাকা তুলে নেয়ার চেষ্টা করেন এবং বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের চাহিদাপূরণ করতে না পেরে ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যায়। অনেক সময় গুজব বা ব্যাংক দ্বারা নেয়া কোনো ভুল পদক্ষেপের কারণে এই ধরণের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ব্যাংকের কার্যক্রম বলতে মূলত জনগণের সঞ্চয় আমানত হিসেবে গ্রহণ ও ঋণ প্রদান বোঝানো হলেও ব্যাংক আরো অনেক ধরণের সার্ভিস যেমন - ক্রেডিট কার্ড, বিভিন্ন ধরণের পেমেন্ট সার্ভিস, কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, ব্যবসায়িক ঋণ, ট্রেড ফাইন্যান্স, ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট সেবা প্রদান করে থাকে। তবে সকল ব্যাংক সকল ধরণের সার্ভিস প্রদান করে না, উদ্দেশ্যভেদে প্রতিটি ব্যাংকের কার্যক্রম ভিন্ন হয়ে থাকে।

ডিজিটাল ব্যাংক বলতে মূলত এমন ব্যাংককে বোঝানো হয়, যার সকল প্রোডাক্ট ও সার্ভিস হচ্ছে ক্লাউড-বেইজড, অর্থাৎ, এই ব্যাংকের কোনো ফিজিকাল লোকেশান থাকে না। তবে অনেক সময় ডিজিটাল ব্যাংকিং, ই-ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং - এই শব্দগুলোকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ডিজিটাল ব্যাংকের সকল প্রোডাক্ট ও সার্ভিস ট্রেডিশনাল ব্যাংকের মতোই, শুধু পার্থক্য হচ্ছে এই যে, ডিজিটাল ব্যাংকের সকল সুবিধা ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে ভোগ করা যায়, ব্রাঞ্চে উপস্থিত হতে হয় না।

ব্যাংকের প্রোডাক্ট ও সার্ভিসগুলোকে মূলত ৪টি ভাগে করা যায়, যথা - কোর প্রোডাক্টস, লোন সার্ভিস, ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস ও অন্যান্য সাপ্লিমেন্টারি সার্ভিস। প্রতিটি ভাগেই একাধিক ধরণের প্রোডাক্ট ও সার্ভিস রয়েছে, যার উদ্দেশ্য মূলত গ্রাহকের আর্থিক লেনদেনকে সহজ করে তোলা এবং নিরাপদে আর্থিক লেনদেন করার সুবিধা প্রদান করা।

কমার্শিয়াল ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাঝে মূল পার্থক্য হচ্ছে এই যে, কমার্শিয়াল ব্যাংক সাধারণ মানুষদের সার্ভিস প্রদান করে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার অধীনে থাকা অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে সার্ভিস প্রদান করে। অন্যান্য ব্যাংকের কার্যক্রম দেখাশোনার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি তৈরি করে, ফরেন রিজার্ভ মেইনটেইন করে, নোট ইস্যু করে, সরকারকে রিপ্রেজেন্ট করে। এসব কার্যক্রম কোনো কমার্শিয়াল ব্যাংক পালন করে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক হচ্ছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে। বর্তমানে বাংলাদেশের নোট ইস্যু করা, মনিটারি পলিসি তৈরি করা, সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা, ব্যাংকিং সেক্টর রেগুলেট করা ইত্যাদি দায়িত্ব রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপর।

দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার মূল দায়িত্ব থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই দায়িত্ব পালন করে মূল ৫টি কাজের মাধ্যমে, যথা - মনিটারি পলিসি তৈরি করা, কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোকে রেগুলেট করা, নোট ইস্যু করা, ফরেন রিজার্ভ ম্যানজ করা ও ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস মোকাবিলা করা।

কোনো কিছু বন্ধক রেখে বা বন্ধক ছাড়াই যখন ব্যাংক আমাদের অ্যাকাউন্টে জমানো টাকার অতিরিক্ত অর্থ আমাদের প্রদান করে, তখন তাকে ব্যাংক লোন বলা হয়। সাধারণত, ব্যক্তিগত কোনো প্রয়োজনে বা ব্যবসায়িক কাজের জন্য ব্যাংক লোন নেয়া হয়ে থাকে। লোনের মেয়াদ শেষ হলে সুদ’সহ লোনের সম্পূর্ণ অর্থ ব্যাংককে পরিশোধ করতে হয়। আর লোন পরিশোধে ব্যর্থ হলে দিতে হয় জরিমানা।

পৃথিবীতে ব্যাংক ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল বিনিময় প্রথার অবসানের মাধ্যমে। তখন ব্যাংকিং বলতে মূলত বোঝানো হতো অর্থ (কয়েন ও স্বর্ণ) জমা রাখা এবং ঋণ আদান-প্রদান। ব্যাংক ব্যবস্থাকে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয় রোমান সম্রাজ্য এবং বিশ্বের প্রায় সকল দেশে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রভাব বিস্তার করতে ভূমিকা পালন করে ইউরোপের বিভিন্ন ধনী সম্প্রদায়।

ব্যাংক হচ্ছে এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যারা জনগণের সঞ্চিত অর্থ আমানত হিসেবে গ্রহণ করে এবং উক্ত আমানতের টাকা ঋণ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তিদের প্রদান করে। আর ব্যাংকের সাথে জড়িত যেকোনো ধরণের কার্যক্রমকে ব্যাংকিং বলা হয়। যেকোনো দেশের ব্যাংককে উক্ত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মনীতি মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।

ব্যাংকিং আধুনিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ব্যাংক শুধু অর্থ সংরক্ষণ করে না — তারা ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে অর্থ তৈরি করে, সুদের হার প্রভাবিত করে এবং অর্থনৈতিক নীতি গঠন করে। আর্থিক সাক্ষরতার জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে তা বোঝা অপরিহার্য।